মেজর পর্ব ২১

মেজর পর্ব ২১
জাকিয়া সুলতানা ঝুমুর

ড্রা,গ এবং অন্যান্য নে,শাদ্রব্য আটক করার সমস্ত ডকুমেন্টস মুশফিকের কাছে,সেই ডকুমেন্টের উপর উর্ধতন কর্মকর্তারা রিসার্চ করছে।সেই জন্যই এত রাতে অফিসে আসতে হলো,তাছাড়া দেশের কাজে তার কখনো না নেই,চাকরির প্রথম দিন থেকেই নিজেকে দেশের জন্য উ,ৎসর্গঃ করে দিয়েছে।এমন হুটহাট ডাক আসলে আগে কখনো মন খারাপ হয়নি কিন্তু আজ বুকে কোথাও ব্যথা হচ্ছে,চিন্তায় কপাল কুঁচকে যাচ্ছে।প্রায় তিনঘন্টা কাজ করার পরে কটেজের দিকে রওনা দেয়।

রুমে এসে দেখে যেভাবে মিতুকে রেখে গিয়েছিলো মিতু সেভাবেই ঘুমিয়ে গিয়েছে,কাপড় পালটে মুশফিক মিতুর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে,ফর্সা গালে কান্নার দাগ স্পষ্ট।সে মিতুকে কাছে টেনে নেয়,কান্নাভেজা গালে ঠোঁট ছুঁয়িয়ে বললো,
“সরি,সরি ফর দ্যাট।”
ঘুমের মাঝেই মনুষ্য উত্তাপ পেয়ে মিতু গুটিসুটি মে,রে মুশফিকের বুক ঘেষে আসে।মুশফিক পরম শান্তিত্ব চোখ বন্ধ করে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

রোদের ঝাপটা চোখে লাগতেই মিতুর ভ্রু কুঁচকে যায়।বিরক্তিতে মুখ দিয়ে শব্দ বের করে নেয়,হাত দিয়ে মুখটা আড়াল করতে চায় কিন্তু রোদটা আজ খুব দস্যি মিতুকে জ্বালানোর পণ নিয়েছে বুঝি।সে বিরক্ত হয়ে চোখ খুলে তাকায়,জানালার পর্দা ধরে মুশফিক দাঁড়িয়ে আছে।

মূহুর্তেই চোখের পর্দায় ভেসে উঠে রাতের টুকরো মূহুর্তের ছবি।ভীষণ ভালোবাসায় মুশফিক তাকে কাছে টেনে নিয়েছিলো,ছুঁয়ে দিয়েছিলো কিন্তু একটা ফোন কলে সব শেষ হয়ে গেলো,তার লজ্জা যেন শেষ হয়েও হইলোনা।তাকে একা রেখে হুটহাট চলে যাওয়ায় সে যেমন অভিমানী হয়েছে তেমনে মুশফিকের চড়া,প্রসস্ত শরীর,তার চোখ,ঠোঁট নাক এসব দেখে লজ্জায় ঠিকঠাক তাকাতে পারছেনা।তাকে তাকাতে দেখে মুশফিক বললো,

“গুড ম,রনিং।”
মিতু অভিমানে লজ্জায় আবার কম্বল মুড়ি দিয়ে ফেলে।মুশফিকও হাল ছাড়ার পাত্র না সে বিছানায় বসে কয়েকবার মিতুকে ডাকে তাতেও মিতু সাড়া না দিলে চুপচাপ কম্বলমুরি দেয়া মানবীর দিকে তাকিয়ে বললো,
“উঠে রেডি হও,আমরা এখনি বেরোবো,আজ সারাদিন ঘুরবো।”
মিতু কম্বলের ভেতরেই ভ্রু কুঁচকে নেয়।ঘুরবে?এই মেজরের সময় হবে! মুশফিক আবার তাড়া দিলো,

“উঠো।”
মিতু মাথাটা বের করে আস্তে করে বললো,
“কোথায় যাচ্ছি? ”
মুশফিক মিতুর দিকে তাকিয়ে বললো,
“হানিমুনে। ”
মিতু কিছু না বলে চুপচাপ শুয়ে আছে।তার মন বলছে” হানিমুন! দেখা যাবে হানিমুনে গিয়ে বউ রেখে অফিসে চলে আসবে।”

মিতুকে কিছু না বলতে দেখে। মুশফিক বুঝতে পারে নারীর অভিমানের দেয়াল খুবই প্রখর,সামান্য কথায় এই অভিমান ভুলানো সম্ভব না সে আস্তে করে মিতুর পাশে শুয়ে পরে।তার কাজে মিতু রাগী চোখে তাকায়।মিতুর রাগী চোখের তাকানো দেখে মুশফিক হেসে দেয়।মিতু ভ্রু কুঁচকে বললো,
“হাসছেন কেনো?”

“আমার রাগী চেহারা দেখলে সেনারা ভয়ে থতমত খেয়ে যায় আর সেই মেজর মুশফিক আহসানের দিকে কিনা এই নরম-সরম নারী রাগী চোখে তাকায়,তাকে ভয় পাওয়াতে চায়!আশ্চর্য!”
মিতু অভিমানে টইটুম্বুর হয়ে গেলো, সেই অভিমানী চেহারা দেখে মুশফিক বললো,
“তা বউ একটু রাগী চোখে তাকালে ভয় পেতেই পারি।বউয়ের কাছে মেজর, কর্নেল সব তুচ্ছ।”

মুশফিকের কথায় মিতু খুশী হয় কিন্তু ভাবে তা প্রকাশ করে না।গতকাল রাতে দুজনের একটু কাছাকাছি আসা যেনো মিতুর লজ্জার পরিমান বাড়িয়ে দিয়েছে দ্বিগুণ।এই যে মুশফিকের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে কিন্তু মুশফিকের দিকে তাকালেই রাতের কথা মনে হচ্ছে,মুশফিকের নরম আদর,উষ্ণ ছোঁয়া।মিতু ঠায় মুশফিকের দিকে তাকিয়ে থাকে।মুশফিক মিতুর হাতটেনে তার বুকে রেখে বললো,

“তুমি কথা না বললে হৃদপিন্ডের চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে মিতুল।”
মিতু বললো,
“কথা বলছি তো। ”
“আমার কাজ সম্পর্কে তোমার নিশ্চয়ই ধারনা আছে।সেনাবাহিনীদের কখনো ছুটি হয়না,যখনি ডাকবে নিজেকে হাজির করতে হবে।রাতে তোমাকে ছেড়ে যেতে আমারও কষ্ট হয়েছে,রাগ করে থেকো না প্লিজ।”
মিতু বুঝে কিন্তু তার মন বুঝে না, মন সারাক্ষণ মুশফিকের বুকে ঝাপটি মে,রে থাকতে চায়।সে মাথা নাড়িয়ে বললো,

“রাগ করিনি।”
মুশফিক তার হাত ছেড়ে গালে ধরে বললো,
“তাহলে কেঁদেছো কেনো?”
মিতু মুশফিকের দিকে তাকিয়ে আছে।মুশফিক আলতো করে গা ছুঁয়ে দিচ্ছে,পুরনো অনুভূতি তাজা হয়ে ফিরে আসছে,মিতুর গা শিহরিত হচ্ছে।
“আমার খুব খারাপ লেগেছে।কষ্ট পাচ্ছিলাম।তাই কেদেছি।”
মুশফিক খুবই নরম কন্ঠে বললো,

“সরি।আমি নিরুপায় ছিলাম।কোন উপায় থাকলে কি এই তুলতুলকে ছেড়ে যেতাম।ওই মুহূর্তে! ইমপসিবল। ”
মিতু মুচকি হাসে।সেই হাসি দেখে মুশফিক বললো,
“উমমম।তুমি চাইলে বাকিটা এখনো ফুলফিলাপ করতে পারি।আর্মিদের কাছে কোন কিছুই না নেই।”
মিতু অবাক হয়ে বললো,

“কি!”
মুশফিক চোখ মে,রে বললো,
“ওই যে…..।”
মিতু বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে বসে।
“ছিহঃ।”
“এমা।ছিহঃ এর কি আছে।আ’ম ইউর হাজবেন্ড।”
মিতু দূরে সরে গিয়ে বললো,

“কচু।”
মুশফিক কোলবালিশ বুকে নিয়ে বললো,
“তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।বাহিরে গিয়ে নাস্তা করবো।আর হ্যাঁ সাথে কাপড় নিও আমরা থাকতে পারি।”
মিতু অবাক হয়ে বললো,
“আসলেই ঘুরতে যাচ্ছি!”
“হ্যাঁ।”
“কোথায়?”

“ঘুরার তো অনেক জায়গা আছে।যেমন,সিন্দুকছড়ি,মায়াবীনি লেক,ঠান্ডা ছড়া,তৈলাফাং ঝর্না,হর্টিকালচার পার্ক,হাতিমাথা,শান্তিপুর অরণ্য কুঠির,রিসাং ঝর্না,তৈদুছড়া ঝর্ণা,দেবতার পুকুর,আলুটিলা গুহা,নিউজিল্যান্ড পাড়া,মাতাই পুখুরি আরও আছে।কোথায় যাবে বল।”

“এতো যায়গা?কোনটা সুন্দর বেশী?”
“সব সুন্দর।”
মিতু হেসে দিয়ে বললো,
“তাহলে আমি সব জায়গায় যাবো।”
মুশফিক উঠে দাঁড়ায়।
“আচ্ছা।ঝর্নায় গেলে কমফোর্ট কাপড় নিও।”

মিতু হাসিমুখে রেডি হয়ে যায়।মুশফিক রেডি হয়ে বেরিয়ে পরে।একটা ছাদখোলা জিপ তাদের নিয়ে যাচ্ছে।জিপটা আর্মিদের,চালক একজন আর্মি।মিতু বুঝতে পারছে তারা ঘুরতে যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু খুবই সতর্ক চারপাশ।মিতু মুগ্ধ হয়ে আশেপাশে তাকাচ্ছে।সে মুশফিককে বললো,
“আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
“নিউজিল্যান্ড পাড়া।”
“ওমা এখানে নিউজিল্যান্ড পাড়া আসবে কোথা থেকে?”

“পানখাইয়া পাড়ার পায়াহেই নিউজিল্যান্ড পাড়া অবস্থিত।আমরা এখন যে রাস্তায় প্রবেশ করবো এই রাস্তার নাম নিউজিল্যান্ড সড়ক।”
মিতু মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে।পাহাড়ে এত সুন্দর,সবুজের সমারোহ,পাহাড়,মেঘের আনাগোনা,ঝরনার কলকল শব্দ,বিস্তৃত জুম ক্ষেত,দূরের ছোটবড় পাহাড়,সব মিলিয়ে মিতু গাড়ি থেকে নেমে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে।সত্যিই যেনো অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের এক টুকরো নিউজিল্যান্ড ঠাই নিয়েছে বাংলার এই খাগড়াছড়ির বুকে।মিতু বললো,

“এই নাম কে রেখেছে?”
“এই পাড়ার নামকরণে তেমন কোন কারণ নেই কিন্তু এখানকার অনেকের মুখেই প্রচলিত যে,
অনেকবছর আগে এক ভদ্রলোক এই পাড়া দিয়ে যেতে যেতে বলেছিলো ঠিক যেনো নিউজিল্যান্ডের মতো বাতাস।সেই থেকেই এর নাম নিউজিল্যান্ড পাড়া।”

মিতু লক্ষ করে দেখলো এই পাড়ায় অনেক পর্যটক।সবাই তাদের মতো সকালেই এসেছে।এই পাড়ায় পাহাড়িদের বাস।মিতু অবাক হয়ে তাদের দেখে।
পানখাই পাড়ায় ঐতিহ্যবাহী সিস্টেম রেস্তোরার অবস্থান।এখানে খাগড়াছড়ির ঐতিহ্যবাহী খাবার পাওয়া যায়।মুশফিক উনাদের সকালেই ফোন দিয়ে খাবারের আইটেম বলে রেখেছিলো রেস্তোরাঁয় গিয়ে মিতুর চোখ কপালে।পনেরো রকমের খাবার টেবিলে সাজানো।বাশের নানান আইটেম বিশেষ করে বেম্বো চিকেন,তাদের ফেমাস ডাল,মাশরুম আইটেম।ড্রাইবারকে আলাদা খাবার দেয়া হয়েছে।
এত খাবার দেখে মিতু অবাক হয়ে বললো,

” এত খাবার কে খাবে?”
“আমি আর তুমি।কোন জায়গায় ঘুরতে আসলে সেখানের বিখ্যাত খাবারগুলো খাওয়ার চেষ্টা করবে।”
মিতু অবাক হয়ে দেখলো সবগুলো খাবারের স্বাধ ভিন্ন,আর খুবই মজাদার।দুজনে খাবার খেয়ে আবার বেরিয়ে পরে।মুশফিক বললো,
“এখন আমরা স্বর্গের সিড়িতে যাবো।”
“স্বর্গ?”

“অবাক হওয়ার কিছু নেই।এটার নাম স্বর্গের সিড়ি কিন্তু এটা স্বর্গে যায় না যাওয়া যায় হাতিমাথা পাহাড়ের চূড়ায়।পাহাড়ের মাথাটা হাতিরমাথার মত দেখতে তাই এর নাম হাতির মাথা। ২০১৫ সালে স্থানীয়দের চলাচলের জন্য ১২ লাখ টাকা খরচ করে নির্মান করা হয়।এখানে ৩০০ টি সিড়ি আছে।এই সিড়ি পেরোলেই হাতিরমাথার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে।”

মিতু সিড়ি পেরোতে পেরোতে অবাক হয়ে চারপাশে তাকাচ্ছে,
পাহাড় ও জঙ্গলের মাঝে দিয়ে এই সিড়ি বয়ে গেছে।মুশফিক শক্ত করে তাকে ধরে হাটছে।মিতু হাত ছাড়াতে চাইলে সে বলে,

“নিচের দিকে তাকিয়েছো?পড়লে আমার বউ শেষ।”
মিতু হেসে উঠে।অনেক কষ্ট করে মিতু হাতির মাথার পৌছায়,মুশফিকের কষ্ট হয়নি সে নিয়মিত এর চেয়ে বেশী হাটে,তার অভ্যেস।মিতু মুগ্ধ চোখে চারপাশে তাকাচ্ছে।চারপাশে তাকিয়ে মিতু মুগ্ধ হয়ে যায়।এতো সুন্দর চারপাশ এতোক্ষনের সব কষ্ট নিমিষেই দূর হয়ে যায়।

উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।মিতুর মনে হচ্ছে সে একটা পাখি,তার নিচে পাহাড়,ঝর্ণা,সব।মিতু মুগ্ধ হয়ে পাহাড় দেখছে আর মুশফিক মুগ্ধ হয়ে তার স্ত্রীকে দেখছে।খুবই সাদাসিধা পোশাক পড়নে।কালো টপসের সাথে সাদা জিন্স।চুলগুলো জুটি করে রাখা,এতেই তার কাছে মিতুকে অপরূপ লাগছে।মুশফিক পেছন থেকে মিতুকে জড়িয়ে ধরে।

মেজর পর্ব ২০

“ভালোবাসি।”
মিতু প্রতুত্তরে বললো,
“আমিও।”
“আমি বেশী।”
“আমি তার চেয়েও বেশী।”
মুশফিক মিতুর কপালে চুমু দিয়ে বললো,
“দেখা যাবে।”

মেজর পর্ব ২২