প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৬
নীতি জাহিদ
এক চামচ মুখে নিয়ে চারপাশের অবস্থা ভালোভাবে পর্যবেক্ষন করছে ইমরান। খেতে খেতে আড্ডায় মেতে উঠেছে পুরো পরিবার। সোহান আর ইশান একটা করে মজার কথা বলছে, পরিবারের বাকিরা হাসিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। খালা এবং ফুফু দুজনই ইমরানের পাশে বসেছে খাটের একপাশে। এর মাঝে ফুফু খালাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
– রাবেয়া তোর মুখটা খারাপ আমি বহুত বছর ধইরা কইতাছি। তুই পোলাটারে আবল তাবোল কইলি আর দেখ বদনজর লাইগা পা টার কি হইলো?
খালা ভ্রু কুচকে বলে,
– আমি কি কইলাম?
– এই যে ওর নতুন পোলাপানের কথা। আরো কটা দিন গেলে কইতি। এখন তো মাঝে দিয়া কত গুলা দিন ক্ষতি হইয়া গেলো। চেষ্টা ও করতে পারবো না। পোলায় নড়নচড়ন করতে কত কষ্ট।
ইমরান তাজ্জব বনে গেলো। এই দুই বুড়ি একসাথ হলেই এদের মুখ ছুটে। খাবার থেকে চোখ তুলে আজ আর লজ্জা না পেয়ে শান্ত স্বরে বললো,
– ফুফু, খালা তোমরা দুজন দয়া করে রমজান মাসটা থামো। নিজেদের মুখ গুলোকে সামলাও। যখন বলতে থাকো তখন আশপাশটা দেখোই না। আমার বয়সের দিকেও তো লেহাজ করে একটু মান ইজ্জত দাও। ভাই, ভাইয়ের বউ, বোন-বাচ্চারা সব সামনে। কিছু হলেই দুজন কবে আমার আরেক বাচ্চা হবে তা নিয়ে চিন্তা জুড়ে দাও। যেদিন নতুন বাবু হবে সেদিন নিজ থেকে বাবু নিয়ে তোমাদের বাড়ি মিষ্টি দিয়ে যাবো। এখন একটু চুপ থাকো। তোমাদের শরীরের অবস্থাও ভালো না। বেশি করে চুপচাপ খাও।
মোনা ইমরানের দিকে কৃতজ্ঞতার সহিত তাকালো। এতক্ষন লজ্জায় চোখ তুলতে পারছিলোনা বেচারী। ডাইনিং পর্যন্ত যাওয়া কষ্টের ইমরানের জন্য। চেয়েছিলো উপরে বসে নিজের টা খেয়ে নিবে, কিন্তু পুরো পরিবার হুমড়ি তুমড়ি খেয়ে তার বেডরুমটাকে ডাইনিং এরিয়া বানিয়ে এভাবে চমকে দিবে ভাবতে পারছেনা। খাটে, উপরে নিচে, সোফায় বসে সবাই মিলে একসাথে সাহরী করার মজাই আলাদা। এর মাঝে প্রসঙ্গ বদলাতে সোহান বলে উঠলো,
– আজকে একটা মজার ঘটনা ঘটেছে।
মোনা খাবারে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছে এর একটাই কারণ সে খুব মজা করে আজ টমেটো ভর্তা করেছে। বাড়ির ছেলে গুলা ছুঁয়েও দেখেনি। কারণ টমেটো টক। মেয়েরা সবাই খেতে ব্যস্ত। সোহানের কথা কেউ আমলে না নিলে সোহান জোরেই বললো,
– ও বড় মামী, ছোট মামী একটা মজার ঘটনা ঘটেছে তো, শুনেন না।
ইমরান খাবার চিবাতে চিবাতে মোনার দিকে তাকিয়ে সোহানকে বললো,
– সোহান তোমার বড় মামীর শৈল্পিক ভাবে ভর্তা খাওয়া দেখলে তোমার আর মজার ঘটনা বলতে ইচ্ছে করবেনা। ভর্তা খাওয়াই দেখতে ইচ্ছে করবে। টমেটো ভর্তা খাওয়া ও শিল্প। ম্যাডাম পূর্ণ মনোযোগের সহিত ফিল নিয়ে খাচ্ছে। অন্যদিকে তার মনোযোগই নেই।
মোনা প্লেট থেকে মাথা তুলে লজ্জা পেয়ে বলে,
– এমন করেন কেনো, কত দিন পর খাচ্ছি। সবসময় কি মাছ মাংস ভালো লাগে। আর সোহান বাবা শুনছি তো তুমি বলো।
তুশি ও মাথা নেড়ে সায় জানালো। বাড়ির সকলে এর মাঝে হেসে দিলো। সোহান মাংসের টুকরা মুখে নিয়ে বলে,
– বিকেলে আমি একটা রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম বন্ধুদের সাথে সেখানে যেয়ে দেখি…. বলবো ইশান?
ইশান নিজের নাম শুনে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালো। সে তো বিকেলে কিছু করেনি। বাইরে ছিলো তবে কেনো ভাই তার নাম নিচ্ছে? ইশান মাথা নেড়ে বললো,
– বলো না, আমাকে জিজ্ঞেস করছো কেনো?
– ঘটনা টা তুই সংক্রান্ত।
বাড়ির সকলে নড়েচড়ে বসলো ইশান পানি দিয়ে ভাত গিললো। মা- বাবা দুজনের দিকে তাকিয়ে দেখে বেশ আগ্রহ নিয়ে দুজন সোহানকে দেখছে। ইশতিয়াক বললো,
– সোহান হেয়ালি না করে বল কাহিনি কি?
সোহান বলে,
– ইশানের কয়েকটা ফ্রেন্ড রেস্টুরেন্টে আড্ডা দিচ্ছিলো। প্রথমে মনে হলো বাচ্চা পোলাপানরা এখন রেস্টুরেন্টে ও চলে আসে। কিচিরমিচির করছিলো। পরে মনে হলো, এখন তো বাচ্চারা অনেক আধুনিক। পাশের টেবিলটাই আমার ছিলো। একটা জিনিস দেখতে বেশ লেগেছে। ওরা ভাগ করে মিলেমিশে খাচ্ছে। জোরে কথা বলাতে ওদের কথা বলার টপিক শুনে নিয়েছি। ওদের মধ্যে দুটো মেয়ে আছে। একজন ইশানের নাম ধরে কথা বলাতে আমি তাতে মনোযোগ দিলাম। বড় মামী বিশ্বাস করো ওদের কথা শুনে আমার প্রচন্ড হাসি পেয়েছে। কিন্তু অনেক কষ্টে নিজেকে সামলেছি।
মোনা ভাত খাওয়া থামিয়ে বলে,
– কি এমন বলেছে? ইশানকে পছন্দ করে নাকি?
ইশান লজ্জ্বা পেয়ে বলে,
– মা কি বলো এসব।
ইমরান ছেলের দিকে চাইলো। ছেলের ইতস্ততবোধ দেখে বললো,
– ভালো তো। পছন্দ হলেই বিয়ে করিয়ে দিব। শ্বশুর হওয়ার খায়েশ আমার অনেক দিনের। ছেলে বিয়ে করানো এক ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
– পাপা….
হেসে উঠলো সকলে। সোহান বলে উঠলো,
– আরেহ শোনো না তোমরা, ইশানকে মেয়েটা পছন্দ করে তবে সে ভয়েও এই বাড়ির বউ হবে না। বড় মামী নাকি বেশ স্ট্রিক্ট জল্লাদ শাশুড়ী। ইশান মাম্মা’স বয়। বিয়ের পর নাকি ইশানকে মামী এতই টাইটে রাখবে ওরা লাইফ এঞ্জয় করতে পারবেনা। ও শান্তিতে শপিং এ যেতে পারবেনা, রেস্টুরেন্টে যেতে পারবেনা ইভেন মুভি ও দেখতে পারবেনা। ওকে দিয়ে বাসার সব কাজ করাবে। ওর সুন্দর হাত নাকি খসখসে হয়ে যাবে। চুলার তাপে চেহারা কালো হয়ে যাবে। ইশান এখনো মায়ের হাতে খায় সে নাকি দেখেছে কোচিংয়ে। ভাবতে পারো এই মেয়ে কতদূর ভেবেছে!
মোনা হকচকিয়ে গেলো। এদিকে বাকিরা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার মত অবস্থা। ইমরান ছেলে এবং স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে এদের প্রতিক্রিয়া দেখতে। মোনা ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে,
– বাবা আমি এত শাসন করি তোমাকে? আমি জল্লাদ।!
– না মা, এই মেয়েকে আমি বিয়ে করবোনা। প্রমিজ।
ইমরান হঠাৎ অট্টহাসি দিয়ে বললো,
– মেয়েটা তো বেশ। এই মেয়ে বুঝলো কি করে এদের মা ছেলের মতলব! তোমরা দেখো এখন থেকে তিনি ছেলেকে এমন বশ করেছে ছেলে বলছে ওই মেয়েকে বিয়ে করবেনা।
মোনা ভাতের প্লেট রেখে মুখ খিচিয়ে ইমরানের দিকে তেড়ে এসে বলল,
– আমি জল্লাদ!
ইমরান ভয় পাওয়ার ভান করে বললো,
– ভয় পাচ্ছি তো। জেলের কয়েদীদের কাছে এক আতঙ্কের নাম জল্লাদ। আমি সেই জেলের এক নম্বর আসামী।
– আমার নিজেরই সংসার জীবনের চার মাস আমি নাকি জল্লাদ গিরি করবো। তবে হ্যাঁ এবার আমি ওই মেয়ের পা ভেঙে দিব আমার বাড়িতে ঢুকার নাম নিলে। ইশান, বাবা তুমি কি ওই মেয়েকে পছন্দ করো?
ইশান দু পাশে মাথা নেড়ে বলে,
– না মা একদম না। সোহান ভাইয়া, মেয়েটার নাম কি সিমি?
সোহান খেতে খেতে বলে,
– হুম হুম সিমি নামই শুনলাম।
ইশান চেঁচিয়ে বললো,
– ইম্পসিবল এই মেয়েকে আমি পছন্দ করিনা। মা তুমি ওর হাত,পা, মাথা সব ভেঙে দিও বাড়ি আসলে। সাহস কত আমার মাকে জল্লাদ বলে। মা কি ওর সাথে জল্লাদ গিরি করছে? করছে তো রিমির সাথে।
মোনা মাথা নেড়ে না বুঝে সায় দিয়ে বলে,
– একদম। তাই তো।
আচমকা পুরো বেডরুম জুড়ে হাসির জোয়ার। কারণ মোনা না বুঝেই নিজেকে জল্লাদ বলাতে সায় দিলো। এদিকে ইশান জিভে কামড় দিয়ে বাবাকে বলছে এই কথা আর না আগাতে। মোনা ইশানের দিকে তাকিয়ে বলে,
– বাবা, তুমি কি আমাকে জল্লাদ বললে?
ইশান বিচলিত না হয়ে বললো,
– রিমির ক্ষেত্রে মা তুমি জল্লাদের মত আচরণ না করলে শুধরাতো না। সেই ক্ষেত্রে ইয়্যু আর নট আ এক্সিকিউশনার, ইয়্যু আর দ্য জাজ।
ইশতিয়াক হেসে বলে উঠলো,
– বাহ! ভাবী ছেলে তো বড় উপাধি দিয়ে দিলো।
আনন্দে, হাসিতে মেতে উঠেছে সকলে। সাহরীর মধ্যে দিয়ে শুরু হলো বছরের প্রথম সাওম, সংযম। মাস যেন সকলের সুন্দর কাটে সেই দোয়াই রইলো সবার মোনাজাতে।
কখনো রোদ তো কখনো শীতল বাতাস, একে একে পার হচ্ছে একেকটি রোজা। ইমরান আগের চেয়ে কিছুটা সুস্থ। স্ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটতে পারছে। এখনো সঠিক উপায়ে হাঁটলে পায়ে চাপ লাগে। গত পনেরো দিন হোম অফিস করছে। আজ অফিস যাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারন্যাশনাল বায়ার আসছে। মোনা, ইশান এবং সোহান প্রতিনিয়ত অফিসের আপডেট দিচ্ছে। বাসায় শুয়ে বসে থাকতে থাকতে শরীরে মরিচা ধরে গিয়েছে এমন অনুভূতি হলো। অফিসের জন্য তৈরি হয়ে নিলো। খুব সাধারণ পোশাকে। মোনা বা ইশান আপাতত কেউ নেই, একা তৈরি হতেও কষ্ট। সাদা টি-শার্ট এবং কালো ডেনিম প্যান্টে অন্যরকম লাগছে। বাড়ির মানুষ এই রূপে পরিচিত, অফিসে আসা হয়না। কেয়ারটেকার এতদিন পর চেয়ারম্যান স্যারকে গেটে দেখে ছুটে এলো। পিছু নিলো বাকিরাও। ইমরান হেসে সবার সাথে কথা বলছে। সবাই তার শরীর স্বাস্থ্যের কথা জিজ্ঞেস করছে। ম্যানেজার উপর থেকে ছুটে এলো। লিফটে যেতে যেতে ইমরান বললো,
– আপনারা এত উত্তেজিত হবেন না। ঠিক আছি। এইতো আর কটা দিল গেলে ইনশাআল্লাহ আগের মত হয়ে যাবো।
ম্যানেজার বলে উঠলো,
– স্যার সবই আছে আগের মত। মিনহাজ স্যার ও বসে মাঝে মাঝে। আপনার কেবিনে তাকালে শূন্য লাগে।
ইমরান মৃদু হেসে বলে,
– কি করবো ম্যানেজার সাহেব, হঠাৎ করেই আগের জায়গায় ব্যাথাটা পেয়েছি। শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারলাম না। সব তো আপনার জানা।
– জ্বি স্যার।
লিফট থেকে বের হয়ে অফিসের দিকে এগিয়ে যেতেই সবাই চমকে উঠলো। এভাবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে আজ চলে আসবে কেউ বুঝতেই পারেনি। মায়ের সাথে ইশা ছুটে এলো। মিনহাজ বের হয়ে বকাঝকা শুরু করেছে এই পা নিয়ে বের হওয়াতে। সবার সাথে কুশলাদি বিনিময় শেষ করে ইমরান নিজের কেবিনে প্রবেশ করলো। নয়ন কাজে বাইরে ছিলো। এসেই বন্ধুকে পেয়ে অফিস সরগরম করে ফেললো। সবাইকে জানিয়ে দিলো আজ অফিসে ইফতার পার্টি হবে।
মিটিং শেষ করতে করতে বিকাল গড়িয়ে গেলো। অফিসে ছোটখাটো ইফতারের আয়োজন হয়ে গেলো। রাত দশটায় সবাই বাসার পথে রওয়ানা হলো। গাড়ি রাস্তায় জ্যামে আটকেছে। মোনা সারাদিন প্রোডাকশন টু ওয়্যার হাউজ ছুটোছুটি করে ক্লান্ত। শো রুমেও অনেক চাপ। অনলাইন, অফলাইনে উপছে পড়া ভিড়। গাড়িতেই ইমরানের কাঁধে ঘুমিয়ে পড়েছে। সোহান, ইশান বাইকে। ইমরানের বেঞ্জের পাশেই সোহানের বাইক। জ্যাম ছেড়ে দিতেই গাড়ি ছুটলো বাড়ির উদ্দেশ্যে। ফ্লাইওভারের উপর উঠতেই জ্যাম কিছুটা কম। সব গাড়ি ছুটছে। আচানক গাড়ির রিয়ার মিরর ফেটে গেলো। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় মিথ্যা কম বলে। সোহান বাইকের স্পিড বাড়িয়ে দিয়েছে। সামনের সিট থেকে রবিন চেঁচিয়ে উঠলো,
– স্যার গুলি ছুঁড়ছে।
ইমরান পকেট থেকে গান বের করতেই রবিন সাইলেন্সার ছুড়ে মা/রলো ইমরানের দিকে। এই রাস্তায় জোরে গুলি ছোঁড়া মানেই রিস্ক। আশে পাশে অনেক গুলো গাড়ি। তবে সব সাদা প্রাইভেট, মাইক্রো। মনে হচ্ছে যেন একটা নির্দিষ্ট দলের গাড়ি। রবিন গাড়ি চালাতে চালাতে গুলি ছুঁড়ছে একদিকে, ইমরান গুলি ছুঁড়ছে অন্যদিকে। দুশ্চিন্তা চেপে বসলো সোহান এবং ইশানের জন্য। ওদের বাইক দেখা যাচ্ছেনা। রবিন সর্বোচ্চ স্পিড তুলে গিয়ারে চাপ দিলো সোহান এবং ইশানকে নাগালে পেতে। বাতাসের গতিতে গাড়ি ছুটছে, এদিকে মোনা উঠে গিয়েছে। ইমরান একহাতে গাড়ির জানালা দিয়ে গুলি ছুড়ছে অন্য হাতে মোনাকে বুকের সাথে চেপে ধরেছে। হঠাৎ করে ফ্লাইওভারের উপর জন সাধারণের সব গাড়ি গায়েব হয়ে গেলো কি করে? নাকি ধারনা সত্যি। এখানে কোনো সাধারণ মানুষের গাড়িই ছিলো না। রবিনের স্পিড সোহানের বাইক ধরে ফেলেছে। ইমরান তাকিয়ে দেখে সোহান এবং ইশান সিট এক্সচেঞ্জ করে ফেলেছে ইতিমধ্যে। সোহান উলটো হয়ে ঘুরে বসে গুলি ছুঁড়ছে এবং ইশান বাইক চালাচ্ছে। সাদা মাইক্রো গুলো দেখা যাচ্ছেনা। ফ্লাইওভার থেকে নামতেই আবার জনসমাগম। বাইক এবং ইমরানের গাড়ি দুটোই মিশে গেলো ভিড়ে। মোনা ভয় পেয়ে পুরোপুরি ঘাঁবড়ে গিয়েছে। মাথা তুলে বললো,
– ইশান কোথায় ইমরান সাহেব?
– ঠিক আছে ইশান, মোনালিসা। দুশ্চিন্তা করোনা। ফ্লাইওভারের উপর এত বড় একটা আক্রমন হলো অথচ মানুষ, পুলিশ কারো সাড়া শব্দ নেই।
ইমরান রবিনকে প্রশ্ন করলো,
– ফ্লাইওভার এত নিরব কেনো, এখান দিয়ে কেনো এসেছো রবিন?
রবিন চিন্তিত গলায় বললো,
– স্যার মোড় নিতে চেয়েছিলাম আমি কিন্তু সোহান, ইশান ফ্লাইওভারে উঠে গেলো। ওদের দেখাদেখি আমিও উঠলাম।
বাড়ির গেটে বাইক থামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইশান- সোহান। মোনা গাড়ি থামতেই ছুটে বেরিয়ে গেলো। ইশানকে জড়িয়ে ধরে বললো,
– বাবা, ঠিক আছো তোমরা।
ইশান মাথা নেঁড়ে বললো,
– হ্যাঁ মা ঠিক আছি।
বাবার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলবে এর আগেই ইমরান থামিয়ে দিয়ে বললো,
– তোমরা ফ্লাইওভারে কেনো উঠেছো?
সোহান প্রত্যুত্তরে বললো,
– মামা নিচ দিয়েই আসতে চেয়েছিলাম। ওখানে যে ট্রাফিক সার্জন ছিলো তিনিই বললো, ফ্লাইওভার দিয়ে যান, রাস্তায় জ্যাম।
ইমরান মাথা নেড়ে বললো,
– মোনালিসা, ইশান ভেতরে যাও। রিল্যাক্স হও। ভুলে যেওনা এসব আমাদের জন্য নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আল্লাহ ভরসা।
ওরা ভেতরে যেতেই রবিন মাথা খাটিয়ে বলে উঠলো,
– নতুন করে কে জেগে উঠলো?
ইমরান কাট কাট গলায় বললো,
– দস্তগীর সানোয়ার খান।
সোহান চমকে বলে,
– দস্তগীর বেঁচে আছে মামা?
রবিন অতি নিশ্চিত হয়ে বলে,
– অসম্ভব। কিভাবে সম্ভব! আমরা সবাই ওর কবর দেয়া দেখেছি।
ইমরান হেসে বলে,
– খাস্তগীরকে দস্তগীর ভেবে আমি যে ভুলটা করেছি, তোমরা প্রত্যেকে একই ভুল করেছো। দস্তগীর আমেরিকার জেল থেকে ছাড়া পেলো কি করে?
রবিন প্রশ্ন করলো,
– খাস্তগীর কে স্যার?
– ওর জমজ ভাই।
রবিন বিরক্ত নিয়ে বললো,
– স্যার বাইরের শত্রু প্রতিহত করা সহজ কিন্তু ঘরের শত্রু কীভাবে?
সোহান ক্ষেপে গিয়ে বললো,
– ওরা কখনোই আমাদের ঘরের ছিলোনা। বংশ পরম্পরায় এই লড়াই চালিয়ে আসছে। কিন্তু ওর এখন উদ্দেশ্য কি?
ইমরান বাড়ির দিকে আগাতে আগাতে বলে,
– উদ্দেশ্য বেশ কিছু হতে পারে। আমাদের সকলকে শেষ করা, কারণ দু বছর আগে অথেনটিক ইনফরমেশন পেয়েছি দাদা মশাই যে পাঠানগড়ের জমিদার বাড়ি পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে তা বংশ পরম্পরায় বাবা, আমি এবং ইশানের নামে। এভাবে চলতে থাকবে। আমাদের বংশের ছেলেদের অনুপস্থিতিতে এই বাড়ি জমিদার বংশের অন্য যেকোনো কন্যা সন্তানের কাছে হস্তান্তরিত হবে। এখন দস্তগীরের টার্গেট হয়তো তাই। ও বেঁচে আছে আমি জানি। বিচলিত না হওয়ার জন্য কাউকে বলিনি।
– ওর কাছে মেয়ে কোথায় থেকে আসবে?
– ওর মিস্ট্রেসের মেয়েটা ওর কাছে আছে। যেই মিস্ট্রেস ওর নামে কেইস করেছিলো।
রবিন এক দলা থুতু ফেলে বলে,
– ছ্যাহ নির্লজ্জ। কত নিচে নামতে পারে। ওই বেডির লাইগা জেল খাটছে। আবার বেডির মাইয়ারে নিজের কাছে রাখছে।
ইমরান বললো,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৫
– পুরো তথ্য না জেনে মন্তব্য করবে নাতো রবিন। ওই মহিলা রে/ইপ কেইস করেছে বলেই জেল খেটেছে। আর মহিলার গর্ভে ওর সন্তান ছিলো। মহিলা গত বছর মা*রা গিয়েছে এক্সিডেন্টে। যদিও আমার পুরো ব্যাপারটা ধোঁয়াশা লাগছে। ও তখন জেলে ছিলো তাই ভেবেছি সত্যি এক্সিডেন্ট হয়তো। এখন তো মনে হচ্ছে কাহিনি অন্য। একটু খোঁজ লাগাও। ও দেশে এসেছে মানে বিপদ আমাদের চারপাশে ঘুরছে। প্রত্যেককে সাবধানে থাকতে হবে। সিকিউরিটি বাড়াও। মোস্ট ইম্পরট্যান্ট হলো, হাম্মাদকে কল দিয়ে বলে দাও, জরুরি তলপ করেছি আমি। নাফিসকে একটা মেইল করো আমার পক্ষ থেকে। আমি কোনো ভাবেই পরিবারে আঁচ লাগতে দিবোনা। একটু সুস্থ হলে জমিদার বাড়ি ঘুরে আসা প্রয়োজন। কি আছে সেই বাড়িতে যার জন্য রমজান মাসে খোদ শয়তান আমেরিকা থেকে চলে আসছে!
