অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬
তোনিমা খান
রাত বাড়তেই মানুষের কর্মব্যাস্ততা কমে আসল, নিরাবতায় আচ্ছন্ন হয় ধরণী। সকলে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে যে যার মতো ঘরে চলে গিয়েছে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিতে। রান্নাঘর থেকে এখনো টুং টাং আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। কাজের মহিলাদের উপর এতোদিন পুরো ঘরটা থাকায় মৌনতা এসেই আবার নিজের মত করে রান্নাঘরের সব গুছিয়ে নিচ্ছে। জবা আর মাজেদা তারাও হাতে হাতে খাবার টেবিল গুছিয়ে ফেলছে। কিন্তু তারা সাগ্রহে অপেক্ষা করছে কখন মৌনতা তাদের সব খুলে বলবে।
নায়েলকে অনেক আগেই ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে মৌনতা। নায়েল এবং তানশান দু’জনেই অস্বাভাবিক পরিমানে শান্ত। তারা ছোটবেলা থেকেই দৌড়ঝাঁপ, চিৎকার চেঁচামেচি, উশৃঙ্খলতা এড়িয়ে চলে। তবে বাচ্চাসুলভ প্রাণবন্ততা রয়েছে তাদের মাঝে, যেগুলো শুধু পরিবারের মানুষের মাঝেই সীমাবদ্ধ। সব গুছিয়ে নিতে নিতেই মৌনতা হাঁফিয়ে উঠল। আর দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পেল না। ডিসেম্বরের এই শীতেও তার পুরো শরীর ঘেমে উঠেছে অস্বাভাবিক ভাবে। মাথা, শরীর কেমন ঝিমিয়ে আসছে। জ্বর আসবে বোধহয়। ইদানিং প্রায়শই তার জ্বর, ঠান্ডা, সংক্রমন লেগেই থাকে। আগে একা হাতে এই পুরো সংসারটা সে সামলে নিতো, তাতে একটুও ক্লান্ত বোধ হতো না। কিন্তু এখন আর পারে না। এতোদিন বিষয়গুলো নিয়ে মাথা না ঘামালেও এখন চিন্তা হচ্ছে। ইমরোজ আসলে তাকে বলবে ডক্টরের কাছে নিয়ে যেতে। সে চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে হাত ধুয়ে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসতে গেলেই জবা আর মাজেদা পথ আঁটকে দাঁড়ায়। চেহারায় তাদের উৎকন্ঠা, আগ্রহ। জবা অনুরোধ করে বলল,
–“মেজো ভাবিজান এহন কন, কাজ তো সব শেষ।”
মৌনতা বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টি ফেলে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসে। তার পাশাপাশি জবা আর মাজেদাও দ্রুত চেয়ার টেনে বসল। মৌনতা তাদের সব খুলে বলল। সব শোনার পর জবাকে রূপকথার জন্য দুঃখিত, ব্যথিত হতে দেখা গেল। কিন্তু মাজেদার বেশ পছন্দ হয়েছে রূপকথাকে তপোবনের জন্য। জবা আফসোসের সাথে বলল,
–”জীবনে ঐ রকম কয়ডা বে’জ’ন্মা থাকলে শান্তিতে বাঁচার উপায় নাই, ভাবিজান। আমি বুঝি! আমি যহন গ্রামের বাড়িতে থাকতাম তহন আমারে আর আমার বইনরে কি মানুষ কম জ্বলাইত? টেহা পয়সা নাই, আমরা গরীব তাই বলে কি আমরা মানুষ না? যে পাবি ছিঁড়ে খাবি আমগোরে? আমরা শরীর বিকাইয়া চলি? আমরা গরীব দেইখা তগো সম্পদ হইয়া গেলাম? শান্তিতে বাঁচার অধিকার কি শুধু ধনী লোকদের ই আছে? ইশশ! সমাজের কয়ডা কু/ত্তা আর টেহা পয়সার জন্য ঐটুকুন একটা মাইয়ারে বুড়া একটা লোকের সাথে বিয়া দিয়া দিছে!”
মাজেদার মতবিরোধ ঘটলো জবার এহেন কথায়।
–“বুড়া কি? আমগো তপোবন বাপ কোন দিক থিকা বুড়া? এহনো ঠিকঠাকমতো চললে মানুষ চাইয়া থাকবো তার দিকে। তা তো তপোবন চলে না। হে যত না বুড়া তার থেকে বেশি তার চলাফেরা বয়স্কদের মত। নিজের একটু যত্ন নেয়? অগোছালো, সাদাসিধে, মনমরা জীবন তার। তার জীবনে যদি আগের মতো আনন্দ থাকত তবে দেখতি এহনো কি সুন্দর লাগতো। বড় বউ থাকতে তো দেহোস নাই, নায়কের মতো চলাফেরা করতো তহন। দেহাইতো একদম নায়কগো মতো।”, জবার কথায় মাজেদা তীব্র বিরোধিতা করে বললো। সে এই বাড়িতে কাজ করে আজ বহু বছর। তপোবনের বিয়ে দেখেছে, তানশানের জন্ম দেখেছে পূর্বার মৃত্যু দেখেছে, দেখেছে এই পরিবারের বদলে যাওয়া সব দিনগুলো সাথে জীবন ও। এই পরিবারের সকলের জীবনে আর আগের মতো সুখ নেই, কেমন যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে পরিবারটা। একটা মানুষের জীবনের গতিবিধি ও ঠিকঠাক নেই।
–“হ আফনের কাছে তো লাগবোই তপোবন ভাইজানরে নায়ক। আফনের চোখে তো ছানি পড়ছে। দূরে বইসা অনেক কিছু কওয়া যায় বুঝছেন, কিন্তু যে ঐ জায়গায় ঐ পরিস্থিতিতে থাকে হে বোঝে কেমনডা লাগে। আফনে বুড়ি মানুষ যা না বোঝেন তা নিয়া বেশি কথা কইয়েন না।”, জবা তিরিক্ষি কন্ঠে ব্যঙ্গ করে বলল মাজেদাকে। মাজেদা দাঁত কিড়মিড় করে তাকায় জবার দিকে।
তাদের কথা কাটাকাটি চলমান দেখে মৌনতাও নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। ঘরে এসেই ফোন হাতে নেয়। ইমরোজকে ফোন দেবে এখন। তার সাথে কথা হয় না আজ এক সপ্তাহ হলো। সেও ফোন করেনি, আর না ইমরোজ করেছে। ইমরোজ যখনি কাজের জন্য বাইরে যায় সবসময়ই সে আগে ফোন করে কিন্তু গত সপ্তাহে কিছুটা রাগ করেই সে ফোন করেনি। সবসময়ই সে কেনো ফোন দেবে? লোকটাও তো কখনো ফোন দিতে পারে? ভেবেছিলো সে ফোন না দিলে হয়তো ইমরোজ ফোন দেবে কিন্তু নাহ লোকটির হয়তো ফুরসৎ মিলে না স্ত্রীকে ফোন দেয়ার, আর না প্রয়োজন বোধ করে।
প্রায় চারবার রিং হওয়ার পর ও ফোনটি রিসিভ হলো না। ঠিক পাঁচ বারের মতো রিং হতেই ফোনটি রিসিভ হলো। মৌনতার মুখে হাসি ফুটে উঠল। কানে ফোন ঠেকিয়ে সাগ্রহে কিছু বলার আগেই অপরপাশ থেকে পুরুষালী গম্ভীর আওয়াজ ভেসে আসলো,
–“এক সপ্তাহ পর মনে পড়ল? আমি ছাড়া খুব ভালো আছো দেখছি।”
–“একই প্রশ্ন আমিও তো করতে পারি।”, মৌনতা মৃদু হেসে শুধায়।
অপরপাশ নীরাবতায় আচ্ছন্ন হলো। ইমরোজের সাড়াশব্দ না পেয়ে মৌনতা বলল,,
–“কিন্তু করব না। কাউকে জোর করে কোনকিছু করানো যায় না। আপনি বলুন কেমন আছেন? কাজ শেষ হয়েছে? খুলনাতে কবে আসবেন?”
–“না কাজ শেষ হয়নি। দুই তিনদিনের মধ্যেই আসছি। শুনলাম বড় ভাইজান নাকি বিয়ে করেছে?”, ইমরোজের কথায় মৌনতা স্মিত হাসল। ম্লান কন্ঠে শুধায়,
–“আপনি আসলেই কাজে অনেক ব্যস্ত তাই না ইমরোজ? পরিবারের কারোর খবর আপনার কাছে থাকে না, আর না আপনি নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেন।”
–“না জানলে জিজ্ঞাসা করলাম কিভাবে?”
–“যেভাবে আমি না বললে আপনি একটাবার জিজ্ঞাসা করতেন না, আপনার মেয়ে কেমন আছে!”
–“নায়েলের আবার কি হয়েছে? ঠিকই তো থাকার কথা। ওর ঠিক থাকার জন্যই তো তোমার বাড়িতে থাকো, তাই না? এত গুলো মানুষের মাঝে যে নায়েলের কিছু হবে না সেটা আমি জানি; তাই এই বিষয়ে চিন্তা করা ছাড়াও আমার আরো অনেক চিন্তার বিষয় রয়েছে। সবসময় এমন ন্যাকা মহিলাদের মতো আবেগি কথাবার্তা নিয়ে বসে পড়বে না, মৌনতা। আর রাত বাজে কয়টা? এখন ঘুমের সময় ফোন দিয়েছ কেন? সারাদিন কাজের জায়গায় থাকতে হয়, রাতে অন্তত বিশ্রামটা নিতে দাও। আর ফোন দিয়েও ভালো কথা না বলে এমন কথা প্যাঁচাতে শুরু করেছো্।”, ইমরোজের অনুভূতি শূন্য বিরক্তি মাখা কন্ঠে ম্লান হয়ে আসলো মৌনতার দেহাবয়ব। দেহ ভার শূন্য হয়ে আসলো ইদানিং স্বামী স্ত্রীর ফোনালাপের মাঝে বিরক্তিকর অনুভূতির আভাস পেয়ে। এই বিরক্তিকর অনুভূতি যেন নিছকই শারীরিক ক্লান্তির এবং ক্ষণকালের হয়। ইমরোজ যেন সত্যিই ক্লান্ত হয়, ঘুমাতে চায় তাই তার সাথে কথা বলতে বিরক্ত বোধ করছে। নাকি ইমরোজ তার সাথে কথাই বলতে চাইছে না? স্বামী স্ত্রীর মাঝে কি শুধুই বিরক্তি তৈরি হচ্ছে নাকি দূরত্ব ও? সে স্থবিরতা ভঙ্গ করে মিহি স্বরে বলল,
–“ওহ্, আপনি ক্লান্ত আমি বুঝতে পারিনি। ভেবেছিলাম সারাদিন কাজ করেন, রাতে হয়তো ফ্রি হবেন ফোন দিলে বিরক্ত হবেন না। আচ্ছা আপনি বিশ্রাম করুন। শরীরের যত্ন নিবেন। নায়েল আর আমি অপেক্ষায় আছি আপনার, শিঘ্রই বাড়ি ফিরে আসুন।”
বাক্যটি শেষ হতে না হতেই ফোনটি খট করে কেটে গেলো। মৌনতা ফোনটা কান থেকে নামিয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেদিকে। সে কাটেনি ইমরোজ কেটে দিয়েছে। সেভাবেই ফোনটি আঁকড়ে ধরে বসে রইল মৌনতা। মস্তিষ্কে উল্টেপাল্টে যেতে লাগলো কিছু বিদঘুটে স্মৃতির পাতা। যেখানে ক্রমশই তার সুখের দিনগুলো মলিন হয়ে আসছে। সেই হাসিমাখা মুখের ইমরোজ পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। হাসির বদলে দেখা যাচ্ছে তার মধ্যে একরাশ বিরক্তি। এই পরিবর্তনে নায়েল আর তার অস্তিত্ব ক্রমশই অপম্রিয়মান। বুকের ভেতর জ্বলন সৃষ্টি হতে লাগলো। অসোহ্য জ্বলন! মৌনতা বুকটা খামচে ধরলো। পাঁচ আঙুলের ভাঁজে ভাঁজে শাড়ি যা নিঙরে জ্বলন দূর করার চেষ্টা করছে মৌনতা।
নিতান্তই ব্যার্থ চেষ্টা। বুকের বা পাশে থাকা হৃদয়টাকে নিঙরে সকল বেদনা দূর করতে পারলে শান্তি মিলতো।
অসোহ্য জ্বলন নিয়েই মৌনতা গুটিয়ে শুয়ে পড়ে মেয়ের পাশে। আলগোছে মেয়েকে টেনে বুকের মাঝে জড়িয়ে নেয়। নায়েল ঘুমের মাঝেই মাকে পেয়ে লেপের আড়ালে সেঁটে যায় মায়ের বক্ষমাঝারে, দু’হাতে জড়িয়ে ধরে মায়ের গলা। অবচেতনেও নায়েল মায়ের বুকের ভেতরটা থেকে সকল ব্যাথাদের শুষে নিলো সরবরাহ করে মাতৃত্বের সুখ। মৌনতার ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠলো তবে চোখে তার অযথাই অশ্রুরা ভীড় জমিয়েছে। সে মেয়েকে জড়িয়ে এলোপাথাড়ি চুমু খায় মেয়ের চোখেমুখে সাথে সাথেই টপটপিয়ে গড়িয়ে পড়লো কয়েক ফোঁটা অশ্রু।
আলিশান হোটেল রুমের কিং সাইজের বেডে ড্রিম লাইটের আলোয় আবছায়া দৃশ্যমান কম্ফোটারের আড়ালে দু’টো অর্ধনগ্ন দেহ। ড্রিম লাইটের আবছা আলোয় দৃশ্যমান পাপাচারে লিপ্ত দুটি মুখ। পরকিয়া শব্দটি হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণ্যতম একটি শব্দ। এর থেকে নিকৃষ্ট অর্থ বহনকারী শব্দ আর কোন শব্দ হতে পারে না। দুই দিনের এই পৃথিবীতে সৃষ্টিকর্তা আমাদের সামনে কতো ধরনের উদাহরণ তুলে ধরে— তবুও মানুষ অবুঝ, দূর্বল হয়ে পড়ে শয়তানের ধোঁকায়।
ঠোঁটে বাঁকা হাসি নিয়ে নগ্ন বুকটিতে থুতনি ঠেকিয়ে সৃজা অপলক তাকিয়ে আছে ইমরোজের দিকে।
–“মৌনতাকে খুব মিস করছিলে মনে হয়?”
ইমরোজের চেহারায় বিতৃষ্ণা, অসন্তোষ অস্থিরতা স্পষ্ট। যেটা আরো বৃদ্ধি পেল সৃজার কথায়। ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে পড়ে মৌনতার ফোন আসলেই। যতক্ষণ মৌনতার সাথে কোন যোগাযোগ না থাকে, বাইরে থাকে ততক্ষণ মস্তিষ্ক নির্দিধায় ধাবিত হয় সৃজার কাছে। কিন্তু যখনি মৌনতার ফোন আসে আর এইসব টিপিক্যাল বউদের মতো আবেগী কথা শোনে তখনি তার মস্তিষ্কে জেঁকে বসে সে ভুল করছে, মৌনতাকে ঠকাচ্ছে, নায়েলকে কষ্টের দিচ্ছে পরিবারকে ঠকাচ্ছে। মস্তিষ্কে বিভ্রাট লেগে যায়। যেটা আরো বেশি মেজাজ খারাপ করে ইমরোজের এর জন্যই সে বাড়িতে বেশি থাকে না, মৌনতার সাথে যোগাযোগ করে না। তাহলেই সে শান্তিতে সৃজার মাঝে নিমগ্ন হতে পারে। বিক্ষিপ্ত মেজাজ নিয়েই ইমরোজ হাতের ফোনটা ছুঁড়ে মারল বেড সাইড টেবিলের উপর। সৃজাকে আগলে নিতে নিতে মেজাজ নিয়ে বলল,
–“তেমন কিছু না। এতদিন পরে ফোন দিয়েছে একটু নরম কন্ঠে কথা তো বলতেই হতো তাই না?”
–“কেন? কেন বলতে হবে ওর সাথে নরম কন্ঠে কথা?”, সৃজা চোয়াল শক্ত করে শুধায়।
ইমরোজ বিরক্ত হলো। বিরক্তি নিয়ে বলল, –“কথা বাড়িও না সৃজা।”
–“তুমি কি ডাবল টাইমিং করতে চাইছো ইমরোজ? ঘরে বউ রাখবে আর বাইরে প্রেমিকা? দুদিকেই তোমার মজা। আর আমি? আমি কি সারাজীবন এভাবেই থেকে যাব? ওর সাথে যখন থাকবে না, তখন ওকে ছেড়ে দিচ্ছ না কেন? আমি আমার সম্মান চাই। আমি সিকদার বাড়ির মেজো বউয়ের সম্মান চাই।”, সৃজা শক্ত কন্ঠে বলল।
–“বললেই হয়ে গেল না, সৃজা। আমি চাইলেই যেকোন সময় মৌনতাকে ছেড়ে দিতে পারি না। আম্মা এটা কোনদিন মেনে নিবে না। ঘরে তুলকালাম কাণ্ড বেঁধে যাবে যদি আমি শুধু শুধু মৌনতাকে ছেড়ে দেই। আমায় একটু সময় দাও। কোন সলিড রিজন তো বের করতে দাও? নয়তো আমি আম্মার সামনে তোমায় কি বলে দাঁড় করাব?”
–“এগুলোই বলে আসছ আজ এক বছর যাবৎ। নিজেকে ইদানিং আমার ঘৃণ্য লাগছে ইমরোজ। মনে হচ্ছে আমি কালপ্রিট, কারোর সংসার ভাঙছি। আমি সহ্য করতে পারছি না ইমরোজ।”, বলতে বলতেই সৃজা ন্যাকা সুরে নাক টেনে কেঁদে উঠল। ইমরোজ নরম হয়। সে সৃজার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলল,,
–“তুমি কেন কালপ্রিট হবে? কারোর সংসার ভাঙছো না তুমি। সংসার থাকলে তো সংসার ভাঙবে? আম্মার পছন্দে বিয়ে করাই ছিল আমার জীবনের ভুল। আম্মা তো আমার জন্য বউ আনেনি এনেছে ঘরের জন্য। সারাদিন ঘরের কাজ, পরিবারের খেয়াল রাখতে পারা একটা আনস্মার্ট সংসারী মেয়ে এনেছে। আজকালকার মেয়েরা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে কিভাবে নিজেদের ডেভলপ করছে। তোমাকেই দেখো! তুমি কতো স্মার্টলি চলাফেরা করো, ফিগার দেখো যে কারোর নজর কাড়বে, স্মার্টলি কথা বলো, জব করো, মিটিং হ্যান্ডেল করো। এমনি একটা লাইফ পার্টনার তো আমি ডিজার্ভ করি তাই না? কোন দিক থেকে অভাব আছে আমার? স্টাইলিশ, হ্যান্ডসাম, অর্থবিত্তে আমি পরিপূর্ণ— তবে আমি একজন পার্ফেক্ট জীবনসঙ্গীর সুখ থেকে নিজেকে কেন বঞ্চিত করব? আমি শিঘ্রই কোন একটা ব্যাবস্থা করব। তুমি হবে সিকদার বাড়ির মেজো বউ, নায়েলের স্মার্ট মা, ইমরোজ সিকাদারের স্ত্রী সৃজা সিকদার।”
–“তুমি সত্যি বলছো?”, সৃজা আবেগে আপ্লুত হয়ে ইমরোজের গলা জড়িয়ে ধরে শুধায়।
–“একদম, তিন সত্যি।”
–“ওহ্ ইমরোজ আই লাভ ইউ! আই লাভ ইউ দ্যা মোস্ট।”, ওষ্ঠকোনে বাঁকা হাসি নিয়ে বললো সৃজা। দৃঢ় হাতে চোখের মেকি অশ্রু গুলো মুছে ফেলল। চোখের সামনে ভেসে উঠলো আলিশান সিকদার বাড়ি, সিকদারদের কোম্পানি। আর কিছুদিন তারপর এইসকল কিছুর ভাগিদার সেও হবে। মৌনতা যেমন অলংকারে আবৃত হয়ে রাজারানীর মতো সেজে থাকে, পুরো সিকদার বাড়ি সামলায় সেই অবস্থানটাও তার হবে। আনন্দের এক লহরী বয়ে গেল রক্ত কনিকায়। আনন্দিত চিত্তে দু’জনে ফের লিপ্ত হয় পাপাচারে।
এক অস্বস্তিভরা অনুভূতি থেকে পালাতে ঘুম দারুণ সহায়তা করে তপোবনকে। ঘুমের মাঝে এতটাই প্রলুব্ধ হয় যে ইমামের আজান ও আজ আর কর্নকুহরে প্রবেশ করে না। রোজকার ফজরের সময়ে ঘুম ভেঙে যাওয়ার অভ্যাস প্রবল হওয়ায় আজো একা একাই ঘুম ভেঙে গেল তপোবনের। তবে বেশ খানিকটা দেরি হয়ে গিয়েছে। কিছুটা হড়বড়িয়ে তপোবন পোশাক বদলে ফ্রেশ হয়ে জায়নামাজ নিয়ে বের হতে গেলেই চোখ আটকায় এক অস্বস্তিভরা অবয়বের দিকে। গতকাল রাতে যেভাবে গুটিসুটি মেরে বিছানার কিনারায় বসেছিল এখনো ঠিক সেভাবেই আছে। একচুল ও নড়েনি। হাঁটুতে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে, শীতে কুঁকড়ে একাকার অবস্থা! তপোবনের প্রত্যাহিক জীবনের শক্তি মিলিয়ে যেতে লাগল জীবনের এই অস্বস্তিকর মোড়ে এসে। যেই ঘরটায় আগে স্বস্তির ছড়াছড়ি ছিল, আজ সেই জায়গায় শুধুই অস্বস্তির ছড়াছড়ি!
অস্বস্তি নিয়েই তপোবন ধীর কদমে এগিয়ে যায়,
তানশানের মাঝে উঠতি বয়সের ছাপ। বয়সের এই টার্মটাতে তারমাঝে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে মানসিক এবং শারীরিক উভয় দিক থেকেই। তবে এই পরিবর্তন শারীরিক ভাবে পরিলক্ষিত হলেও, মানসিকভাবে এখন পর্যন্ত তেমন কোন পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়নি। মা বিহীন বাবা জুড়ে একটা সহজসরল জীবন তানশানের। এই জীবনে প্রথমবার তানশান এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। যেখানে জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টাতে তার গোটা জীবনটার মোড়-ই হয়তো ঘুরতে চলেছে। বাবার পাশে মা ব্যতিত অন্য কাউকে দেখা বিষয়টা এতটা অস্বস্তিকর হবে, তানশান শুরুতে বুঝতে পারে না। তাই তো সেদিন দাদুমনির কথাতে কতো অবলিলায় অন্য একজন নারীকে মা ডেকেছিল। কিন্তু সময় গড়ালে সে বেশ বুঝতে পারছে সে বিষয়টাকে যতটা সহজভাবে নিতে চেয়েছিল বিষয়টা ততই কঠিন। কেমন দম বন্ধকর পরিস্থিতি লাগে তার কাছে। মনে হয় যেনো এই তো একটু একটু করে দূরত্ব বাড়ছে বাবা আর তার মাঝে, কোথাও না কোথাও একটু হলেও জড়তা সৃষ্টি হয়েছে। এটা তানশান তখন উপলব্ধি করতে পারল যখন রোজ ভোর বেলার মতো আজও ঘুম থেকে উঠে বাবার ঘরে বাবাকে ডাকতে গিয়েছিল। কিন্তু বাবার ঘরের দরজা পর্যন্ত গিয়ে দেখল রোজকার ন্যায় দরজাটি খোলা নেই বরং বন্ধ ছিল। তখন সে বুঝতে পারল তাদের বাবা ছেলের জীবনটা আর আগের মতো নেই। তাদের মধ্যে হয়তো ক্ষুদ্র ফাটল দেখা দিয়েছে, যেটা ক্রমশই বৃদ্ধি পাবে। বাবার সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলা, হুটহাট বাবার ঘরে যাওয়া, বাবার সবকিছু জুড়ে আর সে থাকবে না এগুলোই মস্তিষ্কে জেঁকে বসলো।
রোজ সকালে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাবা, দাদুভাই, আর তানশান মসজিদে গিয়ে জামায়াতের সাথে নামাজ পড়ে পার্কে হাঁটতে যায়। আজো সেই অভ্যাসের জোরেই সে গিয়েছিলো বাবার কাছে। তবে প্রতিদিনকার এই নিয়ম আজ ভঙ্গ হওয়ায় তানশান নিরবে নিজের ঘরে চলে আসলো। ছেলে মানুষ কম আবেগপ্রবন হলেও তানশানের মতো বয়সী ছেলেদের মাঝে এটা ক্ষুদ্র এক ক্ষত সৃষ্টি করে। কিন্তু সেই ক্ষত যে নিছকই বয়সের দোষে তৈরি, সেটা অপ্রকাশিতই রয়ে গেল— যখন তপোবন তাড়াহুড়ো করে ছেলের ঘরে ঢুকল। তপোবন ছেলেকে তাড়া দিয়ে বলল,
–“তানশান আব্বু, লেইট হয়ে গেল তো! আমায় ডাকবে না? তাড়াতাড়ি এসো জামায়াত মিস হয়ে যাবে।”
একাকি মলিনতা আঁকড়ে বিছানায় গুটিয়ে বসে থাকা তানশানের মুখটিতে আপানাআপনি হাসি ফুটে উঠল। বাবার আগমনে একাকীত্ব বোধ দূর হয়ে গেল। চোখেমুখে উজ্জ্বলতা ছেয়ে গেল। সে মৃদু হেসে বাবার দিকে তাকিয়ে মাথা দুলিয়ে সায় জানিয়ে বলল,
–“চলো পাপা।”
তপোবন পা বাড়াতে গিয়েও আবার ফিরে আসলো। বরাবরের মতো সাদা পায়জামা পাঞ্জাবির সাথে জড়ানো গায়ের শাল’টি ভালো করে জড়াতে জড়াতে এগিয়ে যায় ছেলের কাবার্ডের কাছে। কাবার্ড থেকে একটা শীতের কান টুপি বের করতেই তানশান চোখ মুখ কুঁচকে নিয়ে তীব্র বিরোধ করে বলল,
–“নো পাপা, ওটা আমি পড়ব না। এটা পড়লে আমায় চোরের মতো দেখায়।”
তপোবনের মুখাবয়ব গম্ভীর হয়। গম্ভীর মুখে ছেলের নিকট এগিয়ে এসে টুপিটি পড়িয়ে দিতে দিতে বলল,
–“শীতের চেয়ে কি স্টাইল বেশি গুরুত্বপূর্ণ? স্টাইল পড়ে করবে, আগে শীত নিবারণ করে নাও। নয়তো ঠান্ডায় কান ব্যথা করবে তখন তোমার সব স্টাইল ভ্যানিশ হয়ে যাবে। আর তাছাড়া এই সকালে তোমায় কেউ দেখতে আসবে না।”
তানশান মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে রইল। তপোবন মৃদু হাসলো তানশানের গোমড়া মুখটি দেখে। শীতের প্রকোপে লাল হওয়া নাকটি দুই আঙুলের ডগায় চেপে দিয়ে বলল,
–“হয়েছে আর মুখ গোমড়া করতে হবে না এখন চলো। একটু রোদ উঠলেই এটা খুলে ফেলবে।”
তানশান হাসলো না মুখ গোমড়া করেই বাবার হাত ধরে মসজিদের উদ্দেশ্যে বের হয়। নামাজ পড়ে বাবা, দাদুভাইয়ের সাথে হাদিস পার্কে হাঁটা হাঁটি করে। পরিবর্তিত জীবনের প্রথম সকালটা এমনি অপরিবর্তিত ছিল তানশানের। তবুও মন থেকে শঙ্কা যায় না, যায় না মনের ভেতরে চলা দ্বন্দ্ব মায়ের জায়গায় অন্য কাউকে সে দেখতে পারছে না। সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির থেকে দূরত্ব তৈরি হওয়ার সেই তীব্র অবর্ণনীয় ক্লেশ গ্রাস করতে লাগলো তানশানের মস্তিষ্ক।
বইয়ে পরিপূর্ণ কলেজ ব্যাগের পরিবর্তে কাঁধে উঠেছে আঁচল। কলেজ ইউনিফর্মের পরিবর্তে বদনে শোভা পেয়েছে দামী শাড়ি। গলায় কলেজ কার্ডের পরিবর্তে জড়িয়েছে ভারী স্বর্নালংকার। হাতে কলমের পরিবর্তে আঁকড়ে ধরেছে স্প্যাচুলা। রূপকথা ঝাঁপসা নিস্পলক দৃষ্টিতে মনোযোগ সহকারে দেখছে স্প্যাচুলাটি। সেখান থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সে তাকায় কিচেন কেবিনেটের উপর বড়ো বড়ো মাছ, কেটে রাখা মুরগি, গরুর মাংস সবজি। মাথায় ঘুরছে শাশুড়ির বলে যাওয়া লম্বা একটি ফর্দা। যেখানে একাধিক খাবারের আইটেমের নাম বলা হয়েছে যেগুলো তাকে রান্না করতে হবে একা হাতে। যার অর্ধেকটার নাম ই তার মনে পড়ছে না। এই বাড়ির একটি নিয়ম হলো বিয়ের পর শশুর বাড়িতে প্রথমদিন সকল রান্না করতে হয় নতুন বউকে।
এবং বাড়ির বড়ো বউ হিসেবে রূপকথাকেও আজ এই নিয়ম পালন করতে হবে। বাড়িতে বসে শুধু তিনজনের জন্য রান্না করতো সেটাও মাঝেমধ্যে। কিন্তু তাতে কখনো মাছ, মাংস রান্না করার সৌভাগ্য হয়নি। আলু ভর্তা, ডাল, শাক সবজি রান্না করেছে। এতো গুলো মানুষের জন্য এতোকিছু রান্না কিভাবে করবে সে? মস্তিষ্কে শুধু এটাই ঘুরপাক খাচ্ছে না। ছোট্ট মস্তিষ্কে এখন অনেক কিছু ঘুরপাক খায়। মা বোন কেমন আছে? আদৌ কি ঠিক আছে? কিভাবে আছে? রাগ দেখিয়ে চলে তো আসলো তবে কতোক্ষণ রাগ ধরে রেখে কথা না বলে থাকতে পারবে? এক রাতেই তো তার দম বন্ধকর অবস্থা হয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা তারা কি ভাবছে রূপকথার কথা? একটাবার ভাবছে কি রূপকথার উপর এই বিশাল দায়িত্ব যে উঠিয়ে দিল, এটা তার ছোট্ট রূপকথা সামলাবে কি করে? একটাবার কেউ ভাবলো না সদ্য যৌবনে পা দেওয়া মেয়েটির মনে কত রঙিন স্বপ্ন বুনেছিল যেগুলো নিমিষেই ধূসর বর্ণে রূপান্তরিত হয়ে গেল।
–“কথা?”, কারো ফিসফিস কন্ঠস্বরে রূপকথা সপ্রতিভ চাহনিতে তাকায় নিজের পাশে সদ্যই দাঁড়ানো মৌনতার দিকে। মৌনতা এদিক ওদিক সতর্ক দৃষ্টি ফেলে শুধায়,,
–“তুমি রান্না করতে পারো না, তাই না?”
রূপকথা নিরবে না বোধক মাথা নাড়লো। মৌনতা স্মিত হাসলো। রূপকথার মাথার হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,,
–“সমস্যা নেই আজকের দিনটা একটু কষ্ট করে রান্না করো। এরপর থেকে আর তোমায় রান্না করতে হবে না। আজ তো এটা নিয়ম, মানতেই হবে।”
বলেই মৌনতা হাতে থাকা একটি নোটপ্যাড বের করে রূপকথার হাতে দিল।
–“এখানে আম্মা যা যা রান্না করতে বলেছে সব কিভাবে রান্না করতে হবে, কতটুকু পরিমানে কি দিতে হবে সব লেখা রয়েছে। তুমি শুধু দেখে দেখে এগুলো ঠিকঠাক ভাবে দেবে। পারবে না? না পরলে জবা তো আছেই, তোমায় সাহায্য করবে। আমি ওকে সব বলে দিয়েছি বুঝেছো?”
–“এখানে কি হচ্ছে?”, শাশুড়ির গম্ভীর কন্ঠে মৌনতা হতচকিত রূপকথার হাতে থাকা নোটপ্যাডটি তার শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে দিল। পেছনে ফিরতেই দেখলো নির্জনা বেগম দাঁড়িয়ে আছে গম্ভীর মুখে। শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে বিগলিত হেসে বলল,
–“কিছুনা আম্মা, নায়েলের জন্য নুডুলস রান্না করতে এসেছিলাম।”
–“তো সেটা করো অন্যের কাজে বা হাত ঢুকিয়ে দিও না। বড় বউমাকে তার নিজের কাজ নিজে করতে দাও। এই বাড়ীর বড় বউ সে, তাকে তার দায়িত্ব বুঝে নিতে দাও। সবসময় সংসার তোমার উপর থাকবে না-কি? তোমারো স্বামী, সন্তান রয়েছে তাদের সময় দিতে হয়। তুমি না থাকলে তো তাকেই এই সংসার সামলাতে হবে।”, রূপকথার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে বলল নির্জনা বেগম। মৌনতা মিহি স্বরে বলল,
–“জি আম্মা।”
–“তা বড় বউ মুখটি অমন বানিয়ে রেখেছো কেন? তোমার অমন বেজার, উদাসীন মুখ দেখে তো কারোর দিন ভালো যাবে না। আমার ছেলেটা এমনিতেই অনুশোচনায় ভুগছে তোমায় বিয়ে করে। আবার এমন মুখ করে তার অনুশোচনা বাড়িয়ে দিও না। তোমাকে তো আর কেউ জোর করে বিয়ে দেয়নি। আর না আমাদের এতো খারাপ দিন এসেছে যে কাউকে জোর করতে হবে। তাই বলছি মুখে হাসি ফোটাও! চলন, বাচনভঙ্গিতে,কাজে চঞ্চলতা, প্রফুল্লতা আনো। ঘরের গিন্নিরা হাসলে, হাসবে সংসার বুঝলে?” , নির্জনা বেগমের কথায় থাকা সূক্ষ্ম কটুক্তি নজর এড়ায় না রূপকথার। অন্তঃস্থলে তার তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
–“বদলে যাওয়া এই জীবনে তো সে এমনি কিছুর অপেক্ষায় ছিল। তবে কেন সে এখনো ভালোকিছুর আশা রাখছে সে? এই জীবনে তার চাওয়া পাওয়া, সুখ স্বাচ্ছন্দ্য তো গতকাল কবুল বলার সাথে সাথেই মরে গিয়েছে। তাহলে কেন এখন সে কষ্ট পাচ্ছে? কষ্ট পাওয়ার তো কথা নয়। না সে কষ্ট কেন পাবে? কোন কষ্ট পাচ্ছে না। তার জীবন এখন এটাই মানিয়ে নেয়া এবং এই সংসারের সকলের চাহিদা অনুযায়ী নিজেকে পরিবেশন করা। সে এখন অর্থবিত্ত, অবস্থানের কাছে হেরে যাওয়া এক তুচ্ছ মানুষ মাত্র! তাকে যে যেভাবে চালাবে, সে সেভাবেই চলবে।”
অন্ধকার, বিবর্ণ মুখটিতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। রূপকথা শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
–“আমি এমন কোন কাজ করব না, যার কারণে আপনার ছেলের অনুশোচনা আরো বেড়ে যায়। তার অনুশোচনা হচ্ছে শুনে আমার আরো নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। আমার কারণে কারোর অনুশোচনা হচ্ছে এটাও সম্ভব? আপনি চিন্তা করবেন না আমি সব কাজ করে নেবো। ”
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫
নির্জনা বেগমের দৃষ্টি আরো তীক্ষ্ণ হয়ে গেল রূপকথার দৃঢ় কন্ঠে বলা কথাটিতে। সে আর কোনরূপ কথা না বলে বেরিয়ে গেল রান্নাঘর থেকে। মৌনতাও বেরিয়ে গেল রান্নাঘর থেকে। সকলে বেরিয়ে যেতেই রূপকথা শাড়ির আড়াল থেকে নোটপ্যাডটি বের করল আর দেখে দেখে সবটা রান্না করল যা যা শাশুড়ি বলেছে। তবে এই যাত্রাপথটুকুতে জবার পুরো সাহায্য পেয়েছে রূপকথা। জবার খুব খারাপ লাগে রূপকথার জন্য সে তাকে আশ্বস্ত করে তার দ্বারা যতটুকু সম্ভব সে করবে। এমনিতেই চাচি প্রচুর রাগী তাকে চাচির রাগের তোপে পড়তে দেবে না সে।
