Home ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩৫+৩৬

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩৫+৩৬

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩৫+৩৬
তানিশা ভট্টাচার্য্য

বিকেলের ম্লান আলো তখন জানলার গ্রিল ছুঁয়ে ঘরের মেঝেতে দীর্ঘ মায়ার মতো লুটিয়ে আছে। ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢুকল প্রেম ও নীলাদ্রি। বিছানার এক কোণে আর্ভিক তখন আপন মনে বসে ছিল। প্রেম ও নীলাদ্রির এই আকস্মিক আগমনে সে সামান্য অবাক হলেও চঞ্চল হলো না। শান্ত ভঙ্গিতে দুহাত বুকের ওপর ভাঁজ করে, পিঠ টানটান করে সে বিছানায় হেলান দিয়ে বসল। তার চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের গভীরতা, যেন সে আগেই টের পেয়েছে কোনো এক ঝড়ের পূর্বাভাস। প্রেম হাঁপাতে হাঁপাতে আর্ভিকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার কণ্ঠে মিনতি আর আশঙ্কার সংমিশ্রণ। সে বলতে শুরু করল

-“ভাই, আমি বড় সমস্যায় পড়ে তোর কাছে এসেছি। পথ খুঁজে পাচ্ছি না আর।”
আর্ভিক নিরুত্তর। তার মৌনতা যেন বন্ধুকে কথা বলার সাহস আর অবকাশ দুটোই দিচ্ছিল। প্রেম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে লাগল
-“জানিসই তো ওকে কতটা ভালোবাসি। কিন্তু ও এবার চরম শর্ত দিয়ে দিয়েছে। বলেছে, এই অক্টোবর থেকে নভেম্বরের সন্ধিক্ষণটুকুই আমার শেষ সময়। এর মধ্যে যদি ওর বাবার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের বিয়ের কথা বলতে না পারি, তবে সে অন্য কারো সঙ্গে ঘর বাঁধবে।”
প্রেম থামল। জানলার বাইরে দিয়ে শুকনো পাতার খসখস শব্দ ভেসে আসছে। ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো জানান দিচ্ছে অক্টোবর ফুরিয়ে নভেম্বরের হিমেল হাওয়া দরজায় কড়া নাড়ছে। সময় বালুঘড়ির মতো হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে। প্রেম আবার কাঁপা গলায় বলল

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-“আজ অক্টোবর শেষ, কাল থেকে নভেম্বর। অথচ আমি এখনো সাহসের সঞ্চয় করতে পারিনি। ওর বাবার সামনে দাঁড়ানোর শক্তিটুকু জোগাড় করে দে ভাই।”
ঘরের ভেতর সেই মূহূর্তে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। শরতের বিদায় আর হেমন্তের আগমনের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এক প্রেমিকের হাহাকার বাতাসের আর্দ্রতাকে ভারি করে তুলল। আর্ভিক একইভাবে নির্বিকার বসে রইল, কিন্তু তার চোখের কোণে বন্ধুত্বের এক প্রগাঢ় আশ্বাস ফুটে উঠল। যেন সে মনে মনে ভাবছে, সময়ের এই নিষ্ঠুর খেলায় সে তার বন্ধুকে একা ছেড়ে দেবে না।
ঘরের গুমোট নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রথম আর্ভিকের কণ্ঠস্বর ভেসে এল—একদম শান্ত, নিস্তরঙ্গ জলের মতো। সে দুহাতে ভাঁজ করা বুকের বাঁধন না খুলেই ধীর চোখে তাকাল। তার স্বরে কোনো উত্তেজনা নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা। সে বলল

-“এই গোলকধাঁধায় আমি তো নিছক দর্শক। তোকে যদি কেউ উদ্ধার করতে পারে, তবে সে একমাত্র নীল।”
নীলাদ্রি তখনো পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারেনি। সে কিছুটা বিভ্রান্ত হয়েই ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানাল, যেন বন্ধুর বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তে সে সদা প্রস্তুত। উৎসুক কণ্ঠে সে শুধাল
-“কিন্তু আমি কীভাবে সাহায্য করব? আমি তো মেয়েটা কে চিনি না।”
আর্ভিক এবার তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্থির করল নীলাদ্রির ওপর। অত্যন্ত ধীরলয়ে বিষাদমাখা হাসিতে সে যোগ করল
-“তুই সোহাগ চিনিস না??”
মুহূর্তের জন্য ঘরের বাতাস ভারী হয়ে এল। শব্দগুলো কানে পৌঁছানোর কয়েক সেকেন্ড পর যেন বোধোদয় হলো নীলাদ্রির। তার সহজ-সরল সম্মতির রেশটুকু মুহূর্তেই আগুনের হলকায় রূপ নিল। বিস্ময় আর অপমানে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চিৎকার করে সে ফেটে পড়ল,

-“কী! তার মানে…. প্রেম এতক্ষণ ধরে সোহাগের কথা বলছিল!?”
আর্ভিকের কণ্ঠস্বর তখনো আগের মতোই নির্বিকার, যেন এক নিপুণ জাদুকর তাসের শেষ খেলাটি দেখাচ্ছে। সে তার বুকের ওপর রাখা হাতের বাঁধন আলগা না করেই শান্তভাবে বলল,
-“হ্যাঁ”
ঘরের তপ্ত আবহাওয়া তখন এক নাটকীয় মোড় নিল। নীলাদ্রির ক্রোধ এবার আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ছড়িয়ে পড়ল। সে বিস্ফারিত নেত্রে প্রেমের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল

-“এসব কী শুরু করেছিস তোরা? দুই ভাই মিলে কি আমার দুই বোনের পিছু লেগেছিস? তোদের সাহস তো কম নয়! একজন সোহাগের সাথে, অন্যজন মেঘাদ্রির সাথে। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো কি একেই বলে? এগুলো একদম ঠিক হচ্ছে না! পৃথিবীতে কি আর কোনো মেয়ে নেই?”
পরিস্থিতির এই চরম উত্তেজনার মাঝে আর্ভিকের কণ্ঠস্বর শোনা গেল, যা ছিল অনেকটা জলন্ত আগুনে ঠান্ডা জল ঢালার মতো। সে এক চিলতে বাঁকা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে প্রেমের পক্ষ নিয়ে বলে উঠল
-“আরে ভাই, শান্ত হ! তুই নিজে ‘নিরামিষ’ বলে কি দুনিয়ার সবাই নিরামিষ হয়ে থাকবে নাকি? তারা তো রক্ত-মাংসের মানুষ, প্রেম-ভালোবাসা তো করবেই।”
আর্ভিক নীলাদ্রির কাঁধে হাত রেখে কিছুটা কৌতুক আর কিছুটা শাসনের সুর যোগ করে বলল

-“খামোখা রাগারাগি করে রক্তচাপ বাড়িয়ে লাভ নেই। বরং চুপচাপ ওখানে বস আর ভাব কীভাবে সাহায্য করা যায়। ভালোবাসা যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন তুই ভাই হয়ে বাধা না হয়ে ঢাল হয়ে দাঁড়া। এখন রাগ ভুলে চুপ করে এখানে বস।”
আর্ভিকের কথা শেষ, ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করল রিকি আর মেঘাদ্রি। তাদের হাতে প্রজেক্টের খাতা, চোখে একরাশ কৌতূহল। কিন্তু ঘরের থমথমে পরিবেশ দেখে তারা যেন দরজায় থমকে দাঁড়াল। নীলাদ্রির বুকের ভেতর তখনো ক্রোধের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছিল, নিজের বোনকে দেখামাত্রই চিৎকার করে উঠল,

-“এই! তুই এখানে কী করছিস?”
তার কণ্ঠে যেন সন্দেহের তীক্ষ্ণ ফলা। মেঘাদ্রি ভয় আর বিস্ময়ে আমতা আমতা করে কোনোমতে বলল,
-“দাদা… আমরা তো শুধু প্রজেক্ট করতে এসেছি। আর একটা জিনিস বুঝতে পারছি না তাই আর্ভিক দাদার কাছে সাহায্যে নিতে এসেছি।”
নীলাদ্রি রিকি আর মেঘাদ্রির দিকে রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে আছে। আর্ভিক এবার পরিস্থিতির লাগাম ধরল। সে মৃদু কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে নীলাদ্রি কে ধমক দিয়ে বলল
-“তুই এবার থাম তো! বাচ্চা দুটো প্রজেক্ট করতে এসেছে, ওদের কাজটা করতে দে। খামোখা সব কিছুতে সন্দেহ খুঁজিস না।”
তার শান্ত শীতল ধমকে ঘরের তপ্ত আবহাওয়া কিছুটা স্তিমিত হয়ে এল। রিকি ধীরপায়ে এগিয়ে এসে খাতাটা বাড়িয়ে ধরল আর্ভিকের সামনে। সে বিনয়ের সাথে বলল

-“দাদা, এই অংশটা কীভাবে করব কিছুতেই বুঝতে পারছি না, একটু বুঝিয়ে দেবে?”
আর্ভিক খাতাটি টেনে নিল এবং অত্যন্ত নিপুণভাবে কঠিন বিষয়টি বুঝিয়ে দিল। কাজ শেষে তারা দুজন যখন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, তখন ঘরের ভেতর আবার সেই আদিম নিস্তব্ধতা ফিরে এল। আর্ভিক এবার দুহাত বিছানায় ছড়িয়ে আয়েশ করে বসল। প্রেমের অস্থির মুখের দিকে তাকিয়ে সে একটা রহস্যময় হাসি দিল। যেন সে একাই এই দাবার বোর্ডের আসল চালটা জানে।
আর্ভিক কণ্ঠে কিছুটা নাটকীয়তা মিশিয়ে বলল
-“ঠিক আছে, এখন তোরা দুটো এখান থেকে বিদায় হ তো দেখি! আমাকে শান্তিতে একটু মগজ খাটাতে দে।”
তার কথা শুনে প্রেম যেন আশার আলো দেখল, আর নীলাদ্রি তখনো রাগে ফুঁসছে। আর্ভিক হাত নেড়ে তাদের তাড়া দিয়ে বলল
-“যা এখন, বেশি ভিড় করিস না। দুদিনের মধ্যে একটা উপায় বের করছি, তবে তার আগে আমাকে নির্জনে একটু ‘ফিলোসফার’ হতে দে!”

রাতের নিস্তব্ধতা তখন চাদরের মতো চারপাশকে জড়িয়ে ধরেছে। আর্ভিক তার রুমের মধ্যে তৈরি করা এক সিক্রেট রুমের বিলাসবহুল সোফায় গা এলিয়ে বসে আছে। তার দৃষ্টি সামনে থাকা একটা বড়ো বাঁধানো ছবির ওপর। ছবিটা কোনো এক নারীর দুটি কাজল কালো চোখের। আর্ভিক সেদিকে তাকিয়েই আপন মনে গান জুড়ে দিল।
“Hai ye nasha ya hai zehar
Iss pyar ko hum kya naam dein
Kab se adhuri hai ik daastaan
Aaja usey aaj anjaam dein
Tumhe bhuloon kaise main
Meri pehli khata tum ho
Main jo jee raha hoon
Wajah tum ho..
Wajah tum ho..”

সুরের লহরী যেন দেয়াল ফুঁড়ে বাইরের করিডোরে হানা দিচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে তানভী, পড়ার পাহাড় ডিঙিয়ে তৃষ্ণার্ত গলায় জলের খোঁজে ঘর থেকে বেরোলো। সারা করিডোরে অন্ধকার শুধু একটা ড্রিমলাইট জ্বলছে, ডান দিকে তাকাতেই সে থমকে গেল। পাশে আর্ভিকের রুম থেকে এক অদ্ভুত মিষ্টি, কিন্তু ছমছমে গানের আওয়াজ ভেসে আসছে।
কৌতূহলী হয়ে তানভী পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল। ঘরের দরজাটা সামান্য ভেজানো ছিল, সে কাঁপা হাতে ধাক্কা দিতেই দেখল—আর্ভিক রুমে নেই, একটা ড্রিম লাইট জ্বলছে, ভেতরটা একেবারে খাঁ খাঁ করছে! একটা মশা ওড়বার শব্দ পর্যন্ত নেই, গান তো দূরের কথা।
তানভী ভাবল বোধহয় কানের ভুল, যখনই সে ফেরার জন্য পা বাড়াবে ঠিক তখনই দ্বিতীয় দফায় সেই গান আবার চড়া সুরে শুরু হলো। তার মনের ভেতর হাজারো প্রশ্ন—আর্ভিক ভাই নেই তো গান গাইছে কে? এবার তার মনে হল, এ নির্ঘাত কোনো সুররসিক ভূতের কাজ! ভয়ে তার গায়ের রক্ত জল হয়ে গেল। ‘ভূত’ বলে চিৎকার করার সাহসটুকুও নেই, তৃষ্ণার কথা মাথায় তুলে সে এক দৌড়ে নিজের রুমে ঢুকে গেল। বেচারা জানলই না, দেয়ালের ওপাশেই গোপন ডেরায় বসে আর্ভিক নামক এক ‘জীবন্ত ভূত’ তখন তার গানের শেষ কলি ধরছে। পিপাসার বদলে এখন বুক ধড়ফড়ানিই তানভীর রাতের সঙ্গী হলো!

গোপন কুঠুরির ম্লান আলোয় সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। আর্ভিক ধীরপায়ে এগিয়ে গেল দেয়ালে টাঙানো একটা বিশাল ফটো ফ্রেমটির সামনে। ধুলোহীন কাঁচের ওপারে বন্দী হয়ে আছে এক চিলতে হারানো স্বর্গ। ছবিতে এক পুরুষ হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন, তাঁর চোখে এক প্রগাঢ় প্রশান্তি; বয়স বড়জোর পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের কোঠায়। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলার স্নিগ্ধ মুখশ্রী থেকে উপচে পড়ছে মাতৃত্বের কোমলতা। ওনার বয়স ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে। আর পুরুষটির কোলে আছে পাঁচ-ছয় বছরের একটা বাচ্চা ছেলে—যার নিষ্পাপ চাহনি।
আর্ভিকের দুই চোখ এখন টকটকে লাল, ঠিক যেন আগুনের আঙরা। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওই হাসিমুখগুলোর দিকে। তার বুকের ভেতরটা এক বিশাল শূন্যতায় দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। সে কাঁদতে চায়, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে নিজের ভেতরের সবটুকু বিষ জল করে বের করে দিতে চায়। কিন্তু অবাধ্য চোখের জল আজ বড় বেশি পাষাণ। কিন্তু কোনো এক কঠোর প্রতিজ্ঞা তার অশ্রুগ্রন্থিকে পাথর করে দিয়েছে। কান্না কণ্ঠনালীতে এসে জমাট বাঁধে অথচ চোখ দিয়ে বেরোতে পারে না। আর্ভিক চোখ বন্ধ করে নিল মুহূর্তেই অতীতের এক বিশাল দরজা খুলে গেল…..

ঘড়িতে বিকাল ৩টে বাজে ছোট্ট ছয় বছরের আর্ভিক স্কুল থেকে ফিরল। এসেই সোজা সোফায় শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর স্কুল ব্যাগ হাতে রণজয় ব্যানার্জী এলেন। তিনি ব্যাগটা জায়গা মতো রেখে দিয়ে আর্ভিক কে বললেন
-“এভি যাও আগে ফ্রেশ হয়ে আসো”
আর্ভিক শোয়া থেকে উঠে ফ্রেশ হতে চলে যায়। আর্ভিক দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার মথুরাপুর গ্ৰামের এক নামকরা প্রাইভেট বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়ে। স্কুলের নাম “জ্ঞানেন্দ্র শিশু বিদ্যামন্দির”। স্কুলটি রণজয় ব্যানার্জীর বাড়ি থেকে ৫ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত। তাই স্কুল ছুটির পর রোজ আর্ভিক রণজয় ব্যানার্জীর সাথে ওনার বাড়িতে আসে। সেখানে খাওয়া দাওয়া করে, খেলে তারপর ৬টা বাজলে অভিক সাহেব নিতে আসেন তাকে।

আর্ভিক ফ্রেশ হয়ে চলে এসেছে। রণজয় ব্যানার্জী তখন আর্ভিকের স্কুলের C.W খাতা গুলো চেক করছেন। ততক্ষণে মৈত্রেয়ী ব্যানার্জীর আর্ভিকের জন্য খাবার নিয়ে এসে বসে অপেক্ষা করেছিলেন। আর্ভিক এসে সোফায় বসল, মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী পরম যত্নে তাকে খাইয়ে দিচ্ছেন। খেতে খেতে আর্ভিকের চোখ যায় জানালার বাইরে বড়ো মাঠটায়। সেখানে অনেক ছেলে একসাথে খেলেছে। আর্ভিক কখনো বাইরে খেলতে যায় নি, তাই সে আবদার করে বলল
-“বড়মা… আমি একটু খেলতে যাব…ওই বড়ো মাঠটায়?”
মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী ঠোঁটের কোণায় হাসি রেখে বললেন
-“আচ্ছা বাবা যাস! কিন্তু আগে খেয়ে নে।”
আর্ভিক খুশি হয়ে বড়মা কে জরিয়ে ধরে, তারপর খাওয়া শেষ করে বলল
-“এবার যাই?”

মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী সম্মতি সূচক মাথা নাড়লেন। আর্ভিক আনন্দের সঙ্গে খেলতে গেল। যাওয়ার কিছুক্ষণ পর আর্ভিক যখন কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ঢুকল, মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী আঁতকে উঠলেন। যে ছেলে আজ পর্যন্ত মাঠের ধুলো গায়ে মাখেনি, সে আজ নিজে থেকে খেলতে গিয়ে ফিরল বিধ্বস্ত অবস্থায়। মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী ওকে জাপটে ধরতেই আর্ভিক কান্নায় ভেঙে পড়ল।
সোফায় বসে শান্ত ভঙ্গিতে চা খাচ্ছিলেন রণজয় ব্যানার্জী। গম্ভীর দৃষ্টিতে তিনি লক্ষ্য করছিলেন আর্ভিকের নুইয়ে পড়া শরীরটা। কান্নার হেঁচকির মাঝেই আর্ভিক জানাল, মাঠে তিনটে বড় ছেলে মিলে একটা ছোট ছেলেকে মারছিল। ও প্রতিবাদ করতে গেলে তাকেও ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়।

“নতুন এসে খবরদারি করছিস?”—এই বলে তারা আর্ভিক কে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে।
আর্ভিকের কথা শেষ হতে না হতেই রণজয় ব্যানার্জী উঠে দাঁড়ালেন। গাম্ভীর্যমাখা পায়ে হেঁটে এসে আর্ভিক কে ওর বড়মার কোল থেকে হ্যাঁচকা টানে নিজের সামনে দাঁড় করালেন। হঠাৎ এই টানে ভারসাম্য সামলাতে না পেরে আর্ভিক মেঝেতে পড়ে গেল। মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী আর্তনাদ করে উঠলেন
-“একি করছ? বাবুকে ফেললে কেন?”
রণজয় ব্যানার্জী হাত তুলে স্ত্রীকে থামিয়ে দিয়ে আর্ভিকের চোখের দিকে তাকিয়ে বজ্রকণ্ঠে বললেন
-“কান্না থামা! এখনই ওঠ।”
আর্ভিক ভয়ে আর বিস্ময়ে চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়াল। রণজয় ব্যানার্জীর চোখে তখন শাসন আর জেদের আগুন। তিনি বললেন,

-“ভবিষ্যতে যদি এইটুকু কারণে তোর চোখে জল দেখি, তবে আমি নিজে তোকে আছাড় দেব। সব সময় আমি তোকে বাঁচাতে আসব না।”
আর্ভিক কাঁপা গলায় বলল, “জেঠু মনি, ওরা তিনজন ছিল, আমি একা কী করতাম?”
-“তুই একা ছিলি না,”
রণজয় ব্যানার্জীর গলায় এবার অভিজ্ঞতার সুর,
-“ওরা ওখানে সবার ওপর অত্যাচার করছিল। তুই সাহস দেখিয়ে রুখে দাঁড়ালে বাকি ছেলেরাও তোর পাশে এসে দাঁড়াত। মনে রাখবি এভি, অন্যায় সহ্য করাও অপরাধ। কোমল হও, কিন্তু দুর্বল নয়।”
আর্ভিকের কাঁধে একটা শক্ত হাত রেখে তিনি দরজার দিকে ইশারা করলেন। শান্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে বললেন,
-“এখন যাও, জিতে এসো।”

‘কোমল হও, কিন্তু দুর্বল নয়’ এই কথা আর্ভিকের মনে গভীর ভাবে প্রভাব ফেলল। আর্ভিক আর পেছনে ফিরে তাকাল না। চোখের জল মুছে, বুক চিতিয়ে সে আবার মাঠের দিকে দৌড় দিল। আর্ভিক বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেই মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে উঠলেন,
-“তুমি কি পাথর? বাবুকে তুমি ওভাবে ধাক্কা দিলে! আর এসব কী শেখাচ্ছো তুমি!?”
রণজয় ব্যানার্জী জানলার বাইরে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। শান্ত স্বরে তিনি বললেন,
-“মৈত্রেয়ী, মানুষ আমাকে ভয় পায় আবার ভালোও বাসে। আমি সেই মাফিয়া যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পুলিশ যেখানে পৌঁছাতে পারে না, সেখান থেকে আমি অসহায়দের উদ্ধার করি। এই অন্ধকার জগৎ সামলানো কোনো সাধারণ মানুষের কাজ নয়।”

তিনি স্ত্রীর দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন, তাঁর চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা, তিনি আবার বললেন
-“আমার এই লড়াইটা দুর্নীতির বিরুদ্ধে, সাধারণ মানুষের জন্য। আমার অনুপস্থিতিতে আমার এই মাফিয়া সাম্রাজ্যের দায়িত্ব কোন দুর্বলের হাতে আমি ছেড়ে যেতে পারব না। এভি যদি নিজের চোখের জল মুছতে না শেখে, তবে ও কাল সমাজকে রক্ষা করবে কীভাবে? আমি চাই ও দয়ালু হোক, কিন্তু দুর্বল নয়।”
মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী চুপ করে গেলেন। তিনি জানতেন রণজয় ব্যানার্জীর ক্ষমতার দম্ভে নয়, বরং সমাজকে নিরাপদ রাখতে এই কঠিন পথ বেছে নিয়েছেন। রণজয় ব্যানার্জী আবার বললেন,
-“যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জানে না, সে ন্যায়ের শাসন করতে পারে না। আজ ও যদি ওই তিনটে ছেলের সামনে ফিরে না দাঁড়ায়, তবে ভবিষ্যতে ও কোনো বড় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস পাবে না। আমি ওকে বীর বানাতে চাই, মৈত্রেয়ী, শিকার নয়।”
বাইরে তখন আর্ভিকের ফিরে আসার অপেক্ষা, যে আজ তার জেঠু মনির আদর্শের যোগ্য উত্তরাধিকারী হয়ে ওঠার প্রথম দীক্ষা নিল।

মাঠে যখন আর্ভিক আবার ফিরে এল, তখন সূর্য পাটে বসছে। বিকেলের ম্লান আলোয় মাঠের মাঝখানে তখনও সেই তিনটে ছেলে জটলা পাকিয়ে বসে ছিল, আর কোণঠাঁই হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সেই মার খাওয়া ছেলেটি। আর্ভিক কে ফিরে আসতে দেখে দলের সর্দার গোছের ছেলেটি টিটকারি দিয়ে উঠল,
-“কি মহারাজ, আবার ধাক্কা খেতে এসেছিস? মায়ের আঁচল ছেড়ে এলি যে বড়?”
বাকিরা হো হো করে হেসে উঠল। আর্ভিক এক মুহূর্ত থমকাল। বুকটা ঢিপঢিপ করছিল, কিন্তু কানের কাছে তখনও জেঠু মনির সেই অমোঘ মন্ত্র বাজছে— ‘দুর্বল হয়ো না’। সে আর পিছিয়ে গেল না। আর্ভিক দেখল মাঠের চারধারে আরও কিছু ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, যারা এতক্ষণ ভয়ে সিঁটিয়ে ছিল।
আর্ভিক সোজা গিয়ে সর্দারের সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলল,

-“মাঠটা সবার। এখানে কেউ কাউকে মারার অধিকার রাখে না। তোমরা তিনটে ছেলে মিলে ওকে মারছিলে কেন?”
-“খুব তেজ বেড়েছে দেখছি!”
বলে সর্দার ছেলেটি যেই আর্ভিকের কলার ধরতে হাত বাড়াল, আর্ভিক চট করে ওর হাতটা ধরে ফেলল। আর্ভিক একা নয়, ওর এই সাহস দেখে মাঠের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা আরও চার-পাঁচজন ছেলে সাহস পেয়ে এগিয়ে এল। একজন বলে উঠল,
-“ঠিকই তো বলছে ওই নতুন ছেলেটা। রোজ রোজ তোমরা আমাদের সঙ্গে এমন করো কেন?”
হঠাৎই দৃশ্যপট বদলে গেল। এতক্ষণ যারা বিচ্ছিন্ন ছিল, আর্ভিকের একার প্রতিবাদে তারা সবাই একজোট হয়ে গেল। তিনটে ছেলে দেখল এখন তারা একা হয়ে পড়েছে, আর বাকি সবাই তাদের ঘিরে দাঁড়িয়েছে। গায়ের জোরের চেয়ে একতার জোর যে অনেক বেশি, সেটা বুঝতে পেরে তারা আস্তে আস্তে পিছিয়ে যেতে শুরু করল।

-“দেখে নেব তোদের,”
বলে বিড়বিড় করতে করতে তারা মাঠ ছেড়ে চলে গেল। মার খাওয়া ছেলেটি কৃতজ্ঞ চোখে আর্ভিকের দিকে তাকাল। আর্ভিক অনুভব করল, ওর ভেতরের সেই ভয়টা অদ্ভুতভাবে উবে গিয়ে এক আশ্চর্য শান্তিতে মন ভরে উঠেছে। সবাই আর্ভিকের কাছে এল, একজন বলল
-“তোমার নাম কী?”
আর্ভিক মুচকি হেসে জবাব দিল
-“আর্ভিক”
ছেলেরা বলল
-“তুমি খুব ছোট, কিন্তু খুব সাহসী। তুমি কি এখন থেকে আমাদের সাথে খেলতে আসবে।”
প্রতি উত্তরের আর্ভিক একগাল হেসে সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল। ও দূর থেকে দেখল, বাড়ির বারান্দায় অন্ধকার ছায়ায় এক অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। জেঠু মনি। কোনো হাততালি নেই, কোনো চিৎকার নেই, শুধু অন্ধকারের আড়াল থেকেও আর্ভিক বুঝতে পারল জেঠু মনির সেই গম্ভীর দৃষ্টিতে আজ এক তৃপ্তির আভাস ফুটে উঠেছে।

অতীতের স্মৃতি থেকে ফিরে আসে আর্ভিক। তার ঠোঁট দুটো থরথর করে কেঁপে উঠল। নিস্তব্ধ ঘরে বাতাসের ফিসফিসানির মতো অত্যন্ত অস্পষ্ট, ভাঙা গলায় দুটো শব্দ বেরিয়ে এল—
-“জেঠু মনি… বড়মা…”
সাথে সাথে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেল আর্ভিক। এই মানুষগুলো তার শুধু আত্মীয় ছিল না, ছিল তার বেঁচে থাকার ধ্রুবতারা। তাদের এই অকাল প্রস্থান আর্ভিকের জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছে। সে জানলার বাইরে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকাল, কিন্তু তার মানসপটে তখনো ভাসছে সেই রক্তিম স্মৃতি। ছবির সেই ছোট্ট শিশুটি আজ বড় হয়েছে, কিন্তু সেই রাতের সেই আর্তনাদ আজও তার কানে প্রতিধ্বনিত হয়।
সে নিজেকে শক্ত করল। তার এই লোহিত চোখের জল কেবল শোক নয়, বরং এক সুপ্ত আগ্নেয়গিরির পূর্বাভাস। জেঠু মনি আর বড়মার সেই অমলিন হাসির মর্যাদা তাকে রাখতেই হবে। সে হাত দিয়ে আলতো করে ফ্রেমটি ছুঁল, যেন স্পর্শের মাধ্যমে তাদের থেকে আশীর্বাদ আর শক্তি সঞ্চয় করছে।

দুইদিন পর তিন মূর্তি হাজির হলো গন্তব্যে। নীলাদ্রির কাছে এটা নেহাতই পিসির বাড়ি, কিন্তু প্রেমের কাছে যেন সাক্ষাৎ ‘সিংহের গুহা’। উঠোনে পা রাখতেই দেখা মিলল নীলাদ্রির পিসেমশাইয়ের মানে সোহাগের বাবার। তিনি যে-সে মানুষ নন, একেবারে রিটায়ার্ড আর্মি মেজর। তাঁর টানটান মেরুদণ্ড আর কাঁচাপাকা গোঁফ দেখলেই মনে হয়, এখনই বোধহয় কাউকে ‘অ্যাটেনশন’ মোডে দাঁড় করিয়ে দেবেন।
তিন বন্ধু মিলে এক এক করে ভক্তিভরে দণ্ডবৎ প্রণাম সারল। মেজরের কড়া নজর যেন এক্স-রে মেশিনের মতো তাদের ওপর দিয়ে বয়ে গেল। তিনি গম্ভীর স্বরে গম্ভীর স্বরে হুকুম দিলেন
-“বসো!”

নীলাদ্রি আর প্রেম যেন কুচকাওয়াজ করা সৈনিকের মতো সোফায় গিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে সেঁটে বসল। কিন্তু আর্ভিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বসল। নীলাদ্রি পিসেমশাইয়ের আপন জন হয়েও কেমন যেন সিটিয়ে রইল, আর প্রেমের অবস্থা তখন কাঁপাকাঁপা। তার মনে হচ্ছিল, বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া তো দূরে থাক, পিসেমশাই যদি এখনই একটা গ্রেনেড প্র্যাকটিস করতে বলেন, তবে সে সোজা দৌড়ে সীমানা পার হবে।
ঘরজুড়ে এক থমথমে নিস্তব্ধতা। মেজরের গম্ভীর ব্যক্তিত্ব আর ছেলেদের আধো-ভীতি মেশানো হাসি—সব মিলিয়ে পরিবেশটা তখন এক দারুণ হাস্যকৌতুকপূর্ণ যুদ্ধের ময়দান। যেন এক সেকেন্ডের এদিক-সেদিক হলেই কোর্ট মার্শাল শুরু হয়ে যাবে! মেজরের সেই বাঘা বাঘা চাউনি আর থমথমে ড্রয়িংরুমে যখন নীলাদ্রি আর প্রেমের আত্মারাম খাঁচা হওয়ার জোগাড়, তখন আর্ভিক সোফায় এমন আয়েশ করে বসে আছে, যেন মেজরের এই ‘আর্মি স্টাইল’ তার কাছে রোজকার ডাল-ভাত।

প্রেম যখন ভয়ে ঘামছে আর নীলাদ্রি পিসেমশাইয়ের গোঁফ দেখে ঢোক গিলছে, তখন আর্ভিক নির্বিকারভাবে সোফায় পিঠ ঠেকিয়ে মেজরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তার বসার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, সে যেন কোনো যুদ্ধ জয় করে আসা সেনাপতি, আর মেজর সাহেব তার অতি সাধারণ এক সুবেদার! ভয়ের বদলে তার চোখেমুখে এক রাজকীয় আয়েশ। যেন মেজরের হাঁকডাক তার কানে কোনো বসন্তের বাতাসের মতো মিষ্টি লাগছে। তার এই ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাব দেখে মনে হচ্ছিল, মেজর সাহেব এখনই হয়তো তাকে ধমক দেওয়া ছেড়ে উল্টো তার সাথে দাবার ছক নিয়ে বসবেন।

নীলাদ্রি পিসেমশাইয়ের কাছে সবার পরিচয় করিয়ে দিল। প্রেম, যে কি না বাইরে দুঁদে আইপিএস অফিসার হিসেবে অপরাধীদের বুকে কাঁপন ধরায়, এখানে সে নিজেই যেন এক আসামী! সোহাগ জলখাবারের প্লেট হাতে এল। আর্ভিকদের সামনে থাকা টি টেবিলের উপর সাজিয়ে দিয়ে তার বাবার ঠিক পেছনে দাঁড়াল। পিসেমশাই সবাই খেতে বললেন।
খাওয়াদাওয়া শেষ হতেই শুরু হলো আসল খেলা। প্রেম টেবিলের তলা দিয়ে নীলাদ্রির পায়ে সজোরে লাথি মারল—ইশারাটা পরিষ্কার
‘তোর বোন, তুই-ই শুরু কর!’
কিন্তু নীলাদ্রি তখন সিলিং ফ্যান দেখতে ব্যস্ত, যেন সে কিছুই বোঝেনি। নিরুপায় হয়ে প্রেম তাকাল আর্ভিকের দিকে। আর্ভিক কেবল চোখের এক কোণ দিয়ে ইশারা করল

-‘নিজের কাজ নিজে কর!’
পুরো জেলায় ত্রাস সৃষ্টি করা পুলিশ অফিসার এবার পিসেমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে তোতলাতে শুরু করল। তার হাত-পা যেন বরফের মতো জমে যাচ্ছে। কাঁপা কাঁপা গলায় সে বলল
-“ইয়ে… মানে… আঙ্কেল, আসলে…”
প্রেমের আমতা আমতা করাতে মেজর সাহেব ভ্রু কুঁচকে হুঙ্কার দিলেন,
-“কী হলো হে? তোমার কি শরীর খারাপ? কোনো অসুখ-বিসুখ আছে নাকি?”
পিসেমশাইয়ের কথায় প্রেম যেন কেঁপে উঠল। তাকে দেখে আর্ভিক মুখ টিপে হাসতে হাসতে প্রায় সোফা থেকে পড়ে যাওয়ার জোগাড়। ঠিক সেই মুহূর্তে নাটকীয়ভাবে যবনিকা পতন ঘটাল সোহাগ। সে বাবার পেছন থেকে মুচকি হেসে বলে উঠল,

-“থাক, তোমাকে আর কষ্ট করে বলতে হবে না। আমি আগেই বাবাকে সব বলে রেখেছি!”
রিমির কথায় ঘরের গুমোট ভাব মুহূর্তেই হাসির হররায় ফেটে পড়ল। প্রেম হাঁ করে তাকিয়ে রইল, যেন সে আকাশ থেকে পড়েছে। সোহাগ খিলখিল করে হেসে বলল,
-“আর্ভিক দাদা আর নীল দাদা তো পরশুদিনই এখানে এসেছিলেন। তাঁরাই বাবাকে সব বুঝিয়ে বলেছেন। বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমিও না করিনি।”
সব শেষে দেখা গেল, যে যুদ্ধের প্রস্তুতিতে প্রেমের ঘাম ঝরাচ্ছিল, সেই যুদ্ধ তার বন্ধুরা আগেই জয় করে রেখেছে। মেজর সাহেব মুচকি হেসে হবু জামাইকে মিষ্টি মুখ করালেন। তিন বন্ধু যখন মিষ্টির রেশ নিয়ে বাড়ির পথে ফিরছিল, তখন পড়ন্ত রোদে তাদের বন্ধুত্বের সেই অদ্ভুত রসায়ন আর অক্টোবর-নভেম্বরের সন্ধিক্ষণ এক সুন্দর পরিণতির গল্প লিখছিল।

পঞ্জিকার পাতা উল্টে ক্যালেন্ডারের বুক থেকে ঝরে গেছে অনেকগুলো দিন। হেমন্তের এক উদাস বিকেলে, যখন উত্তুরে হাওয়ায় শীতের আমেজ আর চারদিকে শুকনো পাতার নূপুরধ্বনি, তখন চৌধুরী নিবাসের দরজায় এসে দাঁড়ালেন রুদ্র বাবু। তিনি বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে করতে প্রফুল্ল মেজাজে বললেন
-“কই সব? কোথায় তোমারা..!! অভিক কোথায় গেলি?”
অভিক সাহেব আর রাখী রায়চৌধুরী তখন বাগানে ফুল গুলো দেখছিলেন। রুদ্র বাবুর গলা পেয়ে ওনারা সেখানে আসেন। অভিক সাহেব রুদ্র বাবুকে দেখে একগাল হেসে বললেন
-“আরে আয় আয় বস”
রাখী রায়চৌধুরী রান্নাঘরে চা করতে গেলেন। অভিক সাহেব রসিকতা করে বললেন
-“তা হঠাৎ! বাড়ির পথ ভুলে এখানে এলি নাকি?”
রুদ্র বাবু ভ্রু কুঁচকে বললেন

-“এমন ভাব করছিস যেন তুই কত আমার বাড়িতে যাস!”
অভিক সাহেব হেসে বললেন
-“আরে ভাই মজা করছি”
রুদ্র বাবু বললেন
-“আর সব কোথায়? মামনি, ঋষি, আর্ভিক?”
ড্রয়িংরুমের সোফাটায় বসে দুই বন্ধু গল্প করছিলেন। এর মধ্যে রাখী রায়চৌধুরী একটা ট্রেতে করে মিষ্টি আর চা নিয়ে এলেন। ট্রে টা টি-টেবিলে রেখে রুদ্র বাবুর হাতে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বললেন
-“ঋষি এখন অফিসে আছে। আর সিনু গুল্লু কে কোচিংয়ে দিতে গেছে। ওকে কোচিংয়ে দিয়ে অফিসে যাবে।”
রুদ্রবাবু চায়ের চুমুক দিয়ে বললেন

-“আচ্ছা”
এরপর পকেট থেকে সযত্নে বের করলেন নীল রঙের একটা নিমন্ত্রণপত্র। সেটা অভিক সাহেবের হাতে এগিয়ে দিয়ে বললেন
“ছেলের নয় বছর পূর্ণ হচ্ছে রে, ভাবতেই পারি না সময়টা কীভাবে ডানা মেলে উড়ে গেল! কোনো ওজর-আপত্তি শুনব না, সপরিবারে আসবি। একদিন আগে যাবি। মনে রাখিস, এটা শুধু আমার ছেলের জন্মদিন নয়, আমাদের একসঙ্গে হওয়ার একটা অজুহাতও বটে।”
অভিক সাহেব কার্ডটা রাখী রায়চৌধুরীর হাতে দিলেন। তারপর একটু হেসে রুদ্র বাবু কে বললেন

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩৩+৩৪

-“অবশ্যই যাব।”
রুদ্র মৃদু হেসে বললেন
-“তাহলে এখন আসি”
এই বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। অভিক সাহেব ওনাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেলেন।

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩৭+৩৮