ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২+৩
তানিশা ভট্টাচার্য্য
আজ বুধবার, আজকের দিনটি “চৌধুরী নিবাসের” মানুষ জনদের কাছে খুবই বিশেষ একটা দিন। এর মধ্য তানভীরা এসে পড়ল তানভী কে দেখে রাখী রায়চৌধুরী অরফে আর্ভিকের মা তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
তানভীকে তিনি শেষ দেখেছিলেন যখন তানভীর ৮ বছর বয়স ছিল। এতগুলো বছরে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে, ছোট ৮ বছরের মেয়েটাও আজ ১৬ বছরের হয়েগেছে। নিজের মেয়ের মৃত্যুর একবছরের পর মৃত মেয়ের জন্মেদিনের দিনই তানভীর জন্ম হয়। আর্ভিকের মা তানভী কে প্রচন্ড ভালোবাসেন, তাকে নিজের হারিয়ে ফেলা সেই মেয়ে মনে করেন। তানভী কে ছোট থেকে আর্ভিকের মা কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছেন।
তানভী যখন চৌধুরী নিবাসে আসা বন্ধ করে দেয় তখন তিনি প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, ছোট তানভী তখন অত বোঝেনি। কিন্তু এখন এসব মনে পড়লে অপরাধ বোধে মাটিতে যেন মিশে যায় সে। তানভী এবার আর্ভিকের মা কে বলল
-“বড়মা, কেমন আছো?”
এত গুলো বছর পর বড়মা ডাকটা শুনে তানভীকে আরও শক্ত ভাবে জড়িয়ে ধরেন তিনি, তারপর বলেন-
-“ভালো আছি গুল্লু , এতগুলো বছরে কী একটাবারও আমায় মনে পড়েনি তোর? এতটা কী পর হয়ে গিয়েছি…তোর কাছে..!?”
-“না বড়মা এমন বলো না, এই দ্যাখো এবার থেকে তুমি যখন বলবে আমি তখনই চলে আসব।”
এরপর সবাই ভিতরে চলে যায়,
কিছুক্ষন পর আর্ভিকের মা দেখলেন ঋষি তৈরী হয়ে কোথাও যাওয়ার জন্য সিঁড়ি দিয়ে নামছে।
-“ঋষি..কোথায় যাচ্ছিস এত তৈরী হয়ে?”
-“ভাইয়াকে এয়ারপোর্ট থেকে আনতে যাচ্ছি মা।”
-“ওও… সাবধানে যা বাবা।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
এয়ারপোর্টে পৌঁছে ঋষি দুর থেকে তার ভাইয়াকে দেখে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে…। প্রায় ৯ বছর পর ভাইয়াকে সামনাসামনি দেখল সে। ছোট বেলায় ঋষির সমস্ত আবদারের জায়গা ছিল তার ভাইয়া । দুজনের বয়সের পার্থক্য মাত্র ২বছরের। ঋষি আর আর্ভিক ভাই কম best friend বেশী। একে অপরের প্রাণ যেন এক সুতোয় বাঁধা।
আর্ভিকের উচ্চতা ৬’১ ইঞ্চি, শ্যামবর্ণের সুঠামদেহী যুবক, গাল ভর্তি হালকা চাপ দাড়ি Wolf Cut hair cut করা, পরনে তার হালকা আকাশি রঙের একটা শার্ট ও কালো ফর্মাল প্যান্ট; শার্ট ইন করে পরা ও হাতা গোটানো, হাতে ঘড়ি, পায়ে বুট পরা। তাকে দেখে এক কথায় সুদর্শন পুরুষ বলা যায়।
-“কেমন আছো ভাইয়া..?”
-“ভালো। অনেক ক্লান্ত লাগছে…চল আগে বাড়িতে যাই।”
এয়ারপোর্ট থেকে আর্ভিক কে সাথে নিয়ে গাড়িতে উঠল ঋষি।
কলকাতা শহরের বড় বড় অট্টালিকা পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে আর্ভিকদের গাড়ি , ড্রাইভিং সিটে ঋষি বসে আর তার ঠিক পাশের সিটে আর্ভিক বসে। কিছুটা এগোনোর পর তাদের গাড়ি যানজটে আটকা পড়ে। ঋষি বিরক্তি নিয়ে বলে
– “সিট! এটা কি এখনি হতে হল।”
আর্ভিক এতক্ষণ ফোনে কাজ করছিল , হঠাৎ সে মুখ তুলে বাইরে তাকাল। তার কিছু একটা মনে হতেই সে ঋষি কে বলল
– “আমি একটু আসছি”
ঋষি শুধু মাথা দোলালো। ১০ মিনিট পর আর্ভিক ফিরে এলো, হাতে কালো প্লাস্টিক ছিল। এতক্ষণে যানজট কেটে গেছে, আর্ভিক গাড়িতে বসে ঋষি কে বলল
-“চল”
ঋষি কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল প্লাস্টিকটার দিকে, তারপর আর্ভিককে বলল
-” ভাইয়া কী আছে এতে ? ”
-“আমার পার্সোনাল জিনিস।”
-” আমি কী দেখতে পারি ভাইয়া?”
আর্ভিক কথাটা এড়িয়ে বলে
-“গাড়ি চালানোর দিকে মনোযোগ দে। গাড়ি চালানোর সময় এত কথা বলতে নেই”
ঋষি মন খারাপ করে গাড়ি চালানোয় মনোযোগ দিল।
সোফায় গা এলিয়ে বসে আছে আর্ভিক, সবাইয়ের সাথে নানা গল্পে ব্যস্ত, বিদেশ থেকে আনা উপহার গুলো সবাই কে দিতে থাকে, তারপর একটা ব্যাগ রাখীচৌধুরির হাতে দিয়ে বলে-
_”মা এটা তোমার ওই আদরের মেয়ের জন্য,দিয়েদিও।”
-“তুই এনেছিস যখন তুই দে নিজ হাতে দেনা বাবা।
-“আমার অনেক কাজ আছে, আমি গেলাম, আমার রুমটা পরিস্কার আছে তো?”
মায়ের কথাটা না শোনার মত শুনে, সে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে চলে গেল, ওপরে গিয়ে নিজের রুমে যাবে এমন সময় তানভী-র সাথে ধাক্কা লাগে তার । তানভী চোখ তুলে তাকাতেই সে দেখে আর্ভিক অগ্নিদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে, তৎক্ষণাৎ তানভী চোখ নামিয়ে নিল এরপর ভয়ে ভয়ে বলল –
-“সরি ভাইয়া”
সেটা শুনে আর্ভিকের রাগ মাথায় চড়ে যায়, সে মনে মনে বলে- ইচ্ছা করছে থাপ্পড় মেরে সবকটা দাঁত ফেলেদি, তাহলে যদি এই ‘ভাইয়া’ শব্দটা মুখ থেকে যায়।
মনে মনে বললেও মুখে কিছু বলে না আর্ভিক। চুপচাপ নিজেরে রুমে চলে যায়, তারপর জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়, কিছুক্ষন পর ফ্রেশ হয়ে বাইরে এল, তখন তার নজর পরে আসার সময় কিনে আনা কালো প্লাস্টিকটার দিকে আনমনে হেসে ফেলে সে।
বিকাল বেলা তোজো বায়না করছে ঘুরতে যাবে বলে, ঋষিকে ওর মা বলল ঘুরিয়ে আনার জন্যে।তোজো, ঋষি নীচে অপেক্ষা করছিল তানভীর জন্য,তানভী রেডি হতে গেছে, হঠাৎ তার চোখ পড়ল ড্রেসিং টেবিলে ওপর একটা কালো প্লাস্টিকের ওপর প্লাস্টিকের তলায় একটা সাদা চিরকুট মতো কিছু একটা ছিল, তানভী চিরকুট টা নিলো তাতে লেখাছিল-
-“এই যে শুভ্রপরী, ফাঁকা হাতে বড্ড বেমানান লাগে আপনাকে, তাই এই সামান্য কয়টা চুড়ি রইল আপনার জন্য।”
তানভী -এবার কালো প্লাস্টিকটা খুলল সেখানে অনেক রকমের চুড়ি ছিল, সে দেখে তো পুরোই অবাক, তারপর ভাবতে থাকে এগুলো কে রেখে গেল, আগে যখন রুমে এসেছিল তখন তো ছিল না, আর তার এই রুমে তেমন সচর আচর কেউ তো আসে না।
চৌধুরি নিবাসের সবকিছুতেই আর্ভিকের মা তানভীকে জড়িয়ে রেখেছেন; তার জন্য একটা আলাদা personal Room-ও আছে, রুমটা আর্ভিক আর ঋষির রুমের মাঝে। তানভীর ভাবনার মাঝে ঋষি নীচে থেকে ডাকে তাড়াতাড়ি আসার জন্য, তানভী একজোড়া চুড়ি পড়ে বাকি গুলো সযত্নে গুছিয়ে রাখল। তারপর আস্তে আস্তে নীচে নেমে এল।
তানভী নীচে এসে ঋষিকে বলল-
-“ভাইয়া চলো।”
আর্ভিক ও সেই মুহূর্তে বাড়ি সদর দরজায় এসে উপস্থিত হল, সে তার বন্ধুদের আথে আড্ডা দিতে গিয়েছিল, আর্ভিকের নজর যায় তানভীর দিকে; তানভীকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত একনজর পর্যবেক্ষন করল,
তানভী আজ একটা লাল রঙের গ্রাউন পড়েছে, হাতে লাল চুড়ি, চুল গুলো সুন্দর করে বেনী করা, কাজল দিয়ে সুন্দর করে চোখ এঁকেছে ঠোঁটে হালকা lipstick।
আর্ভিক এসে সোফায় বসতে বসতে তার মা কে বলল
-“মা এক কাপ মালাই চা বানিয়ে দেবে ?”
আর্ভিকের মা রান্না ঘরে যেতে নিলে তানভীর মা বলেন
-“দিদি তুমি বসো, সিনুকে আমি চা করে দিচ্ছি”
এই বলে তিনি চলে গেলেন। ঋষি আর্ভিককে বলে
-“ভাইয়া, যাবে আমাদের সাথে ? ”
-“কোথায় যাচ্ছিস ? ”
ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ১
-“তোজো বায়না ধরেছে ঘুরতে যাওয়ার জন্য তাই ওদের কে নিয়ে যাচ্ছি। তুমি কী যাবে ?”
তানভী মনে মনে ভাবল, ইসস্! ঋষি ভাইয়া কেন এই রাবণটাকে সঙ্গে নিতে চাইছে। তানভীর মুখশ্রীতে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। আর্ভিক কিছুটা সময় নিয়ে বলল-
-“না, তোরা যা। আমার কাজ আছে।”
কথাটা শুনে যেন তানভী হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।
