Home তোমার আমার গল্প তোমার আমার গল্প পর্ব ৫১ (২)

তোমার আমার গল্প পর্ব ৫১ (২)

তোমার আমার গল্প পর্ব ৫১ (২)
noorayn

খান বাড়ির সুখের সংসারের উপর যেন হঠাৎ করেই কালো ছায়া নেমে এসেছে। এক নিমিষেই যেন গোটা একটি পরিবারের হাসি-খুশি, স্বস্তি আর সুখ ধুলোয় মিশে গেছে।
নিয়াজ খান আর আরশাদের শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। চব্বিশ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও দুজনের কেউই এখনো কোনো রেসপন্স করেনি। হাই ডোজের মেডিসিনও যেন তাদের শরীরে কোনো কাজ করছে না। পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে দেখে ইজাজ খান দুজনকেই দ্রুত সিঙ্গাপুরে নেওয়ার ব্যবস্থা করছেন।
কিন্তু…সব খারাপ সময় যেন একসাথেই নেমে এসেছে খান পরিবারের উপর।
–ডোরা…সবার প্রিয় ছোট্ট ডোরা ভালো নেই।
ঘণ্টা দুয়েক আগেই তাকে ইমার্জেন্সিতে এনে এন.আই.সিউতে অ্যাডমিট করা হয়েছে।
সময় যেন সত্যিই থমকে গেছে সবার জন্য।

–এন.আই.সি.ইউর সামনে মেঝেতে বসে আছে আলিশা। পাগলপ্রায় অবস্থায় কাঁদছে সে ; চোখের পানি যেন কোনোভাবেই থামছে না। নিজের সন্তানের এমন অসহায় অবস্থা একজন মায়ের পক্ষে কীভাবে সহ্য করা সম্ভব?
–এক পাশে শাইনা আর আয়শা সমানতালে কেঁদে চলেছেন। নীলা যেন হারিয়ে ফেলেছে কথা বলার ভাষাটুকুও। আর ইজাজ খান? প্রিয় নাতির এমন অবস্থা সহ্য করতে না পেরে যেন একেবারে পাথর হয়ে গেছেন। চোখের সামনে এতগুলো আপন মানুষকে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে…
–একটু দুর থেকেই, আয়শা পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছেন নিজের মেয়ে আলিশার দিকে।
মেয়েটা এন.আই.সি.ইউর সামনে বসে আহাজারি করছে। নিজের সন্তানের এমন অবস্থায় সে দিশেহারা ; তাকে শান্তনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা আয়শার জানা নেই।
কারণ, তিনি নিজেও এই একই যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন।
তার স্বামী, সন্তান, নাতি – সবাই যেন জীবন-মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে।
যে মেয়েটা সুস্থ, সবল ছিলো, সে’ই মেয়েটাও আজ ভেঙে পড়েছে চোখের সামনে…
আয়শার জীবনে যেন একসাথে সকল অন্ধকার নেমে এসেছে। মা হয়ে তিনি আর কতটা সহ্য করবেন?
তার সব সন্তানদের উপর এই কেমন প্রলয় নেমে এলো?

তার সন্তানরা কেন ভালো নেই? কেন বারবার তাদের জীবনে এমন ভয়ংকর পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে?
এদিকে, আলিশাকে শান্তনা দেওয়ার মতোও যেন কেউ নেই। সবাই এখনো বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না ছোট্ট ডোরার এমন অবস্থা। যে ডোরা সারাদিন তোতাপাখির মতো টুকটুক করে বুলি আওড়াতো, যে ডোরা নিজের চঞ্চলতায় পুরো বাড়িটাকে মাতিয়ে রাখতো…
যে ডোরার একটুখানি দুষ্টমি পুরো খান বাড়ির পরিবেশ হাস্যজ্বল করে দিতো…সে’ই ডোরা কিনা আজ নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে আছে এন.আই.সি.ইউর ছোট্ট একটি বেডে!
কোনো কথার বুলি নেই, কোনো দুষ্টমি নেই, কোনো চঞ্চলতা নেই ; শুধু নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে ছোট্ট শরীরটা।
–আরহাম দাঁড়িয়ে আছে এন.আই.সি.ইউর কাঁচের দরজার সামনে। পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে ভেতরে শুয়ে থাকা নিজের সবচেয়ে নাজুক অংশটার দিকে। তার নিজের সন্তান। কাল রাতেও তো বাচ্চাটা বাবার বুকে ছিলো।
ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে বাবাকে আঁকড়ে ধরে ছিলো…
আর আজ? আজ সেই বাচ্চাটাই যন্ত্রপাতির মাঝে নিস্তব্ধ হয়ে শুয়ে আছে….
আরহামের চোখ দুটো লাল হয়ে আছে, মুখটা অদ্ভুত শান্ত। এমন শান্ত যেন এই মুহূর্তেই কেঁদে ফেলবে সে।
কিন্তু না, আরহাম কাঁদছে না ; সে কাঁদতে পারছে না।
শুধু তাকিয়ে আছে নিজের ছোট্ট অস্তিত্বটার দিকে…

তার বুকের ভেতর এমন ব্যথা করছে কেন? এত ভয় লাগছে কেন? এত অস্থিরতা অনুভব হচ্ছে কেন? আরহাম তো এমন না। আরহাম তো সিরিয়াস হতে জানে না। সবকিছুর মাঝেও হাসতে পারে, মজা করতে পারে। বিপদেও নিজেকে শক্ত রাখতে জানে। তাহলে আজ নিজের সন্তানের এমন অবস্থা দেখে বুকটা এভাবে মোচড় দিয়ে উঠছে কেন?
কেন মনে হচ্ছে তার দম আটকে আসছে?
কেন মনে হচ্ছে, বুকের ভেতর থেকে কেউ যেন তার সমস্ত শক্তি কেড়ে নিচ্ছে? তার বাচ্চা কেন তাকে বাবা বলে ডাকছে না? একবারও ডাকছে না কেন? আরহামের চোখ ক্রমশে ঘোলা হয়ে আসছে…তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে নেমে এলো নিজের সাদা শার্টের দিকে।
শার্টটায় এখনো লেগে আছে ছোট্ট ডোরার রক্ত!
রক্ত…এটা ডোরার রক্ত। তার ছোট মরিচের রক্ত…
আরহাম কয়েক সেকেন্ড নির্বাক হয়ে শার্টটার দিকে তাকিয়ে রইলো। প্রতিবার রক্তের দাগগুলো চোখে পড়লেই তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠছে।
বাবা হয়ে সে কীভাবে নিজের সন্তানের রক্ত শরীরে লেপ্টে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে? কীভাবে?
আরহামের তো ডোরাকে বুকে জড়িয়ে রাখার কথা ছিলো…
অথচ আজ…
নিজের শার্টে সন্তানের রক্ত নিয়ে তাকে কাঁচের ওপাশ থেকে দেখতে হচ্ছে! আরহামের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।
কাঁচের ওপাশে থাকা ছোট্ট ডোরাটাও যেন ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে…সে চোখের পাতা ফেললো না।
ভয় হচ্ছে…অনেক ভয়।
আরহাম এন.আই.সি.ইউর কাঁচের দরজার উপর কাঁপা হাতটা রাখলো। কাঁচের ওপাশে নিস্তব্ধ হয়ে শুয়ে থাকা ছোট্ট ডোরার দিকে পলকহীন চোখে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় শুধু বিড়বিড় করছে…
“আমার ডোরা… আমার বাচ্চা। বাবার বুকে ফিরে আয়, কলিজা।”
আরহামের হঠাৎ ধ্যান ভাঙলো পাশেই কারও কান্নার শব্দে।
সে ধীরে ধীরে পাশ ফিরে তাকালো।
আলিশা…
পাগলের মতো বিলাপ করে কাঁদছে মেয়েটা। বারবার নিজের চুল নিজেই ছিঁড়ছে। কাঁচের ওপাশে থাকা ছোট্ট ডোরার দিকে তাকিয়ে একটু পরপর ঢুকরে উঠছে…
“ডোরা… মাম্মার জানবাচ্চা। মাম্মার বুকে এসো না বাচ্চা। মাম্মার কাছে এসো।”
–পাশে থাকা দুজন নার্স মিলেও তাকে ফ্লোর থেকে তুলতে পারছে না। শান্ত করতে পারছে না কিছুতেই। একজন নার্স আলিশার হাত ধরে রেখেছে, অন্যজন বারবার তাকে উঠে দাঁড়াতে বলছে। কিন্তু আলিশার যেন কোনো হুঁশই নেই।
দুজন নার্সের চোখও অজান্তেই ভিজে উঠছে এক মায়ের এমন আহাজারি দেখে…
“ডোরা… মাম্মার জান। মাম্মার বুকে আসবে না প্রাণ? মাম্মা স্যরি… মাম্মা অনেক অনেক স্যরি, বাচ্চা। মাম্মা ডোরার খেয়াল রাখতে পারেনি…”
–“আল্লাহহহ! আমার বাচ্চাটা কী দোষ করেছিলো?
আমার বাচ্চাকে আমার বুকে ফিরিয়ে দিন, আল্লাহ…প্লিজ, আমার বাচ্চাটাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন না…”
“আপনি এখান থেকে উঠুন, প্লিজ। এন.আই.সি.ইউর সামনে এভাবে চিৎকার-চেঁচামেচি করা যায় না।”
–নার্সের কথাও যেন আলিশার কানে ঢুকলো না।
বাচ্চার এমন অবস্থায় কোন মায়েরই বা হুঁশ থাকে?
আরহাম চেয়ে চেয়ে দেখলো আলিশার আর্তনাদ।
তার বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়, অসহায়ত্ব আর রাগ যেন মুহূর্তেই আগুন হয়ে উঠলো..
সব…সবকিছু আলিশার জন্য হয়েছে। সে ডোরার খেয়াল রাখতে পারেনি। নিজের সন্তানের খেয়াল রাখতে পারেনি।
আরহাম এই মুহূর্তে নিজের হুঁশ হারিয়ে বসেছে। মানুষ যেমন ভয়াবহ বিপদের মুহূর্তে নিজের কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলে, তারও বোধহয় ঠিক তাই হয়েছে।
সে হঠাৎ তেড়ে গেলো আলিশার দিকে…
এক ঝটকায় আলিশার হাত ধরে তাকে টেনে তুলে টানতে টানতে তাকে নিয়ে এলো এন.আই.সিউর সামনে থেকে একটু দূরে…আলিশা স্তব্ধ, বিমূঢ়!
আরহাম তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, কেন নিয়ে যাচ্ছে?কিছুই বুঝতে পারছে না সে।
“আরহাম? আমাকে ছাড়ো… আমার বাচ্চা… আমার ডোরার কাছে যাবো আমি।”
পরমুহূর্তেই – ঠাসস!
ঠাসস!

–পরপর দুই গালে দু’টো জোরালো থাপ্পড় পড়লো আলিশার। আচমকা এমন আঘাতে একপাশে হেলে পড়লো সে। আলিশার চোখের পানি যেন মুহূর্তেই শুকিয়ে গেছে..
সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরহামের দিকে!
আরহাম এগিয়ে এসে তার চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরলো।
ক্রোধে ভরা কণ্ঠে বলে উঠলো –
“তোর জন্য… তোর অবহেলার জন্য আজ আমার বাচ্চা আমার বুকে নেই। তোর জন্য আজ আমার ডোরা জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে।”
আলিশা যেন কথা বলতেই ভুলে গিয়েছে…
পাশ থেকে ইজাজ খান তেড়ে এলেন।
“মেহতাব! এই কেমন বেয়াদবি? এমন পরিস্থিতিতে তুমি কীভাবে নিজের সন্তানের মায়ের গায়ে হাত তুলতে পারো?”
আরহাম ঘুরে তাকালো বাবার দিকে।
“আজ একদম আমাদের মাঝে আসবে না, বাবা। আমি তা একদম মেনে নেবো না। এই মেয়ের জন্য আজ আমার বাচ্চার এই অবস্থা!”
–বলে আবারও আলিশার দিকে ফিরলো সে।
তার গাল চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বললো –
“কেন করলি এমন? কেন? তোর বাচ্চা না ও? কেন ওর খেয়াল রাখতে পারলি না?”
আলিশার ঠোঁট কাঁপলো।
“আম… আমি ইচ্ছে করে করিনি…”

“ওকে একা ফেলে কেন গিয়েছিলি? বল! এমন কী কাজ ছিলো তোর?”
আলিশার গালে তখনো থাপ্পড়ের দাগ ; ব্যথা হচ্ছে। প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে। কিন্তু সে টুঁ শব্দটিও করলো না। তার সব ব্যথা যেন এই মুহূর্তে ফুরিয়ে গেছে।
“ও ছোট না? ওকে কেন একা রেখে গেলি? কেন? নাকি আমার বাচ্চাটাকে মেনে নিতেই পারিসনি তুই?”
“আরহাম…” আলিশা কোনোমতে নামটা উচ্চারণ করলো।
“বল! ওকে মেনে নিতে পারিসনি, তাই না? সারাদিন ওর পেছনে ছুটতে হয় বলে বিরক্ত লাগতো? তাই ইচ্ছে করে এমন করেছিস?”
আলিশার বুক কেঁপে উঠলো এমন কথায়। যে বাচ্চা তার প্রানের চেয়েও অধিক তাকে কিনা মেনে নেওয়ার প্রশ্ন উঠছে!

“আমার সন্তান ও… আমি পেটে ধরেছি ওকে। আ… আমি কীভাবে ওর ক্ষতি করতে পারি?”
“তবে, আমার বাচ্চা কেন এই অবস্থায়? তোর ভরসায় রেখে গিয়েছিলাম না আমি? তুই না ওর মা? তাহলে ওর খেয়াল রাখতে পারিসনি কেন?”
“মেহতাব… এবার বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। ছাড়ো ওকে।”
ইজাজ খানের কণ্ঠ এবার কঠিন হলো।
আরহাম বাবার দিকে ফিরে তাকালো ; দেখতে বিধ্বস্ত লাগছে তাকে। তারপর নিজের রক্তমাখা সাদা শার্টের দিকে ইশারা করে প্রায় পাগলের মতো বললো –
“ছেড়ে দেবো? কীভাবে ছেড়ে দেবো?”
তার কণ্ঠ এবার ভেঙে আসছে…
“আমার শার্টটা দেখো… দেখো না, বাবা? এগুলো আমার বাচ্চার রক্ত। আমার ছোট্ট ছেলেটার রক্ত। ও তো এখনো অনেক ছোট, তাই না? এতটুকু একটা শরীর… আর ওর শরীর থেকে বের হওয়া রক্ত আমার শার্টে লেগে আছে!
আরহাম আবারও নিজের শার্টের দিকে তাকিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললো –
“ও অনেক ব্যথা পেয়েছে, বাবা… আমার বাচ্চাটা অনেক ব্যথা পেয়েছে। আর তুমি বলছো আমি এই মেয়েকে ছেড়ে দেবো?”

ইজাজ খান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। নিজের চঞ্চল ছেলের এমন রুপ তিনি মানতে পারছেন না। তিনি নিজে একজন বাবা হয়ে কিভাবে আরেকজন ভেঙে পড়া বাবাকে শান্তনা দেবে? ওনার শব্দ যেন ফুরিয়ে গেছে তাও কোনোমতে ধীর কণ্ঠে বললেন – “আলিশার কী দোষ এখানে?”
“সব… সব ওরই দোষ!” আরহামের গলা আবার চড়ে গেলো।
“ও কেন আমার বাচ্চাকে একা ফেলে গেলো? কেন অবহেলা করলো?”
“কোনো মা তার সন্তানের অবহেলা হওয়ার মতো কিছু করতে পারে না।”
“পারে!” আরহাম প্রায় চিৎকার করে উঠলো।
“এই যে, এই মেয়েটা পেরেছে! আমার বাচ্চাকে অবহেলা করেছে, যার জন্য আমার ডোরা আজ জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে…”
–আলিশা হুহু করে কেঁদে ফেললো। হ্যাঁ…সব তার দোষ।
সবই তার। আজ তার অবহেলার কারণেই ডোরা অসুস্থ।
সে কেমন মা? কেন সে নিজের বাচ্চার খেয়াল রাখতে পারলো না? আরহাম তো ঠিকই বলছে…
তারই তো দায়িত্ব ছিলো ডোরাকে আগলে রাখার।

“একদম ন্যাকা কান্না করবি না! এত বাচ্চার প্রতি দরদ থাকলে ওর খেয়াল রাখতে পারিসনি কেন?”
“আমার বাচ্চা…।” কাঁপা কণ্ঠ।
আলিশার জবাবে আরহামের চোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠলো।
“না। ও তোর সন্তান না। ও শুধুই আমার। তোর হলে তুই ওকে অবহেলা করতি না।”
আলিশার বুকের ভেতরটা যেন কেউ ছিঁড়ে নিচ্ছে।
আরহাম আবারও তার দিকে তেড়ে যেতে নিলে শাইনা ছুটে এসে কোনোমতে তাকে আঁটকেছে।
“মেহতাব…আর না বাবা, শান্ত হও!”
আরহাম নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও শাইনা তাকে ছাড়লোনা।
সে আবারও আলিশার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো – “শুনে রাখ, মিসেস আলিশা খান… আমার বাচ্চার কিছু হলে আমি তোকে ছেড়ে দেবো না।”
ঠিক তখনই হঠাৎ একজন ডাক্তার ছুটে এলেন এদিকে।
“আপনারা এসব কী শুরু করেছেন? এটা হসপিটাল… এখানের কিছু রুলস আছে। আপনারা এভাবে চিৎকার-চেঁচামেচি করতে পারেন না।”
ইজাজ খান দ্রুত এগিয়ে এসে মাথা নত করলেন।

“We are sorry, Doctor. এমন আর হবে না।”
–ডাক্তার আর কিছু না বলে তাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন।
ইজাজ খান আবার আরহামকে কিছু বোঝাতে যাবেন, ঠিক তখনই এন.আই.সি.ইউর দরজা খুলে ডাক্তার সাইমন দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এলেন। তার মুখে অস্বাভাবিক গাম্ভীর্য।
তিনি দ্রুত নার্সদের কিছু নির্দেশ দিতে লাগলেন।
নার্সরাও সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলো ভেতরের দিকে।
আরহামের বুকটা ধক করে উঠলো…
সে এক মুহূর্তও দেরি না করে ছুটে গেলো ডাক্তার সাইমনের কাছে…
“আরশানের কন্ডিশন এখন কেমন? ও… ও ঠিক আছে?”
–ডাক্তার সাইমন থেমে তাকালেন আরহামের দিকে।
দেশসেরা রকস্টার আরহাম মেহতাব খান।

এই মানুষটাকে তিনি এতদিন শুধু স্ক্রিনের পর্দায় দেখেছেন। দুরন্ত, প্রাণবন্ত, দুষ্টুমিতে ভরা একজন তারকা হিসেবে।
কিন্তু আজ প্রথমবার সামনাসামনি দেখছেন তাকে।
অথচ, আজ সেই দুরন্ত রকস্টারটার চোখে কোনো তারকাখ্যাতি নেই। আছে শুধু একজন বাবার উৎকন্ঠা।
আরশানের হঠাৎ অসুস্থতার কারণেই আজ সকালেই সবটা জানতে পেরেছেন ডাক্তার সাইমন। যদিও ইজাজ খানের নির্দেশে আরশানের অস্তিত্ব এবং শারীরিক অবস্থার কোনো খবর বাইরে প্রকাশ করতে নিষেধ করা হয়েছে।
তিনি গভীর শ্বাস নিয়ে আরহামের দিকে তাকালেন।
“বেবীর সিচুয়েশন ক্রিটিকাল হচ্ছে..”
আরহামের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
ডাক্তার সাইমন আবারও বললেন,
“ওর শরীরের কিছু অংশে কাঁচের টুকরা ঢুকে গেছে। আমরা নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করছি। কিন্তু…
তিনি থেমে গেলেন।
আরহামের চোখে আতঙ্ক আরও গাঢ় হলো। তার ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠছে…
“কিন্তু কী, ডাক্তার?”
ডাক্তার সাইমন কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললেন,

“আরশানের শরীর এখনো অনেক ছোট আর নাজুক। এবং অনেক রক্তক্ষরণও হয়েছে। এতটুকু একটা বাচ্চার শরীরের জন্য এই আঘাতটা খুবই গুরুতর। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ওকে স্টেবল করা।”
“আমার বাচ্চা ঠিক হয়ে যাবে তো?”
“আমরা চেষ্টা করছি, মেহতাব। এখন শুধু আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
ডাক্তার সাইমনের কথাগুলো কানে যেতেই আরহাম যেন আবারও হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়লো।
মুহূর্তের মধ্যে এগিয়ে গিয়ে সে ডাক্তারের কলার চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললো –
“এই…কিছু পারবো না মানে কী? আমার বাচ্চাকে সুস্থ-সবল অবস্থায় ফিরে চাই আমি। ওর কিছু হলে তোদের কারও লাইসেন্স থাকবে না! ক্যানসেল করিয়ে ছাড়বো আমি!”
ইজাজ খান দ্রুত এগিয়ে এসে আরহামের হাত থেকে ডাক্তারকে ছাড়িয়ে নিলেন।
“মেহতাব! নিজের আচরণ সংযত করো!”
ডাক্তার সাইমন নিজের এলোমেলো কলারটা ঠিক করতে করতে আরহামের দিকে তাকালেন। চোখে বিরক্তি স্পষ্ট।
“একজন দেশসেরা রকস্টারের কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশা করিনি।”
কথাটা শুনে আরহাম আবারও তার দিকে তেড়ে যেতে নিলো।
“তোর আশা প্রত্যাশা নিয়ে ঘাষ কাট তুই! আমার বাচ্চাকে সুস্থ কর। যেভাবেই হোক, আমার বাচ্চাকে সুস্থ কর!”
ইজাজ খান শক্ত হাতে ছেলেকে আটকে রাখলেন।

“মেহতাব! থামো…নিজেকে সামলাও।”
আরহামের বুক তখনও ক্রোধে ওঠানামা করছে। চোখজোড়া লাল, মুঠো শক্ত হয়ে আছে। অথচ সেই রাগের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয় – নিজের সন্তানকে হারিয়ে ফেলার ভয়।
আরহামের এমন পাগলামিতে সবাই যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই পাশ থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন আয়শা।
তিনি এসে আরহামের পাশে দাঁড়ালেন। কণ্ঠটা শান্ত অথচ অদ্ভুত রকমের দৃঢ়।
“সুস্থ করার মালিক আল্লাহ, ডাক্তার নয়। চাওয়ার হলে নিজের রবের কাছ থেকে চাও ; যিনি জীবন দেওয়ার এবং কেড়ে নেওয়ার সক্ষমতা রাখেন।”
আয়শার এক বাক্য যেন আরহামের অন্তর কাঁপিয়ে দিতে সক্ষম হলো। সে মুহুর্তেই স্থির বনে গেলো।
সত্যিই তো…সে একবারও নিজের সৃষ্টিকর্তার কাছে চেয়ে দেখেনি। এতক্ষণ সে ডাক্তারকে রিকুয়েষ্ট করেছে, হুমকি দিয়েছে, রাগ করেছে, নিজের ক্ষমতার কথা বলেছে…

কিন্তু যার হাতে তার ডোরার জীবন-মৃত্যু, তার কাছেই তো সে হাত পাতেনি…
হঠাৎ করেই আরহামের কানে আবার বাজতে লাগলো ডাক্তার সাইমনের একটু আগে বলা কথাগুলো –
“বাচ্চার অবস্থা গুরুতর… সময়ের সঙ্গে তা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।”
“বেবী সারভাইভ করতে পারবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছি না।”
–শব্দগুলো যেন বারবার তার মাথার ভেতর প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করলো। সারভাইভ করতে পারবে না…কোনো নিশ্চয়তা নেই…কোনো নিশ্চয়তা নেই।
আরহামের শরীরটা হঠাৎ ঝাকি দিয়ে উঠলো।
তার সমস্ত রাগ যেন এক মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে এসেছে।
চোখ দুটো ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলো ; ঠোঁট কাঁপছে।
কিন্তু এবার কোনো রাগ নেই। কোনো হুমকি নেই।
শুধু ভয় আর অসহায়ত্ব।
আরহাম ধীরে ধীরে এক পা পিছিয়ে গেলো।
তারপর আরেক পা।
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ পেছন ফিরে ছুটে চলে গেলো সেখান থেকে…
“মেহতাব!”

ইজাজ খান পেছন থেকে ডেকে উঠলেন। কিন্তু আরহাম থামলোনা ; সে ছুটছে…
কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে তা যেন সে নিজেও জানে না।
শুধু একটা কথাই বারবার তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে…
“চাওয়ার হলে নিজের রবের কাছ থেকে চাও।”
এদিকে, আরহাম চলে যাওয়ার পরও আলিশা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
তার চোখের সামনে একের পর এক ভেসে উঠছে তার বাবা, তার ভাই, আর এখন তার প্রাণের চেয়েও প্রিয় সন্তান ডোরার মুখ। একসাথে এতগুলো আঘাত যেন আর সহ্য করতে পারছে না মেয়েটা। তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত রুকমের ভারী হয়ে আসছে।

–নিজের অজান্তেই সে বিড়বিড় করছে…
“সব আমার জন্য… সব আমার দোষ… আমি কেন ডোরার খেয়াল রাখতে পারলাম না?”
চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে অবিরাম।
“আমি কেমন মা? আমি কেমন মা যে কিনা নিজের বাচ্চাটাকেও আগলে রাখতে পারলাম না…”
আলিশার মাথাটা হঠাৎ ঝিমঝিম করতে শুরু করেছে।
চারপাশটা কেমন অন্ধকার হয়ে আসছে…
অনেক চেষ্টা করেও নিজের শরীরটা আর সোজা রাখতে পারলোনা সে।
আরহাম চলে যাওয়ার প্রায় দুমিনিট পরই হঠাৎ করেই আলিশার নিস্তেজ শরীরটা ফ্লোরের উপর লুটিয়ে পড়লো…

তোমার আমার গল্প পর্ব ৫১

–আলিশা!”
নীলা চিৎকার করে ছুটে এলো তার কাছে…
আয়শাও দৌড়ে এলেন। কিন্তু আলিশার কোনো সাড়া নেই…

তোমার আমার গল্প পর্ব ৫২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here