রাগে অনুরাগে পর্ব ২৫
সুহাসিনি ফাতেহা
ফারাজ খান তার বেয়াদব বউকে কাঁধ থেকে নামিয়ে ধপাস করে বিছানায় ফেলে দিলো। শার্টের বোতামে আঙুল ঘুরাতে ঘুরাতে যতটা ঝুঁকা যায় ঠিক ততটাই ঝুঁকলো ওর মুখের কাছে। কণ্ঠে খাঁদ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“হুমম! খাটের নিচে বসে বসে তো ভালোই সাহস আসছিলো মুখে। ডিভোর্স চাই? এখন আমার চোখে চোখ রেখে বলো, দেখি তোমার সাহসের নমুনা।”
তিতলির ভয় করছে। এতকাছ থেকে ফারাজকে দেখে কাঁপছে সর্বাঙ্গ। ঠোঁট দুটো অনবরত কাঁপছে। শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি তীব্র। ফারাজের শরীরের তীব্র পুরুষালি সুবাস আর ভারী রাজকীয় উপস্থিতি নিমেষেই অবশ করে দিলো তার চারপাশ।
এইমুহূর্তে মস্তিষ্ক জুড়ে কয়েকশো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তার তো অন্য কারো সাথে বিয়ে হয়েছে? সে তো স্বামীকে দেখেনি। আর যদি কোনোভাবেই ভাল্লুকের সাথেই তার বিয়ে হয়ে থাকে তাহলে কেউ তাকে বলেনি কেন? ভাল্লুক তাকে নিজ মুখে বলছে বিয়ে করবে। তাহলে কি তার সাথে বিয়ে হওয়ার কথা বলেছে ? তুলতুলে ভালো লাগায় ভরে গেল বুকটা। তার ফারাজ এখন থেকে শুধুই তার। ভেবেই সপ্তদশীর মনে মনে খুশিতে লাফিয়ে লাফিয়ে নাচতে ইচ্ছে করে ….
ডিজে ভাল্লুক…ধুম ধুম .. ডিজে ফারাজ…
লা…লা..লা ডিজে ..ভাল্লুক স্যার…. ধুম..ধুম
গানটা সে নিজেই বানিয়েছে।
বেয়াদব বউকে কিছু না বলে গভীর ভাবনায় মত্ত দেখে ফারাজ বাঁকা হাসল। সহসা তিতলির মোলায়েম দুই হাত বিছানার দুপাশে চেপে ধরে যুবক কপট রাগ দেখিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
এখনো মনে হচ্ছে তোমার স্বামী অন্য কেউ ? হুম? নিজের স্বামী চিনো না বেয়াদব ? চোখ কোথায় থাকে তোমার?
তিতলিকে কেঁপে উঠতে দেখে ফারাজ স্রেফ রাগ দেখিয়ে বলল, নাকি এখানে আমি ছাড়া অন্য কেউ আছে? যে তোমার চোখে পড়ি না আমি?
তিতলি ভয়ে কাঁপছে। কথা বলার জন্য ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। গলায় বুঝি সব শব্দরা আটকে গেল। এত কাছ থেকে ফারাজকে কল্পনা করেনি। একদমই করেনি। চোখ তুলে ওই ধারালো নেত্রদ্বয় অবধি পৌঁছাতে তার দৃষ্টিযুগল বিফল হলো।
তাও কাঁপা গলায় মুখ ফস্কে যা পারলো বলল,
আ…আমি…আমি বিশ্বাস করি না আপনাকে । আমার স্বামীকে ডাকুন! বা…বাসর…বাসর করতে হবে তো আমাদের।
ফারাজ ভ্রু কুঁচকালো কৌতুকে। কাগজে কলমে গোটা সমাজকে জানিয়ে বিয়ে করে আনার পর বেয়াদব বউ বলছে তাকে স্বামী হিসাবে বিশ্বাস করে না। এসব শুনলে কি মেজাজ ঠিক থাকে? এখন তার মেজাজও ঠিক নেই। এখন দুগালে তিন চারটা থাপ্পড় বসাতে পারলে মনটা শান্ত হতো। কিন্তু সেটা করা যাবেনা। মুখের কথা যেহেতু বিশ্বাস করে না অন্য কিছু করে দেখাতে হবে। ফারাজ আচানক তিতলির শাড়ির আঁচলে হাত বাড়াতে গেলেই তিতলি আঁতকে ছিটকে দূরে সরে যায়।
ফারাজ চোখ ছোট করে তাকাতেই তার চিবুক গিয়ে গলদেশে ঠেকল। কণ্ঠে ভয়,লজ্জা,সব একত্র হলো,
শা…শাড়ি টানছেন কেন?
সহসা ধারালো দাঁতের রুষ্ট স্পর্শে গম্ভীর সুদর্শন মুখখানায় আচমকা শ্লেষাত্মক ভাবভঙ্গি ধরে রেখে মুখ নামালো মেয়েটার কানের কাছে। অতঃপর হিসহিসিয়ে আওড়াল,
একটু আগে বললে না তুমি বাসর করবে? তোমার তো অনেক শখ বাসর করার তাইনা? তাই আমিও ভাবলাম বাসর করলে মন্দ হয় না। আমি ভার ছেড়ে দিলে আমার লোড সামলাতে পারবে তো?
তিতলি যতই ফারাজ ফারাজ করুক। দাদুর মুখে ওসব শুনার পর থেকে বাসর সম্পর্কে ভয় কাজ করছে। এখন তাকে কে বাঁচাবে? সে তো ভাল্লুকের খাঁচায় বন্দি।
না..না আমি… আমি চিল্লাবো
ফারাজ ভ্রু নাচিয়ে শুধালো, তো আমি কি তোমাকে নিষেধ করেছি? সবাইকে ডাকো। তারপর বলো তোমার স্বামী তোমার শাড়ি ধরে টানতেছে। এতে লজ্জা কার হবে? আমার নাকি তোমার?
তিতলির সহজ সরল স্বীকারোক্তি,
আপনার লজ্জা হবে।
ফারাজ সে কথা আদৌ শুনলো কিনা কে-জানে। বেয়াদব বউকে সত্যি সত্যি বাসর দেখানোর জন্য সামান্য ঝুঁকে এলো। ঠোঁটের কোণে বাঁক এনে আচানক ঠান্ডা, নিরেট হাতখানা তিতলির কোমর ছুঁলো যখনই। শিউরে উঠল তিতলির সমস্ত কাঁপা দেহ। বক্ষস্পন্দন আকাশ ছুঁলো ওমনি। অনুভূতিরা মেঘ ছিদ্র করে পালাল তখন। অশান্ত মন স্থির, অবিচল হলো। ফারাজের হাত থেমে নেই, ডান হাতের মধ্যমা ও তর্জনী দুই আঙুল স্লাইড করে নেমে যাচ্ছে কোমরের ভাঁজে।
তিতলির চোখ বুজে আসতে চায়। চোখ খুলে রাখতে পারে না। সুরসুর করছে পুরো শরীর। তিতলি গাল বেঁকে পৌঁছায় কানের কাছে।
আ…আপনার হাত না–নামান। মরে যা…..
ফারাজ পথিমধ্যেই কথা কে*ড়ে নিয়ে বলল,
কেন? বাসর করার শখ মিটে গেছে?
আমি…আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না।
সামান্য ঝুঁকে আসাতেই এ অবস্থা হলে গোটা আমাকে সামলাবে কিভাবে? বলে ফারাজ কোমর থেকে হাত সরাল তখনই।
সপ্তদশী হাফ ছেড়ে বাঁচল যেন। তৎক্ষণাৎ বুক ফুলিয়ে বড়বড় নিশ্বাস ছাড়ল। ফারাজের খোঁচা মারা কথা গায়ে মাখল না। অভিমানে মেয়েটার কন্ঠ আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে এলো,
আপনি তো আমাকে দেখতে পারেন না। তাহলে বিয়ে করছেন কেন?
কি করবো আমার শ্বশুর তার বেয়াদব মেয়েকে আমার ঘাঁড়ে জোর করে চেপে দিয়েছে। আমিও মায়া দেখিয়ে আর না করি নি বেয়াদব দেখে মায়া হলো। বেয়াদব মেয়েদের প্রতি আমার আবার কৌতূহল বেশি
নিরুৎসাহিত উত্তরে তিতলি আশ্চর্য বনে গেল।
সে বুঝে না লোকটা কি চায়।
অবুঝ ভঙ্গিতে বলল,
আপনি আমাকে ভালোবাসেন আমি জানি।
প্রশ্ন করে তিতলি খুব করে চাইল যেন ফারাজ বলবে,
হ্যাঁ আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া বাঁচব না।
হয়নি। তাকে আহত করতে বাঁকা উত্তর এলো,
তোমার মতো বেয়াদব মেয়েকে শাস্তি দেওয়া যায় ভালোবাসা যায় না
তিতলির খুব কান্না পেলো। নাক ফুলে উঠল। তাও কেঁদে দিবে ওমন ভাব নিয়ে বলল,
শাস্তি দেন। আমি আমার শ্বশুর আব্বুর কাছে নালিশ করবো আপনার খারাপ ছেলে আমাকে ভালোবাসে না শুধু ধমকায়! হুহ!
ফারাজ তীর্যক হাসল। বেয়াদব বউ বুদ্ধিমতি হতে পারে। কিন্তু তার কাছে সে বুদ্ধি নিতান্তই বোকামি ছাড়া কিছুনা। তিতলির কথায় ফিরিয়ে দিলো,
আমিও তোমার আব্বুকে বলবো, আপনার মেয়ে আমার সাথে বেয়াদবি করে নিয়ে যান ওকে।
বলা লাগবো না আমি কালকেই চলে যাবো থাকবো না আপনার সাথে
তিতলির কথার মাঝে হঠাৎ কারেন্ট চলে গেল।
তিতলি অন্ধকারে ভয় পায়। রাতে ঘুমালেও সারারাত লাইট অন করে রাখে। আর এখন সহসা কারেন্ট চলে যাওয়ায় পুরো রুম ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল। ভয়ে তটস্থ বোকা মানবী সব ভুলে সামনের যুবককে জড়িয়ে ধরল। নিজে নিজেই বলল,
না, না ছাড়বেন না হ্যাঁ। আমি অন্ধকারে ভয় পাই আমাকে ধরে রাখুন। নয়তো চিল্লাবো আমি!
বুক কাঁপছে যু্বকের। ফেলে রাখা হাতদুটো তার, মুষ্টিবদ্ধ হয়েছে আনমনে। বিড়বিড় করে আওড়াল,
কারেন্ট যাওয়ার আর সময় পেলো না। বেয়াদব বউকে এখন কয়েকটা কড়া কথা শুনাতে মন চাইছে।
ফারাজের বিড়বিড় শেষ হতে না হতেই চমকের মতোই কারেন্ট এসে পুরো রুম আলোকিত করে দিলো মুহূর্তেই। কিন্তু তিতলি একই ভাবে ধরে রাখল।
ফারাজ নিজে থেকে ছাড়াতে চেয়ে ধমকের সুরে বলল,
কারেন্ট চলে এসেছে। ছাড়ো আমায়।
সপ্তাদশী নিজের মধ্যে নেই। খেই হারিয়েছে অনুভূতিতে। তৎক্ষণাৎ জিভ ফস্কে বেরিয়ে এলো,
না ছাড়লে হয় না।
কথা না শুনলে ওয়াশরুমে গিয়ে রেখে আসবো তখন অন্ধকারে চিল্লালেও আমি যাবো না আনতে
তিতলি বুঝতে পেরে লাজুক ভঙিতে পল্লব ঝাপটে চুল গুঁজল কানে। সে এতক্ষণ ভাল্লুকের বুকে মুখ গুঁজে পড়েছিল ভাবতেই কিশোরী মনে অদ্ভুত শিহরণ জাগল। কিন্তু হেরে যাওয়ার পাত্রী সে নয়। তাকে কথা শুনিয়েছ সে কি ছেড়ে দিবে,
ছাড়ছি ছাড়ছি আপনি শুনুন আপনার ভবিষ্যৎ কারেন্ট চলে যাওয়ার মতো অন্ধকার হয়ে যাবে ২০০ বার বদদোয়া।
কার ভবিষ্যৎ অন্ধকার হবে সেটা সময় হলেই দেখতে পাবে। এখন এত বকবক না করে ঘুমাও তো!
আমি কোথায় ঘুমাবো?
খাটের নিচে ঘুমাও। তোমার জায়গা খাটের নিচে।
তিতলি ঘাবড়ে গিয়ে বলল,
আমি খাটের নিচে কিভাবে ঘুমাবো?
যেভাবে লুকিয়ে ছিলে সেভাবে।
আমি..পারবো না।
ফারাজ কিছু না বলে তিতলিকে একটা কাঁথা আর বালিশ দিয়ে বলল,
নিচে ঘুমাও। পেত্নীর মতো বড়বড় নখ নিয়ে আমার পাশে ঘুমানোর চিন্তা বাদ দাও।
তিতলির কিশোরী মনে রাগের সঞ্চার ঘটলো। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ছো মেড়ে সেগুলো নিয়ে টাইলেসে বিছাল। তারপর অন্যদিক মুখ করে শুয়ে বলল,
লাইট অফ করবেন না।
ফারাজ উত্তর দেয় না। বেয়াদব বউটাকে শাস্তি দিতে বিয়ে করেছে প্রেম ভালোবাসা করতে নয়। তাকে জ্বালানোর শাস্তি এক দুই করে সুদে আসলে উসুল করে নিবে।
.
.
রাতের আঁধার কেটে অবশেষে সকাল হলো। দেওয়াল ঘড়িতে সকাল আটটা। তিতলি রাতে রাগে, জেদে ইচ্ছে করেই খাটের তলে ঢুকে গেছে। প্রথমে ঘুম না আসলেও ফজরের দিকে চোখ লেগে এসেছে। নিজের রুম ছাড়া অন্য রুমে ঘুমাতে অভ্যস্ত নয়। তারউপর নিচে। তিতলি সহসা চোখ খুলতেই সে আবিষ্কার করে সে বিছানায়।
সপ্তদশী চমকাল, থমকাল,ভড়কাল।
তাকে বিছানায় কে আনলো? ফারাজের কথা মনে হতেই মুখ ভেঙচি কাটল। ভাল্লুক আনলো না তো? নাকি সে স্বপ্ন দেখছে? ভাবনার মাঝেই বাহির থেকে দরজায় টোকা দিলো কেউ। বিছানায় ফারাজকে দেখল ও না। তিতলি নিচে নামল। পরনের শাড়িটার অবস্থা খোলে যাবে এমন বেগাতিক অবস্থা। তাকে কি ওই লোক এমন অবস্থায় দেখে… ভাবতেই লাল নীল গোলাপী হয়ে উঠল চেহারা। তার গম্ভীর ফারাজ একান্তই তার স্বামী হয়ে গেছে ভাবতেই লজ্জায় শিহরিত হয়ে উঠছে দেহ। রাতের কথা ভেবে ইচ্ছে করে খাটের নিচে ঢুকে যেতে। কিন্তু পাষাণ লোকতো তাকে বুঝেনা। তাকে বুঝা পর্যন্ত ভাল্লুকের জীবনে শান্তি আসতে দিবে না।
দরজায় আবার টোকা পড়তেই তিতলি ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো। মাথায় ঘোমটা দিয়ে নতুন বউয়ের মানে ফারাজের বউ হওয়ার ভান ধরল। সবার সামনে যেতে লজ্জা লাগছে খুব। তিতলি এগিয়ে দরজার ছিটকিনি খোলে দিলো,
চোখের সামনে দেখা মিললো রাতের সেই গ্লাসে দুধ দিয়ে বাসর ঘর সম্পর্কে ইত্যাদি ইত্যাদি বুঝিয়ে দেওয়া মহিলাটা। হাসিমাখা মুখে বললেন,
“ঘুম কেমন হয়ছে মা?”
তিতলি ছোট করে উত্তর দিল, ভালো শাশুড়ি আম্মু!
ভদ্রমহিলার কপালে ভাঁজ পড়ল। পরপরই বললেন, “আমি তোমার ছোট চাচি শাশুড়ি। ফারাজ চাচিমনি বলে ডাকে তুমিও ডেকো কেমন।”
“জ্বি চাচিমনি।”
“ফারাজ কই? এখনো ঘুমাচ্ছে নাকি?”
ভাল্ল…” তিতলি নিজের মুখ বন্ধ করতে চাইল দুহাতে। ফের বলল,
” না না উনি তো রুমে নেই।”
আলভীর মা রাহেনা বেগম মুচকি হেসে বললেন,
“বাইরে তো যায় নি! মনে হয় ওয়াশরুমে গেছে। আচ্ছা তাড়াতাড়ি গোসল করে নাও।”
তিতলি অবাক হওয়ার মতো বলল,
“এত সকালে?”
“মেয়ে তো দেখি কিছুই জানে না। আচ্ছা গোসল করে নিও। তাড়াতাড়ি রেডি হতে হবে তোমায় নিচে আত্মীয় স্বজনরা দেখতে আসবে।”
বলে মহিলা টা চলে গেলেন। তিতলি দরজা লাগিয়ে ঘুরতে গেল, তখনি সামনে এসে দাঁড়াল ফারাজ খান। নাকটা মুহূর্তে ঠু*কে গেল যুবকের ভেজা লোমশযুক্ত বুকে। তিতলি পিছিয়ে এলো খানিক। চোখ ঝাপটে ধাতস্থ হলো। সামনের মানুষটাকে দেখে পিছনে ফিরলো তখনি।
ফারাজ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। বেয়াদব মেয়ের আবার কি হলো? সে হাত ধরতে নিলে
তিতলি পেছন থেকে কাঁপা গলায় বলে,
“আপ…আপনি কিছু পরুন নির্লজ্জ বেহায়া লোক! একদম খালি গায়ে আমার সা-সামনে আসবেন না।”
ফারাজ কপাল কুঁচকে রাখল আগের মতোই,
“আমার রুম আমি যেভাবে ইচ্ছে আসবো তোমার কি? তোমার জন্য আমার নিয়ম বদলাবে না।”
“বদলাতে হবে!”
“কেন?” শব্দ কম কণ্ঠ নিরেট!
“আমার ল..লজ্জা লাগে!”
“লাগুক!”
বলে ফারাজ তিতলির কুনই শক্ত করে ধরে টেনে এনে সোফায় বসালো। হাতে নেইল কাটার মেশিন। আজকে বেয়াদব বউর নখ গুলো গোড়া থেকে কেটে দিবে। হাত ধরে নখের সামনে ধরতেই তিতলি নেইল দেখে হাত ছাড়ানোর জন্য চেষ্টা করল,
“ছাড়ুন, ছাড়ুন! ব্যাথা পাই।”
” চুপচাপ বসে থাকো নাহলে বিষয়টা শুধু নখ কাটাতে শেষ হবে না চুল ও কেটে দিবো।”
তিতলি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার শখের নখ।
“আমার নখ কাটবো না! প্লিজ কাটবেন না।”
ফারাজ শক্ত মেজাজে হিসহিসিয়ে বলল,
“ভূতের নখ কাটতেছি। দেখতে বিচ্ছিরি লাগছে।”
“আমার শখের নখ প্লিজ দয়া করে নখ কাটবেন না।”
ফারাজ শুনলো না সে কথা। তিতলির সুন্দর সুন্দর নখ গুলো একেএকা কেটে দিচ্ছে।
বোকা মেয়েটার দুঃখে রীতিমত দুঃখবোধের শেষ নেই। কত শখের নখ চোখের সামনেই নাই হয়ে যাচ্ছে।
দু তিনবার আহারে! আহারে বিড়বিড় করল।
নখ বাম হাতের গুলো বড় ছিলো। ডান হাতের নখ ছোট তাই ফারাজ বাম হাতের সব নখ কেটে দিলো। তাকে চিমটি কাটার শাস্তি।
“আপনি খুব খারাপ লোক !” নাক টেনে বলল তিতলি।
ফারাজের সোজাসাপটা উত্তর এলো,
“হুমম বুঝতে পেরেছো।”
“ভাল্লুক কোথাকার!”
“থাপ্পড় দিয়ে সব দাঁত ফেলে দিবো বেয়াদব।”
তিতলি কথা ঘুরিয়ে বলল,
“আপনি আমাকে বিছানায় তুলেছেন আমি জানি। এত সুন্দীর কিউট বউকে নিচে রেখে একা একা ঘুমাতে পারেন না বুঝি?”
ফারাজ ভ্রু কুঁচকে বিদ্রুপ করে বলল,
“ঘুমালে ব্যাঙের মতো লাফায় এমন মেয়ের সাথে আমি এক বিছানায় থাকবো এটা ভাবলে কি করে হুমম?”
“তাহলে আমাকে উ..উপরে তুলছেন কেন? আপনি তো আমাকে ভালোবাসেন না।”
“স্বামী বলে একটা দায়িত্ব আছে না। বউকে খাটের নিচে ঘুমাতে থাকতে দেখে দয়া করে উপরে তুলে দিলাম! এবার এখান থেকে যাও তো।”
তিতলির হঠাৎ টেবিলে গ্লাসের দুধ গুলোর দিকে চোখ গেল। রাতে ছোট চাচি শাশুড়ি দিয়ে গেছে। রাতে ভুলে গিয়ে দিতে পারে নি। তো কি হয়ছে এখন বাসি দুধ খাওয়াবে। তিতলি চঞ্চল পায়ে উঠে এলো। মিথ্যা বলল,
“নিন আপনার দুধ এগুলো খান। এখন ছোট চাচিশাশুড়ি দিয়ে গেছে।”
” রাত থেকে দেখলাম টেবিলে গ্লাস ভর্তি দুধ। ওয়াশরুমে যাওয়ার সময়ও দেখেছি তাহলে এখন আবার কখন দুধ দিয়ে গেলো। মিথ্যা বলছো কেন?”
“এখন এখানে এসে দিয়ে গেছে দেখলেন না আমি দরজা লাগিয়েছি।”
ফারাজ ভাবে সে তো দরজা থেকে নিজেই বেয়াদব বউকে টেনে এনে বসালো। চোখ ছোট করে তাকাতেই তিতলি আবারও বলল,
“আপনাকে দিতে বলছে আমারও স্ত্রী বলে একটা দায়িত্ব আছে না , নিন খান।”
ফারাজ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। সহসা ঠোঁটের কোণে বাঁকা হেসে তিতলির বাড়িয়ে রাখা গ্লাসটা হাতে নিলো।
তিতলি ঠোঁট প্রসারিত করে হাসল। কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ টিকলো না। তৎক্ষণাৎ ফারাজ গ্লাসটা তিতলির মুখের সামনে জোর করে ধরল,
“আমারও স্বামী বলে একটা দায়িত্ব আছে না নিজের ভাগের টা স্ত্রীকে খাওয়ানোর চুপচাপ খা।”
“আরে…আরে কি করছেন খাবো না আমি খায় না!”
“কেন? খুব তো আমাকে খাওয়ানোর জন্য জোর করছিলে এখন খাবে না কেন? খেতে হবে দেখি মুখ খোল! ”
“আ..আমার গোসল করতে হবে চাচিশাশুড়ি বলে গেছেন। ছাড়ুন।”
” আগে খা! তারপর গোসল ।”
তিতলি ভয় পেয়ে গেল। নিজের পায়ে নিজে কু*ড়াল মারল। এই লোক তো সহজে তাকে ছাড়বে না। উপায়ন্তর না পেয়ে তিতলি ফারাজের হাতে দাঁত বসিয়ে দিলো।
“বেয়াদব তোমাকে আমি দুধ খেতে বলেছি আমাকে না। নখের মতো দাঁত কেটে দিতে হবে মনে হচ্ছে।”
তিতলি দৌড়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।
ফারাজ কাম*ড় বসানো জায়গায় নজর বুলিয়ে দ্রুত নেভি-ব্লু রঙা একটা শার্ট গায়ে জাড়লো। এই বেয়াদব বউকে তো সে দেখেই ছাড়বে। শুধু সামনে পাক পালিয়ে আর কই যাবে ঘুরেফিরে সেই তার ঠিকানায় আসতে হবে। তখন সুদ তুলবে এর।
সকাল দশটা প্রায়।
ড্রয়িংরুমে বড়রা কেউ কেউ কাজ করছে। আবার কেউ সোফায় বসে আছে। তিতলিকে সাজিয়ে নিয়ে এসেছে ঝিলিক আর রুপসা মিলে। হালকা মেরুন রঙা কারুকাজ করা একটা জামদানি শাড়ি পড়িয়ে গলায়, হাতে, কানে প্রয়োজনীয় কিছু স্বর্নের জুয়েলারি সহ ঠোঁটে হালকা লিপিস্টিক চোখে কাজল দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে। এতেই মেয়েটাকে চোখ ধাঁধানো সুন্দর লাগছে। তিতলির সামনে ও পাশে বসে আছেন বড়রা। ফারাজের খালা,চাচি,ফুপুরা বসে আছেন। নাছিমা ঠোঁট বেঁকিয়ে বললেন,
বউর তো এখনো নাক পুরায় নাই দেখি। মেয়ে বিয়ে দিতে পারে মেয়ের নাক পুরায়তে হয় ওটা জানে না।
তিতলি বসে বসে এসব শুনছে। কি খারাপ মহিলা। মন চাইল ঘোমটা নামিয়ে দেখতে।
অয়নের মা রুমানা বেগম বললেন,
নাক পুরায় নাই তো কি হয়ছে পুরায় নেওয়া যাবে।
এর মাঝে ছকিনা খাতুন নাতবউকে নিচে এনেছে শুনে রুম থেকে দৌড়ে এসেছেন। নাতবউর সাথে নাস্তা করবেন বলে এখনো নাস্তা না করে বসে আছেন। এসেই বললেন,
কি গো নাতবউ বাসর রাইতে নাতি আদর সোহাগ কইরছে নি? নাতিরে সামলাতে পারছো নি?
তিতলি লজ্জায় মুখ নুইয়ে নিল। এত লজ্জা করছে কেন? তার তো লজ্জায় তুষার ভাইয়ের সাথেও ঠিক মতো কথা বলতে পারছে না।
ছকিনা খাতুন হেসে বললেন,
থাক লজ্জা পাইতে অইবো না। আইয়ো বিয়ার হরের দিন বহুত লজ্জা পাইছিলাম।
ফারিন বেগম পুত্রবধু ও শাশুড়ির জন্য নাস্তা নিয়ে এলেন। সবাই নাস্তা করে ফেলেছে। শুধু পুত্রবধু আর শাশুড়ি বাকি। ছকিনা খাতুন বললেন,
আমার নাতি ফারাজ কই তারে ডাক দেও
ফারাজ কোথায় বেরিয়ে গেছে। ডাকলেও বললো জুরুরী কাজ। বিয়ের পরেরদিন ও এত জুরুরী কাজ কোথায় থেকে আসে ফারিন বেগম ছেলেদের কর্মকান্ড দেখে বাঁচেন না। যাই হোক বিয়ে করেছে এটাই অনেক। ফারিন বেগম বললেন,
বাইরে গেছে আম্মা।
তিতলি মুখ ভেঙচি কাটল ঘোমটার আড়ালে। বাইরে গেছে? গোল্লায় যাক। ভাল্লুক কোথাকার!
তিতলি খাচ্ছে না দেখে ফারিন বেগম আদরমাখা গলায় বললেন,
খাও মা। লজ্জা পাওয়ার কারণ নেই। এটা তোমার বাবার বাড়ির। যখন যা ইচ্ছে হয় আমাকে বা তোমার শ্বশুর আব্বুকে বলবে।
তিতলি উপর নিচ মাথা নাড়ালো। তার আব্বু আম্মুর কথা মনে পড়ছে। চোখ ভিজে উঠল।
ফারিন বেগম আরো কিছু কথা বলে কিচেনের দিকে গেলেন।
ঝিলিক বাড়ির বাইরে বাগানে এসেছে। মূলত তুষার তাকে ডেকেছে। কেন ডেকেছে মেয়েটা শুধু সেটা ভাবছে। তার সাথে কি উনার? লজ্জায় সামনে যেতে পারে না ওই ঘটনার পর থেকে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাছ থেকে একটা অপারাজিতা ফুল ছিড়বে তখনি শুনতে পেলো পুরুষালী গম্ভীর কণ্ঠস্বর…”
“দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাছের ফুল ছি*ড়া হচ্ছে ?”
ঝিলিক চমকে উঠল। পেছনে ফিরল না।
“ক..কই না.. নাতো!”
তুষার কপাল কুঁচকে রাখলো কিছুক্ষণ।
পরক্ষণেই বলল,
রাগে অনুরাগে পর্ব ২৪
“আমার দিকে ফিরে কথা বলুন।”
“কি ক..কথা বলবো? ”
“আমি যা বলবো তার উত্তর দিবেন তাতেই হবে! ”
ঝিলিক শক্ত হয়ে আগের জায়গায় ঠাঁয় দাড়িয়ে রইল। কোনোরকম বলর,
“ব.লেন বলেন আমি শুনছি।”
সহসা পেছন থেকে ভেসে এলো দুষ্টু কণ্ঠ,
“আরে এখানে প্রেম প্রেম কিছু চলছে নাকি? দুঃখের কথা জীবনে একটা প্রেম করতে পারলাম না।”
