ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৪
রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি
“স্নিগ্ধা!”
দরজা খুলতেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল মুগ্ধার মুখ।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাও নরম করে হাসল। হালকা বেগুনি রঙের সালোয়ার কামিজ পরা। মাথায় সাদা ওড়না টানা। চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা। হাতে ছোট্ট ব্যাগ। বৃষ্টির হাওয়ায় সামনের চুলগুলো একটু এলোমেলো হয়ে আছে।
লাজুক স্বরে বলল,
“হঠাৎ চলে আসলাম আপু…”
মুগ্ধা একটানে ওকে ভেতরে টেনে আনল। মেয়েটা প্রায় ভিজে গেছে।
“তুই আসছিস এটা আগে বললি না তো!”
ড্রয়িংরুমে বসা সবাই তাকালো।
ইন্তিয়া পারভীন হাসিমুখে এগিয়ে এলেন।বললেন, “আরে এইটা তো স্নিগ্ধা! এসো মা এসো।”
স্নিগ্ধা ভদ্রভাবে সালাম দিল। “আসসালামুয়ালাইকুম আন্টি।”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছো?”
“জি ভালো।”
ইসরায়েল শেখ খুশি হয়ে বললেন, “আরে স্নিগ্ধা মা যে,আসো আসো।”
স্নিগ্ধা ছোট্ট করে হাসল। সালাম দিলো।
ঠিক তখনই সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল ইশতিয়াক।
এক সেকেন্ডের জন্য যেন কি বলবে ভুলে গেল সে।
তারপর দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে বলল, “আরে… স্নিগ্ধা যে?”
স্নিগ্ধা তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “ জ্বী ভাইয়া,কেমন আছেন ?”
“ভা… ভাইয়া?”
শব্দটা শুনে ইশতিয়াকের মুখ কেমন থমকে গেল।
মুগ্ধা সেটা দেখেই চোখ নামিয়ে হাসল। মুচকি হাসি। লোকজন আছে নয়তো কিছু বলত।
ইসরাফিল শেখ পাশ থেকে সব দেখছিলেন।
ভ্রু নাচিয়ে ধীরে বললেন,
“কি হইল ইশতিয়াক? গলায় কাঁটা আটকাইছে?”
ইশতিয়াক কটমট করে তাকালো। এই চাচ্চুটা তারে ছাড় দেয়না।
“চাচ্চু চুপ থাকবা।”
“আমি তো কিছুই কই নাই।”
মুগ্ধা এবার ফিক করে হেসে ফেলল। ইসরাফিলের তালে তাল মেলানো।
স্নিগ্ধা খুব সহজেই সবার সাথে মিশে গেল। তবে স্বভাবমতো শান্ত। বেশি কথা বলে না।
স রহিমাকে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করলাম। রহিমা খুশি হলো
রহিমা খাতুন বিরবিরাল,
“মাইয়াডা অনেক ভদ্র।”
ইশতিয়াক সাথে সাথে বলে উঠল,
“সবাই কি আর জন্মগত কুটনি হয়,কিছু মানুষ জন্মগতভাবেই ভালো হয়।”
রহিমা ট্যারা চোখে তাকাল। কিছু বলল না। তবে ইসরাফিল কাশির ভান করলেন।
“হুমম… কারো কারো চোখেও আবার শুধু ভালো মানুষই পড়ে।”
ইশতিয়াক এবার সত্যি সত্যি চোখ রাঙালো। চোখেমুখে বিরক্তি। এত কেন জ্বালাবে?
মুগ্ধা আনন্দে মরে যাচ্ছে প্রায়। পারে না জোরে হাসতে।
কিছুক্ষণ পর ইসরায়েল শেখ ফুচকা আর কাঁচা আমের আচার এনে রাখলেন।
মুগ্ধা খুশি হয়ে বলল, “ধন্যবাদ আব্বু”
ইসরায়েল হালকা হাসলেন।
ইশতিয়াক বুক চেপে ধরল।
“এই বাড়িতে আমি এতিম।”
“তুই সমস্যা।”
শান্ত গলায় বললেন ইসরাফিল। হাসির শব্দ উঠল চারপাশে। কার্পেটের উপর পাশাপাশি বসেছে মুগ্ধা, স্নিগ্ধা আর ইশতিয়াক।মাঝখানে ফুচকার বাটি।
স্নিগ্ধা আস্তে আস্তে খাচ্ছে। আর ইশতিয়াক?
সে ফুচকার চেয়ে স্নিগ্ধার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
মেয়েটা চুল সরালে তাকাচ্ছে। হাসলে তাকাচ্ছে। পানি খেলে তাকাচ্ছে।
এমনভাবে তাকিয়ে আছে যে মুগ্ধার হাসি আটকানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
সে ইচ্ছে করেই বলল,
“স্নিগ্ধা তোর চশমাটা অনেক সুন্দর।”
ইশতিয়াক সাথে সাথে মাথা নাড়ল।
“হ, সুন্দর।”
বলেই থেমে গেল।
ইসরাফিল ধীরে ধীরে ঠোঁট থেকে পানির গ্লাস নামালেন।
“কি সুন্দর?”
“চ… চশমা।”
“ও আচ্ছা।”
মুগ্ধা মাথা নিচু করে হাসছে।
স্নিগ্ধা কিছু বুঝল না। শান্তভাবেই আচার খাচ্ছে।
ইসরাফিল আবার আন্দাজে ঢিল মারলেন। “ইশতিয়াক, তোরে দেখি আজকাল খুব ভদ্র লাগতেছে।”
ইশতিয়াক চোখ কুঁচকে তাকায়।
“মানে?”
“না এমনিই। কিছু মানুষ আসলে মানুষের চরিত্র পরিবর্তন হয়।”
মুগ্ধা এবার কাশির ভান করল।
ইশতিয়াক নিচু স্বরে বলল,
“চাচ্চু একটা কথাও আর বলবানা, আজাইরা কথা সব”
“ক্যান? লজ্জা লাগতেছে?”
“হ্যা,প্রথমে ঘোমটা দিতে মন চাইতেছে!”
”তাহলে আমার একটা ওড়না আনি?”
মুগ্ধা বলল। ইসরাফিল আর মুগ্ধা হেসে উঠল।
“ভাই তোরা থাম না!।”
ইশতিয়াক চেঁচালো। সে এবার ফুচকা মুখে পুরে চুপ করে গেল।
মুগ্ধা-ইসরাফিল তখনো ওর দিকে তাকিয়ে হেসে চলেছে।
ইসরাফিল মুখ ঘুরিয়ে হাসি চাপলেন।
ইশতিয়াক দাঁত চেপে বলল,
“তোরা দুইজন আমার জীবন নষ্ট করতাছস।”
“আমরা কি করছি?”
নিরীহ মুখে জিজ্ঞেস করল মুগ্ধা।
“তুই চুপ থাক।”
স্নিগ্ধা অবাক হয়ে তিনজনের দিকে তাকিয়ে রইল।
ও কিছুই বুঝছে না। হচ্ছেটা কি এখানে?
সন্ধ্যা সাতটা।
আকাশের শেষ আলোটা তখনও পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। পশ্চিম আকাশে হালকা কমলা আর ধূসর রঙ মিশে এক অদ্ভুত শান্ত আবহ তৈরি করেছে। বাতাসে দিনের গরম কমে ঠান্ডা একটা আরামদায়ক ভাব এসেছে।
বাড়ির নিচতলা স্বাভাবিক ব্যস্ততায় ভরা।
ইন্তিয়া পারভীন রান্নাঘরে কাজ করছেন। ইসরায়েল শেখ সোফায় খবর দেখছেন,সাথে ইসরাফিল ও আছেন। রাফেয়া ডাইনিং সাজাচ্ছেন। আর ইশতিয়াক ফোন হাতে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে, তার স্বভাবসুলভ নাটকীয় ভঙ্গিতে।
মুগ্ধা স্নিগ্ধার পাশে বসে গল্প করছিল।হঠাৎ গেট খোলার শব্দ।
ইশতিয়াক চোখ তুলে মেকি সুরে বলল,
”কারো ছাইয়া আইছে।”
মুগ্ধার বুক কেমন অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল।
ইখতিয়ার ঢুকল ঘরে।
“আসসালামুয়ালাইকুম।”
সবাই উত্তর দিল।
মুগ্ধার চোখ এক সেকেন্ডের জন্য তার উপর থেমে গেল। ইখতিয়ারও তাকাল। একটা সংক্ষিপ্ত চোখাচোখি। পাশে থাকা স্নিগ্ধাকে দেখল। ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করল। খোঁজখবর নিলো। স্নিগ্ধা ও হাসল।
তারপর ইখতিয়ার স্বাভাবিক গলায় বলল,
“উপরে যাচ্ছি।”
মুগ্ধা আর দাঁড়াল না। হঠাৎ উঠে বলল,
“আমি যাই।”
ইশতিয়াক সঙ্গে সঙ্গে চোখ কুঁচকাল।
“কই যাও বইন?”
মুগ্ধা সোজা তাকাল।
“রুমে।”
“এত তাড়া ক্যান, এন্ট্রেনায় টান পড়েছে নাকি?”
মুগ্ধা চোখ কুঁচকে তাকালো,
”না ব্লুটুথ সিগন্যাল পাচ্ছি,লাগবে?”
”দিলে মন্দ হয় না”
”চুপ যা”
”তুই তোর বরের কাছে যা”
”তোর উপর ঠাডা পড়বে হতচ্ছাড়া”
”তোর উপর আস্ত ইখতিয়ার শেখ পড়বে”
মগ্ধা লজ্জা পেল। মিছে চোখ রাঙিয়ে উপরে গেল। ইশতিয়াক হাসল। এখন যদি এখানে রহিমা থাকত, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে যেত।
রুমে ঢুকেই মুগ্ধা থেমে গেল।
ওয়াশরুমের দরজা তখনও আধখোলা।
ইখতিয়ার বেরিয়ে আসছে।
ভেজা চুল, কাঁধ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। গায়ে শার্ট নেই, শুধু কোমরে একটা তোয়ালে বাঁধা। ভেজা ত্বকে বাতাস লেগে ঠান্ডা ভাব ছড়িয়ে আছে পুরো ঘরে।
মুগ্ধা যেন এক সেকেন্ডে জমে গেল।
চোখ বড় হয়ে গেছে। মুখে কোনো শব্দ নেই।
“আমি… নিচে ছিলাম…”
নিজেই থেমে গেল সে। লজ্জায় গলা শুকিয়ে আসছে।ইখতিয়ার প্রথমে তাকালই না। খুব স্বাভাবিকভাবে ওয়াশরুমের পাশে দাঁড়িয়ে চুল মুছতে শুরু করল। যেন মুগ্ধার উপস্থিতি তার কাছে খুব সাধারণ কিছু।
কিন্তু সত্যি কি তাই? মুগ্ধা এখনো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চোখ সরাতে চাইছে, পারছে না।
ইখতিয়ারের প্রতিটা স্বাভাবিক নড়াচড়া যেন অস্বাভাবিকভাবে ভারী লাগছে তার কাছে।
সে আলমারির দিকে এগিয়ে গেল।
কাপড় নিতে নিতে শান্ত গলায় বলল,
“দরজা লাগায় দাও।”
গলাটা একদম স্বাভাবিক।
কিন্তু মুগ্ধা বুঝতে পারছে, ভেতরে একটা অদ্ভুত চাপ আছে।
সে তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল দুই ধারে। হয়ত ঘোর কাটাতে।
“জি…?”
সে বোঝেনি। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ইখতিয়ারের দিকে। ইখতিয়ার ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
দরজার দিকে তাকিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
”দরজা লাগিয়ে দাও,লোকে দেখবে।
এতেই যেন নিঃশ্বাস ছুটে গেল মুগ্ধার। ছুটে বেরিয়ে এলো ইখতিয়ারের ঘর থেকে। ইখতিয়ার সরু চোখে তাকিয়ে থাকল। মুখে মুচকি হাঁসির রেখা ভেসে উঠলো। আবার কালো মেঘে ন্যায় মিলিয়ে গেল সে হাসি।
রাত এগারোটা।
পুরো বাড়ি ঘুমের দেশে তলিয়ে গেছে প্রায়। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে মাঝে মাঝে। জানালার বাইরে রাতের বাতাসে নারকেল পাতাগুলো দুলছে ধীরে ধীরে। আধখোলা জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে ঘরে।
ঘরের ভেতর মৃদু হলুদ আলো।
ইখতিয়ার বিছানার একপাশে হেলান দিয়ে বসে আছে। হাতে ফোন। চুপচাপ কিছু করছে। আর মুগ্ধা?সে একদম উল্টো।
বিছানার উপর হাঁটু গেড়ে বসে আছে। সামনে বালিশ। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কাঁধে ছড়িয়ে আছে। মুখে হাজারটা কথা জমে আছে যেন।
“শুনেন?”
“হুম।”
“আজকে বৃষ্টি হওয়ার সময় বারান্দাটা অনেক সুন্দর লাগতেছিল।”
ইখতিয়ার ফোনে চোখ রেখেই বলল,
“হুম।”
“আপনি দেখেন নাই?”
“অফিসে ছিলাম।”
মুগ্ধা মুখ বাঁকাল।
“আপনি সব মিস করেন।”
“কি?”
“এই যে বৃষ্টি, বাতাস, গাছের গন্ধ… এইসব।”
ইখতিয়ার এবার চোখ তুলল।
মুগ্ধা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আজকে বৃষ্টি নামার আগে আকাশটা একদম ধূসর হয়ে গেছিল। মনে হচ্ছিল কেউ পানি রঙ দিয়ে আকাশ এঁকেছে।”
কথাগুলো বলার সময় মেয়েটার চোখ খুশিতে জ্বলজ্বল করছে। ইখতিয়ার চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
মুগ্ধা আবার বলল,
“আপনি কি কখনো বৃষ্টিতে ভিজছেন?”
“হুম।”
“সত্যি?”
মুগ্ধা তাকায়। একটু কথা বলার জন্য কত কি করা।
“ছোটবেলায়।”
“এখন?”
“সময় হয় না।”
মুগ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আপনার লাইফটা অনেক বোরিং।”
ইখতিয়ারের ঠোঁট নড়ল সামান্য।
“হতে পারে।”
“ অবশ্যই বোরিং।”
বলেই বিছানার উপর একটু সামনে এগিয়ে এলো মুগ্ধা।
“আচ্ছা, ছোটবেলায় আপনি কেমন ছিলেন?”
“সাধারণ।”
“সব প্রশ্নের এমন শুকনা উত্তর দেন ক্যান?”
“কারণ আমি এমনই।”
মুগ্ধা নাটকীয়ভাবে মাথা নাড়ল।
“আল্লাহ! আপনার বউ হওয়া কঠিন কাজ।”
ইখতিয়ারের বুকের ভেতর কেমন ধাক্কা খেল যেন। না করে উঠল।
মুগ্ধা পরক্ষনেই নিজেই হেসে ফেলল।
“তবে আমি মানিয়ে নিচ্ছি।”
ইখতিয়ার এবার ফোনটা পাশে রেখে দিল।
মুগ্ধা খুশি হয়ে বলল,
“এই তো! অবশেষে ফোন নামাইছেন।”
”তুমি অনেক কথা বলেন।”
“আপনার ভাগেরটাও বলি।”
ইখতিয়ারের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল। সে হাসি আবার সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে ও গেল। আস্তে আস্তে শুয়ে পড়ল সে। মুগ্ধার মুখে কালো অন্ধকার নেমে এলো। কথা বলছিল তো। এভাবে ইগনোর করার কি ছিল। মুগ্ধার চোখ বেয়ে পানি পড়ল। মুগ্ধা ইগনোর শব্দটা নিতে পারে না। আর তার সাথেই…
ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩
অনেকক্ষন বয়ে গেলো। মুগ্ধা ঠাঁয় বসে রইল বিছানার কোণে। আকাশকুসুম কি ভাবছে। ইখতিয়ার শুয়ে আছে। তবে ঘুমায় নি। বুকে যেন পাথর জমছে তার। হঠাৎ উঠে বসল সে। মুগ্ধার মুখ তার পুরুষালি দুই হাতের মধ্যে বন্দি করল। মুগ্ধা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। চোখে তার পানি শুকিয়ে দা হয়ে গেছে। ইখতিয়ার দেখল। তারপর চোখ রাখল মুগ্ধার দুইচোখে। ধীরে ধীরে আওড়ালো,
”এত কাঁদ কেন তুমি? পৃথিবীতে একজনের এটেনশন না পেলে কি এমন এলো গেলো বলতো?এতো ছিঁচকাদুনে কেন তুমি? আমায় একটু বোঝ, আই এম ট্রায়িং মাই বেস্ট টু মুভ অন,গিভ মি সাম টাইম, একটু সময় দাও মুগ্ধা!”
