প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৪
সাইদা মুন
হসপিটাল থেকে সকলে ফিরেছে সন্ধ্যার দিকে। বাড়ির বড়রা এখন রান্নাঘরে টুকটাক কাজ সামলাতে ব্যস্ত, আর বাকি সব বিচ্ছুরা খেলাধুলায় মেতে আছে। দোতালা পুরোটা তাদের দখলে চেচামেচি হাসাহাসির শব্দ পুরোটা জুড়েই। দুইদিন ধরে তালহা তাহিয়াদের পড়ার দিকে নজরই দিচ্ছে না। আর সেই সুযোগ পেয়ে দু’টো যেন আকাশে উড়ছে। পড়ার টেবিলের আশপাশেও ঘেঁষছে না একটাও। যেন ভুলেই বসেছে, কয়েকদিন পর যে ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষা।
দোতালায় তাহিয়াদের ঘরের মাঝেই রাখা হয়েছে ক্যারাম বোর্ড। চারদিকে চারজন, তাহিয়া, মেহরীন, রাফা, ফারিহা বসেছে। আর বেচারা গরিব মেহেদি বোর্ডের চারপাশে ঘুরঘুর করেই মরছে, তাকে খেলতেই নিচ্ছে না কেউ। একেকজনের কাছে গিয়ে গিয়ে রিকোয়েস্ট করছে একটা যেন মারতে দেয়।
—আপু দাওনা একটা মারি, দেইখো আমি তোমাকে ওই সাদা গুটিটা ঢুকিয়ে দিবো।
মেহেদির কথা শুনে তাহিয়া গরম চোখে তাকিয়ে এক ধমক দিল,
—তোকে একটু আগেও একটা মারতে দিয়েছি। আমার ইজি গুটিটা উল্টো নষ্ট করে দিয়েছিস। যা সর…
বোনের ধমকে চুপসে গিয়ে এবার রাফাদের কাছে গেল। তবে তারাও রিজেক্ট করে দিল। শেষমেশ আশা নিয়ে সে মেহরীনের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—ও মেহুপু প্রমিস তোমাকে ওই রেড ঢুকিয়ে দিবো। একটা মারি না…?
মেহরীন অসহায় চোখে তাকাল মেহেদির দিকে। ছেলেটা ঠোঁট উল্টে আবদার করে বসে আছে। সে নিজেই তো এখনো একটা গুটিও তুলতে পারেনি, আবার তাকে দিবে৷ ক্যারাম তো খেলতেই পারেনা সে। তাহিয়ারা যাই টুকটাক শিখিয়েছে তাই হিসেবে স্টিকটা ধরতে পারছে। আর অন্যদিকে তাহিয়া-রাফারা তারাই যেন সব গুটি তুলে নিচ্ছে উড়া ধুরা। কিছু একটা ভেবে সে সরে জায়গা করে দিল মেহেদিকে। যদি সত্যি একটা ঢুকিয়ে দিতে পারে। তবে তারই লাভ।
মেহেদি তো খুশিতে দুম করে বসে পড়ল। মেহরীনের পালা আসতেই স্টিক হাতে নিয়ে এমন ভাব নিল যেন জাতীয় টুর্নামেন্ট খেলতে নেমেছে সে। প্রায় মিনিট খানেক তাকিয়ে তাকিয়ে নিখুঁত ভাবে লক্ষ্য ঠিক করল। মেহরীন তার আত্মবিশ্বাস দেখে তো নিশ্চিত, এবার বোধহয় পারবেই। তাই খুশি খুশি মুখ নিয়ে অপেক্ষায়।
এদিকে এত সময় নিতে দেখে তাহিয়ারা চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। তবে সেসব মেহেদি কিছুই শুনল না। সে নিজের মতো করেই নিঃশ্বাস নিয়ে শট মারল। মুহুর্তেই স্টিকটা ছুটে গেল ঝড়ের গতিতে। সবাই আগ্রহ চোখে তাকিয়ে, এই বুঝি ঢুকিয়ে ফেলল। তবে সকলের ভাবনায় জল ঢেলে, কাঙ্ক্ষিত গুটিতে স্টিক তো লাগিয়েছেই, সাথে পাশে থাকা আরও কয়েকটা গুটিতে লাগিয়ে তিন-চারটে গুটি একসাথে উড়িয়ে দিল।
মুহূর্তেই সবাই ক্ষেপে উঠে একসাথে ধমকাতে লাগল তাকে। মেহেদিকে একপ্রকার তাড়িয়ে সরিয়েও দিল বোর্ড থেকে। থতমত খেয়ে মেহেদি মেহরীনের দিকে আমতা আমতা করে তাকায়। দেখে মেহরীনের মুখটা আরও অসহায় হয়ে গেছে। খেলা চলতে থাকল, কিন্তু মেহরীন টুকটাক গুটিতে স্টিক লাগানো ছাড়া কিছুই করতে পারছে না। তা দেখে মেহেদি আর মেহরীন চোখে চোখে বেশ কয়েকবার তাকাল। দু’জনের মনের ভাষা যেন এখন, “এভাবে আর বসে থাকা যায় না।” এরমাঝেই হঠাৎ মেহেদি দুষ্টু হাসি দিয়ে একটা ইশারা করল। মেহরীনও তার ইশারা বুঝে সমান হাসিতে মাথা নেড়ে রাজি।
পরক্ষণেই, কোনো সতর্কতা ছাড়াই, দু’জন মিলে পুরো বোর্ডের সব গুটি সেকেন্ডের মধ্যে এলোমেলো করে দৌড়! তাহিয়া-রাফা-ফারিহা কয়েক সেকেন্ড বোর্ড, চারপাশ, দেখতে লাগে। কাহিনি কি বুঝতেই চিৎকারে ফেটে পড়ল,
—মেহুর বাচ্চায়ায়ায়ায়া…
—মেহেদিইইইইইইই দাড়া….
তবে তাদের পায় কে। মেহেদি আর মেহরীন প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে। পেছনে তিনজনের ভয়ংকর তাড়া। মুহূর্তে পুরো বাড়িটায় দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেল, সিঁড়ির ওপরে নিচে, বারান্দা, ড্রয়িংরুম, সব জায়গায় শুধু ধাপধাপ পায়ের শব্দ, চিল্লাফাল্লা, আর হাসাহাসি।
সোফায় রিতু, ফারাহ, স্নেহা আর ফাইজারা বসে টিভি দেখছিল সাথে গল্প করছিল। তবে তাদের এই শান্ত পরিবেশে হঠাৎ এমন তাণ্ডব দেখে রিতু কয়েকবার রাগে হুশিয়ার করল,
—চুপ! বন্ধ কর উপরে গিয়ে যা খুশি করনা…
কিন্তু কে শোনে তার কথা। দৌড়ঝাঁপ থামানোর তো প্রশ্নই নেই। রাগে বিরক্ত হয়ে, শেষমেশ রিতু নিজেই উঠে ঘরে চলে গেল। এদিকে আবার হঠাৎ কলিং বেলও বেজে উঠল। তাতেও তাদের থামাথামি নেই, একজন আরেকজনের পিছে দৌড়াতেই ব্যস্ত। অবশেষে ফারাহ উঠে গিয়ে দরজা খুলতে বাধ্য হলো।
দরজা খুলতেই তালহাকে দেখে মুচকি হাসি ফুটে উঠেছিল ফারাহর মুখে। দিনের ক্লান্তি পেরিয়ে মানুষটা ফিরে এসেছে। তার ক্লান্তিময় চেহারাটা দেখতেই যেন নরম হাওয়া খেলে গেল মনে। দ্রুত দরজার পাশ থেকে সরে দাঁড়াতেই তালহা ভেতরে প্রবেশ করল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই ফারাহর মুখের সেই হাসিটা মিলিয়ে গেল সম্পূর্ণ। ঘরময় যেন হঠাৎ উত্তেজনা মুহুর্তেই শান্ত।
তালহা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই, ছোটাছুটি করতে থাকা মেহরীন তার সামনে পড়ে। হঠাৎ তালহাকে সামনে দেখে মেহরীন থামতে গিয়েই পা জড়িয়ে হোচট খেয়ে সোজা মাটিতে পড়তে নেয়। তবে এর আগেই তালহা এগিয়ে গিয়ে এক ঝাটকায় তার কোমর জড়িয়ে টেনে আগলে নেয় বাহুতে। দু’হাতের জোরে তাকে সামলে তুলতেই সাথে সাথে গলার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে কঠিন এক ধমক,
—ইডিয়েট, দৌড়াদৌড়ি করছো কেনো। যদি পরতে কি হতো?
তালহার এতো কাছ থেকে এমন রামধমক খেয়ে কেঁপে উঠে মেহরীন। এমনকি ধমক শুনে আশপাশে থাকা বাকি বিচ্ছুরাও থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। ভয়ে একেকটা চুপসে আছে। মেহরীন হাঁপাতে হাঁপাতে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তালহার হাত তখনো তার কোমরে। ভয়ে কাচুমাচু মুখটা নিচু করে নেয়, প্রায় ফিসফিস স্বরে বলল,
—সরি আর হবেনা…
তালহা এবার তাকে ছেড়ে দাঁড়াল। কিন্তু মুখের অভিব্যক্তি বদলালো না। কিছুটা চিন্তিত চোখে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখে নিল মেয়েটাকে। একটু থেমে, গলা নরম করে জিজ্ঞেস করল,
—লাগেনি তো কোথাও?
মেহরীন কোণা চোখে তাকালো তালহার দিকে। নাক ফুলিয়ে মনে মনে ক্ষীণ রাগ নিয়ে বলল,
—হাহ প্রথমে ধমক দিয়ে পরে আসছে খোঁজ নিতে বলবো না কিছু।
তবে ভাবনার কথাটা নিজের মধ্যেই রেখে দিল সে। মুখে বলল কেবল,
—না….
কিন্তু তালহার রাগের রেখা ফের তীক্ষ্ণ হলো পরের প্রশ্নে,
—এসময়ে পড়তে না বসে এসব বাদরামি করছো কেনো? পড়তে বসোনি কেনো এখনো?
তার প্রশ্নে কিছুটা আঁতকে উঠে মেহরীন। ভয়ে ঢুক গিলে পেছন ফিরে তাকায় তাহিয়ার দিকে। সে তো বলেছিল তালহা এ নিয়ে কিছু বলবে না, তবে এখন? তাহিয়াও ঠিক ওর মতোই গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বেচারিও ভয়ে। তাহিয়াকে কড়া চোখে প্রশ্ন করতেই তাহিয়া ঠোঁট উল্টে এক কানে হাত দিয়ে চোখের ইশারায় “সরি” বলে দেয়। মেহরীন তা দেখে চোখ দিয়ে শাসায়। “যার অর্থ তোকে পরে দেখে নিবো।” দুটোর হাবভাবে দুটোকে নেড়েচেড়ে দেখলেই বোঝা যাবে, অপরাধী দুটোই।
মেহরীনের তাকানো দেখে তালহাও তাকালো তাহিয়ার দিকে। আর সাথে সাথেই তার চোখ আরও গরম হয়ে উঠল।
—তুইও পড়তে বসিসনি?
তাহিয়া তোতলাতে তোতলাতে বলল,
—আ..সলে ভাইয়া আমি তো পড়তে বসতে চেয়েছিলাম মেহরীন বললো পড়ার দরকার নেই একদিন না পড়লে কিছু হবেনা।
তাহিয়ার কথায় তালহা ধীরে মাথা ফিরিয়ে লাল চোখে মেহরীনের দিকে তাকাতেই, মেহরীনের অপ্রস্তুত চোখ বড়বড় হয়ে ওঠে। সে সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—ছি ছি আস্তাগফিরুল্লাহ কি মিরজাফর। আমি এমন কিছুই বলিনি সত্যি। তাহিয়া বলেছিল রাফারা আছে, আজ পড়তে না বসলে আপনি কিছু বলবেন না তাই বসিনি।
তালহা ফুসে উঠে টাই খুলতে খুলতে সোফার দিকে এগোল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সে রেগে আছে। হয়তো আজ অফিসে তার দিনটা মোটেও ভালো কাটেনি। মুখে সেই জমে থাকা বিরক্তি, অস্থিরতা, যেন বাড়িতে ঢুকেই প্রথম ফাঁক পেল কারও উপর তা উগরে দেওয়ার।
ফারাহ দরজা লাগিয়ে ফিরে মেহরীনের দিকে চোখ রাখে। তালহার তাকে আগলে ধরা, তাকে নিয়ে তালহার চিন্তিত হওয়া, ব্যাপারটা তার ভেতরে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি আর বিরক্তি তুলল।
তালহা কোট খুলে পাশে ছুড়ে রেখে দুজনকে সামনে আসতে ইশারা করল। সাথে সাথে সুরসুরিয়ে দুজন তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। রাফা-ফারিহা ওই সুযোগে কবে যে উধাও হয়েছে জানা নেই।
তালহা এবার কড়া গলায় বলল,
—তো? বাড়িতে কি বিয়ে লেগেছে যে পড়া অফ হবে? এসব সামান্য এক্সকিউজ এ আমি পড়তে না করবো, এ কথা কে বলেছে?
দুজন কাঁচুমাচু হয়ে একযোগে আঙুল তাক করল দুজন-দুজনের দিকেই। তা দেখে ফাইজা-স্নেহা ফিক করে হেসে উঠল। কিন্তু তালহার চোখের চাহনি তাদের দিকে যেতেই সে হাসি মিয়িয়ে গেল। তালহা ফের গর্জে উঠল,
—এক থাপ্পড়ে দুটোকে ফোকলা বানাই দিবো স্টুপিড দুটো। সামনে পরীক্ষা সেই খেয়াল নেই?
তাহিয়া আর মেহরীন মাথা নিচু করে পাশাপাশি ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গেল। তালহা একের পর এক ঝাড়ি দিয়েই যাচ্ছে। তার রাগত স্বরটা পুরো ঘর ভরিয়ে রেখেছে। ছেলের চিৎকার শুনেই তিতলি বেগম রান্নাঘর থেকে তড়িঘড়ি করে এক গ্লাস শরবত বানিয়ে নিয়ে এলেন। এসেই দেখেন মেয়েদুটো ভয়ে গুটিয়ে আছে একেকটার মুখ দেখার মতো। ছেলের হাবভাব দেখে তিনি নিশ্চিত, আজ অফিসে নিশ্চয়ই কোনো বড়সড় গণ্ডগোল হয়েছে। তাই হয়তো ঘরে ঢুকেই মেয়ে দুটোকে পেয়ে তাদের উপরই সব রাগ উগরে দিচ্ছে।
তিনি এসে ছেলের হাতে শরবত ধরিয়ে দিয়ে নরম গলায় বললেন,
—হয়েছে তো আব্বু আর এমন করবে না, আমিই একটু ছাড় দিয়েছিলাম।
মায়ের কণ্ঠে তালহার গলার ভলিউম খানিকটা নেমে এলো,
—আম্মু তুমি ওদের হয়ে সাফাই গেয়ো না তো। ওদের এক্সামের আর কদিন আছে? এতো ফাঁকিবাজি করলে চলবে?
তিতলি বেগম এবার দুজনকে চোখে ইশারা করে বললেন,
—আচ্ছা পড়বে তো আমি বলছি পড়বে। এই তাহিয়া-মেহরীন আর ফাঁকিবাজি হবে পড়ায়…?
দুজন সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
—হু হু পড়ব পড়ব আর ফাঁকি দিব না..
তালহা শরবত হাতে নিয়ে গম্ভীরস্বরে বলল,
—দেখবো তো রেজাল্ট, তখন দেখা যাবে কেমন পড়ছেন আপনারা৷ রেজাল্ট যদি ভালো না আসে ডিরেক্ট বিয়ে দিয়ে দিবো।
বলেই শরবত একঢুক মুখে নিতেই পাশ থেকে তাহিয়া বলে ফেলল,
—তাহলে মেহরীনের বিয়েটা আগে দিয়ে দিও…
পরের মুহূর্তে তালহা আর মুখের শরবত গিলতে পারল না। মুখ-নাক দিয়ে শরবত বেরিয়ে আসার মতো অবস্থা। সঙ্গে সঙ্গে কাশতে শুরু করল। ফারাহ ছুটে গিয়ে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। তিতলি বেগম ছেলের মাথায় চাপড় দিয়ে চিন্তিত গলায় বলছেন,
—আস্তে ধীরে খাবি তো আব্বু…
মেহরীন রাগী চোখে চেয়ে আছে তাহিয়ার দিকে। তালহার চোখও তাহিয়ার দিকেই। সে যে দাঁত বের করে হাসছে, কথাটা যে ইচ্ছাকৃতভাবে বলেছে, তা তালহার চোখে এক ঝলকেই পরিষ্কার হয়ে গেল।কাশি থামতেই তালহা রাগী ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। দুই মিনিটের মধ্যে পড়তে বসার আদেশ দিয়ে সে নিজের রুমে চলে গেল। যাওয়ার আগে বোনকে একবার চোখে চোখে শাসিয়ে গেল।
তালহা যেতেই তাহিয়া জোরে হেসে উঠেছে। ভাইকে জব্দ করতে পেরেছে সে। এইতো পেয়েছে সুযোগ ভাইকে হাতে আনার। এ সুযোগ কি মিস করা যাবে। পদে পদে আটকাবে। মেয়েকে হাসতে দেখে তিতলি বেগম কিছুটা রেগে বললেন,
—এক্ষুনি গিয়ে পড়তে বসবি নয়তো খুনতি নিয়ে আসবো আমি।
মায়ের ধমকে তাহিয়া মেহরীনের হাত ধরে রুমের দিকে চলে যায়। মেহরীন তো বকেই চলেছে তাকে।
—তোর কি আক্কেল নেই? একটু শান্তিতে শরবতটুকুও খেতে দিলি না।
—এহ এই তোর জামাইর জন্য এতো দরদ উথলিয়ে পরলে যা না আবার বানিয়ে একদম মুখে তুলে খাইয়ে দিয়ে আয়।
—পারলে তো তাই দিতাম৷ কিন্তু এখন পড়তে না বসলে আরও ঝারি খাবো..
মেহরীনের কথায় তাহিয়া কপাল কুচকে বলল,
—আরে কিছু বলবে না, তুই বউ তোকে বকবে না। যা যা শরবত বানিয়ে নিয়ে যা একটু ব্যস্ত রাখ। সেই সুযোগে আমি ক্যারামটা লুকিয়ে রাখি। নয়তো তা দেখলে ডাবল চিল্লাবে।
তাহিয়ার কথায় মেহরীন কিছুক্ষন ভেবে। মাথা নেড়ে নিচে চলে যায়। ওদিকে তাহিয়া চলে রুমের দিকে। মেহরীন রান্নাঘরে আসতেই তিতলি বেগম বকতে শুরু করে কেনো এসেছে। তবে উনাকে কোনোমতে সামলে মেহরীন কফি বানিয়ে হাঁটা ধরে তালহার ঘরের দিকে। পারমিশন না নিয়েই আজ ডিরেক্ট ঢুকে পড়ল। ইদানীং তালহার সব বিষয়েই কেমন অধিকারবোধ হয়।
ফারাহ তালহার রুমের সামনে দিয়েই যাচ্ছিল। হঠাৎ মেহরীনের এমন আকস্মিক প্রবেশ দেখে সে দাঁড়াল। পার্মিশন ছাড়াই ঢুকে পড়ল? কথাটা মাথায় আসতেই কিছুটা অসহ্য লাগল ব্যাপারটা। সে এগোয় তালহার রুমে যেতে। তবে রিতুর ডাকে বাধ্য হয়ে চলে যায় রিতুর ঘরে। তবু মনে একটা অদ্ভুত কৌতূহল লেগেই থাকে।
মেহরীন রুমে ঢুকে তালহাকে না পেয়ে বাথরুমের দিকে উঁকি দেয়। পানির শব্দ শুনে কফিটা টেবিলের উপর ঢেকে রাখে। তারপর চারপাশে চোখ বুলাতে থাকে। চোখ পড়ে বিছানায় রাখা মোবাইলে, ভিডিও চলছিল। হয়তো তালহা দেখছিল কিন্তু বন্ধ না করেই বাথরুমে চলে গেছে। মেহরীন গুটি গুটি পায়ে বিছানায় বসে মোবাইলটা হাতে নিল। জানেনা তবে ইদানীং একটু বেশিই সাহস বেড়েছে, তালহার জিনিসে হাত দিতে ভয় লাগেনা। দেখতে পায় মোবাইলে ফেসবুক অন ভিডিও চলছে। কিছুক্ষণ সে নিউজফিডে ঘুরাঘুরি করে। হঠাৎ তালহার ফ্রেন্ডলিস্ট দেখার ইচ্ছে জেগে ওঠে মনে। কোনো মেয়ের সাথে কথা বলে কিনা তাও দেখার সখ জেগেছে। তবে কিভাবে দেখবে তা সে জানে না। তাহিয়ার কাছ থেকে একবার দেখেছিল, কিন্তু নিজে ব্যবহার করেনি তাই ভুলে বসেছে। শেষমেশ নিজের ইচ্ছে দমিয়ে, নিউজফিডেই চোখ বুলাতে থাকে। যদি উল্টো পাল্টা কিছু করে বসে তাই ট্রাই করেও দেখল না। একেরপর এক পোস্ট ভিডিও এরমধ্যে একটি পোস্ট ধরা দেয় তার নজরে। কেবল নজরেই না মনেও।
“পাখি ডাকটা ভীষণ আদুরে, এক কোমল, আনন্দময় সম্বোধন। প্রিয় মানুষের মুখ থেকে এমন স্নেহমাখা ডাক শোনাই একধরনের ভাগ্য, একধরনের লাক। যা সবার হয় না। তা আপনার প্রিয় মানুষটা আপনাকে কি বলে ডাকে?”
পোস্ট টা পড়তেই, মেহরীনের ঠোঁট আচমকাই উল্টে আসে। মাথায় খেলল, আজ পর্যন্ত তালহা তো তাকে কখনও “পাখি” ডাকেনি। তাহলে কি তাকে ভালোবাসে না? তালহার কাছে কি সে আদুরে নয়? মুহূর্তেই মনটা আরও ভেঙে যায়। সে বসে থাকে গোমড়া মুখে, মোবাইল পাশে রেখে। নিজের আজাইরা চিন্তায় ডুবেছে। একবার ভাবছে তালহা তাকে ভালোবাসে না। আবার নিজেকেই প্রশ্ন করছে, তালহা মিথ্যাই বা কেনো বলবে?
তার নানান চিন্তার ভেতর হঠাৎ বাথরুমের দরজা খোলার শব্দে মেহরীন ঝটফট উঠে দাঁড়ায়। ওড়না ঠিক করে বাথরুমের দিকে তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে গেল। তালহার কোমড়ে শুধুমাত্র তোয়ালে পেচানো। গোসল শেষে বেরিয়েছে হয়তো, চুল থেকে পানি টপটপ করে ঘাড় হয়ে বুক বেয়ে নিচে পড়ছে। এমতাবস্থায় তালহাকে দেখে মুহূর্তেই লজ্জায় পড়ে যায় মেহরীন। ফট করে সোজা পেছনে ঘুরে দাঁড়ায়। এই শীতের মাঝেও যেন শরীর বেয়ে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে।
তালহা বেরিয়েই মেহরীনকে তার ঘরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কপাল কুচকায়। মেহরীনের মুখে থেকে লজ্জায় “ছিইই” শব্দ বের হতেই তালহা নিজের দিকে তাকায়। দ্রুত তোয়ালের গিট শক্ত করে তালহা দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে তা খোলা। মনে মনে একটা বকা দিয়ে বসে “স্টুপিড একটা কাল কাকে কি বুঝিয়েছি”। বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে যায়। দরজা আটকে দিয়ে মেহরীনের সামনে দাঁড়ায় রাগে কপাল কুচকে জিজ্ঞেস করল,
—পড়তে না বসে এখানে কি করছো?
মেহরীন ইতস্তত করতে লাগে,
—আ…আপনার কফি…
তালহা ধমকের সুরে জবাব দেয়,
—আমি বলেছি কফি আনতে?
মেহরীন মাথা ঝাকিয়ে বলল,
—না না..
তালহা ফুঁসে উঠে বলল,
—তো আনলে কেন?
মেহরীন ভয়ে ভয়ে বলল,
—ভেবেছিলাম…
তাতে যেন তালহার মেজাজ আরও চড়াও হলো। সঙ্গে সঙ্গে ঝারি মেরে বসল,
—ভাবতে কে বলেছে?
—ক.. কেউ না..
—স্টুপিড।
কথার মাঝেই খেয়াল করে মেহরীন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে কথা বলছে। তা দেখে তালহার কপালের ভাঁজ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
—কি সমস্যা? ওদিকে ফিরে কার সঙ্গে কথা বলছ?
মেহরীন হরহরিয়ে বলল,
—আ..আপনার সাথে..
—আমি এদিকে না ওদিকে?
মেহরীন হাত উচিয়ে তালহার দিকে আঙুল তাক করে বলল,
—এদিকে..
তালহা দু’হাত কোমড়ে দিয়ে দাঁড়ায়,
—তো ওদিকে তাকিয়ে কেনো?
মেহরীন অস্বস্তিতে ইতস্তত করতে থাকে।
—আ… আসলে এমনি।
—এমনি মানে কী? আমার দিকে তাকাতে ভালো লাগছে না? আমাকে দেখতে আর ভালো লাগছে না? নতুন কাউকে দরকার নাকি?
তালহাকে এভাবে হঠাৎ আরও চটে যেতে দেখে মেহরীন তড়িঘড়ি ঘুরে দাঁড়ায়।
—ছি! কী সব বলছেন। আমার আর কাউকে লাগবে না, আপনিই যথেষ্ট।
—তাহলে মুখ ফিরিয়ে ছিলে কেন?
মেহরীন তালহার দিকে একপলক তাকিয়ে মাথা নিচু করে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।
—আপনার গায়ের কাপড়…
তালহা নির্বিকার গলায় বলল,
—তো?
—না মানে.. বলছিলাম আর কী।
মেহরীনের চোখ আবার নীচের দিকে দেখে তালহা বিরক্ত হয়ে ওঠে,
—আবার চোখ সরিয়ে নিলে কেন?
মেহরীন এবার নিজেও খানিকটা বিরক্ত। রাগে চটে উঠে বলল,
—উফফ! বুঝছেন না কেন? লজ্জা লাগছে। আপনার কি লজ্জা লাগছে না, একটা মেয়ের সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে?
তার কথায় তালহা এবার বুঝলো বউ তার লজ্জায় মিয়িয়ে আছে। মুহুর্তেই ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফুটে ওঠে। তবে হাসি চেপে রেখে স্বাভাবিক গলায় বলল,
—না, আমার তো মোটেও লজ্জা লাগছে না। বউয়ের সামনে আবার কিসের লজ্জা? আজ পর্যন্ত শুনেছ, পুরুষকে বউয়ের সামনে লজ্জা পেতে?
মেহরীন সেভাবেই মাথা নেড়ে না জানায়। তা দেখে তালহা আবার বলল,
—তাহলে আমি কেন পাব?
কথা বলতে বলতেই তার নজর পড়ে মেহরীনের মুখে। মেয়েটা লজ্জায় লাল টুকটুকে হয়ে উঠছে। গাল দুটোতে ধীরে ধীরে লালচে আভা আরও লাল রঙ ধারন করছে। মেয়েটা এত লজ্জা পেয়েছে? মনে মনে প্রশ্নটা ভাবতেই তালহা ভ্রু তুলে মুচকি হাসে। নিজে নিজেই ফের আওড়ায়, পাবেই তো লজ্জা, বাচ্চা বউ তার। তবে তাকে এমন অপদস্ত হতে দেখে ভালোই লাগছে। উপভোগ করছে ভালোই। বউকে আরেকটু লাল করলে মন্দ কী! এই ভেবে সে বলে ওঠল,
—একি তোমার গাল এত লাল হয়ে আছে কেন?
মেহরীন এদিক, ওদিক তাকাতে তাকাতে গাল লোকাতে লাগে তালহার নজর থেকে। কোনোরকমে বলল,
—না মানে হঠাৎ আপনাকে এভাবে দেখে লজ্জা পাচ্ছি।
তালহা মাথা খানিকটা নিচু করে গভীর দৃষ্টি মেলে ধরল,
—লজ্জা পেলেই কি গাল লাল হয়ে যায়?
মেহরীনের অস্বস্তি আর লজ্জা একসাথে চেপে বসে। কী করবে, কী বলবে, ভেবে পায় না এমন সময়ে। তালহা একদম সামনে, পালাবার পথও নেই। নয়তো এতোক্ষনে ছুটে পালাতো। সে অকারণে চুল ঠিক করতে করতে নড়াচড়া করতে থাকে। নিজেকে স্বাভাবিক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
—কি হলো? আরও লাল হচ্ছে কেন?
তার এই বাড়াবাড়িতে অতিষ্ঠ হয়ে মেহরীন গলা চড়িয়ে বলে ওঠে,
—উফফ! আমি কী জানি? গালকেই জিজ্ঞেস করুন।
কপট রাগে কথাটা বললেও তালহা যে সত্যিই তাই করবে, তা সে ভাবেনি। মুহূর্তেই তালহা দু’পা এগিয়ে আসে। তাকে এগোতে দেখে মেহরীন যেন আরও জমে বরফ। দাঁতে দাঁত চেপে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে। তালহা এগিয়ে এসেই মেহরীনের মুখটা আলতো করে তুলে ধরে। আঙুলের ডগা গালে ছুঁইয়ে হালকা চিমটি কেটে জিজ্ঞেস করে,
—লাল হচ্ছিস কেন গাল?
তালহার এই কাণ্ডে মেহরীন পুরোপুরি হতভম্ব। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে। গালকে জিজ্ঞেস করছে? সে কি কথা বলতে পারে নাকি! তালহার মাথা কি গেছে? তার সেসব ভাবনায় ফোরণ কাটে তালহার স্পর্শ। তালহার হাতের ঠান্ডা স্পর্শ আরও গভীর হতেই মেহরীন যেন আরও দুর্বল হয়ে পড়ল, শরীর ঢিলে হয়ে আসে। কান হয়ে ঘাড় অব্দি তার আঙুলের বিচরণ। মেহরীন মাথা নিচু করতে চাইলেও পারে না, তালহা আটকে রেখেছে।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তালহা হঠাৎ নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল,
—সামান্যতেই যদি এত লজ্জা পাও, এই তোয়ালেও যখন থাকবে না তখন কী অবস্থা হবে তোমার?
কথাটা খুব আস্তেই বলেছে তালহা। তবে মেহরীনের কান অব্দি ঠিকই পৌঁছেছে। মুহূর্তেই তার চোখ বিস্ময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ বড় হয়ে ওঠে। তালহার মুখে এমন কথা শুনে সে একেবারে হতচকিত। কী প্রতিক্রিয়া দেবে বুঝে উঠতে পারছে না। লজ্জায় যেন কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বেরোচ্ছে। তালহা দিন দিন যে এতটা নির্লজ্জ হয়ে উঠছে, সেটা তার কল্পনারও বাইরে।
সঙ্গে সঙ্গে কানে দু হাত দিয়ে চোখমুখ খিচে বিরবিরিয়ে উঠে,
—আল্লাহ মাটি ফাঁক করো…
মেহরীনের এই দশা দেখে তালহা ফিক করে হেসে ওঠে। তার নাক টিপে দিয়ে সরে আসে সামনে থেকে। মেয়েটার অবস্থা দেখে তার হাসি থামছেই না যেন। ওয়ারড্রোবের কাছে গিয়ে কাপড় বের করতে করতে আড়চোখে ফের তাকায়। মেহরীন পিটপিট করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তা দেখে আবারও খোঁচা মেরে বলে বসল,
—এভাবে নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে আছ কেন? চোখ দিয়েই গিলে ফেলবে নাকি?
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গেই চোখ সরিয়ে নেয়। যেন চোখ দুটো আগুন ছুঁয়ে ফেলেছে। কাচুমাচু হয়ে উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,
—আপনি এতো বেশরম…
তালহা ছোট ছোট চোখ করে তাকাল। ঠোঁটের কোণে এমন এক হাসি খেলল, যেটা স্পষ্টই বলে দিচ্ছে, মেহরীনের এই লজ্জা তার জন্য বিরক্ত নয়, বরং ভীষণ উপভোগ্য।
—জানোনা, জামাইদের লজ্জা থাকতে নেই। তাই আমি লজ্জা বিসর্জন দিয়েছি।
—তাই বলে একটুও নেই?
—না নেই, প্রমাণ দেখাবো?
—না না…
—আরে দেখাই?
মেহরীন মাথা জোরে ঝাঁকাতে লাগল,
—না না, দরকার নেই আমি বুঝেছি।
তালহা দুষ্টু হেসে বলল,
—না, তুমি বুঝোনি, দাঁড়াও, তোয়ালেটাও ফেলে দেই…
মেহরীনের লজ্জা আর আতঙ্ক একসাথে মিশে গলায় উঠে এলো,
—ইয়া আল্লাহ! নায়ায়ায়া, প্লিজ…
কিন্তু এর মধ্যেই তালহার গায়ের তোয়ালেটা এসে পরল তার উপর। মেহরীন হতভম্ব হয়ে তা দেখতেই আবার চিৎকার করতে উদ্যত হলে, তালহা পেছন থেকে তার মুখ চেপে ধরল।
—উম উম…
—স্টুপিড, আর একটা আওয়াজ করলে ঠোঁটের হাল বেহাল করে দিবো।
—উম উম।
—বাঁশ খাওয়ার এতো সখ?
—উম উম..
তালহা একটানে তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। মুখ থেকে হাত সরিয়ে চোখে চোখ রেখে কড়া স্বরে বলল,
—কি হয়েছে, চেচাচ্ছিলে কেনো? কিছু করেছি আমি?
মেহরীন হতবাক চোখে তাকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত এক ঝলক দেখে নেয়। গায়ে টাউজার, গেঞ্জি, নাহ সব ঠিকঠাক। বুকের ভেতর জমে থাকা নিঃশ্বাসটা এবার ছাড়তে ছাড়তে বলল,
—ভেবেছি আপনি সত্যিই…
তালহা পকেটে হাত রেখে ভাবভঙ্গি বদলে গম্ভীর হয়ে উঠল।
—তোমার মতো নির্লজ্জ ভেবেছো নাকি আমাকে? আমার যথেষ্ট লজ্জা সরম আছে।
তার এই হঠাৎ পল্টিতে মেহরীন ড্যাবড্যাব চোখে তাকিয়ে। ভাবসাব দেখে এখন যেন লাগছে মসজিদের ইমাম সাহেব। তালহা মৃদু হাসি ঠোঁটে রেখে মেহরীনের কপালে হালকা টুকা দেয়। তারপর সোফায় গিলে বসে বলল,
—অসভ্য বউ, চিন্তাধারা বদলাও। এতো নেগেটিভ ভাবলে হয়?
মেহরীন মুখ ফুলিয়ে রাগী চোখে তাকিয়ে আছে। এতোক্ষন নিজে অসভ্যতামি করে এখন তাকে কিনা অসভ্য বলছে। মানা যায়?
তালহা ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করল,
—তা কফি না এনেছিলে, কোথায়?
মেহরীন কড়া চোখে চেয়ে ঢেকে রাখা কফিটা হাতে নিয়ে বলল,
—গরম করে আনি, ঠান্ডা হয়ে গেছে…
তালহা তাকে থামিয়ে বলল,
—আগে খেয়ে দেখো আসলেই ঠান্ডা হয়েছে কিনা…
মেহরীন কাপের সাইডে হাত দিয়ে দেখে বলল,
—হাত দিয়েই তো বোঝা যাচ্ছে ঠান্ডা…
তালহা কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
—আমি বললাম খেতে..
তালহার কথায় মুখ মোচড়ে একঢোক কফি খেয়ে নেয়। ঢুক গিলতেই চোখমুখ কুচকে এলো। এটা কি কফি নাকি তেতো ওষুধ।
—ইয়াক! এই কফি খান কিভাবে?
—দাও, খেয়ে দেখাচ্ছি…
মেহরীন বোকার মতো তাকায় তার কথায়। তাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে চোখ দিয়ে ইশারা করে সামনে আসতে। সে আসতেই তালহা ছো মেরে হাত থেকে কফির কাপটা নিয়ে মেহরীনের ঠোঁট ছোঁয়ানো জায়গা দিয়ে এক টানে সম্পূর্ণ কফিটা খেয়ে নেয়। এই ঠান্ডা কফি পানির মতো গিলে ফেলতে দেখে মেহরীন নাক তুলে তাকায়,
—একি করছেন! দেন, আমি গরম করে এনে দিচ্ছি।
তালহা শেষ করে কাপটা টি টেবিলে রেখে বলল,
—ফাস্ট গিয়ে পড়তে বসবে। আমি যেন ঘরে গিয়েই পড়ার টেবিলে দেখি।
মেহরীন বিরবিরিয়ে কাপটা নিতে আসলে তালহা থামিয়ে দেয়। চোখ রাঙিয়ে বলল,
—বলেছি ঘরে যেতে! এটা আমি রেখে আসবো..
মেহরীন আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ হাঁটা ধরে। দরজা খুলে বের হতেই তালহা পেছন থেকে ডেকে ওঠে।
—মেহরীন…
মেহরীন থেমে দাঁড়ায়, সঙ্গে সঙ্গে মনটা খারাপও হয়ে যায়। তালহার ডাকল কেবল নাম ধরে? পাখি টাখি সম্বোধন করতে পারে না? মনে মনে ফুসে উঠে, নিরামিষ করলা, খালি মেহরীন বলেই ডাকে। তার ভাবনার মাঝে তালহা ফের ডেকে উঠে,
—মেহরীন, একটু এদিকে আসো তো..
মুখ কালো করে পেছন ফিরে এগোয় তালহার দিকে। আবার কেনো ডাকল, শুনেই যাক সেই ভেবে। মোবাইল নিয়ে কিছু একটা করছে। মেহেরীনের উপস্থিতি টের পেয়ে মোবাইলের স্ক্রিন থেকে চোখ সরায়। মেহরীনের মুখের অবস্থা দেখে তালহা কপাল কুচকে বলল,
—কি ব্যাপার! এমন মুখ বানিয়ে দাঁড়িয়ে আছো কেনো?
প্রশ্ন করতেই মেহরীন মুখ ফসকে বলে ফেলল,
—আপনি তো অনেক নিরামিষ লোক..
—আমি নিরামিষ?
—হুম..
—কিভাবে..?
মেহরীন আহ্লাদী কন্ঠে অভিমানী সুর তুলল,
—আমাকে কেউ মিষ্টি করে পাখি-টাখি ডাকে না, আমি মনে হয় কাউয়া…
তার কথার অভিমান, অভিযোগ শুনে তালহা কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। বউটা তার নাটক শিখে ফেলছে, মনে মনে হাসি পেলেও তা দমিয়ে রাখল। হঠাৎ কঠিন স্বরে বলে উঠল,
—গেট আউট…
তালহার মুখ থেকে এমন রূঢ় বাক্য শুনে মেহরীন তড়াক চোখে তার মুখের দিকে সোজা হয়ে তাকাল। যেন এমনটা অপ্রত্যাশিত ছিল।
—কিইই…
তালহা আরও কঠিন গলায় বলল,
—আই সেইড গেট আউট।
এক মুহূর্তের মধ্যে কথাগুলো যেন মেহরীনের নরম বুকে এসে বিঁধল। বেচারি সামান্য একটা কথা বলায় যে এভাবে অপমান করবে, তা সে কল্পনাও করেনি। অভিমানে মুখটা মুহূর্তেই ভার হয়ে উঠল, বুকের ভেতর জমে উঠল একরাশ ভারী নীরবতা। চোখ নামিয়ে মন খারাপ করে ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল মেহরীন। দরজা পেরিয়ে বাইরে পা দিতেই, পেছন থেকে তালহার কণ্ঠ ভেসে এলো,
—স্টপ…
এই ডাকে এবার বিরক্তির ছায়া নেমে এলো তার চোখে। সদ্য অপমানের আঁচ তখনও গায়ে লেগে। আবার অপমান করতে ডাকছে? অভিমান মুখে চেপে ফিরে তাকিয়ে বলল,
—আবার কি?
তালহা এবার গলার কঠোরতা ঢেকে শীতল হাসি ফুটিয়ে তুলল চেহারায়। স্বরটাও অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে এল তার,
—পাখি, একটু এদিকে আসো তো…
—এহহহ…
—এহ কি? এদিকে আসো, পাখি…
মেহরীন যেন বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে। এই লোকটাই না একটু আগেও তাকে বের করে দিচ্ছিল? ধমকাচ্ছিল? এখন আবার মিষ্টি করে ডাকছে? হচ্ছে টা কি? দ্বিধা আর কৌতূহল একসাথে নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে দাঁড়াল,
—এটা কি ছিল?
তালহা ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি রেখে বলল,
—কেনো, তোমার উইশ পূরণ করলাম।
—তাই বলে এভাবে?
—কিভাবে?
—না মানে, এটা অপমান হয়ে গেল না?
—ওমা, অপমান কই? এটা ভালোবাসার ডাক।
—কিন্তু কেমন অপবাসা হয়ে গেল না?
মেহরীনের অদ্ভুত শব্দে তালহা চোখ কুঁচকে তাকাল,
—অপবাসা আবার কি?
মেহরীন নখ কামড়াতে কামড়াতে বলল,
—অপমান করে ভালোবাসাকে অপবাসা বলে।
—এসব আলতু ফালতু জিনিসে তো মাথা বেশ খাটাও, কিন্তু পড়ার সময় এই ব্রেইন কোথায় থাকে?
—তখন তো ব্রেইন এস্কিডেন্ট করে বসে…
তালহা অবাকসুরে সঙ্গে সঙ্গে থামিয়ে দিল,
—কিইই? কী বললে?
মেহরীন ভয়ার্ত চোখে তাকায়। ভুল কিছু বলে বসেছে নাকি? ভাবতেই আমতা আমতা করতে লাগে,
—ক..কই কিছুনা।
—নাহ মাত্র কি বললে ব্রেইন কি করবে?
মেহরীন আঁটকে আঁটকে বলল,
—এ..স্কিডেন্ট…
তালহা ধমকের সুরে সঙ্গে সঙ্গে শুধরে দিয়ে বলল,
—স্টুপিড, ওটা এস্কিডেন্ট না, এক্সিডেন্ট…
মেহরীন থতমত খেয়ে তাকায়। অস্বস্থিতে পরে হাসফাস করতে লাগে,
—আমি তো তাই বললাম এস্কিডেন্ট…
তার আবারও সেই একই বিকৃত উচ্চারন শুনে আবারও ঝারি মারে,
—হপ আবারও এস্কিডেন্ট বলছ? ওটা এক্সিডেন্ট, এক্সিডেন্ট…
মেহরীন অসহায় চোখে তাকিয়ে তালহার সাথে বলল,
—আরে আমিও তো তাই বলছি, এস্কিডেন্ট, এস্কিডেন্ট…
এইবার তালহা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হঠাৎ অট্টহাসিতে মেতে উঠল। মেয়েটা এক্সিডেন্টকে কিনা এস্কিডেন্ট বলছে। তাকে হাসতে দেখে মেহরীন লজ্জায় অপদস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে। মেয়েটার অবস্থা দেখে যেন আরও হাসি পাচ্ছে তালহার । মন খুলে হাসছে সে। মেজাজটা ফুরফুরে লাগছে। সারাদিনের জমে থাকা ক্লান্তি, অফিসের কাজের ঝট-ঝামেলা, সবকিছু যেন হাসির সাথে হারিয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষন হাসার পর নিজেকে থামাতেই সে নিজেই টের পেল, মনটা অনেকটা হালকা হয়ে এসেছে।
লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা মেহরীনকে তালহা হাত বাড়িয়ে টেনে পাশে বসাল। এই মেয়েটাই যেন জাদুকরী, আশেপাশে থাকলে মন ভালো করে দেয়।
—বলো, এক..সি..ডেন্ট…
মেহরীন ঠোঁট বাঁকিয়ে তার সঙ্গে বলল,
—এক…সি..ডেন্ট…
—এবার বলো এক্সিডেন্ট।
—এস্কিডেন্ট।
তালহা আবার হেসে ফেলল। মজা করে বলল,
—তুমি জেলা থার্ড পজিশনে আসলে কিভাবে? এক্সিডেন্ট নিজেই এক্সিডেন্ট করে বসবে তোমার এমন বিচিত্র উচ্চারণ শুনে। ছি ছি, লোকে শুনলে নির্ঘাত আমার মানসম্মান যাবে। তালহার বউ কিনা সাধারণ একটা উচ্চারণই পারেনা।
মেহরীন গাল ফুলিয়ে মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল,
—আমার মুখ দিয়ে এই উচ্চারণটাই শুধু বের হয় না…
তার অভিমানী চেহারা দেখে তালহা নিজের হাসি থামাল। কিছুক্ষণ সে চুপ করে রইল। বুঝতে পারল, মেয়ে সত্যিই মন খারাপ করেছে। চোখেমুখে তখন স্পষ্ট অভিমান জমে আছে।
মেহরীন নাক ফুলিয়ে বলল,
—ডেকেছেন কেনো?
তালহা নীরবে উঠে বেডসাইড টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। ড্রয়ার খুলতেই ভেতর থেকে বের করে আনল বেলি ফুলের ছোট্ট একটা মালা। হাতে নিতেই হালকা সুবাস এসে নাকে লাগল। ফের আগের জায়গায় এসে সে মেহরীনের হাত আলতো করে আগলে নিল। খুব যত্নে, মালাটা তার হাতে পেচিয়ে দিতে লাগল।
পরাতে পরাতেই অন্যমনস্ক স্বরে বলল,
—জ্যামে আটকে ছিলাম, তখন দেখি ছোট্ট বাচ্চা একটা বেলি ফুল বিক্রি করছে। কি মনে করে তোমার জন্য একটা নিয়ে নিয়েছিলাম। আবার ভেবোনা ঘুষ দিচ্ছি। এমনি, মনের টানেই দিলাম।
মুচকি হেসে মেহরীনের দিকে তাকাতেই দেখে মেয়েটার মুখের ভাবমূর্তি বদলেছে। মুখে জমে থাকা অভিমানটা যেন গলতে শুরু করেছে। চোখেমুখে হাসি ফুটেছে, মুহুর্তেই ঠোঁটের কোণে খেলল ছোট্ট এক চিলতে হাসি। খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে বলল,
—আমি কিছু মনে করিনি।
তআকে খুশি দেখে তালহা ধীরে স্বস্থিতে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ল। মেহরীন হাতের মালাটা নেড়ে দেখতে দেখতে দেখতে খুশি মনে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে একবার ধন্যবাদ দিতে ভুলল না। তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার পরও তালহার চোখ স্থির তাকিয়ে রইল সেদিকে। মেয়েটিকে সামান্য জিনিসেই মহা খুশি করা যায়।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু স্বরে সে বলে উঠল,
—তুমি ভীষণ সহজ-সরল, মেহরীন। এই সরলতাটাই আমাকে মাঝে মাঝে ভয় ধরায়। তুমি যে একটু মায়া দেখলেই ভরসা করে ফেলো। এই সরলতার ফায়দা না কেউ তুলে।
সকাল বাজে আটটা পঁয়তাল্লিশ। তালহা মাত্রই তাদের কলেজে নামিয়ে দিয়ে গেছে। দুই-তিনদিন পর কলেজে পা রাখতেই কেমন যেন মনে হচ্ছে চারপাশটা আলাদা, নতুন। পরিচিত জায়গাগুলোও আজ কেমন যেন অপরিচিত ঠেকছে।
গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দুজনেই অজান্তে সতর্ক হয়ে গেল। মাথায় খেলল, এই বুঝি রাফিরা হঠাৎ ভাউ করে উঠবে। কিন্তু না তা হলো না। চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখল, কেউ নেই। তখনই মাথায় এলো, তারা যে আজ কলেজে আসবে, সেটা তো কেউ জানেই না। সেই ভেবে দুজনেই হেসে উঠল। চলতে লাগল ক্লাসের দিকে।
সিঁড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠতেই দুজনেরই কপাল কুঁচকে গেল। সামনেই সিঁড়ির ধারে দাঁড়িয়ে তনিমা-রাফি-ফারিন। হয়তো কারো অপেক্ষায়। তবে তনিমাকে এখানে দেখে যতটা অবাক তার চেয়ে অবাক রাফিদের সাথে তাকে দেখে। তাহিয়া অবাক কন্ঠে বলেই উঠল,
—কিরে তোরা এখানে আর তনিমা..
কথাটা বলতেই তাদের দৃষ্টি এদিকে ফিরল। মেহরীনদের দেখামাত্রই তিনজনার চোখ ঝলমলে উঠে। খুশিতে একপ্রকার ছুটে এগিয়ে আসতে উদ্যত হবে অমনি কারো তীক্ষ্ণ ধমকে থেমে গেল তারা। সঙ্গে তাহিয়ারাও পেছন ফিরে তাকাল।
—এই মেয়ে, রাস্তা বন্ধ করে এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেনো? কলেজ কি তোমার বাপের? যেখানে সেখানে দখল করে দাঁড়াবে?
মেয়েটির এমন রুক্ষ ব্যবহারে দুজনই রাগী চোখে তাকায়। দাতঁ খিচিয়ে কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে যায়। ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের ফিজিক্স স্যারের মেয়ে এটা, সঙ্গে তার চিরচেনা গ্রুপ। মেয়েটা স্বভাবতই ফাজি, আর বেয়াদব। তার যা আছে, তার চেয়েও দশগুণ দাপট দেখানোই যেন তার অভ্যাস। আগেও মেহরীনদের সঙ্গে ঝামেলা বেঁধেছিল, তবে তখন তালহার ভয়ে তারা আর বাড়ায়নি।
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৩৩
এইবারও তাই হলো রাগ চেপে মেহরীন আর তাহিয়া চুপচাপ পাশ কাটিয়ে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই। উপর থেকে হঠাৎ তনিমার কণ্ঠ ভেসে এলো,
—আরে সর সর কালা হাতি এসেছে, জায়গা দে….
