Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২২

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২২

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২২
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

‎”মুনতাহা… সিদরাতুল মুনতাহা।”
‎নামটা উচ্চারণ করতেই ইখতিয়ারের গলা কেঁপে উঠল। বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। কৃষ্ণচূড়ার পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের শেষ রঙগুলো মাটিতে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু ইখতিয়ারের চোখে যেন কোনো আলো নেই। সেখানে শুধু বহু বছরের জমে থাকা এক গভীর ক্লান্তি।
‎সে কিছুক্ষণ চুপ করে নিজেকে সামলাল।আজ তাকে বলতে হবে। ইখতিয়ার মুগ্ধার হাত হাতের মুঠোয় নিল। শক্ত করে রাখল। মুগ্ধা যন্ত্রমানবের মতো অনুভূতিহীন তাকিয়ে থাকল। ইখতিয়ার সামনে তাকালো। তার ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
‎”মুনতাহা আমার জীবনে এসেছিল একদম অপরিচিত হয়ে। যেমন হঠাৎ কোনো পথিক বৃষ্টির দিনে দরজায় কড়া নাড়ে, ঠিক তেমন।
‎আমি তখন নিজের ভেতর বন্দী একজন মানুষ। চারপাশে হাজার মানুষ ছিল, অথচ আমার পৃথিবীটা ছিল তালাবদ্ধ একটা ঘরের মতো। যেখানে আমি ছাড়া আরো কারো প্রবেশ ছিল দুর্বিসহ”

‎মুগ্ধা নিঃশব্দে শুনছে। ইখতিয়ার আবারো বলল,
‎”প্রথম দিন ও এসে আমার পাশে বসেছিল। আমি পাত্তাই দিইনি। দ্বিতীয় দিনও এলো। তৃতীয় দিনও। তারপর প্রায় প্রতিদিন। কখনো নোট লাগবে বলে, কখনো ক্লাসের অজুহাতে, কখনো আবার কোনো কারণ ছাড়াই।”
‎ইখতিয়ের চোখে দূরের স্মৃতি ভেসে উঠল যেন। চোখ বন্ধ করল সে।
‎”আমি যত দূরে সরে যেতাম, ও তত কাছে আসত। আমি যত নীরব হতাম, ও তত কথা বলত।
‎ধীরে ধীরে বুঝলাম, ওকে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। একসময় খেয়াল করলাম, দিনের একটা অংশ ওকে ছাড়া অসম্পূর্ণ লাগছে।”
‎ইখতিয়ারের কণ্ঠ নরম হয়ে এল। ভাঙা স্বর তার।
‎”অনেক বছর পর আবার একজন মানুষের সঙ্গে গল্প করতে ভালো লাগত। ওর হাসি শুনতে ভালো লাগত। ওর বোকা বোকা কথা শুনে বিরক্ত হতাম, অথচ সেই বিরক্তিটাও উপভোগ করতাম।
‎জানো মুগ্ধা, একাকীত্ব খুব অদ্ভুত জিনিস। বাইরে থেকে একটা সাধারণ শব্দ মনে হলেও ভেতরে ভেতরে শব্দটা মানুষকে গিলে খায়। তৈরি করে ভাঙাচোরা এক হৃদয় যাকে জুড়তে যুগ পার হয়ে যায়”

‎ইখতিয়ারের চোখ স্থির হয়ে গেল। কথাগুলো বলতে বলতে তার গলায় ভার জমতে লাগল। একটু হেসে মাথা নাড়ল সে। বলল,
‎”জানো ওর জন্য আমি বদলাতে শুরু করলাম।
‎যে মানুষটা বছরের পর বছর নিজের মধ্যে বন্দী ছিল, সে ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে এলো। আমি আড্ডা দিতে শুরু করলাম। হাসতে শুরু করলাম। মানুষের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম। মনে হচ্ছিল, বহুদিন ধরে বন্ধ থাকা একটা ঘরের জানালা খুলে গেছে।”

‎মুগ্ধা নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে। ইখতিয়ারের চোখে তখন অদ্ভুত এক শূন্যতা। না বলার ব্যাথার বহিঃপ্রকাশে যেমন কষ্ট মেশানো থাকে ততটা। তার কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল। বলল,
‎”কিন্তু জানো একটা জায়গায় আমি ভুল বুঝেছিলাম। আমি ওকে বন্ধু ভেবেছিলাম। খুব ভালো বন্ধু। জীবনের সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের একজন। কিন্তু মুনতাহা আমাকে বন্ধু ভাবেনি।”

‎মুগ্ধার আঙুল কেঁপে উঠল। ইখতিয়ার বুঝল। আরো শক্ত করে চেপে ধরল মুগ্ধার হাত। যেন নিজেও একটু ভরষা খুঁজছে। ইখতিয়ার দূরে তাকিয়ে বলল,
‎”একদিন বুঝলাম, ও আমাকে ভালোবেসে ফেলেছে। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। পরে যখন বুঝলাম, তখন অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি।”
‎আমি অনেকবার বলেছিলাম, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি ওকে সেই চোখে দেখি না। কখনো দেখিনি।”
‎মুগ্ধা নিঃশ্বাস আটকে শুনছে। চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। ঠোঁট কাপছে। চোখের পলক পড়ছে অনেক ধীরে। সে সোজা তাকিয়ে আছে ইখতিয়ারের রক্তিম অশ্রুমিশ্রিত চোখে। ইখতিয়ার জোরে নিঃশ্বাস নিল। ইখতিয়ার চোখ বন্ধ করল। বলল,
‎”কিন্তু মুনতাহা শুনল না। বরং আরও পাগলামি শুরু করল। রাতের পর রাত মেসেজ। হঠাৎ হঠাৎ দেখা করতে চলে আসা। ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা। বন্ধুদের সামনে অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলা।”

‎ইখতিয়ারের মুখে যন্ত্রণার রেখা ফুটে উঠল।
‎”প্রথমে রাগ করিনি। ভেবেছিলাম সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু জানো ঠিক হলো না।বরং সবকিছু অসহনীয় হয়ে উঠতে লাগল। আমি ওকে বোঝালাম। অনুরোধ করলাম। দূরে থাকতে বললাম। কিন্তু মুনতাহা যেন নিজের অনুভূতির বন্দী হয়ে গিয়েছিল। সে আমার অনুভূতি মানতে নারাজ। আমার পক্ষেও তাকে অন্য চোখে দেখা অসম্ভব। আমি তাকে বান্ধবী রুপি বোন ভাবতাম।
‎তখন আমি একটা সিদ্ধান্ত নিলাম।আমি যোগাযোগ বন্ধ করে দিলাম।”

‎ইখতিয়ার থামল। নীরবতা নেমে এলো যেন ধরণীর বুকে। তার চোখে তখন নিজের প্রতিই ঘৃণা দৃশ্যমান হচ্ছে যেন।
‎”ফোন ধরা বন্ধ করলাম। মেসেজের উত্তর দেওয়া বন্ধ করলাম। দেখা হলে এড়িয়ে যেতে শুরু করলাম।আমার মনে হয়েছিল এটাই সঠিক পথ।”
‎একটা তিক্ত হাসি বেরিয়ে এলো ইখতিয়ারের।
‎”আমি জানতাম না, ওর ভেতরে আরেকটা যুদ্ধ চলছিল।”
‎মুগ্ধার চোখ ভিজে উঠল। ইখতিয়ারের ঠোঁট কাঁপছে।
‎”আমি জানতাম না ওর মানসিক সমস্যা ছিল।”
‎ইখতিয়ার থামল। তার হাত কাঁপছে। কথা বলতে গিয়ে বাঁধছে। স্বর বেরোচ্ছে না যেন। ধীরে ধীরে বলল,
‎”আমি শুধু নিজের শান্তি খুঁজছিলাম। আর সেই খোঁজে একটা মানুষকে একা ফেলে দিয়েছিলাম।”
‎কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না। ইখতিয়ার বহু কষ্টে শব্দ সৃষ্টি করছে। কন্ঠনালি আটকে রেখেছে কেউ। আর মুগ্ধা? সে ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে আছে ভেঙে পড়া ইখতিয়ারের দিকে।
‎ ইখতিয়ার অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে বলল,

‎”জানো কয়েকদিন পর বিকেলে ফোন এসেছিল। মুনতাহা ফোন করেছিল। একবার আসবেন?শেষবারের মতো।”
‎ইখতিয়ারসে দম আটকে ফেলল।যেন শব্দগুলো আবার শুনতে পাচ্ছে সে। তার হাত কাঁপতে শুরু করল। গলা শুকিয়ে এলো তার।
‎”আমি যেতে চাইনি জানো মুগ্ধা । তবু কেন জানি গেলাম। হয়তো আল্লাহ চেয়েছিলেন আমি শেষ দৃশ্যটার সাক্ষী হই।”
‎মুগ্ধার গাল বেয়ে অশ্রু নেমে এলো। ইখতিয়ারের কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে।
‎”আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছালাম…”
‎সে থেমে গেল। শ্বাস ভারী হয়ে উঠল তার। তার হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে উঠল।
‎”চারপাশে মানুষ দৌড়াচ্ছিল। চিৎকার করছিল। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তারপর ভিড় ঠেলে সামনে গেলাম। আর দেখলাম…”
‎তার চোখের সামনে যেন দৃশ্যটা আবার জীবন্ত হয়ে উঠল। গলা বন্ধ হয়ে এলো ইখতিয়ারের।
‎”সব শেষ।”

‎মুগ্ধার বুক মোচড় দিয়ে উঠল। ইখতিয়ারের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তার কণ্ঠ প্রায় ফিসফিস।
‎”মুনতাহা পড়ে ছিল। নিঃশব্দ,নিষ্প্রাণ,স্থির।বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই উঁচু ভবনের ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়েছিল মুনতাহা। ও যখন ছাদ থেকে শেষ পা টাও তুলে নিলো। ছেঁড়ে দিলো নিজের চাকচিক্য দেহটা,আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। সিড়িতেই সবে উঠেছি। তারপরও আমি কিছুই করতে পারিনি। আই ওয়াজ স্টান্ডেড দিয়্যার জাস্ট লাইক আ্য রোবট, আ্যা টয়”
‎ইখতিয়ারের শরীর কেঁপে উঠল। তার চোখ জ্বলে উঠলো।এক ফোঁটা অশ্রু মাটিতে পড়ল। তার গলা ভেঙে গেল।
‎”জানো মুগ্ধা…মৃত্যু ভয়ংকর।
‎কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর হলো—কাউকে হারানোর আগে তার শেষ ডাকটা শুনেও তাকে বাঁচাতে না পারা। মুনতাহা আমার নামে ভালোবাসা দিয়ে নিজেকে উজার করল।
‎একটা তিক্ত হাসি ইখতিয়ারের ঠোঁটে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। চোখ বুজল সে।
‎”সেদিন মনে হয়েছিল আমার জীবনটা আবার ভেঙে গেল। প্রথমবার বন্ধুকে হারিয়েছিলাম ভাগ্যের কাছে। দ্বিতীয়বার একজন মানুষকে হারালাম নিজের অক্ষমতার কাছে।”
‎তারপর ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে ফেলল।তার চোখে অপরাধীর ছায়া নামল।

‎ইখতিয়ারের কণ্ঠটা ধীরে ধীরে থেমে আসছিল। প্রতিটি শব্দ যেন বুকের গভীর থেকে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছিল। মুগ্ধা নিঃশব্দে বসে ছিল তার সামনে।
‎ইখতিয়ার নিচের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
‎”প্রথম জনের বিরহটা মানতে পারলেও মুনতাহারটা মানতে পারলাম না। দোষ দিতে থাকলাম নিজেকে। মনে হতে লাগল সবকিছুর জন্য আমিই দায়ী। যদি সেদিন এমন করতাম, যদি ওভাবে বলতাম, যদি আরেকটু চেষ্টা করতাম… “যদি” শব্দটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল”।
‎ইখতিয়ার মাথা তুলল। চোখ দুটো লালচে হয়ে উঠেছে। মুগ্ধার চোখে চোখ রেখে বলল,
‎”একসময় নিজেকে বদ্ধ উন্মাদ মনে হতে লাগল। না… মনে হতে লাগল বললে ভুল হবে। আমি সত্যিই নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছিলাম।
‎রাতের পর রাত ঘুম আসত না। চোখ বন্ধ করলেই মনে হতো হাজারটা স্মৃতি আমাকে তাড়া করছে। যেন অন্ধকার ঘরে শত শত ছায়া দাঁড়িয়ে আছে, আর আমি তাদের মাঝখানে বন্দী। আরহাম… ও-ই আমাকে বাঁচিয়েছিল। ও আমাকে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেল। চিকিৎসা শুরু হলো আমার। শেখ ইখতিয়ার আহমেদের। অথচ কাউকে কিছু জানানো হয়নি। বাড়িতেও না। সবকিছু চলছিল গোপনে।”

‎কথাগুলো বলতে বলতে ইখতিয়ারের চোখে একফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল।
‎”জানো, তখন আমি একটা জীবন্ত মানুষের মতো ছিলাম না। ছিলাম একটা পোড়া বাড়ির মতো। বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে আছি ঠিকই, কিন্তু ভেতরে সব ছাই হয়ে গেছে।”
‎মুগ্ধার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। ইখতিয়ার আবার বলতে শুরু করল,
‎” তারপর আমার জীবনে তুমি এলে।”
‎তার চোখ এবার ধীরে ধীরে মুগ্ধার মুখে এসে স্থির হলো।
‎” আম্মু যখন তোমার কথা বলল, আমি না বলতে পারিনি। কেন জানো? তোমাকে পছন্দ হয়েছিল। খুব বেশি না, কিন্তু এমন একটা অনুভূতি হয়েছিল… তুমি আলাদা।”
‎ইখতিয়ারের কণ্ঠ নরম হয়ে এলো।
‎”তখন ভেবেছিলাম, হয়তো তুমি এলে সব ঠিক হয়ে যাবে। ডক্টরও বিয়ে করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, নতুন একটা অধ্যায় হয়তো আমাকে পুরনো অন্ধকার থেকে বের করে আনবে।”
‎একটু থামল সে। থেমে থেমে বলল,

‎” তাই তোমাকে আমার জীবনে আনলাম। কিন্তু আপন করতে পারলাম না।”
‎মুগ্ধার চোখে জল চলে এলো। ইখতিয়ার ব্যাথতুর হাসল।
‎” যতবার তোমার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, ঠিক ততবার মুনতাহার মুখটা ভেসে উঠেছে। মনে হতো কেউ আমার বুকের ওপর পাথর চাপা দিয়েছে। নিঃশ্বাস নিতে পারতাম না। দম বন্ধ হয়ে আসত।পারিনি তোমার কাছে যেতে, মুগ্ধা। সত্যিই পারিনি।
‎তারপর শুরু হলো আমাদের সংসার… না, সংসার বললে ভুল হবে। সংসার-সংসার খেলা।”
‎ইখতিয়ারের চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।সে মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
‎” অথচ জানো? একটা মানুষের সাথে একুশ দিন থাকলে অভ্যাস হয়ে যায়। সেখানে তুমি আমার চার মাসের অভ্যাস।”
‎কথাটা বলতেই তার গলা ভেঙে গেল।
‎” সকালে ঘুম ভাঙলে তোমাকে দেখা, রাতে ঘুমানোর আগে তোমার মুখ দেখা, তোমার অকারণ বকবক শোনা, তোমার রাগ, অভিমান… সবকিছু আমার দিনের অংশ হয়ে গিয়েছিল।”
‎ইখতিয়ার চোখ বন্ধ করল।সে থামল কিছুক্ষণ। ধীরে ধীরে বলল,
‎ “কিন্তু মানুষ অভ্যাসের মূল্য বুঝতে পারে না, যতক্ষণ না সেটা হারিয়ে ফেলে। তুমিই ছিলে আমার জীবনের সেই নীরব অক্সিজেন, যাকে আমি অনুভব করতাম ঠিকই, কিন্তু গুরুত্ব দিতাম না। আর যখন সেই অক্সিজেন হারিয়ে গেল, তখন বুঝলাম আমি শ্বাসই নিতে পারছি না।”

‎মুগ্ধার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। ইখতিয়ার তার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
‎” তোমার অনুপস্থিতিই আমাকে বুঝিয়েছে, আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। এই শেখ ইখতিয়ার আহমেদ নামক ছেলেটা মুগ্ধাকে ভালোবেসে ফেলেছে।”
‎তার কণ্ঠে ছিল পরাজিত এক মানুষের স্বীকারোক্তি কথা শেষ হতেই চারপাশটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সেই নীরবতা আর সাধারণ নীরবতা ছিল না। সেটা ছিল বহু বছরের জমে থাকা ব্যথার শেষ আর্তনাদ। যেন দীর্ঘ খরার পর আকাশ অবশেষে বৃষ্টি নামিয়েছে, আর সেই বৃষ্টিতে ভিজে একজন ক্লান্ত মানুষ নিজের সমস্ত গোপন ক্ষত উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

‎তখন কলেজের সামনের উঠোনে দাঁড়িয়ে ইশতিয়াক তার কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল। হাত নেড়ে নেড়ে এমন ভঙ্গিতে গল্প করছিল, যেন দেশের অর্থনীতি থেকে শুরু করে বিশ্ব রাজনীতি—সবকিছুর সমাধান তার মাথার ভেতরেই লুকিয়ে আছে।
‎হঠাৎ তার পকেটের ভেতর ফোনটা কেঁপে উঠল।
‎ইশতিয়াক অন্যমনস্কভাবে ফোন বের করল।
‎স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই চক্ষু চড়কগাছ।
‎” স্নি… স্নিগ্ধা!”
‎চোখ দুটো এমন বড় হয়ে গেল যে বন্ধুরা ভয় পেয়ে গেল। ফোনের দিকে এমন করে তাকানোর কি আছে? কল তো আসতেই পারে? নাকি? একজন জিজ্ঞেস করল,
‎”কী রে? ভূত দেখছিস নাকি?”
‎ইশতিয়াক উত্তর দিল না।বরং নিজের হাতেই একটা চিমটি কাটল।
‎” আউচ!”
‎ব্যথা পেয়ে লাফিয়ে উঠল। বন্ধুরা এবার আরও অবাক।

‎” কী হয়েছে তোর? নাটক করছিস কেন?”
‎ইশতিয়াক ওদের পাত্তা দিলো না। নিজের মনে ফিসফিস করে বলল,
‎ “স্বপ্ন না তো? মহারানী নিজে কল দিছে?”
‎তারপর আবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
‎না, ভুল দেখছে না। সত্যি সত্যিই স্নিগ্ধা কল দিয়েছে! যে মেয়ে মেসেজের রিপ্লাই দিতে তিন যুগ সময় নেয়, সে কিনা নিজে থেকে কল করেছে!
‎ইশতিয়াকের বুকের ভেতর তখন ঢাক-ঢোল বাজতে শুরু করেছে। সে তাড়াতাড়ি বন্ধুদের থেকে দূরে সরে গেল। গলা খাঁকারি দিয়ে ফোন ধরল।
‎” হ্যালো?”
‎ওপাশ থেকে ভেসে এলো স্নিগ্ধার মিষ্টি কণ্ঠ।
‎”কী করো?”
‎ইশতিয়াকের হাঁটু প্রায় দুর্বল হয়ে গেল।
‎আজ সূর্য কি পশ্চিম দিক থেকে উঠেছে?
‎সে অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

‎” কী ব্যাপার? নিজে কল দিছো যে?”
‎স্নিগ্ধা কথাটা একদম গায়ে মাখল না। বরং আরও আদুরে গলায় বলল,
‎” কেন? আমি কল দিতে পারি না নাকি?”
‎ইশতিয়াকের মনে হলো কেউ তার মাথার উপর গোলাপের পাপড়ি ছিটিয়ে দিয়েছে। সে দেয়ালে হেলান দিল।
‎” পারো তো অবশ্যই পারো। তুমি দিনে দশবার কল দিলেও আমার আপত্তি নাই।”
‎স্নিগ্ধা খিলখিল করে হেসে উঠল। এই হাসি শুনে ইশতিয়াকের অবস্থা হলো গরম তাওয়ায় রাখা মাখনের মতো। ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে।
‎তার মুখে তখন নির্বোধের মতো হাসি। সে মনে মনে ভাবছে,
‎”আহা! মেয়েটা অবশেষে আমার মূল্য বুঝতে শুরু করছে।”
‎ঠিক তখনই স্নিগ্ধা মিষ্টি গলায় বলল,
‎” একটা কাজ ছিল।”
‎ইশতিয়াক বুক ফুলিয়ে ফেলল।
‎”বলো, এমনভাবে কথা বললে প্রাণ চাইলে প্রাণও দিয়ে দিব।”
‎” এত কিছু লাগবে না।”
‎” তাহলে?”
‎” তোমার হাতের লেখা সুন্দর,আমার প্র্যাকটিক্যাল গুলো লিখে দিবা?”

‎ইশতিয়াকের মুখের হাসি এমন গতিতে উধাও হয়ে গেল।তার মস্তিষ্কে সাইরেন বাজতে শুরু করল।প্র্যাকটিক্যাল?লিখে দিবে? সে?
‎যে নিজের প্র্যাকটিক্যালই লিখেনি?
‎ইশতিয়াকের মনে পড়ল, গতবার ইখতিয়ার আর মুগ্ধা ভাগাভাগি করে তার প্র্যাকটিক্যাল লিখে দিয়েছিল। সে তো শুধু নাম লিখেছিল!
‎এখন সে অন্যের প্র্যাকটিক্যাল লিখবে কীভাবে?
‎তার অবস্থা হলো এমন একজন মানুষের মতো, যে সাঁতার জানে না কিন্তু তাকে সমুদ্র পার হতে বলা হয়েছে।
‎ওপাশ থেকে স্নিগ্ধার কণ্ঠ এলো,
‎” হ্যালো? চুপ করে আছো কেন?”
‎ইশতিয়াক শুকনো গলায় বলল,
‎” মানে… লিখতে তো পারব।”
‎”সত্যি?”
‎ “হুম… কিন্তু”

‎”কিন্তু না, কিন্তু বললে ব্রেকাপ দিবো, হ্যাঁ তাহলে কাল নিয়ে যেও।”
‎ইশতিয়াকের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। বিরক্তি মাখা কন্ঠে বলল,
‎”আচ্ছা”
‎অথচ মনে মনে বলল,
‎”ইয়া আল্লাহ! এখন ইখতিয়ার ভাইরে কোথায় পাই? ওরে যা ক্ষেপায়তেছি জন্মেও লিখে দিত না”
‎কিন্তু স্নিগ্ধা খুশি হয়ে বলল,
‎”জানতাম তুমি না করবে না।”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২১

‎তারপর ফোন কেটে দিল। ফোন কাটা মাত্র ইশতিয়াক আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অত ধৈর্য ও কোথায় পাবে ? অতগুলো প্রাকটিক্যাল লেখার। কাউকে ম্যাসেজ দিয়ে যে ছেলে ম্যাসেজ এসিভ করে রাখে যাতে অপেক্ষা করতে না হয় সে কি না অতগুলো প্রাকটিক্যাল লিখবে? না লিখলেও ব্রেকাপ! বেচারার কাঁদো কাঁদো অবস্থা। ঐভাবেই ইশতিয়াক আকাশে তাকিয়ে বিরবিরাল,
‎”বারবার আমার উপরেই কেন আল্লাহ? বারবার আমিই কেন?”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here