Home ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫২

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫২

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫২
তানিশা ভট্টাচার্য্য

একমাস পর…..
গাড়ির কাঁচের ওপাশে বিকেলের নরম রোদের আভা এসে পড়েছে। আর্ভিক ড্রাইভ করছে, আর পাশে বসে তানভী নিজের ওড়না ঠিক করতে করতে বারবার আয়নায় মুখ দেখছে। গতকাল রাতে সোহাগের যমজ সন্তান হয়েছে এক ছেলে আর এক মেয়ে! খুশিতে তানভীর মনটা আজ ফুরফুরে।
-“আচ্ছা আর্ভিক, আপনি তো কাল রাতে হাসপাতালে ছিলেন বাচ্চা দুটো কার মতো হয়েছে বলুনতো? সোহাগ দিদির মতো নাকি প্রেম দাদার মতো?”
তানভী উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল। আর্ভিক এক হাতে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে বাঁকা চোখে তানভীর দিকে তাকালো। ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত দুষ্টু হাসি রেখে বলল

-“সেটা তো গিয়েই দেখবি। তবে আমার ভয় অন্য জায়গায়। বাচ্চা দুটো যদি তোর মতো অত কথা বলা শুরু করে।”
তানভী চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল
-“মানে? আমি কি খুব বেশি কথা বলি?”
-“বেশি না, শুধু যখন শুরু করিস তখন আর থামিস না।”
আর্ভিক হাসতে হাসতে বলল। তানভী রাগে লাল হয়ে গেল
-“আপনি না খুব খারাপ! আমি তো ভাবছিলাম বাচ্চা দুটোর জন্য সুন্দর দুটো নাম ঠিক করব।”
আর্ভিক গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল
-“আচ্ছা কী নাম রাখবি শুনি? উমমম…একটার নাম ‘জ্বালাতন’, আর অন্যটা ‘অশান্তি’। একদম তোর স্বভাবের সঙ্গে ম্যাচিং।”
কথার লড়াইয়ে আর্ভিকের সঙ্গে পেরে ওঠা দায়। তার ওপর ওর এই রোমান্টিক অথচ তীক্ষ্ণ রসিকতা তানভীকে বারবার নাজেহাল করে ছাড়ে। রাগে আর অভিমানে তানভী মুখ ফুলিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ ফিরে তাকিয়ে সজোরে বলে উঠল

-“আর্ভিক ভাই! বড়মা বলেছিল আপনি নাকি ছোটবেলায় অনেক ভালো ছিলেন, তাহলে বড় হয়ে এমন বিচ্ছু কেন তৈরি হয়েছেন?”
‘ভাই’ শব্দটা শুনতেই আর্ভিক ঝট করে গাড়ির স্পিড কমিয়ে দিল। ওর কণ্ঠস্বর বদলে গেল এক অদ্ভুত মাদকতায়। একটু গম্ভীর, অথচ গভীর সুরে বলল
-“এই! এখনো ‘ভাই’ ডাকছিস? তোকে আর্ভিক বলতে বলেছিলাম না! আর ছোটবেলার কথা বলছিস? তুই ওই গানটা শুনিস নি?”
তানভী ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল
-“কোন গানটা?”
আর্ভিক হঠাৎ তানভীর দিকে ঝুঁকে এল। ওর চোখের মনিতে তখন দুষ্টুমির ঝিলিক। গুনগুন করে গেয়ে উঠল
“vo dor tha bachapan ka,
ye dor jawani hai…”
বলেই আর্ভিক নিজের রসিকতায় নিজেই হো হো শব্দ করে হেসে উঠল। সেই হাসির দমকে গাড়ির ভেতরটা যেন এক নিমিষেই বসন্তের বাতাসে ভরে গেল। তানভী রাগ করতে গিয়েও পারল না, ওকেও হার মানতে হলো আর্ভিকের এই অদম্য প্রাণশক্তির কাছে। বিকেলের রোদে হাসিতে ঝলমল করতে করতে ওরা এগিয়ে চলল নতুন প্রাণের ছোঁয়া পেতে।

বিকেলের শান্ত আকাশটা তখন আবির রাঙা। অভিক সাহেবের ড্রয়িংরুমে আজ এক বিশেষ আড্ডার আসর বসেছে। রুদ্র বাবু এসেছেন তানভী আর আর্ভিকের চার হাত এক করার প্রস্তাব নিয়ে। দুই বন্ধুর শৈশব আর যৌবনের বন্ধুত্ব আজ এক নতুন আত্মীয়তার মোহনায় এসে দাঁড়িয়েছে।
রাখী রায়চৌধুরী চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে এলেন। টুংটাং শব্দে টি-টেবিলের ওপর চায়ের কাপগুলো সাজিয়ে রাখতে রাখতে তিনি একটু চিন্তিত স্বরে বললেন
-“সবই তো ঠিক আছে দাদা, কিন্তু গুল্লুর তো কলেজের পরীক্ষা সামনে।”
অভিক সাহেব নিজের চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে হোহো করে হেসে বললেন
-“আরে গিন্নি, পরীক্ষা তো সামনের সপ্তাহে, আর সেটা তো কদিনেই শেষ হয়ে যাবে। তাছাড়া বিয়েটা তো আর কালই হচ্ছে না, সেটা হবে আমাদের মামনির পরীক্ষা মিটে গেলে।”
রুদ্র বাবু একগাল হেসে সায় দিলেন। ওনার চোখেমুখেও এখন হবু বেয়াই হওয়ার তৃপ্তি। তিনি অভিক সাহেবের কাঁধে হাত রেখে বললেন

-“একদম ঠিক কথা অভিক। দুই ছেলে-মেয়ে যখন একে অপরকে মন দিয়ে ফেলেছে, ভালোবেসে ফেলেছে, তখন আমরা বড়রা আর মাঝখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে দেরি করে কী লাভ? শুভ কাজে দেরি না করাই ভালো।”
রাখী রায়চৌধুরীর অবশ্য একটু খুঁতখুঁত করছিলেন। পকোড়ার প্লেটটা এগিয়ে দিয়ে তিনি বললেন
-“কিন্তু গুল্লুর তো অনেক স্বপ্ন, ওর ক্যারিয়ারের কী হবে?”
এবার অভিক সাহেব স্ত্রীর হাতটা ধরলেন। স্নিগ্ধ স্বরে বললেন
-“আরে বিয়ের পর কি ওর ক্যারিয়ারের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে নাকি? ও এখন যেমন আছে, বিয়ের পরও ঠিক তেমনই থাকবে। আর্ভিক তো ওকে সব কাজে সাপোর্ট করবেই, আমরাও ওর পাশে থাকব।”
চায়ের সুবাস আর বিকেলের মায়াবী আলোয় ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা যেন এক কাঙ্ক্ষিত পূর্ণতার দিকে মোড় নিল। রুদ্র বাবু আর অভিক সাহেব তখন হারিয়ে গেলেন তাদের পুরনো দিনের স্মৃতিচারণায়, আর রাখী রায়চৌধুরী মনে মনে তানভীর বিয়ের লাল বেনারসির আল্পনা আঁকতে শুরু করলেন। আড্ডাটা আরও জমে উঠল—হাসি, আনন্দ আর আগামীর এক সুন্দর পরিকল্পনায়।

হাসপাতালের কেবিনে বিকেলের ম্লান আলো জানলা দিয়ে এসে পড়েছে সোহাগের বিছানায়। এক শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশ। সোহাগের পাশেই একটা ছোট্ট টুলে বসে আছে তানভী। ওর কোলে সোহাগের ছেলে, আর সোহাগের কোল ঘেঁষে ঘুমাচ্ছে ওর মেয়ে। ছেলেটা হয়েছে একদম প্রেমের মতো, আর মেয়েটা পেয়েছে সোহাগের আদল। তানভী মুগ্ধ নয়নে বাচ্চা দুটোর দিকে তাকিয়ে আছে, পরম মমতায় বারবার ওদের কপালে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
দরজার একপাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে এই দৃশ্যটা দেখছিল আর্ভিক। তানভীর চোখে-মুখে আজ এক অদ্ভুত মাতৃত্বের আভা লক্ষ্য করল সে। তানভীর চঞ্চলতা যেন আজ কোথায় হারিয়ে গিয়ে এক গভীর স্থৈর্যের রূপ নিয়েছে। আর্ভিক অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল; ওর বুকের ভেতর এক প্রশান্তির ঢেউ খেলে যাচ্ছে। ঠিক সেই সময় প্রেম এসে আর্ভিকের পিঠে আলতো করে হাত রেখে বলল

-“কিরে ভাই, এভাবে কী দেখছিস?”
আর্ভিক গভীর স্বরে উত্তর দিল
-“জানিস প্রেম, আমি তানভীর মধ্যে আজ অন্য এক রূপ দেখছি। সেই ছোট্ট কিশোরী তানভী যেন হঠাৎ করেই এক পরিপূর্ণ নারীতে পরিণত হয়েছে। ওর এই মমতাময়ী রূপটা দেখে আমার ভেতরটা এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে যাচ্ছে।”
কথাটা শুনে প্রেম এক তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে আর্ভিকের কথায় তাল মিলিয়ে হাসল। সোহাগ তখন আস্তে আস্তে উঠে বসল। তানভী ধীর পায়ে সোহাগের কাছে এগিয়ে গিয়ে ওর কোল থেকে ছেলেটাকে নামিয়ে রাখল। সোহাগ মৃদু হেসে বলল

-“আরে তানভী, তুমি তো দেখছি জাদুকর! এখনই ছেলেটাকে ঘুম পাড়িয়ে দিলে। আমি কখন থেকে চেষ্টা করছিলাম কিন্তু ঘুমাচ্ছিলই না।?”
তানভী শুধু এক চিলতে মুচকি হাসি উপহার দিল। তার সেই হাসিতে যেন একরাশ স্নিগ্ধতা মিশে ছিল। প্রেম এবার তানভীর উদ্দেশ্যে বলল
-“আচ্ছা তানভী, এই বাবু দুটোর কী নাম দেওয়া যায় বলোতো? আমার তো মাথায় কিছুই আসছে না। তুমিই এদের নাম ঠিক করে দাও।”
তানভী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ও শান্ত দৃষ্টিতে একবার ঘুমন্ত ছেলেটার দিকে আর একবার মেয়েটার দিকে তাকাল। যেন ওদের মুখের আদলেই ও নাম খুঁজে বেড়াচ্ছে। তারপর মুখে এক স্বর্গীয় হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল

-“প্রীত আর সোহিনী।”
নাম দুটো শোনামাত্রই ঘরজুড়ে এক খুশির লহর বয়ে গেল। সোহাগ আর প্রেম একে অপরের দিকে তাকাল; তাদের চোখেমুখে প্রবল ভালো লাগার ছাপ। প্রেম উৎসাহিত হয়ে বলে উঠল
-“প্রীত আর সোহিনী! জাস্ট অসাধারণ!”
আর্ভিকও তানভীর দেওয়া এই নামের দারুণ প্রশংসা করতে শুরু করল। রুচি আর আভিজাত্যে মাখা এই নাম দুটো যেন সেই মুহূর্তের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিল।
কিছুক্ষণ পর তানভী আর আর্ভিক বিদায় জানাল প্রেম আর সোহাগকে। করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পার্কিং লটে পৌঁছাতেই তানভী চাবির গুচ্ছটা নিজের আঙুলে নাচিয়ে একগাল হেসে বলল
-“আর্ভিক, আপনি এবার বসুন। এবার আমি ড্রাইভ করব।”
আর্ভিক ভ্রু নাচিয়ে একটু অবাক হওয়ার ভান করল। আসলে তানভীকে ড্রাইভ করা তো আর্ভিকই শিখিয়েছে, তাই তানভীর আত্মবিশ্বাসের ওপর পূর্ণ ভরসা আছে আর্ভিকের। মৃদু হেসে আর্ভিক বলল
-“আচ্ছা ঠিক আছে, রানী সাহেবা”

গাড়ি স্টার্ট দিল তানভী। বিকেলের রোদ ততক্ষণে মিলিয়ে গিয়ে সন্ধ্যার ধূসর অন্ধকার নামতে শুরু করেছে শহরের রাস্তায়। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় রাস্তাটা যেন ভিজে পিচের এক দীর্ঘ নদী। তানভী বেশ সাবলীলভাবেই গাড়ি চালাচ্ছিল, কিন্তু মাইল দুয়েক যাওয়ার পর হঠাৎ করেই একটা হ্যাঁচকা টানে ও ব্রেক কষল। রাস্তার মাঝপথেই থমকে দাঁড়াল গাড়িটা। আর্ভিক কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে ভ্রু কুঁচকে তানভীর দিকে তাকাল
-“কিরে, কী হলো? হুট করে গাড়ি থামালি কেন?”
তানভী মুখে কিছু বলল না। ও শুধু চোখের ইশারায় সোজা সামনের দিকে তাকাতে বলল। আর্ভিক সামনের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। হেডলাইটের তীব্র সাদা আলোয় দেখা গেল, এক বৃদ্ধ রাস্তার ধারে তার পুরনো সাইকেলটা নিয়ে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। সাইকেলের চেইনটা পড়ে গেছে, আর এই অন্ধকারে হাতড়িয়ে সেটা লাগাতে উনার বেশ কষ্ট হচ্ছিল। তানভীদের গাড়ির আলোতেই তিনি সেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন।
আর্ভিক মুহূর্তেই তানভীর মনের ভাবটা বুঝে নিল। ও তানভীর দিকে তাকিয়ে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি হাসল,যে হাসিতে ছিল তানভীর প্রতি প্রশংসা। আর্ভিক ধীরস্বরে বলল

-“তুই গাড়িতে বোস। আমি আসছি ওনাকে একটু সাহায্য করে।”
তানভীও শান্তভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। কিছুক্ষণ পর চেইন ঠিক করে দিয়ে আর্ভিক ফিরে এল, গাড়ির দরজা খুলে সিটে বসতেই দেখল, সেই বৃদ্ধ লোকটি কৃতজ্ঞতাভরা চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি হাত তুলে এক অদ্ভুত ভঙ্গিতে ধন্যবাদ জানানোর চেষ্টা করলেন। আর্ভিক জানালার কাঁচ নামিয়ে মুখ বাড়িয়ে উঁচু গলায় বলল
-“ঠিক আছে তো কাকা? এবার একটু সাবধানে যাবেন।”
বৃদ্ধ লোকটি একগাল প্রশান্তির হাসি হেসে মাথা নাড়িয়ে চলে গেলেন। অন্ধকারের বুক চিরে তার সাইকেলের প্যাডেলের শব্দটা মিলিয়ে যেতেই তানভী আবার গাড়ি স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনের মৃদু গুঞ্জনের মাঝে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা, যা শব্দের চেয়েও অনেক বেশি কথা বলছিল। তানভী স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে ভাবছিল, মানুষটার রূপের চেয়েও গুণটা কত বেশি দামী। আর আর্ভিক সিটে হেলান দিয়ে ভাবছিল, তানভীর এই তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ আর পরোপকারী মনটাই তাকে বারবার প্রেমে পড়তে বাধ্য করে।

একদিকে যখন উৎসবের আলো জ্বলে ওঠার আয়োজন চলছিল, ঠিক তখনই এক কালো মেঘ বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো আর্ভিক আর তানভীর সাজানো স্বপ্নে আঘাত হানল। রুদ্র বাবু তখনও বিদায় নেননি; তিনি অপেক্ষা করছিলেন তাঁর আদরের মেয়ে আর হবু জামাইয়ের জন্য। বাড়ির সদর দরজায় যখন আর্ভিকের গাড়িটা এসে থামল, তখন কেউই জানত না এই সন্ধ্যাই তাদের জীবনের দীর্ঘতম অন্ধকারে পরিণত হতে যাচ্ছে।
গাড়ি পার্ক করে ভেতরে আসতেই তানভী প্রজাপতির মতো উড়ে গিয়ে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরল। রুদ্র বাবুর চোখে তখন প্রশান্তি। আর্ভিকও সপ্রতিভ ভঙ্গিতে সবার সাথে কুশল বিনিময় করল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে আর্ভিকের পকেটে রাখা ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে একটা বিশেষ নাম দেখে আর্ভিকের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে সবার অলক্ষ্যে ফোনটা বের করে এক অদ্ভুত সতর্কতায় চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে দ্রুত পায়ে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল। রুদ্র বাবু তানভীর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন

-“মামনি, আমার এবার যেতে হবে। তবে যাওয়ার আগে আর্ভিকের সাথে একটু জরুরি কথা আছে। ও মনে হয় উপরে গেল, আমি একটু ওর রুম থেকে আসছি।”
অন্যদিকে, নিজের ঘরের বদ্ধ দুয়ারের ওপাশে আর্ভিক তখন এক ভিন্ন মানুষ। ফোনের ওপাশে থাকা তার দলের লোকটিকে সে কঠোর স্বরে নির্দেশ দিচ্ছিল
-“সবকিছু রেডি করো। এই মাফিয়া কিং এভি রয়-এর হাত থেকে বেঁচে ও পালাবে কোথায়?”
ঠিক সেই মুহূর্তে রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্র বাবুর পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। আর্ভিকের বলা শেষ বাক্যটি তাঁর কানে বিষের মতো বিঁধল। তিনি রাগে ফেটে পড়ে গর্জে উঠলেন
-“আর্ভিক!”
আর্ভিক চমকে পেছনে ফিরল। রুদ্র বাবুর রক্তবর্ণ চোখ আর থমথমে মুখ দেখে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে থতমত খেয়ে আমতা আমতা করে বলল
-“আঙ্কেল, আসলে…”
কিন্তু রুদ্র বাবু তাকে কথা শেষ করার সুযোগটুকুও দিলেন না। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ঘৃণা আর বিশ্বাসঘাতকতার জ্বালায় তিনি আর্ভিকের গালে সজোরে একটা চড় কষিয়ে দিলেন। ঘরে তখন পিনপতন নীরবতা। রুদ্র বাবু চিৎকার করে বললেন

-“তোমার মতো বিশ্বাসঘাতকের কাছে আমি আমার মেয়েকে দেবো না! যার নিজের জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই, সে আমার মেয়ের জীবনকে কীভাবে রক্ষা করবে? আর্ভিক, তুমি ভুলে যাও আমার মেয়েকে! আজ আমি এসেছিলাম তোমাদের বিয়ের কথা বলতে, কিন্তু সেই আলোচনা আজ এখানেই শেষ। আজ থেকে তোমাদের সাথে আমাদের আর কোনো সম্পর্ক নেই।”
আর্ভিক মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সে জানত রুদ্র বাবুর এই রাগের কারণ। এই মাফিয়া জগতের অন্ধকার খেলায় রুদ্র বাবু একদা তাঁর নিজের পরিবার কে হারিয়েছিলেন। সেই স্মৃতিই আজ আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়েছে।
রুদ্র বাবু আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। হনহন করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে সোজা তানভীর হাত ধরলেন। কোনো কথা না বলে তাকে টানতে টানতে বাইরের দিকে নিয়ে যেতে লাগলেন। বাড়ির সবাই,অভিক সাহেব, রাখী রায়চৌধুরী, ঋষি—সবাই হতভম্ব। অভিক সাহেব ছুটে এসে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেন
-“আরে রুদ্র, কী হলো? মামনি কে এভাবে কেন নিয়ে যাচ্ছিস? আর হুট করে এভাবে রেগে গেলি কেন?”
রুদ্র বাবু থামলেন। তারপর বজ্রকণ্ঠে সবার সামনে ফাঁস করে দিলেন আর্ভিকের সেই অন্ধকার জগতের গোপন খবর। নিজের ছেলের এমন ভয়ঙ্কর পরিচয়ের কথা শুনে অভিক সাহেব আর রাখী রায়চৌধুরী যেন পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলেন। ততক্ষণে আর্ভিক টলতে টলতে নিচে নেমে এসেছে। রুদ্র বাবু যাওয়ার আগে অভিক সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন

-“অভিক, আমাকে ক্ষমা করিস। আমি আমার মেয়েকে তোর ছেলের হাতে তুলে দিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারব না।”
কথাটা শুনে তানভীর বুকটা যেন সহস্র টুকরো হয়ে গেল। সে কান্নায় ভেঙে পড়ে শুধু বলল
-“বাবা!”
কিন্তু রুদ্র বাবু আজ পাথরের চেয়েও শক্ত। তিনি কারোর কোনো আর্তনাদে কান দিলেন না। তানভীকে টানতে টানতে গাড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগলেন। অসহায় তানভী অশ্রুভেজা চোখে বারবার পেছন ফিরে আর্ভিকের দিকে তাকাচ্ছিল।
আর্ভিক আর স্থির থাকতে পারল না। সে ছুটে গিয়ে রুদ্র বাবুর পা জড়িয়ে ধরল। মেঝের ধুলোয় লুটিয়ে পড়ে সে আর্তনাদ করে বলল
-“আঙ্কেল, প্লিজ এমনটা করবেন না! আমি ওকে ছাড়া থাকতে পারব না। প্লিজ…”
রুদ্র বাবু ওনার পা ছাড়িয়ে নিতে নিতে কঠোর কণ্ঠে বললেন
-“পা ছাড়ো আর্ভিক! এটাই আমার শেষ কথা।”
গাড়ি স্টার্ট নিল। আর্ভিক তখন রাস্তার মাঝখানে অসহায়ের মতো বসে হাহাকার করছে
-“তানভী, ফিরে আয়! আঙ্কেল, ওকে নিয়ে গিয়ে আমাকে এমন মৃত্যুযন্ত্রণা দেবেন না। তানভী আমার না হলে আমি মরে যাব!”
গাড়ির ভেতরে বসে তানভীও কাঁচের ওপাশে হাত বাড়িয়ে চিৎকার করছিল

-“বাবা, আমি আর্ভিকের কাছে যাব! বাবা, প্লিজ আমাকে ছেড়ে দাও! আমি ওনাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না!”
রুদ্র বাবু ধমকের সুরে বললেন।
-“চুপ করো! ওই ছেলের কথা ভুলে যাও। ওর থেকেও ভালো ছেলের সাথে তোমার বিয়ে দেবো।”
বিকেলের সেই রঙিন স্বপ্ন ম্লান হয়ে অন্ধকার রাতে ডুবে গেল।আর্ভিকের কান্নায় রাতের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল, কিন্তু নিয়তির চাকা ততক্ষণে তাদের বিচ্ছেদের পথে অনেকটা দূরে চলে গেছে।
ধুলোয় মিশে থাকা আর্ভিকের আকাশভেদী হাহাকারে ওই নিস্তব্ধ রাত যেন কেঁপে উঠছে। ছেলের এই বিধ্বস্ত দশা দেখে অভিক সাহেবের বুকটা ফেটে যাচ্ছে। তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে আর্ভিকের পাশে বসলেন, পরম মমতায় ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন। আর্ভিক যেন এক ডুবন্ত মানুষ, খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো করে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল।

-“বাবা! ও বাবা! আমার তানভীকে নিয়ে গেল! তুমি তো জানো ও আমার নিঃশ্বাস। তুমি ওকে এনে দাও না বাবা, প্লিজ ওকে ফিরিয়ে আনো!”
আর্ভিকের কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে এল। ছেলের এই আর্তনাদ অভিক সাহেবের হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধল। তিনি আর্ভিকের দুই বাহু শক্ত করে ধরে তাকে নিজের মুখোমুখি করলেন। তার চোখে তখন ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা। গম্ভীর ও তেজস্বী কণ্ঠে তিনি বললেন
-“আর্ভিক, উঠে দাঁড়াও! কান্নায় ভালোবাসা ফেরে না, ভালোবাসা ফেরাতে হয় পৌরুষ আর সাহসে। মনে রেখো, তোমার জেঠুমণি আর বড়মা চলে যাওয়ার আগে তানভীকে তোমার হাতে সঁপে দিয়ে গিয়েছিলেন। তাই এই পৃথিবীতে যদি তানভীর ওপর কারো সবচেয়ে বেশি অধিকার থাকে, তবে সেটা তোমার। নিজের অধিকার ছিনিয়ে নিতে শেখো আর্ভিক। কাপুরুষের মতো বসে বসে হাহাকার করা তোমার সাজে না। যাও, নিজের ভালোবাসাকে জয় করে নিয়ে এসো। যাও, বিজয়ীর বেশে ফিরে এসো!”

পিতার সেই অগ্নিঝরা কথাগুলো আর্ভিকের শিরায় শিরায় লাভার মতো বয়ে গেল। চোখের জল মুছে সে উঠে দাঁড়াল। তার দৃষ্টিতে এখন আর হাহাকার নেই, আছে লক্ষ্যভেদী সংকল্প। সে বজ্রকণ্ঠে বলল
-“হ্যাঁ বাবা, আমি ফিরিয়ে আনব আমার ভালোবাসাকে। কেউ ওকে আমার থেকে দূরে রাখতে পারবে না।”
কথাটা শেষ করেই আর্ভিক উল্কার বেগে বেরিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই গ্যারেজ থেকে গাড়ির স্টার্ট নেওয়ার গর্জন শোনা গেল, আর টায়ারের তীব্র ঘর্ষণে ধুলো উড়িয়ে সে ছুটে চলল তানভীদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।
আর্ভিক চলে যেতেই রাখী রায়চৌধুরী ত্রস্ত পায়ে স্বামীর সামনে এসে দাঁড়ালেন। শংকিত গলায় বললেন
-“এ তুমি কী করলে? ছেলেটাকে শান্ত করার বদলে এভাবে উসকে দিলে? তুমি জানো না রুদ্র দাদা কতটা রেগে আছেন?”
অভিক সাহেব জানালার ওপাশে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললেন,

-“নিজের ভালোবাসাকে আগলে রাখতে হলে মাঝে মাঝে বিদ্রোহী হতে হয়। নিজের ভালোবাসাকে জয় করতে হলে হৃদয়ে একটু আগুনের দরকার হয়। অনেকে বলে ভালোবাসার মানুষের সুখের জন্য তাকে ছেড়ে দেওয়া মহত্ত্ব, কিন্তু আমি বলি—সারা দুনিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের মানুষকে নিজের করে আগলে রাখাটাই হলো আসল ভালোবাসা। রুদ্রর রেগে যাওয়াটা স্বাভাবিক কিন্তু আমাদের ছেলে হারতে শেখেনি, ও জিততে শিখেছে। আমি জানি ও ঠিক পারবে তানভীকে ফিরিয়ে আনতে।”
খানিকটা থেমে তিনি স্ত্রীর দিকে ফিরলেন। এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫১

-“আর ওর মাফিয়া হওয়ার কথা…ওটা আমি অনেকদিন আগেই জানতে পেরেছিলাম। শুধু আমি নই, ঋষিও সবটা জানে।”
রাখী রায়চৌধুরী আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি বিস্ময়ে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ঋষির দিকে তাকালেন। ঋষি অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে রইল। রাখী রায়চৌধুরী বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। ওনার মনে হলো চারপাশের চেনা জগৎটা মুহূর্তেই বদলে গেছে। তিনি শুধু ওপরের দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করে অস্ফুট স্বরে বললেন
-“হে ভগবান, আমার ছেলেটাকে তুমি রক্ষা করো। ওকে আর গুল্লু কে তুমি বিপদমুক্ত রেখো।”

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৩