Home সে খলনায়ক সে খলনায়ক পর্ব ১৩

সে খলনায়ক পর্ব ১৩

সে খলনায়ক পর্ব ১৩
ফারহানা সানিয়াত

আজকের সকালটা শুরু হয়েছে প্রাণপ্রিয়ার আশ্রমে ঝাড়ু মোছা করে, সেই সকালে ঘুম থেকে উঠে আশ্রমের প্রতিটা কোনা পরিষ্কার করেছে সে,, কাল রাতে ভেবে নিয়েছিল কলেজ যখন পর দিন ও বন্ধ তাহলে আশ্রমের কাজ মনোযোগ দেওয়া যাবে। যেই ভাবনার সেই কাজ আপাতত সব জায়গায় পরিষ্কার করে এখন নিজের ঘর পরিষ্কার করছে,,
,, ওহ আরেকটা কথা তো বলা ই হয়নি এক বছর ধরে প্রাণপ্রিয়া এই আশ্রমে নিজের আলাদা একটা ছোট্ট ঘর পেয়েছে যেমনটা মিসেস সেলিনা আর রহমানেরও আছে, যাইহোক।
এখন সে বিছানায় বসে তার ড্রইং করার সরঞ্জাম গোছাচ্ছে, তার ঘরে আসবাবপত্র থেকে এই ড্রয়িং করার জিনিসপত্র দিয়ে ই গিজিভিজি,,

__ প্রিয়া আপু! প্রিয়া আপু!
হঠাৎ দরজা দিয়ে গুটিগুটি পায়ে প্রাণপ্রিয়াকে ডাকতে ডাকতে পাঁচ বছরের শখ প্রবেশ করতে ই প্রাণপ্রিয়া হাতের কাজ থামিয়ে সামনে দরজার দিকে তাকায়,
__ তোমাকে আন্টি নিচে ডাকছে দ্রুত আসো বলেই আবার শখ যেভাবে এসেছিল সেভাবে গুটি গুটি পায়ে চলে যায়।
প্রাণপ্রিয়া শখের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ভাবে, কিছুক্ষণ আগে না আন্টির সাথে ই ছিলাম!
বসার ঘরে মিসেস সেলিনা আর আবরার মেনশনের সার্ভেন্ট সুফিয়া বসে কথা বলছেন,,
প্রাণপ্রিয়া সিঁড়ি বেয়ে নেমে নিজের জামা হাত দিয়ে ঝরতে ঝরতে তাদের সামনে আসতেই সেলিনা তাকে দেখে অত্যন্ত খুশির সাথে বলে ওঠেন,,

__ তোমার জন্য সুফিয়া একটা ভালো কাজ এনেছে প্রিয়া,,তোমার খুব পছন্দ হবে আর আমার মনে হয় এ কাজের জন্য তোমার বেশ লাভ ও হবে।
প্রাণপ্রিয়া আন্টির কথা শুনে চোখ পিটপিট করে পাশে বসে সুফিয়ার দিকে তাকায়, কাজ!
সুফিয়া হাসেন,, হুম কাজ ছবি আর্ট করার, আসলে বড় সাহেবের ছেলে দামিয়ান সে নাকি কি আর্ট করাবে, তার জন্য একজন আর্টিস্টকে ও বলা হয়েছিল কিন্তু আমি তাকে তোমার কথা বলেছি তুমি খুব সুন্দর আর্ট করতে পারো, আর বড় সাহেবের ছেলে তো একদম বড় সাহেবের মতোই দয়ালু , একজন আশ্রমের মেয়ে সুন্দর আর্ট করতে পারে এটা শুনে তো তোমার আর্ট দেখার জন্য আর্টিস্টকে না করে দিয়ে আমাকে পাঠিয়েছে তোমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ,
সুফিয়া আন্টির কথা শুনে প্রাণপ্রিয়ার সাথে সাথে কাশি উঠে যায়,, তা দেখে সেলিনা দ্রুত সামনে টেবিলে রাখা পানির গ্লাস নিয়ে প্রাণপ্রিয়ার দিকে ধরে বলেন ,,__ নেও নেও পানি খাও, ,
সেলিনা ধরে রাখা পানির গ্লাস প্রাণপ্রিয়া দ্রুত হাতে নিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে বড় করে নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করে,,

সুফিয়া গালে হাত দিয়ে বলেন, হায় আল্লাহ কাশি উঠার সময় পেল না এক মুহূর্তে ই কাশতে কাশতে মেয়েটা কেমন লাল হয়ে গেল ইসস।
প্রাণপ্রিয়া কোনরকম নিজেকে শান্ত করে,,এরপর অশান্ত গলায় বলে উঠে, ,আপনি এটা কি‌ করলেন
আন্টি আমি কি ওতো ভালো আর্ট করতে পারি নাকি আর এটা আমার ধারণা সম্ভব না, আমি যাব না!!
__ কি বলছো এসব? পাশ থেকে সেলিনা কপালে বাজ ফেলে বলে ওঠেন,, তোমার মাথা কি ঠিক আছে এত বড় সুযোগ হাতছাড়া করবে আজ যদি তোমার আর্ট তার কাছে ভালো লাগে এর মূল্য পাবে সাথে এমনও হতে পারে ভালো কোনো সুযোগ সুবিধা ও পাবে।আন্টির কথা শুনে প্রাণপ্রিয়ার মুখ চুপসে যায়, সেলিনার পাশে বসা সুফিয়া ও একই কথা বলেন কিন্তু প্রাণপ্রিয়া তাদের কিভাবে বুঝাবে ওই লোককে দেখলে তার হাত কাঁপে তার অস্বস্তি বোধ হয় সেখানে আর্ট করবে কিভাবে,

আবরার ম্যানসনের সবাই সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সারার পরিবারকে বিদায় জানানোর জন্য । আজ তারা চলে যাচ্ছেন সাথে সারাও, সারা গাড়ির ভেতর থেকে সবার সাথে দাঁড়িয়ে থাকা দামিয়ান কে দেখে হালকা হাসে বিপরীতে দামিয়ানের ঠোঁটেও হালকা হাসির দেখা যায়।এরপর সারা পাশে দাঁড়ানো আহনাফকে এক নজর দেখে গাড়ির সামনের দিকে তাকায় ,,মিস্টার আর মিসেস চৌধুরী ও হুমায়ুন সাথে বাকি সবাইকে বিনয়ের সাথে বিদায় জানিয়ে ড্রাইভারকে গাড়ি স্টার্ট দিতে বলেন…অতঃপর তাদের গাড়ি চলে যেতে যে যার মত ভিতরে ঢুকে নিজেদের কাজে চলে যায়, কিন্তু আহনাফ দাঁড়িয়ে থাকে তার দৃষ্টি মেইন গেটের দিকে যাওয়া সাদা রঙের গাড়িটির দিকে, সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে , মাঝে মাঝে তার ভাগ্যের উপর হাসি পায় যখন পছন্দের মেয়েকে সিস্টার ইন লো বলে ডাকতে হয় আর ফিউচারে ও হবে কথাটা ভেবে পকেটে হাত গুজে শব্দ করে হেসে উঠে ‌তবে পরমুহূর্তেই আবার হাসি থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলে,,
গোলাপি রঙের চুড়িদার ভেজা কোমর পর্যন্ত চুল কাঁধের এক পাশে রাখা মুখে কোনরকম সাজসজ্জা নেই তবে পরিপাটি হয়ে সুফিয়ার সাথে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলছে প্রাণপ্রিয়া,, উদ্দেশ্য আবরার মেনশন ওহ সাথে তার রং তুলি আর রংয়ের ব্যাগ ও আছে মানে সে আর্ট করার জন্য ই যাচ্ছে, না পারতে যাচ্ছে কারণ সেলিনা তাকে জোর করে ঠেলে ঠুলে সুফিয়া আন্টির সাথে পাঠিয়েছে,,
প্রাণপ্রিয় আর সুফিয়া রাস্তার একপাশ দিয়ে হাটার মাঝে তাদের সামনে দিয়েই সারাদের গাড়ি যায়,,
গাড়িতে থাকা সারা আর মিসেস চৌধুরী দুজনে ই প্রাণপ্রিয়া কে দেখে,,

__ এই মেয়ের এই বাসায় আসা-যাওয়া ইদানিং দেখছি বেড়ে গেছে ,,সারা মায়ের দিকে তাকায়,, আশ্রমে একজন কেয়ারটেকার অসুস্থ তাই,,
মিসেস চৌধুরী হাসেন,, সবকিছু এত স্বাভাবিক নিও না বোকা মেয়ে মাথা খাটাও ,সারা হালকা কপাল গুটায়,, তুমি কাল থেকে কি বলছো মম প্রিয়া এমন মেয়ে না আমি ওকে চিনি,
মিসেস চৌধুরী শব্দ করে হাসেন,, হ্যাঁ আমি জানি তুমি ওই মেয়েকে চেনো কিন্তু দামিয়ান সে একজন ছেলে আর সব ছেলেদের মন যে এক জায়গায় পড়ে থাকবে এমন কিন্তু না।
সারা বিরক্ত হয়, এমন না হলে নেই আমার জাস্ট ওর বউ হওয়ার দরকার আমি হব এখন দয়া করে চুপ কর ভালো লাগছে না বলেই সারা এক হাত কপালে দিয়ে চোখ বন্ধ করে তবে আবারো মাথায় আসে দামিয়ান রেস্টুরেন্টে প্রাণপ্রিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল।
গেস্ট হাউসের বসার ঘরের খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে দামিয়ান দৃষ্টি তার ঝিলের স্বচ্ছ পানির দিকে,, পিছন থেকে নিকলাই এসে সাবধান কন্ঠে বলে ,, স্যার সবকিছু রেডি,
দামিয়ান ঝিলে দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পিছে ঘুরে তাকায়,,নিকলাই দৃষ্টি নত করে,,

__ ওকে তুমি এখন যেতে পারো।
__ নিকলাই মাথা নাড়ায় জি স্যার বলে ঘুরে চলে যেতে নিলে আবার দামিয়ানের সামনে এসে দাঁড়ায়,,
স্যার কিছুদিনের মধ্যে ক্যাথরিন ম্যাম ও বাংলাদেশ আসছে তাহলে রাশিয়াতে কে ,,,,
নিকলাইয়ের পুরো কথা শেষ করার‌ আগে দামিয়ান হাত উঁচু করে থামিয়ে দেয়,
__ পরশু তুমি রাশিয়াতে যাচ্ছ তোমার প্লেনের টিকেট কাটা হয়ে গেছে,
স্যারের এহেন কথায় নিকলাই মনে মনে দারুন ভাবে ঝটকা খায় তবে উপর দিয়ে কোনরকম প্রতিক্রিয়া ছাড়া সোজা দাড়িয়ে থাকে,,
দামিয়ান বাঁকা হাসে, আমার আর মম অনুপস্থিতিতে রাশিয়ার সবকিছু তুমি গিয়ে সামলাবে, কারণ আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করি না‌।নিকলাই ঢোক গিলে মাথা নাড়ায় জিজ স্যার,
দামিয়ানের হাঁসি চওড়া করে,, গুড তবে আরেকটা কথা তোমাকে রাশিয়া পাঠাচ্ছি এটা বাবা যাতে না জানে ।
নিকলাই ফের মাথা নাড়ায়, জিজ স্যার,
দামিয়ান চোখ সরু করে নিকলাইয়ের কাঁধে হাত রেখে আরো কিছু বলতে যাবে তখনি গেস্ট হাউসের সদর দরজা দিয়ে সুফিয়া আর তার পিছে পিছে
চুপসান মুখ নিয়ে মাথা নিচু করে প্রাণপ্রিয়া প্রবেশ করে।আর পায়ের শব্দ শুনে দামিয়ানের সরু দৃষ্টি নিকলাইয়ের দিক থেকে সরে প্রাণপ্রিয়া দিকে পড়ে।
সুফিয়া দামিয়ান আর নিকলাইকে বসার ঘরে দেখে দুঃখিত বলেন ওঠেন কারন তারা কথা বলছিল তারমধ্যে তারা দুজন প্রবেশ করেছে,,

প্রাণপ্রিয়া সুফিয়া আন্টিকে দুঃখিত বলতে শুনে চোখ তুল তার দিকে তাকায়,,সুফিয়া হালকা হাসি মুখে প্রাণপ্রিয়া কে বলেন,, থাকো তাহলে এখন আমার যেতে হবে,
প্রাণপ্রিয়া চোখ বড় বড় করে দ্রুত আন্টির হাত ধরে,, কেনো তুমি কোথায় যাবে?
সুফিয়া আস্তে করে প্রাণপ্রিয়ার হাত ছাড়িয়ে বলেন,, এটা কেমন প্রশ্ন গাধা মেয়ে আমার কাজ আছে সেগুলো শেষ করতে হবে না তুমি থাকো আর নিজের কাজ মনোযোগ দিয়ে করো ঠিক আছে বলেই তিনি ধীর পায়ে গেস্ট হাউস থেকে বের হয়ে যায়।
প্রাণপ্রিয়া ঠোঁটে কামড়ে আন্টির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে তাকে এখানে রেখে না গিয়ে ঝিলের জলে ভাসিয়ে দিলেই পারতো,

সে খলনায়ক পর্ব ১২

দামিয়ানের চোখ এখনো প্রাণপ্রিয়ার দিকে, সে নিকলাইয়ের কাঁধ থেকে হাত নামিয়ে ইসারা করে তাকে চলে যেতে বলে। নিকলাই স্যারের ইশারা দেখে দ্রুত গেস্ট হাউস থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়ায়,, প্রাণপ্রিয়াও বাহির থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকাতেই নিকলাই কে দেখে যে দ্রত গতিতে তার সামনে দিয়ে বাহিরে চলে যায়।
অতঃপর,
__ এখানে কি দাঁড়িয়ে থাকার জন্য এসেছ,?
গম্ভীর এক কণ্ঠ প্রানপ্রিয়ার কানে পৌঁছাতেই ভিতরটা ধক তার করে ওঠে ,

সে খলনায়ক পর্ব ১৪