প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ২৯
নওরিন কবির তিশা
জাফলং ভ্রমণের চতুর্থ দিন আজ। দিনগুলো যেন মুক্ত ডানায় ভর করা পাখির ন্যায় উড়ে চলেছে। দেখতে দেখতে তিনটি দিন পার। সকলে ঠিক করেছে, আজ আরেকটা পাহাড়ি উপত্যকা আর হ্রদের সৌন্দর্য উপভোগে ভ্রমণ করবে তারা। সকাল থেকে চলছে সেই তোড়জোড়। সকলের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন,তিহুও তৈরি হচ্ছে।
মোটামুটি সকল সাজ-সজ্জা সম্পন্ন তার। পরনে কাল নীলের আনা হালকা আকাশী নীল রঙা পাকিস্তানি ড্রেস। সঙ্গে ম্যাচিং হিজাব আর দু হাতে গুনে গুনে দশটা একরঙা কাঁচের চুড়ি। এগুলোও নীল কাল এনেছে। তবে পরিমাণে অনেক বেশি, প্রায় দশ ডজন। তিহু এক ঝলক ড্রেসিং টেবিলের উপর থাকা সেগুলোর পানে চাইল। অতঃপর দীঘল আয়নায় একঝলক নিজের দিকে।
হরিণটানা আঁখি জোড়া আজ কাজল কালো। ঠোঁট আবৃত হালকা গোলাপি রঞ্জকে। আয়নায় প্রতিফলিত নিজের অবয়বের পানে চেয়ে, হঠাৎ তার মনে পড়ল কালকের অভিমান গুলোর কথা। আর নীলের কাণ্ডগুলো মস্তিষ্কের দোলা দিতেই অকস্মাৎ মুচকি হাসলো তিহু। কি জানি ভেবে হঠাৎ গেয়ে উঠল,,
🎶 ধরা দিল কেউ অল্প চাওয়াতে….
উড়ে গেল কিছু গল্প হাওয়াতে….
অকারনে আমি অল্প আঘাতে….
হচ্ছি অভিমানী…….
কাঁচা মিঠে আলো নাম কি জানি তার…..
বড় অগোছালো কাটছে দিন আমার….
বেঁচে ওঠে মনে পিয়ানো গিটার…..
হালকা ঘুম পাড়ানি…..
সে তো জল্পনাতে কল্পনাতে….
থাকছে জড়িয়ে…..
আর একলা রাতের আশকারাতেও…..
থাকছে জড়িয়ে…..🎶
গান গাওয়ার এক পর্যায়ে পাশ থেকে নীলের একটা ছবি হাতে তুলল তিহু; তাতে আদুরে হাত বুলিয়ে ফের গেয়ে উঠলো,,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
🎶 সাজনা কাটেনা….
আব আখিয়া তোরে বিন….
সাজনা কাটেনা….
আব আখিয়া তোরে বিন….🎶
গানের কলি গুলো শেষ হতেই, নীলের ছবি খানা বুকে জড়িয়ে ধরে,আনমনে মুচকি হাসতে হাসতে দরজার দিকে তাকাতেই ভূত দেখার ন্যায় চমকে উঠলো সে। নীল দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তার এমন কান্ড দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে। বিস্ময়ে চোখ গুলো বড় বড় হয়ে গেল তিহুর। বিস্মিত আঁখি জোড়ায় নীলের দিকে তাকেই একঝলক নিজের দিকে তাকালো সে।
শুকনো ঢোক গিলে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই নীল, রুমে ঢুকে তার পাশ থেকে ফোনটা তুলে ফের বেরিয়ে যেতে যেতে, ফের থামল, লাজুক তিহুর দিকে চেয়ে বলল,,
—’বাই দ্যা ওয়ে, সো সুইট ভয়েজ।
বলেই বেরিয়ে গেল নীল, সে বেরোতেই তিহু দ্রুত বুকে থাকা, নীলের ছবি খানা নামিয়ে রাখতে রাখতে, নিজের মাথায় নিজে গাট্টা মারল, নিজের বোকামিতে নিজেই বলল,,
—’নেতা সাহেব ঠিকই বলে,তুই আসলেও ইডিয়েট তিহু!নইলে দরজা খোলা রেখে কেউ এমন ছাগলামি করে;গাধা কোথাকার!
সে যখন নিজেকে নিজে ভৎর্সনা দিতে ব্যস্ত তখনই হঠাৎ ভেসে এলো চিরপরিচিত গভীর পৌরুষ সেই কণ্ঠ,,
—’জলদি আসুন ম্যাডাম।
তিহু থতমত খাওয়া কন্ঠে দ্রুত বলল,,—’আ-আসছি।
আর বিলম্ব করলো না সে। চটজলদি ছবিটা যথাস্থানে রেখে দ্রুত এগিয়ে গেলো বাইরের উদ্দেশ্যে।
জীবনটা বড্ড অদ্ভুত।কখনো তাতে বয় আনন্দের বন্যা কখনো বা তার উজ্জ্বল আকাশে জমে কালো মেঘের ঘনঘটা।কখনো কিছু জিনিস মানুষ অপ্রত্যাশিতভাবে পায়,কখনোবা শত সহস্র সাধনার সত্ত্বেও অতি প্রিয় জিনিস হারায়। প্রাপ্তির আনন্দ সকলের সঙ্গে উপভোগ্য হলেও হারানোর বেদনা একান্ত ব্যক্তিগত। আর এই কথাগুলোই যেন চরম বাস্তব মন্নির জন্য।
জাফলং এর প্রতিটা মুহূর্ত সকলের কাছে আনন্দ উচ্ছ্বাসে ভরপুর হলেও, বিষাক্ত কাটা ন্যায় তার কাছে। জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত গুলো পার করছে সে। নিজের প্রিয় মানুষটির সঙ্গে অন্য কাউকে দেখার মত মৃত্যুর ন্যায় যন্ত্রণা, বারংবার কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে তাকে। ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও একমাত্র মায়ের কারণে এই ভ্রমণে আসা। নতুবা ইচ্ছাকৃত মৃত্যু যন্ত্রণা কে বা সহ্য করতে চায়?
আজও আরেক নব বিষপান করতে হবে তাকে। আজকেও একত্রে ঘুরতে যাবে সকলে। আর ঘুরতে যাওয়া মানেই তো, কপতো-কপতিদের খুনসুটি। মুন্নি ড্রেসিং টেবিলের সুবিশাল আয়নায় এক ঝলক নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালো। সদা হাস্যোজ্জ্বল চক্ষু আজ রক্ত লাল। দীর্ঘ রজনীর কন্দনরত অবস্থার প্রভাব সেটা।
নিজের শুষ্ক মুখাবয়বের পানে চেয়ে, হঠাৎ মুন্নি বলে উঠলো,,
—’আমি কি এতটাই খারাপ? এতটাই কুৎসিত নীল ভাই? আমাকে কি একটু আপন করা যেত না? তোমার নামে কবুল পড়ার অধিকার কি আমার ছিল না? তোমার পাশে আজীবন চিরসঙ্গিনী হিসেবে থাকার যোগ্যতা কি আমার নেই? ওটা কি আমার একান্ত ব্যক্তিগত অধিকার ছিল না নীল ভাই? তবুও কেন এমন হলো? কেন? কেন? কেন?
শেষ কথাগুলোতে চিৎকার করে উঠল মুন্নি। নিজের সমস্ত বেদনারা অশ্রু হয়ে ঝড়ে পড়ল চোখের কার্নিশ বেয়ে। অপর হাতের পিষ্ট দ্বারা অশ্রুকণাগুলোকে মুছে নিল এক লহমায়। ফের আয়নার পানে চেয়ে অভিযোগের সুরে বললো,,
—’কি হতো আমাকে আপন করলে? একটুখানি ভালবাসলে? সত্যিই কি ভালোবাসার অযোগ্য ছিলাম?
তার হৃদয়ের আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা, নিকষ কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছে হৃদগহ্বর। চারিদিকে শুধু বিষাদের সুরের আনাগোনা।
সবে রুম থেকে রেডি হয়ে বেরিয়েছে মাহা। পরনে গাঢ় সবুজ রঙা তসর সিল্কের থ্রি পিস। শ্যামাঙ্গিনী দেহে সবুজ রং যেন আলোক দ্যুতি ছড়াচ্ছে। কোমর ছাড়ানো চুলগুলো, খেজুর বিনুনীর দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ। ঠোঁট হালকা রঞ্জকে আবদ্ধ। স্থির পায়ে সে এগিয়ে চলেছে গন্তব্যের দিকে,শীতল করিডোরে তার পদক্ষেপগুলো শব্দের ঝংকার তুলছে।
হুট করে পথচারণার থামলো তার। সম্মুখে উপস্থিত মানবটিকে দেখে চোখ দুটো কুঞ্চিত হলো খানিক। তাকে পাশ কাটিয়ে যেতে নিতেই, মানবটি তার পানে চেয়ে বলল,,
—’লুকিং অ্যাবসোলুটলী গর্জিয়াস অ্যাজ অলওয়েজ,লাভলাইন।
মাহা প্রত্যুত্তরে কিছু না বলেই, এগিয়ে যেতে চায় সম্মুখ পানে। তবে পিছন থেকে রাওফিন ফের বলে ওঠে,,
—’সব ভুল ফিরে আরেকবার কি ফিরে আসা যায় না লাভলাইন?
বড্ড আকুল শোনায় তার কণ্ঠস্বর। না চাইতেও থামে মাহা, এক ঝলক তাকায় রাওফিনের বিষন্ন মুখোশ্রীর পানে।
—’আরেকটি বার কি সুযোগ দেওয়া যায় না, এই অধমকে? আরেকটিবার কি ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসা যায় না তাকে?
মাহা চূড়ান্ত পর্যায়ে বিস্মিত হয় আজ। এতদিন রাওফিনের বহু পাগলামি দেখেছে সে তবে আজকেরটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বড্ড অদ্ভুত লাগছে তার কণ্ঠস্বর আজ। হৃদয় ভেঙে খান খান হচ্ছে মাহার তবুও নিজেকে দৃঢ় রেখে সে বলল,,
—’আজ হঠাৎ রূপ পরিবর্তন? তা আবার কোন খেলা খেলতে চাচ্ছ আমার জীবন নিয়ে?
মলিন হাসলো রাওফিন,,—’আমার উন্মাদনা তোমার নাটক মনে হতো?
—’হত না হয়! হয়তো কখনো তোমার এই উন্মাদনা আমার কিশোরী মনে সর্বোচ্চ প্রভাব ফেলেছিল। তবে আজ তা শুধুই গতানুগতিক বাংলা সিরিয়ালের থেকে কোনো অংশে কম নয়।
—’পুরুষের ভালোবাসার গভীরতা তুমি কি বুঝবে।
—’তাই নাকি?তা শুনি তোমার ভালোবাসার গভীরতা?
—’অতস্পর্শী সমুদ্রের গভীরতা কখনো মেপে দেখেছো?
—’ওহ,শাট আপ রাওফিন। ড্রামার বলদ নায়কের মত অভিনয় কম করো।
—’এটা চূড়ান্ত বাস্তবতা লাভলাইন। আমি সত্যিই তোমাকে ভালবাসি আর এই ভালোবাসার গভীরত্ব হয়তো তুমি কখনোই বুঝতে পারবে না।
—’তোমাকে ভালোবেসে যে পাপ আমি করেছিলাম তার সাজা এখনো ভোগ করে চলেছি। তারপরও বলছো আরেকবার তোমাকে সুযোগ দিতে?
—’আরেকটাবার সুযোগ দাও না, কথা দিচ্ছি এবার নিজের সর্বোচ্চ ভালবাসায় তোমাকে মুড়িয়ে রাখবো।
—’আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু টক এনি মোর।
মাহা এগিয়ে চললো সামনের দিকে আর দাঁড়ানো সম্ভব হচ্ছে না তার পক্ষে। আর কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই হয়তো হৃদয়ের সমস্ত কথাগুলো, কান্না গুলো বাঁধ ভাঙবে।
—’পালিয়ে যাচ্ছো? তা শুনবে না পুরুষের ভালোবাসার গভীরত্বের গল্প?
মাহা থামল, পিছন ঘুরে বললো,,—’এই তাসফিয়া মাহা কখনো পালিয়ে যায় না। বলো শুনি তোমাদের ভালবাসার গভীরত্ব।
রাওফিন মলিন হাসলো,,—’তাজমহল কিন্তু শাহজাহান বানিয়েছে মমতাজ নয়। যুগে যুগে ভালোবাসার প্রমাণ পুরুষই দিয়েছে। তবুও তুমি বলো, পুরুষ ভালবাসতে জানে না?
তার কথায় তাচ্ছিল্যের হাসলো মাহা, শব্দ করেই হেসে উঠলো খানিক। পরক্ষণেই নিজেকে সামলিয়ে বলল,,—’ওয়েট ওয়েট, এত সুন্দর একটা কথায় আমার ইমোশনাল হওয়া উচিত ছিল তাই না? স্যরি বাট আমি একদমই ইমোশনাল হতে পারছি না।
পরক্ষণে ফের হেসে সে বলল,,—’তুমি কি বললে? তাজমহল রাইট? তুমি কি জানো? তাজমহল সবাই দেখলেও মমতাজ কিন্তু দেখতে পারেনি।কারণটা জানো? পুরুষেরা থাকতে কদর দিতে পারে না, তবে হারিয়ে গেলে বারংবার ফিরে চায়। ওই দীপান্বিতা গানের কলিটার মত,,
অশান্ত মন বোঝাই কাকে হারিয়ে চাইছি তোমাকে,
হাতছানি দিয়ে যে ডাকে স্মৃতির পাতায়।
বলেই প্রস্থান করলো মাহা। রাওফিন তখনও স্তব্ধ-স্থবির হয়ে চেয়ে আছে তার প্রস্থান পথের দিকে। মাহা তো ভুল কিছু বলেনি, আসলেও। সে থাকতে কদর করতে পারেনি। এখন একটু তো কষ্ট একটু সহ্য করতেই হবে।
তপ্ত রৌদ্র কিরণে আবৃত ধরনী। আকাশটা উজ্জ্বল সোনালী রৌদ্ররেখায়। উজ্জ্বল সে আকাশে পেজা তুলোর ন্যায় ভেসে চলেছে শুভ্র মেঘের দলবল। চারিদিকে নির্জন প্রকৃতি নিবিষ্ট স্থান আর মাঝে থাকা সংকীর্ণ রাস্তাটা পেরিয়ে এগিয়ে চলেছেন নীলের ছাদ খোলা জিপ গাড়িটা। বরাবরের ন্যায় আজও তারা ছাদ খোলা জিপ গাড়িতেই ভ্রমণে বেরিয়েছে।
তবে আজ অন্যান্য দিনের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন এ যাত্রা। জিপটা সম্পূর্ণ ফাঁকা আজ। শুধু ড্রাইভিং সিটে নীল আর পাশে তার সহধর্মিনী তার স্টুপিড গার্ল। বাকিরা আজ অন্য গাড়িতে গিয়েছে। গাড়ি চলছে গন্তব্যের দিকে। দক্ষ হতে ড্রাইভিং এ ব্যস্ত নীল। দৃষ্টি স্থির সম্মুখ পানে। রাস্তাটা সংকীর্ণ হওয়ায়, যতটা সম্ভব সতর্কতার সাথে গাড়ি চালাচ্ছে সে।
নীল একমনে ড্রাইভিংয়ে মনোনিবেশ করলেও তিহুর দৃষ্টি নীলেতে স্থির। নীল সানগ্লাসের অন্তরালে থাকা চোখ দুটি দ্বারা মিররে তিহুর অবয়বের পানে তাকাচ্ছে আর তার চাতক পাখির ন্যায় দৃষ্টিতে,ঠোঁট চেপে মিটি মিটি হাসছে। তবে বলছে না কিছু। হঠাৎ কি একটা ভেবে তিহু বলল,,
—’এই যে শুনছেন?
কথাগুলো নীলের কর্ণগত হলেও, তৎক্ষণাৎ কিছু না বলে ড্রাইভিং এ মনোনিবেশ করল সে,তিহু ফের ডাকলো,,
—’এই যে মিস্টার? শুনছেন?
নীল তখনও নির্বিকার, তিহু এবার বেশি জোরেই ডাকলো,,—’এই যে মিস্টার গিটারিস্ট? ক্যান ইউ হেয়ার মি?
তিহুর এমন ডাকে, তৎক্ষণাৎ ব্রেক কষলো নীল। তিহু কিছুটা ভেবাচ্যাকা খেয়ে বলল,,
—’কি হলো?
—’এভাবে ডাকলে কেন?
—’আপনি উত্তর দিচ্ছিলেন না কেন?
—’তাই বলে এভাবে ডাকবে?
—’তো কিভাবে ডাকবো?
—’যেভাবেই ডাকো এভাবে আর কক্ষনো নয়। আর গাড়ি চালানোর সময় তো নয়ই।
—’কেন?
নীল ফের জিপ স্টার্ট দিতে দিতে বলল,—’যদি অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যায় তখন তার দায়ভার কে নেবে ম্যাডাম?
তিহু প্রথমে না বসলেও পরক্ষণ এই কথার মর্মার্থ বুঝে আনমনে মুচকি হাসলো।
গাড়ি চলছে সবুজে মন্ডিত পথটার ওপর। চারিদিকে নানা নাম না জানা ফুল আর অপূর্ব প্রকৃতি নিবিষ্ট স্থান। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছাবে তারা। এতক্ষণে হয়তো বাকিরা পৌঁছেও গিয়েছে, শুধু বাকি আছে তারা। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মাঝে স্থির চক্ষে চেয়ে হঠাৎ কি ভেবে তিহু নীলের উদ্দেশ্যে বলল,,
—’একটা গান করুন তো নেতা সাহেব। বোর হচ্ছি খুব।
নীল এক ঝলক তিহুর পানে চাইল, জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই তিহু, চোখের পালক ঝাপটে বোঝালো গান গাইতে। নীলের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তখনও সম্মুখে স্থির। তিহু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকানো তার পানে। অতিবাহিত হলো মুহূর্ত কয়েক, হঠাৎ নীল গেয়ে উঠলো,,
🎶 এই মন পড়েছে আমার বড় দোটানায়….
প্রেম বয়ে আনলো হঠাৎ দমকা হাওয়ায়….
এই আশিকি আশিকি করলো কি জাদু হায়….🎶
তিহু, মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালো নীলের পানে। একটা মানুষ এতটা পারফেক্ট কিভাবে হতে পারে? সে তো জানত রাজনীতি করলে মানুষ কাঠখোট্টা হয় অবশ্য নীল যে খুব বেশি রশিদ তেমনও নয়। কিন্তু একটা লোক রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসা সামলাচ্ছে। তবুও এত সুন্দর কন্ঠস্বর তার। যতটা দক্ষ সে বাইক রাইডিংয়ে, ততটাই দক্ষ গিটার বাজাতে। আবার খুব ভালো ফটোশ্যুটও করতে পারে সে। না জানি আরো কি কি গুন আছে তার?
জাফলং বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর পর্যটক কেন্দ্র গুলোর মধ্যে অন্যতম,আর তার সৌন্দর্য দ্বিগুণ করে একেকটা পাহাড় আর হ্রদের মনোহারিতা। প্রতি জোড়া কপত-কপতির অবস্থান, স্বচ্ছ লেকের উপর স্থপিত পাহাড়ের ডালটির ওপর। অদ্ভুত মনোহরতা বিরজমান চারিদিকে । কাল রাতের সামান্য বৃষ্টির দরুন মাটিতে বিদ্যমান ভেজা সোঁদা গন্ধ।
সকলে পৌঁছেছে প্রায় ঘন্টাখানেক। বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত সবাই। তিহু মাহা জোড়ায় বেশ কিছু ছবি তুলেছে। এছাড়াও সকলে মিলে গাদা খানেক গ্রুপ ফটোও তুলেছে। বর্তমানে সবাই যে যার জীবনসঙ্গীর সাথে গল্পে মত্ত। সৌভিক-কুহেলিকা কিছুটা দূরত্বে দাঁড়ানো, কুহেলিকার ছবি নিজেকে ক্যামেরায় বদ্ধ করছে সৌভিক।
তিহু, রাফা,নীরা আর ফারিসা পাহাড়ি ফুল সংগ্রহে ব্যস্ত। সকালে রাওফিনের বলা কথাগুলো শোনার পর থেকেই কিছুটা বিষন্ন মাহা। তবে বাহিরে তার লেশ মাত্র প্রকাশ করছে না করে দিব্যি রিশাদের সাথে মারামারিতে ব্যস্ত সে। নীল লুকিয়ে লুকিয়ে ক্যামেরাবন্দি করছে তার প্রিয়তমার শত সহস্র ছবি।
হঠাৎ কি একটা ভেবে নীল পাশে তাকাতেই তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো হাজার রঙ্গা পাহাড়ী ফুলে। ফুল গুলোর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে পর মুহূর্তেই তিহুর দিকে চেয়ে কিছু একটা ভেবে মুচকি হাসলো নীল। অতঃপর ক্যামেরাটা আইয়াজের কাছে দিয়েই এগিয়ে গেল ফুল গুলোর দিকে।
—’আরে আপনার হাতে ক্যামেরা?একটা ছবি তুলে দিতে পারবেন? প্লিজ।
নাহা’র কণ্ঠে পিছন ফিরে চাইলো আইয়াজ। নাহা’র হাস্যজ্জল মুখ দেখে সে বলল,,
—’স্যরি কিন্তু এটা তো নীল স্যারের। উনি ম্যাডামের ছবি তুলছিলেন।
নাহা চোখ সরু করে বলল,,—’ম্যাডাম মানে? তিহু বউমনি?
—’জ্বী।
—’ওহ।
সামান্য বিষন্ন মুখশ্রীতে, সেখান থেকে প্রস্থান করেছিল নাহা। হঠাৎ পিছন থেকে আইয়াজ ডেকে বলল,,
—’ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, তোমার ফোনটা আমায় দিতে পারো। আমি ছবি তুলে দিব।
‘সত্যি?’——পুলকিত হয়ে পিছনে ঘুরলো নাহা।
আইয়াজ মাথা নাড়িয়ে সম্মতির স্বরে বলল,—’হুম।
নাহা’র খুশি আর কে আটকায়? জাফলংয়ে আসার পর থেকেই সে হাজারটা অজুহাত খুঁজেছে আইয়াজের কাছাকাছি আসার সাথে গল্প করার। তবে কিছুতেই মিল ছিলো না ফুরসৎ,নীলের সঙ্গে প্রত্যেকটা কাজে আঠার মত লেগে থাকা লাগে আইয়াজের। এজন্যই হয়নি কোনো বাক্যালাপ। তবে আজ এই সুবর্ণ সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করল না নাহা। দ্রুত হাতে থাকা ফোনটা আইয়াজের দিকে এগিয়ে দিয়ে সে বলল,,
—’এই যে।
আইয়াজ মুচকি হেসে গ্রহণ করলো সেটা।
—’ওখানে যেও না বউমনি, জায়গাটা পিচ্ছিল আর রিস্কিও। দেখছোনা রেলিংটা কেমন ভেঙে গিয়েছে।
ফারিসার কথায় তিহুর পানে তাকালো সামান্য দূরত্বে উপস্থিত মুন্নিও।তিহু মুচকি হেসে ফারিসার উদ্দেশ্যে বলল,,
—’আরে কিছু হবে না জাস্ট ওয়েট। শুধু ফুলটা নিব।
—’কিন্তু বউমনি পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
—’আরে না না কিচ্ছু হবে না।
সকলে চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকালেও, নজর তীক্ষ্ণ মুন্নির। ভ্রু কুঞ্জনপুর্বক কিছু একটা ভাবার চেষ্টায় নিমগ্ন হলো সে। পরক্ষনেই তিহুর পানে চেয়ে কুটিল হাসলো সে।রাফা, নীরা,ফারিসার দৃষ্টির অগোচরে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল তিহুর কাছাকাছি।
কাল রাতের বৃষ্টিপাতের দরুন স্থানটা পিচ্ছিল হয়ে আছে বেশ, তার ওপর নিম্নে হ্রদের প্রবল স্রোতধারার উপর স্থগিত পাহাড়ের ডালের রেলিংটা ভঙ্গুর প্রায়। সামান্য আঘাতেই যেন ভেঙে পড়বে সেটা। পাশে জ্বলজ্বল করছে নোটিশ বোর্ড,“ভাঙা পার্শ্ব হতে সাবধান।” সেটিকে এক প্রকার পাত্তা না দিয়েই তিহু স্বচ্ছ পানির ধারা দেখতে আর ফুল সংগ্রহে এগিয়ে গেল সেদিকে।
হঠাৎ পিছন থেকে কারো তীব্র ধাক্কা অনুভূত হতেই পিচ্ছিলতার দরুন ভয়াবহ স্থানটার দিকে এগিয়ে গেল সে। নিজের ভারসাম্য রক্ষায় আঁকড়ে ধরল ভঙ্গুর রেলিং। তবে পরমুহূর্তেই ঘটলো সেই অঘটন। তিহুর ভার না সইতে পেরে, রেলিংটা ভেঙে গেল। আর সামান্য চিৎকারের পরমুহূর্তেই তিহুর অবস্থান হলো প্রবল জলকল্লোলের মধ্যে, তীব্র স্রোতযুক্ত সে হ্রদে।
তার চিৎকারে সকলে ঘুরে তাকালো তার দিকে,ফারিসা রাফা, নীরা একযোগে চিৎকার করে বলল,,
—’বউমনি!
তাদের চিৎকারে বাকি সবাই ঘুরে চাইল। মাহা রিশাদের চুল ছেড়ে সম্মুখ পানে চাইতেই তিহুর অবস্থান, প্রবল স্রোতের মাঝে দেখে হতবাক হলো। পরক্ষণেই চিৎকার করে বলল কাঁপাকাঁপা কন্ঠে বলল,,—’তিহু? আল্লাহ আমার তিহু সাঁতার জানে না।
প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ২৮
গগন কাঁপানো সেই চিৎকার পরবর্তী মুহূর্তেই সর্বোচ্চ বেগে দৌড়ে গিয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল হ্রদের প্রবল স্রোতে। তার এমন কাণ্ডে রীতিমত তাজ্জব বনে গেছে সবাই। তবে সকলকে বিস্ময়ের চূড়ান্তে পৌঁছে পরপর দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ঝাপিয়ে পড়ল রিশাদ নিজেও। মাহা,রিশাদ সাঁতার জানলেও তীব্র স্রোতের মাঝে ডুবি ডুবি অবস্থা তাদের। আর তিহু? সে তো সেই কখন হার মেনেছে তীব্র স্রোতের কাছে।
ডুবি ডুবি অবস্থার মাঝেও মাহা রিশাদ হাতড়ে খুঁজে ফিরছে তিহুকে। এদিকে সবাই চিন্তায় চিৎকার শুরু করেছে। লোকজন জড়ো হতেই কোত্থেকে ছুটে আসলো নীল। পিছু পিছু রাওফিন। দুজনেই একত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ল জলধারায়।
