Home সোনাডিঙি নৌকো সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৬

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৬

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৬
মৃধা মৌনি

‘আর লাগবে না।’
বকুলের আদেশে তৃণা থতমত খেয়ে থামল। চাইলো দীক্ষার দিকে। দীক্ষা মনোযোগ দিয়ে ফোন চাপছে। কি আছে ওতে? একবার তার দিকে তাকাচ্ছে না! এত অবজ্ঞা! এত ঘৃণা! তৃণার ভালো লাগছে না। কিন্তু আগ বাড়িয়ে কিছু যে বলবে, তারও উপায় নেই। আছে যার ঘরে, তার নির্দেশ মতোই তো চলতে হবে। বের করে দিলে কোথায় যাবে সে?

‘যাও, আজকের মতো এখানেই সমাপ্তি।’
তৃণা উঠে দাঁড়াল। আস্পর্ধা দেখো চাকরানির!
মনে মনে দাঁত খিঁচে চিবিয়ে চিবিয়ে আওড়ালো। বকুলের সার্বক্ষণিক সঙ্গী কে ছিল? এই তৃণাই তো। সবসময় সাথে সাথে ঘুরে বেড়াতো, একত্রে মাছ ধরতে যেতো, গাছের ফল পেড়ে খেতো, রাস্তার ছেলেদের দেখত, অবশ্য তৃণাই দেখত, বকুল এসবের ধারে কাছে থাকত না। তার কাছে শান্ত ভাইয়ের চেয়ে বেস্ট আর দ্বিতীয়টি নেই। অথচ এই মেয়ে এখন তাকে কাজের মেয়ের মতো করে ট্রিট করছে! মানে আশ্চর্য!
অরুণিমাভ নাহয় এই বাড়ির মালিক, তুই কে, কীভাবে এসেছিস আর এসেই আমার উপর এমন ছড়ি ঘুরাচ্ছিস, আরে আমি তো তোর বোন.. এইটুকু মানবতা দেখা! মনে মনে গজগজ করতে করতে তৃণা চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই দীক্ষার ফোনটা বেজে উঠল। ধরল দীক্ষা। লাউড স্পিকারে দিতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো অরুণিমাভের গলা, ‘হ্যালো…’

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

দীক্ষা মৃদু হেসে জবাব দিলো, ‘হুম।’
‘অল ওকে?’
‘হ্যাঁ।’
‘ও কোথায়?’
দীক্ষা তবুও একনজর চোখ তুলে তাকাল না তৃণার দিকে, জবাবে বলল, ‘এখানেই।’
‘ঠিক মতো কাজ করছে তো? না করলে আমাকে বলবে কিন্তু! এই মেয়েটাকে রাখাই হয়েছে তোমার সেবা যত্ন করবে বলে। আরহাম আয়ান ওকে পছন্দ করে না। সো তোমার সেবা করতে ভালো করবে আর নাহয় যেখান থেকে এসেছে সেখানেই নামিয়ে আসবো।’
তৃণার চোখজোড়া যেন বিস্ফোরিত হয়ে কোটর থেকে ছিঁটকে বেরিয়ে আসবে এখুনি। কতবড় কথা! তার সেবার জন্য ওকে রাখা হয়েছে! কি এমন মহারানী বনে গেল এই মেয়ে? হঠাৎ করে কি এমন পরিবর্তন ঘটল? তৃণার মন মেজাজ পুরোপুরি খিঁচড়ে গেল৷ এক পা এগোলো, এক্ষুনি একটা উচিত জবাব দেবে ভেবে কিন্তু তার আগেই দীক্ষার জবাবে তাকে থমকে দাঁড়াতে হলো।

‘কয়েকটা দিন দেখি। এমনিতে তো মনে হয় না, কাজের প্রতি বিশেষ আগ্রহ আছে। পা টিপছিল তাও বকুল বলল বলে করল। নইলে হাত খুলে গুটিয়ে রাখত বোধহয়।’
ওপাশ থেকে অরুণিমাভ জানাল, ‘অলস প্রকৃতির মেয়ে। চেহারা দেখেই বলা যায়, জীবনে কিছু করতে আসেনি।’
‘অন্যের ঘরে আ গু ন জ্বালাতে এসেছে শুধু।’ উত্তরটা দিলো বকুল, একটু নিচু স্বরেই, তবু তৃণা শুনতে পেয়ে ঝট করে তার দিকে ফিরলো। বকুল মুখ ভেংচে চোখ সরিয়ে নিলো। ইগনোর… ময়লার আবর্জনার দিকে অত তাকাতে হয় না…

দীক্ষা বলল, ‘আপনি কাল ভালো করে বলে দিবেন। যদি এখানে থাকতে হয়, কাজ করে খেতে হবে। অকারণে কাউকে পালা হবে না। এটা কোনো ধর্মশালা নয়।’
‘ঠিক আছে ঠিক আছে। আপাতত রেস্ট করো। রাখছি।’
‘গুড নাইট।’
‘তোমাকেও!’
ফোন কেটে গেল। দীক্ষা ফোনটা রেখেই বকুলের দিকে তাকাল। ভাসা ভাসা চোখ দুটি আরও বড় করে বলল, ‘এখনো যাচ্ছে না কেন? কাজ হয়ে গেলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগত ফোনালাপ শোনাটা অভদ্রতা।’
বকুল তৃণার দিকে তাকাতেই তৃণা হতবিহ্বল হয়ে পড়ল। কাকে বলব দীক্ষা, তাকে?
এভাবে? এমন আচরণে? তৃণা এগিয়ে এলো, ‘তোমরা আমার সাথে এভাবে কথা বলছ কেন?’
উত্তরটা দিলো বকুল, এগিয়ে এলো সেও, ‘কিভাবে বলছি?’

‘আমি কি কাজের লোক নাকি!’
‘এছাড়া আর কি পরিচয় আছে তোর?’
সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিতে পারল না তৃণা। আসলেই তো, এর বাইরে তার তো কোনো পরিচয় নেই। বকুলের চোখজোড়া মিটিমিটি হাসছে। তৃণা আরও অপ্রস্তুত হলো, থতমত কণ্ঠে শুধালো, ‘তাই বলে এরকম ব্যবহার করবে নাকি! তাছাড়া তোমরা তো আমার পরিচিত, আমার… আমার বো…’
শেষ করার আগেই তার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিলো দীক্ষা, ‘ও না বলেছে ওর কোনো পরিবার নেই, উনি তো তাই বললেন, তাহলে এখন আবার আমাদের সঙ্গে কীসের পরিচয় জাহির করতে চাইছে বকুল?’
বকুল ও একই কথা ছুঁড়ে দিলো চোখের ইশারায়। তৃণা তার ইহজীবনে এমন কোণঠাসা বোধ করেনি। কি বলবে খুঁজে না পেয়ে শেষমেশ মাথাটা আপনাতেই নিচু হয়ে গেল তার। তাই দেখে মনের ভেতর হাজারও প্রজাপতি ডানা ঝাপটে উড়ে বেড়াতে লাগল বকুলের। একদম ঠিক হয়েছে.. যার সঙ্গে যা হওয়া উচিত, তাই হচ্ছে। বিধাতা সবকিছুরই সঠিক বিচার করেন।

‘এখানে তুই কাজের লোক আর আমরা মেহমান, সো হিসেব করে তারপর কথা বলবি। যদিও শ্রমিক শ্রেণীর লোকদের গায়ে হাত তোলাটা জঘন্য অপরাধ, তবু এই অপরাধ তোর করা অপরাধের চেয়ে হাজার গুণ ছোটই। আর আমি যদি সুযোগ পাই, ভালোমতোই করব। সুতরাং এখানেই সাবধান হয়ে যা…বড় ভাইয়া যে কাজ দিয়েছেন সেটা সুন্দর মতো কর, আর নইলে বেরিয়ে যা যেদিক খুশি। পরিবার ছাড়া মেয়েরা রাস্তায়ই থাকে.. তোর সাত না না চৌদ্দ কপালের ভাগ্য তিনি তোকে উঠিয়ে নিয়ে এসেছেন…’

তৃণার বুক ফেটে হাহাকার বেরোলো। মন চাচ্ছে কষিয়ে দু ঘা বসিয়ে দেয় বকুলের নরম গালে। কিন্তু এই মুহূর্তে সেটা সম্ভব না বলেই তৃণা নীরব পায়ে বেরিয়ে গেল। সময় আজ তার মুঠোর মধ্যে নেই। কিন্তু একদিন আসবে। সেই সময়ের অপেক্ষাতেই আজকের অপমানটুকু গিলে নিলো তৃণা।
‘বেশি হয়ে গেল?’ দীক্ষার কণ্ঠে সংকোচ। বকুল দরজা আঁটকাতে আঁটকাতে ভীষণ অবাকে ফিরে তাকাল, ‘পাগল হয়ে গেছ নাকি? কোথায় বেশি হলো?’ ও এগিয়ে এলো চটপট পায়ে।
‘না মানে…’ দীক্ষার কণ্ঠে দ্বিধা, ‘কেমন যেন লাগছে…’
‘খারাপ লাগছে?’ প্রশ্ন করল বকুল,
দীক্ষাকে চেয়ে থাকতে দেখে নিজেই বলল আবার, ‘লাগলেও সামলে নাও। ও যা করেছে তাতে ওকে চাবকে গায়ের ছাল ছাড়ানো উচিত ছিল। জানো তো, ইসলামে পরকীয়া করে যারা, তাদের শাস্তির ব্যাপারে কি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে?’

দীক্ষা মাথা নাড়লো, ‘জানি।’
বকুল বসল তার পাশে। হাত দুটি চেপে ধরে নরম গলায় শুধালো, ‘তুমি নরম হয়ে গেলে চলবে? চোখের সামনে থাকলে সব রাগ গলে পানি হয়ে যায় কিন্তু তুমি কি ওর উপর সত্যিই রাগ পুষে রেখেছ নাকি ঘৃণা?’
দীক্ষা কোনো জবাব দিতে পারল না।
যত সহজ ভেবে সে এসেছিল এখানে, তত সহজ এখন লাগছে না। দৃষ্টির আড়াল হলে অনেক কিছু ভুলে থাকা যায়। যতবার ওই মুখখানা দীক্ষা দেখে, ততবার মনে পড়ে যায়, কীভাবে সূচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরিয়েছিল তৃণা- তার বোন, যার সঙ্গে স্মৃতির পাতার অর্ধেক ঠাসা, ভালোমন্দ নানান মুহূর্তে…. র ক্তে র বোন- যার সঙ্গে দীক্ষার আত্মার সম্পর্ক ছিল, সেই সম্পর্ক কি ছিন্ন হয়েছে? র ক্ত কি ভাগ হয়েছে? কঠিন লাগে তার কাছে। জীবন এমন না হলেও পারতো। কিন্তু জীবন তো…সমান্তরালে চলে না সবসময়।

দীক্ষা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। অনেক কিছু ভাবনায় আসতে চায়, সে আনতে চায় না। পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে নিজের কাছে নিজেই… বকুল বোঝে সব। একটা হাতে দীক্ষার হাত চেপে ধরা তখনো। চুপচাপ তাকিয়ে আছে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা ওই মুখপানে। কি মায়াবি, কি স্নেহময়ী, কেন করলি রে তৃণা? দুনিয়াতে পুরুষের কি অভাব পড়েছিল? অন্য কাউকে ধরে এনে পছন্দের কথা বলতি, আমরা মেনে নিতাম, ভালো থাকতিস, অন্যের বাড়িতে চাকরানি হয়ে থাকতে হতো তোর? আজ পড়াশোনা করে ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বানাতি। নিজের হাতে নিজের জীবন পুড়িয়ে এখনো থামছিস না কেন? একবার বুকে জড়িয়ে নিচ্ছিস না কেন এই মেয়েটাকে… যার সব কে ড়ে নিলি, তার কাছে মাথা নত করে ক্ষমা না চাওয়া অবধি তোর এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে? হয় না…
দীক্ষা তাকাতেই বকুলের ভাবনার গতিপথে লাগাম পড়ল। সেও তাকিয়েই ছিল, দীক্ষার সঙ্গে চোখাচোখি হলো। দীক্ষা বলল, ‘খুব তাড়াহুরোয় আসার সিদ্ধান্ত নিলাম, না রে?’

বকুল মাথা নাড়লো দু’দিকে, ‘এসে ভালো করেছ। হয়তো তোমাকে এখানে আনার মাধ্যমেই বিধাতার বড় কোনো পরিকল্পনা আছে।’
‘জানি না রে, কি যে আছে ললাটের লিখনে!
তবে অপরিচিত কারো বাসায় এভাবে আসাটা উচিত হয়নি।’
‘তুমি কি এখানে ফূর্তি করতে এসেছো আপা?’
‘তা না…’
‘তুমি কার জন্য এসেছ, সত্যি করে বলো তো…’
দীক্ষা হাসল, চোর ধরা পড়ে যাওয়া হাসি।

অরুণিমাভ যখন জানালেন তার বাড়িতেই আছে তৃণা, দীক্ষা সেটা শুনেই মূলত রাজি হয়েছিল। যতই ফেলে দেক না কেন, মুখে যাই বলুক, তবু আসে যায় তো.. এক কণা পরিমাণ হলেও আসে যায়। উপর দিয়ে নিজেকে যতই নারকেলের শক্ত খোলসে মুড়িয়ে নেক, ভেতরটা ফাঁপা, ফাঁকা- তৃণা শুধু স্বামী-স্ত্রীর একটা সুন্দর সংসারই ভাঙেনি, বোন-বোনের পারিবারিক দৃঢ় বন্ধনকেও নড়িয়ে দিয়েছে। সেই বন্ধন এখন সামান্য সুতোয় বাঁধা, যা দীক্ষার হাতে পেঁচিয়ে, চাইলেই সে ছেড়ে দিতে পারত, পারেনি… সবাই প্রতারণা জানে না… সবাই সম্পর্ক ভাঙতে জানে না।
ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলল দীক্ষা। বকুল হাসল এবারে, ‘কত যে লুকাতে চাও, অথচ তোমার চোখে সব ফুটে থাকে… সউউউব…’

গাল টেনে ধরল দীক্ষা ওর, ‘খুব পাকনা হয়েছিস। মামা কে বলতে হবে, তোর বিয়ের ব্যবস্থা করা দরকার।’
এই কথা শুনতেই বকুলের চোখের পাতায় ভেসে উঠল শান্তর অশান্ত মুখখান। চঞ্চল হৃদয়ের সেই ছেলেটা, যাকে বুঝ হওয়ার পর থেকে নিজের হৃদয়ের মণিকোঠায় জায়গা করে দিয়েছে খুব যতনে। কিন্তু সে তো… মনে পড়তেই মনটা মলিন হয়ে ওঠে তার। চোখেমুখে স্পষ্ট বিষন্নতা প্রকাশ পায়। দীক্ষা চুপ করে দেখে। আনন্দ পায়। কি বোকা আহারে! ভাবছে শান্ত তাকে পছন্দ করে.. অথচ শান্ত যে তাকে বোন বানিয়েছে আর বউ তোকেই বানাবে… এক্ষুনি বলতে ইচ্ছে করে দীক্ষার কিন্তু বহু কষ্টে মুখটাকে আঁটকাল। শান্ত বিশেষ ভাবে রিকোয়েস্ট করেছিল, বকুলকে যেন এসব ব্যাপারে কিচ্ছুটি না বলে। বকুলের অস্থির মনের চঞ্চলতা সেও টের পেয়েছে। সেই অস্থিরতা সে নিজেই দূর করবে.. সময় আসুক!

তাই আপাতত ভাইয়ের অনুরোধ পালনেই দীক্ষা শুয়ে পড়ল তাড়াতাড়ি, পেটের নিচে বালিশ চাপা দিয়ে, কত বড় হয়েছে পেটটা… অবাক লাগে! কবে আসবে সোনামনি তার?
‘শুয়ে পড়। অনেক রাত হলো।’ বলল দীক্ষা।
বকুল আনমনে ‘হুঁ’ বলে উঠে এলো। বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ল পাশে। কিন্তু ঘুম এলো না সহজে। না তার, আর না দীক্ষার। পাশাপাশি শুয়ে দুটি মানুষ সম্পূর্ণ নতুন চিন্তা ভাবনায় নিমজ্জিত হয়ে কল্পনার জগতে হারিয়েছে…

আজকাল শিশিরের রাত কা টে না। দিনটা চলে যায় কীভাবে কীভাবে যেন, রাতগুলো বড্ড আলস্যে ভরে আসে। সেকেন্ডের একেকটা কা টা যেন একেকটা বছরের সমান। ধীর লয়ে চলে…শিশির হাপিত্যেশ করে। অস্থিরতায় গুমরে ম রে। আজ তার পাশে কেউ নেই। কেউ না…
পুলিশের কাছে সবকিছুই স্বীকার করেছে সে।

ইয়াবা আর হিরোইন চোরাকারবারিতে তার দায়িত্বটা যে ডেলিভারি ম্যানের- জানার পরেও পুলিশ তাকে অনেক সমাদর করেছে। জানতে চেয়েছে, আর কে কে এসবের সঙ্গে জড়িত। শিশির কাউকেই জানে না, মকবুল ভাই ছাড়া। সেও নাকি শিশিরের অ্যারেস্ট হওয়ার পর থেকে পলাতক। পুলিশেরা অনেক মে রে ছে, নির্যাতন করেছে, কানের উপর জোরে জোরে বা রি দিয়েছে, সূচ ফুটিয়েছে চামড়ায় অসংখ্যবার। কি নেই তাদের নি র্যা ত ন সেলে! শিশির চিৎকার করে বলেছে, সে কাউকে চেনে না আর, কারো সঙ্গে তো কথাই হতো না ওর, এসে দিয়েই চলে যেতো কিংবা ও গিয়ে দিলেই তারা নিয়ে পালাতো একপ্রকার। তবু পুলিশ ক্ষান্ত হয়নি। মা র তে মা র তে শেষমেশ হাল ছেড়ে দিয়ে শিশিরের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতেই মামলা দায়ের করেছে। আগামীকাল তাকে কোর্টে চালান করা হবে। জজ সাহেবের রায়ের উপর ভিত্তি করছে তার ভবিষ্যৎ জীবন। জেলে দেওয়া হবে, এ কথা জানা, তবে কতদিনের জন্য কে জানে!

শিশির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। আজকাল তার মনটা মুক্ত পাখির মতো উড়ে বেড়াতে চায়। উড়ে চলতে চায় বহুদূর। কে যেন বলেছিলেন, শরীর আঁটকে গেলে মন খুলে যায়। কোথায় পড়েছিল লেখাটা? ঠিক মনে করতে পারছে না শিশির। এসব বই পড়ার নেশা টেশা তার কোনো কালেই ছিল না। বই তো পড়ত দীক্ষা, প্রচুর, প্রচুর.. বিয়ের শুরু শুরুতে কত ঝগড়াও হয়েছে দুটিতে এজন্য! শিশির মুখ ফুলিয়ে বলত, ‘তোর তো আমাকে দরকার নেই, দরকার ওই বইয়ের, তাহলে ওসব ছাঁইপাশই বিয়ে করতি।’
দীক্ষা ও কপট রাগ দেখিয়ে খেঁকিয়ে উঠত তখন, ‘খবরদার, আমার বইকে একদম ছাঁইপাশ বলবি না। এগুলি আমার বয়ফ্রেন্ড। আমাকে হাসায়, আমাকে কাঁদায়।’
‘তাহলে আমি কি?’ ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইতো শিশির।
দীক্ষা মুখ ভেংচে বলত, ‘রসকষহীন হাজবেন্ড! বিয়ের পর যার সব রস ফুরিয়ে গেছে…’
‘আচ্ছা, তাই?’ চোখ পাকাতো ছেলেটা।
তাতে হেসে কুটিকুটি হতো মেয়েটা।
কত সুন্দর দিন ছিল!

শিশিরের চোখ ভিজে ওঠে। এক বুক ভরা স্বপ্ন আর জল্পনা কল্পনা নিয়ে শুরু হয়েছিল তাদের পথ চলা। কত ঝামেলার পর এক হয়েছিল দু’জনে.. কোথায় সেসব দিন? কোথায় গিয়ে হারালো? ভুল তো সব তার… নিজের দোষে হারিয়েছে তাকে, সেই সুন্দরতম দিনের সুন্দরতম নারীকে… অযথা কপালের লিখন বললেই হবে নাকি? কিছু ভুল নিজের থেকে হয়, ভাগ্যের জোরে নয়…
সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা। একটুখানি একটা কালকুঠুরির মতো সেলের এক পাশ থেকে প্রস্রাবের উৎকট গন্ধ ভেসে আসছে। আরও একজন বন্দী আছে। একটু পর পর বমি করে ভাসাচ্ছে সবকিছু। মা রে র প্রতিফলন। সেই গন্ধেও সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়বে। অথচ এই শারিরীক, মানসিক তীব্র কষ্ট ছাপিয়ে মন ছেয়ে গেল গভীর বেদনায়…
দীক্ষা…কোথায় তুমি?

কেমন আছ? আমার ডাক কি শুনতে পাচ্ছ?
আমায় কি ক্ষমা করবে না আর?
তোমার সঙ্গে দেখা হবে না আর?
আমাদের হাতে সাজানো সংসারটি আমার কারণেই নিভে যাবে শেষমেশ? দীক্ষা… আমার দীক্ষা… আমার মহারানী!
ফিসফিস করে আওড়ায় শিশির। মাথা নিচু করে। চোখের জলে চিবুক ভিজে গেল। পিঠ দেয়ালে হেলান দেওয়া। থেমে থেমে কাঁপছে তাই।
আমি হারিয়ে ফেলেছি, সব হারিয়ে ফেলেছি।
ফেরত পাবার কি আর কোনো সুযোগ নেই?
হে খোদা, সুযোগ নেই?
জবাব আসে না।
একটা সময়ের পর সবার কৃতকর্মের জন্যেই আফসোস হয়, বুক ফেটে চিৎকার আসে, কান্নারা পাগলের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে বেরোতে চায়। সুযোগ খোঁজে… উদ্ভ্রান্তের মতো একটা শেষ সুযোগ…
না পেলে দোষারোপ করে বিধাতার।
অথচ তিনি কতবার কত ভাবে সুযোগ দেন মানব মনকে…তা কি টের পায় না মানুষ?

সকাল হলো।
পূর্ব দিগন্তে তখনো আবির মাখানো লালিমা পুরোপুরি মুছে যায়নি। ভোরের প্রথম আলো যেন সদ্য ধোয়া কাঁচের শার্শি ভেদ করে ভেতরের হলরুমের মেঝেতে আলপনা আঁকছে। একটা অদ্ভুত স্নিগ্ধতা, যা কেবল অরুণিমাভের বাড়ির পরিবেশেই সম্ভব। বিশাল হলঘরের একপাশে খাবার টেবিল পাতা। রাজকীয় আভিজাত্যের ছাপ টেবিল ক্লথ থেকে শুরু করে প্রতিটি কাঁটা-চামচে। অরুণিমাভ ইতিমধ্যেই পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে টেবিলে এসে বসেছেন। তার পোশাকে কোনো খুঁত নেই। পরিপাটি, ইস্ত্রি করা শার্ট-প্যান্ট। হাতে ঘড়ি, চুল আঁচড়ানো। সকালের রোদ তার দিকে পেছন ফিরে থাকায় চেহারার খুঁটিনাটি স্পষ্ট নয়, শুধু একটি সুগঠিত ছায়া পড়েছে টেবিলের সাদা কাপড়ের উপর।
দীক্ষা এবং বকুলও এসে নিজেদের আসন গ্রহণ করল। আজ দীক্ষার নজর কাড়লেন অরুণিমাভ। ওদের বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময়েও উত্তেজনায় তাকে বিশেষ খেয়াল করা হয়নি ওর, এমনকি সারাটা পথ এসে এ বাড়িতে ঢুকবার সময়েও নয়। তখন কেবল মাথায় ছিল তৃণার মুখোমুখি আরও একবার দাঁড়ানো এবং তাকে এবার পরাজিত করা নিজের জেদের কাছে, অহংবোধের কাছে। এই প্রথম সে লোকটাকে ভালো করে খেয়াল করল। বকুল যেমন বলেছিল, বয়সটা যেন রহস্যে ঢাকা। একবার মনে হয় মধ্য চল্লিশের কোঠায়, আবার পরক্ষণেই মনে হয় হয়তো আরেকটু কম। চুলে পাক ধরলেও সেটা যত্ন করে এমনভাবে সাজানো যে চেহারায় অন্যরকমের গাম্ভীর্য এনেছে। তার রূচির যে প্রশংসা বকুল করেছিল, তা প্রতিটি বিষয়েই স্পষ্ট। তার বসার ভঙ্গি, নীরবতা, এমনকি প্লেটে খাবার নেওয়ার ধরনেও একটা রুচিশীল আভিজাত্য। যেন তিনি চারপাশের সবকিছুকে ছাপিয়ে যান, অথচ থাকেন সম্পূর্ণ শান্ত।

বকুল বসতে বসতে দীক্ষার দিকে তাকাল, মনে মনে বলল, ‘লোকটা কি জানে, সে কত রহস্যময়?’
দীক্ষা মৃদু হেসে চোখের ইশারায় বোঝাল, ‘চুপ থাক, এখন কথা নয়।’
ঠিক তখনই, সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো অরুণিমাভের দুই ছেলে। আরহাম আর আয়ান।
আরহাম একটু চুপচাপ স্বভাবের। তার চোখের দৃষ্টিতে একটা শান্ত জিজ্ঞাসা, যেন সে পরিবেশটাকে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সে এসেই বাবার পাশে রাখা চেয়ারটিতে বসলো, নীরবে। কিন্তু আয়ান! সে যেন গোটা বাড়ির চঞ্চলতা নিয়ে নেমে এসেছে। এই ছেলেটির মুখে অজস্র প্রশ্ন আর চোখে হাজারো কৌতূহল। সে দীক্ষা আর বকুলকে দেখে বেশ উৎসাহিত বোধ করল। এই বাড়িতে নতুন কোনো মানুষের আগমন মানে তার কাছে নতুন খেলার সঙ্গী।
আয়ানের চোখে চোখ পড়তেই দীক্ষা হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু তার হাসিটা পূর্ণতা পেল না। আয়ান যেন দীক্ষার দিকে তাকিয়ে কী একটা বোঝার চেষ্টা করছে। তার গোল গোল চোখ দুটি দীক্ষার স্ফীত উদরের উপর স্থির হলো।
ছোট্ট হাত দিয়ে টেবিল চাপড়ে আয়ান সরাসরি প্রশ্ন করে বসল, ‘আন্টি, why you are so fat?’
দীক্ষা যেন বজ্রাহতের মতো থমকে গেল। সকালের প্রথম কামড় দেওয়া গরম টোস্টটা মুখে দিতে গিয়ে তার বিষম খেলো। কাশি আর শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম! এমন অপ্রত্যাশিত, অপ্রস্তুতকর প্রশ্নে সে লজ্জিত হবে নাকি হাসবে বুঝতে পারল না। দ্রুত সে মুখে হাত চাপা দিলো।

বকুলের অবস্থা আরও শোচনীয়। সে হাসবে কি না, নিজেকে সামলে রাখবে, নাকি ছেলেটার আস্পর্ধায় রেগে যাবে, তা ঠিক করতে পারলো না। শেষমেশ হাসির তোড়টাই প্রবল হলো। বকুল খিলখিল করে হেসে উঠল।
‘হা হা হা! এই দুষ্টু ছেলে, কী বলছিস!’ বকুল হাসতে হাসতেই দীক্ষার পিঠে আলতো চাপড় মেরে দিলো।
দীক্ষা কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘ধরণী সহায় হও…’
অরুণিমাভ ততক্ষণে ব্যাপারটা সামলে নিলেন। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি, তবে কণ্ঠে শান্ত প্রশ্রয়।
তিনি আয়ানের দিকে ঝুঁকে বললেন, ‘আয়ান! তোমার আন্টির পেটের ভেতর একটা বাবু আছে। তাই তার পেট বড়। সে মোটা নয়। আন্টি ইজ নট ফ্যাট, শি ইজ প্রেগনেন্ট, ওকে?’
আয়ান চোখ বড় বড় করে তাকাল, তার মস্তিষ্কে তখন নতুন তথ্য প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে। সে আরও জোরে টেবিল চাপড়ে বলল, ‘বাবু? ওহ মাই গড! বাবু আবার পেটের ভেতর থাকে কীভাবে? সে কি খেলবে না? সে কি খাবে না? বাবু কি শ্বাস নেয়?’

আরহাম এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল, এবার সে মাথা তুলে ছোট ভাইয়ের দিকে তাকাল। কিছুটা বিরক্তি নিয়েই বলল, ‘তুই এত বোকা কেন? তুমি জানো না, সব বাচ্চাই প্রথমে পেটের ভেতরে থাকে। তারপর ওখান থেকে বের হয়।’
আয়ান বড় ভাইয়ের দিকে তেড়ে গেল, ‘তুমি আমায় বোকা বলছো! তুমি জানো তো খুব, তাহলে আমি তোমাকে একটা জিনিস জিজ্ঞেস করব? আচ্ছা, বের হলে ও কীভাবে বের হবে? দরজা দিয়ে? নাকি জানালা দিয়ে? নাকি পিছন দিকের সিঁড়ি দিয়ে?’

আয়ানের এই পাকা পাকা কথা শুনে এবার অরুণিমাভ, দীক্ষা আর বকুল সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল। দীক্ষার কাশি থেমে এখন তার চোখে আনন্দাশ্রু।
অরুণিমাভ হাসতে হাসতে বললেন, ‘না, না, কোনো দরজা-জানালা দিয়ে নয়। ডাক্তার আঙ্কেলরা ওকে বের করে আনবেন। যখন সে যথেষ্ট বড় হবে, তখন। আর সে এখন খেলছেও না, খাচ্ছেও না। সে শুধু তার মায়ের ভেতরে ঘুমিয়ে আছে। শক্তি সঞ্চয় করছে।’
আয়ান কিছুক্ষণ ভাবলো।
‘ও! তার মানে আমিও প্রথমে ওরকম মায়ের পেটে ছিলাম তাই না পাপা?’
‘হুম।’
‘আমাকেও ডাক্তার আংকেলরা বের করে এনেছেন, রাইট পাপা?’
‘রাইট।’

‘আনতে গিয়ে মাথার দু চারটা তার ছিঁড়ে ফেলেছে, এই জন্যেই আমি এত চঞ্চল আর তুমি সবসময় আমাকে পাগল আর ভাইয়া ইডিয়ট বলে, এবার বুঝেছি…আমার আসলে কোনো দোষই নেই, দোষ সব ওই ইডিয়ট ডাক্তার আংকেলদের। তারা আস্তে ধীরে বের করবে না আমাকে?’
অরুণিমাভ হাসি চাপতে পারছে না। চোখ পাকিয়ে তাকাতেই আয়ান মুচকি হাসল, ‘আর কখনো আমাকে পাগল বলবে না পাপা। আমি তো ভালোই…’
‘হুম, খুব ভালো আপনি, এবার খান… কটাকটা কথা…’

জবাবটা দিলো দীক্ষা। তার কথাতে আয়ান চুপ হয়ে গেল। মন দিয়ে খাওয়া শুরু করল।
দীক্ষা হেসে অরুণিমাভের দিকে তাকাল। সে সত্যিই ছেলে-দুটিকে খুব পছন্দ করে ফেলেছে। বিশেষ করে আয়ানের সারল্য আর আরহামের গাম্ভীর্য মিশে এক অদ্ভুত ভালো লাগা তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, সেই রাজকীয় টেবিলের এককোণে, প্রায় অদৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তৃণা। গত রাতের অপমান আর দীক্ষা-বকুলের তীব্র কটাক্ষের পর সে যেন আজ নিজের শরীরটাকেও টেনে আনতে পারছিল না। এই দৃশ্যে তার কোনো অংশগ্রহণ নেই, কোনো স্থান নেই। সে কেবল এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে, অসহায়ত্বের চূড়ান্ত সীমায়।
দীক্ষা, বকুল, অরুণিমাভ- এই তিনজনের হাসির শব্দ তৃণার কানে যেন পেরেক ঠোকার মতো লাগছিল। ভেতরের জ্বলুনিটা বাড়তে বাড়তে এখন অসহ্য এক যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে।

অরুণিমাভ হেসে হেসে কথা বলছেন, দীক্ষার দিকে হাস্যজ্বল চোখ দুটো দিয়ে তাকাচ্ছেন, এমন ভাবে কথা বলছেন যেন সে তার কত আপন! অথচ তার আগে তৃণা এ বাড়িতে এসেছিল। বাচ্চাগুলিও বলি হারি, তার সঙ্গে চাকরের মতো ব্যবহার আর এখানে হা হা হি হি.. সব হয়েছে ওই বাপটার মতো, সুন্দর মেয়ে মানুষ দেখেছে আর মাথা নষ্ট হয়ে গেছে।
দীক্ষা সুন্দর তবে?
তৃণার মনেই প্রশ্ন জাগলো নিজ থেকে।

তৃণা থতমত খেলো। নিজেই নিজেকে বোঝালো, সুন্দর তো সেও.. দীক্ষার চেয়েও বেশি। দীক্ষা মোটা, গাল ফোলা, গলা ফোলা, তবে ত্বক তেলতেলে, ওটাও প্রেগন্যান্সির জোরেই..
আর তৃণা, কি সুন্দর স্লিম ফিগার, একদম নায়িকাদের মতো, চুলগুলো ছাড়লে ছেলেরা অক্কা পড়বে। এখন তো অযত্নের চূড়ান্ত করে নিজের এই হাল- নইলে দীক্ষা তার সামনে কিছুই না হুহ!
তৃণার মনে মনে তীব্র ক্ষোভ জমা হতে থাকল। চোখের কোণে সামান্য জল, যা সে দ্রুত মুছে ফেলল। তাকে কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না। সে যেন বাড়ির আসবাবপত্রের চেয়েও গুরুত্বহীন।

খানিকক্ষণ পর, অরুণিমাভ সম্ভবত তার উপস্থিতি খেয়াল করলেন। তিনি তৃণার দিকে তাকালেন, কিন্তু সেই দৃষ্টিতে কোনো আবেগ মিশে নেই। আছে কেবল একজন মালিকের নির্দেশ।
‘তৃণা, এদিকে এসে সবার জন্য একটু চা নিয়ে এসো তো। ব্রেকফাস্টের পর ওর আবার চায়ের দরকার হয়।’
এ কথা সত্য, তবে এটা অরুণিমাভ জানতেন না, আন্দাজে বললেন আর তাতেই চমকে উঠল দীক্ষা-তৃণা দু’জনেই। দীক্ষা ভাবছে, এ কথা তিনি কীভাবে জানলেন? আর তৃণা ভাবছে, সম্পর্ক তাহলে এতদূর… কি পছন্দ না পছন্দ তাও জানা, বাপরে বাপ…

সে এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে দ্রুত রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। মুখটা ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেছে তার। সে দ্রুত চা বানাল। নিজের জীবনের সব তিক্ততা দিয়ে যেন চা’কে আরও গাঢ়, আরও কষ করে তুলল। কাপে করে চা নিয়ে এসে সে মৃদু পায়ে অরুণিমাভ, আরহাম, আয়ান, দীক্ষা এবং বকুলের সামনে রাখল। হাত কাঁপছে তার। এসব কাজে সে অভ্যস্ত নয়।
অরুণিমাভ তার কাপে চুমুক দিলেন, কোনো মন্তব্য করলেন না। কিন্তু বকুল তার কাপটা হাতে নিতেই তার ভেতরের ক্রোধ তৃণার তৈরি চায়ে মিশে গেল।

বকুলের ঠোঁট কেবল চায়ের স্পর্শ পেল, এক চুমুকও সে গলাধঃকরণ করল না। সঙ্গে সঙ্গেই বকুল মাথা নেড়ে, মুখ বিকৃত করে থু করে চায়ের অংশটুকু প্লেটে ফেলে দিলো।
দীক্ষা ও অরুণিমাভ দুজনেই অবাক হয়ে বকুলের দিকে তাকালেন।
বকুল যেন এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। সে চায়ের কাপটা তৃণার দিকে এগিয়ে দিয়ে চোখ সরু করে বলল, ‘এ কী চা বানিয়েছিস? এত কষকষ কেন? তেঁতো লাগছে যে! কী দিয়েছিস এতে? এটা কি চিনি দিয়ে বানানো চা নাকি তুই তোর জীবনের সব তিক্ততা ঢেলে দিয়েছিস এই চায়ে?’
বকুলের কণ্ঠস্বর ধারালো ছু রি র মতো শোনায়। তৃণা এক ধাক্কায় চুপসে গেল। তার হাত থেকে চায়ের ট্রেটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল।

বকুলের কথা শেষ না হতেই সে আবার বলল, ‘চিনি হয়নি, লিকার ঠিক নেই। তুই কী ভেবেছিস? আমরা রাস্তার লোক? যে এমন জঘন্য জিনিস পান করব? তোর কি কাজের প্রতি এতটুকু আগ্রহ নেই? নাকি ইচ্ছা করেই আমার চা-টা খারাপ করেছিস?’

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৫

তৃণার চোখজোড়া ততক্ষণে জলে ছলছল করছে। এই অপমান! এই নির্লজ্জ কটাক্ষ! তার ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে মাটির বুকে মিশে যেতে। রাগ ও হয়, তবে সেই রাগ এখন নীরব চোখের জলে পরিণত। এই মুহূর্তে কোনো জবাব দেওয়ার সাহস বা শক্তি তার নেই। সে শুধু দেখল, দীক্ষা নীরবে তার দিকে তাকিয়ে আছে, তার দৃষ্টিতে কোনো করুণা নেই, কেবল এক কঠিন প্রত্যাখ্যান। আর অরুণিমাভ? তিনি সম্পূর্ণ নির্বিকার। যেন একটা কাজের মেয়েকে বকুলের বকা দেওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।
তৃণা আর সেখানে দাঁড়াল না। অপমানে, লজ্জায়, ঘৃণায় নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে সে দ্রুত পায়ে ডাইনিং হল ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৭