Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৯

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৯

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৯
‎আফীফা আফনান
রৌদ্রদীপ্ত এক নতুন সকাল। সেই মুগ্ধকর সকালেই টানা চার দিন ধরে তীব্র অসুস্থতা ও মানসিকভাবে ঘরবন্দি থাকার পর আজ মেহুল হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার জন্য রেডি হয়ে নিচে নামল।
‎​দীর্ঘদিন পর কাজে ফেরা, তাই একটু তড়িঘড়ি করেই হাতে বেশ খানিকটা সময় নিয়েই সকালে বেরিয়েছে সে। কারণ সাধারণত প্রতিদিন এই সময়ে ফ্ল্যাটের গেটের সামনে রিকশার জন্য তাকে অন্তত পাঁচ থেকে দশ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করতে হয়।
‎​কিন্তু আজ নিচে নেমে গেটের কাছে পৌঁছাতেই মেহুল এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গেল!
‎​গেটের সামনেই সারি বেঁধে অন্তত চার-পাঁচটা খালি রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। আর তার চেয়েও অবাক করার বিষয় মেহুলকে গেট দিয়ে বের হতে দেখেই তারা যেন চকিতে সতর্ক হয়ে উঠলো এবং প্রতিটা রিকশা একসাথে এসে তার সামনে ভিড় জমাল!
‎ঠিক যেন তারা এতক্ষণ কেবল এই একটা মানুষের জন্যই চাতক পাখির মতো পথ চেয়ে অপেক্ষা করছিল!
শুধু তা-ই নয়, মেহুলের সামনে এসেই চালকেরা নিজেদের মধ্যে শোরগোল ও ঝগড়া বাঁধিয়ে দিল—কে আজ মেহুলকে হাসপাতালে পৌঁছে দেবে! আর যা দেখেই ​মেহুলের মনে ঘোর সন্দেহ ও বিস্ময় দানা বাঁধল। অতঃপর সে দু-এক পা পিছিয়ে এসে রিকশাওয়ালাদের শোরগোল থামিয়ে তীব্র চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “থামুন তো আপনারা! অদ্ভুত তো, এভাবে ঝগড়া করছেন কেন! আর আপনারা জানলেন কীভাবে যে আমি এই সাতসকালে হাসপাতালেই যাব?”
‎মেহুলের হঠাৎ প্রশ্নে ​সবাই একটু থতমত খেয়ে গেল।
‎”কি হলো বলুন? কিভাবে জানলেন?”
‎মেহুলের ধমকে শেষমেশ তাদের ভেতর থেকে এক প্রবীণ, বৃদ্ধ রিকশাচালক হাত কপালে ঠেকিয়ে আমতা আমতা করে বলে উঠলেন, “ওই যে মা… আপনাকে তো হাসপাতালে ঢুকতে-বের হতে কতবার দেখেছি! আমরা তো জানি আপনি আমাগো হাসপাতালের নতুন মেমসাহেব ডাক্তার! তাই ভাবলাম আপনাকে একটু ভালোয় ভালোয় পৌঁছে দিই। আর আমরাও দুইটা টাকা ইনকাম করি!”
‎লোকটা​ কথাটা বললেও তা শুনে মেহুলের ঠিক হজম হলো না। মন বলছিল এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য বা চক্রান্ত আছে। তবুও সে অহেতুক কথা না বাড়িয়ে দেরি হবে দেখে আর কোনো প্রশ্ন করল না; শেষমেশ ওই বৃদ্ধ চাচার রিকশাতেই উঠে বসল। ​রিকশা চলতে লাগল। কিন্তু আসল বিপত্তিটা বাঁধল ঠিক যখন রিকশাটি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে এসে থামল।
‎​মেহুল ব্যাগ থেকে ভাড়ার পার্স বের করে বৃদ্ধ চালকের দিকে নির্দিষ্ট ভাড়ার টাকাটা বাড়িয়ে দিতেই হঠাৎ লোকটা আঁতকে উঠে হাত গুটিয়ে নিল!
‎​”না না, মেমসাহেব! আপনার কাছ থেকে টাকা নেওয়া যাবে না।”
‎​মেহুল ভ্রু কুঁচকে ভাড়ার টাকাটা আরও একটু সামনে বাড়িয়ে বলল, “মানে কী চাচা? টাকা নেবেন না কেন? কষ্টের উপার্জন, নেবেন না কেন?”
‎​বৃদ্ধ লোকটা একদম হাতজোড় করে ফেললেন, “না মা, ভুল বুঝবেন না। আপনার কাছে থেকে ভাড়া নেওয়া আমাদের বারণ!”
‎​মেহুল ভ্রু কুঁচকে নিলো তার মাথার রগ তখন রিকশার ঝাঁকুনির চেয়েও বেশি গরম হয়ে উঠেছে! সে গলার স্বর কিছুটা শক্ত করে জেরা শুরু করল, “বারণ মানে! কে বারণ করেছে আপনাকে টাকা নিতে, চাচা? বলুন তো!”
‎​লোকটি তীব্র ইতস্তত করতে লাগলেন। চোখে-মুখে ভয় আর দ্বিধার স্পষ্ট ছাপ। তিনি কিছুতেই নামটা মুখে আনতে চাইছিলেন না। কিন্তু মেহুল তাকে ছাড়ার পাত্রী নয়; সে চোখ শক্ত করে প্রখর দৃষ্টিতে তাকিয়ে জেরা চালাতে লাগল। কিন্তু ​মেহুল লোকটার ভীতিগ্রস্ত চেহারা দেখেই পুরো ছকটা একলহমায় ধরে ফেলল। তার বুঝতে আর একবিন্দু বাকি রইল না—কেন তার প্রতি এমন অলৌকিক দয়া দেখানো হচ্ছে!
‎অতঃপর ​ভেতরের জ্বলন্ত রাগটা প্রচণ্ড কষ্টে সংবরণ করল মেহুল। সে নিজেকে শান্ত রেখে মৃদু হেসে রিকশাওয়ালা চাচার হাতের তালুতে জোর করেই টাকাটা গুঁজে দিল। তারপর অত্যন্ত দৃঢ় ও স্পষ্ট গলায় বলল—
‎​”টাকাটা রাখুন চাচা! আপনাকে কারো হুকুম শুনতে হবে না। আর না আমি ফ্রিতে আপনার রিকশার যাএী হবো! আর শোনেন… আপনি যদি চান, তবে প্রতিদিন আমাকে হাসপাতালে আনা-নেওয়ার কাজটা নিশ্চিন্তে নিতে পারেন, যদি আপনার কোনো অসুবিধা না থাকে। তবে ভাড়াটা আমিই দেব।”
‎​মেহুলের এমন ব্যবহারে বৃদ্ধ রিকশাচালকের মুখে নিমেষে আনন্দের হাসি ফুটে উঠলেও ভেতরে একটু ভয় ও দ্বিধা থেকে গেল।
‎​তা টের পেয়ে মেহুল লোকটার দিকে তাকিয়ে পরম প্রত্যয়ে বলল, “আপনার কাউকে ভয় পাওয়ার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই, কেউ আপনাকে কিচ্ছু বলবে না! আর যদি কেউ এসে কিছু জিগ্যেসও করে, তবে তার মুখে সোজা বলে দেবেন—ডক্টর মেহুল ইকবাল কারো কাছ থেকে বিনা কারণে কোনো করুণা বা দয়া নেয় না! বরং দরকার পড়লে অন্যকে সাহায্য করে!”
‎​কথাটা শেষ করেই বৃদ্ধ চালককে একটা নম্র ধন্যবাদ জানিয়ে মেহুল হাসপাতালের প্রধান গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।
‎​মেহুল যখন হাসপাতালের চত্বর পেরিয়ে ইনডোরের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল, তখন চারপাশের পরিবেশটা একদম শান্ত ও স্বাভাবিক বলে মনে হলো। কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা বা অতিরঞ্জিত নাটকীয়তা ছিল না।
‎​গেটের দানোয়ান তাকে দেখে আগের মতোই সশ্রদ্ধ সালাম জানাল। রিসেপশনের স্টাফরা আগের মতোই মিষ্টি হেসে শুভসকাল পেশ করল। এমনকি প্রতিদিন যেসব নার্স ও অ্যাসিস্ট্যান্টদের সাথে তার ডিউটি পড়ে, তারাও একদম সহজ ও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কাজ করে যাচ্ছিল।
‎​অথচ চার দিন আগের সেই প্রকাশ্য অনাকাঙ্ক্ষিত স্যান্ডেল-কাণ্ডের পর মেহুল মনে মনে ভেবেই নিয়েছিল—আজ হাসপাতালে পা রাখামাত্র হয়তো শত শত কৌতূহলী ও বিষাক্ত চোখ তার দিকে কুৎসিত কানাঘুষা আর গসিপের তির ছুড়ে মারবে! পুরো হাসপাতাল তাকে নিয়ে কুৎসা রটাতে ব্যস্ত থাকবে।
‎​কিন্তু না! এখানে দৃশ্যপট একদম শান্ত ও শীতল—যেন চার দিন আগে এমন কোনো ঝড় এখানে ধেয়েই আসেনি! তাই মেহুল ধীরপায়ে নিজের কেবিনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
‎সময় তার নিজের গতিতেই এগোতে লাগল। মেহুলও নিজের কেবিনে এসে জরুরি পেশেন্ট দেখা আর ফাইল চেক করার কাজে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এদিকে ​কাজের মাঝেই ডক্টর ফেরদৌসী একবার এসে মেহুলের কেবিনে দেখা করে গেলেন। মেহুল এখন পুরোপুরি সুস্থ কি না, কোনো দুর্বলতা বোধ করছে কি না—মেহুলকে ভালো করে পরখ করে আর পরম স্নেহে খোঁজখবর নিয়ে তিনি আবার নিজের ডিউটিতে ফিরে গেলেন।
‎তিনি যাওয়ার ঘন্টাখানেক পরেই মেহুলের ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক সহযোগী নার্স হাতে একটা ট্রে নিয়ে কেবিনে হাজির হলো। ট্রিতে হালকা ফ্রেশ জুস আর নাশতা সাজানো।
‎​নার্সটি এসেই নম্র ভঙ্গিতে বলল, “ম্যাম, আপনার নাশতা! ডাক্টর ফেরদৌসী ম্যাম নিজ দায়িত্বে এটা আপনার জন্য পাঠিয়েছেন।”
‎​মেহুল একটা পেশেন্ট ফাইল দেখছিল। কারো কন্ঠের শব্দে মুখ তুলে তাকিয়ে মেহুল শান্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ, টেবিলের ওপর রাখো। তুমি খেয়েছ?”
‎​নার্সটি বিনীত হেসে জবাব দিল, “না ম্যাম, যাইনি এখনো। এখান থেকে গিয়ে খাব।”
‎​”ঠিক আছে, আগে যাও নিজে খেয়ে এসো।”
‎​অনুমতি পেয়ে নার্সটি দরজার দিকে পা বাড়াতেই মেহুল একটু থমকে গেল। মনের ভেতরে জমানো খটকাটা শেষমেশ সে চেপে রাখতে পারল না। অতঃপর নার্সটিকে মৃদুস্বরে থামাল, “শুনো…”
‎​নার্সটি সাথে সাথে ঘুরে দাঁড়াল, “জী ম্যাম?”
‎​মেহুল সামান্য দ্বিধা আর ইতস্তত নিয়ে শুধাল, “আমার অনুপস্থিতিতে… মানে এই তিন-চার দিন হাসপাতালে কি সবকিছু ঠিকঠাক ছিল? পেশেন্টদের কোনো প্রবলেম বা বিশেষ কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি?”
‎​নার্সটি বিনয়ের সাথে উত্তর দিল, “না ম্যাম, তেমন তো বড় কোনো কিছু ঘটেনি। সব কাজ নিয়ম মতোই চলেছে। তবে হ্যাঁ… গতকালকে হসপিটালের দু-তিনজন নার্স আর একজন ওয়ার্ডবয়কে হুট করে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে শৃংখলা ভঙ্গের দায়ে।”
‎​মেহুল সাথে সাথে থমকে গেল! কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল, “কাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, জানো কিছু?”
‎​”জী ম্যাম। নার্স ফাতেমা, মিতু আর ওয়ার্ডবয় আনোয়ার… ওদের এই তিনজনের নাম।”
‎​নামগুলো শোনামাত্রই মেহুলের চিনতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলো না! এরা তো সেই নার্স আর ওয়ার্ডবয়ই, যারা সেদিন স্টাফ রেস্টুরেন্টে বসে মেহুলের চরিত্র আর জীবন নিয়ে বিশ্রী কুৎসিত গসিপে মেতেছিল! সেদিন কথা কাটাকাটির সময় মেহুল স্পষ্ট একঝলকে তাদের গায়ের এপ্রোনে থাকা নেমপ্লেটগুলো দেখে নিয়েছিল। অতঃপর
‎​মেহুল আর কথা বাড়াল না। চোখের ইশারায় নার্সটিকে যাওয়ার অনুমতি দিল সে।
‎​কারণ মেহুল খুব ভালো করেই বুঝে গেছে—এই হঠাৎ ছাঁটাইয়ের নেপথ্যে কার হাত জড়িয়ে আছে! যে লোকটা মেহুলকে রাতারাতি চট্টগ্রাম থেকে রাজশাহীতে বদলি করিয়ে আনতে পারে, তার জন্য হাসপাতালের সামান্য দুজন নার্স আর ওয়ার্ডবয়ের চাকরি নট করে দেওয়া তো বাঁ হাতের খেলা!
‎মেহুল তপ্ত নিশ্বাস ফেললো, ​দিন দিন সালমান শাহ নেওয়াজ নামক লোকটাকে মেহুলের কাছে স্রেফ এক সাইকো ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না! কিন্তু এসবের মাঝেও মেহুলের মস্তিষ্কে আসল জটিল প্রশ্নটা হলো—ওই শয়তান লোকটা জানল কীভাবে যে ওই নির্দিষ্ট নার্স আর ওয়ার্ডবয়ই মেহুলকে নিয়ে বিষ ছড়াচ্ছিল? মেহুল তো এই অপমানের কথা নিজে মুখে হুমা আর ডক্টর ফেরদৌসী বাদে আর কাউকে এক বর্ণও বলেনি! তবে কি হাসপাতালের প্রতিটা কোণায়, প্রতিটা দেয়ালের আড়ালে সালমান তার অদৃশ্য চোখ আর কান বসিয়ে রেখেছে?
‎​ভেবে ভেবে মেহুলের মাথাটা যেন ঝিমঝিম করে ধরে আসছিল…
‎কাজের প্রেসারের চেয়েও চারপাশের এই অদৃশ্য নজরদারি আর অলিখিত বন্দিদশার অনুভূতিতে মেহুলের মনটা ভীষণ বিষিয়ে উঠল। ভেতরে জমে থাকা অস্বস্তি আর দমবন্ধ ভাবটা যখন অসহ্য হয়ে উঠল, তখন নিজের মনকে সামলাতে অন্য কোনো উপায় না পেয়ে টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নিল সে।
‎​চটজলদি বাবার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে একটা ডিরেক্ট অডিও কল মিলিয়ে দিল মেহুল।
‎​ওপাশ থেকে মাত্র দুটো রিং হতেই কাঙ্ক্ষিত, অতি-পরিচিত স্নেহের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—”বল মা, মেহু! এত সকালে ডিউটির মাঝে বাবার কথা হঠাৎ মনে পড়ল?”
‎​বাবার অমায়িক কণ্ঠটা কান স্পর্শ করতেই মেহুলের বুকের ভেতরের সমস্ত জমে থাকা বিষাদ যেন একলহমায় হালকা হতে শুরু করল। সে ভেতরের কোনো অশান্তি বা সালমানের বিষাক্ত অধ্যায়ের বিন্দুমাত্র আঁচ বাবাকে লাগতে দিল না। নিজের গলাটা যতটা সম্ভব প্রাণবন্ত ও চঞ্চল করে বলল, “আহা বাবা! তোমার একমাত্র মেয়ে তোমাকে ফোন দিয়েছে, তোমাকে ফোন দিতে আবার নির্দিষ্ট কোনো সময় লাগে নাকি? এমনিই একটু তোমার গলাটা শোনার জন্য কল করলাম। কেমন আছ বলো তো?”
‎​জাবেদ ইকবাল ওপাশ থেকে হেসে উঠলেন, “আমি তো খুব ভালো আছি মা। তুই কেমন আছিস বল? খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো করছিস তো? নতুন শহরের আবহাওয়া খাপ খাইয়ে নিতে কোনো কষ্ট হচ্ছে না তো আবার?”
‎​” আমি একদম পারফেক্ট আছি,” মেহুল ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটিয়ে বানিয়ে জবাব দিল, “আর এই শহরের আবহাওয়াও বেশ শান্ত। হুমা তো আমার সবদিক খেয়াল রাখছে, জানো তো? প্রতিদিন নিয়ম করে আমাকে বকাঝকা করে খাওয়ায়!”
‎​”হাহা! বেশ ভালো কথা,” জাবেদ ইকবাল তৃপ্তির নিশ্বাস ফেললেন, “হুমায়রা মেয়েটা খুব লক্ষ্মী। আর ওদিকের পুঁচকু সোনাটার কী খবর?”
‎​মেহুল বাবার মিষ্টি কথায় খিলখিল করে হেসে উঠল, “পুঁচকু তো দিন দিন মহা ফাজিল হচ্ছে বাবা! হুমাকে সারাদিন জ্বালাতন করে মারে। কিন্তু সকালে আমি ডিউটিতে আসার সময় হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বাই-বাইও জানিয়ে দেয়।”
‎​”তাই নাকি? বাহ্‌! তুই ওকে যত দ্রুত সম্ভব নিয়ে আয় চট্টগ্রাম। আমিও খুব দ্রুত ফিরছি। আমি আসলেই নিজে গিয়ে ওর দত্তকের কাগজপত্র সব ফাইনাল করে আসব। পুরো ঘর সাজাবো খেলনা দিয়ে। জাবেদ ইকবালের নাতনি আসবে বলে কথা। কবে যে ওকে সামনা সামনি দেখব, সেটার অপেক্ষায় দিন গুনছি।”
‎মেহুল বাবার কথাতে হেসে উঠলো—”খুব শিঘ্রই দেখা হবে বাবা। দেখবে প্রথম দেখাতেই তুমি ওকে ভালোবাসতে বাধ্য হবে।”
‎​বাবা-মেয়ের এই সাধারণ, নিটোল আর স্নেহে ভরা আলাপচারিতা চলল আরও মিনিট দশেকের মতো। গল্প শেষে ফোনটা কেটে যখন মেহুল টেবিলের ওপর রাখল, তখন তার ভেতরের দমবন্ধ করা অস্থিরতাটা অনেকটাই উবে গিয়েছে। নিজের বাবার ভালোবাসার সেই একবিন্দু স্পর্শ যেন তার মনের ভেতরে নতুন করে লড়াই করার শক্তি জুগিয়ে দিল!
‎বাবার সাথে কথা বলে ফোনটা কেটে রাখার পর মেহুলের বিষণ্ণ মনটায় বেশ খানিকটা স্নিগ্ধতা নেমে এলো। সে একটা গভীর নিশ্বাস ফেলে টেবিলে রাখা স্ট্রেথোস্কোপটা গলায় ঝুলাল এবং আবারও বাকি পেশেন্টগুলোর ফাইলের দিকে মনোযোগ দিল।
‎​ঠিক তখনই তার ফোনটা হঠাৎ সুর তুলে আবারও বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে হুমার নাম।
‎​মেহুল ফোনটা কানে তুলে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে হুমার চঞ্চল ও তাড়াঘেঁষা কণ্ঠ ভেসে এলো, “হ্যাঁ রে মেহু! বাড়ি কখন ফিরবি আজ?”
‎​মেহুল চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিয়ে শান্ত গলায় জবাব দিল, ” বিকেলে ডিউটি শেষ করে একবারে চারটে নাগাদ বের হব, কেন বল তো?কিছু আনতে হবে?”
‎​”নাহ না কিছু আনতে হবে না, তবে শোন! তুই তো সেদিন বলছিলিস পুঁচকুর একটা সুন্দর নাম রেখে ভালো কোনো জায়গায় ছোটখাটো অনুষ্ঠান করে ছাদকা আর আকিকাটা সেরে ফেলতে। তোর কথা মতো আমি কিন্তু এখানকার একটা লোকাল এতিমখানায় কথা বলেছি আজ সকালে!” হুমার গলায় স্পষ্ট একটা উত্তেজনার ছাপ।
‎​মেহুল ফাইলের পাতা ওল্টানো থামিয়ে বেশ উৎসাহ নিয়ে বলল, “বলিস কী! কী বললেন ওনারা?”
‎​”আমি পুঁচকুর নাম রাখার আর আকিকার ব্যাপারে ডিটেইলস বলতেই ওনারা ভীষণ খুশি হলেন! বললেন আগামীকালই নাকি পুরো আকিকার সব ব্যবস্থা ওনারা নিজেরা রেডি করে রাখবেন। সকালে ওখানে একটা ছোটখাটো মিলাদও পড়ানো হবে, তারপর বাচ্চাদের খাইয়ে আকিকাটা সুন্দর করে দেওয়া যাবে।”
‎​শুনে মেহুলের মুখটায় চার দিন পর পরম তৃপ্তির এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সে খুশিতে বলে উঠল, “তাহলে তো খুব ভালো হয় হুমা! এতে পুঁচকুর জন্য অনেক দোয়াও হবে। এতিম বাচ্চা গুলোর সাথে অনেকটা সময়ও কাটানো যাবে। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন!”
‎​”আমারও সেটাই মনে হলো রে। তাই এমনটা ঠিক করেছি, সব কিছু গোছগাছ করে কালই একসাথে গিয়ে কাজটা সেরে ফেললেই হবে।”
‎​”হ্যাঁ একদম,” মেহুল একটু থেমে কৌতূহল নিয়ে শুধাল, “আচ্ছা, পুঁচকু সোনাটা কী করছে রে? তোকে আবার খুব বেশি বিরক্ত করছে না তো?”
‎​হুমা মৃদু হেসে ওপাশ থেকে বলল, “ধুর না! সোনা পাখিটা পেট ভরে দুধ খেয়ে আপাতত ধুম ঘুম দিচ্ছে। তাইতো তোকে চুপচাপ কল করার সুযোগ পেলাম!”
‎​মেহুল আস্বাসের সুরে বলল, “মাশাআল্লাহ! ঠিক আছে তুইও একটু রেস্ট নে। বিকেল ৫টা নাগাদ কাজ শেষ করে আমি ফিরছি, বাকি কথা রাতে সামনাসামনি বসে গুছিয়ে বলব। রাখি এখন?”
‎​”হ্যাঁ তুই কাজ কর, সাবধানে থাকিস। বাই!”
‎​ফোনটা রাখার পর মেহুলের বুকের ভেতরের জমে থাকা অশান্ত মেঘগুলো যেন আকিকার চিন্তায় একদম দূর হয়ে গেল। অতঃপর সে আবারও মনোনিবেশ করলো নিজ কাজে।
‎বিপাশা শিকদার রান্নাঘরে ব্যস্ত হাতে মসলা কষাচ্ছেন। আজ সকাল থেকেই তার ব্যস্ততার কোনো অন্ত নেই, কারণ বাড়িতে বিশেষ মেহমান আসছেন। বাড়ির মূল বাবুর্চিদের ওপর পুরোপুরি ভরসা না পেয়ে তিনি নিজ হাতেই রান্নার তদারকি করছেন। টেবিলে মাছ ভাজার জন্য মাছে হলুদ-লবণ মাখানো সবে শেষ করেছিলেন, এমন সময় বাইরে গাড়ি এসে থামার পরিচিত গর্জন শোন গেল।
‎​তৎক্ষণাৎ এক পরিচারিকা হন্তদন্ত হয়ে রান্নাঘরে প্রবেশ করে বলল, “ম্যাডাম, মেহমানরা চলে এসেছেন!”
‎​খবরটি পাওয়ামাত্র বিপাশা শিকদার আর এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। দ্রুত কিচেন বেসিনে হাতের হলুদ-লবণ ধুয়ে, এপ্রোনে হাত মুছতে মুছতে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন।
‎​মেইন দরজার কাছাকাছি আসতেই তার নজরে এলো এক দারুণ স্নিগ্ধ ও আভিজাত্যপূর্ণ দৃশ্য!
‎​দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন এক রুপবতী নারী—বয়সে বিপাশার কাছাকাছি হলেও রূপ ও লাবণ্যে বিন্দুমাত্র ঘাটতি নেই! সময় যেন ওনার সৌন্দর্যের কাছে এসে থমকে গেছে, এখনো রূপ যেন ঠিকরে পড়ছে ওনার অঙ্গ থেকে। আর ওনার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ২১-২২ বছরের এক তরুণী—আধুনিক ও রুচিশীল পোশাকে এক লহমায় চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার মতো রূপ।
‎​দরজায় বিপাশাকে দেখতে পেয়েই সেই প্রবীণ নারীটি এক গাল আত্মিক হাসি ফুটিয়ে সামনে এগিয়ে এলেন। পরম ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরলেন তাকে, “কেমন আছো ভাবি?”
‎​বিপাশা শিকদারও আনন্দে চোখ ছলছল করে পরম উষ্ণতায় তাকে বুকে টেনে নিলেন, “আলহামদুলিল্লাহ্‌ মেহেরিন! তুমি কেমন আছ বলো? কত দিন পর দেখলাম তোমাকে!”
‎​মেহেরিন নেওয়াজ জড়িয়ে ধরা ছেড়ে মৃদু হেসে ভাবির দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই তো ভালো ভাবি। সত্যি, কতদিন পর দেখলাম তোমাকে, কিন্তু তুমি একটুও বদলাওনি!”
‎​বিপাশা হেসে উত্তর দিলেন, “তুমিও তো ঠিক আগের মতোই আছ মেহেরিন, বিন্দুমাত্র বদলাওনি!”
‎​ঠিক তখনই ঘরের ভেতর থেকে এক গম্ভীর ও ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—”কে এসেছে বিপাশা?”
‎​শব্দ পেয়ে সবাই উৎসুক হয়ে পেছনে তাকাল। ড্রয়িংরুমের করিডোর পেরিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন বাড়ির কর্তা মিনহাজ সাহেব। আর সামনে তাকাতেই ওনার চোখজোড়া স্থবির হয়ে গেল দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে!
‎​দরজায় মায়াবী হাসি মুখে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওনার একমাত্র আদরের ছোট বোন—মেহেরিন নেওয়াজ!
‎​”মেহেরিন!”—মিনহাজ সাহেবের গলা দিয়ে বিস্ময় ও আবেগের মিশ্র এক ধোঁয়াটে শব্দ বের হলো। সেই যে বিয়ে দিয়ে বোনকে বিদায় করেছিলেন আর কখনো চেহারা দেখেন নি তিনি। প্রায় বাইশ বছর পরে একমাএ বোনকে সামনা সামনি দেখছেন তিনি।
‎​”ভাইয়া!”—ভাইয়ের কণ্ঠ শোনামাত্র মেহেরিন নেওয়াজ সমস্ত অভিমান ভুলে ছুটে গিয়ে মিনহাজ সাহেবকে জড়িয়ে ধরলেন।
‎​বহু বছর পর দুই ভাই-বোনের এই অনাকাঙ্ক্ষিত অথচ পরম কাঙ্ক্ষিত পুনর্মিলনে একলহমায় পুরো ড্রয়িংরুমের বাতাস যেন আবেগঘন হয়ে উঠল। মিনহাজ সাহেব বোনকে পরম স্নেহে মাথায় হাত বুলিয়ে বুকে আঁকড়ে রাখলেন। ওনার চোখে ফুটে উঠল আত্মিক স্বস্তি, আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেহেরিনের একুশ বছরের মেয়েটি মৃদু হেসে উপভোগ করতে লাগল মামা আর মায়ের এই মিষ্টি মিলন মুহূর্ত।
‎বহুদিন পর নিজের পরম আদরের ছোট বোনকে বুকে জড়িয়ে ধরে মিনহাজ সাহেবের চোখের কোণ দুটো আবেগে ভিজে উঠল। দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা, মান-অভিমান আর দূরত্বের পর মেহেরিনকে এভাবে কাছে পেয়ে ওনার ভেতরে জমে থাকা সমস্ত তৃষ্ণা যেন এক মুহূর্তে মিটে গেল।
‎​বোনকে আলতো করে নিজের বুক থেকে আলাদা করে পরম স্নেহে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন মিনহাজ সাহেব। তখনই ওনার প্রখর দৃষ্টি গিয়ে পড়ল মেহেরিনের পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা সেই একুশ বছরের সুন্দরী তরুণীটির দিকে। মেয়েটি বেশ কৌতুহল ও নম্র হাসি নিয়ে ওর মামাকে লক্ষ্য করছিল।
‎​মিনহাজ সাহেবের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি টের পেয়েই মেহেরিন নেওয়াজ পরম তৃপ্তিতে মেয়ের কাঁধে হাত রেখে বলে উঠলেন, “ও আমার মেয়ে ভাইজান… মাইশা! তোমার আদরের ভাগনী।”
‎​কথাটি শোনামাত্রই মিনহাজ সাহেবের গম্ভীর চেহারায় অদ্ভুত এক আনন্দের হাসি ফুটে উঠল। নিজের রক্তের এই নতুন প্রজন্মের রূপ আর আভিজাত্য দেখে ওনার মনটা যেন গর্বে ভরে গেল।
‎​তিনি একপা এগিয়ে গিয়ে মাইশার মাথায় পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে দিলেন। অত্যন্ত নরম গলায় বলে উঠলেন, “মাশাআল্লাহ! কত বড় হয়ে গেছে রে মা টা! একদম তো মায়ের মতো রূপ-গুণ পেয়েছিস। সত্যি… আজ আমার এই বাড়িটা একদম পরিপূর্ণ মনে হচ্ছে।”
‎​মাইশা মাথা নিচু করেই বিনয়ের সাথে সালাম করল, “আসসালামু আলাইকুম, মামা, মামণি। আম্মু সবসময় আপনার কথা বলত, আজ আপনাদের সামনাসামনি দেখে খুব ভালো লাগছে।”
‎​”ওয়ালাইকুমুস সালাম, বেঁচে থাকো মা।”—মিনহাজ সাহেব ভাগনীর মাথায় আবার হাত বুলালেন।
‎​পাশ থেকে বিপাশা শিকদার মৃদু হেসে যোগ করলেন, “তাহলে এখন আর দরজায় দাঁড়িয়ে মিষ্টি কথা নয়! বরং সবাই ভেতরে এসে বসো। মেহেরিন, তুমি মাইশাকে নিয়ে চল, অনেক লম্বা সফর করে এসেছ।”
‎অতঃপর ​দুই ভাই-বোন আর ভাগনীর এই পরম মায়াবী পুনর্মিলনে শাহ নেওয়াজ রাজবাড়ির দীর্ঘদিনের গুমোট বাতাসে যেন এক অন্যরকম আনন্দের ছোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল।
‎শহরের এক শান্ত কোণে অবস্থিত সবুজ গাছগাছালি আর শুভ্রতায় ঘেরা এতিমখানা ও মাদ্রাসা চত্বর। দীর্ঘ ইট-কাঠের দেয়ালঘেরা প্রাতিষ্ঠানিক প্রাঙ্গণে একপাশে খুদে শিক্ষার্থীদের সুরেল কণ্ঠে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের ধ্বনি বাতাসে ভেসে আসছে। আজ এই শান্ত চত্বরটিতেই জমে উঠেছে এক পরম আনন্দের মেলবন্ধন। হুমা ও মেহুলের বহুদিনের অপেক্ষার পর আজ এখানেই তাদের ফুটফুটে পুঁচকুর আকিকা দেওয়া হবে, দেওয়া হবে তার এক পূর্ণাঙ্গ, অর্থপূর্ণ নতুন পরিচয়!
‎​হুমা সকাল সকালই পুঁচকুকে সুন্দর নতুন ড্রেস পরিয়ে তার দুই স্টার্ফকে নিয়ে এতিমখানায় পৌঁছে গিয়েছে। সেখানকার শিক্ষক ও আলেমদের সাথে কথা বলে আকিকার রান্নাবান্না আর মিলাদের যাবতীয় আয়োজনও প্রায় গুছিয়ে এনেছে সে। কিন্তু এত কিছুর মাঝেও হুমার মনটা অস্থির হয়ে আছে কেবল মেহুলের জন্য। সকালে জরুরি এক কাজের কথা বলে মেহুল হাসপাতালে গিয়েছিল, কিন্তু হাসপাতাল থেকে সরাসরি এখানে চলে আসার কথা থাকলেও দুপুর গড়িয়ে আসতে চলল অথচ তার দেখা নেই!
‎​হুমা বারবার মেহুলের মোবাইলে রিসিভারের পর রিসিভার বাজিয়ে চলেছে। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই, ফোন বাজতে বাজতেই তা আবার কেটে যাচ্ছে। হুমা চরম বিরক্ত ও দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে আর বিড়বিড় করে বলছে—”মেয়েটা গেল কোথায়?”
‎​এদিকে হুমা যখন চিন্তা করছে মেহুল তখন হাসপাতাল সংলগ্ন নিরিবিলি গোরস্তানের প্রধান ফটকের ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তার ফর্সা হাত দুটোর পরম আদরে শক্ত করে ধরে রাখা একটি ছোট্ট সদ্য ফোটা বেলি ফুলের চারা।
‎​আজ তার এক কন্যাসন্তানের নতুন নামকরণ আর শুভ আকিকা হতে চলেছে, তাই নিজের অন্তর থেকে অন্য আরেকজন রূপকথার মতো পবিত্র কন্যাকে ভুলতে পারেনি মেহুল। তাইতো আজ সে তার সেই হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট পরীটার জন্য এই উপহারটুকু নিয়ে হাজির হয়েছে। ইসলামি নিয়ম অনুযায়ী নারীদের কবরস্থানে সরাসরি প্রবেশ মানা, তাই মেহুল প্রধান ফটকের বাইরে সীমানাবেষ্টনীর কাছেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
‎​সে আগেই কবরস্থানের রক্ষণাবেক্ষণকারী খাদেম সাহেবের ফোন নম্বর সংগ্রহ করে রেখেছিল। তাই ব্যাগ থেকে ফোন বের করে তাকে একটা কল করতেই মাঝবয়সী এক লোক দ্রুত হেঁটে মেহুলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। মেহুল বিন্দুমাত্র দেরি না করে পার্স থেকে কিছু টাকা আর স্নেহের পরম ছোঁয়ায় আগলে রাখা বেলি ফুলের চারাটি খাদেম সাহেবের হাতে তুলে দিল।
‎​”চাচা, এই বেলি ফুলের গাছটা আর এই টাকা দুটো রাখুন… প্লিজ একদম কোনায় থাকা ওই ছোট্ট কবরটার পাশে গাছটা রোপণ করে একটু পানি দিয়ে দেবেন?”—মেহুলের কণ্ঠস্বর সামান্য কেঁপে উঠল।
‎​লোকটি সহানুভূতির নজরে তাকালেন, “ঠিক আছে মা, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি এখনই লাগিয়ে দিচ্ছি।”
‎​লোকটি কাঁচা মাটির পথ ধরে ভেতরে হেঁটে যাওয়া মাত্রই মেহুল সীমানাপ্রাচীরের ওপাশ থেকে আবছা দৃষ্টি মেলে ওই নির্দিষ্ট ছোট্ট মাটির ঢিবিটার দিকে তাকাল। লাল ইটের বাঁধানো বোর্ডের ওপর স্পষ্ট কালিতে খোদাই করে লেখা রয়েছে—‘স্মৃতি মেহুল ইকবাল’।
‎​নিজের না-দেখা রক্তের বাঁধন, নিজের বুকের এক টুকরো স্মৃতির দিকে কিছুক্ষণ নিষ্পলক ও নিঝুম নজরে তাকিয়ে রইল সে। দেখলো খাদেম সাহেব যত্ন নিয়ে গাছের চারাটা রোপন করছে অতঃপর চোখের কোণ বেয়ে অলক্ষে একবিন্দু নোনা জল গড়িয়ে পড়ল, যা সে হাত দিয়ে নিমিষেই মুছে নিল। দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ফেলে একসময় সেখান থেকে ধীরে ধীরে পা বাড়াল মেহুল।
‎একটু এগিয়ে ​পকেট থেকে ফোনটা বের করতেই মেহুলের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল—হুমার ডজন খানেক মিসড কল! সাইলেন্ট করা থাকায় বেজে ওঠেনি ফোনটা। তাই সে বলতেও পারে নি। অতঃপর মেহুল আর এক মুহূর্ত কালবিলম্ব না করে তড়িঘড়ি হুমাকে একটা বার্তা পাঠাল—‘আসছি আমি, তুই তাড়াতাড়ি এতিমখানার লোকেশনটা পাঠা!’
‎​বার্তা পাঠানোর মিনিট বিশেকের মধ্যেই একটি রিকশায় চড়ে নির্দিষ্ট এতিমখানার গেটে এসে পৌঁছাল মেহুল। রিকশাচালককে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে সে হাসিমুখে চত্বরের দিকে পা বাড়াতে গেল।
‎​কিন্তু এতিমখানার প্রধান ফটক পেরিয়ে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেই আকস্মিক একলহমায় মেহুলের ধাবমান দুটো পা মাটির সাথে জাদুমন্ত্রের মতো আটকে গেল! তার বুকের ভেতরের সমস্ত স্পন্দন যেন মুহূর্তে থমকে স্তব্ধ হয়ে গেল!
‎তার চক্ষুদ্বয়ে ফুটে উঠলো বিস্ময়ে, কারন তার প্রসারিত দৃষ্টির ঠিক বিশ গজ সামনে দাঁড়িয়ে আছে হুমা… আর হুমার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক ভয়াল মায়াবী চেহারার লোক—সালমান শাহ নেওয়াজ!
‎​শুধু তা-ই নয়, যে পুঁচকুর আকিকার জন্য আজকে এত আয়োজন, সেই ছোট্ট অবুঝ নিষ্পাপ শিশুটি এখন সালমানের চওড়া বুকের সাথে পরম যত্নে লেপ্টে আছে! আর সালমান অত্যন্ত সুফি ভঙ্গিতে শিশুটিকে কোলে নিয়ে গাল টিপে আদর করছে!
‎আর যা দেখেই মেহুল হা হয়ে গেলো……

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৩০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here