Home অভিসৃতি অভিসৃতি পর্ব ১১

অভিসৃতি পর্ব ১১

অভিসৃতি পর্ব ১১
নওরিন কবির তিশা

সূর্যের তপ্ত কিরণ মধ্যগগনে নিজের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। আহসান কুঞ্জের চতুর্পাশ্বের সুবিন্যস্ত লতাগুল্মগুলো প্রখর রৌদ্রের দাপটে নিস্তেজ হয়ে ঝুলছে। দোতালার পূর্ব প্রান্তের অর্ধবৃত্তাকৃতির ঝুল বারান্দার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত স্টাডি রুমটা সজ্জিত সবুজের অনবদ্য আস্তরণে। সন্নিবেশিত বনরাজি’র অন্তরালে নিজেকে যেন লুকিয়ে রেখেছে কক্ষটা। সেখানে বসেই, সুঠাম চিবুকে হাত রেখে দুর্জয় অত্যন্ত মনোযোগের সাথে একটি সিকিউরিটি রিপোর্টের ডেটা অ্যানালাইসিস করছিল।
আকস্মিক, এতক্ষণের নীরবতা বিদীর্ণ করেটেবিলের ওপর রাখা ওর এনক্রিপ্টেড অফিশিয়াল ফোনটি বিকট শব্দে ভাইব্রেট করে উঠল। কলার আইডিতে একটি বিশেষ কমান্ড সেন্টারের কোড নম্বর ভেসে উঠতেই দুর্জয়ের অবয়বে পেশাদারি দ্রুততা দেখা মিললো। এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে ফোনটা তুলে সোজাসুজি কানে ধরল দুর্জয়। অকম্পিত, সুদৃঢ় কণ্ঠে বলল,,

“মেজর দুর্জয় হিয়ার, স্যার।”
সঙ্গে সঙ্গে অপর পাশ হতে ভেসে এলো এক প্রবীণ সামরিক কর্মকর্তার কণ্ঠস্বর,,
“দুর্জয়, আ সিচুয়েশন হ্যাজ অকার্ড ইন দ্য ইস্টার্ন ট্র্যাক্টস। ইনফিল্ট্রেশন অ্যালার্ট ফ্রম দ্য ট্রাই-বর্ডার জোন। অপারেশন ‘রেড ফ্যালকন’ ইমিডিয়েটলি ট্রিগার করা হয়েছে। ইয়্যু হ্যাভ টু রিপোর্ট টু দ্য ১৯থ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন হেডকোয়ার্টার্স।”
হঠাৎই, ধমনীতে জেগে ওঠে পেশাদারি শিহরণ; শঙ্কাকে পেছনে ফেলে সুদৃঢ় সংকল্পে জ্বলে ওঠে নির্ভীক সেনানীর চোখ। অকম্পিত, ধাতব কণ্ঠে কোনোপ্রকার দ্বিধা ছাড়াই দুর্জয় শুধায়,,
“হোয়াট ইজ দ্য টাইমলাইন, স্যার?”
“আজ সন্ধ্যা ছয়টার ফ্লাইটে যশোর কেন্টনমেন্ট বা নিকটস্থ এয়ারবেস থেকে স্পেশাল এয়ারক্রাফটে তোমাকে ব্যাক করতে হবে। চট্টগ্রাম হয়ে সরাসরি বান্দরবানের রিমোট অপারেটিং বেসে ড্রপ করা হবে তোমাকে। ১ বাই ৬ ইএমই ট্রুপস অলরেডি মুভ করছে। ইউ হ্যাভ লেস দেন ফোর আওয়ার্স টু প্যাক এন্ড রিপোর্ট। ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?”

“লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার, স্যার! আই উইল বি দেয়ার অন টাইম।”
“গডস্পিড, মেজর। আউট।”
কোনোরূপ প্রতুত্তরের অপেক্ষা না করেই ফোনটা কেটে গেলো। অবশ্য এটাই হয়। অতিরিক্ত কথা বলে, সময় নষ্ট করার মত ফুসরত একদম নেই তাদের হাতে। দুর্জয় বা হাতে ল্যাপটপ অফ করে দ্রুততার সহিত কক্ষ ত্যাগ করলো। আপাতত, পৃথিবীর সবচেয়ে কষ্টসাধ্য কাজ হচ্ছে মাকে ব্যাপারটা বোঝানো। সেই উদ্দেশ্যেই এত তৎপরতা!

“প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড আম্মা। আম আ মিলিটারি পার্সন।সো, আমার কাছে আমার যে কোন পার্সোনাল বিষয়ের উর্ধ্বে আমার দেশ, দেশের জনগণ আর তার নিরাপত্তা। এত বড় একটা ক্রাইসিসের মাঝে আমার পক্ষে, বিয়েতে বসা সম্ভব নয় একদম!”
ছেলের দেওয়া যুক্তির সামনে ক্ষোভে ফুঁসছে সাজেদা চৌধুরী। নেত্র কার্নিশ ভিজে এসেছে ইতিমধ্যেই। অথচ কণ্ঠস্বর কিছুতেই কঠোর হতে নারাজ যেন। অলক্ষ্যে গড়িয়ে পড়া তপ্ত অশ্রু’টুকু সন্তর্পণে লুকিয়ে চূড়ান্ত ক্ষোভ উগড়ে দিলেন,,
“আমি এত শত নিয়মকানুন বুঝি না, দুর্জয়! পুরো ডিফেন্সে কি আর কোনো অফিসার নেই? আর কেউ কি ট্রেনিং নেয়নি? কেন সবসময় তোমাকেই এমন আচমকা যেতে হবে, বলো তো?”
দুর্জয় মায়ের এমন আবেগমথিত অভিযোগে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে, শেষ প্যাকিং টা সমাপ্ত করে মায়ের দিকে এগিয়ে এলো। মায়ের হাত দুটো মুঠোয় পুরে, নরম কন্ঠে বলল,
“আম্মা, শোনো। কম্যান্ড যখন আমায় চুজ করে, দ্যাট মিন্স ইউনিফর্মের প্রতি আমার কমিটমেন্টের ওপর ওনাদের ফুল ট্রাস্ট আছে। দিস ইজ নট জাস্ট আ জব, আম্মা; দিস ইজ অ্যান ওথ। আর এই সিকিউরিটি ক্রাইসিসের টাইমে আমি যদি পার্সোনাল রিজন দেখিয়ে পিছিয়ে আসি, তবে সেটা হবে মাই ওন ডিউটি অ্যান্ড কান্ট্রির সাথে এক ধরনের ব্রেচ অফ ট্রাস্ট। তুমিই তো আমায় শিখিয়েছ, দায়িত্ব থেকে পালানো বীরের কাজ নয়।”

ক্রোধিত সাজেদা চৌধুরী নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করলেন,
“তুই আমাকে নিজের শেখানো নীতি কথা শুনিস না, দুর্জয়! ওই মেয়েটার কী হবে, একবার ভেবেছিস?কী জবাব দেব আমরা ওদের ফ্যামিলিকে?”
দুর্জয় মায়ের কাঁধে আশ্বস্তকারী হাত রাখল,
“ডোন্ট ওয়ারি আম্মা, তাকে বোঝানোর প্রয়োজন হবে না। শ্যি উইল আন্ডারস্ট্যান্ড অল দিস। আর ফ্যামিলি কে বোঝানোর দায়িত্ব তোমার আর আব্বার।”
তৎক্ষণাৎ বেঁকে বসলেন সাজেদা চৌধুরী,

“পারবো না! আমি কিংবা তোমার বাবা কেউ মেয়ের ফ্যামিলিকে বোঝাতে পারবে না।”
অতঃপর স্বামীর দিকে চেয়ে শক্ত কণ্ঠে বললেন,,“তুমি কিছু বলছো না কেন?”
স্ত্রীর এমন ক্ষণে ক্ষণে মুড পরিবর্তনের সঙ্গে পরিচিত হলেও, প্রায়শই অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন তিনি। এই যেমন এখন! তবুও কোনমতে নিজেকে সামলে, সায় জানালেন সহধর্মীনির কথায়,,
“হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই দুর্জয়! নিজের সমস্যা নিজে সলভ করতে শেখো।”
দুর্জয় ট্রাভেল ব্যাকটা কাঁধে তুলতে তুলতে বলল,,
“ওকে, দেন আগামী ১০ বছরে বিয়ের জন্য প্রেসার দেওয়া। আমার সল্যুশন এটাই।”
“দুর্জয়!”
মায়ের চোখ রাঙানো তোয়াক্কা করলো না সৈনিকটি। দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে এসে বরাবরের ন্যায় প্রস্থান পূর্বে মায়ের ললাটে উষ্ণ চুমু আকলো। ব্যাস, সমস্ত অভিযোগ মুহূর্তেই উধাও। তবুও, কোমল সত্ত্বা আজ উপস্থাপন করলেন না সাজেদা চৌধুরী। কি আর করার? মায়ের মৌনতাকে সম্মতি ধরে একে একে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল দুর্জয়।
ঘড়ির কাঁটা আনুমানিক দুইটা তিরিশের ঘরে। কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে যেতে হবে অতি দ্রুতই।

“কোথায় আপনি?”
বহুল আকাঙ্ক্ষিত নম্বরের মেসেজ দেখামাত্রই অলস মস্তিষ্ক সজাগ হলো। প্রবল নিদ্রাকর্ষণে আওড়ে আসা হাত কোনোমতে সচল করে দ্রুত আঙুল চালালো কিবোর্ডে,,
“এইতো বাসায়। আপনি?”
ওর দেওয়া টেক্সটা অপরপক্ষ আদেও পড়েছে কিনা বলা দায়! দুর্ধর্ষ পুরুষের দ্রুততর মেসেজ ফুটে উঠেছে স্ক্রিনে,‌কোনোরূপ ভণিতা ছাড়াই সে লিখেছে,
“আমি আপনার বাসার বাইরে ওয়েট করছি। নিচে আসুন। এখনই। আই ডন্ট হ্যাভ মাচ টাইম।”
কায়রার অলস, নিদ্রাচ্ছন্ন মস্তিষ্কে এতক্ষণ যে তন্দ্রার ঘোর ছিল, দুর্জয়ের আকস্মিক এমন বার্তায় মুহূর্তেই হাওয়ায় মিলালো তা। স্ক্রিনে দৃষ্টি বুলালো ফের, ভ্রান্ত কিছু পড়ছে কিনা সেটাই দেখার উদ্দেশ্যে। তবে পরক্ষণেই নির্ভূলতার প্রমাণ পেয়ে আশঙ্কায় ধিকধিক করে উঠলো বক্ষপিঞ্জর।

চটজলদি পদক্ষেপে বিছানা ছেড়ে নামলো ও।তবে, হঠাৎই বিছানার সংলগ্ন ড্রেসিং টেবিলের দর্পণে নিজের অবয়ব দৃশ্যমান হতেই মুহূর্তের তরে শিউরে উঠল অগোছালো রমণী। পরনে আলগা একখানা হালকা গোলাপি রঙা টপস আর ঢিলেঢালা স্কার্ট, অনাড়ম্বর কেশরাশি বিশৃঙ্খল হয়ে পিঠজুড়ে ছড়িয়ে আছে, চোখের কোণে ঘুম ঘুম আবেশের ছাপ স্পষ্ট। ওড়নাটা কোনোমতে গলার চারপাশে পেঁচিয়ে নিয়ে দু-হাতে মাথার অগোছালো চুলগুলো টেনে কানের পেছনে গুঁজে দিলো ও।
এই চরম অবিন্যস্ত সাজে নিচে নামতে মনের ভেতর কিঞ্চিৎ দ্বিধা কাজ করলেও, অপেক্ষমান লোকটার রাশভারী, অনমনীয় বার্তার তোড় ওকে আর দ্বিতীয়বার ভাবার অবকাশ দিল না। নতুন পোশাকের সাজসজ্জা সামলানো বা প্রসাধন প্রলেপ দেওয়ার ফুসরত কোথায়? কায়রা চটপটে, দ্রুত পায়ে ঘরের দরজা পেরিয়ে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে সোজা নিচে নেমে এলো।

বাড়ির মূল ফটক পেরিয়ে,কিঞ্চিৎ নির্জন উদ্যানের সম্মুখে গিয়ে থামলো ও। পার্শ্ববর্তী সড়কের এক পাশে দাঁড় করানো চকচকে কালচে গাড়িটির বনেটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই সুঠাম, ঋজু অবয়ব। তবে আজ আর ক্যাজুয়াল শার্টের পরিবর্তে, দুর্জয়ের পরনে নিখাদ জলপাই-সবুজ রঙের কমব্যাট গিয়ার আর ট্যাকটিক্যাল ড্রেস, পায়ে ভারী মিলিটারি বুট। চওড়া ছাতির ওপর সুবিন্যস্ত পকেটের কাটছাঁট, সুদৃঢ় চিবুক আর অনাবৃত, গভীর কৃষ্ণাভ নেত্রে এক চরম পেশাদারি কঠোরতার ছাপ।
কায়রা বিস্ময়ে, সংশয়ে মন্থর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দুর্জয়ের কয়েক কদম তফাতে গিয়ে দাঁড়াল। অনাড়ম্বর, এলোমেলো চুলে ওর বিষাদময়, চঞ্চল রূপখানি লোকটার শাণিত চোখের সামনে উন্মুক্ত হতেই ওড়নার প্রান্তটা একটু শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আমতা আমতা করে শুধাল,,
“আ-আপনি? এই বেশে? হঠাৎ এখন, কী হয়েছে?”
দুর্জয় কায়রার অবিন্যস্ত, নিষ্পাপ মুখশ্রীর দিকে অনাবৃত, গম্ভীর দৃষ্টিতে একপলক চাইল। ধীর, গভীর অকম্পিত কণ্ঠে বলল,,

“জরুরি ইমার্জেন্সি কল এসেছে, মিস কায়রা। তাই…, আমাকে এখনই ব্যাক করতে হবে।”
কথাগুলো কায়রার কানে পৌঁছানোমাত্রই যেন চারপাশের সমস্ত শব্দ স্তব্ধ হয়ে গেল; বিস্ফারিত নেত্রে দুর্জয়ের সুদৃঢ়, প্রস্তুরীভূত শান্ত চেহারার দিকে চেয়ে রইল। বুকের ভেতরের স্পন্দনটা সহসা থমকে গেল যেন। চঞ্চল হরিণী’র কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে আসতেই ও কোনোমতে অস্ফুট স্বরে শুধাল,,
“এখনই? মানে… এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছেন? ক’দিনের জন্য?”
দুর্জয় হাতঘড়ির দিকে একঝলক দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে কায়রার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। সামরিক জীবনে অভ্যস্ত সৈনিকের অবয়বের ঠাঁই পেলো না ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি। কন্ঠে এনে দিলো গাম্ভীর্য,,
“অপারেশনের কোনো ফিক্সড টাইমলাইন থাকে না, মিস। ইট কুড বি ফিউ উইকস, অর ইভেন মান্থস। আমাদের হয়তো যোগাযোগের কোনো সুযোগ-ও থাকবে না।”

এক লহমায় কায়রার সমস্ত উছলে ওঠা চপলতা মিলিয়ে গেল। ওড়নার আঁচল পেঁচানো চঞ্চল হাত দুটো হিম হয়ে এলো ওর। যে মানুষটাকে ও সবেমাত্র চিনতে শুরু করেছে, যার সান্নিধ্য ওকে এক অদেখা অনুভূতির সাগরে ভাসিয়েছিল, সেই মানুষটিই আজ এক অচেনা বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ওর থেকে বিদায় নিতে এসেছে!
দুর্জয় কায়রার ফ্যাকাশে, থমকে যাওয়া মুখমণ্ডলের ওপর স্থির দৃষ্টি রেখে ধীর কণ্ঠে আবার বলল,,
“আপনার কাছে আসা জাস্ট একটাই পারপাসে। আপনার ডিসিশন পুনর্বিবেচনা করার এখনো সময় আছে। দিস ইজ দ্য আনসার্টেনিটি আই ওয়ার্নড ইউ অ্যাবাউট। এর পরেও কি আপনি নিজের কথায় স্টিক করবেন, মিস কায়রা ইয়াসির?”
ছলছল নেত্রে চাইলো কায়রা, কান্না চেপে কন্ঠ যথাসাধ্য শক্ত করে বললো,,

“ঝুঁকুন।”
গুরুতর প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে কায়রার আকস্মিক এহেন আদেশে দুর্জয় মুহূর্তের জন্য স্থির হলো। কঠোরতার মাঝেও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে উঁকি দিল ‌অস্ফুট বিস্ময়। ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকে, বিস্ময়াবিষ্ট গলায় শুধাল,
“আই বেগ ইওর পার্ডন?”
“আপনাকে নিচু হতে বলেছি! এমনিতেই আপনার উচ্চতার কাছে পৌঁছানো মহা দায়, তার ওপর অত ওপর থেকে কথা বললে আমার কথা আপনার মাথায় ঢুকবে না!”
দুর্জয় এবার তর্কে জড়ালো না। ধীর গতিতে নিজের দীর্ঘ ঋজু দেহখানা খানিকটা নুইয়ে দিল ওর দিকে। সঙ্গে সঙ্গে, দুর্জয় কিছু বুঝে ওঠার আগেই কায়রা দ্রুত দুই কদম পিছিয়ে গিয়ে এক ঝটকায় সামান্য দৌড়ে এল। তারপর বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে দুর্জয়ের ভারী মিলিটারি বুটের ওপর নিজের কোমল দুটি পা চাপিয়ে দিল। ক্ষণিকের মধ্যে কিছুটা উঁচুতে উঠে এসে দুর্জয়ের সুদৃঢ় কপালের ঠিক মাঝখানটিতে নিজের তৃষ্ণার্ত, উষ্ণ ঠোঁট দুটো ছুঁইয়ে এঁকে দিলো এক পরম অনুভূতির স্বাক্ষর।

স্পর্শের তীব্রতায় মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল দুর্জয়। কমব্যাট গিয়ারের নিচে ঢাকা পড়া ওর রক্তপ্রবাহে এক অচেনা, তীব্র আলোড়নের সৃষ্টি হলো অকস্মাৎ। কায়রা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিচে নেমে এসে এক কদম পিছিয়ে দাঁড়াল। গাল দুটি ততক্ষণে রাঙা হয়ে উঠেছে, তবে দৃষ্টিতে অটল দৃঢ়তা। ও প্রচ্ছন্ন কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল,
“আমার সাইন রইল। এবার, একটা শর্ত মিস্টার মেজর,যে অতল কৃষ্ণচোখে আমি প্রথমবার আশ্রয় খুঁজে পেয়েছি, যে দৃষ্টিতে আমার প্রতিচ্ছবি আঁকা হয়েছে… কোনো অচেনা রমণীর সৌন্দর্যে সেই চোখ যেন আর কখনো বিমোহিত না হয়! মনে থাকে যেন!”
দুর্জয়ের অনমনীয় চিবুক,‌অভেদ্য ওষ্ঠাধর কোণে অলক্ষে এক দুর্লভ হাস্য রেখার দেখা মিললো সহসা। চঞ্চলতার অন্তরালে লুকায়িত আগত প্রণয় উপলব্ধি করে ওর প্রকাণ্ড অধিকারবোধ নিমেষেই ছুঁয়ে গেল কঠোর সেনানী হৃদয়। নিজের বুটের ওপর লেগে থাকা কায়রার কোমল পায়ের ছাপটার দিকে একপলক চেয়ে দুর্জয় সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর কায়রার অস্থির আঁখিদ্বয়ে নিজের সুগভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, গভীর কন্ঠে বললো,,

“অর্ডার রিসিভড অ্যান্ড একসেপ্টেড, মিস কায়রা। প্রমিজ,স্থানটা আপনারই থাকবে।তাই, মিস কায়রা ইয়াসির থেকে মিসেস কায়রা আহসান হওয়ার প্রস্তুতি নিবেন, দ্রুতই!”
অতঃপর দুর্জয় গাড়িটির দিকে এক পা বাড়াতেই, সহসা নীরবতা বিদীর্ণ করে আকুল কণ্ঠে ডেকে উঠল কায়রা,,
“শুনুন!”

দুর্জয় ধীর পদক্ষেপে চলা থামিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।কায়রা বিলম্ব না করে তড়িঘড়ি এগিয়ে এলো ওর মুখোমুখি। তারপর নিজের মাথা থেকে আলতো হাতে এক গুচ্ছ হালকা লালচে, রেশমি চুল ছিঁড়লো জোর টানে। আচমকা এই কাণ্ডে দুর্জয় মুহূর্তের তরে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল ওর চঞ্চল হস্তচালনার পানে।
কায়রা সম্পূর্ণ নিবিষ্ট মনে, চটপটে হাতে সেই রেশমি চুলের গুচ্ছ দিয়ে সুনিপুণভাবে ছোট একখানা বিনুনি গেঁথে ফেলল। অতঃপর বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে দুর্জয়ের হাতটি টেনে নিয়ে ওর চওড়া কবজিতে পরম মায়ায় সেই রেশমি বিনুনিটি জড়িয়ে দিলো।
বিনুনির বন্ধন সম্পন্ন হতেই কায়রা ছলছল আঁখি দুটি তুলে সোজা নিবদ্ধ করল দুর্জয়ের শাণিত, গভীর কৃষ্ণচোখে। ওষ্ঠাধরে করুণ হাসি ফুটিয়ে হৃদয় নিংড়ানো কন্ঠে বলল,,

“আমার মনটা আপনার কাছে গচ্ছিত রেখে গেলাম, মিস্টার মেজর। এটা আপনাকে মনে করিয়ে দিবে, শত মাইল দূরেও কেউ আপনার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছে। এটা হাত থেকে কখনো খুলবেন না! কেমন?”
দুর্জয় নিজের অনমনীয় কবজিতে জড়িয়ে থাকা সেই কৃষ্ণ কেশের স্পর্শ অনুভব করল। তবে, মনোভাব প্রকাশের ব্যর্থ সৈনিকটি কোনো বাক্যালাপ করল না; কেবল সু-গভীর দৃষ্টিতে কায়রার মুখের পানে চেয়ে মৃদু, আশ্বস্তকারী মাথা নেড়ে বিদায় নিল। অতঃপর গিয়ে বসল গাড়ির চালকের আসনে।
গাড়ির ইঞ্জিন সশব্দে গর্জে উঠে সুদূর এয়ারবেসের পানে ছুটে চলল। কায়রা নির্জন উদ্যানের প্রান্তে দাঁড়িয়ে, বাতাসে ওড়না উড়িয়ে দূর সীমানায় মিলিয়ে যাওয়া গাড়িটির পানে নিষ্পলক চোখে চেয়ে রইল্। অন্তরে তখন প্রথম বিরহের মেঘ ঘনাক্রান্ত হলেও, দৃষ্টিতে প্রজ্জ্বলিত অপেক্ষার প্রদীপ।

বিধ্বস্ত কায়রা বাড়ি ফিরেছে,একটু দেরিতেই। প্রায় ঘন্টাখানেক যাবত দুর্জয়ের প্রস্থান পথের দিকে চেয়ে ছিল ও। যদি মিরাক্কেল ঘটে,যদি দুর্জয় ফিরে আসে! কিন্তু, বিষণ্ণ হাওয়া ছাড়া আর কিছুই ফিরে এল না। অবশেষে একরাশ শূন্যতা বুকে চেপে বিষাদগ্রস্ত পায়ে কক্ষে ফিরল কায়রা। বাড়ির লোকজনের কৌতুহলী দৃষ্টি কিংবা প্রশ্নবাণ এড়াতে কারো মুখোমুখি না হয়ে সোজাসুজি নিজের রুমে ঢুকে ভেজিয়ে দিল দরজা।
খানিক বাদে রুটিনমাফিক ট্রে হাতে ঘরে প্রবেশ করল পায়রা। বোনকে নিশ্চুপ হয়ে বিছানায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকতে দেখে স্বভাবসুলভ চটাং গলায় বলে উঠল,

“কী রে? মহারানীকে কি এখন হাত ধরে খাইয়ে দিতে হবে নাকি? নাটক না করে,গেল উঠে!”
আজ আর কায়রা উল্টো তর্কে জড়াল না। অনড়, নিশ্চুপ হয়ে রইল বালিশে মুখ গুঁজে। বোনের এমন অস্বাভাবিক নীরবতায় পায়রার ভ্রু কোঁকড়ালো সামান্য। হাতের খাবার ট্রাঙ্কটা বেডসাইড টেবিলে রেখে ধীর পায়ে এগিয়ে এল সে।
“কায়া?”
সন্দিহান ভঙ্গিতে কায়রার কাঁধে হাত রেখে মুখখানা একটু তুলতেই দেখলো,ডাগর নেত্রদ্বয় জলে টলমল করছে!পলকে মিটে গেল পায়রার ছদ্ম-কঠোরতা। বুকের ভেতরটা চনমন করে উঠল বোনের কান্নায়। স্বকীয় আদর ঢেলে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল,
“আরে পাগলি! আমি তো ইয়ার্কি করছিলাম, এভাবে মন খারাপ করে কেউ? আয় আমিই খাইয়ে দিচ্ছি!”
বোনকে কাছে পেতেই কায়রা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। জলদি উঠে পায়রার গলা জড়িয়ে ধরে হু-হু করে কেঁদে উঠল। ফুঁফিয়ে, অস্ফুট স্বরে বলল,

“আপু… উনি চলে গিয়েছেন!”
“চলে গেছে? কোথায়?”
“মিশনে!”
পায়রা এক মুহূর্তেই সব অনুধাবন করল। কোমল হস্তে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে, শান্ত-স্নিগ্ধ গলায় বলল,
“আরে বোকা মেয়ে, সামরিক জীবনের নিয়ম তো এমনই হবে। এতে এত ভেঙে পড়ার কী আছে? এই বাস্তবতাকে মানিয়ে নিতে হবে না তোকে? নিজেকে গুছিয়ে নিতে হবে না?”
কায়রা মুখ মুছে কাতর গলায় বলল,
“সব জানি আপু, তবুও বুকটা এত খালি লাগছে কেন?”
পায়রা এবার বিছানায় বসে, সন্তপর্নে কায়রাকে উরুতে শুইয়ে দিল। সস্নেহে কপালে ছড়িয়ে থাকা এলোমেলো কেশরাশি সরিয়ে দিতে দিতে বলল,
“ভালোবাসা যখন গভীর হয়, তখন এই সাময়িক বিরহটুকু বড্ড ভারী মনে হয় রে। কিন্তু এই বিরহই তোদের অনুরাগকে আরও নিখাদ করে তুলবে। তুই তোর বীর সেনানীর গর্বিত সঙ্গিনী হবি, এভাবে কাঁদলে কি চলে?”
বড় বোনের অমায়িক স্পর্শ আর আশ্বাসবাণীতে কায়রার অশ্রুসিক্ত নেত্রে প্রচ্ছন্ন শান্তির আভাস ফুটলেও,শূন্যতা গ্রাস করলো ওর চারপাশ।

পার্বত্য বান্দরবানের সুদূর তমা-তুঙ্গী সীমান্ত গহীনে ততক্ষণে ঘন আঁধার নেমেছে। পাহাড়ি পলি, মেঘের বাষ্প মিলেমিশে থমথমে নিস্তব্ধতায় মোড়ানো চারিধার।নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের কাছে, কদমরঙ্গ এলাকার এক রিমোট ফরওয়ার্ড অপারেটিং বেসে সামরিক তাঁবুর মাঝে উচ্চতর কমান্ডের ব্রিফিং ম্যাপের ওপর ঝুকে আছে মেজর দুর্জয় চৌধুরী আর ১৯তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল রেদওয়ানুল হক। পাশে দাঁড়িয়ে জিএসও-২ (অপারেশনস) এবং ইএমই ব্যাটালিয়নের ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার দুই তরুণ অফিসার, ক্যাপ্টেন সাজ্জাদ রাফিন শান্ত, আর ক্যাপ্টেন ফারহাদুল মুন্সী।
প্রবীণ জেনারেলের আঙুল ম্যাপের এক দুর্গম করিডোরে গিয়ে স্থির হলো। গম্ভীর কণ্ঠে তিনি শুরু করলেন,
“মেজর দুর্জয়, মিয়ানমার সীমান্তের এই ট্রাই-জংশন পয়েন্টটা দীর্ঘদিন ধরেই স্পর্শকাতর। ইন্টেলিজেন্স কনফার্ম করেছে, পাহাড়ি নাল আর গভীর জঙ্গলের এই সংবেদনশীল ট্রেইলটাকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে একদল সশস্ত্র ইনসার্জেন্ট ভারী অস্ত্র আর ড্রা-গ-সের একটা বড় কনসাইনমেন্ট ওপারে স্মা-গল করার চেষ্টা করছে।”
দুর্জয় তীক্ষ্ণ নজরে ম্যাপের স্থানাঙ্কগুলো দেখে নিল। পেশাদারি ধাতব কণ্ঠে শুধাল,

“এনালিসিস অনুযায়ী ওদের স্ট্রেন্থ কত স্যার? আর কোন ধরনের ওয়েপনরি ক্যারি করছে?”
জেনারেল রেদওয়ান চিবুক শক্ত করে বললেন,
“অ্যাবাউট ফিফটি প্রফেশনাল মার্সেনারি। উইথ অটোমেটিক এসল্ট রাইফেলস এন্ড গ্রেনেড লঞ্চারস। ওদের মোশনটা ইমিডিয়েটলি নিউট্রালাইজ করতে হবে। কমান্ডের ফুল ট্রাস্ট তোমার স্পেশাল ট্যাকটিক্যাল টিমের ওপর। মিশন ডাইরেক্টিভ একটাই-ক্লিয়ার দ্য জোন উইদাউট এনি কোল্যাটেরাল ড্যামেজ।”
দুর্জয় এক চুল বিচলিত না হয়ে স্যালুট ঠুকে বলল,
“কন্ট্রোল অ্যান্ড স্পিড উইল বি প্রিসাইজ, স্যার। রাত বারোটার আগেই আমার টিম ‘সেক্টর ফোর’ কর্ডন করে স্নাইপার পজিশন নিয়ে নেবে। নো ওয়ান গেটস অ্যাওয়ে।”
“অল দ্য বেস্ট, মেজর। হ্যাভ কেয়ার। গডস্পিড!”–জেনারেলের পিঠ চাপড়ে দেওয়া আশ্বস্ত বাক্যের পর সামরিক তাঁবুর স্থূল পর্দা সরিয়ে বাহিরে এলো দূর্জয়। পাহাড়ি মৃদুমন্দ হিমেল হাওয়া ছুয়ে যাচ্ছে ওকে। দূরে ঘন বুনো জঙ্গলের ভেতর থেকে ভেসে আসছে চিম্বুক পাহাড়ের এক অচেনা নিশীথ ডাক্।
পেছন থেকে বুটের ভারী শব্দে এগিয়ে এলেন জিএসও-২ ক্যাপ্টেন সাজ্জাদ রাফিন শান্ত এবং ইএমই ব্যাটালিয়নের ক্যাপ্টেন ফারহাদুল মুন্সী। ফারহাদ হালকা পা ফেলে দুর্জয়ের পাশে দাঁড়িয়ে মৃদু শঙ্কা মেশানো স্বরে বলল,

“মেজর, ঘুমধুম সীমান্তের ওপাশের পজিশনটা কিন্তু বড্ড ট্রেচারাস। সাডেন,বৃষ্টিতে নালাগুলো ভেঙে কাদা হয়ে আছে, প্লাস ইনসার্জেন্টদের হাতে হ্যাভি ফায়ারপাওয়ার আছে। নাইট অপারেশনে মুভমেন্ট বড্ড টাফ হবে।”
দুর্জয় পকেট থেকে নিজের ট্যাকটিক্যাল গ্লাভস জোড়া বের করে হাতে পরতে পরতে ধীর, অকম্পিত গলায় বলল,
“ডিফিকাল্ট, ফারহাদ… ইম্পসিবল নয়। ওদের ট্যাকটিক্স হলো অতর্কিত আক্রমণ করে ওপারে সটে পড়া। আমাদের জাস্ট ওদের রিফ্লেক্সটাই ব্রেক করতে হবে।”
রাফিন হাতের ম্যাপের একটা পকেটে আলো ফেলে বলল,
“স্যার, সেক্টর ফোরের ইস্ট সাইডে আমরা অলরেডি দুটো স্নাইপার টিম ডেপ্লয় করে দিয়েছি। কিন্তু উত্তর দিকের এই ঘন বাঁশঝাড়ের ট্রেইলটা বড্ড ট্রিকি। ড্রোন ফিডে ওখানে চার-পাঁচজন সশস্ত্র লোক স্কাউটিং করতে দেখা গেছে।”
দুর্জয় তীক্ষ্ণ নজরে ম্যাপের সেই বিন্দুটার দিকে চাইল।

“তাহলে সোজা হিসেব, ক্যাপ্টেন শান্ত। আমরা টিম বি নিয়ে ইস্ট পয়েন্ট থেকে পিন্সার অ্যাটাক চালাব। ফারহাদ, তুমি আর ইএমই টিম নাইট ভিশন সাপোর্ট নিয়ে সাউথ ট্রেইলটা লক করে দাও। একটাও যেন ফায়ার করার সুযোগ না পায়।”
ক্যাপ্টেন রাফিন স্যালুট ঠুকে মৃদু প্রফুল্ল গলায় বলল,
“আন্ডারস্টুড স্যার! কাল সকালের আগেই মিশন সাকসেসফুলি ওয়াইন্ড আপ করে বেসে ব্যাক করব।”
ফারহাদের ঠোঁটের কোণেও একচিলতে হালকা স্বস্তির হাস্যরেখা ফুটে উঠল,,
“আপনার সাথে কমব্যাটে নামলে রিস্কটা থ্রিল মনে হয়, স্যার। অল দ্য বেস্ট!”
দুর্জয় ওদের দু’জনের কাঁধে একহাতে আলতো চাপ দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“গুড লাক, জেন্টলমেন। পজিশনে যান। সি ইউ অন দ্য আদার সাইড!”
দুটো তরুণ অফিসার ধীর পদক্ষেপে আঁধারে মিলিয়ে গেল। দুর্জয় নিজের কৌশলগত অ্যাসল্ট রাইফেলটা কাঁধে ঝুলিয়ে এক পলক সুদূর উত্তরের মায়াবীনির কথা ভাবল, পর মুহূর্তেই চোয়াল শক্ত করে, বুনো জঙ্গলের বি”ষা”ক্ত আঁধারের মিলিয়ে গেল একঝাঁক দেশপ্রেমিক।

নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তের শূন্যরেখা ঘেঁষে নেমেছে নিকষ আঁধার। পাহাড়ি বুনো ঝোপ আর সোঁদা মাটির বুক চিরে নিঃশব্দে এগোচ্ছে স্পেশাল ট্যাকটিক্যাল টিমের ছয়জন লড়াকু সেনা। সবার সামনে কালচে কমব্যাট ড্রেসে ঢাকা সুঠাম অবয়ব–মেজর দুর্জয় চৌধুরী।
নাইট-ভিশন গগলসের সবুজ আভায় পুরো জঙ্গলটা স্পষ্ট ভেসে উঠছে ওর সামনে। কাঁধে ঝুলছে অ্যাসল্ট রাইফেল বিডি-১৫। সাউন্ড সুপ্রেসর লাগানো নলে একবিন্দু শব্দ হওয়ার সুযোগ নেই। বা হাতে বাঁধা ওয়াকিটকি থেকে হেডসেটে অত্যন্ত নিচু সংকেতায়িত তরঙ্গে ভেসে এল ক্যাপ্টেন শান্তর কণ্ঠস্বর,
“স্যার, টিম ‘বি’ পজিশন ইন। উত্তর পাশের ট্রেইলে চারজন সশস্ত্র লোক স্কাউটিং করছে। ওদের ওদের কাছে এইচকে-৩৩ অ্যাসল্ট রাইফেল আর গ্রেনেড রয়েছে পর্যাপ্ত।”

দুর্জয় বাঁ হাতের ইশারায় পেছনের সঙ্গীদের থামার নির্দেশ দিল। ডানহাতে ধরা অ্যাসল্ট রাইফেলটা কায়দা করে উঁচিয়ে ধরে অতি নিচু স্বরে হেডসেটে বলল,
“হোল্ড ইয়্যুর ফায়ার, শান্ত। ওদের মেইন কনভয়টা জংশন পয়েন্টে পৌঁছাতে দেন। পিন্সার অ্যাটাক হবে। ফারহাদ, সাউথ রুট লকড?”
দক্ষিণ দিক থেকে ক্যাপ্টেন ফারহাদের স্পষ্ট মেসেজ এল,
“ইয়েস স্যার! সাউথ রুট সম্পূর্ণ লকড। কেউ পালাতে পারবে না।”
“কপি দ্যাট। অন মাই কাউন্ট… থ্রি, টু, ওয়ান… গো!”

পর মুহূর্তেই বুনো নীরবতা বিদীর্ণ করে গর্জে উঠল নাতিদীর্ঘ গোলাগুলি। সুপ্রেসর লাগানো রাইফেলের ধাতব শব্দে নিস্তব্ধ পাহাড়ি ট্রেইল নিমেষেই যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো। দুর্জয়ের ছোঁড়া সুনির্দিষ্ট তিন রাউন্ড গুলিতে সামনের দুজন মার্সেনারি এক লহমায় কাদার ওপর ঢলে পড়ল।
হঠাৎ বাঁ পাশের বাঁশঝাড়ের ঘন আঁধার হতে ভেসে এলো এক বিজাতীয় চিৎকার। এক সশস্ত্র ইনসার্জেন্ট পজিশন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে দুর্জয়ের দিকে পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে রাইফেল উঁচাল। সময় ছিল না এক সেকেন্ডেরও। দুর্জয় ক্ষিপ্র ট্যাকটিক্যাল ডাইভ দিয়ে কাদামাখা জমিনে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল। পরক্ষণেই বুক ঘষে স্লাইড করে ঘুরে দাঁড়িয়ে, প্রতিপক্ষের বুক লক্ষ্য করে একক রাউন্ড ফায়ার করল। প্রিসিশন শট! লোকটা বিকট আর্তনাদ করে আছড়ে পড়ল মাটিতে।
তৎক্ষণাৎ পরপর দুটো উচ্ছ্বাসিত কন্ঠস্বর ভেসে এলো,,

অভিসৃতি পর্ব ১০ (২)

“ক্লিয়ার! ইস্ট সেক্টর সম্পূর্ণ নিউট্রালাইজড!”
“সাউথ সেক্টর অলসো ক্লিয়ার স্যার! কনসাইনমেন্ট সিকিউরড!”
মাত্র পনেরো মিনিটের সংক্ষিপ্ত অ্যাটাকে সম্পূর্ণ অপারেশন ‘রেড ফ্যালকন’ সফলতার সাথে সমাপ্ত হলো। কোনো কো-ল্যাটেরাল ড্যামেজ ছাড়াই বিপুল পরিমাণ অবৈ”ধ অ”স্ত্র আর বি”স্ফো”রক উদ্ধার করল সেনাদল।

অভিসৃতি পর্ব ১২