ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৫
রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি
রাত তখন সাড়ে এগারোটারও বেশি। চারপাশের পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে নিঃশব্দতার চাদর গায়ে জড়িয়ে ফেলেছে। শেখ বাড়ির প্রতিটা বড় ঘর অন্ধকার। দিনের কোলাহল, হাসি, ব্যস্ততা সব কোথাও গিয়ে থেমে গেছে। শুধু দূরে মাঝে মাঝে কোনো নিশাচর পাখির ডাক ভেসে আসছে। মাঝে মাঝে ক্ষ্যান্ত প্যাচাও গুনগুনাচ্ছে।
তখনই ঘুমান্ত শেখবাড়িতে আগমন ঘটল এক প্রাণোচ্ছল দম্পতির । চুপিসারে পা টিপে তারা নিজেদের বরাদ্দ ঘরে ঢুকলো। রাস্তার ধারে বাড়ি বিধায় ইখতিয়ারের বাইকের আওয়াজ শেখবাড়ির কারো মনে শঙ্কচ সৃষ্টি করেনি। ইখতিয়ারের এই যাওয়া-আসার গল্পও কেউ জানেনি।
ঘরে ঢুকেই মুগ্ধার বুকের ভেতরটা আবার ধুকপুক করে উঠল। বাড়ির সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা বারবার মনে পড়ছে তার। সেখান থেকে মুগ্ধা পুরো চুপ। পুরো গাড়িতে একটাও কথা বলেনি। ইখতিয়ার ও আর ঘাটায়নি।
সে? আর সত্যিই ইখতিয়ারকে জড়িয়ে ধরেছিল! এত বড় সাহস সে কীভাবে পেল?
মনে হতেই কান দুটো গরম হয়ে উঠল। গালখানা সিঁদুর রঙ ধারণ করল। যেন কেউ টকটকে লাল রঙ মেখে দিয়েছে।
জামাকাপড় পাল্টাতে পাল্টাতেও সে বারবার নিজের মুখটা আয়নায় দেখছে। তারপর নিজেই লজ্জায় চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। লজ্জাবতী লতার ন্যায় লতিয়ে পড়ছে যেন। মুগ্ধার মনে হচ্ছে আয়নার ভেতরের মেয়েটা তাকে নিয়েই হাসছে। আয়নাতে তাকাত পারছে না। লজ্জায় গুটিয়ে উঠছে।
ওদিকে ইখতিয়ারও পোশাক বদলে নিয়েছে। তবে তার অবস্থা কিছুটা ভিন্ন। ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য একটা হাসি বারবার ফুটে উঠছে।
সে যতই নিজেকে গম্ভীর দেখানোর চেষ্টা করুক, আজ সেটা সম্ভব হচ্ছে না। আনমনেই হেসে উঠছে বারংবার। বাড়ির সামনে সেই আকস্মিক আলিঙ্গনের স্মৃতি এখনও তার বুকের কোথাও নরম উষ্ণতা হয়ে লেগে আছে।
অনেকদিন ধরে বরফে ঢেকে থাকা কোনো উপত্যকায় হঠাৎ বসন্তের প্রথম রোদ যেমন নেমে আসে, তার মনেও আজ তেমন কিছু ঘটেছে।
কিন্তু সে কিছু বলছে না। একটা শব্দও না। শুধু মাঝে মাঝে মুগ্ধার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে।
আর সেই দারুণ হাসিগুলোই মুগ্ধার লজ্জা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঘরের আলো নিভে গেল। চাঁদের ফিকে আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ভেতরে ঢুকেছে।অন্ধকারের বুকের ওপর রূপালি রেখা আঁকছে।
বিছানার একপাশে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়ল মুগ্ধা।
আরেক পাশে ইখতিয়ার। একই ঘর,একই বিছানা।
মাঝখানে কতখানি দূরত্ব।
মুগ্ধা নিজের শরীরটাকে যতটা সম্ভব গুটিয়ে নিচ্ছে।
মনে হচ্ছে বিছানার কিনারায় আর এক ইঞ্চি জায়গা থাকলেও সে সেখানেই চলে যেত।
তার বুকের ভেতর এখনও অকারণ কাঁপুনি।
চোখ বন্ধ করলেই হাতছানি দিচ্ছে লজ্জারা। সঙ্গে সঙ্গে মুগ্ধার গাল আরও গরম হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে।
ইখতিয়ার সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছে। কিন্তু তার চোখে একরত্তি ঘুম নেই। একদমই নেই। তার সমস্ত মনোযোগ গিয়ে আটকে আছে বিছানার অন্য প্রান্তে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা মেয়েটার দিকে। আজকের দিনটা যেন অবিশ্বাস্য। মুগ্ধা নিজে থেকে ফিরতে চেয়েছে। ছটফট করেছে,অপেক্ষা করেছে।নিজে থেকে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। প্রতিটা স্মৃতি তার ভেতরে আলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে। অনুভূতি কে তাগড়া করছে। শরীরে বয়ছে ভিন্ন অনুভূতির জোয়ার ।
কিন্তু সেই সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা যুদ্ধও চলছে। নীরব যুদ্ধ। নিজের সঙ্গেই।সে ধীরে ধীরে হাত ভাঁজ করল, ছেড়ে দিল। এই পাশ ফিরে শুলো তো, এই আবার সোজা হয়ে শুল। চোখ বন্ধ করছে, তৎক্ষণাৎ খুলছে। নিজের সাথেই চলছে নিজের এক দাগী যুদ্ধ ।
মুগ্ধা চোখেও ঘুম ধরা দিচ্ছে না। চোখ বন্ধ করলেই অদ্ভুত এক প্রশান্তি তাকে ঘিরে ধরছে।
আবার একই সঙ্গে অকারণ লজ্জাও লাগছে।
যেন হৃদয়ের ভেতর কেউ ধীরে ধীরে ফুলের বাগান বানিয়ে ফেলেছে। অথচ সে নিজেই জানে না কখন।
হঠাৎ সে অনুভব করল ইখতিয়ার পাশ ফিরেছে।
তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। তবুও চোখ খুলল না। ঘুমের ভান করে রইল।
নিস্তব্ধতা আরও কয়েক মুহূর্ত ঝুলে থাকল তাদের বদ্ধ ঘরে। ইখতিয়ার যেন নিজের সঙ্গে চলা দীর্ঘ যুদ্ধের অবসান ঘটাল।
দীর্ঘদিন ধরে আটকে রাখা সমস্ত আকাঙ্ক্ষা, সমস্ত ভালোবাসা, সমস্ত অভিমানকে একপাশে সরিয়ে রেখে হঠাৎ হাত বাড়াল সে। পরের মুহূর্তেই মুগ্ধা বিস্ময়ে ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলল।
কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই ইখতিয়ার তাকে হেচকা টানে নিজের কাছে টেনে নিল। খুব কাছে।
ঠিক যেন বহুদিনের হারানো কোনো জিনিসকে আবার বুকের কাছে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যেই তাদের মাঝের সমস্ত দূরত্ব উধাও হয়ে গেল।
মুগ্ধার শরীর এসে থামল ইখতিয়ারের বুকের ওপর।
তার হৃদস্পন্দন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
খুব দ্রুত, ভীষণ ভারী, অস্থির শ্বাস-প্রশ্বাস।
মুগ্ধা হতভম্ব হয়ে গেল। চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তার একটুও খারাপ লাগল না। একটুও না। বরং বুকের ভেতর জমে থাকা অদ্ভুত শূন্যতাটা যেন এক নিমিষে ভরে গেল। চোখে যেন রঙবিরঘঙের প্রজাপতি উড়ছে। ইখতিয়ারের এত কাছে আসার স্বপ্ন সে সবসময় দেখেছে। তবে কাছে আর আসা হয়নি। কাছেই তো ডাকেনি কাছের মানুষ।
ইখতিয়ার কিছু বলল না। একটা শব্দও না। শুধু দুই হাত দিয়ে তাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরল, যেন পৃথিবীর সমস্ত ঝড় থেকে আগলে রাখছে।
মুগ্ধা প্রথমে একটু জড়সড় হয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে সমস্ত সংকোচ গলতে শুরু করল। যেমন ভোরের রোদ পেয়ে শিশিরবিন্দু ধীরে ধীরে গলে যায়। তার মাথাটা নিজে থেকেই ইখতিয়ারের বুকের কাছে গিয়ে ঠেকল।
শুনতে পেল এক পরিচিত মানুষের অপরিচিত হৃদস্পন্দন। মুগ্ধার কাছে সবটাই সপ্ন মনে হচ্ছে। এই এতকাছে আসা, এত আগলে রাখা কোনটাই বিশ্বাস হচ্ছে না যেন। মুগ্ধা নিজেও জড়িয়ে ধরল ইখতিয়ার । পড়ে রইলো ইখতিয়ারের বুকে লেপ্টে।
ইখতিয়ারের থুতনি আলতো করে ছুঁয়ে আছে তার মাথা। আর তার দুই হাত এখনও মুগ্ধাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে।
মুগ্ধার মাথাতে যত্ন আঁকল সে। আরো জড়িয়ে নিল মুগ্ধাকে। তার দরুন ইখতিয়ারের পুরুষালি হাত ঠেকল মুগ্ধার নগ্ন, খাজকাটা কোমড়ে। দুজনেই কেঁপে উঠলো ঠিক। তবে না কেউ হাত সরাল,আর না কেউ হাত সরিয়ে দিলো।
াইরে চাঁদ তখন মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে।
মনে হচ্ছে সেও এই দৃশ্য দেখে মুচকি হাসছে। ঘরের ভেতর ধীরে ধীরে নেমে এলো গভীর প্রশান্তি।
মুগ্ধার চোখ ভারী হয়ে আসছে। ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসির রেখা জ্বলজ্বল করছে ।
সেই একই সময়ে ইখতিয়ারের ঠোঁটেও জন্ম নিল এক তৃপ্তির হাসি। অনেকদিনের অপেক্ষা শেষে পাওয়া শান্তির হাসি। কাউকে একান্তই নিজের করে পাওয়ার হাসি। তার বাহুডোরে আবদ্ধ মুগ্ধার জন্য পাওয়া প্রশান্তির হাসি।
রাতের দীর্ঘ অন্ধকার ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিতে শুরু করেছে নিজের কালো চাদর। পূর্ব আকাশে ফুটে উঠেছে ভোরের প্রথম আলো।
মনে হচ্ছে কেউ যেন নীল ক্যানভাসের কোণে একফোঁটা সোনালি রং ছুঁইয়ে দিয়েছে। সেই রং ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।
জানালার ফাঁক গলে নরম সূর্যের আলো এসে পড়েছে ঘরের ভেতর। আলোটা এত কোমল, যেন ভোর নিজ হাতে ঘুমন্ত পৃথিবীর কপালে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। বাইরে গাছের ডালে বসে পাখিরা ডাকছে। নতুন দিনের আগমনী গান।
আর সেই শান্ত সকালের মাঝেই ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙল মুগ্ধার। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না সে।
ঘুম আর জাগরণের মাঝখানের সেই অদ্ভুত মুহূর্তে মানুষ যেমন নিজের অবস্থান ভুলে যায়, মুগ্ধারও ঠিক তেমনই হলো।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই তার চোখ বড় হয়ে গেল। সে আবিষ্কার করল—
সে ইখতিয়ারের বুকের ভেতর বন্দি হয়ে আছে।
একটা হাত শক্ত করে জড়িয়ে রয়েছে তার কোমরের চারপাশে। আর তার নিজের মুখ
ইখতিয়ারের গালে ঠেকানো। তার শ্বাস-প্রশ্বাস আছড়ে পড়ছে ইখতিয়ারের মুখে।
মুহূর্তের মধ্যে তার বুকের ভেতরটা ধুকপুক করে উঠল। গত রাতের সমস্ত স্মৃতি একসঙ্গে ফিরে এলো। তার জীবনে বসন্ত ফিরছে। ঠিক তার স্বপ্নের মতো করে।
মুগ্ধার কান গরম হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাল সে। ইখতিয়ার এখনও ঘুমিয়ে। গভীর, নিশ্চিন্ত ঘুম। তার মুখে এমন প্রশান্তি, যেন বহুদিনের ঝড়ঝঞ্ঝা পেরিয়ে কোনো ক্লান্ত নাবিক অবশেষে নিরাপদ বন্দরে আশ্রয় পেয়েছে।
কঠিন, গম্ভীর মানুষটাকে ঘুমের মাঝে ভীষণ শান্ত লাগে।
মনে হয় পৃথিবীর কোনো চিন্তা তাকে ছুঁতে পারে না।
মুগ্ধা কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব সাবধানে ইখতিয়ারের হাত সরানোর চেষ্টা করল। যেন সামান্য শব্দেও তার ঘুম ভেঙে যাবে। কাঁচের তৈরি কোনো মূল্যবান জিনিস সরানোর সময় যেমন সতর্কতা লাগে, মুগ্ধাও ঠিক ততটাই সতর্ক হয়ে উঠল।
অবশেষে নিজেকে মুক্ত করতে সক্ষম হলো।
পা টিপে টিপে বিছানা ছেড়ে নামল। একবারও পিছনে তাকাল না।
কারণ সে জানে—
তাকালেই আবার লজ্জারা ঘিরে ধরবে। দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। ঠান্ডা পানি মুখে পড়তেই বুকের ভেতরের অস্থিরতা কিছুটা কমল। তবুও আয়নায় নিজের মুখ দেখেই আবার লজ্জা পেয়ে গেল। কেন জানি আজ নিজেকেই নিজের অচেনা লাগছে।
যেন হৃদয়ের কোথাও নীরবে নতুন একটা ঋতুর আগমন ঘটেছে। কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো সে।আলমারি খুলে পরার জন্য কাপড় নিল। তারপর আবার ওয়াশরুমের দিকে যাওয়ার আগে হঠাৎ থেমে গেল।
চোখ নিজে থেকেই বিছানার দিকে চলে গেল।
কৌতূহলী কোনো শিশুর মতো খুব আস্তে উঁকি দিল সে। ইখতিয়ার এখনও ঘুমিয়ে আছে।
সকালের সোনালি আলো এসে পড়েছে তার মুখে।
মনে হচ্ছে সূর্যের আলোও যেন থেমে গেছে সেই মুখখানা দেখার জন্য। ঘামে ভেজা কালো চুল এলোমেলো হয়ে কপালের ওপর পড়ে আছে।
বন্ধ চোখদুটো অশান্ত। কিছুক্ষণ পর পর নড়ছে।
ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা।
কি আশ্চর্য!
এই মানুষটাই সারাক্ষণ এত গম্ভীর হয়ে থাকে?
ঘুমের মাঝে তাকে এত নিরীহ, এত নির্মল লাগছে কেন? মুগ্ধার বুকের ভেতর কেমন একটা নরম অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। ঠিক যেমন বসন্তের প্রথম বাতাস নিঃশব্দে ফুলের বাগানের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। তার ঠোঁটের কোণেও অজান্তে হাসি ফুটল।
কিন্তু পরক্ষণেই নিজের অবস্থা বুঝতে পেরে লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।
ধুর!
সে কেন এভাবে তাকিয়ে আছে? দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল। আবার তাকালো। তাকালেও বা কি? তারই তো বর। দেখতেই পারে। একটা উড়ন্ত যত্ন ছুড়ে দিলো ইখতিয়ারের দিকে। নিজে নিজেই লজ্জা পেল বৈকি!
কাপড়গুলো বুকের সঙ্গে চেপে ধরে প্রায় দৌড়ে আবার ওয়াশরুমের ভেতর ঢুকে গেল। আর দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে নিজের বেপরোয়া হৃদস্পন্দন শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল।
জানালার ফাঁক গলে আসা রোদের সোনালি রেখাগুলো শেখ বাড়ির মেঝের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে সূর্য নিজের হাতে বাড়ির প্রতিটা কোণায় আলো ছিটিয়ে দিয়েছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে নাশতা তৈরির শব্দ। ড্রয়িংরুমে বসে আছেন বাড়ির বড়রা।
ইসরায়েল সাহেব চুপচাপ চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন। ইসরাফিল সোফায় হেলান দিয়ে বসে খবরের কাগজ উল্টেপাল্টে দেখছেন।
রাফেয়া বেগম কারও সঙ্গে গল্প করছিলেন।
এক কোণে বসে রহিমা বেগম তসবির দানা গুনছেন। তার ঠোঁট নড়ছে ধীরে ধীরে। চোখেমুখে অদ্ভুত প্রশান্তি।
আর ইশতিয়াক? সে একটা চেয়ারে কুঁজো হয়ে বসে আছে। চোখদুটো এখনও ঢুলুঢুলু। মনে হচ্ছে ঘুম তাকে ছাড়তে চাইছে না, আর না সে ঘুমকে ছাড়তে চাইছে।
ঠিক তখনই সিঁড়ির ওপর একটা ছায়া নড়ল।
সবাই প্রায় একই সঙ্গে তাকাল।
মুগ্ধা? হ্যাঁ মুগ্ধা ই তো।
ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে সে। সকালের আলো এসে পড়েছে তার মুখে।
আর সেই মুখটা দেখেই ড্রয়িংরুমে অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। অবাক হলো ড্রয়িং রুমে বসা প্রত্যেকেই। রহিমা বাদে। রহিমা চোখ বুঝে তসবি পড়ছেন।
এই মেয়েটা দুমাসের পরীক্ষার কথা বলে বাপের বাড়ি গিয়েছিল? যাওয়ার সময় কত দৃঢ় ছিল!
পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফিরবে না— এমনটাই বলেছিল তো?
কিন্তু এখনও একমাসও তো পূর্ণ হয়নি। তার আগেই সে ফিরে এসেছে যে?
ইন্তিয়া বেগম প্রথমে মুগ্ধার দিকে তাকালেন।তারপর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল।
মায়েরা সন্তানদের মুখ পড়তে পারেন।
তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। মুগ্ধার সামনে দাঁড়িয়ে কোমল গলায় বললেন,
”কী ব্যাপার মা? পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল নাকি?”
মুহূর্তেই মুগ্ধার বুক ধক করে উঠল। সে আমতা আমতা করে বলল,
”না… মানে… ওই…”
”ওই কী?”
”খুশি হওনি নাকি?”
”আরে আমার আম্মু বাড়ি ফিরেছে খুশি না হয়ে যাব কই?”
ইন্তিয়া বেগমের চোখে হাসি আরও গাঢ় হলো। কিন্তু আর কিছু বললেন না। চুপচাপ একটা যত্ন আঁকল মুগ্ধার কপালে। বেশি ঘাটলেন না তিনি। উত্তর তিনি পেয়ে গেছেন। তার ছেলেমেয়ে দুটো যেন সারাজীবন এমন আদরে-সোহাগে থাকে, আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন।
কিন্তু রাফেয়া বেগম সুযোগ পেয়ে গেলেন বেশ।
তিনি মুগ্ধাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
”আহারে…”
মুগ্ধা ভয় পেয়ে তাকাল। রাফেয়া দুষ্টু হাসেন। আবার বললেন,
”বরের জন্য মাঝরাতে বাড়ি ফিরতে হলো না, বাপের বাড়ি গিয়েও শান্তি নাই।”
একটু থামলেন। তারপর চোখ টিপে যোগ করলেন,
” পড়া হচ্ছিল না বলে একটু বাপের বাড়ি গেল তাও শান্তি দিলো না যে, কিন্তু মনে হচ্ছে বইয়ের চেয়ে অন্য কিছুর টান বেশি ছিল।”
ড্রয়িংরুমে কেউ শুনলো না রাফেয়ার টিপ্পনি। মুগ্ধার কানে বলল যে। মুগ্ধার গাল মুহূর্তে লাল হয়ে গেল। মনে হলো কেউ পাকা ডালিমের রং এনে তার মুখে মেখে দিয়েছে।
সে দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলল। ওদিকে ইশতিয়াক এতক্ষণ আধা ঘুমন্ত ছিল। এবার সোজা হয়ে বসল।
একবার মুগ্ধার দিকে তাকাল। একবার উপরের তলার দিকে। তারপর এমনভাবে মাথা নাড়ল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল রহস্য সমাধান করেছে।
”বুঝছি ছোট আম্মু বুঝছি…”
তার গম্ভীর কণ্ঠে সবাই তাকাল। ইশতিয়াক বুক ফুলিয়ে বলল,
”দুই মাসের পরীক্ষার সিলেবাস এক মাসেই শেষ বোধ হয়!”
ইসরাফিল সঙ্গে সঙ্গে হো হো করে হেসে উঠলেন। ইশতিয়াক হেঁটে মুগ্ধার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। কানে কানে বলল,
”সিলেবাস না, অন্য কিছু শেষ হইছে মনে হয়।”
আবার হাসির রোল উঠল ইশতিয়াকের ঠোঁটজোড়াতে।
মুগ্ধার মনে হচ্ছিল মাটির নিচে একটা গর্ত থাকলে সে এখনই সেখানে লুকিয়ে পড়ত। তার বুকের ভেতর কাঁপুনি চলছে।
লজ্জা, সংকোচ, আনন্দ— সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক অনুভূতি। যেন হৃদয়ের ভেতর একদল প্রজাপতি ডানা ঝাপটাচ্ছে। আর সেই প্রজাপতিগুলোকে কিছুতেই শান্ত করা যাচ্ছে না।
ইসরায়েল সাহেব অবশ্য কিছু বললেন না। তিনি আগের মতোই চুপচাপ চায়ের কাপে চুমুক দিলেন।
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠেছিল। সেই হাসিতে ছিল স্বস্তি।
ছিল প্রশান্তি।
কারণ একজন বাবার কাছে ছেলের সংসার টিকে থাকার চেয়ে বড় সুখ খুব কমই আছে। ইখতিয়ারকে তিনি চেনেন।
তার গম্ভীর মুখের আড়ালে কতটা গভীর ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে, সেটাও জানেন।
আর আজ মুগ্ধার এই অকাল প্রত্যাবর্তন যেন সেই ভালোবাসার নীরব স্বীকৃতি।
রহিমা বেগম তসবির দানা গুনতে গুনতেই একবার মুগ্ধার দিকে তাকালেন। তারপর আকাশের দিকে চোখ তুলে মৃদু হাসলেন। শুকরিয়া আদায় করলেন আল্লাহর কাছে। সে তো এটাই চেয়েছিল।
আল্লাহর বান্দা আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ কি ফিরায়? না। ঐ বান্দার জন্য আল্লাহ পারলে নিজেকেই উজার করে দেয়।
আজ শুক্রবার বিধায় ইখতিয়ারের অফিসের তাড়া নেই। সে নিশ্চিন্তে ধীরে ধীরে ঘুম থেকে উঠেছে। উষ্কখুষ্ক চুলে দারুন লাগছে তাকে দেখতে। ঝিম ধরে বসে আছে সে। তার কাছে পৃথিবী যেন থেমে গেছে। নিজের স্মৃতিশক্তি হারিয়ে গেছে যেন। কিছুক্ষণ লাগল তার বাস্তবে ফিরতে। মনে পড়ল সব। উষ্ণতা ছড়িয়ে গেল তার পুরো শরীরে। অমনি আগমন ঘটল মুগ্ধার। লাল শাড়ি পরিহিতা নারী। উহু! নারী নয় পরী। ইখতিয়ারের একান্ত পরী।চুল গুলো খোপা করে রাখা।
মুগ্ধা ইখতিয়ারকে দেখে লজ্জা পেল বেশ। ইখতিয়ার উঠে দাঁড়ালো। এক পা দু পা এগিয়ে চললো মুগ্ধার দিকে। মুগ্ধা চোখ খিচে বন্ধ করে ফেলল। ইখতিয়ার হাসল। তাকিয়ে থাকল তার নারীর দিকে। আজ যেন সব জড়তা মুছে গেছে। আজ কোন বাধা নেই। সব উবে গেছে। ঠোঁট কামড়ে ধরল ইখতিয়ার। এগিয়ে গিয়ে আরো কয়েক পা। মুগ্ধাকে নিজের কাছে আনলো। খুব কাছে। এক হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরল মুগ্ধা মৃদু মেদযুক্ত কোমড়ে। আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরল। যেন ছেড়ে দিলেই পালিয়ে যাবে। আরেক হাত দিয়ে দরজা আটকে দিলো। দরজার পাশেই দাঁড়িয়েছিল মুগ্ধা। তারপর হাত ঘুরিয়ে রাখল রাখলো মুগ্ধার ঘাড়ের কাছে। তাকিয়ে রইলো মুগ্ধার তিরতির করে কাঁপতে থাকা ওষ্ঠের দিকে। ঘোর লেগে আসল ইখতিয়ারের। ঢোঁক গিলল সে। জিহ্বা দ্বারা ওষ্ঠ ভিজিয়ে নিলো সে। কিঞ্চিত ব্যবধান টুকুও সহ্য হলো না ইখতিয়ারের।এগিয়ে গেল মৌমাছি মধুসন্ধানে।
ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৪
তবে কারো একজনের হয়তো এইটা সহ্য হলো না। ব্যাঘাত ঘটাল ইখতিয়ারের শান্তিতে। দরজায় ধাক্কা দিতে থাকল। অনবরত। ক্ষণিক পর আওয়াজ আসল,
”এই ভাইয়ার বউ সেভেন আপ দরজা খোল”
