Home কিস অফ বিট্রেয়াল কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৩৯

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৩৯

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৩৯
লামিয়া রহমান মেঘলা

গড়িয়ে গেছে বেশ কিছু দিন।
গ্রীষ্ম তার অন্তিম প্রহরে এসে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে বর্ষার ঋতু। এমনিতেই এ বছর গ্রীষ্মজুড়েই প্রকৃতি ছিল অস্থির। মাঝেমধ্যেই কালো মেঘে ঢেকে গেছে আকাশ, ঝড় আর বৃষ্টির দাপটে কেঁপে উঠেছে চারপাশ। এখন তো বর্ষা প্রায় দুয়ারে এসে উপস্থিত। তাই বৃষ্টি যেন আরও উদার হয়ে নেমে আসছে পৃথিবীর বুকে। কখনো ঝিরিঝিরি, কখনো মুষলধারে। কখনো জানালার কাঁচে নরম ছন্দ তোলে, কখনো আবার একটানা শব্দে ঢেকে দেয় সমস্ত নীরবতা।

আজও তেমনই এক বৃষ্টিভেজা দিন।
শিমুল এবং জেবরান গিয়েছে কক্সবাজার। সেরিন প্রায় জোর করেই পাঠিয়েছে শিমুলকে। এতদিনের মানসিক চাপ আর অস্থিরতা থেকে অন্তত কিছুটা সময়ের জন্য দূরে থাকুক সে। এরপর না হয় ঠান্ডা মাথায় সবকিছু ভেবে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।
বাড়িতে এখন শুধু কায়ান, সেরিন, বানু মির্জা আর আহি।
তবে সকাল সকাল গ্রাম থেকে খবর এসেছে। সেখানে কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। তাই বানু মির্জা এবং আহি তড়িঘড়ি করে গ্রামে চলে গিয়েছেন। আর কায়ান রয়েছে অফিসে।
ফলে এই মুহূর্তে পুরো বাড়িতে একাই রয়েছে সেরিন।
ভীষণ একঘেয়ে লাগছে তার। বিশাল বাড়িটা যেন আজ আরও বেশি নীরব, আরও বেশি ফাঁকা। সময় কাটানোর জন্য তাই দুপুরের রান্নাটা সে নিজেই করলো, অবশ্য সার্ভেন্টকে সঙ্গে নিয়ে।
রান্না শেষ করে সেরিন গিয়েছে গোসল করতে।
ঠিক সেই সময়ই বাড়িতে ফিরেছে কায়ান।

বানু মির্জা ফোন করে তাকে জানিয়েছিলেন, আজ তিনি আহিকে নিয়ে গ্রামে যাচ্ছেন এবং ফিরতে বেশ দেরি হবে। বাড়িতে সেরিন একা থাকবে, তাই যেন কায়ান দ্রুত বাড়িতে ফিরে আসে।
কথাটা শোনার পর অফিসে আর মন বসেনি তার। প্রয়োজনীয় কাজগুলো গুছিয়ে সে সোজা বাড়ির পথ ধরেছে।
কায়ান ফিরতে ফিরতেই সকাল থেকে চলতে থাকা হালকা বৃষ্টিটা যেন আচমকা রূপ বদলে নিল। আকাশ ভেঙে নেমে এলো মুষলধারে বর্ষণ। ধূসর মেঘে ঢেকে গেল চারদিক। বৃষ্টির ঘন পর্দায় দূরের সবকিছু ঝাপসা হয়ে উঠলো।
গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করার আগেই বেশ খানিকটা ভিজে গেছে কায়ান।
বাড়িতে ঢুকেই সে সেরিনকে ডাকলো।
কিন্তু সেরিনের বদলে এগিয়ে এলো এক তরুণী সার্ভেন্ট।
মেয়েটার বয়স খুব বেশি নয়। পরনে সাধারণ একটি থ্রি পিস। তাকে আগে কখনো দেখেনি কায়ান। নতুন মুখ দেখে ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল তার।

“কে আপনি?”
মেয়েটা কায়ানের দিকে একটি তোয়ালে এগিয়ে দিতে দিতে বললো,
“আমার নাম ঊর্মি। আমি আজ থেকে নতুন কাজে এসেছি।”
ঊর্মির কাছ থেকে তোয়ালেটা নিয়ে কায়ান বললো,
“আমার স্ত্রী কোথায় জানো?”
প্রশ্নটা শুনতেই ঊর্মির মুখের উজ্জ্বলতা যেন মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল। ফ্যাকাসে দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করলো,
“যিনি দুপুরে রান্না করলো, উনি?”
“হয়তবা। কোথায় সে?”
“উনি তো গোসল করতে গেছেন।”
“ওকে।”

কথাটা বলেই কায়ান সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো।
ঊর্মি স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
বৃষ্টিতে ভেজা সাদা শার্টটি কায়ানের সুঠাম দেহের সঙ্গে লেপ্টে আছে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকা মানুষটাকে দেখে মেয়েটি যেন কিছুক্ষণের জন্য নিজের চারপাশ ভুলে গেল।
কি অপূর্ব দৃশ্য।
ঊর্মি শুধু তাকিয়েই রইলো সেদিকে।

সমুদ্রের বিশাল ঢেউগুলো একের পর এক এসে আছড়ে পড়ছে শিমুলের পায়ের কাছে। নোনা বাতাস ভেসে বেড়াচ্ছে চারপাশে। দূরে দিগন্তরেখায় আকাশ আর সমুদ্র যেন একাকার হয়ে গেছে। বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে, আর তার সঙ্গে সমুদ্রের রূপও যেন আরও গভীর, আরও রহস্যময় হয়ে উঠছে।
শিমুল মাথা রেখে আছে জেবরানের ঘাড়ে। দু’জনেই নীরবে বসে আছে সমুদ্রের তীরে।
শিমুল খানিকটা সময় ধরে তাকিয়ে রইলো সেই বিশাল জলরাশির দিকে।
“জেবরান।”
“বলো।”
“আমার ক টুকু এই সমুদ্রে ফেলে দিলে তাকি আবার ফেরত আসবে?”
প্রশ্নটা শুনে জেবরানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
সে বুঝতে পারে তার স্ত্রীর কষ্ট। একটা মেয়ের জন্য এই সত্য মেনে নেওয়া সত্যিই কঠিন যে সে কোনোদিন মা হতে পারবে না। এই অপূর্ণতা, এই শূন্যতা, এই নীরব ব্যথা প্রতিনিয়ত ভেতর থেকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয় তাকে।
জেবরান কী উত্তর দেবে ভেবে উঠতে পারলো না।

ঠিক তখনই হঠাৎ একটি শিশুর আতঙ্কিত চিৎকার ভেসে এলো তাদের কানে।
শিমুল এবং জেবরান যেখানে বসেছিল, সেটি ছিল একটি পাঁচ তারকা হোটেলের ব্যক্তিগত বিচ এলাকা। এই অংশে সাধারণত খুব বেশি মানুষের আনাগোনা থাকে না। তাই আশেপাশেও তেমন কাউকে দেখা যাচ্ছিল না।
চিৎকার শুনেই দু’জন দ্রুত উঠে দাঁড়ালো এবং শব্দের উৎসের দিকে এগিয়ে গেল।
কাছে যেতেই তারা দেখতে পেল, জারিফ তীরের ধারে দাঁড়িয়ে কান্না করছে আর জিনু পানির মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে।
দৃশ্যটা দেখে শিমুল নিজেকে সামলাতে পারলো না।
সে এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত পানির দিকে ছুটে গেল এবং জিনুকে টেনে তুলে আনলো।
বউয়ের এমন হঠকারী সাহস দেখে জেবরানও দ্রুত এগিয়ে গেল তার পেছন পেছন।
শিমুল জিনুকে তীরে এনে বসিয়ে তার গালে আলতো চাপ দিয়ে বললো,

“জিনু, জিনু, কি হয়েছে?”
কয়েক মুহূর্ত পর জিনুর চোখ খুললো।
প্রচণ্ড কাশির সঙ্গে মুখ দিয়ে পানি বের হতে লাগলো।
চোখ খুলতেই সে কান্না শুরু করে দিল।
শিমুল দ্রুত তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিল।
“কিছু হবে না বাচ্চা। কি হয়েছিল? তোমরা এখানে কেন?”
জারিফ কাঁদতে কাঁদতে বললো,
“মম এসেছে এখানে। আমাদের এখানে দাঁড় করিয়ে বললো সে একটা কাজে যাচ্ছে। কিন্তু আর ফেরেনি। জিনু পানিতে নেমেছিল। এরপর তলিয়ে যাচ্ছিল।”
কথাগুলো শুনে শিমুল এবং জেবরান একবার একে অপরের দিকে তাকালো।
তাদের চোখে একই সঙ্গে বিস্ময়, উদ্বেগ এবং অস্বস্তির ছাপ ফুটে উঠলো।
জেবরান তখন শান্ত গলায় বললো,
“আচ্ছা, তোমরা চলো। আমাদের সঙ্গে চলো।”
ভয়ে জারিফ এবং জিনু দু’জনেই শক্ত করে শিমুলকে জড়িয়ে ধরেছে।
শিমুলও বাচ্চা দুটোকে আগলে নিয়ে হোটেলের রুমে ফিরে গেল।
রুমে পৌঁছে জেবরান সঙ্গে সঙ্গে কায়ানকে ফোন করলো এবং পুরো ঘটনাটা জানালো।
সবকিছু শুনে কায়ান শুধু বললো,
“আমি বিষয়টা দেখছি।”

সিকদার নিবাস।
কায়ান, জেবরানের সাথে কথা বলে কোন দ্বিধা না করেই রুমে প্রবেশ করে।
রুমে প্রবেশ করে সামনের দৃশ্য দেখে কায়ান থমকে যায়।
সেরিনের পরনে শুধুমাত্র একটা টাওয়াল। তাও মেয়েটা হুট করেই খুলে ফেললো।
সেরিন টাওয়ালটা খুলে ফেলতে কায়ান দ্রুত দরজা বন্ধ করে দেয়।
সেরিন ভয় পেয়ে পেছনে ফিরে। কায়ানকে দেখে সে দ্রুত পাশ থেকে টাওয়াল তুলে নেয়।
কিন্তু ততক্ষণে অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছে।
কায়ান, সেরিনের থেকে টাওয়ালটা নিয়ে ছুড়ে ফেলে নিচে।
সেরিন লজ্জা পেয়ে যায়। কায়ান সেরিনের হাত মুখের উপর থেকে সরিয়ে সেরিনের চোখে চোখ রাখে।
সেরিনও তাকিয়ে রয় কায়ানের দিকে অপলক দৃষ্টিতে।
কায়ান ধিরে ধিরে সেরিনকে বিছনার দিকে ধাক্কা দেয়।
সেরিন বিছনায় পড়তে কায়ান ওর উপরে চলে আসে।
সেরিন লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
কায়ান, বাম হাতে সেরিনের মুখটা নিজের দিকে ফেরায়।
“এত লজ্জা কেন পাচ্ছো? হোয়াই?”
সেরিন কিছুই বলতে পারছে না লজ্জায়।
কায়ান সেরিনের গাল থেকে ভেজা চুল গুলো সরিয়ে দেয়। এরপর আলতো করে সেরিনের ঠোঁট দু’টো আজড়ে ধরে।
সেরিনও আর না করার সুযোগ পায়না।
কায়ান ধিরে ধিরে নিজের পরনের সকল পোশাকও খুলে ফেলে।
বাহিরে ঝুম বৃষ্টি কিন্তু রুমের ভেতর বইছে গরম হাওয়া।
সেরিনের ভারি নিঃশ্বাস আর কাপুনি কায়ানকে পাগল করে তুলেছে।
তার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা রাক্ষসটা যেন জেগে উঠেছে।
আজ নিজের সম্পূর্ণ টুকু দিয়ে সে সেরিনকে নিজের করে পাওয়ার উদ্দেশ্যে নেমেছে।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
বিকেলের সেই মুষলধারে বৃষ্টি অনেক আগেই থেমেছে। ভেজা মাটির গন্ধে চারপাশ এখনো স্নিগ্ধ হয়ে আছে। বাগানের পাতাগুলোতে জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটা সন্ধ্যার ম্লান আলোয় চিকচিক করছে। দূরে কোথাও পাখিরা শেষবারের মতো ডেকে নিজেদের আশ্রয়ে ফিরছে। আকাশজুড়ে ধূসর মেঘের ফাঁক গলে অস্তগামী সূর্যের রঙিন আভা ছড়িয়ে পড়েছে।
বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা। কায়ানের কর্মকাণ্ড তখনো চলমান ছিলো।
সেরিন কাঁপা হাতে কায়ানের কোঁকড়া চুলে রেখে নিজের দিকে ফেরায়।
কায়ানের চোখে মুখে নেশা লেগে আছে। সেরিন নামক নেশা।
“ছ ছাড়ুন। আ আমি দুপুরে খাইনি।”
“জান আমিওত খাইনি। কষ্টত আমি করছি তাহলে তুমি কেন বাঁধা দিচ্ছো।”
“ছাড়ুন আপনি খুব খারাপ৷”
কায়ান শব্দ করে হেসে দেয়। সেরিনের ঠোঁটে চুমু খেয়ে বলে,
“লাস্ট অন।”

সেরিন কিছুই বলার সুযোগ পায়না।
লাস্ট অন বললেও এটা লাস্ট অন ছিলোনা।
এরপর লাস্ট ৩ বার সেরিনকে জ্বালিয়ে কায়ান শান্ত হয়।
এরপর সেরিনকে ফ্রেশ করিয়ে বেরিয়ে আসে দু’জন।
সেরিনকে পাঁজাকোলে তুলে ডাইনিং টেবিলের দিকে নিয়ে গেল কায়ান।
সেরিনের পরনে কায়ানের একটি লম্বা সাদা শার্ট।
আর কায়ানের পরনে কালো টি শার্ট এবং ফর্মাল ট্রাউজার।
চেয়ারে বসেও কায়ান সেরিনকে নিজের কাছেই আগলে রাখলো।
আজ বাড়িতে তেমন কেউ নেই। পুরো বাড়িটা যেন অদ্ভুত এক শান্ত নীরবতায় ডুবে আছে।
সেরিন ক্লান্ত হয়ে কায়ানের বুকের সঙ্গে হেলান দিয়ে রইলো।
“আপনার জন্য সব খাবার ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে।”
“নো ওয়ারি বউ, আমি গরম করে দিতে বলছি। ওয়েট।”
কায়ান সার্ভেন্টদের ডাক দিল।
কিছুক্ষণ পর ঊর্মি দ্রুত এগিয়ে এলো।
কায়ানের পাশে সেরিনকে দেখে ঊর্মির মুখের উদ্বেগটা যেন খানিকটা কমে গেল।
সে এগিয়ে এসে বললো,

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৩৮

“কিছু লাগবে স্যার?”
“খাবারগুলো গরম করে আনো।”
ঊর্মি মাথা নেড়ে কিচেনের দিকে চলে গেল।
কায়ান মিষ্টি হেসে সেরিনের গালে চুমু খায়। সেরিন বিরক্ত হয়ে মুখ তুলে কায়ানের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে বললো,
“আর না, আপনি ভীষণ পঁচা।”
কায়ান শুধু মৃদু হেসে দিল।
ওদিকে ঊর্মি খাবার গরম করতে করতে কিচেন থেকে মাঝে মাঝে কায়ান আর সেরিনের দিকে তাকাচ্ছিল।
তার ভেতরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি জমতে লাগলো।
এই সুদর্শন পুরুষটি যেন অজান্তেই তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিয়েছে।

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here