আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২১
সাবিলা সাবি
রাত তখন গভীর।
লন্ডনের ডকইয়ার্ডের বিস্তীর্ণ শিল্পাঞ্চল ঘন অন্ধকারে ডুবে আছে। সারি সারি পরিত্যক্ত ওয়্যারহাউস, বিশাল কার্গো কনটেইনার আর দূরে নোঙর করা মালবাহী জাহাজগুলোকে ঘিরে ছড়িয়ে আছে এক চাপা নীরবতা। মাঝেমধ্যে টেমসের দিক থেকে ভেসে আসা ঠান্ডা বাতাস মরিচা ধরা লোহার দরজায় ধাক্কা খেয়ে কর্কশ শব্দ তুলছে।
এই নীরবতার আড়ালেই বহু বছর ধরে চলেছে শত শত নিরীহ মেয়ের জীবন নিয়ে নির্মম বাণিজ্য।
আজ…
সেই রুটেই অপেক্ষা করছে ভাইপার।
একটি কালো এসইউভি শব্দহীনভাবে এসে থামল ওয়্যারহাউস থেকে খানিকটা দূরে।
দরজা খুলে একে একে নেমে এল ইভানা, মার্ক, জ্যাক এবং তাদের টিমের বাকি সদস্যরা। সবার গায়ে কালো ট্যাকটিক্যাল পোশাক, কোমরে অস্ত্র, কানে কমিউনিকেটর আর প্রত্যেকের চোখে একইরকম সতর্কতা।
সবশেষে গাড়ি থেকে নামল হিয়া। তার মুখের নিচের অংশ কালো মাস্কে ঢাকা। ঠান্ডা বাতাসে কপালের পাশে নেমে আসা চুলের গোছাগুলো আলতো দুলে উঠল।রাতের অন্ধকারেও তার চোখ দুটো ছুরির ধার মতো তীক্ষ্ণ। চারপাশে ধীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে কয়েক সেকেন্ড পুরো এলাকাটা পর্যবেক্ষণ করল। দূরের ওয়্যারহাউসের ভেতরে ট্রাক ঢোকার ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে।
হিয়া কব্জিতে বাঁধা কমিউনিকেটরে স্পর্শ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল পরিচিত কণ্ঠ।
— “ভাইপার।”
হিয়ার কণ্ঠ শান্ত, অথচ দৃঢ়।
— “ইয়েস, বস।”
দানিয়েল কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে বলল,
— “সব ইউনিট পজিশনে আছে। অপারেশন শুরু করার অনুমতি দেওয়া হলো।”
হিয়া কোনো উত্তর দেওয়ার আগে দূরের গুদামঘরের দিকে আরেকবার তাকাল। তারপর নিচু স্বরে বলল,
— “কপি, বস।”
দানিয়েলের গলায় এবার কঠোরতা নেমে এল।
— “মনে রেখো, আজকের মিশনের প্রথম লক্ষ্য ওই মেয়েগুলোকে জীবিত উদ্ধার করা। তাদের একজনেরও কোনো ক্ষতি হওয়া চলবে না।”
একটু থেমে সে আবার বলল,
— “আর দ্বিতীয় লক্ষ্য… আসাদ খানের পুরো চালান আমাদের দখলে আনতে হবে। নগদ টাকা, অ/স্ত্র, ডকুমেন্টস, হার্ডড্রাইভ, লেজার যা কিছু ওর সাম্রাজ্যকে আইনের সামনে দাঁড় করাতে পারবে, সব।”
হিয়ার দৃষ্টি মুহূর্তেই শীতল আর হিসেবি হয়ে উঠল।
দানিয়েল ধীর স্বরে যোগ করল,
— “বহু বছর ধরে আসাদ খান নিজের হাত পরিষ্কার রেখে অন্যদের সামনে ঠেলে দিয়েছে। এবার তার নিজের সাম্রাজ্যই তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে।”
হিয়ার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
— “ডোন্ট ওরি, বস। আজকের রাতের পর আসাদ খানের হাতে কিছুই থাকবে না।”
— “গুড। আর একটা কথা…”
দানিয়েলের কণ্ঠ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।
— “প্রয়োজনে গু/লি চালাবে। কিন্তু প্রমাণ নষ্ট হতে দেবে না। আজকের অপারেশনের পর ওর পালানোর সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে।”
— “আন্ডারস্টুড, বস।”
সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতেই হিয়া ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
ইভানা, মার্ক, জ্যাকসহ পুরো টিম তার নির্দেশের অপেক্ষায়। হিয়া একে একে সবার মুখের দিকে তাকাল।
— “ইভানা, মেয়েদের উদ্ধার করার পর এক মুহূর্তও দাঁড়াবে না। সরাসরি সেফ হাউসে নিয়ে যাবে।”
— “ইয়েস, মিস্ট্রেস।”
— “মার্ক, পূর্ব পাশ কভার করবে।”
— “কপি মিস্ট্রেস।”
— “জ্যাক, পেছনের রুটে নজর রাখবে। একটা গাড়িও যেন বের হতে না পারে।”
— “আন্ডারস্টুড, মিস্ট্রেস।”
হিয়া শেষবার ওয়্যারহাউসের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন শিকারিকে ঘিরে ফেলা এক শিকারির নিখুঁত স্থিরতা।
পরের মুহূর্তেই সে হাতের ইশারা করল। পুরো টিম ছায়ার মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
আজকের রাত…
কেবল একটি উদ্ধার অভিযান নয়।
আজকের রাত থেকেই শুরু হবে আসাদ খানের সাম্রাজ্যের পতন।
মার্ক পূর্ব দিকের কনটেইনারগুলোর আড়াল ধরে এগিয়ে গেল। জ্যাক ঘুরে গেল ওয়্যারহাউসের পেছনের সার্ভিস রোডে, যাতে কেউ পালানোর সুযোগ না পায়। ইভানা নিজের টিম নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল নিরাপদ দূরত্বে। তাদের একমাত্র দায়িত্ব—ভেতরে আটক থাকা মেয়েদের জীবিত উদ্ধার করা।
হিয়া একা এগিয়ে এল মূল প্রবেশপথের দিকে।
ওয়্যারহাউসের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরের শব্দ শোনার চেষ্টা করল সে। ভারী কাঠের দরজার ফাঁক দিয়ে আলো বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে।
কয়েক সেকেন্ড পর সে আলতো করে ভাঙা কাচের জানালার কাছে গিয়ে নিচু হয়ে তাকাল। ভেতরের দৃশ্য দেখে তার চোখ আরও কঠিন হয়ে উঠল।
একপাশে গাদাগাদি করে বসিয়ে রাখা হয়েছে একদল তরুণীকে। কারও দুই হাত বাঁধা, কারও চোখ কান্নায় ফুলে লাল। ভয়ে কেউ মাথা নিচু করে বসে আছে, কেউ আবার নিঃশব্দে কাঁদছে।
আর ঠিক তাদের বিপরীতে ব্যস্ত কয়েকজন অস্ত্রধারী।
কেউ কাঠের বাক্সে একের পর এক আধুনিক রাইফেল ভরে সিল করছে। কেউ কালো ব্যাগে ডলারের বান্ডিল গুঁজে দিচ্ছে। আরেকজন ল্যাপটপ খুলে কিছু ফাইল একটি ছোট হার্ডড্রাইভে কপি করছে।
হিয়ার চোখ স্থির হয়ে গেল সেই হার্ডড্রাইভটির দিকে।
মৃদু স্বরে সে কমিউনিকেটরে বলল,
— “ভিজ্যুয়াল কনফার্মড। ভিকটিমস ইনসাইড। অস্ত্র, ক্যাশ আর ডাটা সব একই লোকেশনে আছে।”
ওপাশ থেকে দানিয়েলের কণ্ঠ ভেসে এল।
— “ভাইপার। হার্ডড্রাইভটা কিন্তু দরকার। ওটার ভেতরেই পুরো নেটওয়ার্কের তথ্য থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।”
হিয়া সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল,— “রজার।”
ঠিক তখনই ভেতরে দাঁড়ানো দাড়িওয়ালা একজন লোক ফোন কানে নিয়ে বলল,
— “হ্যাঁ, বস… সব প্রস্তুত। আর দশ মিনিটের মধ্যে চালান বের হয়ে যাবে।”
ফোনের ওপাশ থেকে কী বলা হলো বোঝা গেল না।
লোকটা আবার বলল,
— “চিন্তা করবেন না। মেয়েগুলোও আজ রাতেই দুবাই পৌঁছে যাবে।”
কথাটা শুনতেই হিয়ার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে ধীরে ধীরে কোমর থেকে নিজের পি/স্তল বের করল।
কমিউনিকেটরে শান্ত কণ্ঠে বলল,
— “সব ইউনিট… স্ট্যান্ড বাই।”
মার্ক, জ্যাক আর ইভানার উত্তর একসঙ্গে ভেসে এল—
— “রেডি, মিস্ট্রেস।”
হিয়া গভীর শ্বাস নিল।তার দৃষ্টি স্থির দরজার ওপর।
আর মাত্র একটি সংকেত…তারপরই এই নরক ভেঙে পড়বে। হিয়ার আঙুল ধীরে ধীরে ট্রিগারের কাছ থেকে সরে এল। সে জানে, এই মুহূর্তে একটা ভুল সিদ্ধান্ত পুরো অপারেশনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। ভেতরে থাকা মেয়েগুলো এখনো শত্রুদের মাঝখানে। গুলি শুরু হলে আতঙ্কে তারা যেকোনো দিকে ছুটে যেতে পারে। হিয়া চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড হিসাব করল। তারপর কমিউনিকেটরে নিচু স্বরে বলল,
— “প্ল্যান চেঞ্জ।”
ওপাশে মার্ক সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল,
— “কমান্ড?”
— “প্রথমে ভিকটিম সেফ। তারপর টার্গেট।”
হিয়ার কণ্ঠে কোনো দ্বিধা নেই।
— “মার্ক, ডান পাশের গার্ডগুলো তোমার। জ্যাক, পেছনের এক্সিট বন্ধ করো। কেউ যেন বাইরে বের হতে না পারে।”
— “কপি।”
— “ইভানা, আমার সিগন্যালের সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে ঢুকে মেয়েগুলোকে বের করবে।”
— “আন্ডারস্টুড।”
হিয়া আবার জানালার ফাঁক দিয়ে ভেতরে তাকাল।
লোকগুলো এখনো নিজেদের কাজে ব্যস্ত। তারা বুঝতেই পারছে না, তাদের চারপাশে মৃ/ত্যুর মতো নীরবে ছড়িয়ে পড়েছে ভাইপারের টিম।
একজন লোক বড় একটি ধাতব বাক্স বন্ধ করে তালা লাগাচ্ছিল।
— “এইটা আগে বোটে উঠাও। বসের নির্দেশ, কিছুই এখানে রাখা যাবে না।”
আরেকজন জিজ্ঞেস করল,
— “আর মেয়েগুলো?”
লোকটা ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল,
— “ওগুলো আলাদা গাড়িতে যাবে।”
কথাটা শুনে হিয়ার চোখে মুহূর্তের জন্য কঠিন আগুন জ্বলে উঠল। কিন্তু সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল। তার কাজ প্রতিশোধ নয়। তার কাজ ছিল সবাইকে নিরাপদে বের করা এবং আসাদ খানের সাম্রাজ্যের শিকড় তুলে ফেলা। হিয়া হাত উঠিয়ে সংকেত দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে—
ওয়্যারহাউসের পাশের দিক থেকে হালকা একটা শব্দ হলো। একজন পাহারাদার সন্দেহ নিয়ে সেদিকে এগিয়ে গেল।
— “কে ওখানে?”
লোকটা টর্চের আলো ফেলতেই অন্ধকার থেকে মার্ক বেরিয়ে এল। এক মুহূর্তের মধ্যেই পাহারাদার কোনো শব্দ করার আগেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। একই সময়ে জ্যাক পেছনের দরজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল।
হিয়া আর অপেক্ষা করল না।সে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ভেতরের লোকেরা তখনো কিছু বুঝে উঠতে পারেনি। পরের মুহূর্তে দরজা বিকট শব্দে খুলে গেল।
সবাই চমকে ঘুরে তাকাল। অন্ধকারের মাঝ থেকে ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করল হিয়া।তার চোখে ছিল বরফের মতো ঠান্ডা দৃষ্টি। একজন অস্ত্রধারী চিৎকার করে উঠল,
— “হু আর ইউ?”
হিয়া কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে মুখের মাস্কটা একটু নিচে নামাল। তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল,
— “যার নাম শুনলে তোদের মতো রাস্তার কুকুরদের বসের ঘুম হারাম হয়ে যায়।”
জায়গাটার বাতাস মুহূর্তেই ভারী হয়ে গেল। কেউ একজন ফিসফিস করে বলল—
— “ভাইপার…”
শব্দটা ছড়িয়ে পড়তেই সবার মুখের রং বদলে গেল।
কারণ তারা জানত—ভাইপার সামনে এলে পালানোর রাস্তা খুব কমই বাকি থাকে। কক্ষের ভেতর হঠাৎ এক অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো।
“ভাইপার” নামটা শুনেই লোকগুলোর মুখের আত্মবিশ্বাস বদলে গেল। কয়েক সেকেন্ড আগেও যারা নিজেদের শক্তিশালী মনে করছিল, এখন তারা প্রত্যেকেই সতর্ক দৃষ্টিতে হিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
একজন লোক দ্রুত কোমরের অস্ত্র বের করতে হাত বাড়াল। হিয়া তার আগেই নড়ে উঠল।
লোকটার হাত ধরে এক ঝটকায় তাকে নিজের দিকে টেনে আনল। তার ভারসাম্য নষ্ট হতেই হিয়া হাত ঘুরিয়ে অস্ত্রটা মেঝেতে ফেলে দিল। পরের আঘাতে লোকটা কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
আরেকজন পেছন দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করল। হিয়া শব্দ পাওয়ার আগেই তার উপস্থিতি বুঝে গিয়েছিল। সে শরীর ঘুরিয়ে আক্রমণ এড়িয়ে গেল, তারপর দ্রুত পাল্টা আঘাতে লোকটাকে মাটিতে ফেলে দিল।
তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল নিয়ন্ত্রিত। হিয়ার চোখে রাগ ছিল না, ছিল ঠান্ডা হিসাব। কারণ সে জানে, এখানে সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। ভেতরে এখনো নিরীহ মেয়েরা আটকা আছে।
এদিকে মার্ক আর জ্যাক দুই পাশ থেকে এগিয়ে এসে বাকি লোকগুলোকে নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করল।
কেউ অস্ত্র তুলতে চেষ্টা করল, কেউ দরজার দিকে ছুটল। কিন্তু বের হওয়ার আগেই জ্যাক পেছনের পথ আটকে দিল।
হিয়া কঠিন কণ্ঠে বলল,
— “কেউ এক পা নড়বে না।”
তার কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা ছিল যে কক্ষের সবাই থেমে গেল। হিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সেই লোকটার দিকে, যে কিছুক্ষণ আগে ফোনে কথা বলছিল।
ঠিক তখনই আবার লোকটার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—Boss.
লোকটা কাঁপা হাতে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আসাদ খানের কণ্ঠ ভেসে এলো,
— “ভাইপার যেহেতু ওখানে পৌঁছে গেছে। ওকে সামনেই ব্যস্ত রাখ। মূল চালান এখনই পেছনের গোপন রুট দিয়ে সরিয়ে ফেল। অস্ত্র, টাকা, সব প্রমাণ নিয়ে জঙ্গলের শেষ পথ ধরে বেরিয়ে যা। আর সুযোগ পেলে ভাইপারকে জীবিত ফিরতে দিস না।”
— “ওকে, বস।”
কল কেটে যেতেই লোকটা চোখের ইশারায় কয়েকজনকে নির্দেশ দিল।
মুহূর্তের মধ্যেই গুদামের পেছনের গোপন দরজাটা খুলে গেল। আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা লোকগুলো দ্রুত কাঠের বাক্সগুলো কাঁধে তুলে নিল। অস্ত্র, নগদ টাকা আর সব গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নিয়ে তারা জঙ্গলের শেষ রুট ধরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
আর বাকি লোকগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই গুদামে থেকে গেল, যাতে হিয়া আর তার টিমকে লড়াইয়ে ব্যস্ত রাখা যায়।
হিয়া তখনো সামনের লোকটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।লোকটার চোখে এখন আর আগের দম্ভ নেই। সে পিছিয়ে যেতে যেতে বলল,
— “তুই জানিস না কার সঙ্গে লড়াই করছিস।”
হিয়া শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে উত্তর দিল,
— “জানি। তাই তো এখানে এসেছি।”
লোকটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।
— “আমাদের ধরলেও কিছু হবে না। বসকে তুই কখনো ছুঁতে পারবি না।”
হিয়ার চোখ সরু হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, এই লোকটা শুধু সাধারণ কর্মী নয়। আসাদ খানের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকতে পারে।
ঠিক তখন ইভানা নিজের টিম নিয়ে ভেতরে ঢুকল।
— “মিস্ট্রেস, মেয়েগুলোকে বের করার ব্যবস্থা করছি।”
হিয়া মাথা নাড়ল।
— “তাদের নিরাপদে নিয়ে যাও।”
ইভানা মেয়েদের নিয়ে বেরিয়ে যেতে শুরু করল।
হিয়া চারপাশে চোখ বুলাল। তার দৃষ্টি আটকে গেল কয়েকটি খালি ধাতব বাক্সের ওপর। সে ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে বাক্সগুলোর ভেতর দেখল।
খালি।
তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
হিসাব অনুযায়ী এখানে আরও অনেক অস্ত্র, টাকা আর গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ থাকার কথা ছিল।
কিন্তু সেগুলোর কোনো চিহ্ন নেই। হিয়া নিচু স্বরে বলল,
— “এটা মূল জায়গা না…”
ঠিক সেই সময় কমিউনিকেটরে জ্যাকের কণ্ঠ ভেসে এলো।
— “বস, একটা সমস্যা হয়েছে।”
— “বল।”
— “পেছনের জঙ্গলের দিকে কিছু লোক পালিয়ে গেছে। তাদের সঙ্গে মূল চালান আছে। টাকা, অস্ত্র আর বাকি সবকিছু।”
হিয়া কয়েক সেকেন্ড নীরব রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
— “তাহলে আসল শিকার এখন শুরু।”
সে অস্ত্রটা শক্ত করে ধরল। তার দৃষ্টি মুহূর্তেই শীতল আর হিসেবি হয়ে উঠল।
ভাইপার এবার তাদের পিছু নেবে।
ওয়্যারহাউসের বাইরে বের হয়েই হিয়া চারপাশের অন্ধকার জঙ্গলের দিকে তাকাল।
রাত আরও গভীর হয়েছে। দূরের গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে হালকা বাতাস আসছে, কিন্তু সেই শান্ত পরিবেশের আড়ালে লুকিয়ে আছে বিপদের গন্ধ।
জ্যাক দ্রুত এগিয়ে এসে বলল,
— “বস, ওরা একসঙ্গে পালায়নি।”
হিয়া তার দিকে তাকাল।
— “কতগুলো রুট?”
— “তিনটা আলাদা পথ। উত্তর দিকের রাস্তা নদীর দিকে গেছে, পশ্চিমেরটা পুরোনো পাহাড়ি পথ, আর দক্ষিণের রুটটা জঙ্গলের গভীরে ঢুকে গেছে।”
হিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। এটা সাধারণ পালানোর চেষ্টা নয়। এত পরিকল্পিতভাবে আলাদা পথে ভাগ হয়ে যাওয়া মানে তারা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল।
মার্ক কমিউনিকেটরে বলল,
— “আমরা উত্তর দিকের পথটা নিচ্ছি।”
জ্যাক বলল,
— “আমি পশ্চিম রুট দেখছি।”
হিয়া মাথা নাড়ল।
— “সতর্ক থাকবে।”
ইভানা মেয়েদের নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হিয়া শেষবারের মতো চারপাশ দেখল।
তার ভেতরে একটা অস্বস্তি কাজ করছিল।
কেউ পালানোর সময় নিজের সব প্রমাণ, অস্ত্র আর টাকা নিয়ে এত পরিকল্পনা করে না, যদি না তার পেছনে বড় কোনো নির্দেশ থাকে।
অন্যদিকে, শহরের একটি গোপন স্থানে আসাদ খানের কাছে খবর পৌঁছে গেছে। তার একজন লোক ফোন রেখে নিচু গলায় বলল,
— “বস, ভাইটার বোধহয় এখানেই আসবেনা।”
আসাদ খান কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল। তার চোখে বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল।
— “আমি বলেছি, তাড়াতাড়ি সব প্রমাণ সরিয়ে ফেলতে। টাকা আর অস্ত্র একটাও ওদের হাতে যাওয়া যাবে না।”
লোকটা মাথা নাড়ল।
— “সব প্রস্তুত, বস।”
আসাদ ঠান্ডা গলায় বলল,
— “আর একটা কথা।”
সে থামল।
— “ভাইপার যেনো এই রাত পার করতে না পারে।”
লোকটার মুখে কঠিন হাসি ফুটে উঠল।
— “বুঝেছি, বস।”
এদিকে জঙ্গলের দিকে। হিয়া একা দক্ষিণের রুট ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। তার পায়ের শব্দও প্রায় শোনা যাচ্ছে না। অন্ধকারের মধ্যে সে প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ছায়া, প্রতিটি অস্বাভাবিক নড়াচড়া লক্ষ্য করছে।
কিছুদূর যাওয়ার পর সে থেমে গেল। মাটির ওপর নতুন পায়ের ছাপ। তার চোখ সরু হয়ে এল।
যারা এই পথ দিয়ে গেছে, তারা তাড়াহুড়ো করে যায়নি।
তারা অপেক্ষা করছে। হিয়া ধীরে ধীরে নিজের অস্ত্র ঠিক করল। ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটে উঠল।
— “পালাচ্ছিস না… আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিস।”
চারপাশের নীরবতা আরও ঘন হয়ে উঠল।
ঝোপের আড়ালে, গাছের ছায়ায় কয়েকজন মানুষ ইতিমধ্যে অবস্থান নিয়েছে। তাদের হাতে অস্ত্র।
তাদের একটাই নির্দেশ—ভাইপারকে শেষ করতে হবে।
আর হিয়া ধীরে ধীরে সেই ফাঁদের একেবারে মাঝখানে ঢুকে পড়ল। হিয়া বুঝতে পারছিল। এই পথটা স্বাভাবিক নয়। মাটির ওপর নতুন পায়ের ছাপ, ভাঙা ডালের চিহ্ন, চারপাশের অস্বাভাবিক নীরবতা—সবকিছুই বলছিল কেউ তাকে অপেক্ষা করে টেনে আনছে।
তবুও সে থামল না।
কারণ এতদূর এসে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আসাদের লোকগুলোকে পালিয়ে যেতে দিলে শুধু টাকা বা অস্ত্র নয়, অনেক মানুষের জীবন নিয়ে খেলা চলতেই থাকবে।
হিয়া নিচু স্বরে বলল,
— “ফাঁদ হলে হোক… শিকার শেষ না করে ফিরে যাওয়ার অভ্যাস আমার নেই।”
সে ধীরে ধীরে আরও গভীরে এগিয়ে গেল। জঙ্গলের ভেতরের অন্ধকার আরও ঘন হয়ে আসছিল। চারপাশে শুধু গাছের ছায়া আর বাতাসের শব্দ।
হিয়ার পা থেমে গেল। কিছু একটা বদলে গেছে।
তার প্রশিক্ষিত মন বিপদের সংকেত পেয়ে গেছে।
পরের সেকেন্ডেই তার শরীর নিজে থেকেই নড়ে উঠল।
পেছন থেকে ছুটে আসা আঘাত সে মাথা নিচু করে এড়িয়ে গেল। একজন লোক ভারি লোহার রড নিয়ে তার ওপর হামলা করেছিল।
হিয়া ঘুরে দাঁড়িয়ে লোকটার হাত চেপে ধরল। এক টানে তার ভারসাম্য নষ্ট করে অস্ত্রটা দূরে ছুড়ে দিল।
কিন্তু সে একা ছিল না। চারপাশের ঝোপ থেকে একে একে বেরিয়ে এলো আরও লোক।
একজন…
দুইজন…
তারপর আরও।
মোট নয়জন।
তারা ধীরে ধীরে হিয়াকে ঘিরে ফেলল।
একজন ঠান্ডা হাসি দিয়ে বলল,
— “ভাইপার… অনেক নাম শুনেছি তোর। আজ দেখা যাক নামের মতো শক্তি আছে কিনা তোর।”
হিয়া চারপাশে তাকাল। তার চোখে ভয় নেই। বরং রয়েছে স্থিরতা।
— “নয়জন?”
সে হালকা হাসল।
— “আরো বেশি আশা করেছিলাম।”
লোকগুলো একসঙ্গে এগিয়ে এল। প্রথমজন সামনে থেকে আঘাত করতেই হিয়া পাশ কাটিয়ে গেল। তার গতির সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন। একের পর এক আক্রমণ আসছে, কিন্তু প্রতিবারই সে শেষ মুহূর্তে সরে যাচ্ছে। তার শরীরের প্রতিটি নড়াচড়ায় বছরের পর বছর প্রশিক্ষণের ছাপ।
একজন পেছন থেকে ধরার চেষ্টা করল। হিয়া তার উপস্থিতি বুঝে গিয়েছিল। সে ঘুরে লোকটার হাত ধরে নিজের গতির ব্যবহার করে তাকে সামনে ছুড়ে দিল।
দুজন একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেল।কিন্তু বিশ্রামের সময় নেই।আরেকজন এগিয়ে এলো।তারপর আরেকজন। চারপাশে একসঙ্গে আক্রমণ।
হিয়া নিজের অবস্থান বদলাতে বদলাতে লড়াই চালিয়ে গেল। তারপর হঠাৎ—
কমিউনিকেটরে ঝিঁঝিঁ শব্দ হলো।
— “ভাইপার, তোমার সিগন্যাল দুর্বল হয়ে যাচ্ছে…”
দানিয়েলের কণ্ঠ ক্ষীণ হয়ে আসছে। হিয়া উত্তর দেওয়ার আগেই একজন তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
সে আঘাত এড়াল, কিন্তু ধাক্কায় কানের কমিউনিকেশন ডিভাইসটা খুলে মাটিতে পড়ে গেল।
শব্দ বন্ধ হয়ে গেল।দানিয়েলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
এদিকে অন্যদিকে—মার্ক আর জ্যাকও নিজেদের রুটে আটকে গেছে।
তাদের পথেও অপেক্ষা করছিল আসাদের লোকজন।
মার্ক দাঁত চেপে বলল,
— “ওরা আমাদের রুট জানত।”
জ্যাক চারপাশে তাকিয়ে উত্তর দিল,
— “এটা পালানোর পরিকল্পনা না… এটা ফাঁদ।”
তারা দুজন নিজেদের মতো করে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
আর দূরে, ইভানা ইতিমধ্যে উদ্ধার করা মেয়েদের নিয়ে নিরাপদ পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তার কমিউনিকেটরে দানিয়েলের সংযোগ আছে। সে জানে তাঁদের টিমের অন্যরা লড়াই করছে।
কিন্তু হিয়ার সিগন্যাল আর পাওয়া যাচ্ছে না।
ইভানা থেমে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
— “মিস্ট্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ নেই।”
দানিয়েলের কণ্ঠ ভেসে এলো,— “তার লোকেশন ট্র্যাক করার চেষ্টা করো।”
কিন্তু জঙ্গলের গভীরে, একা দাঁড়িয়ে হিয়া তখনো লড়াই করছে। নয়জনের মাঝখানে।কানের যোগাযোগ নেই।
কোনো সাহায্য নেই। শুধু নিজের দক্ষতা আর জেদ নিয়ে। কারণ ভাইপার জানে—
এই লড়াইয়ে হার মানার অর্থ শুধু তার পরাজয় নয়।
এর মানে আসাদ খানের হাতে আবারও জয় তুলে দেওয়া।
লড়াইটা তখন আরও নির্মম হয়ে উঠেছে।
জঙ্গলের ভেতর শুকনো পাতার ওপর পায়ের শব্দ, ধাতব অস্ত্রের সংঘর্ষ আর ভারী শ্বাসের শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে।
হিয়া একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে যাচ্ছে।
তার সামনে থাকা লোকগুলো বুঝে গেছে, শক্তি দিয়ে এই মেয়েকে সহজে হারানো যাবে না। তারা এবার কৌশল বদলাল। একজন সামনে থেকে মনোযোগ আটকে রাখল, আরেকজন পাশ কাটিয়ে পেছনে চলে গেল।
হিয়া দুজনের গতিবিধি বুঝতে পেরেছিল, কিন্তু একসঙ্গে এতগুলো আক্রমণ সামলাতে গিয়ে এক মুহূর্তের জন্য তার দৃষ্টি অন্যদিকে চলে গেল।
সেই সুযোগটাই কাজে লাগাল একজন।তার হাতে থাকা লোহার রডটা বাতাস চিরে হিয়ার দিকে এগিয়ে এলো।
পরের মুহূর্তে—
একটা ভারী আঘাত।
রডের আঘাতে হিয়ার মাথা ঝাঁকুনি খেল।কয়েক পা পিছিয়ে গেল সে। কপালের পাশ দিয়ে উষ্ণ রক্ত গড়িয়ে নামতে শুরু করল। চারপাশের লোকগুলো ভেবেছিল এবার সে পড়ে যাবে।কিন্তু হিয়া হাঁটুও ভাঙল না।
সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল।চোখের দৃষ্টি তখনও একই রকম কঠিন।একজন অবাক হয়ে বলল,
— “এত আঘাতের পরও দাঁড়িয়ে আছিস কিভাবে?”
হিয়া হাতের পেছন দিয়ে কপালের রক্ত মুছে নিল।
তার কণ্ঠ শান্ত।
— “আমাকে ফেলে দেওয়ার জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু লাগবে।”
কথা শেষ হওয়ার আগেই সে আবার এগিয়ে গেল।
শরীর ক্লান্ত হচ্ছে, মাথার আঘাতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে, তবুও তার গতি কমেনি।
একজন ছু/রি নিয়ে সামনে আসতেই হিয়া তার হাতের কবজি ধরে আক্রমণের দিক ঘুরিয়ে দিল। তারপর নিজের শরীরের ভার ব্যবহার করে তাকে মাটিতে ফেলে দিল। আরেকজন ভারী চাটু নিয়ে আঘাত করতে এলো।
হিয়া শেষ মুহূর্তে সরে গেল। অস্ত্রটা পাশের গাছে আঘাত করল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে লোকটার হাত থেকে অস্ত্রটা ফেলে দিল। তার প্রতিটি আঘাতের মধ্যে ছিল বাঁচার লড়াই।
এখানে কোনো নিয়ম নেই, কোনো সুবিধা নেই।
তার কাছে এই মুহূর্তে আর কোনো বন্দুক নেই, কোনো ব্যাকআপ নেই। শুধু নিজের প্রশিক্ষণ আর জেদ।
অন্যদিকে, দূরে মার্ক আর জ্যাকও নিজেদের লড়াইয়ে আটকে আছে।
তারা চেষ্টা করছে দ্রুত শত্রুদের সরিয়ে হিয়ার কাছে পৌঁছাতে। কিন্তু আসাদের লোকেরা সংখ্যায় অনেক বেশি।
জ্যাক কমিউনিকেটরে বলল,
— “মিস্ট্রেসের সিগন্যাল পাচ্ছি না।”
মার্ক দাঁত চেপে উত্তর দিল,
— “ওনার ডিভাইস পড়ে গেছে। আমাদের দ্রুত যেতে হবে।”
কিন্তু হিয়ার কাছে তখন বাইরের কোনো শব্দ পৌঁছাচ্ছে না। সে একাই দাঁড়িয়ে আছে নয়জনের সামনে।
র/ক্ত ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে, শ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। তবুও তার চোখে পরাজয়ের কোনো চিহ্ন নেই।
কারণ আসাদ খানের লোকেরা একটা বিষয় ভুলে গেছে—ভাইপারকে আহ/ত করা যায়। কিন্তু তাকে থামানো এত সহজ নয়।
অবশেষে লড়াই শেষ হয়েছে। জঙ্গলের সেই নির্জন অংশে এখন শুধু পড়ে আছে ভাঙা ডালপালা, ছড়িয়ে থাকা অ/স্ত্র আর নিস্তব্ধ কিছু দেহ।
নয়জন মানুষ।
একজনের পর একজন করে সবাইকে পরাস্ত করেছে হিয়া। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে নিজের দুর্বলতাকে প্রকাশ করেনি। কপাল বেয়ে র/ক্ত নেমে আসছিল, মাথার ভেতর তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছিল, চোখের সামনে বারবার অন্ধকার নেমে আসছিল। তবুও সে থামেনি।
হাতের ছু/রিটা এখনো শক্ত করে ধরে রেখেছিল সে।
কিন্তু শত্রুরা যখন আর দাঁড়িয়ে নেই, তখন শরীর আর নিজের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারল না।
হিয়ার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। চারপাশের গাছগুলো কেমন ঝাপসা লাগতে শুরু করল।সে চোখের পলক ফেলল কয়েকবার, তবুও দৃষ্টি পরিষ্কার হলো না।
মাথার আঘাত আর অতিরিক্ত র/ক্তক্ষরণে শরীরের শক্তি ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যাচ্ছে। হিয়া এক পা এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু পা আর আগের মতো সাড়া দিল না।সে নিজের ভারসাম্য ধরে রাখার চেষ্টা করল।
না, এখনো পড়া যাবে না।এখনো তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। কারণ সে ভাইপার। কিন্তু শরীরেরও একটা সীমা আছে।
হাত থেকে ছু/রিটা ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেল।
হিয়া নিজের কপালে হাত রাখল। আঙুলে লেগে থাকা র/ক্ত দেখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব নিচু স্বরে বলল,
— “এত সহজে হার মানবো না…”
কিন্তু কথাটা শেষ করার আগেই তার চোখ আরও ঝাপসা হয়ে এলো।চারপাশের শব্দ দূরে সরে যেতে লাগল।বাতাসের শব্দ, পাতার নড়াচড়া—সবকিছু মিলিয়ে যেতে লাগল।
হিয়া শেষ চেষ্টা করে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করল।
কিন্তু শরীর আর পারল না। ধীরে ধীরে তার হাঁটু ভেঙে গেল। সে মাটিতে পড়ে গেলো ধপাস করে। অন্ধকার জঙ্গলের মাঝে একা পড়ে রইল হিয়া।
হিয়া তখন মাটিতে পড়ে আছে।
শরীরের প্রতিটি অংশে ক্লান্তি জমে গেছে। মাথার আঘাতের যন্ত্রণা আর রক্তক্ষরণ তাকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিচ্ছে। মনে হচ্ছিল এই অন্ধকার জঙ্গল তাকে নিজের ভেতরে টেনে নিচ্ছে।
ঠিক সেই সময়—
ঝোপের আড়াল থেকে আবার একটা শব্দ এলো।
হিয়া নড়তে পারল না, কিন্তু তার প্রশিক্ষিত মন বুঝে গেল। সব শেষ হয়নি। আরও কেউ লুকিয়ে ছিল।
ধীরে ধীরে ছায়ার ভেতর থেকে একজন লোক বেরিয়ে এলো। তার হাতে পি/স্তল।
সে ঠান্ডা দৃষ্টিতে মাটিতে পড়ে থাকা হিয়ার দিকে তাকাল।
— “ভাইপার… শেষ পর্যন্ত তুমিও দুর্বল হলে।”
লোকটা পি/স্তল তুলল।
কিন্তু ট্রিগারে চাপ দেওয়ার আগেই চারপাশের অন্ধকার ভেদ করে একটা ছায়া ঝাঁপিয়ে পড়ল।
শ্যাডো।
সে মুহূর্তের মধ্যে লোকটার ওপর আক্রমণ করল।
লোকটা প্রস্তুত ছিল না। শ্যাডোর আঘাতে সে মাটিতে পড়ে গেল। একটার পর একটা আঘাত আসতে লাগল।
শ্যাডোর রাগ থামার নাম নেই।লোকটার মুখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। সে কোনোভাবে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু শ্যাডো তাকে সুযোগ দিল না।
লোকটার শরীর থেকে র/ক্ত বের হতে শুরু করল।
এক পর্যায়ে লোকটা কষ্ট করে নিজের পিস্তলের দিকে হাত বাড়াল। তার চোখে এবার অন্যরকম হিংস্রতা।
সে শ্যাডোর দিকে অস্ত্র তাক করার চেষ্টা করল।
হিয়া আধো বন্ধ চোখে সবটা দেখছিল। তার শরীর আর সাড়া দিতে চাইছিল না। কিন্তু শ্যাডোর দিকে তাক করা পিস্ত/লটা দেখেই তার ভেতরের শেষ শক্তিটুকু জেগে উঠল।
না।
এটা হতে দেওয়া যাবে না।
হিয়া নিজের শরীরকে জোর করে জাগিয়ে রাখল।
চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল, তবুও সে দাঁত চেপে নিজেকে সামলে নিল। ধীরে ধীরে হাতের ভর দিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করল। তারপর কষ্ট করে দাঁড়াল।
পাশেই পড়ে থাকা একটা ভারী গাছের গুঁড়ির দিকে তার চোখ গেল।শেষ শক্তিটুকু দিয়ে সে সেটা তুলে নিল।
লোকটা শ্যাডোর দিকে গুলি চালানোর আগেই—
হিয়া সমস্ত শক্তি দিয়ে গাছের গুঁড়িটা ছুড়ে মারল।
আঘাতে লোকটার হাতের দিক সরে গেল।পিস্তল মাটিতে পড়ে গেল।
হিয়া আর অপেক্ষা করল না।
সে এগিয়ে গিয়ে লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
আবার শুরু হলো লড়াই। যে শরীর কিছুক্ষণ আগে দাঁড়াতেও পারছিল না, সেই শরীর আবার নিজের সীমা অতিক্রম করে লড়ছে।
শ্যাডো হিয়ার দিকে তাকাল।
হিয়া কষ্টে শ্বাস নিতে নিতে বলল,
— “চলে যা …”
কণ্ঠ দুর্বল, কিন্তু আদেশের মতো কঠিন।
— “আমি বলছি, শ্যাডো… চলে যা।”
কিন্তু শ্যাডো নড়ল না।সে শুধু হিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।হিয়ার চোখে রাগ ফুটে উঠল।
— “আমার কথা শুনছিস না কেন?”
শ্যাডো কোনো উত্তর দিল না। শুধু তার কাছেই দাঁড়িয়ে রইল।
শেষ মুহূর্তে হিয়া লোকটার দিকে তাকাল। লোকটা আবারও পিস্তল তোলার চেষ্টা করছিল। কিন্তু এবার আর তাকে সুযোগ দিল না হিয়া।
শরীরের শেষ শক্তিটুকু একত্র করে সে মাটিতে পড়ে থাকা পিস্তলটা তুলে নিল। চোখে তখন ক্লান্তি, শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা, তবুও তার দৃষ্টি আগের মতোই কঠিন।
এক মুহূর্ত দেরি না করে হিয়া ট্রিগারে চাপ দিল।
শব্দটা গভীর জঙ্গলের নীরবতা ভেঙে দিল। লোকটা নিথর হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। হিয়ার হাত থেকে ধীরে ধীরে পিস্তলটা নিচে নেমে এলো।
এবার আর শরীর তাকে ধরে রাখতে পারল না।
চারপাশ ঘুরতে শুরু করল। সে শ্যাডোর দিকে তাকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল।
পরের মুহূর্তেই হিয়া মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
শ্যাডো দ্রুত তার কাছে এগিয়ে এলো।
কিন্তু হিয়ার শরীরের অবস্থা দেখে সে বুঝতে পারল, এখন তাকে সাহায্য করার জন্য অন্য কাউকে দরকার।
চারপাশে বিপদের গন্ধ এখনো রয়ে গেছে। শ্যাডো কিছুক্ষণ হিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ডানা মেলে অন্ধকার আকাশের দিকে উড়ে গেল।
অন্যদিকে—
লিওন তখন সবেমাত্র বাড়ির সামনে এসে পৌঁছেছে।
গাড়ি থেকে নেমে দরজা বন্ধ করতেই তার মাথার ওপর পরিচিত ডানার শব্দ ভেসে এলো।
সে উপরে তাকাল।
শ্যাডো।
ঈগলটা তার মাথার চারপাশে চক্কর কাটছে।
লিওন বিরক্ত মুখে তাকিয়ে বলল,
— “উফ… ওই হর্নি ফক্সটা আবার এই ঈগলটাকে পাঠিয়েছে আমাকে নজরে রাখতে?”
শ্যাডো নিচে নেমে এসে লিওনের গাড়ির ওপর বসল।
তার আচরণ স্বাভাবিক নয়। বারবার ডানা নাড়ছে, মাথা ঘুরিয়ে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে।
লিওন কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো—
“এই ঈগলটা কি আমাকে কোনো খবর দিতে চাইছে?”
কিন্তু পরক্ষণেই হিয়ার কথা মনে পড়তেই তার বিরক্তি ফিরে এলো। সে ঠান্ডা গলায় বলল,
— “হিয়া যেমন ওর পোষা প্রাণিওতো তেমনি হবে।”
একটু থেমে আবার বলল,
— “বেয়াদব।”
শ্যাডো এবারও অস্থিরভাবে তাকিয়ে রইল। কিন্তু লিওন আর কিছু বুঝতে চেষ্টা করল না।ঠিক তখনই বাড়ির দরজা খুলে অ্যামেলিয়া দ্রুত বেরিয়ে এলো।
তার মুখে চিন্তার ছাপ।
— “লিওন, তুই এসে গেছিস?”
লিওন তার দিকে তাকাল।
অ্যামেলিয়া উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
— “মায়ার শরীরটা ভালো নেই। পেট খারাপ হয়েছে, বারবার বমি করছে।”
কথাটা শুনেই লিওনের মনোযোগ সেদিকে চলে গেল।
সে আর একবার শ্যাডোর দিকে তাকাল। ঈগলটা তখনও অস্বাভাবিক আচরণ করছে।
কিন্তু লিওন ভাবল, হয়তো হিয়ার কোনো নতুন চাল।
সে আর কিছু না বলে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।
আর বাইরে দাঁড়িয়ে শ্যাডো অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
কারণ সে জানে—
যে বিপদ থেকে সে ফিরে এসেছে, তার খবর এখনো কেউ জানে না।
শ্যাডো কিছুক্ষণ লিওনের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখে অস্থিরতা। সে জানে, সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। ডানা মেলে আবার রাতের আকাশে উড়ে গেল সে।
জঙ্গলের সেই এলাকা থেকে লিওনের বাড়িটা খুব বেশি দূরে নয়। তাই শ্যাডো প্রথমে সেখানেই এসেছিল, কারণ তার চোখে প্রথমে পড়েছিল পরিচিত জায়গাটা।
কিন্তু হিয়ার অবস্থা জানাতে হলে তাকে ফিরতে হবে নিজের আসল ঠিকানায়।
টাউন হাউসে।
কিছুক্ষণ পর অন্ধকার আকাশ ভেদ করে শ্যাডো এসে নামল টাউন হাউসের সামনে। দানিয়েল তখনো ভেতরে ছিল। মনিটরের সামনে মিশনের খবরের অপেক্ষায়।
শ্যাডোকে দেখেই তার চোখ থেমে গেল।
কারণ এই ঈগলের আচরণ দানিয়েলের অচেনা নয়।
শ্যাডো কখনো অকারণে এমন অস্থির হয় না।
তার ডানা ঝাপটানো, বারবার সামনে তাকানো, অস্বাভাবিক শব্দ করা—সবকিছু একটা বিপদের সংকেত।
দানিয়েলের মুখের ভাব মুহূর্তেই বদলে গেল।
সে বুঝে গেল। কিছু একটা ঘটেছে।
সে দ্রুত এগিয়ে এসে শ্যাডোর দিকে তাকাল।
— “হিয়া…”
শব্দটা খুব নিচু স্বরে বেরিয়ে এলো। শ্যাডো আবারও ডানা ঝাপটাতে লাগল। মনে হলো সে দানিয়েলকে তাড়াতাড়ি কোথাও নিয়ে যেতে চাইছে।
দানিয়েল আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।সে নিজের ফোন তুলে কয়েকটা নির্দেশ দিল। তারপর দ্রুত টাউন হাউসের বাইরে চলে এলো।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই হেলিকপ্টারের শব্দ রাতের নীরবতা ভেঙে দিল। দানিয়েল উঠে বসল।
শ্যাডো হেলিকপ্টারের সামনে উড়তে শুরু করল।
দানিয়েলের চোখ তখন শুধু সামনে।তার মাথায় একটাই চিন্তা—হিয়া।
যে মেয়েটা নিজের জীবন নিয়ে কখনো ভাবেনি, সেই মেয়েটা এবার কতটা বিপদের মধ্যে পড়েছে, সেটা শ্যাডোর আচরণই বলে দিচ্ছে।
হেলিকপ্টার অন্ধকার আকাশে উড়ে গেল।নিচে রয়ে গেল শহরের আলো। আর সামনে অপেক্ষা করছে সেই জঙ্গল, যেখানে হিয়া একা নিজের শেষ শক্তি দিয়ে লড়াই করে পড়ে আছে।
হেলিকপ্টারটা জঙ্গলের কাছাকাছি খোলা জায়গায় নামতেই দানিয়েল দ্রুত নেমে পড়ল।
শ্যাডো সামনে উড়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
কিছুদূর এগোতেই গাছের ছায়ার মাঝে পড়ে থাকা হিয়াকে দেখতে পেল সে। এক মুহূর্তের জন্য দানিয়েলের বুকটা ভারী হয়ে গেল।
মাটিতে পড়ে আছে তার হিয়া।
মাথার পাশ দিয়ে র,ক্ত শুকিয়ে গেছে, শরীর নিস্তেজ, তবুও হাতের কাছে এখনো লড়াইয়ের চিহ্ন।
দানিয়েল দ্রুত তার পাশে বসে ডাকল,
— “হিয়া…”
কোনো উত্তর নেই।
সে আবার ডাকল,
— “ভাইপার, চোখ খোলো।”
কিছুক্ষণ পর হিয়ার চোখের পাতা সামান্য নড়ল।
অস্পষ্ট দৃষ্টিতে সে দানিয়েলের দিকে তাকাল।
তার প্রথম কথাই ছিল,
— “ওরা…”
কণ্ঠ দুর্বল হয়ে আসছিল।
— “ওরা সব নিয়ে বোটে উঠে গেছে… আটকাতে হবে…”
দানিয়েল তার দিকে তাকিয়ে বুঝল, এত আঘাতের পরও হিয়ার মাথায় এখনো মিশন।
সে নিচু স্বরে বলল,— “তুমি এখন শুধু নিজের কথা ভাবো।”
কিন্তু হিয়া মাথা নাড়ল।— “না… ওদের যেতে দেওয়া যাবে না।”
দানিয়েল আর কথা বাড়াল না।
হেলিকপ্টার জঙ্গলের গভীরে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই সে দ্রুত হেলিকপ্টার থেকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, স্নাইপার আর কিছু সামগ্রী নিয়ে নিল।
রুমাল দিয়ে হিয়ার কপালের ক্ষতটা চেপে ধরল, যাতে রক্তপাত কিছুটা কমে। তারপর সেটা বেঁধে দিলো কপালে শক্ত করে।
তারপর সাবধানে হিয়াকে নিজের কাঁধে তুলে নিল।
হিয়া দুর্বল কণ্ঠে বলল,— “বস… সময় নেই…”
দানিয়েল শক্ত গলায় বলল,— “আই নো।”
তার চোখে তখন শুধু একটাই লক্ষ্য।
আসাদের লোকদের থামানো।
সমুদ্রের তীরের কাছাকাছি পৌঁছাতেই দানিয়েলের চোখ পড়ল দূরে ভেসে থাকা একটা মোটরবোটে।
বোটটা এখনো খুব বেশি দূরে যেতে পারেনি।
মনে হচ্ছে, ওরা কারও সঙ্গে শেষবারের মতো যোগাযোগ করছে। দানিয়েল হিয়াকে সাবধানে একটা গাছের পাশে বসিয়ে দিল।
তারপর হেলিকপ্টার থেকে আনা স্নাইপার রাইফেলটা হাতে তুলে নিল। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল বোটের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর দিকে।
একটা গভীর শ্বাস।তারপর ট্রিগারে চাপ।
ঠাস করে একটা শব্দ হলো।
বোটের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একজন সোজা পানিতে লুটিয়ে পড়ল।
দ্বিতীয় গু/লি। আরেকজন মাটিতে ঢলে পড়ল।
শত্রুরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দানিয়েল একের পর এক নিখুঁত নিশানায় সবাইকে নামিয়ে ফেলতে লাগল।
কেউ অস্ত্র তুলতে পারল না। কেউ পালানোর সুযোগও পেল না। মাত্র কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বোটের সব লোক নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে রইল।
বোটের ইঞ্জিন তখনো চালু ছিল। লোকগুলো মারা গেলেও বোটের কোনো ক্ষতি হয়নি।
সেটা ধীরে ধীরে ঢেউ কেটে ভেসে চলছিল, আর ভেতরে রয়ে গেল অস্ত্র, নগদ টাকা আর আসাদ খানের বিরুদ্ধে থাকা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
দানিয়েল আবার হিয়ার কাছে ফিরে এলো।সে নিচু হয়ে হিয়ার দিকে তাকাল। এত আঘাত, এত রক্তক্ষরণের পরও মেয়েটার প্রথম চিন্তা মিশন।
দানিয়েলের চোখে তখন গর্ব আর উদ্বেগ একসঙ্গে।
দানিয়েল পুনরায় হিয়াকে কাঁধে নিয়ে কাছের আরেকটা বোটে উঠে পড়ল।
তার শরীরে ক্লান্তির কোনো চিহ্ন নেই। এতক্ষণ ধরে হিয়াকে সামলানো, অ/স্ত্র ব্যবহার করা, সবকিছু একসঙ্গে করেও তার গতি একটুও কমেনি।
দূরে পানির ওপর এখনো ভাসছে আসাদের লোকদের বোটটা। বোটটা ধ্বংস হয়নি, শুধু সেটার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে।
দানিয়েল দ্রুত নিজের বোট চালু করল এবং সেই বোটের দিকে এগিয়ে গেল। হিয়া তখনো তার কাঁধে অচেতন আর জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায়।
তার মাথার ক্ষত থেকে র/ক্তের দাগ এখনো শুকায়নি।দানিয়েল একবার তার দিকে তাকাল, তারপর আবার সামনে চোখ রাখল।
কয়েক মুহূর্ত পর সে সেই বোটের কাছে পৌঁছে গেল।বোটে উঠে প্রথমেই সে চারপাশ নিশ্চিত করল।আসাদের লোকগুলো আর কেউ বেঁচে নেই। দানিয়েল ঠান্ডা মাথায় তাদের দে/হগুলো সরিয়ে পানিতে ফেলে দিল। তারপর বোটের ভেতরে থাকা সব অস্ত্র, টাকা আর গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র দেখতে লাগলো।
এই জিনিসগুলো এখন সরাসরি দুবাইয়ের তার সারপেন্ট হাউসে পৌঁছাতে হবে।
দানিয়েল দ্রুত বোটে উঠে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। অস্ত্র আর নগদ টাকা সেখানেই রেখে সে শুধু আসাদ খানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভর্তি পেনড্রাইভটা নিজের কাছে তুলে নিল।
এদিকে সে বারবার মার্ক আর জ্যাকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করল।
কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া গেল না।
সে শুধু কমিউনিকেশন সিগন্যাল চালু রেখেই অপেক্ষা করতে লাগল। যদি ওদের কারও কাছ থেকে কোনো বার্তা আসে।
তারপর একবার সমুদ্রের দিকে তাকাল। এখনই বর্ডার পার হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
এ ধরনের চালান কোনো পরিকল্পনা ছাড়া সীমান্ত অতিক্রম করে না। প্রতিটি রুট, প্রতিটি সময় আর প্রতিটি ধাপ আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে।
তাই আপাতত সবচেয়ে জরুরি কাজ—হিয়াকে বাঁচানো। এই সিদ্ধান্ত নিয়েই দানিয়েল নিজের বোটের ইঞ্জিন চালু করল।
সমুদ্রের নীরবতা চিরে বোটটা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল। কিছুদূর যাওয়ার পর সে নির্জন এক জায়গায় বোট থামাল।
হিয়াকে নিজের কাঁধে রেখেই সে পুনরায় নামলো বোট থেকে। এতক্ষণ পরেও হিয়াকে নামিয়ে বিশ্রাম নেওয়ার কথা তার মাথায় আসেনি।
সে শুধু জানে, এখন হিয়াকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
আরেকটা জঙ্গলে নেমে সে কাছেই একটা বড় গাছের পাশে হিয়াকে বসিয়ে দিল সে।তারপর তার মুখের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল,
— “হিয়া, চোখ খুলে রাখো।”
হিয়ার চোখ সামান্য নড়ল।
দানিয়েল তার কাঁধ ধরে বলল,
— “চোখ বন্ধ করবে না। এটা আমার আদেশ।”
একটু থেমে আবার বলল,— “অজ্ঞান হবে না। শুনতে পাচ্ছো?”
তার কণ্ঠে এবার কঠোরতার সঙ্গে চিন্তাও মিশে গেল।
— “বি স্ট্রং, ভাইপার।”
হিয়া অনেক কষ্টে চোখ খুলে রেখেছিল। কিন্তু শরীর আর সঙ্গ দিচ্ছে না। চোখের পাতা বারবার ভারী হয়ে আসছে। মাথার যন্ত্রণা আর দুর্বলতায় সে ধীরে ধীরে একপাশে হেলে পড়ছিল।
দানিয়েল সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরে ফেলল।— “হিয়া…”
তার কণ্ঠে এবার আগের কঠোরতা নেই, আছে গভীর উদ্বেগ। হিয়া আধো ঘুমের মধ্যে অস্পষ্ট কণ্ঠে বলল,
— “আমি একটু ঘুমাবো, বস…”
কথাটা বলেই তার শরীর আবার ঢলে পড়ল।
দানিয়েল দ্রুত তার পাশে বসে পড়ল।হিয়ার মাথা এসে পড়ল তার কাঁধে। কিছুক্ষণ দানিয়েল নড়ল না।
সে শুধু তাকিয়ে রইল হিয়ার মুখের দিকে।
হিয়ার শান্ত মুখটা দেখতে দেখতে হঠাৎ দানিয়েলের চোখের সামনে ভেসে উঠল আট বছর আগের একটা সন্ধা।
আট বছর আগে…
বাংলাদেশের একটি মিশনে গিয়েছিল দানিয়েল।
সেদিন সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছিল না।
শত্রুরা হঠাৎ আক্রমণ করেছিল।
গু/লিবদ্ধ অবস্থায় কোনোভাবে নিজেকে বাঁচিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিল সে।শরীরে তখন তীব্র যন্ত্রণা।ক্তক্ষরণ হচ্ছিল।
নিজেকে লুকানোর জন্য একটা চলন্ত বাসে উঠে পড়েছিল সে। সেদিন হিয়ার কলেজে অনুষ্ঠান ছিল।
ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল তার।যাত্রীরা একে একে নেমে যাওয়ার পর বাস প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়।
একসময় পুরো বাসে হিয়া একাই ছিল। ঠিক তখনই দরজা খুলে আহত অবস্থায় উঠে আসে দানিয়েল।
তার পোশাকে র/ক্তের দাগ।চেহারায় ক্লান্তি।
হিয়া প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিল।সে কিছু বলার আগেই দানিয়েল দুর্বল কণ্ঠে বলেছিল,
— “হেল্প মি…”
হিয়ার চোখ তখন তার ক্ষত দেখে থেমে গেল। এটা কোনো সাধারণ মানুষ নয়। লোকটা আহত।
দানিয়েল কষ্ট করে তার কাছে এসে বসে পড়ল।
তারপর খুব নিচু স্বরে বলল,
— “ওরা আমাকে খুঁজছে।”
একটু থেমে আবার বলল,
— “ওরা এই বাসে উঠবে… আমাকে লুকাতে সাহায্য করো।”
হিয়া জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। কয়েকজন লোক দ্রুত বাসের দিকেই এগিয়ে আসছে একটা গাড়ি করে।
এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে হিয়া নিজের ব্যাগ খুলল।
ভেতর থেকে একটা হুডি বের করল তার। তারপর দানিয়েলের ওভারকোট খুলে তাকে হুডিটা পরিয়ে দিল।
দানিয়েল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
এত চাপের মধ্যেও মেয়েটার মাথা ঠান্ডা।
পরের মুহূর্তে দানিয়েল হিয়ার কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল। কিছুক্ষণ পর কয়েকজন লোক বাস থামিয়ে ভেতরে উঠে এলো। তারা চারপাশে তাকিয়ে হিয়ার সামনে এসে দাঁড়াল।
একজন কঠিন গলায় বলল,
— “এই মেয়ে, কাউকে দেখেছিস এখান দিয়ে যেতে?”
তারপর দানিয়েলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— ” এটা কে?”
হিয়া একটুও ঘাবড়াল না।স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
— “আপানার কারা এভাবে হুট করে বাসের ভেতরে চলে এসেছেন কেনো? আর এটা আমার বয়ফ্রেন্ড। সে এখন অসুস্থ ঘুমাচ্ছে।”
লোকগুলো সন্দেহের চোখে তাকাল একবার।
কিন্তু তখন দানিয়েলের পোশাক বদলে গেছে।
গুলির চি/হ্ন বা রক্তের ছিটেফোঁটাও আর দেখা যাচ্ছে না।
হিয়া আগেই নিজের ব্যাগ থেকে রুমাল আর স্যানেটারি বের করে বাসের ভেতরে পড়ে থাকা রক্তের দাগ পরিষ্কার করে ফেলেছিল।
তার উপস্থিত বুদ্ধি আর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেখে দানিয়েল অবাক হয়ে গিয়েছিল।
সেদিন প্রথমবার সে বুঝেছিল—এই মেয়েটা সাধারণ কেউ নয়।
বিপদের মুহূর্তে যে মানুষ নিজের ভয় ভুলে অন্য কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করে, তার ভেতরে আলাদা এক শক্তি থাকে।
আর সেই দিন থেকেই হিয়ার প্রতি দানিয়েলের মনে একটা আলাদা ভালো লাগা তৈরি হয়েছিল।
লোকগুলো চলে যাওয়ার পর বাসের ভেতর কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এলো। হিয়া ধীরে ধীরে দানিয়েলের দিকে তাকাল।
মানুষটা এখন অচেতন। শরীরের ক্ষ/ত দেখে বোঝা যাচ্ছে, দ্রুত চিকিৎসা দরকার।
সে উঠে ড্রাইভারের কাছে গেল।
— “আঙ্কেল, সামনে একটা হাসপাতালের কাছে বাসটা থামাবেন?”
ড্রাইভার রিয়ারভিউ মিররে একবার হিয়ার দিকে, তারপর দানিয়েলের দিকে তাকাল।
এতক্ষণ বাসের ভেতরে যা ঘটেছে, সবই তার চোখের সামনে হয়েছে।
র/ক্তাক্ত একজন অচেনা মানুষকে লুকিয়ে রাখা, বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে মেয়েটার বুদ্ধি দিয়ে পরিস্থিতি সামলানো—সব দেখেছে সে।
ড্রাইভার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— “মা, তুমি এসব ঝামেলায় জড়ালে কেন? অচেনা একটা মানুষকে নিয়ে এত কিছু করার দরকার ছিল?”
হিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— “কারণ উনি বিপদে পড়েছেন।”
ড্রাইভার অবাক হয়ে তাকাল।
হিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
— “আমার বাবা সিআইডি অফিসার।”
একটু থেমে আবার বলল,— “আর আমি তার মেয়ে।”
তার চোখে তখন আত্মবিশ্বাস।
— “একদিন আমিও সিআইডিতষ অফিসার হবো।”
ড্রাইভার চুপ করে শুনছিল।
হিয়া দানিয়েলের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “দায়িত্বে থাকা মানে শুধু অপরাধী ধরা না… বিপদে থাকা কাউকে বাঁচানোও দায়িত্ব।”
ড্রাইভার আর কিছু বলল না।শুধু মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল—এত কম বয়সে এমন মানসিকতা সবার থাকে না।
বাসটা অবশেষে একটা হাসপাতালের সামনে এসে থামল।
হিয়া জানালা দিয়ে হাসপাতালের সাইনবোর্ডের দিকে তাকাল।তারপর দ্রুত ড্রাইভারের কাছে গিয়ে বলল,
— “অঙ্কের, একটু সাহায্য করবেন?”
ড্রাইভার পেছনে তাকাল।
হিয়া দানিয়েলের দিকে ইশারা করে বলল,
— “উনাকে হাসপাতালে নিতে হবে। একা আমার পক্ষে সম্ভব না ওনাকে বহন করা।”
ড্রাইভার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সে বুঝতে পারছিল, মেয়েটা একটা বড় ঝামেলার মধ্যে পড়েছে।
তবুও হিয়ার চোখের চিন্তা দেখে আর না করতে পারল না। দুজন মিলে দানিয়েলকে বাস থেকে নামিয়ে হাসপাতালের ভেতরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করল।
হাসপাতালের কর্মীরা স্ট্রেচার নিয়ে এলে হিয়া কিছুটা স্বস্তি পেল। ডাক্তাররা দানিয়েলকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার আগেই হিয়ার চোখ পড়ল তার পকেটের ফোনের দিকে।
সে ফোনটা বের করল। ভাবল, হয়তো তার পরিবারের কাউকে জানানো দরকার।
স্ক্রিনে লক দেখা যাচ্ছে।হিয়া পাসওয়ার্ড দেওয়ার চেষ্টা করল।
কিন্তু সে তো জানে না এই মানুষের ফোনের পাসওয়ার্ড।
কয়েকবার চেষ্টা করেও ফোন খুলল না।সে দানিয়েলের দিকে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য ভাবল, হয়তো ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে খোলা যাবে।
কিন্তু দানিয়েল তখন সম্পূর্ণ অচেতন। কিন্তু ফিঙ্গারপ্রিন্টে কাজ হলোনা কারন হিয়া জানত না, তার ফোনে আরও কঠিন নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে চোখের রেটিনা দিয়ে খুলতে হবে ফোন।
সে আর চেষ্টা করল না। ফোনটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ভাবল, হয়তো কেউ তাকে কল করবে।
রিসেপশনে দানিয়েলের তথ্য দেওয়ার সময় তাকে কিছু ফর্ম পূরণ করতে বলা হলো।
হিয়া কলম হাতে নিল।নিজের নাম লিখল—নূজহাত হিয়া।
কিন্তু ঠিকানা দেওয়ার সময় থেমে গেল।সে জানে না এই ঘটনার পর কী হতে পারে।অপ্রয়োজনীয় ঝামেলায় জড়াতে চাইল না। তাই নিজের আসল ঠিকানা না দিয়ে অন্য তথ্য লিখল।
ঠিক তখনই দানিয়েলের ফোনটা বেজে উঠল।
হিয়া দ্রুত কল রিসিভ করল।ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে এলো।
হিয়া শান্তভাবে বলল,— “আমি তাকে হাসপাতালে এনেছি।”
তারপর সংক্ষেপে সব ঘটনা জানিয়ে দিল।
— “উনার ফোনটা রিসেপশনে দিয়ে যাচ্ছি। আপনারা দ্রুত আসুন।”
কথা শেষ করে সে ফোনটা রিসেপশনে জমা দিল।রিসেপশনিস্ট কিছু জিজ্ঞেস করলে হিয়া শুধু বলল,
— “উনার পরিবারের লোকজন আসছে।”
তারপর আর পেছনে না তাকিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেল।
হিয়ার মাথা তখনো দানিয়েলের কাঁধে।সমুদ্রের বাতাস ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দানিয়েলের চোখের সামনে এখন আর বর্তমান নেই।
সে ফিরে গেছে আট বছর আগের সেই সময়ে।
সেদিন হাসপাতালে চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে প্রথম কাজ হিসেবে দানিয়েল খুঁজেছিল সেই মেয়েটাকে।
যে নিজের পরিচয় না জেনেও একটা আহত অচেনা মানুষকে বাঁচিয়েছিল। হিয়ার দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী সে সেখানে গিয়েছিল।
কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারে—হিয়া হসপিটালে ভুল ঠিকানা দিয়েছে।
ইচ্ছা করেই নিজের পরিচয় লুকিয়েছিল মেয়েটা।
দানিয়েল অবাক হয়েছিল।
কারণ এত কম বয়সে একটা মেয়ে এত ঠান্ডা মাথায় নিজের সব তথ্য গোপন করতে পারে, এটা তার ভাবনার বাইরে ছিল।
তারপর যতদিন সে বাংলাদেশে ছিল, ততদিন হিয়াকে খুঁজেছে। কখনো সেই এরিয়ার কলেজের আশেপাশে।
কখনো সেই বাসস্ট্যান্ডে, যেখানে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল।অনেকবার সে সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকেছে। হয়তো কোনো একদিন হিয়া আবার আসবে।
হয়তো আবার দেখা হবে।কিন্তু সময় চলে গেছে।
হিয়ার কোনো খোঁজ সে পায়নি। শেষ পর্যন্ত তাকে বাংলাদেশ ছেড়ে দুবাই ফিরে যেতে হয়েছিল।
তারপর কেটে যায় একটা বছর। আবার বাংলাদেশে এসেছিল দানিয়েল। আর সেবার ভাগ্য তাকে হিয়ার কাছে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু সে যে হিয়াকে খুঁজছিল, সেই হিয়া আর আগের মতো ছিল না।
আর সেই হিয়াকেই দানিয়েল নিজের হাতে তৈরি করেছে। ভাইপার হিসেবে।
একটা নাম, যেটা শুনলে আন্ডারওয়ার্ল্ডের মানুষ সতর্ক হয়ে যায়।
—
বর্তমানে ফিরে এলো দানিয়েল।
তার সামনে বসে থাকা মেয়েটা আজ পৃথিবীর কাছে ভাইপার। আর তার নিজের অবস্থান?
আন্ডারওয়ার্ল্ডে সে এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে তার ক্ষমতাকে অস্বীকার করার সাহস খুব কম মানুষের।
তার সব অর্জন, সব ক্ষমতা, সব পরিচয়—সবকিছু থাকার পরও একটা কাজ এখনো বাকি।
হিয়ার প্রতিশোধ।
যেদিন হিয়া তার অতীতের সব হিসাব শেষ করবে, সেদিনই দানিয়েলের দায়িত্বও শেষ হবে।
তারপর হয়তো আর কোনো কারণ থাকবে না এই অন্ধকার জগতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকার।
হঠাৎ হিয়ার শরীর নড়ে উঠল।ধীরে ধীরে তার চোখ খুলে গেল।প্রথমেই সে বুঝতে পারল, সে এতক্ষণ দানিয়েলের কাঁধে মাথা রেখে ছিল।
সঙ্গে সঙ্গে সরে গিয়ে সোজা হয়ে বসল।
— “সরি, বস… আমি বুঝতে পারিনি”
দানিয়েল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।এক মুহূর্তের জন্য তার ইচ্ছে হলো বলতে—”সরি বলার কিছু নেই।”
ইচ্ছে হলো হিয়ার মাথাটা আবার নিজের কাঁধে রেখে দিতে।কিন্তু সে নিজেকে থামাল। এই মুহূর্তে সেটা তার চরিত্র আর পরিস্থিতির সাথে যায়না।
তাদের সম্পর্কের এমন কোনো মনোভাব নেই।
দানিয়েল শুধু শান্ত গলায় বলল,
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২০ (২)
— “শরীর কেমন লাগছে এখন?”
হিয়া একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
তারপর ধীরে বলল,— “একটু ভালো।”
দানিয়েল আর কিছু বলল না। শুধু মনে মনে স্বীকার করল—
আট বছর আগে যে মেয়েটা তার জীবন বাঁচিয়েছিল, আজও সেই মেয়েটার জীবন রক্ষা করাই তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
