সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪
Raiha Zubair Ripti
তপ্ত দুপুরে মুনতাহা ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে ভার্সিটি থেকে বাড়ি ফিরে দেখলো বসার ঘরে মির্জা বাড়ির সদস্যরা বসে আছে। সামনের টেবিলে ফল মিষ্টি সাজানো। গত পরশুই যা নয় তাই বলে অপমান করে চলে গিয়েছিল। তারই একদিন পর আবার এমন হাসিমুখ! বড়ই আশ্চর্যের বিষয়। মুনতাহা পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিলো এমন সময় সেলিম মির্জা ডেকে উঠলো-
“ ঐ তো মুনতাহা এসে গেছে। মুনতাহার মতামত জেনে নেওয়া যাক তাহলে?”
বসার ঘরে থাকা প্রতিটি মানুষের চোখ এখন তার দিকে। অস্বস্তিরা চেপে ধরলো। কিসের মতামত জানতে চাইছে তারা?
সাইদা মির্জা উঠে আসলেন। মুনতাহা তো ভেবেই রেখেছিলেন এই বুঝি এসে তাকে যা নয় তা বলে আবার অপমান করবে। কিন্তু তাকে আশ্চর্য করে দিয়ে তিনি বললেন-
“ অ্যাম সরি মুনতাহা। ”
মুনতাহার চোখ মুখে বিস্ময়ের ছাপ। সরি বলছে এই মহিলা! কিন্তু কিসের জন্য? মুনতাহা সবার দিকে তাকিয়ে বলল-
“ ঠ…ঠিক বুঝলাম না। সরি কেনো বললেন?”
“ শুরু থেকেই আমি তোমাকে যা নয় তাই বলে অপমান করেছি। আমার উচিত হয় নি। আমি অন্যায় করেছি। আমি ভীষণ অনুতপ্ত। ”
মুনতাহা তার মুখে এমন কথা শুনে ভাষাহীন হয়ে গেলো। সূর্য কি আজ পশ্চিম দিকে উঠেছে ভুল করে? নাকি সে-ই ভুলভাল কিছু দেখছে চোখের সামনে। সালমান মির্জা উঠে আসলেন।
“ তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো মুনতাহা। কথা আছে। ”
মুনতাহা চলে গেলো। রুমে এসে ফ্রেশ হতেই ময়না বেগম প্রবেশ করলেন। মুনতাহা মাথা নত করে জানতে চাইলো-
“ উনারা হুট করে এ বাড়িতে যে আম্মু? কিছু হয়েছে? আর উনি ওমন বদলে গেলো কি করে?”
“ উনারা তোমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। তুমি কি করবে? ”
“ কিহ! ”
“ হ্যাঁ। সিকান্দারের সাথে তোমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। সালমান রাজি হয়ে গেছে ভাই ভাবির মিষ্টি মিষ্টি কথায়। সিকান্দার বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে না? ছেলেকে ফেরানোর জন্যই হয়তো রাজি হয়েছে। বাড়ির সবাই রাজি বিয়েতে। এখন সবাই তোমার মতামত জানতে চাইবে। ভেবেচিন্তে উত্তর দিবে। তবে শুনে রেখো এটা যে, সিকান্দারের মতো ছেলে তুমি এই পৃথিবীতে খুঁজে আর দুটো পাবে না। তাই পরে আফসোস যেন করতে না হয়। নিজ থেকে তো ভালোবেসে দেখেছিলে। ফলাফল কি হলো? এবার পরিবারের উপর ভরসা থাকলে নিশ্চয়ই হ্যাঁ জানাবে। ”
“ কিন্তু আম্মু যেখানে আমাকে বারবার অপমানিত করা হয়েছে সেইখানে আমার যাওয়াটা কি ঠিক? বিষয়টা এমন হলো না নিজের মুখে নিজে থুথু দেওয়া? পৃথিবীতে কি আর কোনো ছেলে নেই? হ্যাঁ আমি তোমার সংসারে থেকে তোমাদের টা খাচ্ছি পড়ছি বলে তোমাদের ভীষণ সমস্যা হচ্ছে। তাই আমাকে তাড়াতাড়ি এখান থেকে বের করে দিলে বেঁচে যাও। কিন্তু আম্মু আমার দিকটা কি তুমি কখনো ভেবে দেখেছো? আমার তো তুমি ছাড়া কেউ নেই। তোমার সব সিদ্ধান্ত কেই আমি মেনে নেই। এখন যদি আমি নিজের মুখে নিজে থুথু দিয়ে এই বিয়েতে রাজি হই তাহলে কি তুমি খুশি হবে?”
“ হ্যাঁ আমরা খুশি হবো তুমি রাজি হলে। ”
আমরা! মুনতাহা অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। মুনতাহা তো কেবল তার মায়ের খুশির কথা জিজ্ঞেস করেছিলো। সেখানে তিনি বললেন আমরা খুশি হবো! সেই আমরার ভেতর তো মুনতাহা কে রাখা হয় নি কোনোদিন । তারা তাদের খুশিটাকে প্রাধান্য দিলো! মুনতাহা ঠোঁট কামড়ে রাখলো। এই জীবনে তোমার সাথে ভালো কিছু হবে এই ভাবনা থেকে বের হও। তুমি জন্মই নিয়েছো দুঃখ নিয়ে। তোমার জীবনে দুঃখই কেবল চিরস্থায়ী। সুখ? সেটা তোমার জীবনে সৃষ্টি কর্তা লিখে রাখে নি। নিজের বাবার ভালেবাসা জীবনে পাও নি। মা’য়ের ভালোবাসা পাও নি। এবার হয়তো স্বামীর বাড়িতে গিয়েও পাবে না।
“ বেশ, আমি তোমাদের খুশির জন্য সব করতে রাজি। এত সুন্দর একটা জীবন উপহার দিয়েছো পৃথিবীতে এনে। তার ঋণ কোনো না কোনো ভাবে তো শোধ করারই ছিলো। আমি রাজি বিয়েতে। আমি দুঃখ গিলে বাঁচতে পারবো আজীবন। ”
“ দুঃখ! ”
“ তা নয় তো কি? তুমিও জানো,আমিও জানি। ও বাড়ির বউ হলে তা আমার জন্য ঠিক কতটা পীড়াদায়ক। ”
“ যেই মানুষটা সেজদায় লুটে তোমাকে চেয়ে এসেছে,সেই মানুষটার ভালোবাসা কে বিশ্বাস করো মুনতাহা। তুমি ঠকবে না,অসুখী হবে না। তুমি বরং সুখী হবে। ”
মুনতাহা চমকে তাকালো মায়ের দিকে। সেজদায় লুটে তাকে চেয়েছে মানে! সিকান্দার তাকে চেয়েছে! কিজন্য চেয়েছে? তারা তো একে অপরকে কখনো দেখে অব্দি নি।
“ সিকান্দার তোমাকে ভালোবাসে। খুউব ভালোবাসে। শ্বশুর শাশুড়ি পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মানুষ হলেও স্বামী ভালো হলে সেই মেয়ের মতো সৌভাগ্যবতী আর দুটো হয় না। তুমি তাদের মধ্যে একজন। সুখ যখন তোমার দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে নিজ থেকে তখন কেনো তুমি তা দু হাতে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিবে? চলো এখন। তুমি তোমার মতামত জানাবে। ”
মুনতাহা মাথায় কাপড় দিয়ে ময়না বেগমের সাথে বসার ঘরে আসলেন। সালমান মির্জা মুনতাহা কে জিজ্ঞেস করা মাত্রই মুনতাহা জানালো সে রাজি এই বিয়েতে।
সবাই সেটা শুনে খুশি হয়ে আলহামদুলিল্লাহ বললেও সাইদা মির্জার ভেতর টায় আগ্নেয়গিরি লাভায় টগবগ করছে। তার ভেতরটা বলছে- কতটা বেহায়া এই মেয়ে। রাজি হয়ে গেল! হলে তো রাজি? বেশ। এসো একবার মির্জা বাড়ি। তোমার জীবন টা নরক বানানোর জন্য আমি সাইদা মির্জা আছি।
মিষ্টি মুখ করা হলো। সিমরান দুটো মিষ্টি খেতে গিয়েও নানান দুশ্চিন্তায় ঠিক মতো খেতে পারলো না। অর্নব টা আসে নি। তারও আসার ইচ্ছে ছিলো না। কিন্তু শাশুড়ি টা নিয়ে আসলো। গত পরশুই কত কথা বললো আর আজই বিয়ে পাকা করে ফেললো! গিরগিটিও তো এত তাড়াতাড়ি রং বদলায় না।
বিয়ের ডেট ফিক্সড করা হলো সামনের মাসে।
সন্ধ্যা নেমে গিয়ে চারিদিক অন্ধকার হয়ে এসেছে। মায়ের ফ্ল্যাটে নিজের অন্ধকার রুমে বসে গিটারে টুংটাং সুর তুলে সিকান্দার এক মনে গান গাইছে-
~ Maine maula se teri meri duniya hai maangi
Woh jo likh de toh usko hi haq maan loonga
Duniya bhula ke maine tujh ko hai paa liya
Dil se duaon main bhi tujhko hi maanga
Rooh ka guroor saara tujhpe luta diya
Khud ko hara ke teri jeet ko hi maanga..
পাশে থাকা ফোনটা বেজে উঠতেই সিকান্দার গান গাওয়া থামিয়ে দিয়ে ফোনের দিকে তাকায়। নাদিম ফোন করেছে। সিকান্দার ফোন টা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে নাদিম জানালো-
“ তোর বিয়ের ডেট ফিক্সড হয়েছে। ”
সিকান্দার কথাটা শুনে চোখ বুঝে ফেললো। ঠোঁটের কোনে উচ্চারণ করলো-
“ সুবহানাল্লাহ। ”
“ কিছু বললি? ”
“ না। ”
“ এবার খুশি হয়েছিস?”
“ হু। ডেট কবে ফিক্সড করা হলো?”
“ আগামী মাসের ৫ তারিখ। ”
“ হোয়াট! ”
“ কি হলো আবার? ”
“ বিয়েটা সামনের মাসে নয়। এ মাসেই আজ থেকে গুনে গুনে ছয় দিন পর ১৪ তারিখে ফিক্সড করতে বল। শুভ কাজে দেরি করতে হয় না। ”
“ এটা আমি বলবো? ”
“ ফোনটা তোর চাচার কাছে নিয়ে যা। ”
নাদিম ফোনটা নিয়ে সেলিম মির্জার কাছে দিলো। নাদিম ইশারায় বলল- সিকান্দার কথা বলবে।
সেলিম মির্জা ফোনটা কানে নিতেই সিকান্দার বলল-
“ বিয়েটা এই মাসের ১৪ তারিখে ফিক্সড করুন । ”
সেলিম মির্জা হকচকা খেয়ে গেলেন।
“ কিন্তু…. ”
“ কোনো কিন্তু মিন্তু,সম্ভব নয় এসব শুনতে ইচ্ছুক নই আমি। আমি এ মাসেই, ১৪ তারিখ বিয়ে করতে চাই। ”
“ আচ্ছা তাই হবে। ”
সেলিম মির্জা ফোনটা নাদিম কে দিয়ে সালমান মির্জার দিকে চেয়ে বলল-
“ সালমান তোর কোনো অসুবিধা না হলে আমরা এই মাসেই বিয়েটা সেরে ফেলতে চাই। আগামী ১৪ তারিখ। ”
সালমান মির্জার ভ্রু কুঁচকে আসলো।
“ তুমি তো ভাইজান গত মাসের ১৭ তারিখ বললে। ”
“ সিকান্দার এ মাসেই সেরে ফেলতে চাচ্ছে বিয়েটা। তোর অসুবিধা হবে? টাকার টেনশন থাকলে আমি….”
“ না ভাইজান আমার কোনো অসুবিধা নেই। আর টাকার সংকটও নেই আমাদের। আমরা পারবো। ”
“ বিয়েটা তাহলে কোনো কমিউনিটি সেন্টারে করা যাক। এত কম সময়ে আমরা বাড়িতে করতে পারবো না। ভুল হবে। সিকান্দারেরও হয়তো আপত্তি থাকবে না এতে। ”
“ যেটা ভালো হয়। আমাদের তরফ থেকে সবেতেই হ্যাঁ। ”
“ তাহলে আজ উঠি। ১৪ তারিখ বিয়ে। এর আগে কেনাকাটা মানুষজন ইনভাইট দেওয়া সব সেরে ফেল। ”
সাইদা মির্জারা চলে গেলেন। এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলো মুনতাহা। কিন্তু এবার উঠে চলে আসলো রুমে। ১৪ তারিখ তার বিয়ে! হাতে মাত্র ৬ দিন আছে! লোকটাকে তো তার এখনো চেনাই হলো না পুরোপুরি ভাবে। ”
মুনতাহা যখন কথা গুলো ভেবে পুরো রুম জুড়ে পায়চারি করছিলো ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে উঠে। মুনতাহা ফোনের দিকে তাকায়। সিকান্দারের নাম্বার টা দেখে সাথে সাথে হাতে নিয়ে রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে-
“ কংগ্রাচুলেশনস মন। ”
“ কিসের জন্য? ”
“ দুনিয়ার সব নাম-পরিচয় পেরিয়ে আপনার শেষ পরিচয় হতে যাচ্ছে আপনি সিকান্দার শাহ্ এর মাহরাম…”
কথাটায় কি যেন একটা ছিলো। মুনতাহার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল অনুভূতি বয়ে গেলো। বুকের ভেতরটায় ধক করে উঠলো।
“ আমার আপনাকে পুরেপুরি চেনার সময় হয়ে উঠলো না। ”
“ আমাদের কোনো লাভ ম্যারেজ হচ্ছে না মন। অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ হচ্ছে। আমাকে চেনার জন্য পুরো একটা জীবন পড়ে আছে আপনার। সৃষ্টি কর্তার উপর ভরসা রাখুন। আপনি ঠকবেন না। ”
“ তার উপর ভরসা করে তো আমি বারবার ঠকে যাই। সব কিছু হারিয়ে ফেলি। সুখ, মানুষ সব। আমার এখন ভয় হয়। ”
“ প্রতিটি হারানোর পেছনে আছে কোনো না কোনো দোয়ার জবাব…আল্লাহ জানেন কি রাখা আপনার জন্য ভালো আর কি সরিয়ে রাখা আপনার জন্য উত্তম। যা আপনার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে তা আপনার জন্য কল্যাণকর ছিলো না। এটা বিশ্বাস করুন। আর যা আপনার জীবনে পাঠানো হচ্ছে তা গ্রহণ করুন। দেখবেন জীবন কতটা সুন্দর আর সহজ। ”
“ আমি এভাবে কখনো ভেবে দেখি নি আপনার মতো করে গভীর ভাবে। ”
“ কেউ হয়তো আপনাকে এভাবে বলে নি। তাই ভাবেন নি। শুনুন মন আমি আপনাকে প্রতিটি সেকেন্ডে অনুভব করি । যদিও আপনার আমার দূরত্ব এখন এক আলোকবর্ষ দূরে । কিন্তু বিশ্বাস করুন আমার হৃদয়ের পুরোটা জুড়ে কেবল আপনিই থাকেন। আমি আপনার অপেক্ষায়। আপনি আসুন, আমার অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করে। ”
লোকটা এত সুন্দর কথা বলে! মুনতাহার হৃদয় পর্যন্ত স্পর্শ করে ফেলে। এই মানুষটার সাথে যদি তার আগে পরিচয় হতো। তাহলে কি এত দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে হতো তাকে?
“ আপনি অসম্ভব সুন্দর মনের একজন মানুষ। ”
“ আপনিও। ”
“ কেবল আপনার চোখেই। ”
“ এটাই কি যথেষ্ট নয় আপনার জন্য ? ”
“ জ্বি এটাই আমার জন্য যথেষ্ট। ”
“ আমাদের দেখা হচ্ছে কাল। বিয়ের কেনাকাটা করতে হবে। আসবেন তো? আমি অপেক্ষা করবো আপনার। ”
“ আসবো। ভার্সিটি শেষে আসবেন? কাল ক্লাস আছে আমার। ”
“ শিওর। আমি ভার্সিটির বাহিরেই অপেক্ষা করবো। আপনি ক্লাস শেষ করেই আসবেন। ”
“ ঠিক আছে। রাখছি তবে?”
“ জ্বি রাখুন। ”
মুনতাহা কেটে দিলো ফোন। সবটা এখন সে ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিবে। দেখা যাক ভাগ্য তাকে কোথায় আর কতদূর নিয়ে যেতে পারে। আল্লাহ সব সময় সবাইকে একাটানা কষ্টে রাখেন না। মুখ তুলে অবশ্যই তাকান।
সিকান্দারের ফোনটা কেটে যেতেই মেসেজ আসে ফোনে। ফোনের দিকে তাকায়। নাদিম ছবি পাঠিয়েছে মুনতাহার। এই দীর্ঘ ১৪ বছরে মুনতাহার একটি ছবিও সে তার কাছে রাখে নি। নাদিম কয়েকবার পাঠাতে চেয়েছিল। কিন্তু সিকান্দার মানা করায় আর পাঠায় নি। আজ বিয়েটা পুরোপুরি ঠিক হওয়ার পর সিকান্দার নিজ থেকে মুনতাহার একটা ছবি চেয়েছিল। বাট নাদিম মুনতাহার নিকাব পড়া ছবি পাঠিয়েছে। নিচে হাসির ইমোজি দিয়ে লিখেছে-
“ শ্লা এতদিন পাঠাতে চেয়েছি ছবি দেখতে চাস নি। আজ নিজ থেকে চেয়েছিস বলে এই ছবি পাঠালাম। ”
সিকান্দার মুচকি হাসলো। এত বছর যখন সে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পেরেছে। আর ছয়টা দিনও পারবে তার ফোন টা মুনতাহার ছবি বিহীন থাকতে। সিকান্দার ফোন টা পকেটে ভরে আকাশ পানে তাকায়। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠে-
“ ইয়া রব,দেখুন আমার ইন্তেজারের মূহুর্ত শেষের পথে। ”
সাথে সাথে আকাশের বুক চিঁড়ে ঝুম বৃষ্টি নামলো। সিকান্দার সেই বৃষ্টির পানি গুলো আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখলো। রব যখন তার কোনো বান্দার উপর খুশি হন তখন তিনি তার বাসায় মেহমান পাঠান। আরো খুশি হলে রহমতের বৃষ্টি দেন। তারপর আরো খুশি হলে তখন সেই ঘরে কন্যা সন্তান দান করেন।
পরের দিন ভার্সিটি তে এসে মুনতাহা ইলা কে তার বিয়ের খবরটা জানালে ইলা অবাক হয়। সে জানতো মুনতাহা আর অর্নবের রিলেশনের বিষয় টা। কিন্তু কখনো দেখা হয় নি। আর এটাও জানে না যে অর্নব নামের ছেলেটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে। এখন সেই বাড়িরই সেই প্রেমিকেরই বড় ভাইয়ের সাথে বিয়েটা ঠিক ভালো চোখে দেখছে না ইলা। শান্ত কন্ঠেই প্রশ্ন করলো-
“ তোমাকে কি এই বিয়েটাতে জোর করা হয়েছে মুন?”
যদিও এক প্রকার জোর করেই রাজি করানো হয়েছে তাকে। পারিবারিক সব কিছু তো আর সবাইকে বলা যায় না।
“ এমনটা মনে হলো কেনো তোমার ইলা?”
“ না মানে জেনেশুনে ও বাড়ির বউ হতে চাইছো যে?”
“ বিষয় টা খুবই দৃষ্টিকটু দেখাচ্ছে তাই না?”
“ হু। ”
“ দেখা যাক কি হয়। ”
“ এক সেকেন্ড তুমি অর্নবের সাথে রিভেঞ্জ নেওয়ার জন্য এমনটা করছো না তো? ”
“ আমার তোমাকে তেমন মেয়ে মনে হয়?”
“ না। কিন্তু তোমার এই বিয়েতে রাজি হওয়ার লজিক টা ঠিক বুঝছি না। ”
“ আমি নিজেও আশ্চর্যান্বিত হচ্ছি নিজেকে নিয়ে। ”
“ তুমিও কি কনফিউজড এটা নিয়ে?”
“ হু। ”
“ ছেলে কেমন? ভালো? দেখতে শুনতে সুন্দর? ব্যবহার কেমন?”
“ ছেলে ভালো। দেখতে শুনতে অসাধারণ। ব্যবহার অমায়িক। ”
“ ঐ ছেলেই বা কেমন জেনে শুনে ছোট ভাইয়ের প্রেমিকা কে বিয়ে করতে চাইছে! ”
“ আমিও এটা ধরতে পারছি না। যতদূর শুনেছি উনি আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু উনাকে ফাস্ট দেখলাম আমি বিয়েতে না করায় যখন উনি হন্তদন্ত হয়ে আমাদের বাড়িতে আসলেন। তাহলে কিভাবে কি হলো আমি সত্যি বুঝতে পারছি না। আমার মাথা কাজ করে না। ”
“ আজ তো আসবে বললে। দেখাবে তো তোমার উডবি হাসবেন্ড কে?”
“ অবশ্যই। ”
ক্লাস শেষ করে তারা ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হয়ে নিচে আসতেই দেখলো গাড়ির সামনে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ফোন টিপছে সিকান্দার। আশেপাশের মেয়েরা তাকিয়ে আছে। ইলাও ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে মুখের সামনেই আচমকা এমন এক হ্যান্ডসাম ছেলেকে দেখে অতি আশ্চর্যান্বিত হলো। ভার্সিটির নতুন কোনো লেকচারার নাকি? ইলার আবার ফেসবুকে গল্প পড়ার বদঅভ্যেস আছে। এমন অনেক গল্পই পড়েছিল যেখানে ভার্সিটির লেকচারার অনেক হ্যান্ডসাম সুন্দর হয় আর ভার্সিটির সবচেয়ে সাধারণ ব্রিলিয়ান্ট মেয়ের সাথে প্রেম তারপর বিয়ে হয়। ইলার তেমন তেমন ভাব হলো। ব্লাশ করলো কিঞ্চিৎ। মুনতাহার বাহু ধরে বলল-
“ হায় আল্লাহ! এত সুন্দর হ্যান্ডসাম লোকটা কে! আমাদের ডিপার্টমেন্টের লেকচারার নাকি? শুনেছিলাম নতুন লেকচারার জয়েন হবে। উনি কি তিনিই?”
মুনতাহা আড়চোখে তাকালো সিকান্দারের দিকে। ডার্ক ব্লু রঙের ইন করা শার্ট। যার হাতা কনুই অব্দি গোটানো। বা হাতে ব্লাক ঘড়ি। চুলগুলো সুন্দর মতো সেট করা। দারুনই তো দেখাচ্ছে। সেজন্যই তো মেয়েই গুলো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে চলতি পথে।
মুনতাহা ইলাকে নিয়ে সিকান্দারের সামনে গিয়ে সালাম দিলো। সিকান্দার ফোনে তাদের বিয়ের স্টেজ ডেকোরেশনের ডেমো ছবি দেখছিলো। মুনতাহার গলার স্বর শুনে সাথে সাথে সামনে তাকিয়ে সালামের জবাব দিয়ে বলল-
“ ক্লাস শেষ আপনার?”
“ জ্বি। ”
“ তাহলে চলুন যাওয়া যাক?”
পাশে যে ইলা নামের একটা মেয়ে আছে সিকান্দার যেন ভ্রুক্ষেপই করলো না। মুনতাহা নিজেই পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল-
“ আমার ফ্রেন্ড ইলা। ”
সিকান্দার না তাকিয়েই বলল-
“ ওহ্ আচ্ছা। নাইস টু মিট ইউ। ”
ইলা অবাক হলো। হায় হায় এ লোক তাহলে মুনতাহার উডবি হাসবেন্ড! আর এতক্ষণ সে কি না কি ভাবছিলো। আর তাছাড়া আরো একটা কথা হলো এই লোক তো ইলার দিকে তাকালো অব্দি না। তাদের মধ্যে কথাও হলো না। তাহলে নাইস টু মিট ইউ বললো কোন ব্যেসিসে!
সিকান্দার গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বলল-
“ মন আসুন। ”
মুনতাহা ইলাকে জিজ্ঞেস করলো-
“ যাবা তুমি সাথে?”
ইলা সাথে সাথে বলল-
“ না না তুমি যাও। আমার কাবাব মে হাড্ডি হওয়ার ইচ্ছে নাই। যাই হোক বেডা দেখতে কিন্তু সেই। তোমাকে নিয়ে ভীষণ লয়্যাল বোধহয়। সেজন্যই তো আমার দিকে তাকিয়ে কথা অব্দি বললো না। যাও যাও তুমি যাও। পরে কথা হবে। ”
ইলা চলে যেতেই মুনতাহা গিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। শপিংমলে বাড়ির আর বাকি সদস্য রা অপেক্ষা করছে তাদের। সেজন্যই সিকান্দার একটু তাড়া দিয়েছিল। মুনতাহা উঠতেই সিকান্দার ও উঠে বসলো। গাড়ি স্টার্ট দিতেই মুনতাহা বলল-
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩
“ আপনি আমার ফ্রেন্ডের সাথে কথা কেনো বললেন না? তাকালেন অব্দি না। ”
সিকান্দার গাড়ি চালাতে চালাতে জবাব দিলো-
“ আপনি সামনে থাকলে আমার আর কারোর দিকে তাকাতে ইচ্ছে করে না মন। ”
“ তাহলে কি আমি সামনে না থাকলে তখন তাকান?”
“ তখন মাথা নিচু রেখে নিজের দৃষ্টির হেফাজত করি। আর এটা আমার জন্য ফরজ। ”
