Home হৃদয় রাঙানো প্রেম হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৫০

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৫০

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৫০
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

মিঠুকে কোলে নিয়ে ঘরময় পায়চারি করছে হুমায়রা। কৃশানের নাম্বারে একের পর কল করেই যাচ্ছে। অথচ ওপাশ থেকে কোনো রেসপন্সই মিলছে। মেয়েটার চিন্তা বাড়ে। ফের কল লাগায়। এবেলায় এসে বেশ সময় নিয়ে ওপাশ থেকে কল রিসিভ করা হলো। কোনোমতে সালাম টুকু দিল হুমায়রা। পরপরই প্রশ্নের ঝুড়ি ছুঁড়ে মারল,

“ কোথায় আপনি? বাসায় ফিরবেন কখন? কটা বাজে খবর আছে? এতক্ষণ কল ধরলেন না কেন? ”
“ আসছি। ”
ব্যাস এটুকুই, তারপর খট করে কলটা কেটে গেল। মেয়েটা হতবম্ব হলো। মাথায় থাকা চিন্তার মাত্রাটা আরো বেড়ে গেল মানুষটার আচরণে। মস্তিষ্ক শিউর হলো যে স্বামী নামক পুরুষটি এতদিন পর আজ আবারও মারপিট করেছে। আসলে ঘটনা টা হলো- সকালে ইয়াসমিন বেগম ও নাজমিন বেগম বাসায় ফেরার পরপরই রেখা বেগম কল করে জানিয়েছেন হুমায়রার মামা খুব অসুস্থ্য। যেহেতু হুমায়রার মামির করা কান্ডের ব্যাপারে তারা অবগত নন সেহেতু খবর টুকু শুনেই হুমায়রাকে যেতে বলা হলো। হুমায়রার মামির করা ঘটনা সম্পর্কে বাড়ির কাউকেই কিছু জানানো হয়নি। সবাই জানে- তাঁরা বাড়ি থেকে বেরোনোর পর সরাসরি ভাড়া বাড়িতেই ওঠেছিল। এর আগের কান্ড কিছুই অবগত না থাকায়ই এমন স্বাভাবিক আচরণ তাদের। তবে বাঁধ সাধে কৃশান। ও কোনোভাবেই যাওয়ার জন্য রাজি হয়না। কিন্তু শেষমেশ হুমায়রা মামার অসুস্থতার দোহাই দিয়ে মানুষটা কে রাজি করিয়েই ছাড়ে। অতঃপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে বাড়িতে পা রাখতে কৃশানকে। তাদের প্রবেশ মাত্রই রেখা বেগম হুমায়রা কে ধরে কান্না জুড়ে দিলেন,

“ ওরে হুমায়রা রে, তোর মামার কি হলো? দেখ তোর মামা ঠিকমতো হাঁটতে পারছে না, হাত পায়ে পানি নেমে গেছে, আস্তে আস্তে চোখগুলোও ফুলে যাচ্ছে। তোর মামার কিছু হয়ে গেলে আমাদের কি হবে রে হুমায়রা…..! ”
“ শান্ত হোন মামণি। ইনশাআল্লাহ কিচ্ছু হবে না মামার। ”
ভদ্রমহিলা হুমায়রা কে ছাড়েন তবে কান্না থামান না। স্বামীর শিয়রে বসেই নিঃশব্দে কাঁদতে থাকেন। কৃশান কিছুক্ষণ মামা শ্বশুর কে পর্যবেক্ষণ করে। পরপর ঠান্ডা গলায় শুধায়,
“ ডাক্তার দেখিয়েছিলেন? ”
“ হুম। ”
“ কি বলেছে? ”
“ কিডনিতে সমস্যা হয়েছে। বড় কোনো হাসপাতালে নিতে বলেছে। কিন্তু আমিতো এসবের কিছুই বুঝিনা। আর নাতো… ”
কথা সম্পূর্ণ করতে পারলেন না তিনি মাথপথেই কৃশান বলে ওঠে,

“ আচ্ছা আমি দেখছি কি করা যায়। ”
কৃশান পুরো ভার নিজ হাতে তুলে নেয়। অতএব ভদ্রলোককে ভর্তি করানো হয় কুমিল্লা মুন হসপিটালে। টাকা থেকে শুরু করে বাদবাকি সবকিছুই নিজ হাতে সামলায় কৃশান। অশ্রুসিক্ত নয়নে ক্লিনিকে এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করা কৃশান কে কিছুক্ষণ পরখ করেন রেখা বেগম। পরপর কৃশান যখন তার সামনে এলেন তিনি কান্নার গতি বাড়িয়ে দিলেন। অনুতপ্ত ভেজা গলায় বললেন,
“ আমাকে ক্ষমা করে দাও বাবা, আমি তোমাদের সাথে অনেক অন্যায় করেছি। হুমায়রা তোর সাথে যে আচরণ করেছি আমি তার কোনো ক্ষমা হয়না। পারলে মামনিকে ক্ষমা করে দিস ”
“ এখন এসব বাদ দাও মামণি। কান্না কাটি না করে মামার জন্য দোয়া কর যেন আল্লাহ সবকিছুই তাড়াতাড়ি ঠিক করে দেন। ”

“ হুম, দোয়া তো করছিই রে মা। ”
“ আচ্ছা এখন আমরা আসি। কোনো সমস্যা হলে আমাকে কল করবেন। ”
“ এখনি চলে যাবে? ”
“ হুম। এখানে থাকা ওর স্বাস্থ্যের জন্য ঠিক হবেনা। পরে আসবে নাহয় আবার। ”
ভাগ্নির প্রেগন্যান্সির কথা মনে পড়তেই আর কথা বাড়ালেন না রেখা বেগম। এই অব্দি সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু রাস্তায় এসে বিপত্তি টা ঘটে। হসপিটালের কিছুটা দূরে কৃশানের এক পুরনো শত্রু সামনে পড়ে। তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আসতে নিচ্ছিল কৃশান। তবে এতদিন পর কৃশানকে দেখতেই ছেলেটি পেছন থেকে বলে উঠল,

“ করে কৃশান, শুনলাম তুই নাকি সাধু পুরুষ হয়ে গেছিস। নেশা টেশা সবকিছু নাকি ছেড়ে দিয়েছিস? তা এখন কি নারীর নেশায় মত্ত হয়েছিস? সাথের টা কে? খাসা জিনিসই দেখি ধরেছিস! ”
ছেলেটির মুখে বিচ্ছিরি হাসি। কৃশান এবার চোখ ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকায়। এগোতে নিলেই তার শার্টের হাতা খামচে ধরে হুমায়রা। মাথা নাড়িয়ে বুঝায়- না এগোতে। কৃশান ওর দিক তাকিয়ে কিছু একটা ভাবে। অতঃপর থেমে যায় সে। নিঃশব্দে রওনা হয় বাড়ির উদ্দেশ্যে। তবে আসার সময় মানুষটার রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করার ব্যাপারটা ঠিকই চোখে পড়ে হুমায়রার। কৃশান পুরোটা রাস্তা শক্ত হয়ে ছিল। হুমায়রা তাকে নানাভাবে বুঝাল। পৃষ্ঠে কিচ্ছুটি বলেনি সে। তার এই নীরবতা যেন অন্য কোনো ঝড়েরই বার্তা দিচ্ছিল।

কৃশান বাড়ি ফেরে রাত নটার দিক। বেশভূষা বেশ স্বাভাবিক তার। তবে খুব মনযোগ দেখলে বুঝা যায় – হাতের অনেক জায়গায় কেটে, ছিলে আছে যেন এই হাত দিয়ে কোনো কিছুতে বেলামুম আঘাত করেছে। কপালের দিকটাও খানেক ছিলে আছে, পায়ের পাতায় ক বিন্দু রক্তকণা লেগে আছে। হুমায়রা তীক্ষ্ণ চোখে স্বামীকে পর্যবেক্ষণ করে। ভ্রূ কুঁচকে শুধায়,
“ আপনি মারপিট করে এসেছেন? ”
“ না, একজনকে শিক্ষা দিয়ে এসেছি। ”
“ আপনাকে আমি নিষেধ করেছিলাম এসব করতে। তাও আপনি মারপিট কেন করলেন? ”
“ দরকার মনে হয়েছে তাই। ”
“ আপনার কি মনে হয় এগুলো কোনো ভালো পুরুষের কাজ? ”
“ কাপুরুষকে ছেড়ে দেয়ার মতো ভালো মানুষ আমি নই। আজ হোক, কাল হোক আমার জানে হাত দিলে তার জান নিতে দুবার ভাবব না আমি। ”

“ আল্লাহ ক্ষমাকারীকে পছন্দ করেন। পাল্টা আঘাত ছুঁড়া কারীকে নন। ”
“ ক্ষমা করে দিয়েছি বলেই হাসপাতালে আছে, নয়তো কবরে থাকত এতক্ষণে। এখন চুপ থাকতো, মেজাজ খারাপ করিস না। ”
“ আপনার যা ইচ্ছে তাই করুন। আমার কি? ”
রাগে ফুসতে ফুসতে বিছানায় এসে ধপ করে বসে পড়ল হুমায়রা। সেদিকে ধ্যান দিল না মানব। লা পরোয়া ভঙ্গীতে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল সে।
শাওয়ার নেওয়া শেষ হতেই ফাস্টএইড বক্স নিয়ে হুমায়রার সামনে এসে বসল কৃশান। বলল,
“ মেডিসিন লাগিয়ে দে। ”
খালি গা তার, কাটা স্থান গুলো পানির স্পর্শে আসতেই লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। খানেক ফুলে এতক্ষণে সেগুলো পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হুমায়রার বুক পুড়ে ক্ষতস্থান গুলো দেখে। তবে মুখে তেজ দেখিয়ে বলে,

“ পারব না, কেউ আমার কথা শুনে না আমি কেন তার কথা শুনতে যাব। ”
“ জ্বলছে কিন্তু। ”
“ জ্বলুক আমার কি তাতে? ”
“ কথা না শুনলে মার খাবি কিন্তু। ”
“ মারুন না করেছে কে? মারপিটই তো আপনার কাজ! ”
“ এখন কি এটা রেখে আসব। পরে কিন্তু লাগাতে আসলে দিব না। ”
হুমায়রা কিছুক্ষণ চুপচাপ মানুষটার দিক তাকিয়ে থাকে। পরপর তিরিক্ষি মেজাজে ফাস্টএইড বক্স খুলে কাজ শুরু করে।
“ আস্তে, চিকিৎসা দিচ্ছিস নাকি অন্যকিছু? ”
হুমায়রাকে বেপরোয়া ভঙ্গিতে তুলো চাপতে দেখে বলে উঠল কৃশান। পৃষ্ঠে কিছু বলেনা রমণী। তবে হাত নরম করে। এর মাঝেই টুপ করে এক ফোঁটা জলবিন্দু কৃশানের হাতে এসে পড়ে। সাথে সাথেই ওর দিক খানিকটা ঝুঁকে মানব। দুষ্টু কণ্ঠে শুধায়,

“ ব্যথা পাচ্ছি আমি তুই কেন কাঁদছিস? ”
“ খুশি লাগছে আমার তাই কাঁদছি । ”
কৃশান মৃদু হাসে। অতঃপর হুমায়রার কাজ শেষ হতেই কোনোরূপ কথাবার্তা হীন ওর কোলে শুয়ে পড়ে। মেয়েটি রেগে যায়। তেজ দেখিয়ে বলে,
“ এখানে শুয়েছেন কেন? উঠুন বলছি! ”
“ স্যরি, তবে মারপিট করার জন্য না তোর কথা না শোনার জন্য। ”
“ আমার কথা শোনার কোনো দরকার আছে নাকি? কোনোকিছু করার আগে আমার আর আমার বাচ্চার কথা কারো ভাবনায় থাকে নাকি! ”
“ আমার ভাবনার পুরোটা জুড়ে যাদের মালিকানা তাদের নিয়ে ভাবতে নতুন করে মনে করতে হয় নাকি! ”
“ আপনার এই কাব্যময় কথাবার্তা আপনার লেখক পেইজে গিয়ে বলুন। আমার ক্ষেত্রে তো আপনি পুরোটাই বখাটে। ”

“ বখাটে, ফেরারি আর যত হই না কেন- সবটাই শুধু তোর জন্য। ”
হুমায়রা এবার চুপ মেরে যায়। রাগ দেখানোর আর সুযোগ পায়না। কৃশান ওভাবেই ওর কোলে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকে।কিছুসময় পর মানুষটা হুট করেই বলে উঠে,
“ ও কবে আসবে আমাদের মাঝে? ”
“ আসবে যখন আল্লাহ তায়ালা চান তখনি। ”
“ আমার যে খুব করে ওকে দেখতে ইচ্ছে হয়, কোলে নিতে ইচ্ছে হয়, আদর করতে মন চায়। ”
হুমায়রা হাসে ওর কথা শুনে। বলে,
“ ইনশাআল্লাহ খুব শীঘ্রই আপনার ইচ্ছে পূরণ হবে। ”

অতঃপর একদিন চলে আসে কৃশানের সেই আকাঙ্ক্ষিত ক্ষণ। কালের প্রত্যাবর্তনে স্রোতের ন্যায় কেটে গেছে দুটি বছর। সেই সাথে বদলে গেছে মির্জা নিবাসের ধরণ, পরিবেশ ও সদস্যসংখ্যা। পুরো বাড়িময় সুখের আমেজ নিয়ে আগমণ ঘটেছে বাড়ির একমাত্র প্রাণকেন্দ্র কাইফা বিনতে কৃশানের অর্থাৎ কৃশান মির্জার একমাত্র রাজকন্যা কাইফার। গুটিগুটি পায়ে পুরো মাতিয়ে হেঁটে বেড়ায় সে। সকলের একমাত্র চোখের মণি। আর কৃশান মির্জার তো একেবারে প্রাণ ভোমরা বললেই চলে। চৌদ্দ মাসের মেয়ে ব্যতীত কিচ্ছুটি বুঝে না সে। মেয়ের মাঝেই নিজেকে খুঁজে পায়, দেখতে পুরো বাবার মতোই হয়েছে কাশফিয়া। মায়ের ফর্সা আর বাবার ফেইস কাটিং সমেত একেবারে কিউটের ডিব্বা। এত্তটাই মায়াবী বাচ্চা যে আজ অব্দি যেই দেখেছে সেই কোলে নিতে চেয়েছে। অবশ্য মেয়ে যে আদুরে কান্ড কারখানা ঘটায় এতে কোলে না নিয়ে পারবে নাকি কেউ? কৃশানের তো এই মেয়ের টানে ঠিকঠাক মতো কাজে যেতেও ইচ্ছে হয়না। যদিও এখন তার আগের মতো কাজ করতে হয়না। চারটা মধ্যে তিনটা ক্যাফেই ভাড়া দিয়ে রেখেছে সে । ঐখান থেকে মাস শেষে যে টাকা আসে এতেই আয়েশে এরকম দুই/ তিনটা সংসার চালানো যাবে। তাই কাজের তেমন চাপ নেই বললেই চলে। শুধু কে. এইচ ক্যাফে টাই আজও নিজ হাতে সামলায় সে। এটা তার কর্ম জীবনের প্রথম ঠিকানা তাই এটার মাঝে একটা অন্যরকম অনুভুতি কাজ করে।
বিকেলে বাসায় ফিরে মেয়েকে বিছানায় বসা অবস্থায় পেল কৃশান। মায়ের পাশে বসে বিভিন্ন খেলনা নিয়ে খেলছে সে। বাবাকে দেখতেই তার সে কি খুশি! তৎক্ষনাৎ হাত ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বাবার উদ্দেশ্যে হাত বাড়ায়। কৃশান দেরী করেনা এসেই প্রথমে মেয়েকে কোলে নেয়। স্নেহের পরশ এঁকে বলে,

“ বাবা আমার। ”
কাইফা ছোট্ট ছোট্ট হস্ত যুগল দিয়ে বাবার গলা পেঁচিয়ে ধরে। অকস্মাৎ উচ্চারণ করে,
“ বাবা…! ”
কৃশান চমকায়, হকচকায় বুক সুদ্ধ খানেক কেঁপে ওঠে মেয়ের মুখ থেকে প্রথম বাবা শব্দটি শুনে। এতদিন কাইফা শুধু ঠোঁট নেড়ে নেড়ে শব্দহীন উচ্চারণ করত শব্দ বের হয়নি কখনো। আজই, আজই প্রথম শব্দ করে বাবা ডাকল সে। কৃশান তৎক্ষনাৎ মেয়ের মুখটা নজর বন্দি করে। একেবারে সামনে এনে থেমে থেমে শুধায়,
“ কি বললে বাবা তুমি? আরেকবার বলো? ”
শিশুটি কি বুঝল কে জানে? সে এক নাগাড়ে জপতে শুরু করল,
“ বাবা, বাবা, বাবা, বা বা বা…..”
কৃশান অনুভুতি পূর্ণ দেহটা নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। মেয়েকে বুকের উপর বসিয়ে দেয়। পরপর পাশে বসা স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলে,
“ শুনলে আমার মেয়ে কি বলল? ”
হুমায়রা হাসে, মাথা দোলায় দুপাশে। মুখে বলে,

“ শুনলাম। ”
কাইফা থেমে নেই, বাবার ট্রিম করা দাড়ি হাতিয়ে বারংবার বাবা শব্দটি বলতে থাকে। কৃশান চোখ বুঁজে নেয়। ওর ঠিক কি অনুভুতি হচ্ছে বলে বুঝানো সম্ভব না। বাবার বন্ধ চোখের পাতা দিক তাকিয়ে থেমে যায় কাইফা। মনযোগ দিয় কৃশানের চোখ খোলার কাজে। ওর ছোট্ট শাহাদাত আঙ্গুল টা চোখের উপরে অনুভব করতেই চোখ খুলে তাকায় কৃশান। টিউলিপের পাপড়ির ন্যায় গোলাপি ঠোঁট জোড়া প্রসারিত হয় শিশুটির। ফের ডাকে,
“ বাবা। ”
“ বলো না বাবা। ”
“ বাবা। ”
“ হ্যাঁ বলো, বাবা শুনছি তো। ”
“ বাবা। ”

কৃশানের ঠোঁট থেকে যেন হাসি সরছেই না। মেয়ের কান্ড দেখে সে উচ্ছ্বাস তার। হুমায়রা মনযোগ দিয়ে বাবা- মেয়ের কান্ড দেখে। কিছুক্ষণ এভাবেই কাটে। এক পর্যায়ে মেয়েকে নিয়ে উঠে বসে কৃশান। পকেট থেকে কি যেন একটা বের করে স্ত্রীর নিকট ঝুঁকে। পরপর হুমায়রার হাতে জিনিসটা ধরিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“ আমাকে বাবা ডাক শোনার এই অতুলনীয় অনুভুতি দেয়ার জন্য এটা তোমার দফা। ”
হুমায়রা বস্তুটির দিকে তাকায়। বস্তুটির গায়ে গুটিগুটি অক্ষরে লিখা- পাসপোর্ট। চোখ বড় বড় হয়ে যায় রমণীর। বিস্ময় নিয়ে মানুষটার পানে তাকায়। কৃশান তখন মেয়ের হাতে আরেকটা পাসপোর্ট ধরিয়ে দিয়ে বলে,
“ এই ছোট্ট ঠোঁট জোড়া নেড়ে বাবা ডাকার জন্য এটা তোমার দফা সোনাবাবা। ”
কাইফা ক্ষণিকের জন্য ভাসা ভাসা নেত্রযুগল দিয়ে দফা খানা পর্যবেক্ষণ করে। পরক্ষণেই টুপ করে সেটাকে মুখে পুড়তে নেয়। মাঝপথেই ওকে থামিয়ে দেয় হুমায়রা। মেয়ের হাত থেকে পাসপোর্ট টা কেড়ে নিয়ে স্বামীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে,

“ এগুলো কিসের পাসপোর্ট? ”
“ আল্লাহর ঘরে যাওয়ার পাসপোর্ট। ইনশাআল্লাহ কিছুদিনের ভিতরেই স্বপরিবার নিয়ে তোমার আল্লাহর ঘর ছুঁয়ে দেখার ভাগ্য হবে। ”
হুমায়রার হুট করেই মনে পড়ল একটা বিষয়। অনেক আগে কৃশানের আনা একটা হাদিসের বইয়ে হজের ফজিলত সম্পর্কে পড়ে ঐ পৃষ্ঠাটায় ও গুটিগুটি অক্ষরে লিখে রেখেছিল এমনই একটা লাইন-
“ কোনো একদিন স্বপরিবার নিয়ে আমারও আল্লাহর ঘর ছুঁয়ে দেখার ভাগ্য হোক…! ”
কৃশান কি তাহলে তার সেই লিখাটুকু পড়েছিল? কথা শুনে তো তাই মনে হচ্ছে। তবুও শিউর হতে জিজ্ঞেস করল,

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪৯

“ আপনি কি আমার ঐ লিখাটা পড়েছিলেন? ”
“ কোন লিখা? ”
ভ্রূ কুঁচকে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে কৃশান। যেন কিছুই মাথায় ঢুকছে না তার। অথচ সে কিন্তু সবটা বুঝেছে। হ্যাঁ, কৃশান পড়েছিল সেই লিখাটা। আর সেই থেকেই সবকিছুর বন্দোবস্ত। তবে তা স্বীকার করল না। তার রিয়েকশন দেখে হুমায়রা থতমত খেয়ে গেল। নিজের ভাবনাকে ভুল মনে করে তৎক্ষনাৎ কথা ঘুরিয়ে নিল,
“ কিছুনা। ঐ পাসপোর্টের ভিতরের লিখার কথা বলছিলাম। ”
কৃশান অগোচরে চাপা হাসে। স্বাভাবিক গলায় বলে,
“ হুম। ”

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৫১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here