প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৫
নীতি জাহিদ
ঝড়ো বাতাস, ভেজা ভেজা আবহাওয়া, জোর করে বন্ধুরা জয়েন করতে বললো বারবিকিউ পার্টিতে । কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ জয়েন করলো। নাচ গান সব হচ্ছে। মোনা ইমরান একপাশে বসে আছে। মোনার মনে হলো ইমরানের বন্ধুদের সবাই এই বয়সে সুন্দর, স্মার্ট। কিন্তু ইমরান এদের মাঝে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। ওর গায়ের রঙ তামাটে বর্ণ। এরপরো এত সুন্দর কেনো? চোখের চশমায় কিছুটা মধ্যবয়সী লাগছে তবুও সুন্দর। হয়ত মোনার নিজের পুরুষ বলেই! অথচ এদের মাঝে অনেকেই বেশ সুদর্শন। নিজে নিজে হাসছে। মোনার মিটমিট হাসিতে ইমরানের চোখ গেলো। ইমরান কানের কাছে ধীরে বললো,
– আমার এখানে ভালো লাগছেনা।
– কেনো?
– ভিড়।
– চলে যাবেন?
– আরেকটু বসি। ইশান বাচ্চাদের সাথে মিশছে এটাই ভালো লাগছে। ধন্যবাদ মোনালিসা।
– কেনো?
ইমরান হাসছে। মোনা বুঝতে পেরেছে ইমরানের ধন্যবাদ দেয়ার কারণ। ইশান মিশতে চায়নি বাচ্চাদের সাথে মোনা বুঝিয়ে পাঠিয়েছে। ইমরান দূর থেকে তা লক্ষ্য করেছে। মন মত কেউ না হলে ইশান প্রথমে মিশতে পারেনা। বাবার এই স্বভাব ভালো ভাবেই ছেলে রপ্ত করেছে। ইমরান চায় না ছেলে অসামাজিক হোক।
মোনা হেসে বললো,
– ইশান কিন্তু আপনার চেয়েও বেশি আত্মসম্মান প্রবন।
– হুম।
রাতে সকলে সী ফুড টেস্ট করছে। সবাই একসাথে বসেছে। ইশান অক্টোপাস খেতে খেতে বললো,
– মা, অক্টোপাস আমি দেশের বাইরেও টেস্ট করেছি বাট দিস ওয়ান ইজ বেস্ট। ঢাকায় পাবো?
– বাসায় খাবে?
– হুম ফুফিকে খাওয়াবো।
জহির দূর থেকে বলে,
– ইমরান ইশান কি আইরিন আপারে খাওয়ানোর কথা বলতেছে?
ইমরান হাসছে মাথা নেড়ে। জহির বলে উঠলো,
– ব্যাটা এই ভুল জীবনেও করিস না। ফুফি তোরে ঝাঁটা নিয়া দৌঁড়াবে। আমরা কাঁকড়া খাওয়াতে গেছিলাম একবার, আপা আমাদেরকে তোদের বাড়িতেই যাইতে মানা করে দিছে।
– সিরিয়াসলি? পাপা ফুফি খাবেনা?
ইমরান মাথা নেড়ে বলে,
– না বাবা, ফুফি খায়না। ফুফি বাঙালি খাবার পছন্দ করে।
– কিন্তু এটা অনেক মজা।
– সবার টেস্টবাড তো সেম না পাপা।
আড্ডায় আনন্দে সময়টা কেটে গেলো। যে যার যার রুমে চলে গেলো। ইশান নিজের রুমে ঢুকে যাওয়ার সময় বাবাকে বললো,
– রুমে ঢুকে ঝামেলা পেতে পারো। আমাকে বকা দিতে আসবে না। কথাও বলতে আসবেনা। আমি কিছুই জানিনা এসবের। আমাকে যা বলা হয়েছে আমি তা করেছি।
ইমরান মোনা ভ্রু কুঁচকে ফেললো। ইমরান প্রশ্ন করলো,
– কি করেছো তুমি?
– মা, পাপাকে বলো যেন বকা না দেয়।
মোনা নিজেও কিছুটা ঘাবড়ে গেলো।
– আচ্ছা যাও। আমি দেখছি। খারাপ কিছু করোনি তো?
– না না একটা জিনিস রেডি করতে গিয়ে এ পাশ ওপাশ করা হয়েছে। আমি কিছু করিনি।
মোনা পলক ঝাপটে বললো,
– ঠিক আছে যাও।
ইশান দ্রুত দরজা লাগিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলো। ইমরান রুম কিই দিয়ে দরজা খুলতেই হতভম্ব। মোনা পাশ কাটিয়ে রুমের দিকে তাকিয়ে দেখে মুখে আঁচল গুঁজলো। উচ্চারণ করলো,
– ইয়া আল্লাহ।
ইমরান লজ্জা পেয়ে ছেলের সাথে কথা বলবে বলে বেরিয়ে যাচ্ছিলো এর আগেই মোনা আটকে দিলো। এখন কি বাপ ছেলেকে গিয়ে এসব প্রশ্ন করবে? মোনা ইমরানকে নিয়ে রুমে ঢুকে দরজা আটকে দিলো। সোফায় একপাশে বসে আশপাশটা দেখছে। ইমরান হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশটা ক্যান্ডেলে ও কাঁচা ফুলে সাজানো। আর্টিফিশিয়াল ক্যান্ডেল জ্বলছে। সেন্টেড ক্যান্ডেলের সুবাস ছড়াচ্ছে। তাই সন্ধ্যায় ইশান রুমের চাবি নিয়েছিলো। কিছুক্ষন আগে এসে এসব ক্যান্ডেল জ্বালিয়েছে। মোনা কথা না বাড়িয়ে চুপ করে বসে আছে। ইমরান মোনার দিকে তাকিয়ে বলল,
– ফ্রেশ হয়ে নাও। কি যে করেছে রুমটাকে!
মোনা মাথা নামিয়ে রেখেছে। ইমরান স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে মোনা লজ্জা পেয়েছে। নিজে স্বাভাবিক হয়ে বললো,
– আই এম এক্সট্রিমলি স্যরি মোনালিসা। আমি নিজেই বিব্রত বোধ করছি।
বিছানার উপর ফুল ছড়ানো। ইমরান বিছানার উপর থেকে ফুল গুলো সরিয়ে নিচে ফেললো। কাঁচা ফুলের সুবাস মন মাতিয়ে তুলেছে। মোনা উঠে কথা না বলে আলমারি থেকে ড্রেস বের করে ওয়াশ রুমে চলে গেলো। ইমরান ফোন করলো এই বুদ্ধির জনককে। স্পষ্ট জানে কাজটা কার? সকাল থেকে এসব বলে যাচ্ছিলো, ইমরান মুভ অন কর। নয়ন ফোন রিসিভ করতেই ওকে প্রথমে ঝাড়ি দিয়ে বললো,
– কি পরিমান বেহায়া হলে ছেলেকে দিয়ে বাপের বাসর সাজাস তুই?
– তোর কি আমাকে মূর্খ আর বেলাজা মনে হয়। ইশান কেনো বাসর সাজাবে? ও শুধু রুম কিই টা নিয়েছে। বাকিটা আমি ইন্সট্রাকশন দিয়েছি জহির করেছে।
রাগত স্বরে বললো,
– অতিরিক্ত কিছুই ভালো না।
– মোনাকে ভালো রাখার জন্য হলেও এতটুকু করা প্রয়োজন। ও তোর মাঝেই বাঁচবে। মিনহাজ ভাইয়ের কি হবে আমরা কেউ জানিনা। তোরা যে সারাক্ষণ কথা কাটাকাটি আর মান অভিমান নিয়ে থাকিস সে খবর আমার চেয়ে বেশি কে জানে।
ইমরান নিশ্চুপ। নয়ন মজা করে বলল,
– দোস্ত গান শুনবি?
– এক চড় দিবো।
– শুন না,
কালো কালো করিসনা লো ও গোয়ালের ঝি
আমায় বিধাতা করেছে কালো আমি করব কী?
– নয়ন আমি সামনে থাকলে তুই নিজেকে আয়নায় দেখার সাহস পেতি না।
নয়ন হাসতে হাসতে কথা না বাড়িয়ে ফোন রেখে দিলো। ইমরান নিশ্চুপতা নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। বাতাস বেশ ঠান্ডা। জ্যাকেট খুলতে খুলতে ভেতরে ঢুকতেই দেখে মোনা ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েছে। জ্যাকেট হাতে দিয়ে আর সামনে আগাচ্ছেনা। মনে হলো যেন পা থমকে গিয়েছে। হলুদ জরি সুতার শাড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা রমনী রুমের আলো আরো কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে। শাড়ি পরার ধরন এলোমেলো। মনে হচ্ছে কোনো রকম পেঁচিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে। টাওলে চুল মুছতে মুছতে রিনরিনে স্বরে বললো,
– ফ্রেশ হয়ে আসুন। দেরী করলে ঠান্ডা লেগে যাবে।
ধ্যান ফিরে ইমরান জ্যাকেট সোফায় রেখে প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল, ওয়ালেট বের করতে করতে বললো,
– এসব কাজ নয়ন আর জহিরের।
মোনা হেসে বললো,
– আমার মনে হয়েছিলো। ইশানের মাথায় এসব আসবেনা।
– হুম। আমি ফ্রেশ হয়ে আসি।
ইমরান ড্রেস বের করবে মোনা বলে উঠলো,
– আপনার সাদা পাঞ্জাবিটা পরুন প্লিজ। ছবি তুলবো আমরা। রুম টাতো বেশ সুন্দর সাজিয়েছে।
টি শার্ট বের করতে চাইলো। মোনা মন খারাপ করে তাকিয়ে থাকাতে পাঞ্জাবি বের করে ওয়াশরুমে চলে গেলো।
ফ্রেশ হয়ে বের হতে হতে দেখতে পেলো মোনা একটা মোম হাতে নিয়ে বাকি ক্যান্ডেল গুলো জ্বালাচ্ছে। জ্বলজ্বল করছে ওর চারপাশটা। এজন্যই বোধ হয় সাহিত্যিকরা নারীদের সৌন্দর্য্য যতবার বর্ণনা করেছে ততবার ব্যর্থ হয়েছে এই ভেবে যে, তাদের এই ভারী ভারী শব্দের বর্ণনার চেয়েও প্রতিটি রমনী অস্বাভাবিক রূপ নিয়ে জন্মায় যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিনই নয় দূর্বোধ্য বটে। টাওলে মাথা মুছে ব্যালকনিতে মেলে টেবিলের উপর থেকে ফোন নিয়ে আড়ালে মোমবাতি হাতে থাকা রমনীর দুটো ছবি ক্যাপচার করলো। ইমরানের দিকে চোখ পড়তেই হাতের ইশারায় মোনা ডাকলো। সাদা পাঞ্জাবীতে সুপুরুষ লাগছে। এলোমেলো ভেজা চুল। নারীর হৃদয়ে অনুভূতির সঞ্চার করতে যথেষ্ট। একটা ক্যান্ডেল হাতে নিয়ে ইমরানসহ ছবি তুললো। মোনা হেসে বললো,
– দেখুন আমাদের কি সুন্দর লাগছে?
গম্ভীর স্বরে আওড়ানো বাক্য মোনার বেশ অপছন্দ হলো,
– বেমানান লাগছে।
মোনা ক্যান্ডেলটা একপাশে রেখে মুখ ভেঙচে বললো,
– আমার বেমানানই সই। সবসময় বাঁকা কথা বলতে হবে কেনো। জন্মানোর সময় আমার শ্বাশুড়ি মুখে মধু দেয় নি?
– বেঁচে থাকলে জিজ্ঞেস করার অপশন ছিলো।
মোনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
– মানুষ এতটা বেরসিক ও হয়? এটাও তো বলতে পারতেন মা দেয় নি তাতে কি তুমি দাও।
ইমরান সোফায় পায়ের উপর পা তুলে আয়েশী ভঙ্গিতে বসে বললো,
– এত রাতে মধু কোথায় পাবে? বললেই তো অবান্তর কথা সত্যি হয়ে যাবে না।
– আপনার রিসোর্টে নাই?
– জানিনা।
মোনার ইচ্ছে করলো এই মুহূর্তে নিজের মাথায় দুটো বাড়ি দিতে। কথার ইনার মিনিং যে মানুষ বুঝে না তার সাথে মশকরা করা বৃথা। বুঝেও না বুঝার ভান করছে। ঠিকই তো ছিলো সন্ধ্যায় এখন আবার মাথায় ভূত চেপেছে।
রমনীর ধ্যান ভেঙে তার দিকে তাকিয়ে বললো,
– ক্যান্ডেল থাকবে?
– থাকুক।
– শুয়ে পড়ো। সারাদিন ভালোই এদিক সেদিক হেঁটেছো।
– আপনি?
– শোব। কাজ আছে।
স্বল্প কথায় কিভাবে বাক্য শেষ করে এই লোক! মোনা চুপচাপ শুয়ে ফোন চালাচ্ছে। আড়চোখে ইমরানকে দেখছে। ইমরান ল্যাপটপ কোলে নিয়ে সোফায় অহেতুক বসে আছে। মস্তিষ্ক কাজ করছেনা। প্ল্যান ছিলো মোনা ঘুমালেই নিজে শোবে। এই রাতে কিছুতেই নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হা/রাতে চায়না। মোনা প্রস্তুত নয়। নিজেও বেশ অপ্রস্তুত। অপরদিকে অধিকার নিয়ে যতবার প্রশ্ন এসেছে মোনা তাকে ততবার উপেক্ষা করেছে। নিজ থেকে এসে এই মেয়ে যেদিন বলবে অধিকার দিলাম তবে সে ইমরানকে সম্পূর্ণ রূপে নিজের করে পাবে। মোনার চোখে ঘুম নেই। চোখ তুলে মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,
– ঘুমাও, ফোন রেখে।
গাল ফুলিয়ে উত্তর করলো,
– আপনিও আসুন।
ইমরান বাধ্য হয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করে দিয়ে শুতে এলো। রুমের লাইট বন্ধ করতেই ক্যান্ডেলের টিম টিম আলোয় বেশ মোহনীয় লাগছে কামরা। চশমা খুলে সাইড টেবিলে রাখলো। বিছানায় শুতেই চোখ বুজে মোনার দিকে পিঠ দিয়ে শুয়েছে। মোনা হাসছে। ইমরানের মনে হলো মোনা এখনো না ঘুমিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কম্ফর্টার গায়ে টেনে ঘাড় ঘুরিয়ে মোনার দিকে তাকাতেই মোনা মিটমিটিয়ে হাসছে। প্রশ্ন করলো ভারী স্বরে ,
– এনি প্রবলেম?
– একদম না। আপনি লজ্জা পাচ্ছেন কেনো?
ইমরান চোখ পাকিয়ে বলল,
– মজা করবেনা।
– ওকে। তবে কি করবো?
ইমরান স্বর গম্ভীর করে বললো,
– ঘুমাও।
মোনা মুখাভঙ্গি স্বাভাবিক করে বললো,
– গুড নাইট।
– হুম।
বেশ কিছুক্ষন পার হলো কারো চোখেই ঘুম নেই। তবে কামরা জুড়ে পিতপতন নিরবতা। সহসা মোনার মনে হলো ইমরান কি উপেক্ষা করছে? মোনার দিক থেকে ‘না’ ছিলোনা। তবে প্রতিবার কেনো ইমরান পিছিয়ে যায়। সেদিন রাতে রাগ করে অধিকার দিবেনা বলেছিলো তাই? কিন্তু এরপর ও তো বহুবার নিজে অনুভূতি প্রকাশ করেছে মোনা। ইমরান কি বুঝতে পারেনা! রিক্তা মামী সবসময় বলতো, ‘জড়তা কাটিয়ে তোকেই আগাতে হবে। ইমরান ভাই কিন্তু সংকোচ নিয়ে পিছিয়েই থাকবে।’
মোনার মাঝে মাঝে মনে হয় ইমরান তাকে বেশ যত্ন করে আগলে রাখে। যত্ন আর ভালোবাসার মাঝে কি অনেক পার্থক্য? কিন্তু ভালোবাসে তাও তো প্রকাশ করেছে।
ইমরানের সাথে কাঁকনের সম্পর্কের কথা মুহুর্তে মনে পড়ে গেলো। কাঁকনের কথা ভাবতেই বুক চিনচিন করে উঠলো। ইমরানের প্রথম প্রেম, প্রথম ভালোবাসা, ইশানের মা। ইমরানের আবেগ। মোনার হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো নোনা জল। শাড়ির আঁচল মুখে চাপলো। পরক্ষনে মনে পড়লো, মামা যখন ইমরানের স্ট্রোক করার কথা জানিয়েছে তখন থেকেই অপরাধ বোধ গেড়ে বসেছে। যে মানুষটা আহত মোনাকে মেনে নিতে না পেরে অসুস্থ হয়েছে তাকে এতগুলো দিন কষ্ট দিলো। তবুও মোনাকে কখনো কর্কশ স্বরে দুটো অপছন্দনীয় কথা বলে আঘাত করেনি বিয়ের পর থেকে। বরাবর ভাষা সংযত রেখেছে।
জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা বৃথা চেষ্টা মনে হলো ইমরানের। কামরায় মোহনীয় পরিবেশ,পাশে প্রিয় নারী। উপেক্ষা করছে কি করে? ইমরান নিজেকে প্রশ্ন করলো সে কি সত্যি মোনাকে উপেক্ষা করছে নাকি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টায় আছে। নিজেকে বেশ শক্ত করে মোনার দিকে না ফিরেই বললো,
– মোনালিসা কেনো ঘুমাচ্ছোনা?
আঁচলে চোখ মুছে মোনা কাঁপা গলায় বললো,
– এ ই তো ঘুমাচ্ছি।
ইমরানের বুকের পাশটা ভেজা গলা শুনে ধুকপুক করে উঠলো। মোনার দিকে ফিরেই জোর করে নিজের দিকে ফেরালো। চমকে উঠলো। মোনার দুচোখে পানি দেখে। হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন করলো,
– কাঁদছো কেনো ?
ইমরান ভাবছে আঘাত করলো নাতো কোনো ভাবে? ইমরান বেশ লক্ষ্য করেছে মোনার চোখের পানি ইমরানের সহ্য হয়না। মোনা কাঁদলেই ইমরান রেগে যায় নতুবা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বকাঝকা শুরু করে। মোনা ইমরানকে সরিয়ে চোখ মুছে বললো,
– এমনি। কাঁদছি না খারাপ লাগছে।
– একটু আগে হাসছিলে।
– আমি এমনই।
ইমরান দু হাতে চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো,
– যাও মুখ ধুয়ে আসো। ঘুম যেহেতু আসছেনা আসো গল্প করি। কফি খাবে?
মোনা দু পাশে মাথা নাড়লো খাবেনা। ইমরান সায় দিয়ে মুখ ধুতে পাঠালো জোর করে। বিছানায় হেলান দিয়ে ইমরান অপেক্ষা করছে। মোনা ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে টিস্যুতে মুখ মুছে খাটে এসে বসলো। ইমরান কাছে ডাকলো। কাছে বসতেই এক হাতে আগলে টেনে বুকে নিলো। ভেজা চুলগুলো কানের গোড়ায় গুঁজে বললো,
– কি কষ্ট দিয়েছে এই অধম যে এত রাতে নিশব্দে কাঁদতে হচ্ছে?
মোনা চুপ। ইমরান মোনার ছোট্ট হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিলো। মনে হলো মেয়েটা কোনো ভাবে কষ্ট পেয়েছে। ঘুরতে এসে আঘাত করা উচিত নয়। নরম তুলতুলে এক হাত মুখের সামনে এনে উপরের পৃষ্ঠে আলতো ওষ্ঠ ছোঁয়ায়। আদুরে গলায় বললো,
– ইমরান সাহেব পঁচা?
মোনা মাথা নাড়ে।
– তাহলে ভালো?
মোনা আবার ও মাথা নাড়ে।
– পঁচা ও না, আবার ভালো ও না?
মোনাকে আরো কাছে টানে ইমরান। পুনরায় প্রশ্ন করে,
– তাহলে কি?
– জানিনা।
মোনা ইমরানের এতটাই কাছে যে, মোনার শরীরে ঘ্রান নাকে লাগছে। শ্যাম্পুর ফুলেল গন্ধে ইমরান হুঁশ হারাবে। ইমরানের নিরবতায় মোনা মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখে ইমরান চোখ বুজে আছে। চোখ খুলতেই মোনার চোখাচোখি। কপালে কপাল লাগিয়ে ইমরান বললো,
– উপেক্ষা করিনি। সময় দিতে চেয়েছি।
মোনা মাথা নোয়ালো। ইমরান মোনার থুতনি ধরে মাথা উঠিয়ে বললো,
– কাঁদবেনা। সহ্য হয়না।
মোনা দু পাশে মাথা নাড়ছে এবং চোখ দিয়ে পানি ফেলছে। ইমরান বুঝতে পারছেনা এই মেয়ে কি চাইছে?
সকালে মামী ফোনে বলেছে নিজেদের দূরত্ব কমাতে। সালমা চাচীও একই কথা বলেছে। মোনা নিজেও চায় ইমরানকে নিজের করে পেতে। শুধু কথাটুকু গলা অবধি এসে আর আসছেনা। এখন কি করে বলবে! প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে। ইমরান কনফিউজড মোনার আচরনে। মোনাকে শক্ত করে বুকে চেপে ধরে আছে। একটু শান্ত হলে চোখ মুখ মুছে দিয়ে বললো,
– মোনালিসা, মাই সুইট বার্ড কি হয়েছে বলো? শরীর খারাপ লাগছে?
কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে ভেজা গলায় বললো,
– নাহ।
– ভালো লাগছে?
– হ্যাঁ।
– ভেরী গুড।
– ঘুমাবে এখন?
মোনা দু পাশে মাথা নেড়ে বলে,
– নাহ। একটা জিনিস দেখাবো দেখবেন?
– কিহ?
শাড়ির আঁচল তুলে পেটের কাছটাতে লম্বা কা টা দাগটা দেখালো। ইমরান চমকে উঠে মোনার দিকে তাকালো। পেটের দাগটা দেখে রীতিমতো আঁৎকে উঠলো। নাভীর পাশ থেকে উপরের তেরছাভাবে প্রায় ছয় ইঞ্চি কাটা। তাকিয়ে আছে নিষ্পলক।
মোনার প্রশ্ন,
– ধরে দেখবেন না?
হাত কাঁপছে জায়গাটা ছুঁতে। না ছুঁবে না সে! ইমরানের প্রকৃতপক্ষে সাহস হয়নি এই দাগ স্পর্শ করার। এই সুন্দর নির্দাগ উদরে এই দাগের জন্য ইমরান দায়ী! কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা। সেদিন ছবির মাঝে দাগ দেখেও বুঝে নি। সরাসরি দেখে বুকের ভেতরটা পোড়াচ্ছে। মুখে উচ্চারণ করলো,
– স্যরি।
মোনা বাকহীন। ইমরান প্রশ্ন করলো,
– আর আছে?
মিনমিনে আওয়াজে বললো,
– মাথায় আর বুকে।
ইমরান ঢোক গিললো। একটি কথাও বাড়াচ্ছেনা। সেই গম্ভীর ভাব নিয়ে প্রশ্ন করলো,
– সামান্য কথার আঘাত সহ্য হলোনা?
– নাহ। সত্যি সামান্য ছিলো?
শব্দহীন সময়। কারো মুখে টু শব্দটিও নেই। কথার বিপরীতে কি বলতে হয়! উত্তর খুঁজে না পেয়ে কথার বোল বদলে বললো,
– এত ভালোবাসা অনুচিত যা নিজেকে আঘাত করে।
– আপনি ও বাসেন। ইতালীতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন কেনো আমার এক্সিডেন্টের কথা শুনে? বাবা, মামা ইতালী গিয়েছিলো জানতাম, আপনার জন্য গিয়েছিলো কাউকে বলেনি। বাবা ফিরে আসার পর আমাকে বলেছিলো আপনি ভীষণ অসুস্থ, কথা বলছেন না কারো সাথে। এতদিন এসব কেনো লুকিয়েছেন?
চমকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলো মোনার দিকে। এসব কথা মোনার জানা ঠিক হয়নি। নিজেকে উন্মোচন করতে চায়না এই মানুষটা! পুনরায় প্রশ্ন করলো মোনা,
– উত্তর দিন।
– জানিনা
– অসুস্থ হলেন কেনো?
– জানিনা
নিরব দুজন। মোনা বেশ কিছুক্ষন পর বলে উঠলো,
– ইমরান সাহেব…
– বলো।
– ভালোবাসি।
অপলক তাকিয়ে আছে। মোনা কি তবে সত্যি বললো! একবার, দুবার বেশ কয়েকবার বললো মেয়েটা। বুকে টেনে নিলো স্বীয় স্ত্রীকে। মোনার ললাটে কাঁটা দাগে অধর ছোঁয়ালো। মোনা চোখ মেলে ইমরানের হাসি দেখতে পেলো।
মাথা নেড়ে হেসে উত্তর দিলো,
– হুম।
ইমরানের হাসি দেখে মোনা চোখ মুখ উজ্জ্বল হলো। ইমরানের ডান গালে নমনীয় অধর ছুঁয়ে বললো,
– ধন্যবাদ, হাসার জন্য।
চাপা হাসি। অনুভূতি প্রকাশ না করা হাসি। আকস্মিক ঘটনায় কিভাবে অনুভূতি প্রকাশ করতে হয় ইমরানের অজানা। স্বল্পতায় উত্তর,
– শুকরিয়া
ইমরান প্রশ্ন করলো,
– ঘুমাবে?
মোনা মাথা নাড়লো। ইমরান প্রশ্ন করলো,
– তবে?
মোনা চোখ তুলে বললো,
– ঘুমানো উচিৎ?
– জানিনা তো। উচিৎ বলে তো মনে হচ্ছে।
– আপনাকে লাগবে।
– মোনালিসা তুমি এখন অবুঝ নও।
– ভেবেই বলছি। ইমরানকে লাগবে। নিজের করে।
– যদি না দিই।
মোনার বিরক্ত লেগে উঠলো। বিছানা ছেড়ে রাগ করে উঠে বারান্দায় বাতাসের মাঝে এসে দাঁড়ায়। সমুদ্রের ভারী গর্জন কানে লাগছে। ঢেউ আছড়ে পড়ছে। জোয়ার শুরু হয়ে আরো আগে। এখন ই ভাটার টান শুরু হবে। ভাটার মতো যদি সব দুঃখ সমুদ্র সাথে করে নিয়ে যেতো। শক্ত পুরুষালি হাতের স্পর্শ পেয়ে কেঁপে উঠলো শরীর। পেছন থেকে ইমরান শাড়ির উপর কোমড় জড়িয়ে ধরলো। ইমরান উঠে আসবে মোনা ভাবতেই পারেনি। কোমড় টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে ফেললো। মোনার বড় গলার ব্লাউজের উন্মুক্ত পিঠ ঠেকছে ইমরানের বুকে। কাট কাট প্রশ্ন ইমরানের,
– আর কি কি লাগবে?
– কিছুনা
ইমরানের থুতনী ঠেকেছে মোনার কাঁধে। মোনার রাগ এখন তীব্ররূপে আছে। এই রাগ ভাঙানো আপাতত বাধ্যতামূলক কর্তব্য বলে মনে হচ্ছে ইমরানের। ডান গালে ঠোঁট ছুঁয়ে বললো,
– আমার মোনালিসার কি অভিমান হয়েছে?
মোনার হাতে ওষ্ঠ ছুঁয়ে বলে,
– চলো ঘুমাবে।
মোনাকে কোলে নিয়ে কামরায় ফিরে এলো। মোনার ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা দৃষ্টিতে চেয়ে হালকা হেসে ইমরান বলে উঠলো,
– সময় হয়নি মোনালিসা…
এই কথার মানে কি! ফের অপমান! মোনার মনে জেদ চেপেছে। হঠাৎ মনে হলো কাঁকনের আজকের ফোনকল। যদিও ইমরান জানিয়েছে তাদের দুজনের কথোপকথনের ব্যাপারে সব। সে যাই হোক৷ আগে ইমরান তার। বলে উঠলো,
– ইমরান সাহেব আমার আপনাকে লাগবে। পুরো ইমরানটাকে মোনালিসার নামে চাই।
ইমরান হাসছে। বুকে আগলে নিলো প্রাণপ্রিয়াকে। বলে উঠলো,
– পুরো ইমরানটাই তোমার লিটল ফেইরী।
মোনা ইমরানের হাতে শাড়ির আঁচল ধরিয়ে বললো,
– আপনার অধিকার।
– এত তাড়াতাড়ি?
– তাড়াতাড়ি মনে হলো?
– মাত্র তো কিছু মাস হলো।
– তাতে কি?
– অধিকার দিবে না বলেছিলে।
– দিতে হয়না, ওটা এমনি আপনার প্রাপ্য।
মোনা অপলক দৃষ্টিতে বোঝার চেষ্টা করছে ইমরানের ভাবনা। ইমরান ঠোঁট কামড়ে চাপা হাসি দিচ্ছে, গালের এক পাশ খাদ হয়ে গেলো। মোনা ইমরানের মুখের দিকে তাকিয়ে শব্দ হারালো। ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আমার সামনে ছাড়া বাইরে এভাবে হাসবেন না। আপনাকে হাসলে সুন্দর লাগে।
ইমরান হো হো করে হেসে দিলো। মোনার হাত ইমরানের গলা জড়িয়ে ধরেছে। মোনার হাতে অধর ছুঁইয়ে নিজেই বললো,
– তোমার সামনে হাসবো। হবে?
– হুম
মোনার নিস্তব্ধতা দেখে ইমরান প্রশ্ন করলো,
– ঘুমাবেনা?
– হুম, এখন ঘুম আসছে।
মোনার কন্ঠে অভিমান। ইমরানের মনে হলো রাগলে মোনাকে কেমন দেখাবে? মোনার কপালে আলতো অধর ছুঁয়ে বললো,
– আমার তো ঘুম আসছেনা।
– তাহলে কি করবেন?
– জানিনা,
– মানে কি আমরা ঘুমাবোনা?
– জানিনা, শুধু এতটুকুই বলবো ঘুম আসছেনা।
কি হেয়ালিপনা করছে মানুষটা! মোনা ক্রোধ নিয়ে বললো,
– আসবে না তো। সেদিন অফিসে বলেছিলাম না ডেইরি মিল্ক ছাড়া কিছু বুঝবেন না।
– ওহ শিট, আমি তো তোমার জন্য ডেইরি মিল্ক এনেছিলাম।
মোনা উত্তেজিত হয়ে গাল ফুলিয়ে বলে,
– দেন নি কেনো। শত্রুতা করে দেন নি।
– কিসের শত্রুতা?
– যদি আমি আপনাকে ফেলে চকলেটে মনোযোগ দি?
– আমাকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা মোনালিসার এখনো হয় নি।
– এত আত্মবিশ্বাস?
– হুম। বাই দ্য ওয়ে, খাবে?
– অবশ্যই।
– যেদিন উপেক্ষা করবো, কি করবেন?
– কিছুই না, নিঃশেষ হয়ে যাব।
মোনা কথা বাড়ায় নি। ইমরানের আবেগ এক লাইনে বেরিয়ে এসেছে। ইমরান হাত বাড়িয়ে টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা বড় ডেইরি মিল্ক হাতে ধরিয়ে দিলো। মোনা তৎক্ষনাৎ ছিলে মুখে দিলো। ইমরান মিট মিট করে হাসছে। মোনা খেতে খেতে বললো,
– এটার অভাব বোধ করছিলাম এখানে, নাট ছিলো ওদের ক্যাফেটেরিয়াতে কিন্ত সিল্ক নেই। ধন্যবাদ ইমরান সাহেব….
মুখ দিয়ে আর একটি কথা বের করতে পারলো না মোনালিসা। ডেইরি মিল্ক সমেত মোনার অধর ইমরানের কব্জায়। চকলেটের বাকি অংশ খাটের এক কোনায় পড়ে রইলো। চকলেটে খেলে কি ডায়াবেটিস হয় না?
মোনা মুখ খুলেই গাল ফুলিয়ে বললো,
– অসভ্য ইমরান সাহেব, আমাকে চকলেট শেষ করতে দিলেন না?
– ভুল বললে, চরম অসভ্য হবে। শেষ করোনি কেনো? আমি ধরে রেখেছি?
মোনা মিনমিন করে বলে,
– সুযোগ দিলেন কোথায়?
ইমরান নিষ্পলক তাকিয়ে হাসছে, মোনা বলে উঠলো,
– এভাবে তাকাচ্ছেন কেনো, আমি কি চকলেট?
– উম ইমরানের চকলেট। এনিওয়ে কিভাবে তাকাচ্ছি?
– কেমন দুষ্টু দুষ্টু দৃষ্টি। আপনার সাথে যায়না।
– আমার সাথে কি যায়?
– খ্যাট খ্যাট করা, রাগ দেখিয়ে চোখ পাকানো, ধমকানো।
– ওটা তো বিয়ের আগে, তুমি দুষ্টু ছিলে তাই?
– এখন কি?
– আমার চকলেট। তুমি তো নিজেকে সারাক্ষন চকলেট দাবি করো।
– মিথ্যা বলবেন না সারাক্ষন কাঁকন, কাঁকন করেন। এখন তো রিমিও যোগ হবে। কথা বলবেন না আমার সাথে। আড়ি। ঘুমাবো আমি।
পুনরায় সেই নামগুলো। মস্তিষ্ক ধপ করে জ্বলে উঠলো রাগে। ইমরান উত্তর দিলো,
– ওকে ফাইন। শুভ রাত্রি।
মোনাকে ছেড়ে ঘাড় ঘুরিয়ে ফোনে সময় দেখে রাত তিনটা। নিজের বালিশে মাথা রেখে ঘুমের জন্য চোখ বুজলো। সকালে খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে যা মোনা ইশান ঘুমে থাকতেই শেষ করতে হবে। মোনা বাকি চকলেট টুকু মুখে দিতে দিতে পেছন দিক থেকে ইমরানকে জড়িয়ে ধরে বললো,
– আচ্ছা আর বলব না, স্যরি আসেন ঘুমাই। আমাকে বুকে নিন।
হাসি টুকু আড়াল করে গম্ভীর ভাব নিয়ে আগের মত ই ফোন নিয়ে ব্যস্ত। মোনার জোরাজোরিতে ফোন রেখে মোনাকে জড়িয়ে ধরতেই মোনা একটু ডেইরিমিল্ক দুষ্টুমি করে ইমরানের গালে লাগিয়ে দিলো। ইমরান চোখ বন্ধ করে বললো,
– উঁহু, ঘুমাও মোনালিসা। অনেক রাত হয়েছে। দুষ্টুমি করবেনা।
মোনা পুনরায় দুষ্টুমি করতে গেলে ইমরান চেপে ধরতেই মৃদু চিৎকার দিয়ে বললো,
– নাহ….আর করবো না…….
বলে কি আর লাভ হবে? ইমরানের সম্পূর্ণ মনোযোগ মোনাতে নিবদ্ধ। মোনার ডান হাতে চকলেট। ইমরানের দিকে তাকিয়ে হাসছে। ইমরান ঠোঁট কামড়ে হাসছে। সেই হাসি দেখে চোখ সরিয়ে ফেলেছে মোনা। লজ্জায় দু গালে আভা ক্যান্ডেলে আলোতে স্পষ্ট। মোনার হাত দুটো চেপে ধরে ইমরান বলে উঠলো,
– কয় বার বারণ করেছি দুষ্টুমি করবেনা? একবারো শুনেছো?
মোনা দু পাশে মাথা নেড়ে বললো,
– স্যরি আর করবোনা।
– এখন যদি সত্যি আমি কিছু করি?
মোনা সরাসরি ইমরানের দিকে তাকালো। যেখানে লজ্জা পাওয়ার কথা সেখানে লজ্জা না পেয়ে এই মেয়ে চোখে চোখ রেখে বলে,
– আমি হেসে সেই কিছু টুকু গ্রহন করে নিব।
ইমরানের প্রশ্ন,
– অধিকার হঠাৎ দিতে চাচ্ছো কেনো?
– অনেক আগেই দিয়েছি। আপনি পিছিয়ে ছিলেন। বলেছিলেন মাঝে দেয়াল আছে।
– আজ তবে ভাঙলো কি করে?
– আপনি নিজের করে নিলেই ভাঙবে। এখনো অক্ষত সেই দেয়াল।
ইমরান মোনাকে ছেড়ে দিলো। মোনা আর কথা বাড়ায় নি। কেন যেন এখন চকলেটটা বিস্বাদ লাগছে। একপাশে রেখে দু চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। ইমরান চুপচাপ খাট থেকে পা দুটো নামিয়ে বসে আছে। বেড সাইড টেবিল থেকে পানি নিয়ে এক ঢোল গিলে সব কটা ক্যান্ডেল নিভিয়ে দিয়ে গায়ের পাঞ্জাবি খুলে ছুড়ে ফেলে দিলো। পেছন দিক থেকে মোনাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
– স্যরি…
কথা বাড়ায়নি ইমরান প্রেয়সী। মানুষটা স্বেচ্ছায় আঁচল সরিয়ে কাটা দাগ স্পর্শ করলো। অধর ছোঁয়ালো প্রতিটি দাগে। মান অভিমানের সমস্ত দেয়াল ভেঙে ইমরান আজ প্রেয়সীতে মত্ত। নয়নের মজা করে বলা কথা যে সত্যি হয়ে গেলো, ইমরান এবার হানিমুনে যাচ্ছে। অথচ তার পরিকল্পনা ছিলো স্ত্রী সন্তানকে সুস্থ পরিবেশ দেয়া। উপর ওয়ালার পরিকল্পনা আরো সুন্দর। আমরা সবসময় মহান রবের কাছে চাই ভালো টা, তিনি খুশি হয়ে আমাদের শ্রেষ্ঠ কিছু দেন। ইমরানের আজ মনে হলো মোনালিসা তার জীবনে পাওয়া আরো একটি শ্রেষ্ঠ অর্জন। ইশান আর মোনালিসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই সম্পদ।
গুটিশুটি মে*রে লেপ্টে আছে ইমরানের বুকে। কপালে উষ্ণ অধর ছুঁয়ে ইমরান বললো,
– ধন্যবাদ ইমরানের মোনালিসা। এতটা সুখ আশা করিনি এই জীবনে। যেদিন বিয়ে করেছি সেদিন থেকেই জেনে এসেছি তুমি আমার দায়িত্ব। বড্ড ভুল ধারণা ছিলো। শুধু দায়িত্ব নয়, তুমি আমার অসম্ভবের সম্ভব, প্রিয় স্বপ্ন। যে স্বপ্ন মানুষ দেখতে চায়, কিন্তু সহজে নাগাল পায় না। যারা পায় তারা জিতে যায়। আমি বোধ হয় জিতে গেলাম মোনালিসা।
– আমিও জিতেছি। কিভাবে জানেন?
– কিভাবে?
– এইযে অনায়াসে চাইলেই ইমরানকে ছুঁতে পারি, যখন তখন বুকে যেতে পারি, জড়িয়ে ধরতে পারি, বকা দিতে পারি, রাগ করতে পারি। কেউ পারবে আমার মত?
ইমরান মোনার বাচ্চামোতে হেসে বলে,
– ইম্পসিবল । সেই অধিকার শুধুই মোনালিসার। কার এত বড় স্পর্ধা মোনার ইমরানকে ছোঁবে?
– সেটাই তো।
– তবে একটু বাড়িয়ে বললে। ইমরান নিতান্ত তুচ্ছ। তুমি অমূল্য।
– মোনালিসাকে অপমান করা হয় আমার মত দাগযুক্ত মোনার সাথে তুলনা করলে। মোনালিসা নিখুঁত।
– তুমি কি জানো তোমার পেটের, বুকের এই কাটা দাগ গুলো আজ থেকে আমার বড্ড প্রিয়। এগুলো আমার জন্য তৈরি হওয়া চিহ্ন। তুমি তোমার খুঁতেই অনন্য। আর কে বললো মোনালিসা নিখুঁত। মোনালিসার সবচেয়ে বড় খুঁত মোনালিসার চোখের উপর কোনো ভ্রু নেই। এরপরো দেখো কি সুন্দর। আমার মোনা তার থেকেও সুন্দর।
– সত্যি মোনালিসার ভ্রু নেই?
– উহু, যাচাই করো।
মোনা সত্যি হাত বাড়িয়ে ফোনে সার্চ দিয়ে দেখলো লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি খ্যাত মোনালিসার ভ্রু নেই। অদ্ভুত ব্যাপার সেপার। জীবনের এতটা বছর পেরোলো অথচ এই বড় একটা জিনিস অজানাই রয়ে গেলো। তাহলে মোনালিসাও নিখুঁত নয়।
মোনার মনে স্বস্তি ও আনন্দের মিশ্রণ। খুব ইচ্ছে হলো মানুষটার গলায় গান শুনতে,
– আচ্ছা এখন বাকি চকলেট খাব, একটা গান শোনান প্লিজ…
প্রেয়সীর আবদার রাখতে গেয়ে উঠলো,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৪
– “শুধু তোমাকেই ভালোবেসে
শুকনো নদীতে ডিঙি ভাসিয়েছি মোহনার কাছে এসে
শুধু তোমাকেই ভালোবেসে
দু’মুঠো আদর ভিক্ষে চেয়েছি দরিদ্র এই দেশে
শুধু তোমাকেই ভালোবেসে
এই পাঁজরভরা ভালোবাসা দু’হাত ভরে নাও
এই আধো আলো আধো ছায়া দু’চোখ ভরে নাও
এই আমায় কিছু নাইবা দিলে
এই আমায় কিছু নাইবা দিলে, নিজের করে নাও।”
