Home অভিসৃতি অভিসৃতি পর্ব ১৩

অভিসৃতি পর্ব ১৩

অভিসৃতি পর্ব ১৩
নওরিন কবির তিশা

অবিন্যস্ত কেশরাশি, শুষ্ক ওষ্ঠাধরের কোণে প্রচ্ছন্ন ফাটল, সামান্য লিপবামের আলপনাটুকু পর্যন্ত অনুপস্থিত। এমন অশৃঙ্খলিত অবয়বে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে পা রাখার দুসাহস কেবল কায়রা ইয়াসিরের মাঝেই বিদ্যমান। এ নিয়ে অবশ্য বন্ধুমহলের ভর্ৎসনা কম সহাস্যে হজম করতে হয়নি ওকে! প্রতিবারই এক অজুহাত-বিলম্বে ঘুম।

অবশেষে দিনের সবচেয়ে বিরক্তিকর ও দীর্ঘায়িত ক্লাসের ইতি টানতেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল কায়রা। শ্রেণীকক্ষ পেরিয়ে বাইরে পা রাখতেই চঞ্চল বাতাসের তোড়ে ওর চেহারাটা আরও কিঞ্চিৎ উস্কোখুস্কো ঠেকলো। সময় গণনায়,আজ দুর্জয় প্রস্থান করার ঠিক পঞ্চম দিবস।
এমনিতেই সব কিছু বিরক্তিকর লাগছে, ওপর আজ বন্ধুমহলও একদম ছন্নছাড়া। তূজার মাইগ্রেনের তীব্র যন্ত্রণা, আর রুশাফ-নিহার-ইভানরা পারিবারিক জটিলতায় অনুপস্থিত। জনাকীর্ণ ক্যাম্পাসের ভিড়েও তাই, নিজেদের বড্ড একাকী ঠেকছিল কায়রা-মেধার।
ক্লান্ত পায়ে হেঁটে ক্যাম্পাসের মূল ফটকের সীমানায় এসে অলস ভঙ্গিতে দাঁড়াল ও। রিক্সার উদ্দেশ্যে আশেপাশের নজর বোলাতেই আকস্মিক দৃষ্টিগোচর হলো এক কল্পনাতীত দৃশ্য।রাস্তার পাশে থামানো গাড়ির কালচে বনেটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক ঋজু অবয়ব। পরনে নেভি ব্লু রঙের ইনফরমাল শার্ট, হাতা দুটো সামান্য গোটানো, পিছন ফিরে পকেট থেকে পকেটে হাত পুরে ফোন বের করছে সবে।
কায়রা নিষ্পলক, বাক্‌রুদ্ধ চোখে চেয়ে রইল বহুক্ষণ। কায়রা নিষ্পলক, বাক্‌রুদ্ধ চোখে চেয়ে রইল বহুক্ষণ। হৃতস্পন্দন নিমেষেই কয়েক গুণ বেড়ে গেল ওর; দুর্জয়? লোকটা ফিরে এসেছে? কোনো কিছু না ভেবে, প্রবল ব্যাকুলতায় কায়রা দ্রুত পায়ে সেদিকে ছুটতে শুরু করল। পরম আবেশে ভরা গলায় ডাকার জন্য ওষ্ঠাধর উন্মুক্ত করতেই হঠাৎ গাড়ির বনেটে হেলান দেওয়া অবয়বটি মুখ ফেরাল। ধাতব চশমার ফ্রেমের ওপাশে অন্য এক অচেনা, পুরুষ।
একমুহূর্তে কায়রার উচ্ছ্বসিত হাসি উবে গেল। থমকে গেল গতি। বিজাতীয় এক ভদ্রলোক সুসংহত ভঙ্গিতে চেয়ে শুধালেন,

“এনি প্রবলেম, ম্যাম?”
কায়রা সীমাহীন কুণ্ঠায় ছোট হয়ে এল। ম্লান মুখে কোনোমতে অস্ফুট স্বরে বলল,
“আই অ্যাম স্যরি… ভুল মানুষ ভেবেছিলাম।”
ঠিক তখনই পেছনে এসে দাঁড়াল মেধা। কায়রার বিষাদগ্রস্ত কাচুমাচু চেহারা দেখে সন্দিহান কণ্ঠে শুধাল,
“কী হয়েছে তোর? এভাবে ছুটলি কেন?”
কায়রা একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজেকে সামলে নিয়ে ধীর গলায় বলল,
“কিছু না রে… ছায়া ভেবেছিলাম, বাস্তব নয়।”
ওরা দুজন আবার চঞ্চল পায়ে হাঁটতে শুরু করতেই আচমকা পেছন থেকে দিহানের তীক্ষ্ণ, বিদ্রূপাত্মক কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“হাহ্‌! শুধু শুধু অপেক্ষা করে কোনো লাভ আছে, কায়রা? গতকাল খুব তো মেজরের নাম নিয়ে প্রফেশনাল পারফেকশনের বুলি আওড়াচ্ছিলে! এই মিলিটারিদের বিয়ে করলে সারাজীবন এভাবে ছায়া দেখেই কাটবে, কোনোদিন প্রপার কেয়ার পাবে না!”

দিহানের এমন অনাহূত খোঁচায় কায়রার এতক্ষণের জমাটবদ্ধ মনখারাপ নিমেষেই প্রখর ক্ষোভে পরিণত হলো। ও চলন্ত পদক্ষেপে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে সোজাসুজি দিহানের মুখোমুখি ঘুরল। অতল বরফশীতল দৃষ্টিতে মেপে নিয়ে শাণিত কণ্ঠে বলল,
“কেয়ার জিনিসটা বুঝবেন কীভাবে, মি. দিহান চৌধুরী? ওনার অনুপস্থিতিও যে সাময়িক উপস্থিতিগুলোর চেয়ে থাউজেন্ড টাইমস বেশি দামি, তা অনুধাবন করার মতো ম্যাচিউরিটি অন্তত আপনার মতো চকলেট বয়দের নেই! সো, মাইন্ড ইউর ওন বিজনেস অ্যান্ড জাস্ট গেট আউট অব মাই ওয়ে!”
দিহানের থমথমে চেহারা পেছনে ফেলে কায়রা আর এক সেকেন্ড দাঁড়াল না; মেধার হাত ধরে সুদৃঢ় পদক্ষেপে সেখান থেকে প্রস্থান করলো।

ঘড়ির কাঁটা দুপুর দুটো ছুঁইছুঁই। হালকা সবুজ লতাগুল্মে ছাওয়া কক্ষ পার্শ্ববর্তী ৎঝুলবারান্দার মোড়ায় বসে ছিল ইথিকা। পরনে সুতি শাড়ি, অনাড়ম্বর চুলগুলো কোনোমতে একখানা আলগা খোপায় বাঁধা। ওষ্ঠাধরে জমাটবদ্ধ প্রগাঢ় মৌনতা। সদা হাস্যজ্জল মেয়েটির ভারাক্রান্ত মুখ দেখেই ঠাওর করা যাচ্ছে নেপথ্যে অবশ্যই রয়েছে গুরুতর কিছু।
সকাল কুহুকে সামলাতে গিয়ে উজানকে চা দিতে খানিক বিলম্ব হয়েছিল। তাই পরবর্তীতে তাড়াহুড়োয় পরিবেশনার সময়, অলক্ষ্যে একটুখানি ছিটকে পড়েছিল শ্বেতশুভ্র শার্টে। তারপর আর কি? দাম্পত্যের চার বছরের দীর্ঘ দিনপঞ্জিতে যা কখনো ঘটেনি, আজ সকালে সেটাই ঘটেছিল—অফিসের ব্যস্ততায় উজান একটু উঁচুগলায় কড়া কথা শুনিয়ে গিয়েছিল ওকে। ব্যস, সেই এক বিন্দু কঠোরতাই ইথিকার হৃদয়ে প্রকাণ্ড এক অভিমানের ঝড় তুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল!
সকাল থেকেই জাগতিক সমস্ত কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ও। প্রয়োজনীয় কথাটুকুও বলছি গোমড়া মুখে। অবশ্য, আতিকা বেগম সকাল থেকে বাসায় না থাকায় কথা বলার ও বিশেষ প্রয়োজন পড়ছে না ওর।কুহু তো ঊষার সাথে ব্যস্ত থাকে সারাক্ষণ।
সহসা নীরবতা ভেঙে ভেসে এলো হন্তদন্ত পদধ্বনি। ঘাড় ফেরানোর প্রয়োজন বোধ করল না ইথিকা। আবার, এই অসময়ে উজানের বাড়ি ফেরার কোনো যুক্তিসংগত কারণও খুঁজে পেলো না।

“জানু?”
ভেসে আসা সেই অতি চেনা, সুগভীর আকুল কণ্ঠস্বর শুনেও ইথিকা অলস ভঙ্গিতে অন্যদিকে চেয়ে রইল। অভিমানের কঠিন প্রাচীর ভেদ করে সাড়া দিল না একবিন্দু। উজান ধীর, অকম্পিত পদক্ষেপে একদম পেছনে এসে দাঁড়াল। তারপর বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে পেছন থেকে দু-হাতে ইথিকার অনাবৃত কোমর জড়িয়ে ধরে থুতনিটা এনে রাখল ওর কাঁধে। আলতো পরশে ছড়ালো প্রচ্ছন্ন প্রশান্তি। ইথিকা নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করল না, কেবল ওষ্ঠাধর চেপে নিশ্চুপ হয়ে রইল।
উজান বাঁ হাতে ইথিকার সেই অগোছালো খোপার ভাঁজে অতি পরম মায়ায় গুঁজে দিল টাটকা বেলি ফুলের একগাছি সুবাসিত গাজরা। ইথিকার গালে নিজের ওষ্ঠাধর আলতো স্পর্শ করিয়ে নিচু, সুকোমল স্বরে শুধাল,
“এখনো খুব রাগ করে আছ, বউ?”
ইথিকা চট করে ক্ষুণ্ন গলায় বলে উঠল,
“মোটেও না! আমার খেয়েদেয়ে কাজ নেই যে আপনার মতো ব্যস্ত মানুষের ওপর রাগ জমিয়ে রাখব? ছাড়ুন আমাকে! অফিসে যাননি কেন?”
উজান একটু বাঁকা হেসে জড়িয়ে ধরার বাঁধনটা আরও কিঞ্চিৎ শক্ত করল। স্নিগ্ধ কণ্ঠস্বরে প্রচ্ছন্ন অনুশোচনা মিশিয়ে বলল,

“অফিসে গিয়েছিলাম। কিন্তু, অশান্তি লাগছিলো। সো, আই হ্যাব টু ব্যাক জানু! আই অ্যাম সো স্যরি, ডার্লিং। সকালে একদমই খেয়াল ছিল না।আর কক্ষনো হবে না।”
ইথিকার মন গললো না একদম। পূর্বের অবস্থানে অবিচল থেকে চোয়াল মুখ শক্ত করে ও বলল,,
“স্যরি বললেই সব শেষ হয়ে যায় না, উজান! আপনি যা খুশি বলবেন আর ভাববেন ফুল এনে দিলেই আমি গলে জল হয়ে যাব? আমার কোনোকিছুতেই সত্যি আর কিছু যায়-আসে না। ছাড়ুন বলছি!”
ইথিকার অনমনীয় কণ্ঠে উজানের ঠোঁটের কোণে জমানো হাসিটুকু আরও বিস্তৃত হলো। বাহুলতা থেকে ওকে কোনো সুযোগ না দিয়ে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল ও। ঘটনার আকস্মিকতায়,চমকে উঠে ইথিকা মৃদু আর্তনাদ করে উজানের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরল।
“আহা! ছাড়ুন বলছি, পড়ে যাব তো!”
উজান একবিন্দু কান না দিয়ে সুদৃঢ় পদক্ষেপে সোজা শয়নকক্ষে এসে উপস্থিত হলো। ইথিকাকে কোমল শয্যার ওপর বসিয়ে দিয়ে ও এক হাঁটু গেড়ে নিচে বসল। ওর দু-খানি কোমল হাত নিজের প্রশস্ত করতলে তুলে নিয়ে চোখের দিকে চেয়ে নিচু স্বরে বলল,

“তুমি ছাড়া এই ব্যস্ত জীবনে আর কিছুর আসলেই কোনো ভ্যালু নেই, জানু! ভুল তো মানুষেরই হয়, এটুকু ক্ষমা কি আমার প্রাপ্য নয়?”
ব্যাস! প্রিয় পুরুষের ব্যাকুল কন্ঠস্বর মূহূর্তেই,ইথিকার অভিমানের দৃঢ় প্রাচীর বালির বাঁধের মতো ধসিয়ে দিল। নত হলো ‌ অক্ষিপল্লব , স্নিগ্ধ হাস্যরেখায় প্রসারিত ওষ্টাধর। মিষ্টি সে মুহূর্তকে পূর্ণতা দিতে, কোত্থেকে দৌড়ে রুমে এলো কুহু। বাবা-মাকে এমন ঘন হয়ে বসে থাকতে দেখে সে দু-হাতে বাচ্চাসূলভ কৌতুহল নিয়ে শুধালো,,
“ওমা! পাপা, তুমি এখানে? আর মামণি কি কেঁদেছিল?”
আকস্মিক এই অনাহূত উপস্থিতিতে ইথিকা নিমেষেই র”ক্তা”ভ হয়ে উঠল। দ্রুত হাত দুটি ছাড়িয়ে নিয়ে নিজেকে সামলে বসল। উজান একগাল হেসে হাত বাড়িয়ে দিল কুহুর দিকে,,

“না সোনা, মামণি কাঁদে নাই। পাপা মামণিকে বাটারফ্লাই দেখাচ্ছিল। কাম হিয়ার, মাই লিটল প্রিন্সেস!”
কুহু দৌড়ে এসে দুজনের মাঝখানে একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ল। উজানের কোলে উঠে সে ইথিকার গালের বেলি ফুলের ঘ্রাণ নিতে নিতে বলে উঠল,
“পাপা, মামণির চুলে ফুল কেন? আমাকে দাওনি কেন? আই ওয়ান্ট ওয়ান টু!”
উজান কুহুর নাকে আলতো চিমটি কেটে কুহুকে আর ইথিকাকে একসাথে নিজের বুকের সুনিবিড় উষ্ণতায় জড়িয়ে ধরল।
“তোমার জন্য কাল অনেকগুলো নিয়ে আসব, মাম্মা। নো ওয়ারিজ!”

গোধূলির বিদায় লগ্নে সাঁঝের আঁধার ঘনিয়ে এসেছে। ধূম্রজালের ন্যায় কুহেলির আস্তরণ ক্রমশ গ্রাস করছে চরাচর। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে, কোনোমতে দুটো খেয়েই বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়েছিল কায়রা।প্রায় ঘন্টা দু’য়েকের দীর্ঘ তন্দ্রার ঘোড়াটুকু কাটতে না কাটতেই পায়রার প্রবল নাড়াচাড়ায় চোখ মেলতে হলো কায়রাকে। অস্থির ভঙ্গিতে ওকে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে পায়রা তাড়া দিল,
“জলদি ওঠ তো কায়রা, আর শুয়ে থাকিস না!”
অসময়ে এই অনাহূত উপদ্রবে বিরক্ত হয়ে কায়রা বিছানায় উঠে বসে ক্ষুণ্ন স্বরে বলল,
“কী হয়েছে রে? এভাবে বিরক্ত করছিস কেন?”
পায়রা সে কথায় কান না দিয়ে হাত বাড়াল ঘরের কোণে রাখা শাড়ির দিকে। তারপর শাড়িটা ওর হাতে গুঁজে দিয়ে আবদারের সুরে বলল,

“তুই তো আবার শাড়ি পরতে পারিস না! চল, পেটিকোট আর ব্লাউজটা গলিয়ে নে, আমি জড়িয়ে দিচ্ছি।”
কায়রা অবাক চোখে চেয়ে থেকে শুধাল,
“কিন্তু এই অসময়ে,আমি হুট করে শাড়ি পরতে যাব কেন?”
“সবসময় বেশি কথা বলিস কেন তুই? রেডি হ, জলদি কায়রা, অলরেডি দেরি হয়ে গেছে!”
বলতে বলতেই শাড়ির ভাঁজ খুলতে গিয়ে পায়রা থমকে গেল। চটজলদি চারপাশটা দেখে নিয়ে বলল,
“আরে, ব্লাউজটা তো দেখছি এখানে নেই! বোধহয় আমার রুমে রয়ে গেছে, দাঁড়া নিয়ে আসছি।”
পায়রা নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই কায়রার কৌতূহল আর বাঁধ মানল না। সেও অলস পায়ে, ঘুরঘুর করতে করতে পায়রার পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে বলল,

“এই বলবি তুই? এখন অসময়ে শাড়ি কেন পড়বো?”
হাঁটতে হাঁটতে দোতলার ঝুলবারান্দার কাছে এসে কায়রা অকারণেই আলস্য ভরে এক ঝলক নিচে চাইলো।অমনি থমকে গেল চঞ্চল পদচারণা, চূড়ান্ত বিষ্ময়ে দৃষ্টিকে মীর জাফর উপাধি দিতে তৎপর হয়ে, কাঠের রেলিংটা আঁকড়ে ধরে আরও খানিকটা ঝুঁকে দেখতে চাইল-সত্যিই কি ও ঠিক দেখছে?
ঠিক তখনই, থমকে থাকা আবহাওয়ায় তরঙ্গ তুলে নিচে বসে থাকা দুর্জয় আচমকা মাথা তুলে ওপরের দিকে তাকাল। মুহূর্তেই, মিলন ঘটলো দু’জোড়া প্রতীক্ষিত নেত্রের। এক জোড়ায় প্রবল চাঞ্চল্য, প্রতীক্ষার সমাপ্তিতে ফুটে থাকা উচ্ছ্বাস। তবে,অন্যটি তখন নির্লিপ্ত। অথচ সেই নির্লিপ্ত সুগভীর, স্থির দৃষ্টির মুখোমুখি হতেই কায়রার হৃতস্পন্দন বুঝি আবার থমকে যাওয়ার উপক্রম হলো!
কাকতালীয়ভাবে, তখনই কোনো এক অজ্ঞাত কারণে পরিবারের অন্য সদস্যরাও ওপরের দিকে মুখ তুলে তাকালেন। আর কায়রার এমন চরম অবিন্যস্ত, এলোমেলো রূপে আঞ্জুমান ইয়াসির কিঞ্চিত ধমকের স্বরে বললেন,,
“পায়রা কেনা পাঠালাম তোমাকে রেডি করতে। এই অবস্থা কেন? জলদি যাও রেডি হয়ে এসো!”
হঠাৎ সবার দৃষ্টি নিজের ওপর নিবদ্ধ হতে দেখে কায়রা সীমাহীন লজ্জায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। অস্ফুট স্বরে,
“অ্যাঁ… হ্যাঁ, যাচ্ছি!”
বলেই সকলের দৃষ্টির আড়ালে যেতে, এক প্রকার ছুট লাগাল নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে।

“কিছুদিন পর তোমার সেমিস্টার পরীক্ষা, আর দুর্জয়ের কথাও বলা যায় না। প্রফেশনাল লাইফে যে কোনো মুহূর্তে ডাক পড়বে ওর। তাই আমরা চাইছি, এ সপ্তাহের ভেতরেই তোমাদের বিয়ের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে। আশা করি, তোমার কোন আপত্তি নেই?”
সবে, তাকে সাজিয়ে নিচে এনেছে পায়রা। সাজগোজ বলতে, পরনের গোলাপি শাড়ির সঙ্গে মুখে হালকা মেকআপের প্রলেপ। আর এলোমেলো কেশরাজ শৃঙ্খলায় এনে বিনুনি করা। তবে, এসেই এমন সুখকর সংবাদে পুলকিত নারীকায়া চূড়ান্ত উচ্ছ্বাস উগড়ে দিতে চাইছে সকলের সম্মুখে। সম্মতি মানে? সহস্র..না না! কোটিবার রাজি সে। তবে, সকলের সামনে নির্লজ্জ’মো করা যাবে না একদম।তাই, যথেষ্ট ভদ্র থাকার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় মাথা নাড়িয়ে বললো,,

“না,আমার কোনো আপত্তি নেই।”
“আলহামদুলিল্লাহ্!”—— প্রবীণ সবাই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করার পরমুহূর্তে,আনোয়ার সাহেব কায়রাকে পুনরায় প্রশ্ন ছুঁড়লেন।এবার অবশ্য, প্রশ্নের মাঝে আদেশের পরিমাণটাই প্রকট,
“তাহলে, আজ তোমাদের এনগেসমেন্ট-টা সেরে ফেলি।”
কয়রা’র সম্মতির অপেক্ষা করল না আঞ্জুমান ইয়াসির।পায়রাকে আদেশ দিয়ে বললেন,,
“বাবার রুমের ড্রয়ার থেকে আংটিটা নিয়ে এসো।”
নির্দেশনা পেতেই গুটিগুটি পায়ে,বাবার কক্ষ থেকে আংটি রাখা খোদাইকৃত ছোট্ট বক্সটি তুলে দিলো ফুপুর হাতে। ততক্ষণে দুর্জয়ের মাও কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা দুর্জয়ের হাতে গুঁজে দিয়েছেন। আঞ্জুমান ইয়াসির কায়রার হাতে বাক্সটা দিয়ে ইশারা করতেই বড়দের সম্মতিক্রমে আংটি বদল পর্বের সূচনা হলো।
দুর্জয় হাত এগিয়ে দিতেই কায়রা’র এতোক্ষণের উচ্ছ্বাস কেমন যেনো তীব্র কম্পনে রুপ নিলো। শীতার্ত ব্যক্তির ন্যায় থরথরিয়ে উঠলো ও। কিছুতেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হলো না,হাত উঠানোর পর্যাপ্ত শক্তিটুকুও যেনো লোপ পেয়েছে এই মুহূর্তে। ব্যাপারটা সকলের অগোচরে থাকলেও দুর্জয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়ালো না।আলগোছে কয়রার কম্পিত হাতটা মুঠোয় পুরে বন্ধন শক্ত করলো।

অভিসৃতি পর্ব ১২

কায়রা দৃষ্টি উঁচিয়ে ওর দিকে চাইতেই, আশ্বস্থ নেত্রে চাইলো ও। শুকনো ঢোক গিয়ে,মৃদু হাসলো কায়রা। দুর্জয় ধীরে ধীরে ওর অনামিকায় আংটি-টি পরিয়ে দিলো। কয়রাও নিজেকে কিঞ্চিৎ ধাতস্থ করে, দুর্জয়কে আংটি-টি পরিয়ে বাগদান পর্ব সমাপ্ত করলো।সকলে ব্যস্ত হতেই অন্তরালে,দুর্জয় কিঞ্চিৎ ঝুঁকে কয়রার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,,
“মিসেস দুর্জয় হতে চলেছেন ম্যাম। এত ভয় থাকলে হবে?”

অভিসৃতি পর্ব ১৪