প্রণয়ের বিরহ পর্ব ১২

915

প্রণয়ের বিরহ পর্ব ১২
তাসনিয়া রহমান স্নিগ্ধা

রাত মনে হয় এগারোটার দিকে, দরজা নক করছে কেউ।কেয়া আর আমি একসাথে বসে আড্ডা জমিয়েছি, পূর্ব এখনও বাড়িতে আসে নি। দরজায় নক করতে দেখে কেয়া উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। সহসা রুমে ঢুকে এলো সিয়া।ফাইরুজের বেস্ট ফ্রেন্ড প্লাস পূর্বের কাজিন হয় ও। রুমে এসেই আমার মুখের উপর একটা পেপার ছুড়ে দিয়ে বললো,,,

‘ এই খানে সই করো কুইক। তোমার মতো সস্তা মেয়েদের কাছে আমার সময় নষ্ট করার মত কোন সময় নেই।'(সিয়া)
আমি আর কেয়া দু’জনেই খুব অবাক হয়ে গেছি। কিসের কাগজ কিছু না জেনেই সই করবো কেন,আর ওকে তো আমি এই বাড়িতে প্রথম দেখছি। পূর্বের রুমের সামনে ওর ছবিটা দেখে খুব অবাক হয়েছিলাম, পরে কেয়ার থেকে জেনেছি ও পূর্বের কাজিন। তাহলে হঠাৎ করে ও এমন করছে কেন । কেয়া আমার পাশে এসে দাঁড়াল।ওর মুখের দিকে তাকালাম আমি,ওও কিছু বুঝতে পারছে না।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ কি এটা?আর এখানে সই করে কি হবে, তা না জেনে আমি সই করবো না।'(আমি)
‘ কি বললে?'(সিয়া)
তখনই পূর্ব রুমে চলে এলো। পূর্ব কে দেখেই সিয়ার মুখ হাসি হাসি হয়ে গেছে, আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,,
‘ ভাবী, ভাইয়া সই টা করে দিতে বলেছে তাড়াতাড়ি সই করে দাও।'(সিয়া)

পূর্ব আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। কিছু বলছেন না উনি, আমি ও বুঝে উঠতে পারলাম না সিয়ার ওমন অদ্ভুত ব্যবহার।পুরো বাড়িটাই এদের অদ্ভুতুড়ে তেমনই বাড়ির মানুষ গুলোও অদ্ভুত। কিছু না বলে চুপচাপ সই করে দিলাম।সিয়া কাগজ টা নিয়ে চলে গেল,ওর পিছুপিছু কেয়া ও চলে গেল।

রাত তিনটা বাজছে। রুমে বেডে পূর্ব স্যার ঘুমাচ্ছেন আর আমি বেলকনিতে বসে আছি। কিছুই মাথায় ঢুকছে না আমার এই মানুষগুলোর ব্যবহার।পুরো বাড়িতে মনে হয় একমাত্র তূর্য ভাইয়া আর পূর্ব স্যার ই স্বাভাবিক সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ আর বাকিরা খুব অদ্ভুত। তাহমিমা বিকেলেই বাসায় ফিরে গেছে,মা বারবার কল করছিল ওকে বাসায় যাওয়ার জন্য। চোখ বন্ধ করে এদের নিয়েই ভাবছিলাম তখন ফোনটা হঠাৎ করে বেজে উঠলো। ফোন হাতে নিলাম, দেখি তাহমিমা কল করেছে। হঠাৎ এতো রাতে ওর কল, বাসায় কিছু হলো নাকি আবার? তাড়াতাড়ি করে কল রিসিভ করলাম,,,

‘ হ্যালো,তামু।কি হয়েছে, বাসায় সব ঠিক আছে?'(আমি)
‘ আপু,আপু চুপ। একদম আস্তে আস্তে কথা বল তুই ।(প্রায় ফিসফিসিয়ে বললো তাহমিমা)
আমি গলার আওয়াজ যথাসম্ভব কমিয়ে ফেললাম।তাহমিমার আওয়াজ শুনেই বোঝা যাচ্ছে বেশ ভয় পেয়ে আছে ও। রুমের দিকে একবার উকি দিয়ে দেখলাম স্যার জেগে গেছেন কিনা!নাহ উনি ঘুমাচ্ছেন

‘ আচ্ছা,বল কি হয়েছে?আর তুই এতো ভয় পেয়ে আছিস কেন?'(আমি)
‘ আপু আমার কথা তুই বিশ্বাস কর।তোর সামনে অনেক বিপদ অপেক্ষা করছে আপু। আমি তোর শশুর বাড়ীর লোকদের সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য জানতে পেরেছি যেগুলো আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। সাথে আমার হবু স্বামী শাহরিয়ার চৌধুরী তূর্যের ব্যাপারেও।’ (তাহমিমা)

‘ এসব কি বলছিস তুই তামু?'(আমি)
‘ হ্যা রে আপু। দুলাভাই মানে আজমীর চৌধুরী পূর্ব সে ও ওদের মতোই রে,আপু তুই এক কাজ কর। তুই ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে আয়। বাড়িতে চলে আসিস না আবার, আমি তোর শশুর বাড়ীর সামনে এসে অপেক্ষা করছি তোর জন্য। তুই যে কোন ভাবেই হোক ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আয়, এরপর তোকে আমি সব ডিটেইলস বলছি।(তাহমিমা)

‘ কিন্তু,,,,,!'(আমি)
‘ এখন কোন কিন্তু না আপু। আমি যা বলছি তাই কর,কেউ যেন ঘুর্নাক্ষরেও টের না পায় আপু।কেউ জানতে পারলে তুই শেষ ‘(তাহমিমা)

আর বিশেষ কিছু বলার আগেই ফোন টা কেটে গেল। তাহমিমার কথা শুনে হাত পা ঘামতে শুরু করলো আমার। এসব কি বললো ও?ওর আবার কিছু হলো না তো,কল টা ওভাবে কেটে দিল যে।তড়িঘড়ি করে রুম থেকে বের হতে যাবো তখনই মনে পড়লো একটু শব্দ হলেই স্যার জেগে উঠতে পারেন। সাবধানে পা ফেলে রুমের বাইরে বেরিয়ে এলাম। দরজা ভালো করে লাগানো ছিল না তাই দরজা খুলতে কোনো সমস্যা হয়নি।

পা টিপে টিপে রাজ মহল থেকে বেরিয়ে এলাম বাইরে। গেটের কাছে দারোয়ান খালেক চাচা ঘুমাচ্ছেন বসে বসে।অতি সন্তর্পণে গেট খুলে বাইরে বের হলাম, বেশি পাওয়ারি লাইটের আলোয় চারদিকে দিনের মতো ফর্সা লাগছে। গেটের বাইরে এসে একটু দূরে এসে দাঁড়ালাম।

তখনই মেসেজ এলো,সিন করে দেখি তাহমিমা বাড়ি থেকে একটু দূরে একটা বট গাছ আছে সেখানে যেতে বলেছে। ব্যাপারটা একটু খটকা লাগলো আমার।ও আমার সাথে এতো রাতে দেখা করতে চাইছে করুক কিন্তু এখানেও তো দেখা করতে পারে। এখানে তো তেমন কেউই নেই, দারোয়ান চাচাও যে ঘুমাচ্ছেন এটা তো ওর জানা র কথা। তাহলে বট গাছের ওখানে ডাকলো কেন?

আফসানা চৌধুরী সোফায় বসে বসে ঝিমুচ্ছিলেন নিজের রুমে। পাশেই আনোয়ার চৌধুরী কিসের সব বই পত্র ঘাটছেন হন্নে হয়ে।এক পর্যায়ে তা খুঁজে না পেয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, আচমকা চেঁচানো তে আফসানা চৌধুরী ধড়মড়িয়ে উঠলেন।
‘ কি হয়েছে তোমার? খুঁজে পাওনি এখনও?'(আফসানা চৌধুরী)

‘ না। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে এটা কেউ এখান থেকে সরিয়ে ফেলেছে।কেউ টের পেয়ে গেছে এটা এখানে ছিল।'(আনোয়ার চৌধুরী)
কন্ঠে ভয় কাজ করছে আনোয়ার চৌধুরীর । আফসানা চৌধুরীর কপালে ও ভাঁজ পড়েছে, কথাটা শুনে।
‘ কিন্তু কেউ তো জানে না এটার সম্পর্কে তাহলে কি করে?'(আফসানা চৌধুরী)

‘ তুমি ভালো করে মনে করে দেখো আফসানা, বিগত কয়েক দিনের মধ্যে আমাদের রুমে কি কেউ এসেছিল? কোন অল্প বয়সী মেয়ে বা বাচ্চা মেয়ে! ভালো করে মনে করার চেষ্টা করো।'(আনোয়ার চৌধুরী)
ঠোঁট উল্টালেন আফসানা চৌধুরী। কিছুই মনে পড়ছে না উনার।মগজ আঁতিপাঁতি করেও মনে করতে পারলেন না যে এই রুমে কেউ এসেছিল কি না। অসহায় ভঙিতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। আনোয়ার চৌধুরী ধপ করে বেডে বসে পড়লেন , শরীর অবশ হয়ে আসছে উনার।

‘ কি হবে এবার?'(আনোয়ার চৌধুরী)
‘ পূর্ব কে ডেকে বলবো এই ব্যাপারে?'(আফসানা চৌধুরী)
‘ না! পূর্ব একবার যদি জানতে পারে যে ওটা হারিয়ে গেছে তাহলে বুঝে নিও সেদিন এই পৃথিবীতে তোমার আর আমার শেষ দিন হবে।’

প্রণয়ের বিরহ পর্ব ১১

কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন আনোয়ার চৌধুরী। ভয়ে অস্থির হয়ে পড়ছেন তিনি। হঠাৎ করেই উনার বুকে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হলো, বুকে হাত দিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন। আফসানা চৌধুরী একটা চিৎকার দিয়ে স্বামীকে ধরতে গেলেন কিন্তু পারলেন না চিৎকার করতে, না পারলেন উনাকে ধরতে। পাথরের মত জমে গেছেন তিনি,,,,,,,

প্রণয়ের বিরহ পর্ব ১৩