Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৪

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৪

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৪
সানজিদা আক্তার মুন্নী

রাত ঘড়ির কাঁটা যখন দুটোর ঘরে, সময় তখন বোধহয় কিছুটা থমকে দাঁড়ায়। চরাচরে নেমে আসে এক আদিম, অতলান্ত স্তব্ধতা আর ঠিক এই প্রহরে তৃষ্ণা বারান্দায় এসে বসে আছে। বাইরে এখন কৃষ্ণপক্ষের গাঢ় অন্ধকার, মনে হচ্ছে কেউ পৃথিবীর চোখে কাজল পরিয়ে দিয়েছে। আকাশের গায়ে আজ নক্ষত্রের জৌলুস নেই, শুধু দূরে কোথাও একাকী এক ফালি চাঁদ মেঘের আস্তরণ সরিয়ে উঁকি দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। এই ম্লান আলোয় শহরের সুউচ্চ অট্টালিকাগুলোকে মনে হচ্ছে একেকটি ঘুমন্ত দৈত্য, যারা দিনের কোলাহল শেষে এখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ঠান্ডা বাতাস বইছে খুব ধীরে, চুপিচুপি কোনো গোপন সংবাদ পৌঁছে দিচ্ছে পাতার কানে হয়তো।

এই বাতাসের তোড়ে তৃষ্ণার অবিন্যস্ত চুলগুলো অবাধ্য হয়ে চোখে-মুখে আছড়ে পড়ছে। বাতাসে ভারী হয়ে আছে হাসনাহেনার তীব্র, উন্মাতাল ঘ্রাণ। কে জানে, হয়তো পাটোয়ারী বাড়ির বাগানের কোনো এক কোণে ফুটে থাকা ফুলগুলো আজ রাতেই তাদের সমস্ত সুবাস উজাড় করে দেওয়ার পণ করেছে। দূরে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টটা একপায়ে দাঁড়িয়ে ভিজছে কুয়াশায়, তার হলুদ আলোয় নিচের পিচঢালা পথটিকে মনে হচ্ছে কোনো এক বিষাদগ্রস্ত নদীর মতো।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

কোথাও কোনো শব্দ নেই, যা আছে তা হলো মাঝে মাঝে নিশাচর পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ আর ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ঐকতান। এই নির্বাক প্রকৃতির সামনে বসে তৃষ্ণার মনে হয়, সে একাই জেগে আছে। তার নামের মতোই এক অমিয় ‘তৃষ্ণা’ এই নিঝুম রাতে ডানা মেলেছে অজানা এক অপেক্ষার, কিংবা অব্যক্ত এক বেদনার।
রাতের নিস্তব্ধতা চিরে হু হু করে বয়ে যাচ্ছে হিমেল হাওয়া। উত্তুরে বাতাসের প্রতিটি ঝাপটা তার পাতলা শরীরে বিঁধছে কাঁটার মতো, হাড়কাঁপানো এই ঠান্ডায় তার শরীর রি রি করে কাঁপছে। কিন্তু তৃষ্ণার সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। তার সমস্ত চেতনা এখন আচ্ছন্ন হয়ে আছে এক গভীর অপমানে। ওয়াসেম আজ আয়রাদকে যে কথাগুলো বলেছে, সেগুলো বিষাক্ত তীরের মতো তার হৃদয়ে বিঁধে আছে এখনো। মানুষের বিবেক কি এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে? নিজের স্ত্রীকে কেউ এভাবে সবার সামনে ছোট করতে পারে?

তৃষ্ণা অস্ফুট যন্ত্রণায় দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে বুকের ভেতরটা শূন্য মনে হচ্ছে তার। নিজেকে শান্ত করার এক করুণ চেষ্টা চালিয়ে সে বিড়বিড় করে ওঠে “ভুলে যাও তৃষ্ণা, এসব তোমার ললাটলিখন। তোমার মতো তুচ্ছ প্রাণীর আবার সম্মান কিসের? কুকুরের কি কখনো মর্যাদা থাকে? না, থাকে না। তবে তোমার কেন থাকবে?” আকাশের বুকে সেই একফালি রূপালি চাঁদ মেঘের আড়ালে মুখ লুকোচ্ছে, আর তৃষ্ণা এই অসীম শূন্যতার দিকে তাকিয়ে নিজের দীর্ঘশ্বাসগুলোকে বাতাসের সাথে মিশিয়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।

ঘরের ভেতর হঠাৎই তন্দ্রা ছুটে যায় ওয়াসেমের। ঘুমের ঘোরেই সে অভ্যাসবশত নিচের দিকে তাকায়। তাকাতেই তার চোখ থেকে ঘুম পালিয়ে যায়। তৃষ্ণাষ্ণা নেই এখানে। ও কোথায়? ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসে ওয়াসেম। ঘরের চারকোণে চোখ বুলাতেই তার বুকটা ধক করে ওঠে তার। আজ তো তৃষ্ণা নিজের বিছানাটাও পাতেনি। ওয়াসেম আজ তাড়াতাড়ি শোয়ে গেছে কিন্তু তার স্পষ্ট মনে আছে শোয়ার সময় সে তৃষ্ণা কে দেখেছিল ঘরে ঢুকতে, তাহলে এখন গেল কোথায় ও? তবে কি সে চলে গেল? এক অজানা ভয়ে ওয়াসেমের বুক কাঁপতে শুরু করে। লুঙ্গির গিঁটটা তড়িঘড়ি করে ঠিক করে সে হন্তদন্ত হয়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে আসে। দরজার চৌকাঠে পা রাখতেই তার চোখে পড়ে সোফায় গুটিসুটি মেরে বসে থাকা তৃষ্ণাকে। ওকে দেখামাত্রই ওয়াসেমের অবরুদ্ধ শ্বাস মুক্তি পায়। কেন জানি আজ তার বারবার মনে হচ্ছিল, আজকের সেই কদর্য আচরণের পর তৃষ্ণা বুঝি এই ঘর, এই মায়া ছিন্ন করে চিরতরে বিদায় নিয়েছে। শান্তির এক তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে ওয়াসেম ধীর পায়ে তৃষ্ণার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। তৃষ্ণা তার অস্তিত্ব টের পায়, কিন্তু আজ আর ফিরে তাকায় না। তার স্থির দৃষ্টি পড়ে থাকে অন্ধকার আকাশের পানে।
ওয়াসেম ঘ্যাসঘ্যাসে গলায় জিজ্ঞেস করে, “কি রে, এই হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় বাইরে বসে মরতেছিস কেন?”
তৃষ্ণা কোনো ভাবান্তর ছাড়াই নিস্পৃহ স্বরে উত্তর দেয়, “এমনি-ই।”

ওয়াসেম ধীর, স্থির পায়ে তৃষ্ণার দিকে এগিয়ে এসে তার পাশে বসে পড়ে। শিকারি বাঘ যেমন নিঃশব্দে শিকারের দিকে এগোয়, ওয়াসেমের ভঙ্গিটাও ঠিক তেমনই। তৃষ্ণা তাকে এভাবে নিজের দিকে আসতে দেখে বসা থেকে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ায়। অজানা আশঙ্কায় তার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠছে, শরীরটা মৃদু কাঁপতে শুরু করেছে। ওয়াসেমের এই ক্রমশ কাছে আসা তার শ্বাসরোধ করে দিচ্ছে। সে আর স্থির থাকতে পারে না। নিজেকে কোনোমতে সামলে, আমতা আমতা করে বলে, “আমি… আমি ঘুমাতে গেলাম।”

কথাটা বলেই তৃষ্ণা পাশ কাটিয়ে দ্রুত চলে যেতে উদ্যত হয়। কিন্তু পালানোর পথ নেই। ওয়াসেম চিল যেমন করে শিকার ধরে, ঠিক তেমনই ক্ষিপ্র গতিতে খপ করে তৃষ্ণার বাঁ হাতের কবজিটা চেপে ধরে।অদৃশ্য কোনো লোহার শিকল দিয়ে কেউ সজোরে তার হাতটা পিষে ফেলছে তৃষ্ণার কাছে মনে হয়। হাড় পর্যন্ত কেঁপে ওঠে সেই চাপে। যন্ত্রণায় মুখটা বিকৃত হয়ে যায় তৃষ্ণার সে ব্যথাতুর চোখে, ছলছল দৃষ্টিতে ওয়াসেমের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় প্রশ্ন করে, “হাত… হাত ধরলেন যে? কোনো প্রয়োজন?”

কথার কোনো উত্তর দেয় না ওয়াসেম। আচমকা এক হেঁচকা টানে তৃষ্ণাকে নিজের পাশে ধপ করে বসিয়ে দেয়। এই আকস্মিক টানে তৃষ্ণার মনে হয়, বাম হাতটা বুঝি শরীর থেকে ছিঁড়েই গেল। যন্ত্রণায় শরীরটা কুকড়ে যায় তার। ওয়াসেমের এমন উন্মাদ আচরণে বিস্ময় ও ভয় কাজ করে মনে। সে সরাসরি ওয়াসেমের চোখের দিকে তাকায়, যেখানে কোনো মায়া নেই তৃষ্ণা তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কিছু প্রয়োজন আপনার? এভাবে টানলেন কেন?”
ওয়াসেম বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, বলে, “না, প্রয়োজন নেই।”
তৃষ্ণা হতভম্ব হয়ে বলে, “তাহলে এভাবে বসালেন কেন?”
তৃষ্ণার বারবার প্রশ্নে ওয়াসেমের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ে যায় সে কড়া চোখে তৃষ্ণা ন্যায় তাকায়, গলায় ধমকের সুর তুলে বলে, “আমি বলেছি বসতে, তাই বসবি। এত প্রশ্ন কেন করছিস?”
তৃষ্ণা আজ কেন জানি আর সেই আগের মতো ভীতু হয়ে চুপ থাকতে পারে না। ভেতরে ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভটা হয়তো আজ বাঁধ মানছে না। তাই সেও পাল্টা জব্বর একখানা জবাব কষে দেয়, “কী জন্য বসব সেটা তো বলবেন? শুধু শুধু বসে থেকে কী করব?”

তৃষ্ণার মুখে এমন পাল্টা জবাব শুনে ওয়াসেমের তো গা জ্বলে যায় সে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকায় তৃষ্ণার মুখের দিয়ে আর চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, “ডানা গজিয়েছে তোর? মুখে মুখে তর্ক করছিস? আমার ইচ্ছে হয়েছে এখন তোকে পাশে নিয়ে বসব, তাই বসিয়েছি। তোর কোনো সমস্যা?”
ওয়াসেমের এই অযৌক্তিক জেদের কাছে হার মানে তৃষ্ণা। সে চুপ হয়ে যায়। মাথা নিচু করে বসে থাকে পাথরের মূর্তির মতো। কী-ই বা করার আছে তার? তার মতে ওয়াসেম পাগল হয়ে গেছে, নিজের খামখেয়ালিপনায় নিজেও বুঝতে পারছে না সে কী করছে। তৃষ্ণাকে নিস্তব্ধ বসে থাকতে দেখে ওয়াসেম ধীরে ধীরে নিজের মাথাটা তৃষ্ণার উরুর ওপর এলিয়ে দিয়ে চোখ বুঁজে নেয়। এই কোলে শুতে পারলে আলাদা শান্তি লাগে তার। ওয়াসেম আদেশের সুরে বলে শুধয়, “আমার চুলগুলো টেনে দে তো।”

তৃষ্ণার কাছে এই দৃশ্য নতুন নয়। আগেও বহুবার ক্লান্ত ওয়াসেম তার কোলে শুয়ে শান্তি খুঁজেছে, তৃষ্ণা পরম যত্নে তার চুলে বিলি কেটে দিয়েছে। অন্য সময় হলে ওয়াসেমের এই সান্নিধ্যে তৃষ্ণা খুশি হত। কিন্তু আজ? আজ তার মনের আকাশটা ভারী মেঘলা। আজ আর সেই ভালোলাগা কাজ করছে না তার। তৃষ্ণার ভেতরটা আজ এক অদ্ভুত বিতৃষ্ণায় ভরে আছে। সবকিছু কেমন বিরক্তিকর, অসহ্য লাগছে তার কাছে। তবুও, সব অনিচ্ছা আর বিরক্তিকে বুকের ভেতর পাথর চাপা দিয়ে, অনেকটা যান্ত্রিক পুতুলের মতোই তৃষ্ণা চুপচাপ ওয়াসেমের মাথায় আঙুল বোলাতে থাকে।

ঘড়িতে এখন বেলা এগারোটা। শীতের সকালের মিঠা রোদ গড়িয়ে এখন বেশ তেজ বেড়েছে, মাথার ওপর সূর্য জ্বলজ্বল করছে। এলাকার বড় মাঠটা আজ কানায় কানায় পূর্ণ। ধুলো আর মানুষের ঘামে এক অন্যরকম নির্বাচনী সমাবেশের পরিবেশ। এটি মূলত তন্ময় চাচার সমাবেশ। নির্বাচনের আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি, তাই আজকের সমাবেশটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঝিমিয়ে পড়া জনতাকে চাঙ্গা করতে হলে একটা গরম ভাষণের দরকার।
​তৌসির ধীর পায়ে স্টেজে উঠে। ওর হাঁটাচলায় কোনো জড়তা নেই, চোখে-মুখে সেই চিরচেনা বেপরোয়া ভাব। সে তো আর পেশাদার নেতা হলে। মানুষের সামনে দেখায় সে সোজাসাপ্টা মানুষ। স্টেজে দাঁড়িয়ে মাইকটা হাতে নিতেই স্পিকারে একটা তীক্ষ্ণ আওয়াজ হয়, আর সাথে সাথে পুরো মাঠের গুঞ্জন অনেকটা কমে আসে সবাই তাকিয়ে রোন তৌসিরের দিকে। ​তৌসির একবার পুরো মাঠের দিকে চোখ বুলিয়ে নেয়। তারপর মাইকটা মুখের কাছে এনে ভারী গলায় উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলে ওঠে

আসসালামু আলাইকুম, প্রিয় এলাকাবাসী। কেমন আছেন আপনারা?
আপনারা নিশ্চয়ই জানেন আজ আমরা কেন এখানে সমবেত হয়েছি। আমাদের সবার পরিচিত মুখ, আমার শ্রদ্ধেয় চাচা জনাব তন্ময় শিকদার এবার আমাদের এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। আমি আজ এসেছি আপনাদের কাছে আমার চাচার জন্য, আমাদের পরিবারের জন্য এবং আপনাদের নিজেদের ভালোর জন্য ভোট চাইতে।

ভাই ও বাবারা, আপনারা আমাকে চেনেন। আমি খুব সহজ-সরল মানুষ। পেঁচিয়ে, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কিংবা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ১০০ রকম বানোয়াট কথা বলতে আমি পারি না। যা বলি, ডাইরেক্ট বলি, মুখের ওপর বলি। আমি বিশ্বাস করি, সত্য কথা তিতা হলেও বলা উচিত।
আজও আমি আপনাদের কোনো মিথ্যা স্বপ্ন দেখাব না, সোজাসাপ্টা একটা হিসাব দিচ্ছি। আমার চাচাকে যদি আপনারা ভোট দেন, লাভটা কিন্তু আপনাদেরই হবে। ইনশাআল্লাহ, এই এলাকা আরও উন্নত হবে।
দেখুন, ওপর মহল থেকে যদি উন্নয়নের জন্য ১০% বরাদ্দ আসে আমি মিথ্যা বলব না সেখান থেকে ৩% আমাদের খরচ বা ব্যবস্থাপনায় থাকবে, ১% হয়তো এদিক-সেদিক যাবে, কিন্তু বাকি পুরো ৬% কাজ আপনাদের হবে।
আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলছি, আপনারা যদি অন্য কাউকে ভোট দেন, তারা হয়তো পুরো টাকাটাই মেরে দেবে। সেখানে ৬% তো দূরের কথা, ১% কাজ হবে কি না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। কিন্তু আমাদের কাছে আপনারা অন্তত আপনাদের হকের সিংহভাগ কাজ বুঝে পাবেন।

এই এলাকার উন্নয়নে আমরা অতীতেও কাজ করেছি, আপনারা তা জানেন এবং স্বীকারও করেন। প্রিয় এলাকাবাসী, আপনারা ভুলে যাননি এই জনসেবা করতে গিয়েই আমার বড় চাচা তাজদার শিকদার এবং আমার বড় ভাই, মানে বড় চাচার ছেলে তৌসিফ শিকদারকে অকালে প্রাণ দিতে হয়েছে।
স্বৈরাচারের শিকার হয়ে তারা মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েছেন। তাদের বাঁচতে দেওয়া হয়নি। তাদের একটাই অপরাধ ছিল তারা বিএনপি করতেন। এই দলের সমর্থক হওয়ার কারণেই তাদের মৃত্যু উপহার পেতে হয়েছে।
এত কিছুর পরেও কিন্তু আমরা থেমে থাকিনি। আমরা লড়ে গিয়েছি। সেই স্বৈরাচারী শাসনামলে চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও যদি আমরা এলাকার উন্নয়ন করতে পারি, তবে এখন কেন পারব না? ইনশাআল্লাহ, এখন আরও বেশি পারব।

আমি জানি এবং আমি নিজে স্বীকার করছি আমার দল চাঁদাবাজি আর ভণ্ডামিতে ওস্তাদ কিন্তু তাই বলে আমি বা আমার পরিবার তো তেমন না দল বা মার্কা না দেখে ‘মানুষ’ দেখে ভোট দিন। আপনারা তো আমাদের রক্ত চেনেন, আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য জানেন।
তাই আমার বিনীত অনুরোধ দল বা মার্কা দেখে বিচার করবেন না, মানুষ দেখে ভোট দিন । মানুষ হিসেবে আমার চাচা কেমন, আমাদের পরিবার আপনাদের জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকার করেছে, সেটা দেখে ভোট দিন। সুযোগ যদি না চান, দিতে হবে না। কিন্তু যদি মনে করেন আমরা আপনাদের সেবা করতে পারব, তবে ভোট দিয়ে সেই সুযোগটি দিন। আমার চাচা জনাব তন্ময় শিকদারকে ভোট দিলে লাভ আপনাদেরই হবে।
ধন্যবাদ সবাইকে।
আসসালামু আলাইকুম।

তৌসির তার বক্তব্য শেষ করে মাইকটা নামাতেই চারদিক থেকে করতালির আওয়াজ ফেটে পড়ল। উপস্থিত জনতার উচ্ছ্বাস আর গগনবিদারী হাততালি বলে দিচ্ছে কথাগুলো তাদের কলিজায় গিয়ে লেগেছে। তৌসিরের এই এক গুণ, যা পেটে তাই মুখে। অন্য দশজন নেতার মতো সে তেল মেরে, মিষ্টি কথায় মানুষকে ভোলাতে জানে না। সে যা বলে সোজাসুজি বলে, আর একবার কথা দিলে জান দিয়ে হলেও তা রক্ষা করে। এই বেপরোয়া সততার জন্যই সে এলাকাবাসীর চোখের মণি।
​মঞ্চের একপাশে বসে ছিলেন নাযেম চাচা। তৌসির জনতার উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে চাচার পাশের চেয়ারটায় ধপাস করে বসে পড়ল। চোখেমুখে তার জয়ের আত্মবিশ্বাস।
​নাযেম চাচা তৌসিরের দিকে একটু ঝুঁকে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “কিরে তৌসির! জনগণ কি ভোট দিব? তোর কি মনে হয়?”
​তৌসির শার্টের কলারটা একটু ঠিক করে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল, “দিব মানে? আলবৎ দিব! যেই কড়া ভাষণ দিছি চাচা, যে ব্যাটা ভোট দিত না, সেও এখন দৌড়াইয়া আইসা ভোট দিয়া যাইব।”

সর্দার বাড়িতে,,,,,
সর্দার বাড়ির অন্দরমহলে আজ নিস্তব্ধতায় ঘেরা। অবশ্য সে হওয়ার কারণও আছে বাড়ির কাজের বুয়ার মেয়ের সাথে সর্দার বাড়ির ছোট ছেলের বিয়ে হয়েছে! বিষয়টি বিস্ময়কর হওয়ার কথাই তো তাই না? কিন্তু বড় কর্তার আদেশের ওপর কথা বলার সাহস এই তল্লাটে কারো নেই। তাই বিয়ে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায়ও ছিল না।
বাসর ঘরের সুসজ্জিত খাটে জড়সড় হয়ে বসে আছে নওরি অর্থাৎ সেই কাজের বুয়ার মেয়ে। বয়স তার খুব বেশি নয়, এই সবে সতেরোতে পা দিয়েছে। কিন্তু এই অল্প বয়সেই তার কাঁধে যে দায়িত্ব আর পরিস্থিতির ভার চেপেছে, তা সামলানোর সাধ্য নওরির নেই।

পরনের বেনারসি শাড়িটা সে খুলে রেখেছে তার মায়ের দেওয়া শেখানো বুলি এখনো নওরির মাথায় বারংবার ঘুরপাক খাচ্ছে, “নিজের থেকে সব দিয়ে দিবি, যাতে ইয়াদ তোর প্রতি আকৃষ্ট হয়।” নওরি বোকাসোকা, সরল এক কিশোরী মায়ের কথাকেই সে বেদবাক্য মেনে ব্লাউজ আর পেটিকোট পরিহিত অবস্থায় মাথা নিচু করে বসে আছে বিছানায় ইয়াদের অপেক্ষায়। লজ্জায়, ভয়ে তার হাত-পা কাঁপছে, কলিজাটাও শুকিয়ে আসছে আতঙ্কে তার
দরজা খোলার শব্দ হয়। ইয়াদ ধীর পায়ে ঘরে প্রবেশ করে। কাজের মেয়ের সাথে বিয়ে হয়েছে এ নিয়ে ইয়াদের মনে কোনো ক্ষোভ বা বিরক্তি নেই। তার চোখেমুখে নিস্পৃহতা। সে মনে করে, বাবার আদেশে যা হয়েছে, তা-ই সঠিক। কিন্তু ঘরে ঢুকে খাটের দিকে তাকাতেই ইয়াদের ভুরু কুঁচকে যায়। অর্ধ নগ্ন নওরির থেকে চোখ সরাতে পারে না ইয়াদ। তাই বাধ্য হয়ে অবাধ্য চাহনি নিয়ে তাকিয়ে থাকে খাটে বসা কাঁপতে থাকা নওরির দিকে। নওরির এই কান্ড দেখে বুঝতে তার বাকি থাকে না যে, এই কিশোরীকে কেউ ভুল বুঝিয়ে এমনটা করতে বাধ্য করেছে। সে নিজে থেকে এমনটা করলে লজ্জায় কুঁকড়ে এভাবে বসে থাকত না।
ইয়াদ ধীর পায়ে নওরির সামনে এসে দাঁড়ায়। নতজানু হয়ে বসে থাকা নওরির দিকে তাকিয়ে সে ঠান্ডা কিন্তু গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করে,

“তোমার বয়স কত?”
ইয়াদের এই ভাবলেশহীন প্রশ্নে নওরি চমকে ওঠে। ভয়ে ভয়ে চোখ তুলে তাকায় ইয়াদের মুখপানে। কিছুক্ষন স্থির চোখে চেয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দেয়,
“স… সতেরো।”
ইয়াদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আবার প্রশ্ন করে,
“এতটুকু বয়সে তুমি এসবের কী বোঝো মেয়ে? শাড়ি খুলে এভাবে বসে আছো কেন?”
এমন প্রশ্নের ধারালো বাণে নওরি আরও গুটিয়ে যায় ও মাথা নিচু করে ফিসফিসিয়ে বলে,
“মা… মা বলেহছে এভাবে থাকতে। আপনি নাকি এতে খুশি হবেন।”
উত্তরটা শুনে ইয়াদের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষাদের হাসি ফুটে ওঠে। যেমনটা সে ভেবেছিল, ঠিক তেমনটাই। বিছানায় ছড়িয়ে থাকা লাল বেনারসিটা আলতো হাতে তুলে নেয় ইয়াদ তারপর খুব যত্ন করে নওরির গায়ে শাড়িটা জড়িয়ে দিতে দিতে সে শান্ত গলায় বলে,

“নাও, এটা গায়ে জড়াও। আমার চোখের লজ্জা আছে।”
ইয়াদের এমন ব্যবহারে নওরি যারপরনাই বিস্মিত হয়। একইসাথে তীব্র লজ্জায় তার কান গরম হয়ে ওঠে। ছিঃ! কেন যে সে মায়ের কথা শুনতে গেল! তড়িঘড়ি করে শাড়ি দিয়ে নিজেকে ঢেকে নেয় বোকা নওরি। নওরি নিজেকে গুছিয়ে নিতেই ইয়াদ তার মুখোমুখি হয়ল বসে। সরাসরি নওরির চোখের দিকে তাকিয়ে ইয়াদ ম্লান গলায় বলে,
“তোমাকে আমি কিছু কথা বলব, মন দিয়ে শোনো।”
নওরি মাথা নাড়ায়, “জি, বলুন।”
ইয়াদের স্পষ্ট উচ্চারণে বলতে শুরু করে,
“দেখো, পরিস্থিতির চাপে তোমার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। তোমার আর আমার পারিবারিক অবস্থান বা ক্লাস এক না এতে আমার ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায়। আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি। তাই তোমাকে আমি স্ত্রী হিসেবে কোনোদিন গ্রহণ করতে পারব না। তবে তুমি এই বাড়িতে থাকতে পারো, যেহেতু তোমার যাওয়ার মতো অন্য কোনো জায়গা নেই। আমি তোমাকে আশ্রয় দেব, কিন্তু স্ত্রী হিসেবে অধিকার দিতে পারব না।”

কথাগুলো নওরির কাছে খুব জটিল মনে হয় না। সে অবুঝ হতে পারে, কিন্তু এটা বোঝার মতো বুদ্ধি তার আছে যে, সর্দার বাড়ির ছেলের সাথে বুয়ার মেয়ের আসমান-জমিন তফাৎ। সে জানত, ইয়াদ তাকে স্ত্রী হিসেবে মানবে না। তাই ইয়াদের প্রত্যাখ্যান তার বুকে কোনো ঝড় তোলে না। সে শান্তভাবে মাথা নাড়িয়ে বলে,
“আচ্ছা।”
নওরির এই সহজ স্বীকারোক্তি ইয়াদকে অবাক করে দেয় বেশকিছুটা। সাথে বিচলিতও করে দেয়। ইয়াদ তো ভেবেছিল এ শুনে নওরি কাঁদবে, কিংবা অনুনয় করবে। কিন্তু নওরির এই নির্লিপ্ত মেনে নেওয়া ইয়াদ কে এক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিস্ময় আর কৌতূহল নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইয়াদ উঠে দাঁড়ায় আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“তুমি ফ্রেশ হয়ে একটা পাতলা, আরামদায়ক কাপড় পরে নাও। আর বিছানার এই ফুলগুলো সরিয়ে শুয়ে পড়ো। আমি একটু পর আসছি।”
নওরি মাথা নিচু করে বসে আছে তার ছোট ঠোঁট দুটো কেঁপে ওঠে অস্ফুট স্বরে একটি শব্দই বেরিয়ে আসে,
“আচ্ছা।”

এই একটি শব্দের পেছনে যে কতটা অসহায়ত্ব আর অনিশ্চয়তা লুকিয়ে আছে, তা নওরি নিজেও হয়তো জানে না। ইয়াদ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ইয়াদ সর্দার বংশের নাম বহন করলেও আসলে ওমর সর্দারের রক্তজ সন্তান নয় পালিত সন্তান সে। অথচ সর্দার বাড়ির আভিজাত্য আর দাপট তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ৩১ বছর বয়সী এই মানুষটি পেশায় একজন কুখ্যাত অপরাধী আইনজীবী। আইনের মারপ্যাঁচে অপরাধীকে নির্দোষ প্রমাণ করাই যার নেশা, তার জীবনে নওরির মতো এক সরল কিশোরীর আগমন কোনোভাবেই খাপ খাওয়ার মতো? নাহ খাওয়ার মতো না! তাই হয়তো সে বিয়ে টি মেনে নিয়েও নিল না।

ইয়াদ যেতেই ঘরটা নওরির কাছে আরও বেশি হাহাকার করে ওঠে। নওরি ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। সাজানো বাসর ঘরের চাকচিক্য তার চোখে আজ বড্ড বেমানান ঠেকছে। সে একবার পুরো ঘরে চোখ বুলিয়ে নেয় বড় বড় আলমারি, শৌখিন আসবাব আর দামি পর্দার আড়ালে নিজেকে বড় বেশি তুচ্ছ মনে হচ্ছে এখন তার।
ইয়াদের নির্দেশ মতোই সে নিজেকে ফ্রেশ করে নেয়। ভারী সাজ আর গয়নাগুলো বিসর্জন দিয়ে একটি ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরে নেয়। তারপর বিছানার এক কোণে জড়সড় হয়ে শুয়ে পড়ে। চারদিকের ফুলের সুবাস যেখানে আনন্দ দেওয়ার কথা, সেখানে তা যেন তাকে দমবন্ধ করা এক যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
নওরির দুচোখে ঘুম নেই। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় সে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে । কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তার জীবনের সবটুকু ওলটপালট হয়ে গেল তার। বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথা করছে বোধহয় হাজারটা সুঁই একসাথে বিঁধছে। মায়ের কোল ছাড়া সে কোনোদিন এক রাতও কাটায়নি, অথচ আজ এই অচেনা মহলের এক বিজাতীয় গাম্ভীর্যের মাঝে সে সম্পূর্ণ একা।

অচেনা ঘর, অচেনা মানুষ আর এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সব মিলিয়ে নওরির ১৭ বছর বয়সী মনটা কানায় কানায় বিষাদে ভরে ওঠলো আজ। সে কি করে পারবে এই মরুভূমিতে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে?
রাত এখন ঠিক চারটে নিস্তব্ধতার চাদরে মুড়ে আছে চরাচর। ইয়াদের দুহাত তাজা, উষ্ণ রক্তে রঞ্জিত। হয়তো কোনো বিমূর্ত চিত্রকর তার ক্যানভাসে লাল রঙের আঁচড় কেটেছে। ইয়াদের রক্তে লোহিতবর্ণ আঙুলের ফাঁকে ধরা একখানা প্রাতঃকালীন সংবাদপত্র। সংবাদপত্রের কাগজের বুকে ঔদ্ধত্যের হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে তৌসির বলতে গেলে ইয়াদেরই প্রতিচ্ছবি। ছবির নিচে তার কীর্তিগাঁথা। তবে তৌসিরের ব্যাপারে যা লেখা তা মূলত ব্যঙ্গ করছে ইয়াদের বর্তমানকে। ​পত্রিকার দিকে তাকিয়ে ইয়াদের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক হিমশীতল, বক্র হাসি। সে ঘরের ভেতর প্রবেশ করতে করতে নিজের মনেই আউড়ে যায় স্বগতোক্তি,

​”তৌসির একই মায়ের গর্ভ থেকে, একই সময়ে ভূমিষ্ঠ হলাম তুই আর আমি। অথচ কাগজে তোর বয়স চৌত্রিশ আর আমার একত্রিশ? সময়ের অঙ্কটাও তুই বদলে দিয়েছিস? তুই মানুষ নস রে তৌসির, তুই এক ধুরন্ধর জাদুকর, যে নিজের আয়ু নিয়েও পৃথিবীর সাথে জুয়া খেলতে জানে। যথার্থই এক জানোয়ার তুই!”
​ঘৃণাভরে বিড়বিড় করতে করতেই কক্ষে প্রবেশ করে ইয়াদ। দরজার এপাশেই তার জন্য বোধহয় অপেক্ষা করছিল এক ভিন্ন দৃশ্য কক্ষে প্রবেশ করতেই তার চোখ পড়ে বিছানায়। বিছানাজুড়ে ছড়ানো অজস্র রক্তগোলাপের পাপড়ি, আর তার ঠিক মাঝখানে নিশ্চিন্তে সুপ্ত নওরি। দেখে মনে হচ্ছে পাপড়ির সাগরে ভাসমান এক পদ্ম। ইয়াদের মনে পড়ে যায় একটু আগের ঘটনা সত্য অন্য এক নারীর প্রতি ইয়াদের আসক্তির কথা জেনেও যে মেয়েটি একবারের জন্যও প্রশ্ন তোলেনি, বরং নীরব সম্মতিতে মেনে নিয়েছে সবকিছু। নওরির এই নির্বাক আত্মসমর্পণ ইয়াদের পাষাণ হৃদয়েও এক ভালোলাগার শিহরণ জাগিয়ে দিয়েছে।

​হাতের রক্তমাখা পত্রিকাটা ঘরের এক কোণে অবহেলায় ছুঁড়ে মারে ইয়াদ। তারপর ধীর, সপাদ পায়ে এগিয়ে যায় ওয়াশরুমের দিকে। ওয়াশরুমে গিয়ে পানির কলটা ছেড়ে দিয়ে প্রথমে দীর্ঘক্ষণ ধরে ধুয়ে নেয় নিজের রক্তাক্ত হাতজোড়া। জলের স্রোতে লাল রং ফিকে হতে থাকে। হাত ধুয়া শেষ হলে প্যান্টের পকেট থেকে বের করে আনে দুটো ধারালো ছুরি। ইস্পাতের ফলা থেকে পানির ঝাপটায় ধুয়ে মুছে সাফ করে নেয় হত্যার শেষ চিহ্নটুকু। ​কিন্তু কাজ এখনো বাকি। শার্টের বুক পকেট থেকে অতি সাবধানে ইয়াদ বের করে আনে দুটো পিচ্ছিল গোলাকার বস্তু। মানুষের চোখের মণি। আজ যে শিকারকে সে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, তারই অস্তিত্বের শেষ সাক্ষী এই চোখ দুটো। ইয়াদের চোখে-মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। মণি দুটো নিজের দুই হাতের তালুতে নিয়ে প্রবল আক্রোশে কচলে পিষে ফেলে সে। তারপর ছোট ছোট টুকরোগুলো বেসিনের পানির স্রোতে ভাসিয়ে দেয়। রক্তের দাগ, পাপের চিহ্ন সব ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায় মুহূর্তেই। ​শরীর থেকে রক্তের শেষ বিন্দুটুকু মুছে ফেলতে দীর্ঘ সময় নিয়ে স্নান সারে ইয়াদ। পানির শীতল স্পর্শে তার উত্তেজনা প্রশমিত হয়। অবশেষে কোমরে একটা গাঢ় নীল রঙের তোয়ালে জড়িয়ে, সদ্য স্নানসিক্ত শরীরে ধীর পায়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে সে।

বাইরে এখন প্রকৃতির রুদ্ররূপ। মেঘের গর্জনে আকাশ ফেটে পড়ছে, আর তুমুল বৃষ্টির ছাঁট আছড়ে পড়ছে জানালার কাঁচে। এক প্রলয়ংকরী ঝড় যেন পৃথিবীকে তছনছ করে দেওয়ার নেশায় মেতেছে। ঘরের ভেতরে সেই উন্মত্ততার রেশ নেই, আছে শুধু এক হিমশীতল নীরবতা। ইয়াদ অন্য একটি তোয়ালে দিয়ে তার সিক্ত চুলের পানি মুছতে মুছতে ধীর পায়ে গিয়ে দাঁড়ায় ঘরের জানালার সামনে। বাইরের ঝোড়ো হাওয়ার তাণ্ডব দেখে ইয়াদের ঠোঁটে ফুটে ওঠে এক তৃপ্তির আভা। ঘাড় ঘুরিয়ে সে তাকায় বিছানার দিকে দেখে ঠান্ডার প্রকোপে নওরি সেখানে কুঁকড়ে শুয়ে আছে, নওরির এই হালাত দেখে ইয়াদের মনে হচ্ছে ঝড়ের কবলে পড়া এক নিস্পাপ লতা শুইয়ে আছে তার বিছানায়। নওরির এই অসহায় ভঙ্গি দেখে ইয়াদের ওষ্ঠাধরে এক শয়তানি হাসির রেখা খেলে যায়। সে নিঃশব্দে বিছানার দিকে এগিয়ে যায়। আর্দ্র শরীর নিয়ে কাঁথার নিচে প্রবেশ করে নওরির একদম গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ে সে। তারপর এক প্রবল হেঁচকা টানে নওরিকে নিজের শক্ত বুকের মাঝে পিষ্ট করে নেয় ইয়াদ। নওরি ঘুমের ঘোরেই অবচেতন মনে এই বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে চায়, শরীরটাকে সরিয়ে নিতে চায় দূরে। কিন্তু ইয়াদের শক্তির কাছে সেই চেষ্টা বৃথা। ইয়াদ নওরিকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে জাপটে ধরে। নওরির শাড়ীর অবিন্যস্ত আঁচল সরিয়ে নওরির উন্মুক্ত উদরে নিজের বরফশীতল হাতটা চেপে ধরে সে। নওরির শিউরে ওঠা শরীরটা ইয়াদের পাশবিক উল্লাসকে আরও বাড়িয়ে দেয়। নওরির অনাবৃত কাঁধে মুখ গুঁজে এক দীর্ঘ ছেড়ে গাঢ় চুম্বনে তাকে সিক্ত করে ইয়াদ। তারপর অতি নিভৃতে, নওরির কানের কাছে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে ফিসফিসিয়ে বলে,

“আমি যা পেতে চাই, তা আমি ছিনিয়ে নিতে জানি নওরি। এই তো সেদিন তোমায় প্রথম দেখলাম, আর আজ তুমি আমার শয্যাসঙ্গিনী, আমার বেগম রূপে । তুমি জানো না, কত বড় এক কুশলী খেলোয়াড়ের জালে তুমি বন্দি হয়েছো। তোমার এই শান্ত আত্মসমর্পণই তোমার কাল হয়ে দাঁড়াবে বলে দিলাম।
কথাগুলো শেষ করেই ইয়াদ অত্যন্ত নিপুণ হাতে নওরির ব্লাউজটি শরীর থেকে আলাদা করে নেয়। আবরণহীন অবস্থায় তাকে বালিশে শুইয়ে দিয়ে ইয়াদের তৃষ্ণার্ত মুখটা খুঁজে নেয় নওরির উরোজদ্বয়ের উষ্ণতা। নওরি কে সে আগেই কৌশলে অন্য একজনের মাধ্যমে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে দিয়েছে। তাই ঘুমের ওষুধের প্রভাবে নওরি এখন চেতনার ওপাড়ে তার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই ঝোড়ো বিপর্যয় টের পাওয়ার ক্ষমতাও তার অবশিষ্ট নেই। ইয়াদের আদিম লিপ্সা আর বাইরের বৃষ্টির শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।তবে ইয়াদ বেশি আগায় না সে শুধু এতটুকুই এসে নিজেকে বণ্টন করে নিয়ে। ক্লান্ত আর তৃপ্ত ইয়াদ নওরিকে আঁকড়ে ধরেই ঘুমের অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে শুরু করে।

মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসছে ফজরের আজানের সুগম্ভীর ধ্বনি আর এই ঠিক মুহুর্তেই শিকদার বাড়ির উঠোনে রচিত হচ্ছে এক নির্মম নরক। ভোরের আবছা কুয়াশা ভেদ করে সেখানে বাতাসের সাথে মিশেছে কাঁচা রক্তের লোনা গন্ধ।

​তৌসির আজ আর মানুষ নেই, মনে হচ্ছে ওর সত্তা গ্রাস করেছে কোনো এক আদিম, হিংস্র পশুর সত্তায়। বাড়ির উঠোনের প্রবীণ কদম গাছটি সাক্ষী হচ্ছে এক হাড়হিম করা দৃশ্যের। গাছটির শক্ত ডালে উল্টো করে ঝোলানো হয়েছে একটি জীবন্ত দেহ। অভাগা লোকটির চামড়া এখন শরীর থেকে বিচ্যুত হচ্ছে তৌসিরের হাতের নিপুণ, কিন্তু পৈশাচিক টানে। ধারালো ব্লেডের প্রতিটি পোঁচে লোকটির শরীর মুচড়ে উঠছে, কিন্তু আফসোস হায় তাহার বাঁচার কোনো উপায় নেই। জ্যান্ত শরীরে চামড়া ছেঁড়ার শব্দ যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা কানে না শুনলে বিশ্বাস করা কঠিন। লোকটির কণ্ঠনালী চিরে বেরিয়ে আসতে চাইছে আর্তনাদ, কিন্তু যন্ত্রণার তীব্রতায় তা গোঙানিতে রূপ নিয়েছে। তার জিহ্বা অর্ধেক বেরিয়ে ঝুলে পড়েছে, চোখ দুটো কোটর থেকে ঠিকরে আসছে হতভাগা শিকারীর। তৌসিরের দুই হাত রক্তে চপচপ করছে, কনুই বেয়ে উষ্ণ রক্তের ধারা চুইয়ে পড়ছে শ্যাওলাধরা মাটিতে। সাংবাদিক ছিল এই লোকটি। তৌসিরদের নুন খেয়েই একদিন গুণ গাইত, কিন্তু লোভের বশবর্তী হয়ে ফণা তুলেছিল ব্ল্যাকমেইলের। এই বিশ্বাসঘাতকতারই চূড়ান্ত মূল্য চুকোতে হচ্ছে তাকে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা লোকটির দিকে তাকিয়ে তৌসিরের চোখ জ্বলে ওঠে গলার স্বর নামিয়ে, হাড়হিম করা ঠান্ডা গলায় ও হিসহিস করে বলে,

​”সাউয়া ছিঁড়িয়া কাউয়ারে খাওয়াইয়া দিমু বলছিলাম না? মাগির পোলা, গাদ্দারি করলে কলিজা ছিঁড়া ফালাই, তারপরও করলি ক্যান? নে, এখন বোঝ মরণ কেমন যন্ত্রণার!”
“ পদ্মা সেতুর পিলারের দাম বহুত না হইলে তোর পিছনে দুইটা ভইরা দিতাম! “
​এই নারকীয় যজ্ঞের চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তৌসিরের আপনজনেরা মানে নাযেম চাচা, মিনহাজ মামারা। তাদের মুখে কোনো বিকার নেই, চোখে নেই কোনো সমবেদনা। তাদের অবস্থায় মনে হচ্ছে উঠোনে কোনো উৎসব চলছে, আর এই রক্তপাত সেই উৎসবেরই এক সাধারণ অংশ।

​অন্যদিকে, ফজরের নামাজ শেষ করে স্নিগ্ধ মন নিয়ে নাজহা বেরিয়েছিল তৌসিরের খোঁজে আজ ঘুম থেকে উঠে তাকে দেখতে পায়নি তাই বেরিয়েছে। কিন্তু ভোরের আলোয় উঠোনের দিকে পা বাড়াতেই থমকে আড়ষ্ট হয়ে যায় নাজহা। চোখের সামনের দৃশ্যটি দেখে তার মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো মুহূর্তেই অকেজো হয়ে পড়ে।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৩

​পা দুটো মাটির সাথে গেঁথে গেছে, চাইলেও নড়াতে পারছে না। কদম গাছের নিচে তৌসির দাঁড়িয়ে আছে? নাকি মানুষের চামড়ায় ঢাকা এক রাক্ষস দাঁড়িয়ে আছে? নাজহা বুঝতে পারে না সেটা। রক্ত, মাংস আর গোঙানির এই বীভৎস সমারোহ দেখে নাজহার ধমনীর রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছে। তার পবিত্র ভোরের আকাশটা মুহূর্তেই কালো হয়ে গ্রাস করে নেয় তাকে। মানুষ কি আসলেই এতটা নিকৃষ্ট হতে পারে? এতটা ভয়ঙ্কর? নাজহার স্তব্ধ চোখের তারায় এখন কেবলই এক অবিশ্বাসের ঘোর নিয়ে তৌসিরের দিকে তাকিয়ে আছে।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৫

2 COMMENTS

Comments are closed.