হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩১
সাঞ্জেনা শাজ
“নাহ, প্লিজ আর না৷ উমমমম, মেহরাদ ভাই! আপনার ছোঁয়া আমায় নিঃশেষ করে দিচ্ছে। আর পারছি না। কষ্ট হচ্ছে তো! খুব ব্যাথা হচ্ছে! ”
“আর একটু জান। চেয়ে দেখ, তোর জন্য কতটা ডেসপারেট আমি! লুক এট মি, বেইবি। আর একটু ব্যাথা সহ্য কর। মেডেসিন নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। ”
শুভ্রতা তাকায় না। দরদর করে ঘামছে মেয়েটা। তার উপরে ভর ছেড়ে রাখা লোকটা বস্রহীন লাজহীন হয়ে তার সামনে উপস্থিত। শুভ্রতার বুক কাপে। এতো বড় লোকটার ভার শুভ্রতা কিভাবে সামাল দিবে? তার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এই রূপ তো তার অজানা মেহরাদ ভাইয়ের! লাজে, শংকায়, ভয়ে শুভ্রতার জান যায় যায় অবস্থা।
তাড়াক করে শোয়া থেকে উঠে বসলো শুভ্রতা। পুরো শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার। কিছুক্ষণ আগে দেখা ওটা কি ছিলো? স্বপ্ন? নাকি দুঃস্বপ্ন? মেহরাদ ভাই… মেহরাদ ভাই….
শুভ্রতার শব্দ আটকে আসে। গলা শুকিয়ে কাঠ। মেয়েটা সব ভুলতে চায়। দিশেহারা হয়। মৃদু আর্তনাদ করে উঠে বারবার। চোখের সামনে ভাসে মেহরাদ ভাইয়ের নির্লজ্জ, লাজহীন, সম্পূর্ণ উন্মুক্ত বলিষ্ঠ কায়া৷
“নাহহহহহহ। আল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ। আল্লাহ তুমি আমায় এসব ভুলিয়ে দাও। এ কি দেখে ফেলেছে আমার চোখ দুটো? এগুলো ভুলিয়ে দাও আমায় আল্লাহ। তাড়াতাড়ি ভুলিয়ে দাও। এখন আমি কিভাবে মেহরাদ ভাইয়ের সামনে যাবো? ওনার দিকে তাকাবো! দেখলেই তো সেই দৃশ্য ভাসবে চোখে।” শুভ্রতা বিলাপ শুরু করলো। তআর জীবনে এটা প্রথম। এই নোংরা ঘটনা তার সাথে কিভাবে ঘটলো! সে কি নষ্ট মাইন্ডেড হয়ে গিয়েছে?
ঘড়িতে তখন আটটা বেজে গিয়েছে। শুভ্রতা কপালের, ঘারের চিকন ঘাম টুকু মুছে নিজের দিকে একবার তাকালো। পা’য়ের ব্যাথাটা কম এখন। সে উঠে একেবারে শাওয়ার নিতে চলে গেলো। তার সাথে কি হয়ে গেলো এটা? হায়, হায়!
সকালের নাস্তায় শুভ্রতা ফ্রেস হয়ে যেতে যেতে অনেককেই পেল না৷ শুধু সে আর শান্তা আছে ।তা-ও শান্তার প্রায় খাওয়া শেষ। সোহানা তার জন্য ওয়েট করছে ড্রয়িং রুমে। আর চার পাচ দিন বাকি পরিক্ষার। তাই কিছুতেই মিস দেওয়া যাবে না। যেতেই হবে। এমনিতেই পরশু বন্ধ দিয়ে দিবে।
শুভ্রতা ব্রেডে কামর দিয়ে চিবুতে চিবুতে কারো পা’য়ের শব্দ পেয়ে মাথা উঠিয়ে একবার সামনে তাকালো। মূহুর্তেই খাবার গলায় আটকে গেল। মেহরাদ আসছে একেবারে অফিসের জন্য রেডি হয়ে। শাওয়ার নেওয়া মেইবি!
মূহুর্তেই শুভ্রতার চোখ গুলো আকারে বড়ো বড়ো হয়ে গেল। মুখশ্রী রেড চেরি হয়ে গিয়েছে। গাল দিয়ে উষ্ণ ধোঁয়া বের হচ্ছে। সম্পূর্ণ ফিটফাট, পোশাকে আবৃত লোকটাকে সে সেই নিষিদ্ধ ভাবে দেখছে এখনো। না চাইতেও একবার উপর থেকে নিচ অব্দি নজর বুলিয়ে নিয়েছে। দৃষ্টি আটকায় নিষিদ্ধ জায়গায়। কেশে উঠলো শুভ্রতা। ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি পেটে চালান করে দিলো। দেহে উষ্ণতা ছড়িয়ে গিয়েছে পুরো।
মেহরাদ গিয়ে বসলো শুভ্রতার সামনা-সামনি চেয়ারে। প্রায় সারারাত নির্ঘুম সে। মেয়েটার জন্য তার পুরুষ সত্তা সারারাত আন্দলোন করেছে। জ্বালিয়েছে, ঘুম কেড়ে নিয়েছে। সে এই সব গুলো সুধে আসলে পুরোন করবে। না পাড়তে দু দু’বার শাওয়ার নিয়েছে এই মৃদু শীতল আবহাওয়ার মাঝে। তারউপর মেয়েটার লাজে রাঙা মুখশ্রী! সব যেন তার ধৈর্যের পরিক্ষা নিচ্ছে বসে বসে!
মেহরাদ খেয়াল করেছে শুভ্রতার দিকে, মেয়েটার চোরের মতো দৃষ্টি ভোলাচ্ছে তার দেহে। বারবার পানি খাচ্ছে একটু একটু। মুখশ্রী লজ্জায় লালিত৷ হাত কাপছে, নজর ঘোরাচ্ছে এদিক সেদিক। এতো লজ্জা, এতো অস্থিরতা কেন? শুধুই রাতের সে ঘটনায় না-কি ভিন্ন কিছু? সে ধরতে পাড়লো না আসল বিষয়টা। অবশ্য তার ধারনার বাইরে এ বিষয়, তার বোকা রমনী তাকে নিয়ে এই এডাল্ট উদ্ভট স্বপ্ন দেখে কোমায় চলে যাচ্ছে!
খাবার খেতে খেতে মেহরাদ শুভ্রতার দিকে না তাকিয়েই শুধালো,
“ব্যাথা কমেছে? মেডিসিন নেওয়া হয়েছে?”
অনেক দিন পর মেহরাদ কথা বললো শুভ্রতার সাথে সকলের সামনে। কিচেন থেকে ছেলের কথা শুনে উঁকি দিলেন জাহানারা বেগম। সুরাইয়া বেগমও। দেখলেন ছেলে জিজ্ঞাসা করেছে ঠিকিই কিন্তু দৃষ্টি খাবারের দিকেই।
এদিকে শুভ্রতার কাশি উঠে গেল। আবার সেই, ব্যাথা ; মেডিসিন! মেয়েটা কেশে আবার নিজেই ঢকঢক করে আবারও পানি খেয়ে নিলো। তার সাথে এসব কি হচ্ছে! আল্লাহ!
মেহরাদ পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো মেয়েটার দিকে। আজকে খুব নার্ভাস লাগছে মেয়েটাকে। বেশি ব্যাথা হচ্ছে কি!
মেহরাদের চাহনি দেখে শুভ্রতা তড়িৎ এদিক সেদিক মাথা নাড়াল, অর্থাৎ ব্যাথা নেই। মেহরাদ ভ্রু কুচকেই তাকিয়ে রইলো। মেয়েটা খুব আজব বিহেভ করছে তো।
শুভ্রতা কোন রকম দুটো খেয়ে ব্যাগ কাধে নিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইলো। যাওয়ার আগে বিদায় নিলো বড় মা মেঝো মা’য়ের কাছে। তাকে আসতে দেখে সোহানা ঢেং ঢেং করে বেরিয়ে গেল গাড়ির উদ্দেশ্যে। শুভ্রতাও গেলো পিছু পিছু। কিন্তু মেয়েটার পা চলতে চায় না। উদ্ভট চিন্তায় মাথা জ্যাম হয়ে আছে। আজ সারাদিন এগুলোই চোখের সামনে ভাসবে বুঝি!
মেহরাদ এক হাতে কোট ঝুলিয়ে শুভ্রতার পিছু পিছুই বের হচ্ছে অফিসের উদ্দেশ্যে। বরাবরের মতোই তাদের গাড়ি এক স্থানে রাখা।
মেহরাদ শুভ্রতাকে পরখ করছে কপালে ভাজ ফেলে। মেয়েটার কি হয়েছে আজ! শুভ্রতার দু কদম তার এক কদম সমান। মিনিটের মধ্যে দুজনের অবস্থান হলো পাশাপাশি।
শুভ্রতা পাশে তাকিয়ে দেখলো মেহরাদ তার পাশে। আচমকা তার পা’য়ে পা লেগে গেলো পা’য়ের গতি বাড়াতে গিয়ে। আবারও ধপ করে পড়তে নিলে মেহরাদ বাহু চেপে ধরলো।
“ইডিয়েট, কি সমস্যা? এরকম করছিস কেন? ”
শুভ্রতার সব তালগোল পাকাচ্ছে চক্রাকারে। সে নিজেকে আবারও সেই স্বপ্নের মধ্যে মনে করলো। সে কোন কিছু না ভেবেই নিজের বাহু থেকে মেহরাদের হাত খানা সড়াতে সড়াতে বলতে থাকলো,
“ছাড়ুন, ছাড়ুন আমায়। এতো বড় আপনাকে আমি সামলাতে পারবো না। আমায় ব্যথা দিবেন আপনি। আপনি আর আমার সামনে আসবেন না।”
মেহরাদ এক ভ্রু উচিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে পরখ করছে শুভ্রতার পাগলামো। মেয়েটার অতিরিক্ত হাইপারটেনশনে আছে। পুরো মুখশ্রী রক্তিম হয়ে আছে। চোখ তুলে তাকাচ্ছে না তার দিকে। দৃষ্টি নামিয়েই হাত নাড়িয়ে আবল তাবল বকছে। এরকম করার কারণ কি? আর এসবিই কেন বলছে?
“মাথা গেছে? হয়েন ডিড আই হার্ট ইউ?”
শুভ্রতা এদিক সেদিক মাথা নাড়াল অনবরত। ছুটে চলে যেতে চাইলো। কিন্তু মেহরাদ আবারও আটকে ধরেছে ওর বাহু। আবারও রাশভারি কন্ঠে শুধালো,
“এতো বড়ো আপনায় মানে কি? তোর কি মনে হয় আমি হাতি?”
শুভ্রতা এযাত্রায়ও তড়িঘড়ি করে মাথা নাড়াল। মেয়েটার নিশ্বাসের পালা বাড়ছে৷ মুখশ্রী ঘেমেনেয়ে একাকার। মাথা এখনো নিচুই।
“ইউজ ইউর টাং শুভ্রা। সে ইন ওয়ার্ড।” গম্ভীর স্বরে বললো মেহরাদ।
শুভ্রতা ভয় পেলো মেহরাদের গম্ভীর স্বরে। লোকটা আবার ভুল বুঝবে তাকে? সে তো তাকে হাতি বুঝায় নি। সে নিজেই ছোট।
“আপনায়…আপনায় কিচ্ছু বলিনি তো। আমি…আমি নিজেই ছোট। সেটা বলেছি।”
“,আর এটা তুই কেন বলেছিস?”
“এমনি..এমনিই। আমায় যেতে দিন। দেরি হয়ে যাচ্ছে। ”
“,উঁহু, তাকা এদিকে। তাকাচ্ছিস না কেন? সবকিছু ক্লিয়ার কর। ওয়েরড বিহেভ করছিস কেন?”
“না না, আমি তাকাতে পাড়বো না। আমার চোখ দুটো নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আমি আর আপনার দিকে তাকাবো না।”
এযাত্রায় মেহরাদের চোয়াল শক্ত হলো। মেয়েটা সেই কখন থেকে কি পাগলের মতো বলে যাচ্ছে! সে হাতের চাপ আরও দৃঢ় করলো। চাপা স্বরে বললো,
“কি বলছিস ভেবে বলছিস তো! তুই বলতে চাচ্ছিস আমি এতটাই বাজে, যে আমার দিকে তাকাতে পাড়বি না? আমি খারাপ?”
শুভ্রতা যেন আৎকে উঠলো। তাকে অযথাই ভুল বুঝে যাচ্ছে। সে কখন এসব বললো? তার সাথে রাত থেকে এসব কি হচ্ছে! সে মেহরাদের রাগী দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে হরহর করে বলতে থাকলো,
“আপনি ভুল বুঝছেন। আপনি ভালো। আমিই খারাপ। তাইতো এরকম জঘন্য স্বপ্ন দেখলাম আপনায় নিয়ে।”
মেহরাদের কপালের ভাজ সমান্তরাল হলো। চোখ দুটো তীক্ষ্ণ তবুও। সে তাড় স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“শাওয়ার নিয়েছিস?”
“হু। ”
“কেন?”
“কারণ…. ” শুভ্রতার কথা আটকে গেল। গলা দিয়ে কোন রা বের হলো না আর। সে মাঝেমধ্যেই শাওয়ার নেয় সকালে কলেজে যেতে। কিন্তু আজ কারণ তো ভিন্ন। সে চাইলেই গুছিয়ে মিথ্যে বলতে পাড়তো। কিন্তু তার মাথায় তো কিছুই কাজ করছে না।
মেহরাদের নিকট মেয়েটার আজে বাজে কথা , চোরা লজ্জালু চাহনি, পাগলামো সব যেন নিমেষেই চোখের সামনে ধরা পড়লো। তার গম্ভীর ঠোঁটের কোনা বেকে আসতে চাইলো। কিন্তু ঠোঁটে ঠোঁট চেপে আটকে রাখলো। তবে কন্ঠে ঠাট্টা মিশিয়ে শুধালো,
“আচ্ছা!তো জঘন্য স্বপ্ন দেখেছিস! আর সেই স্বপ্নে আমি তোকে ব্যাথা দিয়েছি? কোথায়?”
শুভ্রতা অস্থীর হয়ে গেল। তার পুরো দেহ থেকে উষ্ণ তাপ বের হচ্ছে যেন। নিচের ঠোঁটে দাত কামড়ে রইলো। এরিই মাঝে মেহরাদ আবারও শুধালো,
“হোয়ার ডিড আই হার্ট ইউ শুভ্রা, ইন ইউর ড্রিমস? ”
শুভ্রতা অনবরত মাথা নাড়িয়ে না বুঝাতে থাকলো। অর্থাৎ সে বলবে না। কিছুতেই না। ছুটতে চাইলো প্রান পনে। মেহরাদ হাতের বাধন কিছুটা আলগা করলো। কিছুটা ঝুকে শুভ্রতার ঘনিষ্ঠ হয়ে মৃদুস্বরে আওড়ালো,
“Happy sweet wet dreams sweetheart.” শেষের কথাটা অস্পষ্ট বাজলো শুভ্রতার কানে। তার নিশ্বাস জমে গেল যেন। হাতটা কিছুটা হালকা লাগতে এদিক সেদিক আর তাকালো না। দৌড়ে গাড়ির ভিতর ঢুকে দরজা আটকে দিলো। দু গালে গাড়ির ভেতর থেকে পানির বোতল নিয়ে চেপে ধরলো। ফেটে রক্ত বের হয়ে যাবে যেন এতো তাপ ছড়াচ্ছে।
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩০
এযাত্রায় মেহরাদ আর আটকালো না নিজেকে। ঠোঁটের কোনা বাকিয়ে হেসে ফেললো। নির্লজ্জ হাসি। নিচের ওষ্ঠ দংশন করে আওড়ালো,
“তোর স্বপ্নেও আমার রাজত্ব, জান। আর তুই কি-না আমার কাছ থেকে মুক্তি চাস? হাউ সিল্যি,হাহ!”
