Home ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩১+৩২

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩১+৩২

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩১+৩২
তানিশা ভট্টাচার্য্য

তানভী ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে। আর্ভিক টেবিলে রাখা কফিটা নিয়ে এক চুমুক দিল। তারপর তানভীর দিকে তাকিয়ে বলল
-“কিছু বলবি?”
তানভী সহসা বলল
-“আপনি জামা পড়ুন তাড়াতাড়ি।”
আর্ভিক কপাল কুঁচকে গম্ভীর কন্ঠে বলল
-“আর যদি না পড়ি, তাহলে জামা না পড়ার অপরাধে আমায় জেলে দিবি!?”
তানভী না সূচক মাথা নাড়ল। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বলল

-“আমি গেলাম।”
আর্ভিকের হাতে একটা ল্যাভেন্ডার কালারের শার্ট ছিল, সেটা পড়তে পড়তে তানভী কে বলল
-“তানভী তোর প্রিয় রং কী ?”
তানভী যেতে যেতে দাঁড়িয়ে গেল তারপর সাহসা জবাব দিল
-“কালো”
-“ঠিক আছে যা”
তানভী বেরিয়ে যেতেই আর্ভিক তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিল।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

স্কুলে ফার্স্ট পিরিয়ডের পর তানভী মেঘাদ্রি আর রিকি তিনজনে মিলে গল্প করছিল। রিকি তানভীর সাথে কথা বললেও মেঘাদ্রির সাথে একটা কথা বলেনি। মেঘাদ্রির মনের ভেতর এক অজানা খারাপ লাগা কাজ করছে। তাদের আড্ডার মাঝে আর্ভিক ক্লাসে এলো। সবাই যে যার জায়গা মতো বসে পড়ল। তানভী নিজের জায়গায় বসতে বসতে আর্ভিকের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠে। আর্ভিক একটা কালো রঙের শার্ট পড়ে এসেছে। তানভী মনে মনে ভাবে
“আর্ভিক ভাই তো ল্যাভেন্ডার রঙের শার্ট পড়ছিলেন, তাহলে এটা….”
তানভীর ভাবনার মাঝে আর্ভিক ক্লাসে সবার উদ্দেশ্যে বলল
-“তোমাদের সবার হোমওয়ার্ক গুলো আমার টেবিলে জমা করো”

আর্ভিকের কথা মত সকলের যে যার হোমওয়ার্ক টেবিলের জমা করে। তানভী হোমওয়ার্কের খাতাটা বের করার জন্য তার ব্যাগটা খুললো, খোলা মাত্রই সে দেখল যে সে আজ খাতাটাই আনে নি। তার ভয়ে শরীরে কাঁপাকাঁপি শুরু হয়েছে। মেঘাদ্রি তানভীকে খোঁচা দিয়ে বলল
-“কিরে কি ভাবছিস জমা দিবি না? আমার কাছে দে আমি দিয়ে আসছি”
তানভীর একটা শুকনো ঢক গিলে, ভীত কন্ঠে বলল
-“আমি হোমওয়ার্কের খাতাটা বাড়িতে ফেলে এসেছি”

তানভীর কথায় মেঘাদ্রি চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকায়। আর্ভিকের রাগ সম্পর্কে মেঘাদ্রি অবগত তাই সেও ভয় পাচ্ছে যে এখন কি হবে। এর মধ্যেই আর্ভিক তাদের দুজনের উদ্দেশ্যে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল
-“তোমাদের দুজনের কি হলো? খাতাটা দিয়ে যাও!”
আর্ভিকের কণ্ঠস্বর শুনে তানভী কিছুটা কেঁপে উঠল। সে মেঘাদ্রিকে চোখের ইশারায় তার খাতা জমা দিতে বলল। মেঘাদ্রি গুটিগুটি পায়ে গিয়ে নিজের খাতাটা জমা দিল। কিছুক্ষণ পর আর্ভিক রাগান্বিত কন্ঠে বলে উঠলো
-“মিস তানভী! আপনার হোমওয়ার্ক কোথায়?”
তানভীর চোখের কোণে ভয়ের মেঘ জমেছে। আর্ভিকের গম্ভীর প্রশ্নে তার ঠোঁট দুটো কেঁপে ওঠে, যেন অবাধ্য কোনো শব্দ পথ হারিয়েছে। নতজানু দৃষ্টিতে সে মেঝের ধুলোয় উত্তর খোঁজে। ক্লাসরুমের নিস্তব্ধতায় তার থমকে যাওয়া নিশ্বাসটুকু আজ এক করুণ কবিতার মতো শোনাচ্ছে। সে কাঁপাকাঁপা কন্ঠে জবাব দিল

-“স্যার আমি খাতাটা আনতে ভুলে গেছি”
তানভীর এমন কথায় আর্ভিক রীতিমতো হুংকার দিয়ে বলে ওঠে
-“Get out from my class.”
তানভী পাথরপ্রতিমা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর্ভিকের কঠোর আদেশে দরজার পথ খোলা থাকলেও, তার পা দুটো মেঝের গভীরে শিকড় গেড়েছে। অপমানের তপ্ত হাওয়ায় অবনত মুখটি এক বিবর্ণ পদ্ম; গুমরে মরা কান্নাটুকু গলায় আটকে আছে। একবিন্দু নড়ার শক্তিটুকুও যেন আজ তার অভিমানী মৌনতায় বিলীন। তাকে এভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আর্ভিক আবার রাগান্বিত কন্ঠে বলে ওঠে
-“কি বললাম, শুনতে পাওনি? বেরিয়ে যাও আমার ক্লাস থেকে Out!!”
আর্ভিকের তিরস্কারের তপ্ত নিঃশ্বাস পিঠে নিয়ে সে ম্লান মুখে ক্লাসের চৌকাঠ পেরোল। অপমানে নুইয়ে পড়া কাঁধ আর পাথুরে পা দুটিতে ছিল একরাশ বিষণ্ণতা। বাইরের করিডোরে এসে যখন সে একা দাঁড়াল, তখন চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন তার বুকের হাহাকারকে আরও গভীর করে তুলল। অপমানে নীল হওয়া মেয়েটি আজ বড়ই একা।
ঘণ্টা বাজতেই ক্লাসের গুমোট আবহ কাটে। আর্ভিক যখন গম্ভীর পায়ে বেরিয়ে আসছিলেন, তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এক পলকের জন্য স্থির হলো বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তানভীর ওপর। সেই ক্ষণিক চাহনিতে শাসন ছিল নাকি প্রচ্ছন্ন কোনো মায়া, তা অজানাই রয়ে গেল।

আর্ভিক চলে যেতেই তানভীর পা যখন ক্লাসের চৌকাঠ স্পর্শ করল, তার চারপাশের বাতাস যেন বিষণ্ণতার ভারে থমকে ছিল। চোখের কোণে জমে থাকা মেঘ আর ম্লান মুখচ্ছবি বলে দিচ্ছে তার মনের ভেতর কোনো এক নীরব ঝড় বয়ে গেছে। ক্লাসের কোলাহল তাকে স্পর্শ করছিল না, সে যেন একাকী এক দ্বীপে বন্দি।
ঠিক তখনই তার দুই বন্ধু রিকি ও মেঘাদ্রি ত্রাতা হয়ে এগিয়ে এল। তারা একরাশ রোদ্দুর হয়ে চুইয়ে পড়ল তার ধূসর জগতে। কেউ নিছক কৌতুক করে, কেউবা মমতায় হাত ছুঁয়ে তার ঠোঁটে হাসি ফোটানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায়। বন্ধুদের স্নেহের পরশে ধীরে ধীরে বরফ গলতে শুরু করে। একসময় বিষণ্ণতার দেয়াল ভেঙে উপচে পড়ল এক চিলতে হাসি,যেন শরতের মেঘ চিরে এক ফালি সোনালি রোদ।

রিসেসের সময়, তানভী আর রিকি কথা বলছে তখন সেখানে মেঘাদ্রি এল। তাকে দেখে তানভী হাসি মুখে বলল
-“মেঘাদ্রি, আয় আয় বস এখানে”
মেঘাদ্রি এসে বসল, তখনই রিকি বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল
-“তানভী আমি একটু আসছি”
কথাটা বলা মাত্রই রিকি সেখানে আর একমুহুর্ত দাঁড়াল না। মেঘাদ্রি স্তম্ভিত নয়নে তাকিয়ে রইল রিকির যাওয়ার পানে। তানভী মেঘাদ্রিকে প্রফুল্ল মেজাজে বলল
-“জানিস তোকে বলা হয়নি। আমাদের রিকি রিলেশনশিপে আছে।”

তানভীর কথাটা শোনা মাত্রই মেঘাদ্রি তার দিকে বোকার মত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। সে যেন বাক্য হারিয়ে ফেলেছে। হঠাৎ বুকের বাম পাশটায় তীব্র যন্ত্রণা অনুভব হচ্ছে তার। সে রিকি কে মনে মনে পছন্দ করা শুরু করেছিল। কিন্তু কেরিয়ার আর বয়সের কথা মাথায় রেখে তা এতদিন প্রকাশ করতে পারে নি। মেঘাদ্রি ভেবেছিল রিকি আর সে দুজনেই জীবনে প্রতিষ্ঠিত হলে সে গিয়ে রিকির কাছে নিজের অনুভূতি গুলোকে প্রকাশ করবে। কিন্তু কি থেকে যে কি হয়ে গেল সেটা ভেবেই মেঘাদ্রির দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সে অতি কষ্টে কান্না চেপে রেখে সেখান থেকে উঠে গেল।
সময় কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করে না। তাই সঠিক সময় মতো সব কিছু না করলে হয়তো তার পরিনতি এমনটি হয়। মেঘাদ্রি যদি সঠিক সময় মতো রিকি কে নিজের অনুভূতি সম্পর্কে জানিয়ে দিত, তাহলে হয়তো আজকের দৃশ্যটা অন্যরকম হতো।

রিসেসের পর তানভী করিডোরে একা দাঁড়িয়ে আছে। আর্ভিক
ইতিমধ্যে ক্লাসে আসে। সেকেন্ড পিরিয়ডের পর আজকের মতো আর্ভিকের ক্লাস শেষ, কিন্তু ইংলিশ টিচার না আসার কারণে আর্ভিক পূজার ছুটির জন্য একটা প্রোজেক্ট দিতে এসেছে। ৫ মিনিট হয়েছে আর্ভিক ক্লাসে এসেছে, তানভীর সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। হঠাৎ ক্লাস থেকে আর্ভিকের কন্ঠস্বর শুনে তানভী সেদিকে তাকাল। সে দেখল আর্ভিক ক্লাস করাচ্ছে। তানভীর যেন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়। সে কোনোকিছু না ভেবে ক্লাস রুমের দরজার কাছে গিয়ে বলল

-“Sir, may I come in?”
আর্ভিক অগ্নি দৃষ্টিতে তানভীর দিকে তাকিয়ে কন্ঠস্বর তিনগুন ভারী করে বলল
-“Yes”
তানভী আরচোখে আর্ভিকের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে নিজের ডেস্কে বসতে যাবে তখনই আর্ভিক ধমক দিয়ে বলে ওঠে
-“Miss Tanvi, get out from my class.”
তানভী বোকার মতো আর্ভিকের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বলল
-“স্যার আপনি তো আমাকে আসতে বললেন”
আর্ভিক রাগান্বিত কন্ঠে জবাব দিল
-“হ্যাঁ আসতে বলেছি কারণ তুমি বাইরে ছিলে, আর বেরিয়ে যেতে বলছি কারণ তুমি ৫ মিনিট লেট করে ক্লাসে ঢুকেছ। Now get out”
তানভী ছলছল নয়নে মাথা নিচু করে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেল। ক্লাস শেষে আর্ভিক বের হয়ে এসে তানভীকে বলল
-“আমার কেবিনে আয়!”

তানভী গুটি গুটি পায়ে আর্ভিকের পিছন পিছন যায়। কেবিনে এসে আর্ভিক তানভীকে একটা চেয়ারে বসতে ইশারা করল। তারপর কেবিনের দরজা ভেতর থেকে লাগিয়ে তানভীর সামনে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসল। তানভী মাথা নিচু করে নিরবে কেঁদে চলেছে। আজ দুবার তাকে পুরো ক্লাসের সামনে অপমানিত হতে হয়েছে।
আর্ভিক তানভীর দুই গালে হাত দিয়ে মাথাটা তুলল। তারপর চোখের জল মুছে দিয়ে অতি কোমল কন্ঠে বলল
-“অনেক খারাপ লাগছে না তোর! কি করব বল তোকে যদি আজকে আমি কিছু না বলতাম, তাহলে পরের বার এই ভুলটা অন্য কোনো স্টুডেন্ট করলে আমি তাকে শাস্তি দিলে সবাই আমার দিকে আঙুল তুলবে। তুই কি এটা চাস?”
তানভী করুন দৃষ্টিতে আর্ভিকের দিকে তাকাল। তারপর না সূচক মাথা নাড়ল। আর্ভিক মৃদু হেসে তানভীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল
-“That’s like a good girl”
তারপর পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে তাকে দিতেই সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়।

তানভীর থেকে রিকির রিলেশনের ব্যাপারটা শোনার পর থেকে মেঘাদ্রি যেন উন্মাদ হয়ে যায়। বাড়ি ফিরে কিছু খাইনি সে। নিজেকে রুমের মধ্যে বন্ধ করে রেখেছে। নীলাদ্রি, আর ওর মা অনেকবার তাকে ডেকেছে কিন্তু মেঘাদ্রি দরজা খোলে নি। সে বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ গুঁজে অঝোরে কেঁদে চলেছে।
একসময় কান্না বন্ধ করে ফোনটা নিয়ে তানভীর নম্বরে কল করল। তানভীকে সবে মাত্র সোহাগ পড়িয়ে গেছে, এমন সময় মেঘাদ্রির কল এল। তানভী কলটা রিসিভ করল। তানভী কে কিছু বলতে না দিয়ে ওপাশ থেকে মেঘাদ্রি করুন কন্ঠে জিজ্ঞেস করল
-“রিকি কী সত্যি রিলেশনে আছে?”
-“হ্যাঁ! কিন্তু কেন?”
মেঘাদ্রি কিছু না বলেই কলটা কেটে দিল। তানভী কোনো উত্তর না পেয়ে কান থেকে ফোনটা সরিয়ে দেখে মেঘাদ্রি কল কেটে দিয়েছে। এদিকে কল কাটার পর পাথরের মূর্তির ন্যায় ফ্লোরে বসে আছে মেঘাদ্রি আর তার দুই চোখ বেয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে।

কেটে গেছে দুটো দিন, আজ বাঙালির প্রাণের উৎসব দূর্গা পূজার মহাষষ্ঠী। শারদীয়া দুর্গোৎসবের পুণ্যলগ্নে মহাষষ্ঠী হলো অপেক্ষার অবসান আর আনন্দের বোধন। ভোরের শিশিরভেজা শিউলি ফুলের গন্ধে আকাশ-বাতাস ম ম করেছে। ঢাকের কাঠির মিষ্টি আওয়াজ জানান দিচ্ছে, মা এসেছেন মর্ত্যে।
ভোরের মায়াবী আলো জানলার পর্দা চিরে সপ্তদশীর চোখে পড়েছে, ঠিক তখনই বালিশের পাশে থাকা ফোনটার মৃদু কম্পন তাকে জানান দেয়—ষষ্ঠীর সকাল এসে গেছে। স্ক্রিনের আলোয় ফুটে ওঠেছে আর্ভিকের নম্বর থেকে আসা শুভেচ্ছাবার্তা। সে ম্যাসেজটা পড়ল
“শিউলি ফুলের গন্ধে মাখামাখি ভোরের আকাশ,
ঢাকের কাঠি দিচ্ছে জানান,মা এসেছেন আমাদের দোরগোড়ায়। শারদীয়া মহাষষ্ঠীর এই পুণ্য লগ্নে তোকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।”

তানভীও আর্ভিক কে শুভেচ্ছা জানাল। ঘুমের ঘোর লেগে থাকা চোখে আনন্দের ঝিলিক; নিজের অজান্তেই সে হেসে ফেলে। আজ আর পড়ার টেবিলের ব্যস্ততা নেই, আছে নতুন জামার ভাঁজ খোলার রোমাঞ্চ আর বন্ধুদের সাথে আড্ডার পরিকল্পনা।
তানভী তাড়াতাড়ি করে বিছানা ছেড়ে উঠে ওয়াশরুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে। সে একেবারে স্নান করে গোপালকে ভোগ লাগিয়ে তারপরে নিচে নামলো। নিচে এসে দেখে অভিক সাহেব বসে চা খাচ্ছেন আর রাখী রায়চৌধুরী রান্নাঘরে লুচি ভাজচ্ছেন। তানভী গিয়ে অভিক সাহেবের পাশে বসল। অভিক সাহেব তাকে দেখে বললেন
-“পড়াশোনা কেমন চলছে মামনি?”
-“ভালো আঙ্কেল”

তানভী হাসি মুখে জবাব দিল। ওনাদের কথার মাঝে রাখী রায়চৌধুরী তানভীকে ডেকে বললেন
-“গুল্লু, ঋষি আর সিনু ভাইয়াকে ডেকে আনতো। সেই কখন থেকে ডাকছি আসার নাম নেই।”
তানভী বড়মার কথা মতো তাদের কে ডাকতে গেল। সেকেন্ড ফ্লোরে বামদিকে পরপর তিনটে রুম পড়বে। প্রথমেরটা ঋষির মাঝখানেরটা তানভীর আর তার পাশেরটা আর্ভিকের। তাই তানভী প্রথম ঋষির রুমের দিকে গেল। ঋষির রুমের দরজা চাপানো, তানভী দুবার নক করলো। কিন্তু ভেতর থেকে কোন সারা শব্দ পেল না। তাই সে দরজাটা একটুখানি খুলল, সারা রুম জুড়ে অন্ধকার জানালা দেওয়া পর্দা টানা। ঋষির বিছানার নিচে দরজার দিকে পিঠ করে বসে আছে ফ্লোরে। আর সাউন্ড সিস্টেমে একটা গান বেজে চলেছে

“Aashiquii kaa gum hum piye ja rahe
Tera naam lekar hum jiye ja rahe
Channa ve tere liye raat bhar
Hum to piye ja rahe
Channa ve tere liye raat bhar
Hum to piye ja rahe
Tera naam tera naam tera naam
Tera naam tera naam tera naam
Liye ja rahe”

তানভী কিছুক্ষণ সেটা নীরব দর্শকের মত দেখে, পুনরায় দরজা লাগিয়ে দিল। দরজা লাগিয়ে যেই না পিছনে ঘুরতে যাবে অমনি আর্ভিকের সঙ্গে তার ধাক্কা লাগে। আর্ভিক কপাল কুঁচকে বিরক্তি মাখা কন্ঠে বলল
-“চোখে দেখতে পাস না?”
-“না! দেখতে পেলে কি আর আপনার মত লোকের সাথে ধাক্কা লাগে”
কথাটা তানভী বিড়বিড় করে বলল। আর্ভিক আগের ন্যায় অভিব্যক্তি রেখে জিজ্ঞেস করল
-“কিছু বললি?”
তানভী সহসা জবাব দিল
-“না”
আর্ভিক তানভীর দিকে সূক্ষ্ম নয়নে তাকিয়ে সেখান থেকে চলে যেতে নিলে তানভী উদ্বিগ্ন কন্ঠে তাকে বলে
-“আর্ভিক ভাই!”
আর্ভিক দাঁড়িয়ে পড়ল। তানভী আর্ভিকের সামনে গিয়ে তার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় আর্ভিকের রুমে। রুমে এসে আর্ভিক তানভীকে জিজ্ঞাসু কন্ঠে বলল

-“কী হয়েছে?”
-“আমার কিছু হয়নি!”
-“তাহলে এখানে এভাবে আনলি কেন আমায়?”
আর্ভিক একরাশ বিরক্তি নিয়ে চেয়ে আছে তানভীর দিকে। তানভী আর্ভিককে বিছানায় বসিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর বিস্মিত কন্ঠে বলল
-“আর্ভিক ভাই! ঋষি ভাইয়ার কী হয়েছে??”
তানভীর মুখ থেকে এমন প্রশ্ন শুনে আর্ভিক কপাল কুঁচকে তাকাল তার দিকে। তারপর গম্ভীর কন্ঠে বলল

-“কেন কি হবে?”
-“বলুন না প্লিজ কি হয়েছে ঋষি ভাইয়ার”
আর্ভিক কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে চেয়ে রইল তানভীর দিকে। তানভী আর্ভিকের হাত ধরে ঝাঁকিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল
-“বলুন না!”
আর্ভিক কোনো উপায় না পেয়ে তানভী কে হাতের ইশারায় তার পাশে বসতে বলল। তানভী বসতেই আর্ভিক শান্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্মৃতির এক বিষণ্ণ চাদর মেলে ধরে তানভী কে বলতে থাকে তার ভাইয়ের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। গল্পটি ছিল এক রাজপুত্রের, যার রাজকন্যাকে কেড়ে নিয়েছিল মরণব্যাধি ক্যান্সার। আর্ভিকের কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত করুণ সুর। সে বলছে,
-“জানিস, আজ থেকে তিন বছর আগে ওর আকাশটা হঠাৎ করেই ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল। যে মেয়েটির হাসিতে তার জীবনে বসন্ত নামত, সেই মেয়ের শরীরে বাসা বেঁধেছিল এক মরণ-কীট। ধীরে ধীরে ঝরে গেল সব পাপড়ি। যেদিন ও চলে গেল, সেদিন ছিল দূর্গা পূজার ষষ্ঠী, ওর চলে যাওয়াতে আমার ভাইটার মনের ভেতরেও যেন একটা প্রদীপ চিরতরে নিভে গেল।”
তানভী অপলক চোখে শুনছিল সেই বিচ্ছেদের কাব্য। আর্ভিক কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবারো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করে

-“সবাই যখন নতুন জামার গন্ধে বিভোর, আমার ভাইটা তখন স্মৃতির চিতা জ্বালায়। উৎসবের আলো ওর চোখে কেবল অন্ধকার নিয়ে আসে। যেদিন ঢাকের বাদ্যি আর শিউলি ফুলের গন্ধে আকাশ-বাতাস মাতোয়ারা হওয়ার কথা ছিল, ঠিক সেই সন্ধিপূজার লগ্নেই তার প্রিয়তমা বিদায় নিয়েছিল পৃথিবী থেকে। প্রতিমার বিসর্জনের আগেই ঘটে গিয়েছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিসর্জন। তাই আজও মণ্ডপে মণ্ডপে যখন আরতি হয়, ধুনুচি নাচের তালে মেতে ওঠে শহর, ঋষির কানে তখন কেবল বাজে এক করুণ বিদায় রাগিণী।”

তানভী পুরো অবাক হয়ে শুনছিল—কীভাবে উৎসবের আনন্দও কারও জীবনে এক অনন্ত বিলাপ হয়ে ফিরে আসে। ঢাকের প্রতিটা কাঠি যেন ঋষির বুকে আঘাত করে মনে করিয়ে দেয় সেই হারিয়ে যাওয়া মুখটি। সময়ের স্রোতে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও, প্রিয়তমার স্মৃতি আজও সেই ঋষির হৃদয়ে এক অমলিন দীর্ঘশ্বাস হয়ে রয়ে গেছে—ঠিক যেন শরতের মেঘে ঢাকা এক টুকরো বিষণ্ণ চাঁদ।
আর্ভিক মৃদুস্বরে বলল
-“তিনটে বছর কেটে গেল, কিন্তু ওর পুজো আজও সেই সাদা-কালো হাসপাতাল ঘরের গন্ধে আটকে আছে।”
তানভী কি বলবে ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না, সে ছলছল নয়নে তাকিয়ে আছে আর্ভিকের দিকে।

কলকাতার সপ্তমীর পড়ন্ত বিকেল। শহরের আকাশে আবির আর সোনারাঙা রোদ্দুরের লুকোচুরি। নিজের রুমের কারুকাজ করা শ্বেতপাথরের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে তানভী। পরনে তার ঘিয়ে রঙের তসর, তাতে চওড়া লাল পাড়; যেন শরতের কাশফুলের গায়ে গোধূলির ছোঁয়া লেগেছে।
খোলা চুলে পুজোর প্রথম হিমেল হাওয়ার খেলা। দূরে কোনো এক মণ্ডপ থেকে ভেসে আসছে ঢাকের কাঠি আর শঙ্খধ্বনি। তার চোখের কাজল যেন ওই বিশাল তিলোত্তমার সমস্ত ভিড় আর আভিজাত্যকে বন্দি করে রেখেছে। হাতের আলতা আর সোনালি চুড়ির মৃদু নিক্বণ মিশে যাচ্ছে রাস্তার কোলাহলে। মেয়েটি নির্নিমেষ চেয়ে আছে শহরের ভিড়ের দিকে, যেখানে আভিজাত্য আর আবেগ মিলেমিশে একাকার। তার এই মায়াবী মৌনতায় যেন সপ্তমীর বিকেলটি এক জীবন্ত কবিতায় পরিণত হয়েছে।

হঠাৎ দূরে জ্বলে ওঠা রাস্তার আলো দেখে তানভীর কিছু একটা মনে পড়ে গেল। এক চিলতে হাসি তার ওষ্ঠে খেলে যেতেই সে আলগোছে ফোনটা তুলে নিল। তারপর মেঘাদ্রির নম্বরে ডায়াল করল। প্রথমবার কলটা রিসিভ হলো না। তানভীর আবার কল করলো। দ্বিতীয়বারের মাথায় মেঘাদ্রি কলটা রিসিভ করল।
তানভী অত্যন্ত আনন্দিত স্বরে ‘হ্যালো’ বলতেই ওপার থেকে ভেসে আসা মেঘাদ্রির কণ্ঠস্বর তাকে স্তব্ধ করে দিল। সেই স্বরে খুশির লেশমাত্র নেই, বরং তা ছিল গভীর বিষাদ আর চাপা কষ্টে ভারী। সে ব্যাকুল হয়ে শুধালো

-“কী হয়েছে রে তোর?”
মেঘাদ্রি ওপার থেকে খুবই নির্লিপ্ত ও ধরা গলায় বলল
-“না রে, কিছু হয়নি। কেন ফোন করেছিস সেটা বল।”
তানভী ব্যাকুল হয়ে আবারও জিজ্ঞেস করল
-“আরে সত্যি করে বল না, কী হয়েছে তোর? গলাটা এমন শোনাচ্ছে কেন?”
কিন্তু ওপার থেকে মেঘাদ্রি অস্থিরতা আর বিরক্তির স্বরে তাগাদা দিয়ে বলল
-“আহা, বললাম তো কিছু হয়নি! তুই অকারণে কথা না বাড়িয়ে আসল কথাটা বল তো, কেন ফোন করেছিস?”
তানভী ম্লান মুখে ওপার থেকে আসা বিরক্তির উত্তর দিল। সে বিষণ্ণ স্বরে বলল
-“আসলে রিকি ফোন করেছিল, ঠাকুর দেখতে বেরোনোর জন্য খুব জোরাজুরি করছে। কিন্তু তুই তো জানিস, এই ভিড়ভাট্টা আমার একদম সহ্য হয় না। তাই ভাবলাম তোকে ফোন করে বলি, তুই ওর সাথে ঘুরে আয় না।”

-“তোকে ফোন করে বলেছে তুই যা আমি যাব না।”
মেঘাদ্রি অভিমানী কন্ঠে জবাব দিল। তানভী অনেক অনুরোধ এবং পীড়াপীড়ির পর অবশেষে ওপার মেঘাদ্রি দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাজি হলো। অত্যন্ত ভারাক্রান্ত গলায় সে বলল
-“ঠিক আছে, তুই যখন এত করে বলছিস, আমি যাব ওর সাথে।”
তানভী ফোনটা কাটতেই ঘরের পর্দা সরিয়ে আর্ভিক বেলকনিতে এসে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে উৎসবের চপলতা। সে আবদারের সুরে বলল

-“কাল তো সুযোগ হলো না, চল আজ সপ্তমীর রাতে তোকে ঠাকুর দেখিয়ে আনি।”
তানভী ম্লান হেসে সরাসরি মাথা নেড়ে বলল
-“উঁহু, এই অসহ্য ভিড় আমার একদম ভালো লাগে না।”
আর্ভিক অবিশ্বাসের সুরে হেসে উঠল। কিছুটা ঠাট্টা আর কিছুটা বিস্ময় মিশিয়ে সে বলল
-“তুই তো দেখি অদ্ভুত মেয়ে রে! পুজোর দিনে ঠাকুর দেখার এমন অফার পেয়েও কেউ ফিরিয়ে দেয়? তুই তো দেখছি একদম অন্য জগতের মানুষ, যার কাছে আভিজাত্যের নির্জনতা, ভিড়ের উন্মাদনার চেয়ে অনেক বেশি দামী।”
আর্ভিকের ঠাট্টা মেশানো কথায় তানভী এক মুহূর্তের জন্য ম্লান হাসল।

বিকেলের সোনাঝরা আলো তখন ফিকে হয়ে আসছে। ঘড়ির কাঁটায় সাড়ে পাঁচটা। পার্কের এক কোণে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে ম্লান মুখে দাঁড়িয়ে আছে মেঘাদ্রি। তার বিষণ্ণ চোখের ওপর দিয়ে শরতের হালকা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। এমন সময় হাঁপাতে হাঁপাতে রিকি এসে দাঁড়ালো, কণ্ঠে তার কৈফিয়ত
-“সরি রে, অনেকটা দেরি হয়ে গেল!”
মেঘাদ্রি একটি ম্লান হাসির রেখা টেনে বিদ্রূপের সুরে শুধালো,
-“তুই একা? শুনলাম তোর নাকি নতুন প্রেমিকা হয়েছে, সে কোথায়?”
রিকি চোখের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে সামনের দিকে ইশারা করল। একরাশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সে উত্তর দিল

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২৯+৩০

-“ওই তো সামনেই দাঁড়িয়ে আছে, চল আজ আলাপ করিয়ে আনি।”
রিকির কথাটা শুনে মেঘাদ্রির মনটা খারাপ হয়ে গেল। সে আর কিছু না বলে রিকির সাথে হাঁটা শুরু করছে। পার্কের ঝাউগাছের ছায়ায় তখন সন্ধ্যার মায়া নামছে, আর এক নতুন গল্পের অপেক্ষায় মুহূর্তটি স্তব্ধ হয়ে রইল।

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩৩+৩৪