Home শ্যামা সুন্দরী শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩৭

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩৭

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩৭
সুরভী আক্তার

মুখটা গুরুভার করে সামনের দিকে হেলে সোফায় বসে আছে অংকুর । দুই হাত দুই হাঁটুতে ঠেসে রাখা । মুখের ভঙ্গিমা অত্যাধিক শক্ত । সকাল সকাল মেজাজ বিগড়ে গেছে একটা পুঁচকে খরগোশ ছানার জন্য । কাল শোয়ার আগ অবধিও বুক খানা লাফাচ্ছিলো ওর । অদ্ভুত আনন্দ লাগছিলো সুরবালার সংস্পর্শে এসে । মেয়েটা যেভাবে আচমকা ঝট করে জড়িয়ে ধরেছিল , সেভাবেই আচমকা ঝট করে ছেড়েছেও । অংকুর কে ছেড়ে আর একবারও মাথা তুলে ওর দিকে তাকায় নি । পিছু ফিরে এক ছুটে সোফায় শুয়ে পড়েছে কম্বল মুড়ি দিয়ে নিজেকে পুরোপুরি আড়াল করে । অংকুর আকস্মিক ওর কান্ডে খানিক থম মেরে দাঁড়িয়ে ছিল । স্তব্ধ হয়ে গেছিলো । পরমুহূর্তে হেসেছিল বোধহয় । কম্বলের নিচে নিজেকে আড়াল করা সুরবালার অবয়ব দেখতে দেখতে ঘুরে এসে শুয়ে পড়েছিল সে ।

সকালে ঘুম ভেঙ্গেছে চমকে ওঠার মাঝে । এক প্রকার বিভৎস ভাবেই । ঘুমের মাঝে নিজের গালে ভেজা খড়খড়ে কিছু অনুভব করতেই পিটপিট করে চোখ খুলেছিল । ঘুমের আবেশে কাতুরে চোখে সামনে আচমকা একটা সাদা ধবধবে খরগোশ ছানা কে দেখে চেঁচিয়ে ঘুম ছুটে লাফিয়ে উঠেছিল অংকুর । ওর চিৎকারে চমকে উঠেছে সুরবালাও । ও এদিকটায় ঠিক মতো খেয়াল দিতে দিতেই খেই হারিয়ে পুনরায় চিৎকার করে উঠেছে অংকুর । ওর চিৎকারে একে একে শবনম, সালেহা , আতিয়া বেগম সকলেই হাজির মুহুর্তেই । খাট থেকে লাফিয়ে নেমে ছিটকে দূরে দাঁড়িয়েছে অংকুর । চোখ এখনো গলু নামক খরগোশ ছানা টার দিকেই ‌। আচমকা ভয় পেয়ে শ্বাস প্রশ্বাস ছুটছে বেগতিক । গলু ভোলাভালার ন্যায় বাদামি অক্ষি যুগলের সহিত পিটপিট করে চেয়ে দেখছে অংকুর কে । সুরবালা আগেই উঠে পড়েছিল । হাত মুখ ধুয়ে এলোমেলো চুল গুলোতে চিরুনি চালাচ্ছিল সে । অংকুরের চিৎকারে দ্রুত এগিয়ে জিজ্ঞেস করল সে….

” কি হয়েছে ? এভাবে চিৎকার করছেন ক্যান ?
তৎক্ষণাৎ সুরবালার দিকে তাকালো অংকুর । দরজার কাছে ইতোমধ্যে সবাই উপস্থিত । আতিয়া বেগম সঙ্কিত হয়ে শুধালেন ব্যাস্ত স্বরে…
” নয়া জামাই ,, কি হইলো হে তোর ? তুই আবার এমনে ভুত দেখার ন্যায় চিল্লাইতাছিস ক্যান ?
সবার চোখেই একই প্রশ্ন । মুখে ভাবভঙ্গিতে উদ্বিগ্নতা । ভ্যাবাচ্যাকা খেলো অংকুর । পতিত হলো অপ্রস্তুত অবস্থায় । চোখ মুখ ডলে শ্বাস টেনে নিজেকে স্বাভাবিক করতে করতেই সালেহা শুধালেন এবার….

” জামাই বাবা , কি হয়েছে ? এভাবে চেঁচালে কেনো ?
” ঐ , না মানে ! খ.. খরগোশ ! ওটা এখানে কি করছে ?
খাটের উপর গুটিসুটি মেরে বসে থাকা গলুকে ইশারা করে বললো অংকুর । সবাই তাকালো খাটের দিকে । সুরবালাও । ও চিরুনি রেখে এগিয়ে এসে গলুকে কোলে তুললো ।
” এটা তো আমার গলু ! এটা কে দেখে এভাবে চেঁচানোর কি আছে ?
অংকুর সুরবালার দিকে কটমটিয়ে তাকালো । ফুসলো ভেতর ভেতর । এটাকে আবার আদর করে কোলে নিয়েছে দেখো । পরশে গায়ে হাত বুলিয়েও দিচ্ছে । অংকুর বিড়বিড় করলো মনে মনে…
” আমার ঘুমের সুযোগে চাটাচাটি করতে এসেছিল হতচ্ছাড়া ।
মুখে বললো…

” না , হঠাৎ চোখের সামনে দেখেছি তো । তাই চমকে উঠেছিলাম । ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠেছি, বুঝতে পারিনি ।
শবনম রসিক হাসলো । সালেহা বেগম অস্বস্তি বোধে ঘর ছাড়লেন । তিনি চলে যেতেই আতিয়া বেগম রসিকতার স্বরে বললেন গলা খাঁকারি দিয়ে…
” ওও , আমি আবার ভাবলাম , আমার নাতনিটা হের নয়া জামাই রে কামড় টামড় দিলো নাকি ! এই লাইগা ছুইটা আইলাম । আইচ্ছা নয়া জামাই , থাক তুই । ইয়ার পর শ্বওড় বাড়িত আইয়া এমনে আর চিল্লাইস না । মানুষ বদ চিন্তা করবো নাইলে…
বলে হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলেন তিনি ‌। শবনম খানিক দাঁড়িয়ে থেকে ও নিজেও চলে গেলো ।
অংকুর সবার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো । আত্মারাম আর একটু হলেও খাঁচা ছাড়া হয়ে যেতো । এসব মশকরা কথা কানে ঢুকলো না । ও নির্বিকারে তাকালো সুরবালার দিকে । চোখ সরু করে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে মেয়েটা । অংকুর তাকাতেই বললো….

” এতো বড় দামড়া একটা লোক , একটা খরগোশ ছানা কে দেখলে কে ভয় পায় হ্যাঁ ?
” কি সব ভাষা ! দামড়া মানে কি হ্যাঁ ?
” কিছু না ! এতো বড় হাতির চেহারা নিয়ে একটা ছোট্ট খরগোশ ছানা কে ভয় পান ?
” তো ভয় পাবো না ? ওটা কে হ্যাঁ , অকাজ কুকাজ করছিল আমার ঘুমের সুযোগ নিয়ে । কোত্থেকে জুটিয়েছো এটাকে …?
” অকাজ কুকাজ মানে ? কি করেছে ও আপনার সাথে ? আপনার মতো একটা হাতিকে কি করবে ও ?
” সুরবালা ?
তপ্ত স্বর অংকুরের । ভেঙ্গিয়ে উত্তর করলো বালা….
” জ্বি , বলুন !
অংকুর আর একটা কথাও বলে নি । গলুর দিকে একবার রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে সোজা এগিয়েছে গোসল খানার দিকে ।

বর্তমান ______
সোফায় ওভাবেই বসে অংকুর । সকালের নাস্তা ঘরেই খেয়েছে । সংগ্রাম নেই , তাই ও ইতস্তত ছিলো । ওর অবস্থা বুঝে বালা কে দিয়ে ঘরেই নাস্তা পাঠিয়েছিলেন সালেহা । খাওয়া শেষ কবেই । আতিয়া বেগম একটু আগে আবার এসেছিলেন ‌। মাজার ব্যাথা বেড়েছে । শ্যামা ঘরে নেই । এসেই হুটোপাটি করে বালা কে নিয়ে নিজের ঘরে গেছেন । গলু কে ঘরেই রেখে গেছে বালা । একটা খাঁচায় রেখে নরম নরম পুঁই শাকের কলি খেতে দিয়েছে । এই খরগোশ ব্যাটা আবার খাচ্ছেও কুটকুট করে । অংকুর ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে ওর খাওয়া দেখছে । এটাকে সহ্য হচ্ছে না একদম ।
রিনিঝিনি নুপুরের শব্দে ক্ষিপ্ত দৃষ্টি শিথিল করলো অংকুর । তাকালো ঘাড় কাত করে । বালা এসেছে । ও সোজা গলুর খাঁচার দিকে এগোলো । গলুকে কোলে তুলে সোজাসুজি বললো ভরাট গলায়….

” বাড়ি যাবেন কবে !
” কাল !
” না ,, আমি আজকেই যেতে চাই ।
” যাও !
” একা ?
” আমাকে নিয়ে যাও !
” আমি আপনাকে নিয়ে যাবো, না আপনি আমাকে নিয়ে যাবেন ?
” তোমার শশুর বাড়ি , তুমি আমাকে নিয়ে যাবে না ?
” ওটা আমার শশুর বাড়ি হলো কি করে ?
” আমার সাথে বিয়ে হওয়ার পর !
” তাহলে বাড়ি টা কার ?
” আমার মায়ের !

চোখ মুখ খিচলো বালা । এই লোকটা সোজাসাপ্টা কথা বলতে পারে না নাকি ? চোখে চোখ রেখে কেমন ঘোর প্যাঁচ লাগিয়ে কথা বলছে দেখো ।
অংকুর সোফায় বসে । বালা ওর মুখোমুখি খাটের উপর ধপ করে বসলো । নিরেট দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখেই বললো….
” আমি আজকেই যাবো !
” কেনো ?
” মা তাড়াতাড়ি যেতে বলেছে ?
” তোমার মা ?
” আপনার !
” আমার মা তোমার কি হন ?
” শাশুড়ি !
” আরে বাহ্ , স্বামী কে স্বামী মানো না অথচ স্বামীর মাকে শাশুড়ি মানো ?
” মা মানি ! এই দিক থেকে আপনি আমার শাশুড়ির পেটের ভাই !

তৎক্ষণাৎ চোখ নামিয়ে খুক খুক করে কেশে উঠলো অংকুর । বালার হাসি পেলো । কিন্তু হাসলো না । মুখ গম্ভীর করে হাসি চাপলো । অংকুর এক মুহুর্তে চোখ নামিয়েছিলো । আবার কাশি থামিয়ে চোখ তুললো । বালার সাথে চোখাচোখি হলো অমনি । বললো মেয়েটা…
” গলু কে কিন্তু আমি নিয়ে যাবো এবার !
কন্ঠ নিরেট করলো অংকুর । চোখ তীক্ষ্ণ করে বললো…
” ওসব প্রাণিতে মার এলার্জি আছে !
শায়লার কথা শুনে মুখখানা মলিন করলো বালা । চোখ নামিয়ে গলুর দিকে তাকালো । এটা সারাদিন সারা বাড়িতে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায় কে জানে ?

শ্যামার থেকে তো ওকে নিজের কাছে নিজ দায়িত্বে নিয়েছে বালা । আগের বার নিয়ে যেতে পারে নি । ভেবেছিল এবার নিয়ে যাবে । কিন্তু বাঁধ পড়লো । বালা চোখ তুলে চাইলো ফের । অংকুরের একই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ওর পানে । আচমকা অংকুরের অমন দৃষ্টি তীরের ন্যায় বিধলো বালার নিকট । এভাবে কি দেখছে লোকটা ? দেখার মাঝেও পার্থক্য আছে ‌। এই লোকটার দৃষ্টি অদ্ভুত ।
হুট করে কাল রাতের কথা মনে পড়লো বালার । কি করেছিল ও কাল ! নিজ ধ্যানে থেকে করেছে কি ? বুকটা ছলাৎ করে উঠলো মেয়েটার । অংকুর চোখ সরানোর নাম নিচ্ছে না । বরং আরো গাঢ় থেকে গাঢ় করছে চাহনি । বালা শুধালো তপ্ত স্বরে…

” কি দেখছেন এভাবে ?
” আমার বউকে..
তৎক্ষণাৎ উত্তর অংকুরের । থতমত খেলো বালা । বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গলুকে কোল থেকে নামালো । অংকুরের চেয়ে দেখার মাঝে বাঁধা পড়লো । বিভ্রান্ত হলো ও । চোখ খানা কুঁচকালো ও । এই মেয়ে টা বিরক্ত করে প্রচুর । বালা প্রসঙ্গ পরিবর্তন করতে এমনি এমনি বলে উঠলো….
” বিকেলে তৈরি থাকবেন । আমি আমার শশুর বাড়ি যাবো ।
” আচ্ছা ….
ছোট্ট উত্তরে বালা আড়চোখে চাইলো । অংকুরের দৃষ্টি এক দেখে চোখ মুখ পাকালো । রাগান্বিত চোখে চেয়ে ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলল….

” এভাবে ড্যাপ ড্যাপ করে কি দেখছেন হ্যাঁ ? না তাকিয়ে কথা বলতে পারেন না ?
অংকুর ধীর শীতল কন্ঠে বলল শুধু….
” দেখার অধিকার টাও কেড়ে নেবে ?
কথাটা কেমন শোনালো । তৎক্ষণাৎ প্রতি উত্তরে কিছুই বলতে পারলো না বালা । ক্ষুব্ধ মুখশ্রী শিথিল করলো , সাথে চোখের দৃষ্টি ও । অংকুর তবুও কয়েক পলক একই ভাবে চেয়েই রইলো । তৃপ্তি মিটিয়ে মুহুর্ত কয়েক বাদ চোখ নামিয়ে ধীরে শ্বাস ফেলে বললো….
” যাও ,,, আর তাকাবো না…

” আচ্ছা রত্নার আম্মা , একখান কথা কোই ?
তালেব মন্ডলের কথায় তার স্ত্রী তাকালেন তার দিকে । ভাত বেড়ে পানির মগে পানি ঢালছিলেন তিনি । রত্নার আব্বা অর্থাৎ তালেব মন্ডল দুপুরে বাড়িতে খেতে এসেছেন । হাত মুখ ধুয়ে বারান্দায় চৌকির উপর বসেছেন । তাদের বারো বছরের মেয়ে রত্না পাশেই বসে । ভাবুক দেখাচ্ছে তালেব মন্ডল কে । রত্নার মা তৎক্ষণাৎ বললো….
” কন !
” আমগো ছোট জমিদারের বউরে দেখছো ? বিয়ার পর তো মেলা মাইনষে দেখতে গেইছিলো , তুমি যাও নাই ?
ধক্ করে উঠলো রত্নার মা । হঠাৎ এই প্রশ্ন কেনো করছেন ইনি । তাও আবার এতো দিন বাদ । রত্না বা রত্নার মা বাড়ির বাইরে পা রাখুক বা কারোর সাথে মিশুক,এটা একেবারেই পছন্দ করেন না তালেব মন্ডল । তিনি সবসময় মেয়ে বউকে চোখে চোখে রাখেন । তালেবের গায়ের রং কালো কুচকুচে । একেবারেই কালো । রত্নার মা শ্যামলা , আর রত্না হয়েছে উজ্জ্বল শ্যামলা । স্বামী , স্ত্রী, সন্তান , কারোর সাথেই কারোর মিল নেই । তালেব মন্ডল রত্নার মা কে সবসময় এক ঘরে করে রাখতে চান । তিনি যতক্ষণ ক্ষেতে থাকেন , ততক্ষণ তার তত্ত্বাবধানের বাইরে থাকেন রত্না আর রত্নার মা ।

ছোট জমিদারের বিয়ের পর পুরো গ্রাম ভেঙ্গে ছিল তার বউকে দেখার জন্য । মহিলারাই শুধু । রত্নার মাও গেছিলো মেয়েকে নিয়ে । তালেব মন্ডল কে না জানিয়ে , তার অগোচরে চুপিসারে । তালেব মন্ডল বাড়িতে ফেরার আগেই তিনি ফিরে এসেছিলেন আবার । এক ঝলকেই দেখেছিলেন ছোট জমিদারের স্ত্রী কে । আজ এতো মাস পর আচমকা সেই প্রসঙ্গ কেনো তুললেন তালেব মন্ডল ?
গলা শুকিয়ে আসলো রত্নার মায়ের । তিনি কম্পিত দৃষ্টি সরিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন । মেয়েকে চোখে না বোধক ইশারা দেওয়ার আগেই রত্না বাচ্চা সুলভ হৃদয়ে ছটফটিয়ে বললো….

” হ আব্বা , গেছিলাম তো দেখতে ! আম্মা ও গেছিলো ‌। তুমি বকবা দেইখা কোই নাই তোমারে ।
ছলকে উঠলো রত্নার মা । এই মেয়েটা কি বলে ফেললো মুখ ফসকে ? না জানি আজ কোন তোলপাড় শুরু করে দেয় এই লোকটা ।
তালেব মন্ডল নিজ ধ্যানে ভাত মাখতে মাখতে আবার শুধালেন….
” ছোট জমিদারের বউ টারে দেখছো আম্মা ?
” হ আব্বা , দেখছি তো !
” কেমন দেখতে ?
” উমমমম , সুন্দর আছে …
একটু ভেবে উত্তর করলো রত্না । তালেব মন্ডল নিজের স্ত্রীর দিকে তাকালেন । মেয়ের কথা কানে তুললেন না । তিনি অনেক শুনেছেন , পাশের গ্রামের মোখলেছ মিয়ার বেটির সাথে তাদের ছোট জমিদারের বিয়ে হয়েছে । মোখলেছ মিয়ার সেই বেটি নাকি কালা !
তালেব মন্ডল মুখে এক নলা ভাত তুলে এবার নিজের স্ত্রী কে শুধালেন….

” কি গো , হুনছি নাকি ছোট জমিদারের বউ কালা ! এইটা কি হাচা ? আমার নাকান ( মতো ) কালা ?
অভয় পেলেন রত্নার মা । তালেব মন্ডলের কন্ঠে ক্ষিপ্ততা নেই । তিনি তবুও ভয়ে ভয়ে বললেন…
” আপনার নাকান নয় , কালা কয় না ছোট জমিদারের বউরে ! একটু শ্যামলা কয় ।
” তোমার নাকান ?
” হ , কিন্তু চেহারা খানা চিকচিক করে । আমার নাকান খসখসা না । নরম শরম , চকচকা সুন্দর…
” সুন্দর আছে ?
” হ , শ্যামলা হইলেও ভারী সুন্দর আছে ! মানান আছে চেহারার !
একটু থেমে আবার বললেন …
” আপনি ক্যান শুধাইতাছেন ?
” আইজ দেখলাম , ছোট জমিদারের লগে হের বউরে । দূর থাইকা দেখছি । বউরে কোলে কইরা আইল পাড় হইতাছিল । দেইখা মনে হয় নাই হের বউ কালা ! কালা মাইনষেরে কেউ ভালোবাসে ? তাও আবার কিনা জমিদার ! এই লাইগা জিগাইলাম কালা না ধলা ? এহন হুনলাম শ্যামলা..

” কালা মাইনষেরে ভালোবাসে না কেউ ?
” কোই ভালোবাসে ? আমারে তো কেউ ভালোবাসে না ? নেহাতি তুমি শ্যামলা , এই লাইগা সংসারে টিইকা আছো । ধলা হইলে তো ভাইগা যাইতা এতদিন ।
” আপনি যেমনে বাইন্ধা রাখেন আমারে , ভাগমু ক্যামনে ?
” ভাগার ইচ্ছা আছে নাকি ?
” ইচ্ছা থাকলে ভাইগা যাইতাম ! আমিও তো শ্যামলা , ভাইগা আর কোই যামু । একমাত্র গতি তো আপনে ।
খাওয়ার পাতে দৃষ্টি রেখে খেতে খেতে বললেন তালেব মন্ডল…
” আমি কালা দেইখা তোমারে ভালোবাসি , ছোট জমিদার ধলা হইয়াও হের শ্যামলা বউরে ভালোবাসে । এইটা দেইখা হের বউরে দেখতে ইচ্ছা করতাছে ভীষণ ।
রত্নার মা আঁতকে চাইলেন । তালেব মন্ডলের প্রথম কথাটা কানে বাজলো । রত্নার মারে রত্নার বাপ ভালোবাসে ! বিয়ে হওয়ার চৌদ্দ বছর হতে চলল , আজ পর্যন্ত এতো শান্ত মলিন ভাবে কোনো দিন কথা বলেন নি তালেব মন্ডল । আজই প্রথম । তাও কিনা আজই ভালোবাসার কথা বললো , মুখ ফসকে হয়তো ! রত্নার মা আচানক ধীর কন্ঠে বললেন…

” চেহারা দেইখা ভালোবাসা হয় না , ভালোবাসা হয় মন থাইকা । ছোট জমিদারের মন আছে । আর ছোট জমিদার গিন্নির একখান মায়াবী চেহারা আছে । এই লাইগা ছোট জমিদার হের শ্যামলা বউরে ভালোবাসে । হুনছি ভালোবাইসাই নাকি বিয়া করছে ।
” তুমি কি কইবার চাও আমার মন নাই ? আমার গায়ের চামড়া কালা হইলেও মন ধলা । এই লাইগা তুমি আমার বউ । চোদ্দ টা বছর আটকাই ধইরা সংসার করতাছি । ভালোবাইসা বিয়া করি নাই তা কি হইছে , বিয়ার পর তো ভালোবাসছি ! এই লাইগা একখান মাইয়ার আম্মা হইছো…

শ্যামা কে নিয়ে মাধবপুরে এসেছে সংগ্রাম জোয়ার্দার । দুপুরের খাবার খেয়েছে এখানেই ‌। আচমকা মেয়ে-জামাইকে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলেন অলকা । খেই হারিয়ে ফেলেছিলেন এদিক ওদিক ছুটতে । মেয়ে জামাই ও যে আচমকা হুট করে এসেছে এটা শুনলেন পরে । সংগ্রাম শ্যামা কে রেখে যাবে , এটা শোনার পর বোধহয় তার থেকে খুশি আর কেউ হন নি । কাকড়ি বুড়ি বাড়িতে নেই কদিন থেকে । মেয়ের বাড়িতে গেছেন । আরো দুটো দিন থাকবেন ‌। এই সময়ে শ্যামার থাকাটা মন্দ হবে না । একেবারে উপযুক্ত সময় এটাই । অলকাও বাড়িতে একা থাকেন সারাদিন ‌। মিলে ধান ভানার কাজ ছেড়েছেন সেই শ্যামার বিয়ের পর । কাজ করেই বা এখন কি করবেন ? শ্যামার জন্য কাজ করতেন তিনি । এখন তো কাছে শ্যামা নেই , সে আছে সুখে ।

মোখলেছ ও আড়তে থাকে বেশিরভাগ সময় । দুপুরেও ফেরে না অধিক দিন । ফেরে একেবারে রাতে ।
শ্যামা কাছে নেই আজ কতগুলো মাস । মেয়েটা কে একপলক দেখার জন্য বুক পোড়ে ভীষণ । ইচ্ছে করে এক ছুটে মেয়ের কাছে যেতে । কিন্তু উপায় নেই । তারা যে জমিদার । সংগ্রাম ও কখনো তাগিদ দেয়নি অলকা কে নিয়ে যাওয়ার । কি করে যাবেন অলকা ? মেয়ে কে দেখার তীব্র তৃষ্ণা, তীব্র তাপদাহে পুড়েছেন । ময়না টাও নেই কদিন হলো । গা জুড়িয়ে ছিলো কতোদিন । আবার জ্বালা ধরিয়ে চলে গেছে ।
বিকেলের আগে আগে শ্যামা কে রেখে চলে গেছে সংগ্রাম । আগের বার আসার পর দুটো শাড়ি রেখে গেছিলো শ্যামা । সংগ্রাম যাওয়ার আগে বলে গেছে গুনে গুনে দুদিন শ্যামা কে বাপের বাড়িতে রাখবে শুধু । শ্যামা না করে নি । এই দু’টো দিনই অনেক ।

বিকেলে সংগ্রাম চলে যাওয়ার পর কেমন একা একা ভাব ধরেছে শ্যামার । আম্মা কাছে আছে তবুও । ফুলি খবর পেয়ে ছুটে এসেছে সন্ধার আগে । মাগরিবের আজানের আগে দুই বান্ধবী ঘাটে গিয়ে বসেছে । অলকা রাতের রান্না বসিয়েছেন ।
বহু কাল বাদ শ্যামা আজ ওর সেই চিরচেনা ঘাটে । আহহ্ , কত তৃপ্তি এখানে । তৃপ্ত হাওয়া বইছে চারপাশে । সেই আগের পলি মাটির গন্ধ । আলতো শীতের আমেজ । নদীর পানির কলকল শব্দ । ঢেউ বইছে ধীর গতিতে । শরীর মন সব জুড়িয়ে যাচ্ছে শ্যামার । এ এক অদ্ভুত ভালোলাগা । বড় আমগাছটার নিচে বসেছে দুজন । শ্যামা কে দেখে ফুলি কি খুশি । ফুলিটার চেহারার হাল বেহাল । শরীরে মাংস ছাড়া হাড় । একেবারে কাহিল অবস্থা ওর । শ্যামলা ফিনফিনে চেহারা খানা কেমন মুচড়ে গেছে , নেতিয়ে পড়েছে । কালি বসেছে চোখের নিচে । মাথার চুল গুলোতে তেল তো দূর , চিরুনি ও করে না কতদিন কে জানে । শ্যামা করুন নিভু চোখে কাতুরে হয়ে ওকেই দেখছে সেই তখন থেকে । কি অবস্থা হয়েছে ওর সই’য়ের । ফুলি একধাপ সিঁড়ি নিচে বসেছে । শ্যামা উপরে । ফুলিও চেয়ে দেখলো । শ্যামার মাঝেও পার্থক্য পেলো । আগের তুলনায় একটু মোটা হয়েছে শ্যামা । চেহারাতেও জৌলুস বেড়েছে । ফুলির মুগ্ধ চোখে শ্যামার সৌন্দর্য দ্বিগুণ লাগলো । ও হাসলো স্নিগ্ধ । শ্যামা বললো আহত স্বরে…

” ফুলি ! কি অবস্থা হইছে তোর ? এমনে শুকায় গেছিস ক্যান ?
ফুলি নিজের দিকে তাকালো । নিজেকে দেখে বললো…
” শুকাইছি ? কোই ? আমি তো আগের মতোনই আছি ! অনেক দিন পর দেখতাছিস তো , এই লাইগা এমন মনে হইতাছে !
” অনেক দিন পর দেখতাছি দেইখাই তফাত বুঝতে পারতাছি ! আমার চৌখকে লুকাইবি ? তোর অবস্থা বুঝমু না আমি ? চৌখের নিচেও কেমন কালি পড়ছে , ঘুমাইস না রাইতে ?
” ঘুমাই তো !
” তাইলে !
” এমনি এমনি !
” কাকি কেমন আছে ?
” আছে বাইচা !

শ্যামা খানিক থম মেরে রইলো । ফুলি চঞ্চলতা করছে না । আগের মতো নিজে থেকে বক বক করে মাথার পোকা নাড়িয়ে দিচ্ছে না । হাসাচ্ছে না শ্যামা কে । শ্যামার চাহনিতে ফুলির অপ্রস্তুত লাগছে নিজেকে । ও বোধহয় নিজেকে আড়াল করতে চাইলো । চোখ নদীর দিকে তাক করলো । বলে উঠলো ….
” দেখ শ্যামা , নদীতে পানি শুকাই গেছে । কাইল নৌকা নিয়া আমু ? যাইবি ঘুরবার ‌?
শ্যামা ওর কাটানো কথায় কান দিলো না । ফুলির মাথা টা নিজের দিকে টেনে আনলো । ওর মাথাটা রাখলো নিজের কোলে । এলোমেলো জট পাকানো একটা বেনি মাথায় । শ্যামা সেটাতে হাত চালাতে চালাতে মিষ্টি করে বললো…..
” চুলে তেল দেইস না কতদিন ? এমনে জইট পাকায় আছে ক্যান ।
ফুলি প্রথমে শ্যামার কোল থেকে মাথা তুলতে চাইলেও পরে তুললো না । অধীক দূর্বলতায়‌ মাথাটা বেশি করে এলিয়ে দিলো শ্যামার কোলে । চোখ দুটো বুজলো । হালকা অন্ধকারে ওর শ্যামলা গাল বেয়ে চোখ ছাপিয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু কণা গড়িয়ে পড়লো শ্যামার কোলে । ভেজা রুদ্ধ স্বরে বলল ফুলি….

” তুই যতদিন থাইকা নাই , ততোদিন থাইকা চুলেও তেল পড়ে নাই । কে দিয়া দিবো আমার চুলে তেল ? তোর মতো কইরা যত্ন নিয়া কেডায় বিলি কাইটা দিবো আমার মাথায় । কেউ তো নাই , এই লাইগা কাম গুলাও হয় নাই । কেউ করে নাই তোর রাইখা যাওয়া কাম…
শ্যামা ধক্ করে উঠলো । বুক খানা মোচড় দিয়ে উঠলো ওর । হাত দুটো ও থেমে গেলো আচানক । ফুলির গলার স্বরে ওর চেপে রাখা কান্না স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে । শ্যামা ওকে টেনে তুললো । মুখখানা আগলে ধরে নিজের মুখোমুখি করলো ।

” কানতাছোস ফুলি ?
” তোরে খুব মনে পড়ে রে শ্যামা , খুব মনে পড়ে । ভীষণ কান্না পায় তোর কথা মনে উঠলে । ক্যান তোর বিয়া টা হইলো ক দেহি ? সব সময় ক্যান থাকলি না তুই আমার লগে ? আগের মতো কইরা । ক্যান আমারে রাইখা চইলা গেলি ? আমার খুব একলা লাগে রে ? তোরে ছাড়া ভালো লাগেনা আমার । আমি ভালো নাই রে !
আম্মার জবান ও বন্ধ হইয়া গেছে , জানিস । কথা কয় না কয়দিন থাইকা । হেও আর বাঁচবো না । আমারে কান্দায় মরার আগেই । কেমনে চাইয়া থাকে জানিস ? কথা কওনের চেষ্টা করে , ঠোঁট নাড়াইতে পারে না । কথা না কইতে পাইরা নিজেও কান্দে আমারেও কান্দায় । হেয় মরলে আমার আর কেউ থাকবো না রে ! কেউ থাকবো না আর ।
ফুলি কান্না গিলে মাথা নোয়ালো । শ্যামা আহত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ নীরবে চেয়ে থাকলো ওর দিকে । এই মুহূর্তে কথা বাড়ালে ও নিজেকেও সংবরন করতে পারবে না । আর ফুলির ও কষ্ট বাড়বে । শ্যামা ঢোক গিলে বললো….
” তুই বস , আমি এক্ষুনি আইতাছি !

ফুলি মাথা তুললো । বাঁধা দিলো না শ্যামা কে । শ্যামা উঠে ঘাট ছেড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো । সোজাসুজি ঘরে গিয়ে টেবিলের উপর থেকে তেলের বোতল টা হাতে তুললো । অলকা খেয়াল করেন নি পেছনে । শ্যামা বারান্দায় এক মুহুর্ত থেমে অলকা কে দেখে ফের ঘাটের দিকে এগোলো । আজান পড়বে এক্ষুনি । শ্যামা আবার গিয়ে আগের জায়গায় বসলো । ওর উপস্থিতি টের পেয়ে হাতের উল্টো পিঠে চোখ দুটো মুছে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ফুলি । ফুলি তাকাতেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটালো শ্যামা । মিষ্টি শীতল কন্ঠে বলল…

” আমার রাইখা যাওয়া কাম আমিই করমু ।
ক্যামনে অগোছালো কইরা জট পাকাই রাখছোস চুল গুলাতে । সোজা হইয়া বস , আমি তেল দিয়া দিতাছি ।
” না না শ্যামা , আমার দেরি হইয়া যাইবো । আজান পড়বো এক্ষুনি । আম্মারে ঘুমের মধ্যে রাইখা আইছি । উঠলে আমারে খুঁজবো । আমি যাই ? কাইল আমু আবার …
” বস তো , হইবো না দেরি ‌। আমি টপাস কইরা তেল দিয়া দিতাছি ।
ওকে সামনের দিকে ফেরালো শ্যামা । ফুলি কিছু বলতে গিয়েও পারলো না । বেনি খানা আগেই খুলে দিয়েছে শ্যামা । আলতো হাতে তেল নিয়ে সিঁথিতে দিলো । বিলি কেটে আগের ন্যায় অতি যত্নে ফুলির চুলে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে তেল দিতে লাগল শ্যামা ।

সন্ধ্যার আজান পড়েছে ।
রাতের রান্না বান্না ইতোমধ্যে শেষ । আফতাব , আফতাবের বাবা বাড়িতে নেই কেউ । ঘরে হারিকেন জ্বালিয়ে বসে আছে শাশুড়ি বউমা । খালেদা সবে নামাজ সেরে উঠলেন । তিনি এসে বসলেন ময়নার পাশে । কোমল কন্ঠে বললেন…
” কাইল থাইকা আমার লগে লগে নামাজ পড়বা । এমনে মিছামিছি বইয়া থাইকা লাভ কি ? আল্লাহর কাম করলে কামে আইবো ।
আমার নামাজ পড়া না দেইখা আমার লগে নামাজ ধরবা কাইল থাইকা । ফজরে ডাইকা দিমু আমি ! কেমন ?
” আইচ্ছা আম্মা !
” সব সূরা পারো নামাজের !
” হ ।
” তাইলে নামাজ পড়ো না ক‌্যান ?
” কাইল থাইকা পড়মু , ডাইকা দিয়েন ।
ময়নার নিরস স্বর । হারিকেনের আলোয় ময়নার দিকে তাকিয়ে আছেন খালেদা । মেয়েটা হাসলে সুন্দর লাগে । কিন্তু হাসে না ‌। খালেদা চুপ থেকে বললেন….

” একনা হাসো তো বউমা , আমি দেখমু ‌। তোমারে হাসলে সুন্দর লাগে..
ময়না খানিক ঠোঁট ফাঁক করলো খালেদার কথায় । স্মিথ হাসি ‌। হাসি টুকু গায়েব হতে সময় লাগলো না । ঠোঁটের কোণে জোর পূর্বক টেনে আনা হাসি টুকু মুহুর্তেই সরিয়ে ফেললো আফতাবের উপস্থিতিতে । হুট করে ঘরে ঢুকে ডাকলো আফতাব…
” আম্মা !
তড়িতে তাকালেন খালেদা । এই সময় তো ছেলে বাড়িতে আসে না । আজ আসলো যে ? আফতাব ফেরে দেরি করে । ওর খাবার বেড়ে ওর ঘরে ঢেকে রাখেন খালেদা । ও ফিরে একলা একলা খেয়ে নেয় ‌। আজ তাড়াতাড়ি ফিরলো ‌। খালেদা ডাকের সাঁড়া দিলেন , বললেন….

” আব্বা , এতো তাড়াতাড়ি আইছোস আইজ ?
” হুম ।
” ক্ষুধা লাগছে ? ভাত দিমু ?
” না , দেরি করে খাবো !
কথাটা শেষ করেই হাতে থাকা একটা লাল রঙা ব্যাগ এগিয়ে দিলো খালেদার দিকে । একবার ও তাকায় নি ময়নার দিকে । ময়না এক পলকে নিরাস চোখ সরিয়েছে । আফতাব ব্যাগ টা খালেদার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল…
” এটা নাও !
” কি আছে এইটাত ?
” শাড়ি ।
” শাড়ি ?
সচকিতে বিচলিত প্রশ্ন খালেদার । ময়না ফের চাইলো । প্রথমে ব্যাগ টার দিকে , পরে আফতাবের দিকে । আফতাব না তাকিয়ে উত্তর করলো….
” সকালে তো বললে , মনে করে একটা শাড়ি আনতে ! তাই আনছি !
” বউ মার লাইগা ?
” যার জন্য আনতে বলেছিলে , তার জন্যই ।
খালেদা খুশিতে চিকচিক করে উঠলেন । ময়নার অবিশ্বাস্য মূক চাহনি । ওর তাকিয়ে থাকার মাঝেই কথা শেষ করে গটগট করে ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে আফতাব আবার বললো ।

” আমি ঘরে গেলাম ।
খালেদা তড়িঘড়ি করে ব্যাগ থেকে বের করলেন শাড়ি টা । গাঢ় বেগুনি রঙের একটা শাড়ি । কপাল গুটালেন খালেদা । তিনি তো বলেছিলেন নীল শাড়ি আনতে । আফতাব বোধহয় রঙ চিনতে পারেনি । যাই হোক , এই গাঢ় রঙের বেগুনি শাড়িটা ও মানাবে ময়না কে । তার বাউ মাকে সবকিছুই মানাবে । ময়না থ মেরে বসে আছে । চেয়ে আছে শাড়িটার দিকে । সূক্ষ্ম কারুকার্য খচিত একখানা জামদানি শাড়ি । ব্যাগে আরো কিছু আছে , খালেদা এবার পুরো ব্যাগটা উপুড় করলেন । বিছানার উপর ঠক করে পড়লো কাগজে মোড়ানো এক গোছা কাঁচের চুড়ি । সাথে একখানা কালো ছোট টিপের পাতা । ময়নার চোখ দুটো আরো বৃহৎ হয়ে আসলো । জ্বলজ্বল করে উঠলো । আপনা আপনি হাসি ফুটলো দুই ঠোঁটে । খালেদা মোড়ানো কাগজ খুলে চুড়ি গুলো বের করতেই ময়না চুড়ি গুলো ছোঁ মেরে নিলো নিজের হাতে । বেগুনি রঙের ও কাঁচের চুড়ি হয় ? এই রঙের চুড়ি তো আগে দেখে নি । মুখ ফাঁক করে চুড়ি গুলোর দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলল ময়না….

” কি সুন্দর । বেগুনি রঙের কাঁচের চুড়ি ? আগে তো দেহি নাই !
খালেদা স্মিথ হাসলেন ।
” শাড়ির সাথে বনাইয়া নিয়া আইছে চুড়ি । আমার পোলা চালাক আছে । টিপের পাতা ও আনছে দেখি ।
ময়না তড়িঘড়ি করে চুড়ি গুলো হাতে ঢোকালো । ওর সব সাজগোজের জিনিস বাড়িতে । আজ কাল সাজগোজে মন ধরে না । সেসব হয়তো ট্রাংকের ভিতর পড়ে আছে । দুহাত ঝাঁকাতেই রিনঝিন শব্দ হলো নিস্তব্ধ ঘরে । ফিক করে হাসলো ময়না । খালেদা অপ্রতিভ নয়নে দেখছেন তার ছেলের বউয়ের খুশি । ময়না একখানা টিপ তুলে আন্দাজে কপালে লাগালো । হাসলেন খালেদা , এবার শব্দ করে । কেমন বাচ্চাদের ন্যায় খুশিতে ছটফট করছে মেয়েটা ।
এমনটা এই কদিনে প্রথম দেখলেন খালেদা । তিনি বললেন নরম গলায়….

” শাড়িটাও পইড়া ফেলাও বউ মা । তোমারে মেলা সুন্দর মানাইবো ।
ময়না ইচ্ছের বিরুদ্ধে খানিক দ্বিমত করে বললো….
” এখনই ?
” হ । দরজা লাগায় দিয়া আহো । আমি পড়াই দিতাছি !
ময়না ঝট করে নেমে ছুটলো দরজার দিকে । হাতের ঝাকুনিতে চুড়ির রিনিঝিনি শব্দে মুখরিত হলো পুরো ঘর । দরজা লাগিয়ে ছটফটিয়ে ছুটে আসলো আবার । পড়নের শাড়িটা বদলে ওকে নতুন শাড়ি টা পড়ালেন খালেদা । অতি যত্নে শাড়ির কুচি গুলো ভাঁজ করে দিলেন । আঁচল খানা পাতলা করে ঘাড়ে ঝুলিয়ে দিলেন । খালেদার ঘরে বড় আয়না নেই । ঘরের বেড়ায় ছোট একটা আয়না টাঙানো । খালেদা চোখ ভরে ময়না কে দেখলেন প্রথমে । আহ্ , কি মুগ্ধতা তার দৃষ্টিতে । এই আবছা অন্ধকারেও ময়নার শরীরে শাড়িটা যে কতখানি ফুটে উঠেছে ! ভীষণ জ্বলছে ময়নার শরীরে শাড়িটা । ফর্সা শরীরে টকটকে হয়ে ফুটে উঠেছে । খালেদা শাড়ির আঁচল খানা ময়নার মাথায় টেনে দিলেন । ময়না শুধালো…

” শেষ আম্মা ?
” হ ।
” কেমন লাগতাছে আমারে !
” মেলা, মেলা, মেলা সুন্দর । একেবারে চান্দের নাকান । আমার এই আন্ধার ঘরের আলো হইয়া জ্বলতাছে তোমার রুপ ।
ময়না লাজুক হাসলো । আয়না দেখার উদ্দেশ্যে ঘুরে তাকাতেই খালেদা বলে উঠলেন ।
” এইখান তো ছোট আয়না বউমা । তোমার ঘরের বড় আয়নায় নিজেরে দেইখো । আফতাব ও ঘরে আছে । ঘরে যাও ….
ময়না মুখখানা চুপসে ফেললো ।
খালেদা স্মিথ হেসে বললেন….

” লজ্জা পাইতে হইবো না । ঘরে যাও । নয়া শাড়ি আইনা দিলো আমার পোলা । আমার পোলারে দেখাইবা না ?
ময়না আমতা আমতা করে দ্বিমত করতে চাইলো । কিন্তু খালেদার জোরাজুরিতে পারলো না । ঠেলে ঠুলে ওকে ঘর থেকে বের করে নিজের ঘরে পাঠিয়ে দিলেন খালেদা । বাইরে এসে খানিক থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল ময়না । দেউড়ির কাছে কারোর পায়ের শব্দে উপস্থিতি টের পেলো , আফতাবের বাবা এসেছেন । তার সামনে এভাবে পড়তে চাইলো না ময়না । ও এক ধাক্কায় ঘরে ঢুকলো সমস্ত সংকোচ ঠেলে । দরজা টা ঠাস করে লাগিয়ে দিলো । হাঁফ ছাড়ল অতঃপর ।

দরজার শব্দে বিরক্তি নিয়ে চোখ তুললো আফতাব । সামনে ময়না কে দেখে থমকালো । ময়না ঘাড় ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকাতেই বিরক্তি মাখা মুখখানা শিথিল করলো আফতাব ‌। ময়না সোজাসুজি তাকিয়েছে , ফলে একেবারে চোখাচোখি হয়েছে আফতাবের সাথে । আফতাবের তাৎক্ষণিক দৃষ্টিতে ভড়কালো ময়না । আফতাবের শ্যামলা চেহারার কপালে কয়েক স্তর ভাঁজ । ময়না বুঝলো সে বিরক্ত হয়েছে । চোখ নামিয়ে নিলো ময়না । চিবুক ঠেকালো গলায় ।
দু’জনেই নীরব । কারোর মুখে কথা নেই ।

খানিক সময় পেরোলেও আফতাবের কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে ধীরে ধীরে আবার চোখ তুললো ময়না । অমনি আবার চোখাচোখি হলো । আফতাবের স্থির দৃষ্টি । এবার ময়নার দৃষ্টির সম্মুখীন হয়ে এক মুহুর্ত পর চোখ সরালো ও । আবার চোখ তুলে পা থেকে মাথা অবধি ময়না কে পরখ করলো সে । ময়না ইতস্তত, সংকচিত । হাত পা শিরশির করছে ওর । আফতাব আকস্মিক বসা থেকে উঠলো । এগোলো দৃঢ় পায়ে । ময়না চমকালো , ভড়কালো মেয়েটা । আফতাব কে নিজের দিকে আসতে দেখে পেছাতে চাইলো । পেছনে দরজা , এক পা পেছাতেই পিঠ ঠেকলো দরজার সাথে । আফতাব এসে থামলো ওর সম্মুখে । তীর্যক তীক্ষ্ণ নেত্রে চিবুক গলায় ঠেকানো মেয়েটার দিকে আরো কয়েক পলক চেয়ে থাকলো ।

আকস্মিক দ্বিধা হীন হাত বাড়িয়ে দিলো ময়নার দিকে । আঘাতের ভয়ে সিটিয়ে গেলো মেয়েটা । চোখ মুখ খিচে গুটিয়ে দাঁড়ালো । আফতাব আলতো হাত ওর কপালে স্পর্শ করালো । দুই আঙ্গুলে কপালের বাঁকা টিপ খানা তুলে একেবারে মাঝামাঝি সঠিক স্থানে বসিয়ে দিল । কাজ শেষে হাত সরালো ঝট করে । আবার বিদ্যুতের গতিতে দ্রুত গিয়ে বসলো আগের জায়গায় । ময়নার কম্পিত হৃদয়ের কম্পন বাড়ছে ।
ও চোখ খুললো পিটপিট করে । কেনো জানি মনে হয়েছিল আফতাব মারবে ওকে । গায়ে হাত তুলবে মানিকের মতো । কিন্তু না ।

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩৬

ও ধীরে ধীরে নিভু চোখে তাকালো সামনে । পা ঝুলিয়ে খাটে বসে আফতাব । সামনের দিকে দৃষ্টি । ময়না তাকাতেই ও ময়নার দিকে না তাকিয়ে বললো…
” শাড়ি খোলো….

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩৮