Home সে খলনায়ক সে খলনায়ক পর্ব ১২

সে খলনায়ক পর্ব ১২

সে খলনায়ক পর্ব ১২
ফারহানা সানিয়াত

গোল আকৃতির টেবিলের একপাশে গুটি শুটি হয়ে বসে আছে প্রাণপ্রিয়া,, তার চোখ মুখ দেখে বোঝা যাবে সে আপাতত কতটা অস্থিরতায় ভুগছে, কিন্তু কি করার কিছুক্ষণ আগে সারাকে যখন বলেছিল আমি যাবো না। সারা তাকে এক ধমক মেরে টেনে এখানে নিয়ে এসেছে,, তবে এখানে যদি সারা শুধু একা থাকতো তাহলেও মানা যেত কিন্তু সাথে,, প্রাণপ্রিয়া জিভ দিয়ে ঠোট ভিজিয়ে এক নজর তার বরাবর তাকায়,
দামিয়ান যে আপাতত পায়ের উপর পা তুলে বুকে হাত গুঁজে পাশে সরার সাথে কথা বলছে।
আচ্ছা একটা কথা তারা দুজনই যখন কথা বলছে তাহলে তাকে টেনে নিয়ে আসার কি ছিল!! তারমধ্যে চোখে ভেসে আসছে সেদিনের ঝিলের ঘটনাটা উফফ!!

__ তোমার পড়াশোনার কি খবর প্রিয়া? সারা দামিয়ান আর তার কথা বলার মাঝে প্রাণপ্রিয়াকে জিজ্ঞেস করে ওঠে,,
প্রাণপ্রিয়া নিজের একা একা কথা বলা বন্ধ করে কোনমত হালকে হেসে মিনমিন কন্ঠে বলে,, জিজ ভালো,,
__ ‌হুম ভালো হলেই ভালো আশা করি এইচএসসিতে ভালো পয়েন্ট পাবে তুমি।প্রাণপ্রিয়া ঠোঁটে চেপে মাথা নিচু করে ইনশাল্লাহ,,
তখনই পাশ থেকে একজন সার্ভেটে এসে তাদের সামনে কোল্ড কফি রেখে যায় ,,খাবার আসতে লেট হবে বলে আপাততোর জন্য কফি অর্ডার করেছিল সারা,,
__ তো এক্সামের পর কি কোনো ভার্সিটিতে ভর্তি হবে?টেবিলের উপর থেকে কফির গ্লাস হাতে নিতে নিতে সারা জিজ্ঞেস করে।
প্রাণপ্রিয়া মাথা তুলে হালকা হাসে, ইচ্ছা আছে বলেই বরাবর বসা এক নজর দামিয়ানকে দেখে,,
যে তার দিকে ই স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার প্রতিটা ভাবভঙ্গি খুব লক্ষ্য করে দেখছে,, তার অস্থির দুটি চোখ, বারবার পাতলা ঠোঁটে দুটো চেপে রাখা বা কামড়ে ধরা, সামনে আসা ছোট ছোট চুল কানের পিছে গুঁজে দেওয়া,,
প্রাণপ্রিয়া দামিয়ানকে নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অস্থিরতা দ্বিগুণ হয়ে গলার সাথে লেগে থাকা দুপাট্টা ঠিক করে বুকের সামনে নিয়ে আবার দামিয়ানকে এক নজর দেখে,, দামিয়ানের দৃষ্টি এখনো স্থির। পাশে বসা সারা প্রাণপ্রিয়াকে নানান কথা জিজ্ঞেস করার মাঝে সেও খেয়াল করেছে ব্যাপারটা,,

__ আমার মনে হয় এখন যাওয়া দরকার আপু,,, তার আর অস্থিরতা সহ্য হচ্ছে না এখন কেটে পড়তেই হবে,( মনে মনে বলে প্রাণপ্রিয়া।)
সারা ভ্র কুচকায়,, কেনো তোমার ফ্রেন্ড কি ফোন করেছে?
প্রাণপ্রিয়া না সূচক মাথায় নাড়ায় ,, নাহ হয়তো ফোন দেওয়ার কথা তার মাথায় নেই তাই আমাকে খুঁজতে পারে আর আমার অনেক ইম্পরট্যান্ট কাজও আছে আমার যাওয়া উচিত বলেই প্রাণপ্রিয়া বসে থেকে উঠে চেয়ার সরিয়ে দ্রুতপায়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার জন্য হাটা ধরে ,,
দামিয়ানের দৃষ্টি প্রাণপ্রিয়ার দিকে এখনো স্থির তবে মুখে এবার গম্ভীর্যতা ফোটে উঠেছে কারন প্রাণপ্রিয়ার চলে যাওয়াটা যেন তার কাছে পছন্দ হয়নি ,,পাশ থেকে সারা বিরক্তি মুখে বলে,, মেয়েটার জন্য কফি অর্ডার করেছিলাম একবার ছুঁয়েও দেখেনি এমন কোন ফ্রেন্ড অপেক্ষা করছে তার জন্য,

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে বুকে হাত দিয়ে সস্থির নিশ্বাস ফেলে প্রাণপ্রিয়া, তার দমটা যেন এতক্ষণ আটকে ছিল আল্লাহ!!
__ কিরে! কিরে! কোথায় গিয়েছিলে তুই? তোকে না আমি দাঁড় করিয়ে গিয়েছিলাম। ব্যস্ত পায়ে ইভান প্রাণপ্রিয়ার কাছে এসে জিজ্ঞেস করে,,
সামনে থেকে প্রাণপ্রিয়া এতক্ষণ পর ইভানকে আসতে দেখে রাগে সে দাঁত কিড়মিড় করে উঠে এই ছেলের কারণে তার অস্বস্তিতে ভুগতে হচ্ছিল ,
,__ তুই নিজে কোথায় হাওয়া হয়ে গিয়েছিল হে, এখন আমাকে জিজ্ঞেস করছিস আমি কোথায় গিয়েছিলাম ফালতু ছেলে, ইভানের অপরাধী কন্ঠ ,, আমার ইম্পর্টেন্ট কাজ পড়ে গিয়েছিল দোস্ত ,রাগ করিস না আমি অনেক দুঃখিত তোকে এভাবে দাঁড় করিয়ে যাওয়ার জন্য কিন্তু তুই,,
প্রাণপ্রিয়া চোখমুখ কুচকে বলে উঠে,, চুপ কর আর একটা কথা বলবি না ,,, বলেই প্রাণপ্রিয়া সামনে হাটা ধরে, পিছে থেকে ইভান হা করে শ্বাস ফেলে এখনই এই মেয়ের রাগ ভাঙ্গাতে আল্লাহই জানে তার কি কি করতে হয়।
ঘন্টাখানেক পর,,
কেনাকাটা শেষ করে প্রাণপ্রিয়া ইভান শপিং মল থেকে বের হয়ে সোজা বাহিরে আইসক্রিম ওয়ালার কাছে গিয়ে পছন্দ মতন আইসক্রিম কেনা শুরু করে। প্রাণপ্রিয়ার রাগ কমানোর জন্য ইভান বলেছে আজ যে কয়টা আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করবে সে খাবে ,, তাই আর প্রাণপ্রিয়াকে কে আটকায় খুশি মনে বকবক দুষ্টুমি করতে করতে আইসক্রিম কিনে,
অন্যদিকে লাঞ্চ করার পর কিছু সময় কাটিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে দামিয়ান আর সারা গাড়িতে উঠে বসে। তবে হঠাৎ সারার চোখ পড়ে বাহিরে কিছু দূর দূরে আইসক্রিমের দোকানের সামনে দাঁড়ানো প্রাণপ্রিয়া আর ইভানের দিকে,,

__ ও মাই গড ওটা ডক্টর ইসরাফিল আঙ্কেল এর ছেলে ইভান আর প্রাণপ্রিয়া না?সরার কথা শুনে দামিয়ান সারার দিকে তাকায় এরপর তার চোখ বরাবর বাহিরে ,,
বাহিরে প্রাণপ্রিয়া আর ইভান উচ্চস্বরে হাসাহাসি দুষ্টুমি করছে দুজনের একে অপরের হাত ধরা যে কেউ দেখলে বলবে তারা প্রেমিক প্রেমিকা, সারা নিজেও হেসে বাহিরের দিকে তাকিয়ে এই কথাটা বলে তবে সত্যিটা এমন কিছুই না।
দামিয়ানের গাড়ির স্টেয়ারিং ধরা হাত আস্তে আস্তে দৃঢ় হয় প্রাণপ্রিয়ার মুখের হাসি আর হাসতে হাসতে ইভানের ওপর ঢলে পড়া খুবই বিরক্তকর,, সে চোখ সরিয়ে গাড়ি স্টার্ট করে ,,ওই‌ আশ্রিতা ডক্টরের ছেলের জন্য চলে এসেছিল! তার সামনে থেকে এই ছেলের জন্য এসেছিল! এই ছেলের সাথে দেখা করার জন্য!!

বাহিরে সন্ধ্যা হতে না হতে আবরার ম্যানসনের চারপাশে ঝলমলে আলোয় আলোকিত,, এই সময়টা রাজকীয় আবরার ম্যানসনের সৌন্দর্য একদম অন্যরকম,সারা হাতে চায়ের কাপ নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাহিরের এই সৌন্দর্য দেখছে,,
পিছে বেতের সোফায় বসা মিসেস চৌধুরী বলে ওঠেন,,
__ তোমার এনগেজমেন্ট টা হলে আমি আর তোমার বাবা একদম সস্থির নিঃশ্বাস ফেলবো, কবে থেকে এর জন্য অপেক্ষা করছিলাম আমরা অবশেষে আবরার পরিবারের সামাজিকভাবে সদস্য হবে তুমি।
সারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে ,, এতে লাভ কি হবে?
মিসেস চৌধুরী মেয়ের এমন কথায় বাঁকা হাসেন,, বল কি লাভ না হবে ,
সারা মায়ের দিকে ঘুরে তাকায়,,
আমি জানি তুমি কোন লাভের কথা বলছো,
দামিয়ানের সাথে বিয়ে হলে হুমায়ূন আঙ্কেল তার ব্যবসার সবকিছু আমাকে দিবে কিন্তু আমার তো এমন লাভ চাইনা। পুরোটা জীবন আমার ফর্মালিটি সম্পর্কের মধ্যে চলে যাবে যেখানে কোনো ভালোবাসা থাকবে না শুধু থাকবে দায়িত্ব।

মিসেস চৌধুরী মেয়ের অবুঝ ইমোশনাল কথাবার্তা শুনে বসা থেকে উঠে মেয়ের দিকে এগিয়ে শক্ত কণ্ঠে বলেন,,
ভালোবাসা মাই ফুট ,কি হবে ভালোবাসা দিয়ে? কি হয়? এসব মাথা থেকে বের করো আমাদের স্ট্যাটাসের সাথে ভালোবাসার এইসব মানায় না সবকিছুই বিজনেস দিয়ে হয়,, আর কি বললে তোমার এমন লাভ চাইনা? সিরিয়াসলি সারা!ছয় বছর ধরে এই বাসায় আসা যাওয়া কি এমনি হচ্ছে আমাদের ? তোমাকে আমি এখানে এমনিই রেখেছি? তোমার বাবা আর তোমার হুমায়ুন আঙ্কেলের বিজনেস ডিল এমনি হচ্ছে?
সারা অন্য দিকে তাকায়,, মিসেস চৌধুরী মেয়ের চিবুক ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলেন,,
__মা বাবা কখনো সন্তানের খারাপের জন্য কিছু করে না। তাই এতদূর এসে এমন ইমোশনাল অবুঝের মত কথা না বলে দামিয়ানের দিকে ফোকাস দাও তার সাথে বেশি বেশি সময় কাটাও যতটুক পারা যায়, তাকে বোঝাও তুমি তার জন্য পারফেক্ট,
সারা মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে
মাথা নাড়ায়,, মিসেস চৌধুরীর মুখে হাসি ফুটে ওঠে
আচ্ছা কাল তো তুমি আমাদের সাথে বাসায় যাবে তাই না।
সারা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়,,

সে খলনায়ক পর্ব ১১

__ আচ্ছা ঠিক আছে তবে বেশ দিনের জন্য বাসায় থাকা যাবে না আবার এখানে চলে আসতে হবে,,কারণ ধনী ছেলে তার মধ্যে পুরোপুরি বাংলাদেশী ও না কখন কোথায় নজর পড়ে যায় বলা যায় না।
মায়ের এমন কথা শুনে সারা কপাল কুঁচকে যায় মানে!
__ মানে বাড়ির আশেপাশে চোখে পড়ার মতো সৌন্দর্য আছে হ্যাঁ জানি ঐসব জাস্ট কয়েক দিনের ফুর্তি হয়ে থাকে কিন্তু এনগেজমেন্ট এর আগে আমি চাই দামিয়ানের মনোযোগ তোমার দিক থেকে সরে অন্য জায়গায় পড়ুক।
সারা মায়ের কথায় কিছু একটা ভাবে অতঃপর হঠাৎ মাথায় আসে দুপুরে রেস্টুরেন্ট দামিয়ান‌ প্রাণপ্রিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল ,,,

সে খলনায়ক পর্ব ১৩