Home অস্তরাগের রঙ অস্তরাগের রঙ পর্ব ৫

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৫

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৫
তেজরিন উম্মীদ

খান বাড়ি থেকে যখন রুশদীদের বাড়ি ফিরল, ঘড়ির কাঁটা তখন রাত দুটোর ঘর ছুঁইছুঁই। সারাদিনের ধকল আর অনুষ্ঠানের কোলাহলে মাথাটা টিপটিপ করছিল। ঘরে ফিরেই রুশদী পোশাক বদলে একটা দীর্ঘ শাওয়ার নিল। ঠান্ঠা পানির ধারায় শরীরের ক্লান্তি কিছুটা ধুয়ে গেলেও সে বুঝতে পারছে, অবাধ্য মাইগ্রেনটা আবার প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে হাজির হচ্ছে। ধীরে ধীরে ব্যথাটা উঠছে।

ঘরের বাতি নিভিয়ে দিয়ে রুশদী অন্ধকারে নিজের বিছানায় গিয়ে বসল। বিছানা ঘেঁষেই বড় জানালাটা। জানালার গ্লাস দুটো খুলে দিতেই রাতের এক ঝাপটা হিমেল হাওয়া তার সত্তা ছুঁয়ে গেল। কিছু মুহূর্ত সে চোখ বুজে সেই প্রশান্তিটুকু অনুভব করল । এরপর চোখ মেলতেই দেখল দূরে রাস্তার সোডিয়াম বাতির হলদেটে আলোর নিচে একটা কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।

গোসল সেরে রুশদী চুলগুলো মোছেনি। ভেজা চুলের শীতলতা তার মাথার যন্ত্রণায় কিছুটা আরাম দিচ্ছে, মাইগ্রেনের সেই চিনচিনে ব্যাথা থেকে বাঁচতে এই কাজ করেছে। জলবিন্দুগুলো চুইয়ে পড়ে তার পিঠ ভিজিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। জানালার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে রুশদী উদাস হয়ে বসে রইল। তার স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ দূরের ওই সোডিয়াম আলোর দিকে। ঢাকা নগরীর এই জনমানবহীন রাস্তার দিকে তাকিয়ে সে অনমনেই বলে উঠল,
“জানালার গ্রাস ছুয়ে রুশদী বসে আছে একা,সোডিয়ামের আলোয় রাত আজ বড় বেশি ফ্যাকাশে আর আঁকা।
রাস্তার ওই নিয়ন বাতিগুলো যেন এক একটি নির্ঘুম চোখ,শহরের বুকে জমে আছে কত শত না বলা রোখ।
হলুদ আলোয় ভিজে যাচ্ছে রাজপথের নির্জন শরীর,অন্ধকারকে শাসন করে জেগে আছে অদ্ভুত এক নীড়।
কাঁচের ওপারে ওই আলোর মায়া,ফেলে রাখা স্মৃতির মতো দীর্ঘতর হয় মানুষের ছায়া।

সোডিয়ামের এই আলোয় শহরটা যেন এক মলাটবদ্ধ গল্প,যার প্রতিটি পাতায় রহস্য বেশি, আর উত্তর খুব অল্প।নিস্তব্ধ রাতের এই হলদেটে জাদুতে বিভোর রুশদীর মন,অপলক চেয়ে থেকে কাটছে তার এক অদ্ভুত নিশি-যাপন।”
‘টুং!’ ফোনের নোটিফিকেশনের শব্দ পেয়ে রুশদী পাশে ফিরে তাকলো।তোর ফোনের কিনে একটি মেসেজ উঠে রয়েছে,

“ফোন তুলিস না কেন? মেসেজ সিন করে রেখে দিস সমস্যা কি?আমি ২০ তারিখ দেশে আসছি।”
ওভাবেই মেসেজটি পড়ে নিল রুশদী। পড়ার পর তার মনে হলো না যে এর কোনো উত্তর দেওয়া প্রয়োজন, এমনকি মেসেজটা সিন করার তাগিদও সে অনুভব করল না। একরাশ বিরক্তি আর উদাসীনতায় সে ফোনটা হাতে নিয়ে সাইলেন্ট করে দিল। তারপর ডিসপ্লে নিচের দিকে দিয়ে ফোনটা বিছানার এক কোণে উল্টে রাখল।
সে জানে, মেসেজ সিন না করলে ওপাশ থেকে একটু পরেই ফোনের বন্যা বয়ে যাবে। সেই অযাচিত শব্দের ঝনঝনানি আর কৈফিয়ত দেওয়ার যন্ত্রণা থেকে নিজেকে বাঁচাতে ফোনটাকে দূরে সরিয়ে রাখল সে।

সারা রাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি শের। অস্থিরতায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে যখন ভোরের আজান কানে এলো, ঠিক তখনই রাজ্যের ঘুম এসে ভর করল তার চোখে। দেরিতে ঘুমানোর ফলে যখন তার ঘুম ভাঙল, ঘড়িতে তখন বেলা বারোটা। চোখ-মুখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসল সে। পাশেই আধশোয়া হয়ে ফোনে মগ্ন ছিল ফারাজ। শের একটা দীর্ঘ হাই তুলে শরীরের জড়তা কাটাল, তারপর আড়মোড়া ভেঙে বিছানা থেকে নামল।
ছেলের ঘুম ভাঙতে দেখে ফারাজ নরম সুরে জিজ্ঞেস করল, “ঘুম কেমন হলো?”

“টু মাচ খারাপ!”
ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল শের।ঘুমের রেশ কাটেনি বলে কিছুটা টলমলে পায়েই সে ভেতরে ঢুকল। ব্রাশ হাতে নিয়ে সে নিজেই দাঁত মাজতে শুরু করল। ওয়াশরুমের দরজা খোলাই ছিল। বাইরে থেকে ফারাজ অবাক হয়ে দেখল শের আজ একাই ব্রাশ। প্রতিদিন তো ফারাজকে নিজ হাতে ব্রাশ করিয়ে দিতে হয়।বিস্ময় কাটিয়ে ফারাজ দরজায় উঁকি দিয়ে বলল,
“আমাকে লাগবে?’
“নো নিড।”
“একা পারবে তো?”
শের গম্ভীর মুখে উত্তর দিল, “আমি বড় হয়ে গিয়েছি পাপা। নিজের কাজ আমি নিজেই করতে পারি, পাপা। এখন আর কারো প্রয়োজন হয় না।”
ফারাজ ফোনটা নামিয়ে ছেলের দিকে বড় বড় চোখে তাকাল। এক রাতের ব্যবধানে এত পরিবর্তন! গতকালও যে ছেলে বায়না করে তার হাতে ব্রাশ করেছে, আজ সে এমন বয়স্কদের মতো কথা বলছে কেন? ফারাজ বিস্ময় লুকিয়ে মুচকি হেসে বলল,

“ওকে, মিস্টার শের খান!”
শের নিজের হাতেই হাত-মুখ ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছে নিল। এরপর বাইরে এসে ফারাজকে বলল,
“পাপা, আমার ড্রেস বের করে দাও তো।”
“কেন? কোথায় যাবে তুমি?”
শের এবার রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে বলল,
“উফফ পাপা, প্রশ্ন করো না তো! আমার প্যান্ট আর ব্যাগি টি-শার্ট বের করে দাও, কুইক!”
ছেলের মেজাজ দেখে ফারাজ আর প্রশ্ন করল না।আলমারি জামা-কাপড় বের করে বিছানায় রেখে বলল,
“এসো, পরিয়ে দিচ্ছি।”
কিন্তু শের বিছানা থেকে জামাটা ছোঁ মেরে তুলে নিল। বলল,
“আমি একাই পরে নিচ্ছি।”

কথাটা বলেই সে পোশাক নিয়ে আবার ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। ফারাজ কোমরে হাত দিয়ে অবাক হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটার হলোটা কী? হঠাৎ এমন অদ্ভুত ব্যবহারের কারণটা ফারাজের ঠিক মাথায় খেলল না। ফরাজের মনে হচ্ছে, যেন অন্য এক শেরকে দেখছে সে।
পোশাক বদলে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে শের আয়নার সামনে দাঁড়াল। চিরুনি চালিয়ে পরিপাটি করে চুল আঁচড়ালো সে, মুখে মাখল ক্রিম। এরপর গলায় মোটা শিকলের মতো একটা চেইন পড়ে নিল। সবশেষে চোখে কালো চশমাটা চাপিয়ে পকেটে হাত দিয়ে স্টাইলের সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ফারাজ অবাক চোখে শুধু দেখে গেল হ ছেলের এই অদ্ভুত হিরো হিরো ভাবভঙ্গি দেখছিল।
শের রুম থেকে বেরিয়ে হনহনিয়ে শানের রুমের দিকে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে দেখা হয়ে গেল দাদি রাইমা খানের সাথে। তিনি আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“শের, কখন উঠলে দাদু?”
শের না থেমে সামনের দিকে এগোতে এগোতেই সংক্ষিপ্ত জবাব দিল,
“থার্টি মিনিটস আগে।”
“চল, কিছু খেয়ে নেবে।”
“টাইম নেই দাদু!”
রাইমা খানকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়েই শের তার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলল। রাইমা খানও অবাক হয়ে নাতির এই ব্যস্ততা দেখতে লাগলেন।
শানের রুমের দরজা খোলাই ছিল। শের অনায়েসে ভেতরে ঢুকে দেখল শান উপুড় হয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘরটা অন্ধকার, তবে জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা সামান্য আলোয় সবকিছু আবছা দেখা যাচ্ছে। শের গুটিগুটি পায়ে বিছানার কাছে গিয়ে একপ্রকার যুদ্ধ করে বিছানার উপর উঠে, শানের ওপর চড়ে বসল। এরপর শানের পিঠে ধাক্কা দিয়ে ডাকতে লাগল,

“এই ঝিংকু, ওঠ! একটা মিশন আছে।”
শান অঘোরে ঘুমাচ্ছে, কোনো সাড়া নেই। শের আবার তার পিঠে কিল মেরে বলল, “এই চাচু ওঠো, ডিলারের কাছে যাব।”
এবার শানের ঘুমটা হালকা হয়ে এলো। সে বুজে থাকা চোখে অস্ফুট স্বরে বলল, “কে ডিলার? কিসের ডিলার?”
“সিফু! সিফু ডিলার। ওর কাছে যাব, চল কাজ আছে।”
“শের, ডিস্টার্ব কর না তো… ঘুমাতে দাও”
শান অনুনয় করল।
“ওঠো বলছি, তুমু না উঠলে কিন্তু তোমার খবর আছে!”
শেরের জেদের কাছে শেষমেশ হার মানতে হলো শানকে। সাধের ঘুম বিসর্জন দিয়ে সে উঠে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর দুজনে বেশ পরিপাটি হয়ে তৈরি হয়ে যখন বের হতে চাইল, ঠিক তখনই আবার রাইমা খানের সামনে পড়ল তারা। তাদের এভাবে ফিটফাট হয়ে বেরোতে দেখে তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় যাচ্ছ তোমরা?”
এবারও কেউ থামল না। শের শুধু পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলল, “ডিলারের কাছে।”
“ডিলারের কাছে?” রাইমা খান বিড়বিড় করে কথাটা আওড়ালেন। মাথায় কিছুই ঢুকল না তার, এই ডিলারটা আবার কে? আর কিসেরই বা ডিলার? প্রশ্নগুলো তাকে করার সুযোগ না দিয়েই তারা নিমেষের মধ্যে পগার পার হয়ে গেল।

শান তার বাইকে শেরকে বসিয়ে রওনা হলো সিকদার কুঞ্জের উদ্দেশ্যে। খান বাড়ি থেকে প্রায় ত্রিশ মিনিটের পথ। তারা যখন সিকদার বাড়িতে পৌঁছালো, দেখল মস্ত বড় ড্রয়িং রুমটাই কেউ নেই। কাউকে খোঁজার প্রয়োজন বোধ না করে তারা সোজা চলে গেল সিফাতের ঘরের সামনে। ভেতর থেকে দরজা লাগানো। শের বাইরে থেকেই দরজায় কড়ানাড়তে শুরু করল আর হাঁক ছাড়ল,
“এই সিফু, দরজা খোলো। ”

সিফাত মানুষটা বরাবরই ঘুমকাতুরে। বেলা এখন দুপুর দুটো, কিন্তু তার ঘুমের নেশা কাটেনি। সারারাত প্যাঁচার মতো জেগে থেকে ভোরের আলো ফুটলে সে বিছানায় যায়, আর সেই ঘুম ভাঙে একদম মাগরিবের আজানের আগে। শেরের ছোট ছোট হাতের কড়ানাড়ায় সেই গভীর ঘুম ভাঙার কোনো লক্ষণই দেখা গেল না। ঠকঠক করতে করতে এক পর্যায়ে শের হাঁপিয়ে উঠলে শান নিজেই হাল ধরল। সেও জোরে জোরে সিফাতকে ডাকতে শুরু করল।
এই বিকট শব্দে সিফাতের ঘুম না ভাঙলেও শানের ফুপি শানজানা খান বেরিয়ে এলেন। অসময়ে শান আর শেরকে নিজের সামনে দেখে তিনি বেশ অবাক হলেন। কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন,
“তোরা? এই অবেলায় হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলি?”
শান কোনো কুশল বিনিময় না করেই বিরক্ত মুখে বলল, “ফুপি, এই সিফাতের বাচ্চা তো দরজা খুলছে না। কিছু একটা করো তো!”

“ও জেগে থাকলে তো দরজা খুলবে! এখনো হয়তো ঘুমের ঘোরে আছে। তোরা দাঁড়া, আমি ওর ঘরের চাবি নিয়ে আসছি,”
বলে শানজানা খান সিফাতের রুমের চাবি আনতে চলে গেলেন।
শানজানা খান চাবি এনে দিলে তারা দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।আর শানজানা তাদের জন্য নাস্তা পানির ব্যবস্থা করতে রান্না ঘরে চলে গেলেন।
সিফাতের রুমে পা রাখতেই এক বিদঘুটে গন্ধে শান আর শেরের দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। সারা ঘর ধোঁয়াটে হয়ে আছে, তার সাথে মিশে আছে উৎকট এক ঘ্রাণ। ঘুটঘুটে অন্ধকার আর পিনপতন নিস্তব্ধতার মাঝে কেবল এসির শোঁ শোঁ শব্দ আর সিফাতের হা করে নেওয়া নিশ্বাসের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। শান ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে সুইচ খুঁজে ঘরের বাতিগুলো জ্বালিয়ে দিল।

আলো জ্বলে উঠতেই ঘরের যে দৃশ্য ফুটে উঠল, তা দেখে দুজনেই হতভম্ব হয়ে গেল। মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য চিপসের প্যাকেট, রেডবুলের ক্যান, আর সেই সাথে দুই-তিনটি বিদেশি মদের খালি বোতল। বিছানাটা বিচ্ছিরিভাবে অগোছালো হয়ে পড়ে আছে, কিন্তু সিফাত সেখানে নেই। এদিক-ওদিক তাকিয়ে তারা দেখল, মেঝেতে কার্পেটের ওপর অদ্ভুত এক ভঙ্গিমায় আয়েশ করে অঘোরে ঘুমাচ্ছে সে।
শান একপ্রকার দৌড়ে সিফাতের কাছে গেল। পাশে হাঁটু গেঁড়ে বসে তাকে ধাক্কা দিয়ে ডাকতে লাগল,
“এই সিফাত! একি অবস্থা করে রেখেছিস ঘরের? তুই বাড়িতে কবে থেকে এসব নেশা শুরু করলি? ফুপি-ফুপা কিচ্ছু জানে না? এই সিফাত, ওঠ বলছি!”

কিন্তু সিফাতের কোনো হুঁশ নেই। সারারাত মদে বুঁদ হয়ে থাকার পর সে এখন চেতনার বাইরে। গতকাল রাতে সে শুধু বিদেশি অ্যালকোহলই নয়, সাথে কোকেনও নিয়েছিল। নেশার ঘোরে যখন ঘুম আসছিল না, তখন সে পাগলের মতো উচ্চমাত্রার দুটো ঘুমের ওষুধ গিলে ফেলেছিল। ওষুধ কাজ করতে শুরু করার পর সে যেখানে ছিল, সেখানেই এলিয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় এখন তার ঘুম ভাঙা একপ্রকার অসম্ভব।

শান যতবারই ডাকাডাকি করল, সিফাত ততবারই নিথর হয়ে পড়ে রইল। শানের মনে এবার ভয়ের স্রোত বয়ে গেল। বুকটা ধক করে উঠল,বাজে কোনো নেশার প্রতিক্রিয়ায় খারাপ কিছু ঘটে যায়নি তো? কাঁপা কাঁপা দুটো আঙুল সিফাতের নাকের কাছে ধরল সে। যখন আঙুলে উষ্ণ নিশ্বাসের ছোঁয়া পেল, তখন যেন শানের দেহে প্রাণ ফিরে এল। সিফাত হয়তো মাত্রাতিরিক্ত নেশা বা ড্রাগের জন্য জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে। দীর্ঘক্ষণ চেষ্টার পরও যখন কোনো সাড়া মিলল না, তখন শান হন্তদন্ত হয়ে নিচ থেকে পানি আনতে ড্রয়িংরুমের দিকে ছুটে গেল।

সে গেলে শের এসে সিফাত এর পাশে বসে।শের এর ঘুমের অভাবে ঘুম আসে না আর এখানে এই ঘুমের ডিলার কিভাবে ঘুমাচ্ছে,, ঘুম ভাঙানো যাচ্ছে না। আর শের একটু ঘুমালে বারবার ঘুম ভেঙে যায়। এই সিফু ডিলার বোধহয় অনেক অনেক দামি ঘুম কিনেছি। হ্যা সিফাতের এই ঘুমের দাম অনেক দামি, অনেক বেশি দামি। এক বতলের মদের দাম নিম্ন ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা হয়ে থাকে। এক গ্রামে কোকেন এর দামও ৫-৭ হাজার টাকা হয়ে থাকে। একটা ক্যান্ডির দাম ৩৫০ টাকা, তাহলে তো অবশ্যই সিফাতের এই ঘুমের নাম অনেক। এবং এই দামি ঘুমের জন্য সিফাতের অনেক দামী একটা জিনিস ব্যায় করতে হয় সেটা হচ্ছে সিফাতের নিজের জীবন! তবে সাড়ে চার বছরের শের ও সব বুঝবে কিভাবে?

শের তার সিফুর কাছে গিয়ে তার চুল গুলো টেনে বলল,”
“এই সিফু ! ওঠো তো আমি তোমার কাছ থেকে ঘুম কিনতে এসেছি। সিফু!সিফুর বাচ্চা………”
শেষে চিৎকার করে উঠলো শের। সিফাতকে এত ডাকাডাকির পরও তার ঘুম না ভাঙ্গায় বিরক্ত হয় সে।
ততক্ষণে পানি নিয়ে ঘরে ফিরল শান। শানজানা খানও ছেলের খোঁজ নিতে ভেতরে ঢুকতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ঘরের ভেতরকার অবস্থা দেখে তাকে বাইরেই আটকে দিল শান। দরজা বন্ধ করে সিফাতের কাছে এসে শান তার চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিতে লাগল। গালে আলতো থাপ্পড় মেরে ডাকল, “সিফাত ওঠ! এই সিফাত, ঠিক আছিস তো তুই?”

অবশেষে গভীর ঘুমের ঘোর কিছুটা কাটল। সিফাতের চোখের পাতা সামান্য নড়ল। শান পানি দেওয়া বন্ধ করে উদ্বেগের সাথে তাকিয়ে রইল। অনেক কষ্টে সিফাত চোখ মেলল, কিন্তু পুরোপুরি খুলতে পারল না। তার চোখ দুটো টকটকে লাল হয়ে আছে। নেশার ঘোর আর ঘুমের ওষুধের প্রভাবে চোখ খুলতে পারছে না। নিজের সামনে শানকে দেখে সে কিছুটা চমকে উঠল। উঠে বসার চেষ্টা করতেই টাল সামলাতে পারছিল না, শান তাকে ধরে বসাল।
সিফাত চোখ কচলাতে কচলাতে ঘুম কন্ঠে বিরক্তি নিয়ে বলল, “শালা, পানি দিয়ে তো একদম গোসল করিয়ে দিলি! কিন্তু তুই আমার ঘরে ঢুকলি কী করে?”

শান কড়া গলায় পাল্টা প্রশ্ন করল, “সেসব পরে বলছি। আগে বল, এসব কী শুরু করেছিস তুই? বাড়িতে বসে নেশা করছিস? রুমটাকে বার বানিয়ে রেখেছিস।রাতে ঠিক কী খেয়েছিলি বল তো? আধা ঘণ্টা ধরে তোর ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করছি, কোনো সাড়া নেই! কী খেয়েছিলি তুই?”
সিফাত একটা লম্বা হাই তুলে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বলল, “আরে, খাওয়া-দাওয়া করে ঘুম আসছিল না, পরে দাদুর দুইটা ঘুমের ট্যাবলেট খাইছি!” এটুকু বলেই খিলখিল করে হেসে উঠল সিফাত। এমনভাবে হাসল যেন সে দারুণ কোনো কৌতুক বলেছে। অথচ বিষয়টা মারাত্মক সিরিয়াস,একজন বয়স্ক মানুষের উচ্চমাত্রার ঘুমের ওষুধ খেয়ে তার মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারত।

শান এবার রেগে আগুন। বলল, “এই, কি পাগল হয়েছিস সিফাত? এত পাওয়ারফুল ওষুধ দুটো খেয়ে নিলি? এখন যদি তোর ঘুম না ভাঙত? কী সব করে বেড়াস বল তো!”
সিফাত নির্লিপ্তভাবে বলল, “আরে চিল! ঘুম না ভাঙলেই তো ভালো হতো। চিরতরে ঘুমিয়ে যেতাম, ঘুমের জন্য আর ওষুধ খেতে হতো না। ভালোই তো হতো, তুই চল্লিশার দাওয়াত খেতে পারতি।”
“সিফাত, তোর কি কোনো মানসিক সমস্যা হয়েছে? তোকে আমার সুস্থ মনে হচ্ছে না। মানসিক ভারসাম্যহীনদের মতো কথা বলছিস। ওঠ তো! তোর সাথে আজ প্যাঁচাল পাড়ার সময় নেই। যা, ফ্রেশ হ!”
সিফাত ওঠার নাম নেই। হাত-পা মোচড়ামুচড়ি করে ঘুম ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগল। এর মাঝে শের উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল, “এই সিফু ডিলার! তুমি এত দারুণভাবে ঘুমাও কীভাবে বল তো? তুমি কোথা থেকে ঘুম কেনো? আমার না ঘুম আসে না। আমার ঘুমটা বোধহয় অনেক সস্তা। তাই আমি তোমার কাছ থেকে ঘুম কিনতে এসেছি। আমাকে কিছু দামি দামি ঘুম দাও তো, যেন আমি অনেক অনেক ঘুমাতে পারি এবং দ্রুত ঘুমিয়ে যাই, আর আমার ঘুম সহজে না ভাঙে।”

সিফাত টলটল চোখে শেরের দিকে তাকাল। বলল, “ঘুম আসে না তোর?”
শের মাথা নেড়ে ‘হুম’ বলল।
“নে এটা খা, ঘুমে চোখে আর কিছু দেখবি না,”
বলেই পাশে পড়ে থাকা জ্যাক ড্যানিয়েলসের বোতলটা শেরের দিকে বাড়িয়ে দিল সিফাত।
শের না বুঝে বোতলটা নিতেই শান বিদ্যুৎগতিতে বোতলটা কেড়ে নিয়ে দূরে ছুঁড়ে মারল। মুহূর্তেই কাঁচের বোতল মেঝেতে পড়ে চুরমার হয়ে গেল। শান সিফাতের গালে সজোরে এক থাপ্পড় মেরে বলল, “শা*লা, পাগল হয়ে গেছিস নাকি? তুই ওকে কী খেতে দিলি? এটা খেলে ওর কী অবস্থা হতো?”
সিফাত তখনো সম্পূর্ণ নেশাগ্রস্ত। হুঁশজ্ঞান ঠিকমতো ফেরেনি। তাই শান আর বেশি কথা না বাড়িয়ে সিফাতকে টেনে তুলল। নিচে গিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দারুচিনি পানি আর লেবুর রস মিশিয়ে আনল। জোর করে সিফাতকে খাওয়াল, যাতে ওর নেশার ঘোরটা একটু কমে।

দেখতে দেখতে রুশদী আর ফারাজের বিয়ের দিন চলে এসেছে। মাঝে মাত্র একটা দিনের ব্যবধান, তারপরই শুরু হয়ে যাবে বিয়ের সব অনুষ্ঠান। রঙ খেলা, মেহেদী সন্ধ্যা, গায়ে হলুদ, তারপর সেই কাঙ্ক্ষিত বিয়ে এবং সবশেষে বউভাত।অনুষ্ঠানের দীর্ঘ তালিকা শুনেই রুশদীর মাথা চক্কর দিয়ে উঠছে। তার মনে হচ্ছে, পরীক্ষার প্রস্তুতির চেয়েও বিয়ের প্রস্তুতি যেন শতগুণ বেশি কঠিন। সে মনে মনে ভাবে, ‘এতসব ঝক্কি পোহানোর দরকারটা কী বাপু? সোজাসুজি বিয়ে করে বউভাতের দিন বউ পেটপুরে দু-মুঠো ভাত খেয়ে নিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়!’
কলেজ শেষ করে রুশদী আজ একটু দ্রুত পায়েই বাড়ির পথ ধরেছে। বাসায় গিয়ে তাকে রান্না করগে হবে। যদিও বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকে নাহিদা তাকে কোনো কাজ ছুঁতে দেন না, এমনকি রান্নাঘরের ত্রিসীমানায়ও ঘেঁষতে দেন না। নাহিদা নিজেও রাঁধেন না, সব কাজের ভার তুলে দিয়েছেন তার বয়স্ক মায়ের ওপর। সম্পর্কে তিনি সৎ নানী হলেও, এই বয়সে তাকে দিয়ে খাটানো রুশদীর একদম সহ্য হয় না। এছাড়াও, বয়সের ভারে নানী অনেক কিছু গুলিয়ে ফেলেন,কখনো তরকারিতে নুন দিলে হলুদ দিতে ভুলে যান,হলুদ দিলে তরকারিতে পানি দেন না, পানি দিলে নুন দিতে ভুলে যান।আবার প্রায় প্রতিদিনই খাবার পুড়ে কয়লা হয়ে যায়। সেই বেস্বাদ পোড়া তরকারি খাওয়ার চেয়ে নিজের হাতে রান্না করাটাকেই রুশদী বেশি ভালো বলে মনে করে।

“এই রুশদী, দাঁড়া!”
নিজের নাম শুনে রুশদী থমকে দাঁড়িয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে পেছনে তাকিয়ে দেখল, ধবধবে সাদা কলেজ ইউনিফর্ম পরা তিথি হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে আসছে তার দিকে। রুশদীর সামনে এসে তিথি দু-হাঁটুতে হাত দিয়ে ঝুঁকে পড়ল। ঘন ঘন নিশ্বাস নিতে নিতে লাগল। তার বুকটা ওঠানামা করছে। নিজেকে শান্তু করতে ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে কয়েক ঢোক পানি খেল সে।
রুশদীর হাতে একদম সময় নেই, তাকে দ্রুত বাসায় পৌঁছাতে হবে। তাই কিছুটা তাড়া দিয়ে সে বলল, “কিছু বলবে তিথি? এভাবে ডাকলে কেন?”

তিথি পানির বোতলটা ব্যাগে পুরে খানিকটা অনুযোগের সুরে বলল, “এই রুশদী, তুই আমাকে সব সময় তুমি তুমি করিস কেন? এখন থেকে তুই করে বলবি। তুমি বললে কেমন জানি পর পর লাগে।”
রুশদী একটু হেসে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে। এবার বল, পেছন থেকে ওভাবে চিৎকার করে ডাকলি কেন?”
“তেমন কিছু না, এমনি। চল, যেতে যেতে কথা বলি।”
দুজন পাশাপাশি পা মিলিয়ে হাঁটতে শুরু করল। খানিকটা পথ যাওয়ার পর তিথি কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা রুশদী, আজ তোকে প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে দেখলাম। হাতে মনে হয় একটা অ্যাপ্লিকেশন ছিল। কিসের দরখাস্ত রে ওটা?”

রুশদী নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিল, “দশ দিনের ছুটির
জন্য দিয়েছি।”
তিথি আকাশ থেকে পড়ল। চোখ কপালে তুলে শুধালো, “দশ দিন! বলিস কী? এত লম্বা ছুটি কেন? কোথাও ঘুরতে যাবি নাকি?”
“না রে, কোথাও যাব না।”
“তাহলে এত ছুটির প্রয়োজন কী?”
রুশদী সোজা ওর চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “আমার বিয়ে।”
কথাটা শুনে তিথির মনে হলো রুশদী নির্ঘাত মজা করছে। ও হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলল, “যাহ! ফাজলামি করিস না তো। যা জিজ্ঞেস করেছি সত্যি করে বল।”

“আমি সিরিয়াসলি বলছি, সত্যিই আমার বিয়ে। বিশ্বাস না হলে এই দেখ এনগেজমেন্ট রিং।”
বলেই নিজের বাম হাতটা তিথির সামনে মেলে ধরল। আংটিটা রোদে চিকচিক করে উঠল। তিথি থমকে দাঁড়িয়ে গেল, সেই সাথে রুশদীও। তিথি বড় বড় চোখ করে আংটিটার দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েক মুহূর্ত পর বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল, “সত্যি তোর বিয়ে? তার মানে একদম সত্যি? কিন্তু কার সাথে?”
“মজা কেন করব রে? সত্যি আমার বিয়ে। পাত্র শারফারাজ খান। চিনিস তো মনে হয়?”
শহরের খুব কম মানুষই আছে যারা প্রভাবশালী মন্ত্রী পরিবারকে চেনে না। নামটা শুনেই তিথি যেন বড়সড় এক ধাক্কা খেল। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “মন্ত্রীর বড় ছেলে শারফারাজ খান?”
“হুম!” ছোট করে উত্তর দিয়ে রুশদী আবার হাঁটতে শুরু করল।

তিথিও ওর সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটছে ঠিকই, কিন্তু ওর মাথায় তখন একরাশ বিস্ময় আর প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তিথি ইতস্তত করে বলল, “কিন্তু শারফারাজ খান তো বিবাহিত ছিলেন, ওনার তো একটা ছোট ছেলেও আছে, তাই না?”
রুশদী বলল, “ওনার অনেক আগেই ডিভোর্স হয়ে গেছে। আর ওনার ছেলে আছে তো কী হয়েছে? এটা তো আমার জন্য আরও ভালো! কোনো ঝক্কি ছাড়াই একদম রেডিমেড একটা কিউট বাচ্চা পেয়ে যাচ্ছি। আর পুচকিটা তো বেশ বড়ই হয়েছে, প্যাম্পাস পাল্টানোর ঝামেলাও পোহাতে হবে না।”
তিথি এবার যেন একটু দমে গেল। অবাক হয়ে বলল, “তাই বলে তুই জেনে-বুঝে একজন ডিভোর্সি মানুষকে বিয়ে করবি? আর ওনার বয়স তো তোর চেয়ে ভালোই বেশি।”

রুশদী এবার একটু থামল। তিথির দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখ তিথি, ওনার ডিভোর্স হয়েছে মানে এই নয় যে মানুষটা খারাপ। আমাদের সমাজে ডিভোর্সটা এখন খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। আর আমি তো কোনো সতিনের সংসার করতে যাচ্ছি না, আমি আমার নিজের সংসারই করব। আর বয়সের কথা যদি বলিস, ওনার বয়স দিয়ে তো আমি খাটা খাব না! বর্তমানে এইটুকু এজ গ্যাপ খুবই স্বাভাবিক। তাছাড়া আমার বরাবরই ম্যাচুড মানুষ পছন্দ। সব মিলিয়ে সে আমার জন্য একদম পারফেক্ট।”

তিথি আর কথা বাড়াল না। বিয়েটা রুশদী করছে, সে নয়। রুশদী যখন সবকিছু জেনে-বুঝেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তার কোনো আপত্তি নেই, তখন অন্য কারো কিছু বলার অবকাশ থাকে না। তিথি বুঝতে পারল, রুশদী যথেষ্ট ম্যাচুয়েড এবং নিজের ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা তার আছে। তাই সে প্রসজ্ঞ পাল্টে কিছুটা অভিমানের সুরে বলল,
“আচ্ছা, সব না হয় বুঝলাম। কিন্তু তুই নিজে থেকে আমাকে বিয়ের কথা একবারও জানালি না কেন? তুই কত খারাপ রুশদী! নিজের বিয়ের দাওয়াতটুকুও আমাকে দিলি না? এই বুঝি তোর বন্ধুত্ব? যা, তোর সাথে আমার আড়ি!”
আসলে রুশদীর বন্ধুর সংখ্যা হাতেগোনা আবার নেই বললেই চলে। পড়াশোনায় তুখোড় আর দেখতে সুন্দরী হওয়ায় অনেকেই তাকে মনে মনে হিংসে করে। রুশদীও কিছুটা অন্য স্বভাবের।সেও কারো সাথে অহেতুক যেচে কথা বলতে যায় না।তাই নিজের ব্যক্তিগত কথা শেয়ার করার মতো তেমন কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু তার নেই বললেই চলে। তবে তিথিকে হয়তো বলা উচিত ছিল। রুশদী মুখে স্বীকার না করলেও, মেয়েটা তাকে মনেপ্রাণে নিজের প্রিয় বন্ধু ভাবে। প্রতিদিন ক্লাসে আগেভাগে এসে রুশদীর জন্য সিট ধরে রাখা, একা একাই রুশদীর সাথে রাজ্যের গল্প করা। রুশদী মাঝেমধ্যে এড়িয়ে চললেও তিথি নাছোড়বান্দা।

তিথির এমন অবুঝ অভিমান দেখে রুশদীর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে নরম গলায় বলল, “আসলে সবকিছুর চাপে ভুলেই গিয়েছিলাম রে! যাহ, এখন তো দাওয়াত দিলাম। আজই ব্যাগ গুছিয়ে আমার বাসায় চলে আসবি। বিয়ের সব অনুষ্ঠান শেষ হলে তবেই তোর ছুটি।”
তিথি এবার গাল ফুলিয়ে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আমি এখন ধরলাম বলে দাওয়াত দিচ্ছিস! আগে তো মনেই ছিল না। আচ্ছা যা, তোর জন্য মেনে নিলাম। কিন্তু দাওয়াতের কার্ড কই? কার্ড দে!”
রুশদী এবার তিথির চোখের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, “কাকে কার্ড দেব? দূরের মানুষকে কার্ড দিয়ে নিমন্ত্রণ করতে হয়, তুই কি আমার দূরের কেউ? তুই তো আমার আপন মানুষ, তোর জন্য আবার কার্ড কিসের?”
রুশদীর মুখে এই ছোট্ট কথাটি শুনে তিথির মনটা মুহূর্তেই ভালো হয়ে গেল। এক নিমিষেই ধুয়েমুছে গেল সবটুকু রাগ আর অভিমান। খুশিতে তার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। রুশদী আলতো করে তিথির কাঁধে হাত রাখল, তিথিও রুশদীকে জড়িয়ে ধরল। এরপর দুই বন্ধু করতে করতে বাড়ির পথ ধরল।

দিনটি রুশদী ও ফারাজের হলুদের দিন। গত কয়েকদিনের একের পর এক অযথা করা অনুষ্ঠানে দুজনেই চরম বিরক্ত। কখনও রঙ খেলা, কখনও মেহেদী সন্ধ্যা,সবকিছুতেই তাদের যেন সং সেজে বসে থাকতে হচ্ছে।
— খান বাড়ির চিত্র —

ওদিকে ফারাজকে নিয়ে এক এলাহি কাণ্ড বেধেছে। বাড়ির বড়রা মিলে তাকে অনেক জোরাজুরি করে ধবধবে সাদা লুঙ্গি আর সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরিয়েছিলেন। কিন্তু ফারাজ নাছোড়বান্দা, সে এসব কোনো মতেই পরবে না। তার সোজা কথা লুঙ্গি সামলানো তার কর্ম নয়, হুটহাট খুলে গিয়ে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেলে তখন সামলাবে কে? অনেক ধস্তাধস্তি আর মান-অভিমানের পর ফলাফল হলো শূন্য।ফারাজ এসব লুঙ্গি গেঞ্জি পরলেও আবার টা খুলে ফেলে।
ফারাজের ফুপি শানজানা খান আর ফারাজের খালা রিমা চৌধুরী দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করলেন জেদি ভাগনাকে বোঝাতে। কিন্তু ফারাজের মতো ঘাড়ত্যাড়া মানুষকে বোঝানো আর যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করা যেন একই কথা। শেষমেশ তারা দুজন হার মানলেন। ব্যর্থ হয়ে তারা আবদার করলেন, “আচ্ছা তোকে লুঙ্গি পরতে হবে না অন্তত সাদা পাঞ্জাবিটা পর। ”

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৪ (২)

এবার ফারাজ কিছুটা নরম হলো। পাঞ্জাবি পরতে তার অন্তত কোনো আপত্তি নেই। পরিপাটি করে সাদা পাঞ্জাবি পরে সে তৈরি হয়ে নিল। হলুদের অনুষ্ঠানটি খান বাড়ির বিশাল লনে হবে, আর বিয়ে ও বউভাতের আয়োজন হবে শহরের একটি বড় রিসোর্টে।

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৬