নূর ই মহব্বত পর্ব ৩৫
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী
কেটে গেছে দীর্ঘ কয়েক মাস। হালকা শীতের আমেজমাখা এক মিষ্টি সকাল। ফজরের নামাজ পরে নওমি বসে ছিলো। এখন ঘুম আসে না তার। কিন্তু যখন ঘুম পায় তখন হাজার চেষ্টা করেও যেন চোখ মেলে তাকাতে পারে না, চোখের পাতা দুটো ম-রণ ঘুমে ঢলে পড়তে চায়। দেখতে দেখতে ওর প্রেগন্যান্সির সাতটা মাস চলছে। ইদানিং অদ্ভুত সব শারীরিক পরিবর্তন এর সাথে নানান রকম বায়না আর মেজাজের ওঠানামা যোগ হয়েছে। ঘুম আসছে না দেখে সে একটা একটা ছোট উলের সোয়েটার নিয়ে বসেছে যেটা সে বুনছিল।
নওমি নিজের বেশ বড়সড় হয়ে ওঠা বেবি বাম্পের ওপর নিজের হাতটা রাখল। ও হাত রাখতেই ভেতরের প্রাণটা যেন জানান দিল নিজের অস্তিত্বের। ভেতর থেকে একটা শক্ত ছোট্ট লা’থি এসে লাগল ওর হাতের তালুতে। আচমকা এই মিষ্টি ধাক্কায় নওমির মুখ থেকে একটা মৃদু “আহ” শব্দ বেরিয়ে এল, তবে সেই ব্যথার রেশটুকু মিলিয়ে গেল এক তৃপ্তির হাসিতে। সে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে ছোট্ট করে নওমি বলল,
– কী রে সোনা? তুমিও কি তোমার মাম্মার মতো এখন থেকেই রাত জাগা পাখি হয়ে উঠছ? তোমার বাবা জানতে পারলে কিন্তু আমাদের দুজনকেই কড়া কড়া লেকচার শোনাবে!
ঠিক তখনই মসজিদ থেকে ফিরে আসলো আহিল। নামাজ পড়েই ফিরে এসেছে। আগে নামাজ পরে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করতো এক প্রকার নিয়ম করেই ফজরের পর কিছুক্ষণ পার্কে হাঁটার অভ্যাস ছিল, কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে সেই রুটিনে কড়া কাটছাঁট পড়েছে। এখন নামাজ শেষ হতেই পা চালিয়ে সোজা বাড়ির পথ ধরে; নওমিকে একা রেখে এক মুহূর্তও যেন ওর বাইরে মন টেকে না।
দরজা খুলে ঘরে পা রাখতেই আহিলের তীক্ষ্ণ নজর চলে গেল বিছানার দিকে। নওমিকে ওভাবে উলের কাঁটা-সুতো হাতে জেগে বসে থাকতে দেখে ওর দুই জোড়া ভুরু কুঁচকে একাকার হয়ে গেল। মুখে ভর করলো একরাশ গম্ভীরতা। বিছানায় সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কিঞ্চিৎ ধমকের সুরে বললো,
– আবার সকাল সকাল এই উলের কাজ নিয়ে বসেছ তুমি? এত করে বলি ফজরের পর একটু চোখ বুজে বিশ্রামের চেষ্টা করতে, তা না! আমার ইনস্ট্রাকশন কি তুমি আজকাল একদমই পাত্তাই দিচ্ছ না?
নওমি বাচ্চাদের মতো মুখ করে বললো,
– একদম ঘুম আসছিল না। আজকাল ফজরের পর আর চোখেই ঘুম থাকে না। কিন্তু বেলা বাড়লে যখন ঘুম পায় তখন মনে হয় টেনেও আর চোখের পাতা খুলতে পারছি না!
আহিল হাসলো। ওর চুল এলোমেলো করে দিয়ে বললো,
– তাও ঘুমনোর চেষ্টা করবে! তুমি তো চেষ্টায় করো না বরং উঠে এইসব নিয়ে বসেছো!
নওমি সোয়েটারটা একপাশে সরিয়ে রেখে একটু মুখ ফুলিয়ে অভিমানী গলায় বলল,
– সারাদিন এই চার দেয়ালের মাঝে শুয়ে শুয়ে আমার দম আটকে আসে আহিল! আর তাছাড়া, আপনার এই পুচকু সন্তান এত দুষ্টু হয়েছে যে সকাল থেকে আমাকে একটুও শান্তিতে বসতে দিচ্ছে না। সারাক্ষণ শুধু লাথি মা’রছে! এমনভাবে ঘুমটা ভাঙাল যে আর চোখেই ঘুম আসছিল না। তাই ভাবলাম বসে না থেকে সোয়েটারটা একটু এগিয়ে রাখি।
আহিল ওর পাশে বসলো। এমনি ফুলা গাল তার উপর অভিমান করে আরো গাল ফুলানোতে আরো সুন্দর লাগছে। আহিল হেসে ওর গালে একটা টোকা দিয়ে বললো,
– গাইনোকোলজিস্টের ওই থিওরিগুলো তো তোমার আদনানের সময় থেকেই মুখস্থ! এই থার্ড ট্রাইমেস্টারে এসে স্লিপিং প্যাটার্ন একটু চেঞ্জ হবেই। তার ওপর আমার এই পুচকু সন্তান তো জিনের দিক থেকে ডক্টর আযলানের মতোই একটু বেশি হাইপার অ্যাক্টিভ হয়েছে মনে হচ্ছে! রাত-বিরেতে মাম্মাকে বড্ড জ্বালাচ্ছে, তাই না?
নওমি আহিলের এই রসাত্মক কথা শুনে ঠোঁট উল্টে বড্ড আদুরে ভঙ্গিতে তাকাল। এরপর আহ্লাদী আর নালিশের সুরে বলল,
– কী করব বলুন তো? আদনানের সময় কত কষ্ট একা একা মুখ বুজে সহ্য করেছি, তখন তো সেসব গায়েই মাখিনি। আর এখন? এখন তো আপনার এই সারাক্ষণের লাই আর আদরে আদরে আমার স্বভাবটা একদম খারাপ করে ফেলেছেন! সামান্য একটু কষ্টও এখন আর সহ্য করতে পারছি না। অল্পতেই বড্ড বেশি ওলটপালট লেগে যায় শরীর আর মনে।
আহিল মুচকি হেসে বললো,
– স্বভাব খারাপ হয়েছে তো ডক্টরের কী দোষ বলো? আমি তো একজন পারফেক্ট ডক্টর তাই না? তাহলে পেশেন্টের পারফেক্ট দেখাশোনাও তো করতে হবে।
নওমি ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,
– আপনার এই অতিরিক্ত পারফেকশনিজমই তো আমার বারোটা বাজাচ্ছে! দিনে দশবার চেকআপ করতে চাওয়া, কথায় কথায় দুধ আর ফলের বাটি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এসব কি কোনো সাধারণ মানুষের সহ্য হয়? আপনি ডক্টর হিসেবে যতখানি কড়া, স্বামী হিসেবে কিন্তু তার চেয়েও বেশি ডমিনেটিং!
আহিল নিজের নামে এই মিষ্টি অভিযোগে বিন্দুমাত্র দমে গেল না বরং মৃদু হাসলো।
– ডমিনেটিং না হলে কি এই অবাধ্য পেশেন্টকে কন্ট্রোল করা যায় নাকি? আমি তো…
আহিল ওর বাক্যটা শেষ করার আগেই নওমির একটা চাপা আর্তনাদ কানে এল। নওমি হঠাৎ পেটে হাত দিয়ে সোজা হয়ে বসল। মুখের অবয়বটা ব্যথায় কিছুটা কুঁচকে গেল ওর। আহিল চমকে উঠে তার ডক্টর সত্তাটা যেন সজাগ হলো! তড়িঘড়ি করে নওমির মুখোমুখি বসে চোখে মুখে তীব্র দুশ্চিন্তা ফুটিয়ে তুলে বললো,
– কী হয়েছে নওমি? কোথায় খারাপ লাগছে বলো?
নওমি ওনার এই অস্থিরতা দেখে ব্যথার মাঝেই মৃদু হাসল। ও আহিলের একটা হাত টেনে নিয়ে নিজের পেটের ওপর ঠিক ডান পাশটায় রাখল। যেখানে এইমাত্র খুব শক্ত একটা ধাক্কা অনুভূত হয়েছে। ও একটু মুখ ভার করে বাচ্চার মতো করে নিজেরই বাচ্চার বিরুদ্ধে নালিশ করার মতো করে বলল,
– আপনার এই ডমিনেটিং স্বভাবের কথা বলছিলাম না? দেখুন, আমার কথা শুনে জুনিয়র আহিল কেমন ক্ষেপে গেছে! একদম বাপের হয়ে ওকালতি করতে এইমাত্র কষে একটা লা-থি বসাল। ডক্টর সাহেব, আপনার সন্তান কিন্তু এখন থেকেই আপনার বিরুদ্ধে কোনো কথা সহ্য করতে পারছে না!
নওমির কথা শুনে আহিলের বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে ওঠা সেই তীব্র ভয়টা এক ফুঁৎকারে উড়ে গিয়ে সেখানে ভর করলো এক অন্যরকম অনুভূতি! আহিল হাতটা আরেকটু চেপে রাখলো নওমির পেটের উপর। অদ্ভুত ব্যাপার, বাবার হাতের স্পর্শ পেতেই ভেতরের সেই চঞ্চল পুচকুটা যেন এক নিমেষে শান্ত হয়ে গেল! আহিল একবার মুচকি হেসে নওমির দিকে তাকালো তারপর ঝুঁকে ওর পেটের কাছে মুখ নিয়ে বড্ড আদুরে আর ফিসফিসে গলায় এমনভাবে বললো যেন সত্যি সত্যি শুনতে পাবে,
– শোনো পুচকু সোনা, বাবার ওপর যত খুশি ভক্তি দেখাও তাতে বাবার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তাই বলে মাম্মাকে একদম কষ্ট দেওয়া যাবে না। মাম্মা কষ্ট পেলে কিন্তু বাবার খুব কষ্ট হয়। তুমি তো বাবার পুচকু চ্যাম্পিয়ন, তাই না? এখন একদম শান্ত হয়ে থাকো তো দেখি! দুনিয়ায় আসলে বাবাকে যত ইচ্ছে জ্বালিও কিন্তু মাম্মাকে না হু?
নওমি একদৃষ্টে আহিলের এই রূপটা দেখছিল। আহিলের কথা শুনে কে হেসে ফেললো। ওর চুলের ভাঁজে আঙুল গলিয়ে বললো,
– আপনি সত্যিই পাগল আহিল!
আহিল ওর দিকে তাকিয়ে বললো,
– হ্যাঁ পুচকুর মায়ের পাগলই তো!
নওমি খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো।
কয়েকদিন পরের কথা, নিঝুম রাত; সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু বেডরুমে আহিলের ঘুমের বারোটা বেজে গেছে!
বিছানায় আরাম করে ঘুমাচ্ছিল আহিল। হঠাৎ করেই ওর গায়ের ওপর একটা ধাক্কা লাগল। চোখ মেলে তাকাতেই দেখল, আবছা নীল নাইট বাল্বের আলোয় নওমি ওর বুকের ওপর দুই কনুই ভর দিয়ে, গালে হাত রেখে একদৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ওর ফর্সা মুখটা অভিমানে পুরো ফুলে আছে।
আহিল ধড়ফড় করে উঠে বসতে চাইলো কিন্তু নওমি ওর উপর থাকায় ও উঠতে পারল না। ও সেভাবেই নওমির দিকে তাকিয়ে বড্ড ব্যস্ত হয়ে শুধাল,
– কী হয়েছে নূর? কোনো প্রবলেম হচ্ছে? পা কাম’ড়াচ্ছে, নাকি পেটে ব্যথা?
নওমি ওর ঝটকা দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বসল। কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,
– আপনার খালি রোগ আর প্রবলেম! আমি কি আপনার হাসপাতালের পেশেন্ট নাকি? আমার কিচ্ছু হয়নি!
আহিল একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। ও শান্ত হয়ে বললো,
– আচ্ছা বাবা সরি। তাহলে মাঝরাতে এভাবে রাগ করে বসে আছ কেন? আদনান তো ঘুমাচ্ছে। তোমার কি ঘুম আসছে না?
নওমি যেন কাঙ্খিত আলাপ খুঁজে পেল। আহিলের দিকে তাকাতেই আহিল দেখলো নওমির চোখ দুটো টইটুম্বুর জলে ভরা যা দেখে আহিল রীতিমতো ভড়কে গেল। নওমি ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,
– আপনার এই সন্তান বড্ড পচা! ও আমাকে ঘুমাতেই দিচ্ছে না। আর তার চেয়েও বড় পচা হচ্ছেন আপনি! আপনি এত শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন কীভাবে? আমার এদিকে ছটফটানি লাগছে আর আপনি নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন? আপনার ঘুম আসছে আমাকে এভাবে জাগিয়ে রেখে?
আহিল ফুঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললো,
– আচ্ছা আমাকে উঠতে দাও তারপর তোমার সাথে জেগে থাকবো প্রমিস।
নওমি উঠে বসলে আহিলও উঠে বসে হাই তুলে বললো,
– এবার বলো কি হয়েছে ম্যাডামের?
– ম্যাডামের কী হয়েছে সেটা তো ডক্টর সাহেবের আগেই বোঝা উচিত ছিল। আমার না এখন আইসক্রিম…
আহিল চোখ বড় বড় করে বললো,
– আইসক্রিম? এই ঠান্ডায় আইসক্রিম খেয়ে ঠান্ডা লাগানোর জন্য?
নওমি তড়িঘড়ি করে বললো,
– না না আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করছিল আরো কিছুক্ষণ আগে এখন আর ইচ্ছে করছে না। এখন ইচ্ছে করছে…
– কি?
– এই মুহূর্তেই কাঁচা আম দিয়ে তেঁতুলের আচার খেতে ইচ্ছে করছে!
আহিল চোখ দুটো বড় বড় করে ফেলল। ও ঘড়ির দিকে তাকাল রাত তখন পৌনে চারটে! ও অসহায় ভঙ্গিতে বলল,
– নওমি, এই মাঝরাতে আমি কাঁচা আম আর তেঁতুলের আচার কোথায় পাব? তার ওপর এই শীতের শুরুতে কাঁচা আম তো বাজারেও পাওয়া যাবে না!
নওমি হেসে বললো,
– আরে আপনার বাজারে খুঁজতে হবে না তো! আমাদের ফ্রিজে তেঁতুল আছে আর গতকালকে আপনার ফুপি গ্রাম থেকে যে আম পাঠালো না? ওখানে কিছু কিছু কাচা আম আছে একটু খুঁজে দেখলেই পাবেন
আহিল নওমির মুখে এমন অকাট্য আর সুনির্দিষ্ট রসদ এর হদিস পেয়ে এক মুহূর্তের জন্য যেন বোবা হয়ে গেল। ও চোখ দুটো সরু করে নওমির দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ফেলল।
– বাহ্ ম্যাডাম! ফ্রিজে কোন কোন খোপে কী কী লক করা আছে, সব তোমার নখদর্পণে। ডক্টর আযলানকে আজ তুমি সত্যিই চো র বানিয়ে ছাড়বে!
নওমি ওর এই কথায় বিন্দুমাত্র লজ্জিত না হয়ে উল্টো আহ্লাদে মাথা দুলিয়ে বলল,
– চো র কেন হতে যাবেন? আপনি তো আপনার কলিজার আবদার পূরণ করতে যাচ্ছেন। নিজের বাড়িতে কেউ চো র হয় নাকি? যান না আহিল,! পুচকুটা ছটফট করছে আচারের জন্য। আপনি কি চান আপনার সন্তান একটা আমের আচারের জন্য জন্মদাগ নিয়ে পৃথিবীতে আসুক?
আহিল এবার আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। ও বিছানা থেকে নামার জন্য উদ্যত হয়ে নওমির গালে আলতো একটা টোকা দিয়ে বলল,
– না একদমই চাই না! তবে মেডিকেল সায়েন্সে এই জন্মদাগের কোনো ভিত্তি নেই তবুও যাচ্ছি আমি।
আহিল বিছানা থেকে নামতে গেলেই নওমি চট করে পেছন থেকে ওর টি-শার্টের হাতাটা টেনে ধরল। আহিল কিছুটা অবাক হয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখল, নওমির মুখের সেই চঞ্চল হাসিটা উধাও হয়ে সেখানে কেমন এক অপরাধবোধ ভর করলো।
– থাক যেতে হবে না।
মুখ ভার করে বললো নওমি। আহিল ভ্রু কুঁচকে বললো,
– কেন? আচার খাবে না?
– উহু আমি বড্ড সেলফিশের মতো নিজের কথাই ভাবছিলাম। আপনার ঘুমটা একদম নষ্ট করে দিলাম। কাল তো সকাল সকালই আপনাকে হাসপাতালে ছুটতে হবে, কত জটিল সব পেশেন্ট দেখতে হয়! আপনার তো প্রপার রেস্ট দরকার। আর আমি সামান্য একটা আচারের জন্য আপনাকে এই শীতের মাঝরাতে আপনাকে জাগিয়ে দিলাম! আপনি ঘুমান তো আহিল, আমার এখন আর আচার খেতে ইচ্ছে করছে না, সত্যি!
নওমি ওনার হাতটা ছেড়ে দিয়ে শুয়ে পড়ার জন্য এগোতেই আহিল ওর হাত টেনে ধরলো,
– অ্যাই কোথায় যাচ্ছো! চুপচাপ বসে থাকো আমি নিয়ে আসছি।
– না না দরকার নেই আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন।
আহিল গম্ভীর হওয়ার ভান করে বললো,
– চুপ থাকো বেশি বুঝো তুমি?
নওমি চুপ হয়ে যেতেই আহিল ওর পাশে বসলো।
– তুমি আমাকে কি ভাবো হ্যাঁ? এইটুকুতেই আমার সমস্যা হবে? তোমার কষ্টের ভাগ নেয়ার চেষ্টা করছি নওমি! সেটাও তুমি দিবে না? আমার অপরাধবোধ কমানোর একটা ওয়ে যখন আল্লাহ দিয়েছেন তখন আমার বাচ্চার আর বাচ্চার মায়ের প্রতিটা আদুরে আবদার পূরণ করার সৌভাগ্য আমি কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চাই না। আর হাসপাতালের কাজ? এই আহিল এতটাও দুর্বল নয় নূর যে সামান্য কয়েক ঘণ্টার কম ঘুমে ভেঙে পড়বে। তাই তোমার কোনো ইচ্ছে বিসর্জন দিতে হবে না তুমি বসো আমি চট করে আসছি!
আহিল পা টিপে টিপে ঘরের দরজা খুলে নিচে রান্নাঘরের দিকে রওনা হলো।
থমথমে মাঝরাতে ডক্টর আযলান ফ্রিজ হাতড়ে অবশেষে ফুপির পাঠানো সেই কাঁচা আম আর তেঁতুল উদ্ধার করল… মিনিট পনেরো পর যখন ঘরে ফিরল, ওর এক হাতে একটা ছোট কাঁচের বাটি। তাতে চমৎকার করে কাসুন্দি, বিট লবণ আর কাঁচামরিচ দিয়ে সেই কাঁচা আম আর তেঁতুলের একটা লোভনীয় ভর্তা মাখানো।
নওমি আচারের বাটিটা দেখেই বিছানার ওপর সোজা হয়ে বসল। আহিল মুচকি হেসে বাটিটা ওর দিকে এগিয়ে দিলে নওমি হাসিমুখে সেটা নিলো। এক চামচ খেতেই টক আর ঝালের তীব্রতায় নওমির চোখ-মুখ কুঁচকে গেল পরক্ষণেই আহিলের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো। খেতে খেতে হঠাৎ ঘুমের ঘরেই আদনান হালকা কেঁদে উঠলো। ঘুমের ঘোরেই হয়তো কোনো স্বপ্ন দেখে কেঁদে উঠেছে বাচ্চাটা।
আদনানের মৃদু কান্নার শব্দ কানে যাওয়া মাত্রই নওমির পুরো অবয়বটা বদলে গেল। একটু আগের সেই চঞ্চল, আচারের জন্য আহ্লাদ করা জেদি মেয়েটার কোনো অস্তিত্ব রইল না। ও হাতের আচারের বাটিটা পাশের সাইড টেবিলে নামিয়ে রাখল। নিজের শরীরের ভারী ভাব আর ক্লান্তি উধাও হয়ে গেল এক লহমায়। ও অত্যন্ত সাবধানে আদনানের পাশে ফিরে ওকে এক হাতে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরলো। ওর পিঠে হাত বুলিয়ে বলল,
– কি হয়েছে? এই তো বাবা, মা আছে তো। মায়ের কলিজা সোনা আমার, কিচ্ছু হয়নি।
আদনান মায়ের চেনা ঘ্রাণ পেয়ে আবার নিস্তেজ হয়ে ঘুমে তলিয়ে গেল।
বিছানায় বসে আহিল একদৃষ্টিতে নওমির এই রূপান্তরটা দেখছিল। যে মেয়েটা একটু আগে নিজে বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে মাঝরাতে আচারের জন্য কেঁদে ঘর মাথায় করছিল, ওর ওপর পুরো অধিকার খাটিয়ে নালিশ করছিল সেই মেয়েটাই নিজের সন্তানের সামান্য একটু কান্নায় নিমেষের মধ্যে কতটা পরিণত আর দায়িত্বশীল একটা মা হয়ে উঠল!
নূর ই মহব্বত পর্ব ৩৪
– তুমি সত্যিই অদ্ভুত ম্যাজিক নওমি! একটু আগে যেই মেয়েটাকে বাচ্চার মতো সামলালাম সে-ই আবার এত সুন্দর করে একটা বাচ্চাকে আগলে রাখল! তোমাকে যত দেখি, প্রতিদিন আমি তোমার প্রেমে নতুন করে পড়ি।
নওমি হাসলো ওর কথা শুনে। আচারের বাটিটা হাতে তুলে নিতে নিতে বললো,
– আপনার আদর আর লাই পেয়ে আমি আপনার কাছে যতই বাচ্চা হয়ে থাকি না কেন আহিল, আমাদের সন্তানদের কাছে তো আমি শুধুই তাদের মা। মায়েদের কি কখনো নিজের কথা ভাবলে চলে?
