এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৮
আসিফা খান
কোলাকুলির পর্যায় চললো দীর্ঘ রিফাত আর দানিশ এর মধ্যে। কত বছর পর দুই বন্ধুর দেখা বলে কথা।রিফাত, আহীল আর দানিশ ছোটো কালের বন্ধু। স্কুল তিন জনে এক সাথে শেষ করলেও কলেজ পড়া হলো না দানিশ এর কিন্তু সম্পর্ক বজায় ছিল দূরত্বের সাথে।। দানিশ কিয়ৎকাল আগেই জানালো এই রেস্টুরেন্ট তার। বন্ধুর সাফল্য দেখে বেজায় খুশি হলো রিফাত।। রিফাত জানত দানিশ এর একটা রেস্টুরেন্ট আছে,,কিন্তু সেটা যে এইটাই সেটা জানত না ।।
“তাহ শুনলাম নাকি তোর নার্সিং হোম এর কাজ শেষ বললেই চলে।”
দানিশ এর প্রশ্নে জবাবে রিফাত বললো,,,”হ্যাঁ ঠিকই শুনেছিস।।এই সব বাদ দে আগে বল আমাদের ভাবি কেমন আছে?”
দানিশ লাজুক হাসি ফুটিয়ে বলে,,,”আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছে।এক বছরেও নতুন ভাব বিদ্যমান।।”
এদিকে ইয়ানা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। চেনার চেষ্টা করছে দানিশ কে। দানিশ ও কথার ফাঁকে তাকালো ইয়ানার দিকে। চোখ ছোট ছোট করে আবার রিফাত এর দিকে তাকিয়ে বললো,,,
“আমি যদি ভুল না হই,,,এটা ইয়ানা রাইট?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
রাফাত মাথা ঝাকিয়ে সম্মতি জানালো। দানিশ অবাক কন্ঠে বলল,,,,”কত বড় হয়ে গেছে ইয়ানা,,,আমি ওকে অনেক ছোটো বেলায় দেখেছিলাম।।( ইয়ানার পাশে চিয়ার টেনে বসে আবারও বললো)তুমি আমাকে চিনবে না,,,কিন্তু আমি তোমায় চিনি,,,রিফাত এর বন্ধু আমি,,, দানিশ। নাম তো শুনাহি হোগা।”
ইয়ানা ফিক করে হেসে দেয়।। চার বছর পর রিফাত এই প্রথম ইয়ানার হাসি দেখলো।মেয়েটা হাসলে এখনও তার এক গালে টোল পড়ে।। রিফাত এক ঢোক চিপে দৃষ্টি ঘোরালো।।ইয়ানা হাসি বজায় রেখেই বললো,,,
“না,,, নামতো শুনিনি কিন্তু এখন শুনলাম। কেমন আছো দাভাই?”
ইয়ানার মিষ্টি কথা শুনে দানিশ খুশি হলো। মনে পড়লোমেয়েটা ছোটো বেলা থেকেই প্রাণউজ্জ্বল, চঞ্চল,মিষ্টি ভাষী।। এদিকে ইয়ানার মুখে ‘ তুমি ‘ ডাক শুনে রিফাত আবার ও তাকালো তার দিকে।কি সুন্দর মন মাতিয়ে কথা বলছে দানিশ এর সাথে।স্মৃতিতে আটকালো ছোটো বেলায় ইয়ানার তাকে ‘ তুমি ‘ সম্মধনের কথা।। আগের ইয়ানা আর এখন কার ইয়ানার মাঝে বেশ কিছু পার্থক্য খুঁজে পেলো রিফাত।।
কথার মধ্যে দানিশ রিফাত এর দিকে তাকিয়ে বলে,,,”কি রে,,, কি এত ভাবছিস?বস,,,”
রিফাত থমথমে খেয়ে গেল।গলা কেশে দানিশ এর পাশে চিয়ারে বসলো।।দানিশ রিফাত এর দিকে তাকাতেই চোখ গেলো তার কাধের দিকে।চার আঙ্গুলের নখের চিহ্ন স্পষ্ট।দানিশ ভ্রু কুঁচকে অবুঝের মতো বলে উঠলো,,,
“রিফাত,,,এটা কিসের দাগ? দেখে তো মনে হচ্ছে কেও আঁচড় দিয়েছে!”
ব্যাস কথাটা বলা দেরি ছিল কিন্তু রিফাত এর কাশি উঠতে নয়। দ্রুততার সাথে শার্ট টেনে কাধ ঢাকার চেষ্টা করলো। এদিকে ইয়ানার হেঁচকি ওঠা শুরু হলো।লজ্জা আর অসস্তি মুড়িয়ে ফেলেছে তাকে।। দানিশ দুই জনের অবস্থা দেখে জোর আওয়াজে হেসে ফেললো। দুই জনকেই পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো। রিফাত পানি শেষ করে বলে,,,”আসলে,,,**”
দানিশ রিফাত কে আর বলতে না দিয়ে মিটি মিটি হাসি দিয়ে বলে,,,” থাক থাক এক্সপ্লেন্ করা লাগবে না। বুঝি আমি,,,আমিও যে এক বিহাবিত পুরুষ।”
রিফাত কটমট দৃষ্টি নিয়ে তাকালো ইয়ানার দিকে।বেচারি ইয়ানা কি করবে,,সেতো নিজেই ব্রীড়ার বেড়াজালে আবদ্ধ।কোনো রকম নিজের হেঁচকি থামিয়ে মাথা নয়ালো মেয়েটা,,,দানিশ এর কথা শুনে ইয়ানার কান থেকে গরম ধোঁয়া বেড়াচ্ছে।লালিমা আভায় গাল দুটো টকটকে হয়ে গেছে।
“তোরই বউ,,,এই ভাবে তাকাস না মেয়েটার দিকে। দেখ,,,লজ্জায় একাকার মেয়েটা।আমি যাই,,,আর হ্যাঁ বিল পে করার দুঃসাহসিকতা করবি না।”
দানিশ উঠে চলে গেল।এখন এই দুই মানব মানবীর পাশে স্থাই থাকা আর ঠিক নয় বলে মনে করেছে সে।রিফাত আর ইয়ানার বিয়ের বিষয় টা কাছের মানুষ ছাড়া সেরকম কেও জানেনা বললেই চলে। তাই তো এই চার বছরে অগুণিত বিবাহের প্রস্তাব এসেছে ইয়ানর জন্য।বউ শব্দটি শুনে ইয়ানা কেপে উঠল, সংগোপনে সৃষ্টি হলো ঝড়ো বাতাস। চোখ তুলে রিফাত এর দিকে তাকালো বটে কিন্তু লোকটার ভাব ভঙ্গিমা স্পষ্ট হলো না।
অবশেষে খাওয়া দাওয়া শেষে রিফাত ইয়ানার দিকে একটা ওষুধ দিয়ে বললো সেটা খেয়ে নিতে। ওষুধ খাওয়ার পরেই দানিশ এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তারা বেরিয়ে পড়লো বাড়ির উদ্দেশে।
স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক সৃষ্টি কর্তার রচিত সব চেয়ে সুন্দর সম্পর্ক।। এই সম্পর্কে মিশ্রিত আছে আবেগ,বিশ্বাস,সন্মান,রাগ অভিমান,অনুরাগ, স্নেহ আর অগাধ ভালোবাসা।। এক অদৃশ্য সুতোর সাথে বেধে যায় দুটি মন। একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে অচেনা দুই মানব মানবী। কবুল বলার সাথে সাথেই একে অন্যের প্রতি তৈরি হয় নাম না জানা টান, অনুভব।। শীতল স্রোতের মধ্যে ভাসতে থাকে দুই হৃদয়।। মন দেহ মিলে হাতে হাত রেখে তারা পাড়ি জমায় জীবন মৃত্যুর মিলিত স্থানের দিকে।
ইয়ানা আর রিফাত এর সম্পর্কের মোড় কোন দিক নেবে তাহ এখনও ধাঁধা হয়ে রয়েছে।দুই জন যতই দূরত্ব বজায় রাখতে চায়,,প্রকৃতি যেনো তাদের আরো বেশি কাছা কাছি নিয়ে আসে।।
ভিজে চুল পিঠ মেলে দিয়ে মাথায় ওড়না চাপলো তত্পর ডাইনিং রুমে এসে হাজির হলো ইয়ানা। পায়ে ব্যাথা আগের তুলনায় অনেক ভালো,,,বেশি হাঁটলে ব্যাথা বাড়বে তাই আজ কলেজ থেকে অবসর নিয়েছে সে। আজ সারাদিন প্রায় রুমেই কাটিয়েছে।মিশি আর ফিন এর সাথে মেতে ছিল সর্বক্ষণ।ফোনে ঘণ্টা খানেক কথাও হয়েছে আতিকার সাথে।। কাল তাদের বাড়ি ফিরতে প্রায় বিকাল পেরিয়ে গিয়েছিল,,,বাড়ি এসে তাদের কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়নি উপরন্ত সবাই খুশি হয়েছে তাদের এক সাথে দেখে।।বিষাদ মেঘ উবে যাচ্ছে বলে ধারণা করছে সবাই।।,,, এই ধারণা নিয়েই মিসেস আসফিয়া আর ইয়াসমিন বেগম ইয়ারার মাথা খেয়ে ফেলেছে ” কেমন ঘুরলি! কেমন কাটলো সারাটা দিন?” আরো কত কি।
ইয়ান া সহজে মিথ্যে বলতে পারে না মিথ্যে বললে সে কেমন তুটলিয়ে যায়,,, কিন্তু কাল নিজের অ্যান্টি মা আর নিজের মাকে খুবই সুন্দর করে মিথ্যের গল্প শোনালো।।,,, না চাইতেও রিফাতের কথা সে মানলো ,, সে বলেনি তার ব্যথার কথা। সে চাইনি অযথা সবাই চিন্তা করুক তাকে নিয়ে।।,,, কিন্তু ইয়ানার এই ছোট্ট মিথ্যার পিছনে পরিবারের সবার মনের মধ্যে তৈরি হয়েছে অশেষ আশা,,, সম্পর্কে উন্নতি হচ্ছে,ক্লেশ কমছে। ভালোবাসাও বাড়বে।
দুপুরে সবাই একসাথে খাবে,,, ইতিমধ্যে ডাইনিং টেবিলের চেয়ার দখল করেছে দাদু, মিস্টার আফতাব ,আলেয়া।। ইয়ানা চিয়ার টেনে বসতে নিলে তার আগেই দাদু বলে ওঠে,,,
“ইনু যাওতো মামনি রিফাত আর আহিল কে ডেকে আনো তো,,,,তারপর এক সাথে খাবো।”
ইয়ানা ক্লেশ এ পড়ে গেলো। দাদুর মুখের উপর না বলার সাহস কারোর নেই বললেই চলে।। কিন্তু তার প্রতিজ্ঞা,,,সেটা কোনো ভাবেই ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারবে না সে।। ফন্দি আটলো,,,দরজায় টোকা দিয়ে বাহিরে থেকেই ডেকে চলে আসবে,,,কিন্তু রুমে পা দেবে না,,,কোনো ভাবেই নয়।
দুই তিন বার টোকা দেওয়ার পর দরজা আপনা আপনি খুলে গেলো,,, ইয়ানা দরজা খুলে বাহিরে থেকেই চোখ বোলালো রুমের ভেতর। চোখ গেলো ব্যালকনির দিকে। আহিল ভাই কে পুরো দেখা যাচ্ছে পাশে অবস্থিত রিফাত এর অবয়ব বোঝা যাচ্ছে শুধু মাত্র।। ইয়ানা এবার দরজায় জোরে দুই বার থাবা বসলো,,,জোর গলায় বলল,,,
“আহিল ভাই দাদু আপনাদের ডাকছে,,,নিচে আসুন তাড়াতাড়ি।”
ইয়ানার আওয়াজ পেয়ে আহিল উকি দিলো,,,বিস্তারিত হেসে রিফাত এর শার্ট ধরে টান দিলো।। রিফাত হাতে থাকা সিগারেট শেষ করে আহিল এর দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেললো,,,ছেলেটা কেমন মিচকি মিচকি হাসছে। এই হাসির কারণ রিফাতের উপলব্ধি হচ্ছে না।
রিফাত ইয়ানা কে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে বারান্দা দিয়ে কিন্তু মেয়েটা তাকে দেখতে পাচ্ছে কিনা সেটা বোঝা যাচ্ছে।। হলুদ রঙের সালোয়ার কামিজ পড়েছে মেয়েটা,,, মাথায় ওড়না চাপানো সুন্দর করে, ভিজে কিছু অবাধ্য চুল মুখে সামনে এসে পড়েছে, গোল গোল চোখে তাকিয়ে আছে সে বারান্দার দিকে।।,,,মেয়েটাকে দেখলেই আজ কাল কেমন যেন বিব্রত বোধ হয়।,,, সেই জন্মকাল দিয়ে মেয়েটাকে দেখে আসছে সে,,ছোটবেলায় কোলে নিয়ে কতই না ঘুরেছে মেয়েটাকে নিয়ে। কিন্তু এখন তার দিকে তাকালে এমন অদ্ভুত অনুভূতি হওয়ার কোনো মানেই হয় না।। চোখ ফেরালে রিফাত।
আহিল ইয়ানার সামনে এসে সমস্ত দাঁত বের করে বলল,,,”আমি যাই,,,, তুমি ওর সাথে আসো কেমন!”
ইয়ানা থম্ মেরে রইলো,,, ইতিমধ্যে পিছে পিছে রিফাত ও বেরিয়ে এলো।। ইয়ানের দিকে না তাকিয়ে হাঁটা শুরু করলো, গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করল,,,,”পায়ে ব্যাথা আছে?”
“না,,, মানে অল্প।”
খাওয়া দাওয়া মাঝে দাদু আহিল কে জিজ্ঞাসা করলো,,,,”চিরো কুমার থাকার ইচ্ছা আছে নাকি?,,বিয়ের বয়স তো পেরিয়ে যাচ্ছে। বিয়ে টা করে নাও এবার।।,,আমার কাছে কটা মেয়েদের নম্বর আছে,,,সবাই সুন্দরী,উচ্চ শিক্ষিত,,,মানবে তোমার সাথে,,,,কি বলো।”
টেবিলে বসে থাকা প্রত্যেকটা মানুষের ঠোটে হাসির রেখা।। আহিল এর খাবার গলায় আটকা পড়েছে,,, বেচারার অবস্থা শোচনীয়,,,নার্ভাস হাসি দিয়ে দাদুর দিকে তাকিয়ে বললো,,,”আসলে এখনও বিয়ে নিয়ে কিছু ভাবিনি দাদু।”
“তাহ আর কখন ভাববে,,,মাথার চুলে পাকন ধরলে তারপর!,,,আমাদের রিফাত কে দেখো,,,সময় মত বিয়ে দিয়েছি। এত দিন ছিলনা তাই বাচ্চার বাবা হতে পারিনি এবার নিশ্চই হয়ে যাবে।। আর তুমি ওর বন্ধু হয়ে এখনও অবিবাহিত!”
ইয়ানার কাশি উঠে গেলো দাদুর কথা শুনে,, গাল লাল হয়ে গেছে তার।ইয়াসমিন বেগম এর দিকে তাকাতেও লজ্জা করছে।,,,রিফাত চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে বসে রইলো। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠেছে সে। আহিল গুগলি চোখে তাকিয়ে রইল রিফাত এর পানে। বুঝেছে বন্ধুর অবস্থা চরম লেভেল পার করেছে।
মিস্টার আফতাব ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখলো,,, মুখশ্রীর হাফ ভাব দেখে মিস্টার আফতাবের বুঝতে বাকি রইলো না ছেলের মনে এখন কি চলছে ,,রেগে আছে তবে প্রকাশ করতে পারছে না। তত্পর ইব্রাহিম সাহেব এর দিকে মুখ তুলে বললো,,,”আব্বু,,,থাক না এই সব।,, এখনি এগুলো নিয়ে ভাবার সময় নয়।”
এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৭
পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলো।,,,খাওয়ার শেষ করে ইয়ানা চিয়ার থেকে উঠতে যাবে তার আগে ইব্রাহিম সাহেব বললো,,”ইনু,,,তোমার কাপড় আর প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে নেবে।”
“কেনো,,,দাদু?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো ইয়ানা।
“কারণ আজ থেকে তুমি রিফাত এর রুমে শিফট হবে।”
