Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ২৩

মেজর কারদার পর্ব ২৩

মেজর কারদার পর্ব ২৩
ফিনারা ঝুমুর

কারদার বাড়ির অন্দরে আজ হালকা সাজসাজ রব। বড় কোনো জাঁকজমক বা প্যান্ডেল না হলেও, অতিথি আপ্যায়নের জন্য যতটুকু পরিপাটি ও গোছানো প্রয়োজন, ঠিক তেমনই এক মায়াবী রূপ ধারণ করেছে পুরো বাড়ি। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা পোলাও, রোস্ট আর রেজালা মসলার ঝাঁঝালো মিষ্টি সুঘ্রাণ থেকে থেকে বাতাসে মিশে ড্রইংরুম অবধি ছড়িয়ে পড়ছে। আর সেই ড্রইংরুমটাই এখন কারদার বাড়ির সবার প্রধান মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে।

​“কিঞ্জা মাকে নতুন করে আর কিই বা দেখবো বলো? ছোটবেলা থেকে তো চোখের সামনেই বড় হতে দেখলাম। তাই চাচ্ছিলাম বেশি দেরি না করে সোজা শুভ কাজটাই সেরে ফেলতে। তোর কী মতামত, জুবায়ের?”
​মাঝবয়সী ও সুঠাম দেহের লোকমান হোসেনের এমন প্রস্তাবে জুবায়ের কারদারের মুখখানা আনন্দে এক্কেবারে আটখানা হয়ে গেল। পরম তৃপ্তিতে ওনার পাশে বসা কিঞ্জার দিকে তাকালেন তিনি। নতজানু হয়ে সোফায় বসে থাকা কিঞ্জাকে আজ চমৎকার দেখাচ্ছে। ওর গায়ের ফর্সা গড়নে বেশ মানিয়েছে মিন্ট গ্রিন কালারের হালকা সিল্কের শাড়িটা। গলায় ও কানে শোভা পাচ্ছে বল চেইনের সাথে ছোট্ট সুন্দর লকেট আর কান-জুড়ে ম্যাচিং বল টপ। চুলগুলো বেশ যত্ন করে পেছনে খোঁপা করা, আর ফর্সা হাতে ছটা ছড়াচ্ছে চিকন ছোট ছোট হিরে আর গোল্ডের মিশ্রণে তৈরি চমৎকার সব চুড়ি।​বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে জুবায়ের কারদার হেসে উঠলেন,
“তুই যা বলবি লোকমান, তোর যা ইচ্ছে। আমার এতে কোনো দ্বিমত নেই।”
​জুবায়েরের কথায় লোকমান হোসেন আরও চওড়া করে হাসলেন। তারপর নিজের স্ত্রীর দিকে ইশারা করে বললেন,
“দিয়া, কিঞ্জা মাকে আংটিটা পরিয়ে দাও তো এবার।”
​দিয়া বেগম মিষ্টি হেসে হাত নেড়ে বললেন,
“আরেহ! আমি কেন পরাতে যাব হ্যাঁ? যার ঘর আলো করে বউ হয়ে যাবে, সেই পরাক না!”
​দিয়া বেগম মূলত লোকমান হোসেনের স্ত্রী। কিঞ্জাকে নিজেদের ঘরের বড় বউ করে ঘরে তোলার তীব্র বাসনা নিয়েই আজ সপরিবারে তাদের কারদার বাড়িতে আগমন।
​ওদিকে ড্রইংরুমের বড় সোফাটার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে মিথিলার কাঁধে আলতো টোকা দিয়ে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে উঠল মেঘ,

“কিঞ্জা আপুর হবু বরটা কিন্তু দেখতে বেশ সুদর্শন আর হ্যান্ডসাম, তাই না মিথু?”
​সোফায় বসে থাকা বাকিদের অলক্ষে একটু দূরে কাঠের চেয়ারে বসে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে আদর আর রাহাত। ওরাও বেশ কৌতূহলী চোখে নিজেদের দুইমাত্র বোনের জীবনের এই বিশেষ মুহূর্ত তথা এনগেজমেন্ট দেখছে।​মিথিলা ঘাড় ঘুরিয়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে ফিসফিসিয়ে বলল,
“খবরদার মেঘ! ওদিকে একদম নজর দিবি না কিন্তু। ওটা অলরেডি আমাদের কিঞ্জা আপুর জন্য বুকড!”
​মিথিলার এমন সাবধানবাণীতে মেঘ নিজের ঠোঁট উল্টে এক মস্ত বড় ভেঙচি কেটে বলল,
“উঁহু! আমার কোনো ঠ্যাকাও পড়ে নাই ওমন হ্যান্ডসাম বরের দিকে নজর দেওয়ার!হুহ!”
​গতকালই তো ওরা সবাই মিলে বাগেরহাট থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছেছে। আর নিয়ে এসেছে কে? স্বয়ং মেজর সাহেব! পরশু দুপুরে ওই এলাহি ভোজ শেষ করে বিকেলের দিকেই আলেয়া বানু আর মেঘকে নিজের জিপে তুলে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল শীর্ষ। উপলক্ষটা আর কিছুই নয় কিঞ্জার এনগেজমেন্ট আর বিয়ের দিনক্ষণ পাকা করা।​লোকমত হোসেন এবার ওনার ছেলের দিকে তাকিয়ে তাগাদা দিলেন,
“জলদি কিঞ্জা মার খালি হাতটায় আংটিটা পরিয়ে দাও, সামী।”
​সামী নামের ছাব্বিশ কি সাতাশ বছর বয়সী দীর্ঘকায়, ফর্সা ছেলেটি কিঞ্জার দিকে আলতো করে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল। ওর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মৃদু হাসিটা এক অদ্ভুত ভালোলাগার জানান দিচ্ছিল। সে অত্যন্ত নরম গলায় বলল,

​“হাতটা দাও, কুঞ্জ।”
​সামীর মুখে নিজের সেই ছোটবেলার ডাকনাম ‘কুঞ্জ’ শোনলেও কিঞ্জা আর নিজের মাথা তুলতে পারল না। ওর বাবা জুবায়ের কারদারের পরম বন্ধু লোকমান হোসেনের সুবাদে ছোট থেকেই সামী ওদের বাড়িতে বহুবার এসেছে। আর সেই তখন থেকেই সামী ওকে নিজের দেওয়া এই কুঞ্জ নামেই ভালোবেসে ডেকে আসছে।
​কিঞ্জা অত্যন্ত ধীর ও কাঁপা কাঁপা একখানা হাত সামীর প্রসারিত হাতের দিকে এগিয়ে দিল। সামীর উষ্ণ আঙুলের ছোঁয়া নিজের শীতল ত্বকে লাগতেই এক তীব্র অস্বস্তি আর আড়ষ্টতা যেন সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল কিঞ্জার। বুকটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল ওর, কিন্তু এই গুরুজনদের মাঝে কিছু বলার বা করার সাধ্যি ওর ছিল না।
​সামী আলতো করে ওর অনামিকা আঙুলে ছোট্ট হিরের আংটিটি গলিয়ে দিল। চারপাশ থেকে একযোগে হাততালির শব্দ ভেসে এলো।​শিউলি বেগম এবার কিঞ্জার দিকে প্লাটিনামের একটি চমৎকার পুরুষালী আংটি এগিয়ে দিয়ে মিষ্টি গলায় বললেন,
“এবার তুই সামীর হাতে এই আংটিটা পরিয়ে দে, মা।”

​মুসলিমদের ধর্মীয় নিয়মানুযায়ী পুরুষদের জন্য স্বর্ণের অলঙ্কার পরা নিষেধ, তাই পাত্র সামীর জন্য কারদার পরিবার বেছে নিয়েছে দামী প্লাটিনামের রিং। কিঞ্জা চরম আড়ষ্টতা আর কাঁপন বুকে চেপে আংটিটা হাতে নিয়ে সামীর অনামিকায় স্থাপন করল। কাজটা শেষ হতেই ও নিজের ভেতরের ছটফটানি আর চেপে রাখতে পারল না। সে অত্যন্ত আড়ষ্ট ও নিচু কণ্ঠে শিউলি বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
​“আমি–আমি একটু ওপরে যাই মা? মাথাটা কেমন যেন একটু ঝিমঝিম করছে।”
​শিউলি বেগম মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে স্নেহের স্বরে বললেন,
“আচ্ছা যা মা, ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নে।”
​উপস্থিত সবাই ভাবল নতুন বউ বুঝি লজ্জায় লাল হয়ে ওমন করে পালিয়ে যেতে চাচ্ছে, তাই কেউ আর ওর এই চলে যাওয়া নিয়ে অন্য কিছু ভাবল না।
​কিন্তু শীর্ষ?​ও সোফার এক কোণায় বসে থাকলেও ওর গ্রে চোখ দুটো আজ কেন যেন অতিরিক্ত মাত্রায় গম্ভীর আর তপ্ত। ও বড্ড তীক্ষ্ণ, প্রখর ও সন্দেহী চোখে কিঞ্জার ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে রইল। ওর সেই গ্রে চোখের তারায় এক চরম অস্থিরতা আর ভাবনার মেঘ খেলা করছে।

রাত তখন গভীর অগভীর । কারদার বাড়ির নিচের ড্রয়িংরুমটা এখনও মেহমানদের হাসিকান্না আর আনন্দমুখর আড্ডায় জমজমাট। কিন্তু সেই উৎসবের আলো আর কোলাহলকে এক লহমায় পেছনে ফেলে, বাড়ির সবার অলক্ষ্যে সদর দরজা দিয়ে সন্তর্পণে বাইরে বেরিয়ে যায় কিঞ্জা।
​ওর পরনের সেই মিন্ট গ্রিন সিল্কের শাড়ির আঁচলটা ও কোমরে শক্ত করে গুঁজে নিয়েছে। চোখেমুখে কোনো ভয় বা দ্বিধা নেই, বরং এক আদিম জেদ আর দাপটের সঙ্গে ও এগিয়ে চলেছে কারো মুখোমুখি হয়ে এক চরম মোকাবেলা করার উদ্দেশ্যে।
​এদিকে কারদার বাড়ির অন্ধকার ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে এক হাত পকেটে গুঁজে
শান্ত চোখে বোনের এই সন্তর্পণে প্রস্থান দেখছিল শীর্ষ । ও চাইলে কিঞ্জাকে আটকাতে পারত, জাঁদরেল মেজরের এক হুঙ্কারেই বোন থমকে যেত। কিন্তু ও নির্বাক, নিস্পৃহ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ও যেন বহু আগে থেকেই কিঞ্জার মনের এই অশান্ত ঝড় আর ওর দৌড়ঝাঁপের সীমানাটা খুব ভালো করেই জানে।
​শহরের এক কোণে ধুলোবালি আর নিয়ন আলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা একটা আধো-অন্ধকার অফিসের সামনে এসে থামে কিঞ্জা। বাইরে কোনো প্রহরী নেই। ভেতর থেকে কতগুলো কর্কশ পুরুষালী কণ্ঠ আর হাসির আওয়াজ স্পষ্ট ভেসে আসছে। কিঞ্জা নিজের বুকের ভেতরের ধুকপুকানি উপেক্ষা করে, এক পলকও না ভেবে অফিসের ভেতরের দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ে।
​ভেতরে ঢুকতেই ওর চোখে পড়ে একটা বড় ক্যারাম বোর্ডের চারপাশ ঘিরে বসে নাহিদ আর ইমন আরও গুটিকয়েক ছেলের সাথে ক্যারাম খেলায় মত্ত।

“প্রহর ইবনাত কোথায়?”
আকস্মিক এক নারীর রুদ্রমূর্তি আর পায়ের স্যান্ডেলের খটখট শব্দে ওদের স্ট্রাইকার চালানো হাতগুলো বাতাসে থমকে যায়। বাকি ছেলেরা হাঁ করে কিঞ্জার দিকে তাকিয়ে থাকলেও, নাহিদ অতটা অবাক না হয়ে নিজের চেনা কুটিল কপালটা কুঁচকে তাকাল। ওমন রুক্ষ গলাতেই শুধাল,
​“ভাইরে দিয়া আপনার কী কাম, আপা?”
​“তা জেনে তোমার কী কাজ হ্যাঁ? বেশি প্যাচাল না পেড়ে চটজলদি বলো প্রহর ইবনাত কোথায়?”
​কিঞ্জার এই রণংদেহী ও গম্ভীর মেজাজ দেখে নাহিদ আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। সে ক্যারামের গুটিটা হাতে নাচাতে নাচাতে হাতের আঙুল দিয়ে পশ্চিমের অন্ধকার গলির শেষ রুমটার দিকে ইশারা করল। কিঞ্জা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে নিজের সময় নষ্ট না করে হনহন করে পশ্চিমের দিকে পা বাড়াল।​ও চলে যেতেই ক্যারাম বোর্ডের পাশে থাকা এক ছেলে কৌতূহলী গলায় ফিসফিসিয়ে বলল,
“কে এই রাগী মাইয়া রে নাহিদ? ভাইরে এভাবে তল্লাশি কইরা খুঁজতাছে ক্যালা?”
​নাহিদ ভাবলেশহীনভাবে ক্যারাম বোর্ডে স্ট্রাইক করে চিবিয়ে বলল,
“মেজর শীর্ষ কারদারের একমাত্র বোন। ভাইয়ের বন্ধুও হয় হেই মেজর। তয়, ভাইয়ের লগে কী এক গোপন লেনা-দেনা আছে হের, আল্লাহই জানে।”

​ওদিকে পশ্চিমের অন্ধকার করিডোর পেরিয়ে একটা বন্ধ কাঠের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় কিঞ্জা। কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে, দরজায় লক না পেয়েই ও এক ধাক্কায় কক্ষের ভেতর প্রবেশ করে।
​ভেতরে পা রাখতেই কিঞ্জার পেটটা তীব্র মোচড় দিয়ে ওঠে। সমস্ত গা গুলিয়ে বমি আসতে চাইল ওর। রুমের স্যাঁতসেঁতে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে কড়া মদের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ আর সস্তা ব্র্যান্ডের সিগারেটের একরাশ বিষাক্ত ধোঁয়া। অন্ধকার রুমটার ভেতর হাতড়ে হাতড়ে ও দেয়ালের সুইচটা টিপতেই পুরো ঘরটা নিয়ন আলোয় ফর্সা হয়ে উঠল। আর আলো জ্বলতেই ওপাশের দৃশ্য দেখে কিঞ্জার চোখের কোণ দুটো রাগে আর তীব্র ঘৃণায় কুঁকড়ে গেল।
​বিছানার পাশে, মেঝেতে খাটের শেষভাগের কাঠের সাথে মাথা হেলিয়ে অঘোরে পড়ে আছে অর্ধনগ্ন প্রহরের অবিন্যস্ত দেহটা। গায়ের শার্টের বোতামগুলো খোলা, পেটের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আছে মদের একটা আধভাঙা বোতল, যেখান থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় দামী মদ চুইয়ে মেঝেতে গড়াচ্ছে।
​এই চরম নেশাখোর আর দায়িত্বজ্ঞানহীন রূপটা দেখে কিঞ্জার মেজাজ এক লহমায় সপ্ত আকাশে চড়ে গেল। ও নিজের আঁচলের এক কোণ নাকে চেপে ধরে ধীরপায়ে এগিয়ে গেল সেই অর্ধচেতন প্রহরের একদম মুখোমুখি।
​আশেপাশে রাগের চোটে কোনো পানির গ্লাস বা অন্য কিছু খুঁজে না পেয়ে ও আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। শাড়ির আঁচলটা এক ঝটকায় সরিয়ে ও নিজের ডান হাত দিয়ে ঠাস ঠাস করে দুটো সপাটে চড় বসিয়ে দিল প্রহরের দুই গাল বরাবর!

​“এই হাড়েবজ্জাত নেশাখোর! ওঠ বলছি! চোখ খোল!”
কিঞ্জা চিৎকার করে উঠল।​নেশার ঘোরে থাকা অবস্থায় গালে এমন অতর্কিত ও জলন্ত চড়-থাপ্পড়ের আঘাত খেয়ে প্রহর তীব্র যন্ত্রণায় নিজের চোখ মেলে তাকাল। মদের ঘোরে প্রায় তিন মিনিট ও একদম হা করে, থ মেরে বসে রইল। তারপর চোখ কচলে সোজা সামনে তাকাতেই ওর চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল। ও দেখল, ওর চিরচেনা নরম কিঞ্জা আজ এক মূর্তিমান রণচণ্ডী হয়ে ওর বুকের ওপর চড়াও হয়েছে!​প্রহর নিজের লাল হয়ে থাকা গালটা এক হাত দিয়ে চেপে ধরে হিংস্র গলায় গর্জে উঠল,
“এই মেয়ে! আমার নিজের ডেরায় ঢুকে আমার গায়ে হাত তোলার মতো এত বড় সাহস তোমায় কে দিয়েছে শুনি?”

​“একশত বার হাত তুলব আমি তোর গায়ে! তোকে আমি কাল থেকে ঠিক কতগুলো ফোন কল করেছি, হ্যাঁ? একটা সিঙ্গেল কলও রিসিভ করার যোগ্যতা কেন হয়নি তোর?”
কিঞ্জা কড়া গলায় হিসহিসিয়ে উঠল।​প্রহর একটা অবজ্ঞার হাসি হেসে অবহেলার স্বরে বলল,
“কেন করব শুনি? তুমি কি আমার লিখে দেওয়া তিন সত্যি করা ঘরের বৈধ বউ লাগো যে তোমার খামখেয়ালি সব কলের জবাব আমি দিতে বাধ্য থাকব?”
​কিঞ্জা প্রহরের আরেকটু কাছে এসে ওর ভেজা শার্টের কলারটা নিজের দুই হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। ওর চোখ ফেটে তখন কান্নার তীব্র বান ডাকছে। ও নিজের অনামিকা আঙুলটা সামীর দেওয়া সেই হিরের রিংটার দিকে তাক করে প্রহরের চোখের সামনে মেলে ধরে ভাঙা গলায় বলল,
​“আজ–আজ আমার আংটি বদল ছিল প্রহর! এই দেখ, এই যে হাতটায়, এই যে আঙুলটায় আমি সারা জীবন কেবল তোর দেওয়া আংটিটাই জড়িয়ে রাখতে চেয়েছিলাম, আজ সেই পবিত্র জায়গায় অন্য এক অচেনা পুরুষ নিজের আংটি বসিয়ে দিয়ে গেছে! অন্য কেউ আজ আমার হাতটার ওপর নিজের অধিকার স্থাপন করে নিয়েছে!”
​প্রহর কিঞ্জার চোখের সেই জলন্ত কান্না আর আঙুলের আংটির দিকে এক পলক তাকাল। ওর ভেতরের চোরা যন্ত্রণাটা ও নিজের নেশার আড়ালে চাপা দিয়ে ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক ও অবহেলার হাসি ফুটিয়ে বলল,
​“খুব ভালো হয়েছে! শেষমেশ তবে আমার এই ভূতটা তোমার মাথা থেকে চিরতরে নেমেছে!”

প্রহরের সেই চরম তাচ্ছিল্য আর অবহেলার জবাব শুনে কিঞ্জার বুকের ভেতরের জমানো কষ্টগুলো যেন এক মস্ত বড় বিস্ফোরণে ফেটে পড়ল। ওর চোখের কোণ বেয়ে অবাধ্য অশ্রুধারা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে প্রহরের শার্টের কলারটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে ভাঙা, আর্তনাদভরা গলায় কেঁদে উঠল,
​“আমার ভালোবাসা কি এতটাই ঠুনকো লেগেছে আপনার কাছে, প্রহর? আমায় কি একটাবারের জন্যও একটুখানি মন থেকে ভালোবাসা যায় না? আমি তো আপনার কাছে কোনো ধন-সম্পদ চাইনি, স্রেফ একটুখানি ভালোবাসার ভিক্ষাই তো চেয়েছিলাম! সেই সামান্য ভিক্ষাটুকু দিতেও আপনার এত বড় সমস্যা? আপনি না নিজেকে বড় সমাজসেবক দাবি করেন, মানুষের সেবা করে বেড়ান? তবে আমার এই রক্তাক্ত মনটার দিকে চেয়ে একটাবারের জন্যও আপনার দয়া হলো না?”
​প্রহর নিজের অবিন্যস্ত চুলগুলো এক হাত দিয়ে পেছনে ঠেলে দিয়ে এক পৈশাচিক ও তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। ওর লালচে চোখের মণি দুটোতে তখন এক অদ্ভুত বিষাদ আর ক্ষোভ। ও চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
​“মেয়েমানুষ জাতিটাই আসলে বড় ছলনাময়ী রে কিঞ্জা! গিরগিটির মতো ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলাতে ওস্তাদ তারা। তাদের এই বিষাক্ত, মিছে ভালোবাসার ফাঁদে পা দিয়ে কত শত পুরুষ যে তিলে তিলে নিজের জীবন শেষ করেছে, তার কোনো হিসাব আছে?”

​প্রহরের মুখে নারী জাতির প্রতি এমন চরম বিতৃষ্ণা আর অবজ্ঞা শুনে কিঞ্জা ওর চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে কেমন এক অদ্ভুত, দৃঢ় অথচ গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
​“দুনিয়ার সব মেয়েকে দয়া করে আপনার ওই পালিয়ে যাওয়া স্ত্রীর মতো চরিত্রহীন ভাববেন না, প্রহর! সবাই এক রকমের হয় না। কেউ পরিস্থিতির অজুহাতে চোখের পলকে নিজের স্বামীকে ত্যাগ করে চলে যায়, আর কেউ হাজারটা ঝড়ের মাঝেও নিজের ভালোবাসাকে বুকের মাঝে পরম যতনে আগলে রাখে। আমায়– আমায় অন্তত একটা সুযোগ দিয়ে দেখুন না!”

​নিজের জীবনের সেই সবচেয়ে অন্ধকার, রক্তাক্ত ও দগদগে পুরাতন ক্ষতটা কিঞ্জার মুখে ওমন অতর্কিতে জাগ্রত হতেই প্রহর যেন এক লহমায় নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল! ওর ভেতরের ঘুমন্ত পিশাচটা যেন এক ধাক্কায় জেগে উঠল। সে এক ঝটকায় মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কিঞ্জার দুই নরম বাহু নিজের লোহার মতো শক্ত মুঠোয় খামচে ধরল। তারপর ওর মুখের ওপর ঝুঁকে এসে এক বীভৎস, কর্কশ হাসি হেসে বড্ড নোংরাভাবে বলতে লাগল,
​“মেয়েমানুষের শরীরের ভেতর একবার কামের জ্বালা উঠলে কে জামাই আর কে জামাইয়ের বন্ধু, সেই বিচার-বুদ্ধিটুকু ভুইল্লা যাইতে ওগো এক সেকেন্ডও সময় লাগে না! তারা আবার বড় বড় মুখে কয় সবাই নাকি এক না! হোন ছেমড়ি, তোরা সব মেয়েমানুষই আসলে এক জাতের। তোরা সব চরিত্রহীন, বেশ–”
​প্রহরের মুখ থেকে ওমন জঘন্য ও নোংরা গালিটা শেষ হওয়ার আগেই কিঞ্জা নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ডান হাতটা বাতাসে চালিয়ে দিল। ঠাঁটিয়ে এক মস্ত বড় চড় আছড়ে পড়ল প্রহরের ওই বিষাক্ত মুখের গালে! থাপ্পড়ের তীব্র শব্দে নিস্তব্ধ অন্ধকার ঘরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল।​কিঞ্জা রাগে, অপমানে আর জেদে হাঁপাতে হাঁপাতে প্রহরের চোখের দিকে তীব্র ঘৃণায় চেয়ে একদম সপাটে চেঁচিয়ে উঠল,

মেজর কারদার পর্ব ২২

​“একদম চুপ! নিজের ওই নোংরা মুখ দিয়ে আর একটা বাজে শব্দও উচ্চারণ করবেন না বলছি! অনেক হয়েছে! আমি আপনাকে ভালোবেসেছি, এটা কোনোদিন বদলাবে না। আর বিয়ে? বিয়েটা এই দুনিয়ায় যদি আমি কাউকে করি, তবে তা এক একমাত্র আপনাকেই করব প্রহর ইবনাত! তা সে ভালো পথে সোজা আঙুলে ঘি তুলে হোক, কিংবা মন্দ উপায়ে আঙুল বাঁকা করে হোক!”

মেজর কারদার পর্ব ২৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here