মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১৩
jannatul firdaus mithila
তুলোর ন্যায় নরম বিছানায় শুয়ে থাকায় মনে হচ্ছে ভারী শরীরটা বুঝি হাওয়ায় ভাসছে। অসারতায় ডুবে থাকা হাত-পা গুলো কেমন নড়চড়বিহীন পড়ে আছে। চোখদুটো বুঁজে থাকলেও মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে সজাগ হচ্ছে মাহিরার। এক-আধটু টের পাচ্ছে পায়ের পাতায় কারো শীতল হাতের স্পর্শ। ধীরে ধীরে সেই স্পর্শ গাঢ় হচ্ছে! পায়ের পাতা ছেড়ে দিয়ে উঠে আসছে টাখনু বরাবর। মুহুর্তেই সম্পূর্ণ সজাগ হলো মাহি। পায়ে ওমন শিরশিরে পরশ অনুভুত হতেই শোয়া ছেড়ে লাফিয়ে উঠে মেয়েটা। ভয়ার্ত ঢোক গিলে সম্মুখে তাকাতেই দেখে — মেইডেন ইরা কেমন ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে তার পানে। মাহি ভড়কায়! সময় নিয়ে নিজেকে সামলে সন্দিহান গলায় আওড়ায়,
“ আপনি? এখানে?”
মেইডেন কথা বলতে পারছেন না কেন যেন। তার হয়ে তার চোখদুটো বোধহয় কথা বলছে আজ। জানাচ্ছে — মাহির কষ্টে তিনিও কষ্ট পাচ্ছেন। মাহি কিয়তক্ষন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মধ্যবয়সীর আঁধারে ছেয়ে থাকা মুখপানে। ঠোঁট নাড়িয়ে ফের কিছু বলতেই যাবে ওমনি ঘটে গেল এক অতর্কিত ঘটনা। মেইডেন কেমন ছুটে এসে মেয়েটাকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরলেন আচমকা। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল মাহি। পাথরের ন্যায় বসে রইল কেবল। এদিকে মেইডেন কাঁদছেন! হু হু করে কাঁদছেন। এই কান্নায় নেই কোনো নাটকীয়তা। আছে কেবল বুকচেরা আর্তনাদ। মাহির বোধগম্য হচ্ছেনা মেইডেনের এহেন বাঁধহীন কান্নার কারণ। সময় যত পেরুচ্ছে, ততই যেন বেড়ে যাচ্ছে মেইডেনের কান্নার বেগ। মাহি আর পাথরের ন্যায় বসে থাকার মুরোদে রইল না। ধীরে ধীরে মেইডেনের পিঠের ওপর একহাত উঠিয়ে এনে আলগোছে রাখল সে। খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে বলতে লাগল,
“ কি হয়েছে আপনার মেইডেন? এভাবে কাঁদছেন কেনো?”
মেইডেন তৎক্ষনাৎ জবাব দিলেন না। অথচ মাহিকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরে, চোখদুটো বুঁজে কেমন পাগলের ন্যায় বিরবির করছেন,
“ মোয়া মামনি মারিয়া। মোয়া লিউবিমায়া দেভোচকা। মামা তেব্যা ওচেন লিউবিত।”
(আমার মামনী মারিয়া। আমার আদুরে মেয়ে, মা তোমাকে খুব ভালোবাসি মা।)
মাহির বোধগম্য হলোনা এহেন ভিনদেশি ভাষা। সে তৎপর হলো মেইডেনকে থামাতে। মেইডেনের পিঠের ওপর আলতো করে হাত বুলিয়ে নরম কন্ঠে বলছে,
“ কান্না থামান মেইডেন। হঠাৎ করে কি হলো আপনার?”
কথাটা শুনলেন মেইডেন। ত্বরিত নিজের উপচে পড়া আবেগগুলোকে দমালেন দক্ষতায়। রয়েসয়ে বড় একখানা ঢোক গিললেন, কান্নাগুলো গলার কাছে আঁটকে ফেলতে। অতঃপর ভীষণ চেষ্টায় নিজেকে কোনমতে সামলে নিয়ে মাহিকে ছাড়লেন। মাহি বেচারি ছাড়া পেয়ে তৎক্ষনাৎ বুক থেকে সরে এলো মেইডেনের। সন্দিগ্ধ দৃষ্টি তুলে তাকাতেই দেখল — মেইডেন কেমন হা করে তাকিয়ে আছে তার পানে। চোখে পলক পড়ছেনা মধ্যবয়সীর। মাহি খানিক অস্বস্তিতে পড়ল তার ওমন চাহনি দেখে। সামান্য ঢোক গিলে শুকনো কাঠ গলাটা কোনমতে ভিজিয়ে নিয়ে মুখ খুলল,
“ আপনি কী কিছু বলবেন মেইডেন?”
“ আমাকে ক্ষমা করে দাও।”
কথার পিঠে এহেন অপ্রাসঙ্গিক বাক্য বোধহয় সুবিধের ঠেকলোনা মাহির নিকট। মেয়েটার সন্দিগ্ধ মুখাবয়ব তো তাই বলছে। সে তৎক্ষনাৎ কপালে গোটাকতক সন্দেহের ভাঁজ টেনে গম্ভীর কন্ঠে আওড়ায়,
“ মানে? হঠাৎ ক্ষমার প্রসঙ্গ আসলো কোত্থেকে?”
মেইডেন স্মিত হাসলেন। প্রতিত্তোরে সঠিক জবাব না দিয়ে আলগোছে মাহির একহাত টেনে নিয়ে, ঠোঁট বসালেন হাতের উল্টো পিঠে। মনে মনে বললেন,
“ ভবিষ্যতে ক্ষমা চাওয়ার সময় পাব না ডিয়ার। কেননা তোমার আয়ুর স্থায়ীত্ব খুব বেশিদিন নেই!”
সোচি ক্যাসিনো অ্যান্ড রিসোর্ট! শহর থেকে বেশ দুরত্বে অবস্থিত ক্যাসিনোটি বাইরে থেকে দেখতে যতটা বিলাসবহুল, ভেতর থেকে দেখলে ততটাই গা ছমছমে রহস্যময়তায় বুদ! উক্ত ক্যাসিনোতে দিনের বেলা বিভিন্ন ধরনের বেটিং কিংবা জু/য়ার আসর বসলেও সন্ধ্যা হতে না হতেই ক্যাসিনোর সম্মুখ দুয়ার বন্ধ হয়ে যায় সাধারণের জন্য। তবে রাত যত গভীর হয়, উক্ত ক্যাসিনোতে বিভিন্ন গ্যাংস্টারের আসা -যাওয়া বোধহয় ততই বেড়ে যায়।
সোচি রিসোর্টের বেসমেন্ট! আলিশান কক্ষের ন্যায় জায়গাটিতে সাজিয়ে রাখা বড় একখানা গোলাকার টেবিল। টেবিলের ওপর সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা বিদেশি ইল্লিগ্যাল অ*স্ত্র। পাশেই স্তুপ জমিয়েছে সাদা কো/কেইন পাউডার। টেবিলের হেড অফ দা চেয়ার বাদ রেখে বাদবাকি চেয়ারে গোল হয়ে বসে আছে বেশকিছু নামী-দামী গ্যাংস্টার। আন্ডারওয়ার্ল্ডের কালো জগতে যাদের রয়েছে অবাধ বিচরণ। প্রত্যেকের চোখেমুখে অপেক্ষা পরিলক্ষিত! যেন সবাই বেশ আগ্রহ নিয়ে বসে আছে কারো আগমনের অপেক্ষায়। সময় গড়াচ্ছে, কক্ষে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের বিরক্তি বাড়ছে তরতর করে। তারা কী আর যেন-তেন মানুষ? শত হলেও গ্যাংস্টার বলে কথা! তাদের এভাবে ডেকে এনে অপেক্ষা করানোর মানে টা কি? তাদের সময়ের কি কোনো মূল্য নেই? কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই উপস্থিত গ্যাংস্টারদের মধ্য থেকে তক্ষুনি উঠে দাঁড়ায় বেনজামিন, স্পেনের মাউরো গ্যাংয়ের হেড। মধ্যবয়সী লোক! পেটটা ভারী উঁচু। মাথাভর্তি কোঁকড়ানো চুল, গায়ের রঙটা বেশ ময়লা। তিনি বসা ছেড়ে উঠেই কেমন চিড়বিড়ানো কন্ঠে বলে ওঠেন,
“ হোয়াট দা হেল ইজ দিস গোয়িং অন হিয়ার? কতক্ষণ যাবত বসে আছি আমরা! অথচ মনস্টারের আসার কোনো নামগন্ধও নেই! তিনি না এলে ডিল ফাইনাল হবে কিভাবে? জানব কিভাবে কে কয়টা কনটেইনার পাচ্ছি?”
বেনজামিনের কন্ঠে সে-কি তেজ! ভাষায় প্রয়োগ হয়েছে রূঢ়তা। বাদবাকি সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনলেন কথাটা, তবে গায়ে মাখলেন না কেউ। আশ্চর্য হলেও সত্যি কারো মুখেই তেমন কোনো বিরক্তির ভাঁজ নেই, যেমনটা আছে বেনজামিনের মুখাবয়বে। তাদের ভাব দেখে মনে হচ্ছে — তারা বুঝি এহেন অপেক্ষায় অভ্যস্ত। বেনজামিন চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সকলের মুখাবয়ব পরোখ করল একবার। কই সে ভাবল, এভাবে প্রতিবাদী আওয়াজ তুললে বাকিরা নিশ্চিত তার সঙ্গে সাই দিবে অথচ কান্ড দেখো! হলো এর উল্টো! বেনজামিন ভারী অপমানিত বোধ করল এবার। কপালের চামড়ায় ঝুলে থাকা বিরক্তির ছাপগুলো তার ধীরে ধীরে রুপান্তরিত হলো রাগে, ক্ষোভে। সে কেমন গজগজ করতে করতে চেয়ার ছেড়ে চলে যেতে উদ্যোত হলেই পেছন থেকে ভেসে আসে ভিক্টর তথা থাইল্যান্ডের মিয়ামি গ্যাংয়ের লিডারের দারাজ কন্ঠ!
“ প্রাণে বাঁচতে চাইলে আর এক-কদমও বাড়াবেন না বেনজামিন। কেননা এখানে আসার সিদ্ধান্তটা যার যার ইচ্ছেতে হলেও এখান থেকে বেরুনোর সিদ্ধান্তটা কেবল শ্যাডো মনস্টারের হাতেই থাকে। তাই অতিরিক্ত লাফালাফি না করে বসে পড়ুন।”
থামলেন বেনজামিন। ভাবুক হলেন পরমুহূর্তে! রাশিয়ার সবচেয়ে বড় ডিলার গ্যাং তথা রুশদীর সাথে যুক্ত হওয়ার পর এই প্রথম কোনো ডিলিংয়ে সরাসরি অংশ নিয়েছে বেনজামিন। জানেনা এই গ্যাংয়ের তথাকথিত অনেক রুলস। স্রেফ লোকমুখে শুনেছে এদের নাম, ডাক! মনের মধ্যে একরাশ কৌতুহল থাকা স্বত্বেও এখন অব্ধি শ্যাডো মনস্টার নামক ব্যাক্তিটিকে একটিবারের জন্যও দেখার সৌভাগ্য মিলেনি তার। এ নিয়ে বেচারা ভারী বিরক্ত! হতে চেয়েছিলেন মনস্টারের ফেবারিট, অথচ এখন দেখো!গুটি উল্টে গেল একমুহূর্তে। বেনজামিন কপট অতিষ্ঠ মুখে ফের চলে এলো নিজ আসনে। পরনের দামী কোটটার পেটের কাছের বোতামটা খুলে নিয়ে, আলগোছে বসল চেয়ারে। খানিকক্ষণ সাপের ন্যায় হুদাই ফোঁস ফোঁস করেও যখন দেখল স্বস্তি মিলছেনা, ঠিক তখনি বেচারা খানিকটা বেঁকে বসে পাশের জনকে চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“ কখন আসবে মনস্টার?”
ভিক্টর কোকেন হাতাচ্ছে। কখনো আবার প্যাকেট তুলে নাকের কাছে নিয়ে এসে ঘ্রাণ শুঁকছে জোরালোভাবে। তন্মধ্যে বেনজামিনের ওমন প্রশ্নের জবাবে শ্লেষাত্মক হাসল ভিক্টর। শ্লেষাত্মক কন্ঠে বলল,
“ যখন মনস্টারের মন চাইবে।”
উত্তরটা মনমতো হয়নি বেনজামিনের। লোকটা কেমন নাকমুখ কুঁচকে বসে রইলো নিজ জায়গায়। এরইমধ্যে কক্ষটিতে প্রবেশ করে বেশকিছু সশস্ত্র বডিগার্ড। প্রত্যেকেই ছুটে এসে ঘিরে ধরলেন পুরো কক্ষটি। সবার গায়ে একইরকম সাদা পোশাক! হাতে দামী দামী অস্ত্র। কক্ষে উপস্থিত সকলের নজর পড়ল দরজার দিকে। দেখল— ধীরে ধীরে একজোড়া ব্যুট পরিহিত পা গটগটিয়ে ঢুকছে ভেতরে। সবার দৃষ্টি ক্রমশ উপরে উঠল। কিয়তক্ষন বাদেই সবার চক্ষুগোচর হলো — মেজেন্টা রঙের স্যুট পরিহিত এক সুদর্শন যুবককে। যুবকের চোখেমুখে কুটিল হাসির রেশ স্পষ্ট! মাথার চুলগুলো ছোট ছোট কাট দেওয়া, গালটা আবৃত খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে। পরনের শার্টের উপরিভাগের বেশক’টি বোতাম খোলা। যুবক সবাইকে একপলক দেখেই বাঁকা হাসল। পাদু’টোর দাম্ভিক কদমে টেবিলের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে ভরাট কন্ঠে বলল,
“ হেই এভরিওয়ান! হোয়াটস আপ? ডিল এখনো ফাইনাল হয়নি?”
ভিক্টর ঠোঁট পিষে হাসল। পেছনের চেয়ারের হাতলে একহাত উঁচিয়ে রেখে বসল পরক্ষণে। রয়েসয়ে বলল,
“ নাহ! তোমার জন্যই ওয়েট করছিলাম।”
যুবক হুট করেই নিচের ঠোঁটখানা কামড়ে ধরল কেন যেন। পরমুহুর্তে নিজের আর্টিফিশিয়াল লেন্স পরিহিত চোখদুটো খানিক কুঁচকে তাকাল ভিক্টরের দিকে। সময় নিয়ে শুধালো,
“ মনস্টার কোথায়?”
ভিক্টর আগের ন্যায় হাসল। মাথাটা সামান্য কাত করে রহস্যময় কন্ঠে আওড়াল,
“ ওহ নিক! স্টপ দিস জোকারি! মনস্টার কোথায় সেটা আমরা না জানলেও তুমি ঠিকই জানো সেটা আমরা জানি। শত হলেও শ্যাডো মনস্টারের চিরশত্রু বলে কথা! তুমি তো তার খবর রাখবেই!”
নিক ক্রুর হাসল মনে হচ্ছে। চোখদুটো তীক্ষ্ণ করে নিয়ে, হাত দু’খানা গুঁজে দিলো প্যান্টের পকেটে। অতঃপর পাদু’টো সামান্য ফাঁক করে আরামে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল,
“ বাহ! তুমি দেখছি ইদানীং ব্রেন খাটাতে শিখে গিয়েছো ভিক্টর! যদিওবা ভুল বলোনি তুমি! এরজন্য অবশ্য তোমাকে একটা গিফট দেওয়া উচিত। উমমম… কি দেওয়া যায়?”
নিক ভাবুকের ন্যায় ঠোঁট উল্টালো। মাথাটা নুইয়ে রেখে ধীর পায়ে কদম বাড়ালো টেবিলের একপাশে। খানিকক্ষণ সময় নিয়ে ভাবল কিছু একটা। অতঃপর কেমন বাঁকা হেসে বাঁকা চোখে তাকালো ভিক্টরের পানে।চট করে বলে উঠল,
“ যাও..আজ পুরো রাতের জন্য আমার অস্ট্রেলিয়ান গার্লফ্রেন্ড তোমার। আই নো ইউ’ভ ওয়ান্টেড টু হুক আপ উইথ হার মেনি টাইমস, সো গো অন! আজ ও তোমার।”
হকচকিয়ে ওঠে ভিক্টর! কানে ভুল শুনল কি-না যাচাই করতে আচমকা বলে বসে,
“ হোয়াট?”
নিক ক্রুর হাসছে। পাদু’টো ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে ভিক্টরের কাছে। ভিক্টর হতবাক চোখে তাকিয়ে আছে এখনো। ততক্ষণে নিক এসে দাঁড়িয়েছে ভিক্টরের পেছনে। হালকা ঝুঁকে এসে নিকের কান বরাবর মুখ এনে দুষ্ট কন্ঠে বলল,
“ ইউ নো হোয়াট ভিক্টর? শি’স ঠু ওয়াইল্ড ইন বেড। আই থিংক ইউ’ড লাভ ইট!”
ভিক্টরের অপবিত্র মনটা বুঝি লাফাচ্ছে রীতিমতো। তার সারা মুখে ছড়িয়ে গিয়েছে কামুকতার ছাপ। নিকের অস্ট্রেলিয়ান গার্লফ্রেন্ডের প্রতি সে-ই কবে থেকে ঝোঁক ছিল তার। তবে আগ বাড়িয়ে কিছু বলার বা করার সাহস হয়ে উঠেনি কখনো। কিন্তু আজ যেহেতু যেচে পড়ে সুযোগ পেয়েছে, তাহলে শুধু শুধু এই সুযোগ হাতছাড়া করবে কেন শুনি? এদিকে এহেন প্রস্তাবে ভিক্টর যতটা খুশি হয়েছে, অন্য একটা মানুষ ঠিক ততটাই ক্রোধান্বিত হচ্ছে। টেবিলের একদম কর্নারের চেয়ারে মাথা নুইয়ে বসে থাকা আলেক্সান্ডার ক্রমান্বয়ে ফুঁসছে রাগে। সুশ্রী ফর্সা মুখাবয়বটা তার লাল হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। কেননা নিকের অস্ট্রেলিয়ান গার্লফ্রেন্ডটা যে আর কেউ নয় বরং তার স্ত্রী — মেরিন। একবার এক ডিল ফাইনাল করতে এসেছিল আলেক্সান্ডার সঙ্গে এসেছিল মেরিন। সেদিনই নিক দেখে ফেলে মেরিনকে। প্রথম প্রথম নিকের বিহেভিয়ার যথেষ্ট ক্যাজুয়াল থাকলেও পরবর্তীতে তার আচরণ হয়ে উঠে উম্মাদের ন্যায়। নিজের ক্ষমতাবলে আলেক্সান্ডারকে জোর করে আঁটকে রেখে তারই সামনে থেকে বেচারি মেরিনকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় নিক। আলেক্সান্ডার কতবার চেষ্টা করেছে নিজের স্ত্রীকে ছাড়িয়ে আনতে কিন্তু বরাবরই ব্যর্থ হয়েছে নিকের ক্ষমতার কাছে। এ ছেলে যে আস্ত বড় এক শয়তান! যেটাতে একবার নজর দেয়, সেটা নিজের নামে হাসিল না করা অব্ধি শান্ত থাকেনা। আলেক্সান্ডারের চোখদুটো ভরে যাচ্ছে ঘৃণার অশ্রুতে।৷ নিজ বেদনায় মত্ত থাকা বেচারা খেয়ালই করেনি তার পেছনে কখন যে নিক এসে দাঁড়িয়েছে! সে হঠাৎ শুনল নিকের দুষ্ট কন্ঠের টিটকারি!
“ বাই দা ওয়ে অ্যালেক্স! ইউ নো সামথিং? তোমার ওয়াইফ কিন্তু আমাকে দিয়ে ভারী প্লেসড! কজ তোমারটার তুলনায় আমারটার গর্জন তাকে বেশি কাঁদিয়েছে।”
তৎক্ষনাৎ দাঁতে দাঁত চেপে ধরে অ্যালেক্স। চোখদুটো বুঁজে ফেলে অসম্ভব রাগে। চোয়ালটা কেমন থরথর করে কাঁপছে তার। নিক বোধহয় পৈশাচিক হাসল তা দেখে। রয়েসয়ে সটান হয়ে দাঁড়াতেই হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকাল দরজার দিকে। একগাদা কালো পোশাকধারী গার্ডস ঢুকছে দৌড়ে দৌড়ে। জনে জনে গিয়ে স্ট্যান্ড নিলো নিজস্ব আঙ্গিকে। নিক সটান হয়ে দাঁড়ায় এবার। দু’হাত ফের প্যান্টের পকেটে গুঁজে নিয়ে বাঁকা হেসে বিরবির করে,
“ ব্লাডি মনস্টার হেজ কাম!”
প্রত্যেকে নিজেদের মাথা নুইয়ে ফেলে সঙ্গে সঙ্গে। মিনিট খানেক বাদেই কক্ষে ঢুকল একদম ধবধবে সাদা রঙা লম্বা কোট পরিহিত এডউইন। মাথায় গোলাকার টুপি! তবে তার টুপির দৈর্ঘ্য ওতো বেশি নয়। সে গম্ভীর মুখে সম্মুখে পা বাড়াতেই হঠাৎ শুনল নিকের বাঁকা কন্ঠ!
“ বাহ! সাপের আসার বদলে দেখছি বিচ্ছু চলে এলো!”
এডউইন গম্ভীর পুরুষ। হুটহাট কথার জবাব দেবার অভ্যেস নেই তার। সে নিজের গাম্ভীর্য বজায় রেখে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে মাথা থেকে টুপিটা নামিয়ে আনল আলগোছে। অতঃপর নিকের পানে ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
“ এসব ছোট খাটো কাজের জন্য বিচ্ছুই যথেষ্ট মিঃ নিকোলাস। কারণ সাপ আসে কেবল ছোবল মারতে!”
নিক চোখ বাঁকায়। শক্ত চোয়ালে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে,
“ সার্কাজম করলে?”
গম্ভীর মুখো এডউইন বুঝি ঠোঁট দুটো পিষে হাসল একটুখানি। মুখাবয়বে একপ্রকার রহস্যময় ভাবভঙ্গিমা ফুটিয়ে প্রতিত্তোরে বলল,
“ উঁহুম! ফ্যাক্ট বললাম।”
কথাটা মোটেও পছন্দ হলোনা নিকের। তা তার মুখাবয়বের পরিবর্তনেই স্পষ্ট! এদিকে এডউইনের এহেন কট্টর জবাবে শ্লেষাত্মক হাসল সবাই। তৎক্ষনাৎ মিটমিটে হাসিতে ফেটে পড়ল সকলে। এডউইন সেদিকে নজর দিলোনা। চুপচাপ গটগটিয়ে এগিয়ে গেল হেড অফ দা চেয়ারের কাছে। ভীষণ শ্রদ্ধায় চেয়ারে না বসে, চেয়ারের ঠিক পাশাপাশি দাঁড়াল। নিকের এতেও সমস্যা! সরু চোখে ঘাড় বাকিয়ে চেয়ে থেকে গমগমে গলায় বলল,
“ সাপ যেহেতু তোমাকে তার জায়গায় পাঠিয়েছে, তাহলে তার জায়গায় বসছ না কেন?”
এডউইন প্রতিত্তোর করলোনা। সটানভাবে দাঁড়িয়ে বা-হাতটা পাশে বাড়িয়ে দিতেই একজন গার্ড এগিয়ে এসে তার হাতে ল্যাপটপ ধরিয়ে দিলো। এডউইন তক্ষুনি ল্যাপটপটা টেবিলের ওপর রেখে দক্ষ হাতে কিবোর্ড চাপলো বেশকিছুক্ষন। অতঃপর মিনিট খানেক বাদেই পেছনের বিশাল স্ক্রিনে দেখা গেল এক রহস্যময় মানব ওরফে দি শ্যাডো মনস্টারের অবয়ব। এডউইন প্রজেক্টরের সাথে ল্যাপটপের স্ক্রিন কানেক্ট করে তক্ষুনি সটান হয়ে দাঁড়ায়। বাদবাকি গ্যাংস্টাররা নুইয়ে রেখেছে মাথা, সঙ্গে আছে নিকও। এমনিতে মহাশয় মুখে যতই ফটরফটর করুক না কেন, মনস্টারের সামনে তার কোনো হেকরিই চলেনা! ওদিকে এডউইনের পেছনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে মনস্টারের অবয়ব। যুবক পায়ের ওপর পা তুলে ভীষণ আয়েশে বসে আছে রাজকীয় সোফায়। তার একহাতে প্রতীকী হিসেবে “ মনস্টার সিগনেচার” ব্রেসলেটটা স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। যুবকের গায়ে বরাবরের ন্যায় কালো ওভার ক্লোক। মাথায় গোলাকার টুপি! তার দেহের খানিকটা অংশ দেখা গেলেও মুখটা ঢেকে আছে অন্ধকারে। সে এবার নিজের ভারী কন্ঠে বলতে শুরু করল,
“ নাচনি তর্গি!”
(বিড শুরু কর!)
কথাটা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই শুরু হলো বিড। একে একে প্রত্যেক গ্যাংস্টার নিজেদের সর্বোচ্চ দাম দিয়ে কিনে নিতে লাগলেন অ*স্ত্র ভর্তি কনটেইনার। শ্যাডো মনস্টার আড়ালে থেকেই প্রত্যেককে বুঝিয়ে যাচ্ছেন নিজেদের কাজ। কে কোথায়, কবে কিভাবে কনটেইনার নিবে, আনবে সবকিছু! সবার মনোযোগ কাজের দিকে থাকলেও একমাত্র নিকের মনোযোগ অন্যত্র। তার বিষাক্ত মন ভাবছে অন্যকিছু। আজ এই শ্যাডো মনস্টারের জায়গায় তার থাকার কথা ছিল, অথচ ভাগ্য দেখো! হয়েছে তার উল্টো।
রাত প্রায় সাড়ে ১২টার কাছাকাছি!
ঘুম নেই মাহির চোখে। অস্থিরতায় বুদ হয়েছে শরীর। রাতের খাবারটাও এখনো খায়নি মেয়েটা। কেন যেন ক্ষুধা নামক ইচ্ছেটুকু আপাতত নেই তার মধ্যে। মাহি চুপচাপ পা গুটিয়ে বসে আছে জানালার পাশের কাউচের ওপর। ছলছল চোখদুটো অদূরের আসমানের পানে নিবদ্ধ, নিরবে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে! আকাশে আজ চাঁদ উঠেনি। মিটমিটিয়ে জ্বলছে তারাগুলো। তাদের পানে চেয়ে থাকতে ভীষণ শান্তি পাচ্ছে মেয়েটা। সে যখন নিজ প্রশান্তিতে মত্ত ঠিক তখনি ফুড রেক নিয়ে কক্ষে আগমন ঘটে মেইডেন ইরার। মেঝেতে হালকা ঘর্ষণের শব্দ পেয়ে তৎক্ষনাৎ ঘাড় বাকিয়ে তাকায় মাহি। মেইডেনকে খাবার নিয়ে আসতে দেখে ফের মুখ ঘুরিয়ে নেয় মেয়েটা। অনিহার সুরে বলে,
“ কেনো আনলেন আবার? আপনাকে না বললাম আমি খাব না?”
মেইডেন শুনেও না শোনার ভান ধরলেন। রয়েসয়ে ফুড রেকটা ঠেলে নিয়ে এলেন কাউচের সামনে। পা ঘুরিয়ে নিরবে এসে বসলেন মাহির পায়ের কাছে। মাহি তৎক্ষনাৎ নিজের পাদু’টো গুটিয়ে নেয়। মেইডেন তখন আলতো হেসে হাত রাখলেন মেয়েটার হাঁটুর ওপর। নরম কন্ঠে শুধালেন,
“ খেয়ে নাও ডিয়ার। আমার ঔষধ খেতে হবে।”
মাহি অন্যত্র মুখ ঘুরিয়ে রেখেই বলে ওঠে,
“ আপনার ঔষধ আপনি খাবেন! আমিতো আপনাকে ধরে রাখিনি মেইডেন।”
মেইডেন ঠোঁট উল্টালেন। মুখভঙ্গিতে কপট নাটকীয় ভাব ধরে সুর টেনে টেনে বললেন,
“ বা’রে! খাবার না খেয়ে কিভাবে ঔষধ খাব শুনি?”
হতবাক মাহি। খুব বেশিক্ষণ জড়সড় ভাব নিয়ে বসে থাকাটা আর হলোনা মেয়েটার। তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে বসে, মেইডেনের পানে শান্ত চোখে তাকিয়ে থেকে নরম কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ আপনি এখনো খাননি?”
দু’ধারে বারকয়েক মাথা নাড়ায় মেইডেন। অন্যত্র চোখ ঘুরিয়ে গলায় একরাশ নমনীয়তা ঢেলে জবাবে বললেন,
“ যেখানে আমার মেয়েটা এখনো না খেয়ে আছে, সেখানে আমি কিভাবে খাই বলোতো?”
মাহি নরম মনের মানুষ! খুব সহজেই যে কাউকে বিশ্বাস করে ফেলার বড় দোষ রয়েছে তার। আজও ঘটল একই ঘটনা। মেইডেনের মায়া কান্নায় মেয়েটা ভুলে গেল সব। নিজের একরাশ অনিহা থাকা স্বত্বেও কেবলমাত্র মেইডেনের কথা চিন্তা করে রাজি হয়ে গেল খাবার খেতে। মেইডেন বুঝি এতেই রাজ্য জয়ের আনন্দ পেলেন। তক্ষুনি সার্ভিং রেক থেকে দুটো প্লেট নিয়ে এলেন সামনে। ধীরে ধীরে নিজের পাতে এবং মাহির পাতে খাবার বেড়ে দিলেন একটু একটু করে। তারপর রেক থেকে একবাটি বড়ো বড়োচিংড়ীর মালাইকারি তুলে হাতে নিলেন তিনি। খুব যত্ন করে মাহির পাতের কোণে খানিকটা তরকারি দিয়ে বাটিটা সরিয়ে নিতে চাইলেই মাহি কেমন জোর দেখিয়ে বলে ওঠে,
“ আপনিও নিন না! চিংড়ীর মালাইকারি কিন্তু খুব স্বাদের।”
এহেন কথায় মেইডেন কেমন থতমত খেলেন মনে হচ্ছে! মানুষটার মুখাবয়বে কাচুমাচু ভাব বেশ স্পষ্ট। যেন খাবারটা নিজ পাতে নিলেই কিছু একটা ঘটে যাবে তার সঙ্গে। মেইডেন প্রসঙ্গ ঘোরাতে কেমন আফসোস নিয়ে বললেন,
“ আর বলোনা ডিয়ার! খেতে তো আমিও চাই বাট আমার আবার চিংড়ীতে মারাত্মক এলার্জি। মুখে নেওয়া মাত্রই নিশ্বাস আঁটকে আসে! তাই ডাক্তার বারণ করেছে চিংড়ি খেতে।”
সহজ-সরল মাহি ধরে নিল কাহিনী সত্য। তাই সে আর জোর করল না মেইডেনকে। নিজেই নিজের পাতে কব্জি ডুবিয়ে খেতে লাগল কেমন। তবে তরকারিটা একটু মুখে নিতেই স্বাদে ভারী তারতম্য পেলো মেয়েটা। শঙ্কিত মনে প্লেটটা নাকের কাছে নিয়ে এসে ঘ্রাণ শুঁকল একবার। তার কেন যেন মনে হচ্ছে তরকারির স্বাদটা একটু ভিন্ন! এদিকে মেইডেন মাহিকে খাওয়া থামাতে দেখে উদ্বিগ্ন হলেন। যেচে পড়ে তাড়া দেখিয়ে বললেন,
“ কি হলো? খাও!”
মাহি ভাত মাখাচ্ছে ধীরে ধীরে। মাথাটা নুইয়ে রেখে বলে ওঠে,
“ মাছটা কেমন যেন লাগছে!”
মেইডেন হাসলেন। ইতস্তত কন্ঠে পরক্ষণেই শুধালেন,
“ বিদেশি মাছ তো, আর আমিও ফার্স্ট টাইম রান্না করলাম। তাই হয়তো এমন লাগছে তোমার কাছে।”
মাহির মনটা কেমন খচখচ করছে। তবুও সৌজন্য রক্ষার্থে কোনমতে খাবারটুকু খেল মেয়েটা। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, প্রথম দু-লোকমা নাক সিটকাতে সিটকাতে মুখে তুললেও বাকি অবশিষ্ট খাবারটুকু একপ্রকার গাপুসগুপুস করে গিলছে মাহি। মেয়েটার চোখেমুখে এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে ক্রমশ! তার চোখদুটো নিবুনিবু হয়ে যাচ্ছে, ঠোঁটের কোণে নেশাগ্রস্তের ন্যায় ঝুলছে শূন্য হাসি। মেইডেন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মাহির পানে। যেই দেখলেন মাহির মুখখানায় পরিবর্তন নেমেছে ওমনি বাঁকা হাসলেন তিনি। খানিকটা এগিয়ে এসে চাপা স্বরে মাহিকে বললেন,
“ কেমন লাগছে ডিয়ার?”
নেশাগ্রস্ত দেখাচ্ছে মাহিকে। মেয়েটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে আয়েশি ভঙ্গিতে জবাব দেয়,
“ আমি উড়ঁছি! এই দেখো।”
এতক্ষণে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন মেইডেন। বুঝে গেলেন — ঔষধে কাজ হয়েছে। তিনি তৎক্ষনাৎ হাত থেকে খাবার প্লেটটা নামিয়ে রেখে এগুলেন মাহির পানে। মাহির কানের কাছে মুখ এনে একনাগাড়ে বলতে লাগলেন,
“ তোমার আজ রাতে সিডের ঘরে যেতে হবে ডিয়ার। সিড তোমার জন্য ব্যথা পেয়েছে। এখন সেবা করার দায়িত্ব কার বলোতো?”
নেশাগ্রস্ত মাহি বাচ্চাদের ন্যায় ঠোঁট উল্টে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়,
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১২
“ আমার!”
মেইডেন বাঁকা হাসলেন। আলতো করে মাহির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“ সিড তোমাকে ভালোবাসে ডিয়ার। আর ভালোবাসার মানুষের কষ্ট কমাতে নিজেকে উজাড় করতে হয়। তার সঙ্গী হতে হয়! তবেই না সে সুস্থ হবে আগের মতো। তুমিও আজ সিডের কাছে নিজেকে উজাড় করবে কেমন? বেচারা ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে!”
