Home এক প্রণয় রাত্রি এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৯

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৯

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৯
আসিফা খান

স্কলারশিপ পেয়েছে রিফাত। ব্রাইট স্টুডেন্ট হওয়ার সুবাদে বিদেশ গিয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করে দক্ষ হার্ট সার্জেন হয়ে ওঠার অবসর পাচ্ছে সে। এ যেনো এক সুবর্ণ অনুকূল। বাল্যকাল থেকেই তার স্বপ্ন সে ডক্টর হবে,,,চিকিৎসা করবে,,,অসুস্থ মানুষদের নিজের দক্ষতার দ্বারা সুস্থ করে তুলবে। বলা চলে এই সপ্ন তার মায়ের,,,,তার মৃত মাতৃত্বের বায়না। সাদা অপ্রণ গায়ে জড়ানো,,গলায় স্টেথোস্ক ঝুলানো রিফাত কে নিজের চক্ষুদ্বয় এর সামনে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি কিন্তু ,সৃষ্টিকর্তা হয়তো অন্য কিছু ভেবে রেখেছিলেন। আট বছর বয়সী রিফাত কে রেখেই তাকে পারি জামাতে হয়েছিল না ফেরার দেশে।। এই সুযোগ রিফাত কোনো ভাবেই হাত ছাড়া করবে না,,,কোনো মূল্যে না।বাড়ির সকলে এই বিষয়ে ভীষণ খুশি। মিস্টার আফতাব ছেলের মতে এবং পাশে সর্বদা প্রস্তুত ছিলেন। ছেলে তার দক্ষতা পূর্ণ,বুঝদার,,,,ছেলের প্রতি হয়েছে তার একঘাত ভালোবাসা।। বাড়িতে ছেয়ে গেছে খুশির আমেজ। বিরাজ করেছে আনন্দ।।

ইব্রাহিম সাহেব নাতির খুশিতে আত্মহারা হলেন,,হাত তুলে উন্নতি কামনা করলেন তার প্রাণপ্রিয় নতিটার জন্য। কিন্তু সাথেই তার মনের মধ্যে বয়ে চলেছে এক ঝড়। চাপা উত্তেজনায় ভারী হয়েছে মাথা। নাতি তার সুদর্শন যুবক, আদর্শ ব্যক্তিত্বের অধিকারী,দক্ষতায় পরিপূর্ণ,,,,, কিন্তু হৃদয়,, সেটা তো বেসামাল।। তার প্রাপ্ত বয়সী যুবক নাতি টার বেসামাল হৃদয় যদি পিছলে পড়ে কোন বিদেশী রমণীর মোহে! যদি আটকা পরে সাদা চামড়ায় মোড়ানো কোনো এক তরুণীর প্রতি।। এই ভাবনা চিন্তার মধ্যে অসম্ভব এর চিহ্ন খুঁজে পাচ্ছে না ইব্রাহিম সাহেব। যুবক বয়সের হৃদয় কতটা পিচ্ছিল হয় সেটার সম্বন্ধে ভালোই জ্ঞান রাখেন তিনি।। যদিও রিফাত এই ধরনের ছেলে নয় তারপরেও ভয় তো থাকেই।। তার বংশের প্রথম বংশধর,,, বংশের বাতি রিফাত,,, তাকে নিয়ে কোন ধরনের উপেক্ষা তিনি কোন সময় বরদাস্ত করেননি।। এত বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত করা তার মান সম্মানের পাহাড় তিনি কোনভাবেই ভেঙে চুরে গুড়িয়ে দিতে পারবেন না। তার বংশ মর্যাদায় কাওকে হস্তক্ষেপ করতে দেবেন না,, অসম্মান হতে দেবেন না তাঁর সম্মান কে।।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

এইসব ভয়ংকর ধরনের ধারণার মাধ্যমে ইব্রাহিম সাহেব নিলেন এক কঠিন সিদ্ধান্ত। তার সিদ্ধান্ত অটল,অনড়। তার সিদ্ধান্তকেই শীর্ষে স্থান দিয়ে ডাক করলেন মিস্টার আফতাব কে।। বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করলেন তার রুমে। ইব্রাহিম সাহেব ছেলের দিকে এক পলক তাকিয়ে রকিং চেয়ারে নিজের আসন গ্রহণ করলেন মিস্টার আফতাব কে ইশারায় বললেন তার সামনে বসতে।।বাবার গম্ভীর ভাব উপেক্ষা করতে পারলেন না মিস্টার আফতাব। ভ্রু কুঁচকালেন, ভাবলেন, অতঃপর আসন গ্রহণ করলেন।
“কিছু বলবে আব্বা,,,,বিশেষ কোনো কথা আছে?”

অত্যাধিক নম্রতার সাথে কথাটা বলে উঠলেন আফতাব মিয়া।। তানারা দুই ভাই বাবার মুখমণ্ডল দেখেই কিভাবে যেন বুঝে যায় তার বাবা এখন কেমন মেজাজ এ আছেন।। ইব্রাহিম সাহেব কিছু মুহূর্ত চুপ থেকে বললেন,,,
” আচ্ছা আফতাব আমার সিদ্ধান্ত কি কোনদিন তোমাদের জীবনে খারাপ প্রভাব ফেলেছে?”
হতগম্ভ হল, বিমূঢ় হল মিস্টার আফতাব। বিভ্রান্ত কর পরিস্থিতিতে পড়লেন তিনি। হুট করে বাবার এমন কথা শুনে কিছুটা অবাক হলেন।। নম্র শান্ত কন্ঠে বললেন,,,”না আব্ব া এমনটা কোনদিন হয়নি,,, তোমার সিদ্ধান্ত সব সময় সঠিক হয়েছে। এতে আমরা দুই ভাই কেউ কোনোদিন নাচক করতে পারবো না।”
সন্তুষ্ট ,প্রভাবিত হলেন ছেলের কথা শুনে তিনি হয়তো এরকমই উত্তর আশা করেছিলেন।। তার দুই ছেলে আদর্শবাদী, বয়স বেড়েছে তারাও ছেলে মেয়ের বাবা হয়েছে কিন্তু মিস্টার ইব্রাহীমের কথা কোনদিন না এর কাতারে ফেলেননি।। রুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন এরশাদ করলেন,,,

“আমার দুই ছেলে তুই রত্ন আর তাদের দুই ছেলে আমার দুই কাঁধ।। আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সিদ্ধান্তটা অবশ্য রিফাতের উদ্দেশ্যে।। শুনলাম তার বিদেশ যাওয়ার বিমানের টিকিট নাকি কালকের।। আমি আমার দাদু ভাইকে নিয়ে গর্বিত।। ২৬ বছর বয়সি একটা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ আমার দাদুভাই,,, সাথে দিন কাল খুব একটা ভালো নয়।। দুনিয়া দেখেছি আমি, মাথার চুল তো আর এমনি এমনি পাকিনি।।”
“কেমন সিদ্ধান্ত আব্বা?”
“ইনু মামনির সাথে রিফাত এর বিয়ে।। আশা করি আমার এই সিদ্ধান্তে তোমার অমত হবেনা আমি কিছু ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্তটা নিয়েছি।। আমি চাই দাদুভাই বিয়েটা সেরে তারপর বিদেশ যাক।। একটা পিছুটান ,কারোর অপেক্ষা যেন আমার দাদুভাইকে দেশমুখি করে রাখুক।”

মিস্টার আফতাব চমকিত হলেন।বাবার নেওয়া এরকম হঠাৎ সিদ্ধান্ত তাকে অবাক এর চরম পর্যায়ে নিয়ে গেল।। কিয়ৎক্ষণ এর জন্য রিফাতের মুখশ্রী চোখের সামনে ভেসে উঠলো। ছেলে তার গুরুগম্ভীর, অল্পভাষী। রাগ,জেদ যেহেতু তার নাকের ডগায় তাই নিজের জীবনে কাউকে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ দেয়নি কখনো। সেটা যে কেউই হোক না কেন অবশ্য কারো হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়নি কারণ রিফাত খুবই গোছানো এক ছেলে।। গুন পেয়েছে তার দাদুর মত। সেই ছেলেটাও নিজের সিদ্ধান্তকে সবসময়ই গুরুত্ব দিয়ে এসেছে।। পরিবেশ শান্ত দেখাচ্ছে যেমনটা ঝড়ের পূর্বে প্রকৃতি দেখায় ঠিক তেমনি।।ঠাওর করতে পারলো না,,বাবার হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্তের কোন ভিত্তিযোগ্য কারণ খুঁজে পেল না মিস্টার আফতাব।। তিনি জানেন তার বাবার না শব্দটি শোনার অভ্যাস নেই। তারা সিদ্ধান্তে সবাই মঞ্জুরী পোষণ করুক এটাই তিনি সব সময় চান।। তার ওপর ইয়ানা মেয়েটার বয়স সবেমাত্র ১৬,, রিফাতের থেকে হাতগুনে ১০ বছরের ছোট সে। এটা কোন বিবাহ যোগ্য মেয়ের বয়স নয়। তারউপর রিফাত সে কখনোই মানবে না এই ফয়সালা। একটা আদর্শ বাবা হিসেবে রিফাত এর না বলার কারণ ও তিনি জানেন।।

মিস্টার আফতাব চিন্তিত মুখে বললো,,,”কিন্তু আব্বা,,,,ইয়ানা এখন অনেক ছোটো।তারউপর রিফাত কে তো তুমি চেনো,,, ও কখনোই মানবে না।। আর ওর উপর চাপানো সিদ্ধান্ত সে কখনোই মেনে নেয়নি।তার চক্ষু প্রমাণ তো তুমি দেখছো। আসফিয়ার করুন চেহারার আরশী আমার ইয়ানার মায়াবী মুখশ্রী হোক সেটা আমি চাইনা।”
ইব্রাহিম সাহেব এর কন্ঠ এবার দৃঢ় হলো,,,”তোমার মা যখন আমায় বিয়ে করে তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৪, তাই বয়সের কথা মাটি চাপা দাও।।আর দাদুভাই কে আমি দেখে নেবো। তুমি মাসুদ কে বলো কাল সন্ধার আগে চলে আসতে,,,দাদুভাই ঘর ছাড়ার আগেই বিবাহ সম্পূর্ণ করবো।,,,ইয়াসমিন কে আমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিও। সে দ্বিমত পোষণ করবে না আমার বিশ্বাস।”

মুখমণ্ডলে রাগের ছাপ স্পষ্ট। শুভ্র রাঙা চেহারায় আমাবস্যার প্রলেপ। চোখ রক্তবর্ণ ,,,এক লৌহমানবে পরিণত হয়েছে রিফাত।।দুই হাত মুঠি বদ্ধ, চোয়াল শক্ত, ক্রুদ্ধ দৃষ্টি সীমাবদ্ধ কার্নিশে ভাঙা কাঁচের দিকে। একটু আগে কাঁচ এর টি – টেবিলটায় সজরে লাথি মেরে ভেঙে ফেলেছে সে। রাগে থরথর করে কাঁপছে।। রুমটাই যেন এক ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে। মিস্টার আফতাব দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছেলের সেই দৃশ্য দেখে চলেছে অনিমেষ দৃষ্টিতে। এটাতো হওয়ারই ছিল।। ইব্রাহিম সাহেবের সিদ্ধান্তে রিফাত অমত জানানোর পর তাকে জোর করা উচিত হয়নি,,, তাই তো এই ক্লেশ।।

ইব্রাহিম সাহেব বেশ শান্ত। নাতির রাগে সে তার সিদ্ধান্ত বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করবে না।। নাতি যদি তার জেদি হয় তাহলে সে সেই স্কুলের রিটায়ার হেডমাস্টার।। রিফাত এর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আবারো একই কথা জিজ্ঞাসা করলেন,,,”তার মানে তুমি ইয়ানা কে বিয়ে করবে না, তাইতো?”
রিফাত জবাব দেওয়ার কোনো প্রয়োজন মনে করল না।। মিস্টার আফটার ছেলের মনোভাব বুঝতে পেরে রুমের মধ্যে প্রবেশ করলেন গ্লান স্বরে বললেন,,,,”থাক না আব্বা। এই বিয়ের কথা আমরা রিফাত ফিরে আসার পরেও তো করতে পারি এখন কি দরকার এসবের! তোমার সিদ্ধান্তে অমত জানাচ্ছিনা। শুধু সময় পরিবর্ত করতে বলছি।”
ইব্রাহিম সাহেব এবার কিছুটা রোষপূর্ণ হলেন। ছেলের কথায় বেজায় অসন্তুষ্টি পোষণ করলেন।আফতাব মিয়ার দিকে ভরাট একজোড়া দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো,,,,
“বিশাল সম্পত্তির মালিকানা থেকে যদি নিজের ছেলের নাম না কাটাতে চাও তাহলে তাকে বিয়েতে সম্মতি জানতে বলো আফতাব।”

কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলো রিফাত। কপালে ভাঁজ পড়ল। চরম উত্তেজনায় হাতের মুঠো শক্ত হলো। চোয়াল দৃঢ়তায় পরিপূর্ণ হল।প্রলয় ঘটিয়ে ফেলার মত চোখের অবস্থা কাহিল বিবশ হয়ে উঠলো। ইব্রাহিম সাহেবের কথা রিফাতের জন্য কাটা ঘায়ে নুনের ছিটানোর মত হয়ে গেল।। কোন উপায় না পেয়ে তার দাদু কি না তাকে সম্পত্তি হারানোর হুমকি দিচ্ছে! ওই সম্পত্তি,,, যে সম্পত্তির উপর রিফাতের কোন কালেই কোন ধরনের নজর ছিল না।মেডিকেলে চান্স পাওয়ার পর থেকে সে ছোটখাটো একটা চাকরি খোঁজে,,তত্পর নিজের পড়াশুনার খরচ নিজে চালাতে শুরু করে বাবার টাকার দিকে ঘুরেও পর্যন্ত তাকাইনি যে ছেলে তাকে কিনা সম্পত্তির হুমকি! এটা নিছকই হাস্যকর।। রাগে ফুসতে আরম্ভ করল রিফাত। নিজেকে ঠিক রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে তার জন্য তারপরেও একটা জোরে রুদ্ধশ্বাস ছাড়লো। দাদু বাবা চাচার ওপরে উচ্চস্বরে কথা বলার মত বেয়াদবি রিফাত কোনদিনই করেনি,, আজও করতে পারল না। দমন করে নিলে নিজের রাগ,,, দাতের দাঁত পিসে কোনরকম বলল,,,,

“আপনার বাবা কে বলে দিন তার বিশাল সম্পত্তির ওপর আমার কোনদিনই কোন ধরনের দৃষ্টি ছিল না। সেটা আমার সাথে সাথে আপনারা সবাই জানেন। লাগবে না আপনাদের সেই নিছক বিশাল সম্পত্তি ঠেলে দিলাম আপনাদের দিকে।”

কথাটা আফতাব মিয়ার দিকে তাকিয়ে কোনরকম বলে রুম থেকে হনহন করে বেরিয়ে গেল রিফাত।। বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা হতে যাচ্ছে। রাগের মাথায় অত্যাধিক জেদের বসে ঘরের বড় ছেলে এইভাবে বেরিয়ে যাওয়া সবার মনে একটা ঝড় তুললো।। মিস্টার আফতাব কে কোনদিন বউ আর মায়ের মধ্যে দ্বন্দ্বের শিকার হতে হয়নি, তারা দুজনেই ছিল অত্যন্ত বুঝদার। কিন্তু আজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ভেঙে,, মিস্টার আফতাব কে শিকার হতে হল নিজের বাবা আর নিজের ছেলের মধ্যকার দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে।। অগণিত ফোন করা হলো রিফাতকে। আশেপাশে জানা শোনা সমস্ত বন্ধু-বান্ধব কে জিজ্ঞাসা করা হলো রিফাতের সম্পর্কে কেউ কোন খবর দিতে পারল না। গাড়ি নিয়ে সেই যে বেরিয়েছে এখনো পর্যন্ত ঘরে ঢোকেনি সে। রাত পেরালো সকাল আসলো রিফাতের খোঁজ পাওয়া গেল না। আজকে তার বিদেশ যাওয়ার দিন,,, রাত এগারোটা দশে তার ফ্লাইট। বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষের ললাটে পড়লো চিন্তার ভাঁজ,,, আর তার ওপর ঘটে গেল আরেক ঘটনা।

একটা দিন বেড়ালো, সন্ধ্যা প্রায় ৬:৪৫ এর কাছাকাছি রিফাত বাড়ি ফিরল। বিধ্বস্ত চেহারা। উসকো খুসকো চুল,, মলিন মুখশ্রী নিয়ে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করতেই চোখের সামনে পড়লো এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। হাতে স্যালাইন লাগানো অবস্থায় সোফায় বসে রয়েছে ইব্রাহিম সাহেব অসুস্থ মুখখানা দেখে বোঝাই যাচ্ছে তার শরীর খুব একটা ভালো নয়।। তার আশেপাশে বসে রয়েছে আফতাব সাহেব, আসফিয়া ,ইয়াসমিন বেগম তার ছোট চাচা, চাচি, হাফিজ।। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রিফাতের উপর সবার দৃষ্টি এসে পড়ল আফতাব সাহেব কোনরকম সোফা থেকে উঠে রিফাতের সামনে এসে দাঁড়ালেন হুট করে ছেলের দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলেন আর অত্যন্ত করুন স্বরে বললেন,,,

“রিফাত আমি জানি না আমার কিছু হলে তোমার খারাপ লাগবে কি লাগবে না! কিন্তু বিশ্বাস কর আমার আব্বার যদি কিছু হয়ে যায় আমি একদমই ঠিক থাকবো না।b তুমি বেরিয়ে যাবার পর থেকেই আব্বার শরীর ভালো ঠেকছিল না। কাল থেকে আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত তোমার কথা জিজ্ঞাসা করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছিল। তত্পর আজ সন্ধ্যায় কিছু ভাঙার শব্দে সবাই ছুটে যাই তার রুমে। গিয়ে দেখি কাঁচের ক্লাসটা মেঝেতে পড়ে আছে। আর আব্বা বুকে হাত দিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।। হাসপাতালে নিয়ে যাই দ্রুত,,, ডক্টর বলেছে আব্বাকে কোন ধরনের স্ট্রেস, চিন্তার মধ্যে রাখতে না,,, না হলে পরে বড় ধরনের সমস্যা হতে।। তুমি ডাক্তার বড় ধরনের সমস্যা মানে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ।। আমার একটা অনুরোধ রাখো রিফাত,,, বাবা হিসেবে এটুকুনি চাওয়া আমার জন্য পাপ নয়। তুমি আমার আব্বার কথাটাকে মেনে নাও,, তার সিদ্ধান্তে হ্যা জানাও। এটা তোমার কাছে আমার চাওয়া।।”

মিসেস আসফিয়া, ইয়াসমিন বেগম ,ছোট চাচা চাচী সহ ,,হাফিজ দেখছে এক করুন দৃশ্য।। মিসেস আসফিয়া কেঁদে দিল এ দৃশ্য দেখে।।এদিকে যার জন্য তিন বাপ বেটার মধ্যে তৈরি হয়েছে এই অসামান্য দ্বন্দ্ব,, সে নিজের রুমে আরামে ঘুমাচ্ছে। ১৬ বছর কিশোরীকে কিছুই জানানো হয়নি। ইয়াসমিন বেগম নির্দ্বিধায় এই বিবাহ সম্পর্ক মেনে নিলেও মেয়েকে এখনো পর্যন্ত কিছুই বলেনি।। ইয়ানা সেই যে দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর ঘুমিয়েছে এখনও ওঠেনি,,, এদিকে তার জন্য ঘটে গেল এক গল্পের মত ঘটনা।।

রিফাতের পাশে বসানো হলো ইয়ানাকে।।গায়ে জড়ানো মেহেরুন রঙের শাড়ি,, যার আঁচল মাথায় ঘোমটার মতো দেওয়া।।কি হচ্ছে এটা কিছুই বুঝতে পারছে না ইয়ানা। তারা মাম্মা রুমে ঢুকেই তাকে এক প্রকার টেনে তুললো ঘুম থেকে, আর নিজেই তৈরি করতে লাগল ইয়ানাকে,, কোনরকম শাড়ি পরিয়ে নিচে নিয়ে আসলো আর বসিয়ে দিল রিফাতের দাভাই এর পাশে।।,, ঘুম এখনো চোখ ছাড়িনি। মাঝের মধ্যেই হাই তুলছে ছোট্টই ইয়ানা।।

আশেপাশে চোখ বুলালো দেখতে পেল তার আপনজনের া তাদের ঘিরে বসে রয়েছে।তাদের সামনাসামনি বসে রয়েছে এক দাড়িওয়ালা লোক,,, কি যেন কথা বলছে ইব্রাহিম সাহেবের সাথে।। কিছুক্ষণের মধ্যে আরও দুজন ব্যক্তি যোগদান দিয়েছে এই মাহফিলে।আহিল আর দানিশ। এই সমস্ত কিছু দেখে এক রকম বোকা বনে দাঁড়িয়ে আছে। তারা তো এসেছিল তাদের প্রিয় বন্ধু রিফাত কে সি-অফ করতে। কিন্তু এখানে এটা হচ্ছেটা কি!এদিকে আলেয়া বিরক্তির লুক নিয়ে তাকিয়ে যে হাফিজের দিকে,, ছেলেটা মাঝের মধ্যেই মেয়েটার ছোট্ট বিনি ধরে টানাটানি করছে।।ইয়ানা একবার মুখে হাত দিয়ে ফিক করে হাসলো এদের দেখলেই তার টম এন্ড জেরির কথা মনে পড়ে।
ইয়ানা, আরেকবার আড় চোখে তাকালো নিজের পাশে বসে থাকা রিফাতের দিকে গম্ভীর চেহারা। ভাবলেশহীন মনোভাব ,,,চোখ রয়েছে মেঝের দিকে। আশেপাশের খেয়াল নেই যেন সে কোন অচেনা মানুষদের ভিড়ে বসে রয়েছে। ইয়ানা একটা শুকনো গিললো,, চঞ্চলতা হারিয়ে গেল। সে যে ভয় পায় এই লোকটাকে।কেমন যেন গম্ভীর,, কথা বলে কম,,, আর তাকে ধমক দেয় বেশি।

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৮

কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই বিয়ে পড়ানো শুরু হল।ইয়ানা কে কবুল বলতে বললে সে একবার ইয়াসমিন বেগমের দিকে তাকালো মায়ের চোখের ইশারা পেয়ে,,, দ্বিধা ছাড়াই কবুল বলে দিল। অবুঝ মেয়েটা জনলোই না তার সাথে এই মুহূর্তে কি ঘটে গেলো।। এদিকে রিফাত কে কবুল বলতে বললে সে গম্ভীর স্বরে কবুল বলা মাত্রই সোফা থেকে উঠে হনন করে নিজের রুমে চলে গেল কিছু মুহূর্তের মধ্যে নিজের লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে এলো। কারো দিকে তাকানো পর্যন্ত না। এই যে ছেলেটা অভিমানে চলে যাচ্ছে চার বছর দর্শন মিলবে না তার,,, ইব্রাহিম সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। হাত উঠিয়ে দোয়া চাইলো নিজের ছেলের জন্য।। ইব্রাহিম সাহেব মনে মনে বলল আলহামদুলিল্লাহ।

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ১০