Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ৩৮

মেজর কারদার পর্ব ৩৮

মেজর কারদার পর্ব ৩৮
ফিনারা ঝুমুর

ঝকঝকে জমকালো অনুষ্ঠান ছেয়ে গেছে অদম্য উল্লাসে। পুরো কারদার বাড়ির সবুজ উদ্যান যেন মাতাল গুঞ্জনে মেতে উঠেছে। সবার মাঝে দাঁড়ানো জাঁদরেল মেজর শীর্ষ কারদারের সগর্বে উচ্চারণ করা সেই একটিমাত্র বাক্য সকলের কানে এখন মধুর বাদ্যের ন্যায় বেজেই চলেছে!
​ওদিকে স্টেজের নিচে থাকা সেই রহস্যময় আগন্তুক চরম অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে আছে মেঘের উজ্জ্বল মুখশ্রীর পানে। তার ধারালো চোখ ঘুরে বেড়াচ্ছে মেঘের সর্বাঙ্গে। তাকাতে তাকাতে হুট করে তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হয় শীর্ষ আর মেঘের শক্ত করে চেপে ধরা হাত জোড়ার মেলবন্ধনে! শীর্ষর বড় ডান হাতের করতলে পরম নিরাপদে চাপা পড়ে রয়েছে মেঘের ছোট্ট বাম হাতখানি। স্টেজের আলোয় সতেজ ও স্পষ্টভাবে ভেসে ওঠা মেঘের সেই অমলিন হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে হিংসা ও চরম আক্রোশে ভরে ওঠে আগন্তুকের হিয়া। দাঁতে দাঁত চেপে তার বিষাক্ত মুখশ্রী হতে নির্গত হয়,

​“ঐ আর্মির পোষ্য রক্ষিতার পাপিত ফসল! আবু সাত্তার মাস্টারের পালিত কন্যা—মেঘালয়া আরণ্যি! মোছা. শারমিন সুলতানার গর্ভজাত সেই পিতার পরিচয়হীনা জারজ সন্তান!”
​কথাটি বিড়বিড় করে বিষ উগরে দিয়েই ভিড়ের গহীনে আড়াল হয়ে মিশে রয় আগন্তুক।
​পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে যখন আনন্দের ঢল, সবাই যখন হাসিখুশিতে মেতে আছে, ঠিক তখনই চরম বেজার ও কালচে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে গুটি কয়েক মানুষ। তাদের মধ্যে প্রথম সারিতেই রয়েছে শিউলি বেগম, সূচি ও তার স্বীয় পিতা-মাতা। আর তাদের ছাড়াও যদি সেখানে আরও কেউ থেকে থাকে—তবে তারা হলো একটু আগেই নৃত্যে রত শ্যামাঙ্গিনী মেঘের অপার্থিব প্রেমে অগোচরে পা পিছলে পড়ে যাওয়া তানভীর ইভান, শাহরিয়ার আদিত্য এবং ডক্টর ফায়াজ তানজিম!
​এই শ্যামাঙ্গিনী মেঘালয়ার অনবদ্য রূপে মাতোয়ারা হওয়া অপ্রকাশিত ও গোপন প্রেমিক পুরুষ তারা। শীর্ষর করা প্রতিটি উচ্চকিত প্রাপ্তির বাক্য শুনে এই কজন পুরুষের বুকের হিয়া যেন এক নিমেষে ভেঙে খান খান হয়ে যায়! অথচ বুকের ভেতরের সেই পরাজয়ের দহন লুকিয়ে রেখে, তীব্র আগুন চোখে তারা কেবল চেয়ে থাকে শীর্ষ ও মেঘের পরম বিশ্বাসের হস্তমিলনের দিকে। তবে তাদের মাঝে একজনকে যে ভালোবাসার কোনো নীতি কিংবা বিবাহিত জীবনের সামাজিক সীমানা বিন্দুমাত্র ছুঁতে পারেনি। সে হলো খাদ্যমন্ত্রীর অহংকারী পুত্র তানভীর ইভান!

​নিজের মনের সুপ্ত বাসনা ও কুটিল জিদ চেপে রেখে, দূর থেকে মেঘের দিকে হিংস্র চোখে তাকিয়ে বিড়বিড় করে স্বগতোক্তি করে ইভান,
​“হোক সে অন্যের বিবাহিতা, তবুও সে কেবলই আমার! এই তানভীর ইভানের চোখে একবার যে নারী লেগেছে, সে যে যেকোনো মূল্যে আমার হতে বাধ্য!”
পাশে চেয়ারে বসে থাকা খাদ্যমন্ত্রী নিজাম উদ্দিন ছেলের মুখ থেকে বের হওয়া বিড়বিড়িয়ে বলা কথাগুলো শুনতে পাননি। তিনি পূর্ণ মনোযোগ সহকারে উপভোগ করতে থাকেন কিঞ্জাকে ঘিরে কারদার বাড়ির ভাই-বোনদের অকৃত্রিম উল্লাস ও আনন্দ-ঘন মুহূর্ত।
​ওদিকে সূচি জ্বলন্ত আগুন চোখে শীর্ষ আর মেঘের এমন মাখামাখি ও ভালোবাসা দেখে রাগে ফুঁসতে থাকে। পায়ের উঁচ হিল দিয়ে মেঝের একটা ছোট ইটের টুকরোকে সজোরে লাথি মেরে দূরে সরিয়ে দেয়। তারপর শিউলি বেগমের গায়ের সাথে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হিসহিসিয়ে বলে,

​“দেখলে তো? তোমার গুণধর ছেলে কীভাবে শত শত মানুষের সামনে ওই কালিনীকে নিজের বউ বলে স্বীকৃতি দিয়ে দিল! এখন ওই মেয়েটাকে এই বাড়ি থেকে বের করবে কীভাবে, বলো?”
​শিউলি বেগম এতক্ষণ মুখ কালো করে ওদের রূপকথাতুল্য রঙলীলা দেখছিলেন। ঘৃণায় বিকৃত হয়ে ওঠে তাঁর মুখাবয়ব। কিয়ৎক্ষণ গভীর চিন্তায় মগ্ন রইলেন তিনি। তারপর সূচির কানটা নিজের ওষ্ঠের একদম কাছে টেনে এনে শেয়ার করলেন তাঁর মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাওয়া কুৎসিত ও নোংরা এক ফন্দি!
​ফুফির বলা বিষাক্ত ফন্দির গূঢ় অর্থ বুঝতে পেরেই সূচির বিষাক্ত ঠোঁটে ফুটে ওঠে এক বিনাশী ও প্রলয়কারী ক্রূর হাসি! চরম উত্তেজিত ও আন্দোলিত হয়ে সে বলেই ফেলে,
​“সুপার্ব ফুফি, একবারে সুপার্ব! ইউ আর রিয়েলি আ জিনিয়াস!”
​সূচির এমন উৎসাহিত ও শয়তানি আদল অপরিসীম পরিতৃপ্তি সহকারে উপভোগ করেন তার বাবা তৌফিক মৃধা এবং মা শামীমা পারভীন। স্বামী-স্ত্রী দুজনই মনে মনে চরম অধীর হয়ে চাইছেন যেকোনো মূল্যে সূচিকে শীর্ষর বউ হিসেবে কারদার বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করতে। তারা যে প্রতিশোধ নেবে কারদার পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের নিষ্পাপ মেয়ের ওপর করা প্রতিটা অবহেলা আর অপমানের!

রাত গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়েছে। কারদার বাড়িজুড়ে এখন এক নিশ্চুপ, শান্ত আবহাওয়া বিরাজমান। দীর্ঘ অনুষ্ঠান শেষে বাড়ির মানুষজন আর আগত অতিথিদের কেউ কেউ এখনও জেগে আড্ডায় ব্যস্ত, আবার কেউ বা ঘুমপরীদে দেশে পাড়ি জমিয়েছে।
​ওদিকে নিরিবিলি ঘরে মেঘের কোলের ওপর মস্তক রেখে নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে শীর্ষ। মেঘের সুকোমল আঙুলগুলো পরম অনুরাগে বিচরণ করছে স্বামীর আর্মি কাট ছাঁটের চুলে। হাতের নরম ছোঁয়া জারি রেখে প্রবল ভালোবাসা আর কৌতূহল নিয়ে চেয়ে আছে সে শীর্ষর সুঠাম মুখপানে। চোখের ব্যাকুলতা আর গোপন চেপে রাখতে না পেরে মেঘ শেষমেশ অনুচ্চ স্বরে শুধায়,
​“কাউকে কিচ্ছু না জানিয়ে হুট করে এভাবে আসার আসল কারণটা কি আমি, মেজর সাহেব?”
​কথাটা শুনতেই শীর্ষর বন্ধ থাকা প্রগাঢ় ধূসর চোখ জোড়া ধীরে ধীরে মেলে যায়। মাদকতায় ভরা সেই দৃষ্টি ঘুরে থমকে দাঁড়ায় রমণীর আননে। পরমুহূর্তেই নিজের ঘাড়ে এক উষ্ণ পুরুষালি হাতের ছোঁয়া অনুভব করে মেঘ। ধীরে ধীরে, বড্ড নমনীয়ভাবে ওর ঘাড়টা নিচু হয়ে এসে চুঁইচুঁই করে স্পর্শ করে শীর্ষর সরু নাসিকা। মেঘের কোমল নাসিকার ডগায় নিজের দাঁতের মৃদু নিশান এঁকে দেয় শীর্ষ। লজ্জায় নেত্রপল্লব খিঁচিয়ে মুদে ফেলে মেঘ, দু-হাতে শক্ত করে খামচে ধরে স্বামীর সুঠাম বাহু! মেঘের এমন আবেশ জড়ানো অভিব্যক্তি দেখে আফিমের মতো এক নেশালো স্বরে শীর্ষ বলে ওঠে,

​“নিজের রূপসী বউয়ের এমন আকুল আবেদন যে আর ফেলতে পারলাম না, ফ্লাওয়ার! তাই তো সব কাজবাজ ফেলে সোজা ছুট লাগাতে হলো ঘরপানে”
​শীর্ষর মুখ থেকে পাওয়া এই জবাবে মেঘের মুদে থাকা নেত্রপল্লব যেন এক নিমেষে নেচে ওঠে! ভালোবাসার সেই মায়াবী ঘোরে একেবারেই বেসামাল হয়ে, সম্পূর্ণ নিজ অজান্তেই মেঘের নরম ওষ্ঠ গিয়ে ছুঁয়ে ফেলে শীর্ষর তামাটে ঠোঁট দুটোকে! আচমকা এই অনভিপ্রেত চুম্বনে চমকে ওঠে দুজনেই।
​“ইশ! একি কাণ্ড হলো আমার দ্বারা!”
​লজ্জায় যেন এখন মাটিতে মিশে যাওয়ার মতো দশা মেঘের! তড়িঘড়ি করে নিজের পুরো মুখখানা লুকিয়ে ফেলে শীর্ষর চওড়া বুকের গহীনে। আলতো করে স্বামীকে এক মৃদু ধাক্কা দিয়ে, লাজুক কণ্ঠে স্বগতোক্তি করে নিজের দোষ ঢাকতে চায়,
​“সবই কুসঙ্গে পড়ে! সঙ্গদোষে লোহা ভেসেছে আজ,আমার এই নির্লজ্জ স্বামীটা নিজের সাথে সাথে আমার লজ্জা-শরমও সব কেড়ে নিয়েছে!”
​মেঘের এমন অদ্ভুতুড়ে অসংলগ্ন অজুহাত শুনে শীর্ষর বুক চিরে ভেসে আসে মন গলানো একখানা প্রাণখোলা হাসির শব্দ! সেই হাসির অপার্থিব ছটা দেখার তীব্র অভিলাষে মেঘ চট করে মাথা উঁচিয়ে স্বামীর পানে তাকায়। কিন্তু শীর্ষর মুখের সেই মনকাড়া হাসির ঝলকানি দেখে মেঘের শ্যামা গাল দুটি লজ্জায় আরও দ্বিগুণ লাল হয়ে ওঠে! কান দুটো মুহূর্তেই গরম হয়ে ওঠে, সঙ্গে যেন শিহরিত হয় ওর সর্বদেহ!
​“ইশ! এত লজ্জা লাগছে কেন আমার!”

​নিজের দু-হাতের করতলে অমনি গোলগাল মিষ্টি মুখশ্রী ঢেকে ফেলে মেঘ। শীর্ষকে বিছানায় রেখেই তড়িঘড়ি করে ছুটে চলে যায় ওপাশে থাকা আরশির সামনে। আর তাড়াহুড়োয় শাড়ির দীর্ঘ আঁচলখানি খসে পড়ে রয় মেঝের ধবধবে সাদা টাইলসের ওপর। বড্ড অবহেলায়, পরম অনাদরে!
মেঘের এমন নাজুক অবস্থা আর বাঁধভাঙা লজ্জা বিছানায় শুয়ে শুয়ে পরম তৃপ্তি নিয়ে উপভোগ করছে শীর্ষ। ঠোঁট দুটি হালকা ফাঁক করে এক অদ্ভুত দুষ্টু শব্দ করে সে, যা মেঘকে যেন আরও দ্বিগুণ বেকায়দায় ফেলে দেয়! ভালোবাসার দুষ্টুমিতে ভরা গলায় মেঘকে জানিয়ে দেয়,
​“এখনই যদি এই অবস্থা হয় ফ্লাওয়ার, তবে সম্পূর্ণ ছুঁলে তো সোজা মূর্ছা যাবে!”
​কথাটা কানে পৌঁছাতেই মেঘের বুকের ভেতর থাকা হৃদযন্ত্রটা একেবারে বেসামাল হয়ে ওঠে! পাজর ভেঙে যেন এখনই বাইরে বেরিয়ে আসার জোগাড়। অস্বাভাবিক গতিতে ঢিপঢিপ করে বেজেই চলেছে সেটা। এই মুহূর্তে নিজেকে সামলানো বড্ড দায় হয়ে পড়েছে ওর জন্য। শেষমেশ মনের অন্তরে লুকিয়ে থাকা সেই অবাধ্য অশান্ত হৃদযন্ত্রটাকে একপ্রকার ধমকেই ওঠে মেঘ,

​‘অ্যাই, এত লাফাচ্ছিস কেন রে তুই, হ্যাঁ? মরেছিস নাকি একেবারেই?’
​কিন্তু মেঘের সেই কাল্পনিক ধমকে যেন বুকের ভেতরের অশান্ত সাগরটা আরও দ্বিগুণ উত্তাল হয়ে ওঠে! স্বস্তির খোঁজে বুকের মাঝে একটা হাত রেখে হাঁসফাঁস করে ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে থাকে সে। আর ঠিক সেই ব্যস্ততার মাঝেই সহসা রমণীর অনুভূতির ক্যানভাসে ধরা দেয় একজোড়া প্রচণ্ড শক্তিশালী পুরুষালি হাতের মাঝে নিমেষেই বদ্ধ হয়ে যাচ্ছে সে!
​কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরশির সামনের শক্ত পাটাতনে ঠাঁই মেলে ওর মেদহীন নরম পৃষ্ঠদেশের। আর ঠিক পরপরই সুকোমল ঘাড়ের উন্মুক্ত অংশে এসে আছড়ে পড়তে শুরু করে স্বামীর গাঢ় ও গরম দীর্ঘশ্বাস!

“তোমায় একটু ছুঁই! খুব বেশি ক্ষতি করবো না, লুটবো!”
​শীর্ষর মুখ থেকে পাওয়া এই স্পষ্ট ও উন্মাদ সংকেতে মেঘের ভেতরের তনুমন আরও তীব্রভাবে হাঁসফাঁস করে ওঠে। অবাধ্য বুকটা লাগামহীনভাবে কাঁপছে! শীর্ষ তো তার সবই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, তবুও যে আজ মনের ভেতরের ক্ষ্যাপা বাসনা আর কোনো বাঁধ মানতে চাইছে না!
​সুচিন্তিত ভঙ্গিতে মেঘের পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা ঘন কুন্তলরাশি পরম আদরে ঘাড়ের অন্যপাশে সরিয়ে দেয় শীর্ষ। তারপর একের পর এক ছোট ছোট নিবিড় চুমুতে ভরিয়ে দিতে থাকে ওর কোমল ঘাড়ের মসৃণ ত্বক। আর মুহূর্তের ব্যবধানেই সেই ছোট ছোট মিষ্টি চুমুগুলো রূপ নিতে শুরু করে এক তীব্র মাতাল দংশনে! শীর্ষর শুভ্র দন্তের সেই আলতো দংশন মেঘের দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক উন্মত্ত উত্তাল সাগরের তোলপাড় বইয়ে দেয়!
​মেঘ নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে কাঁপাকাঁপা ও অবশ হয়ে আসা গলায় আর্তনাদ করে প্রশ্ন করে,
​“মেজর সাহেব। অা এসব কী করছেন আপনি?”
​নিজের চলমান মাতাল কার্য অব্যাহত রেখেই, মেঘের সেই অশান্ত ও ব্যাকুল প্রশ্নের বেশ ধীর ও ভারী গলায় উত্তর দেয় শীর্ষ,

​“নিজের এতদিনের জমানো প্রাপ্যটুকু পরম ভালোবাসায় বুঝে নিচ্ছি, ফ্লাওয়ার!”
​কথাটার সাথে সাথে শীর্ষের ছোঁয়ার তীব্রতা যেন আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে থাকে! মুহূর্তের মাঝে এক প্রবল ঝটকায় মেঘকে নিজের বুকের দিকে ঘুরিয়ে নেয় সে। আচমকা এই পরশে নিজেকে সামাল দিতে না পেরে ভয়ার্ত ও আকুল মেঘ দু-হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে শীর্ষের গায়ে থাকা শার্টের হাতা। লজ্জায় নিজের সমস্ত মুখশ্রী লুকিয়ে ফেলে স্বামীর চওড়া ঘাড়ের ফাঁকে। মেঘের সেই ঘন ও গরম শ্বাস ক্রমাগত ছিটকে পড়তে থাকে শীর্ষের ঘামার্ত সুঠাম ঘাড়ে,

​“মেজর সাহেব–”
শীর্ষর বোধহয় মেঘের এই অতিমাত্রায় নাজুকতা আর সহ্য হলো না। মেঘের পিঠে ছড়িয়ে থাকা আলগা কুন্তল এক ঝটকায় শক্ত করে নিজের মুষ্টিবদ্ধ করে নেয় সে। পরম শক্তিতে কাছে টেনে মুখের একদম সামনে নিয়ে আসে মেঘের আরক্ত ও লাজুক মুখশ্রী। আবেশ জড়ানো কিন্তু অস্থির গলায় হিসহিসিয়ে বলে,
​“তোমাকে চাই, ফ্লাওয়ার! আজ, এখন এবং ঠিক এই মুহূর্তেই!”
​নিজের কথাটা শেষ করে শীর্ষ আর একটি সেকেন্ড সময়ও নষ্ট করল না। সোজা নিজের মুখটা দাবিয়ে দিল মেঘের তুলতুলে গলার ফাঁকে। তৃষ্ণার্ত ওষ্ঠের সাহায্যে চুষে নিতে লাগল গলার সমস্ত লজ্জার আভা। আর তার অবাধ্য, হিংস্র হাতের উন্মাদের মতো বিচরণ চলতে লাগল মেঘের সুকোমল পুরো কায়াজুড়ে। ধীরে ধীরে আলুথালু হয়ে ধসে পড়তে লাগল পরিধেয় শাড়ির প্রতিটা ভাঁজ। ভয়ে, লজ্জায় আর এক অলৌকিক অনুভূতির দোলাচলে থরোথরো করে কাঁপছে মেঘ, নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে মিশে যাচ্ছে শীর্ষের উত্তপ্ত সুঠাম দেহের সাথে!

​মেঘের এমন নিখাদ ও ব্যাকুল প্রতিক্রিয়া শীর্ষকে যেন আরও বহুগুণে উন্মাদ ও ব্যাকুল করে তোলে! এবার কিঞ্চিৎ শক্ত করে কামড়ে ধরে মেঘের নগ্ন গ্রীবা। যন্ত্রণায় ও এক অপূর্ব তৃপ্তিতে মৃদু গুঙিয়ে ওঠে মেঘ। অস্পষ্ট আকুতি ঢেলে তোতলে উঠে ডেকে ওঠে,
​“আ — আমার মেজর!”
​শীর্ষকে পুরোপুরি দিশেহারা ও আত্মহারা করার জন্য মেঘের মুখ থেকে বের হওয়া এই একটিমাত্র আকুল ডাকই যথেষ্ট ছিল! ক্ষিপ্র হাতে ছুড়ে ফেলে দেয় মেঘের শাড়ির পেঁচিয়ে থাকা দীর্ঘ আঁচল। উদ্যানের স্টেজের আলোয় প্রতিফলন শীর্ষের কক্ষের আরশির সামনে হঠাৎ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে মেঘের এক অদ্ভুত রূপসী ও আবেদনময়ী রূপ! দৃশ্যটা দেখে মাতাল মাতাল লেগে ওঠে শীর্ষর, যেন ঘোর লেগে টলে ওঠে ওর বলষ্ঠ দেহ। দ্রুত হস্তে টেনে খুলে ফেলে নিজের পরিধেয় শার্টের প্রতিটি বোতাম। এক মুহূর্তে শার্টটি গা থেকে খুলে হেলায় ছুড়ে মারে ঘরের দূর কোনো এক কোণে!

​মেঘের সেই অপরূপা ও সম্মোহনী কায়ার পানে প্রগাঢ় মায়ায় চেয়ে নিজের ক্ষুধাতুর চক্ষুকে তৃপ্ত করে শীর্ষ। জিহ্বার সাহায্যে আলতো করে ভিজিয়ে নেয় নিজের শুষ্ক তামাটে ঠোঁট দুটো। মাদকময় চোখে ড্যাবড্যাব করে গিলতে শুরু করে মেঘের প্রতিটি বাঁক আর অনন্য রূপরেখা। লজ্জায় তখন একেবারে মরণ দশা মেঘের! শীর্ষর এই উন্মাদের মতো নেশালো চাহনি আর একদম সহ্য হচ্ছে না ওর। নিজেকে কেমন বিশৃঙ্খল ও এলোমেলো লাগছে। নিজের হাতে পাতা ভালোবাসার এই মিষ্টি ফাঁদে আজ ওর নিজেরই শ্বাস ওঠা-নামা শুরু করেছে অস্বাভাবিক গতিতে। শান্ত, ঘুমন্ত সিংহটাকে যে আজ সে নিজেই শখ করে জাগিয়ে তুলেছিল তাই তো মরতে হচ্ছে এই মধুর সাজায়!
​আর এক মুহূর্তও কালবিলম্ব না করে ধেয়ে এসে মেঘের নগ্ন কোমরটা এক টানে নিজের আরও কাছে টেনে নেয় শীর্ষ। ছোট ছোট মাতাল চুমুতে ভরিয়ে দিতে থাকে ওর উন্মুক্ত কোমর, নাভির আশপাশ আর পেট। ঠিক তখনই নাভির ঠিক পাশে ফুটে থাকা কুচকুচে কালো তিলকটা চোখে পড়তেই শীর্ষ পুরোপুরি বেশামাল হয়ে পড়ে! হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে তীব্র আবেগে ঠোঁট দাবায় ঠিক ওই কালো তিলকটার ওপর! বুঁদ হয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,

​“আই ওয়ান্ট ইউ জাস্ট নাউ, ফ্লাওয়ার!”
​নিমেষের মধ্যে খুলে ফেলে শাড়ির সমস্ত কুঁচি। এক ঝটকায় হাঁটুর ওপর বসিয়ে নেয় মেঘকে। লালা আর ঘামে ভিজে একাকার হয়ে ওঠা মেঘ যেন তখন এক রূপসী লজ্জাবতী লতা! মেঘের সেই নিদারুণ সুন্দর আদল পরম অনুরাগে পরখ করে নিজের ঠোঁট দুটো ডুবিয়ে দেয় ওর ভেজা চুলের ভাঁজে।
​ভালোবাসার এই অপরিসীম গভীরতা ও সুখে মেঘের দু-গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে কয়েক ফোটা পবিত্র অশ্রু। ডুকরে উঠে ফুঁপিয়ে জড়িয়ে ধরে শীর্ষর সুঠাম গলা। কাঁপা কাঁপা গলায় আবেশে উচ্চারণ করে,
“আমি আপনাকে ভালোবাসি! স্বামী হিসেবে নয়, প্রণয়পুরুষ’কে মন-প্রাণ সঁপেছি! এই আমিটা আপনার, তাই না — মেজর সাহেব?”
​মেঘের এই পরম আকুতি ও ভালোবাসার স্বীকারোক্তি শুনে মেঘকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের গভীর থেকে গভীরে চেপে ধরে শীর্ষ। সুকোমল ঘাড়ের পৃষ্ঠে একের পর এক গভীর ঠোঁটের পরশ মাখাতে মাখাতে ঘোর লাগা কণ্ঠে বিবিড় করে উত্তর দেয়,

​“ইউ আর অনলি মাইন, জান! ইউ আর অলওয়েজ মাইন–!”
দু-হাতের শক্তি দিয়ে আলতো করে মেঘকে ওপরে তুলে নেয় শীর্ষ। মেঘের নত মুখশ্রীর পানে চেয়ে বিছানার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গাত্মক মুচকি হাসি ফুটিয়ে বলে,
​“কী হলো? সব সাহস এক নিমেষে হাওয়া হয়ে গেল নাকি, ফ্লাওয়ার? পরশুদিন ফোনে খুব তো বাহাদুরি দেখালে এটা করবে, ওটা করবে, সব নাকি একাই করে ফেলবে! আর আজ সামনা-সামনি আসতেই একেবারে পানিতে ভেজা বিড়াল বনে গেলে? বেশ মজার তো জিনিসটা!”
​মেঘ নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে একখানা নিবিড় কিল বসিয়ে দেয় শীর্ষর সুঠাম চওড়া বুকে। নাক-মুখ কুঁচকে তীব্র লজ্জায় মিনমিন করে বলে ওঠে,
​“হাড়ে হাড়ে বজ্জাত একটা মানুষ!”

​শীর্ষর বুক চিরে একখানা হালকা তৃপ্তির হাসির শব্দ ভেসে আসে। মেঘকে সাবধানে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে, নিজে ওর ওপর ঝুঁকিয়ে পড়ে। কানের কাছে নিজের তামাটে নাকটা নিয়ে কয়েক পল পরম অনুরাগে ঘর্ষণ করে। কানলতিতে নিজের দাঁতের আলতো ছাপ ফেলে একদম নিচু পুরুষালি গলায় বলে,
​“আজ তোকে হাতেনাতে পরখ করে দেখব, আমার এই পানিতে ভেজা বিল্লির গায়ে কত জোর!”
​মেঘের হাতের সুমিত নখ তীক্ষ্ণভাবে দাগ কেটে দেয় শীর্ষর উন্মুক্ত খালি পিঠের ওপর। সেখানে ফুটে ওঠে এক তাজা লাল রক্তাভ নিশান! এবার নিজের ভেতরের সবটুকু তেজ জড়ো করে জবাবে বলে,
​“মনে রাখবেন মেজর সাহেব, হিংস্র বাঘও কিন্তু শেষমেশ নিজের পোষা বিল্লির কাছেই হার মানে!”
​শীর্ষর চওড়া গলাটা নিজের দু-হাতের ফাঁকে আড়াআড়িভাবে আঁকড়ে ধরে নাকের সাথে নাক ঘষে মেঘ। পরম ভালোবাসায় এক আলতো চুমুতে ভরিয়ে দেয় স্বামীর সরু ও লম্বাটে নাসিকা। শীর্ষও আর নিজের ভেতরের ক্ষুধাতুর তৃষ্ণা ধরে রাখতে না পেরে মধু লুণ্ঠন করতে সোজা ঝাঁপিয়ে পড়ে মেঘের কাঁপতে থাকা গোলাপি ওষ্ঠের মধুভাণ্ডারে!

​প্রথমে সেই ছোঁয়া আলতো আর সুকোমল দিয়ে শুরু হলেও, মুহূর্তের ব্যবধানে তা রূপ নিতে শুরু করে এক তীব্র মাতাল হিংস্রতায়! শীর্ষ যেন এক অবাধ্য ও অদৃশ্য অপোষ্য হিংস্র মানবে পরিণত হয়। একে একে ভালোবাসার গভীর দাগের পর দাগ ফেলে যেতে থাকে মেঘের স্নিগ্ধ শ্যামবর্ণের কায়াজুড়ে। ব্যথায় আর এক অচেনা সুখে মৃদু গুঙিয়ে ওঠে মেঘ, যা শীর্ষকে যেন আরও বহুগুণে উসকে দেয়!
​নিজেদের ভালোবাসার পরম সমুদ্রে পরিপূর্ণভাবে ডুব দেওয়ার ঠিক সেই মধুর মুহূর্তে হঠাৎ ঘরের ব্যালকনি টপকে ভেতরের দিকে পর পর সাতটি ভারী ঢিল ছুড়ে মারে অজ্ঞাত কেউ!
​ওদের ছুড়ে মারা দু-তিনটি ঢিল সজোরে আঘাত হানে জানালার কাঁচের ওপর। চনচন শব্দে মুহূর্তেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছিটকে পড়ে সেই স্বচ্ছ কাঁচের ফালি! ধপধপ করে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে রক্তবর্ণ কাঁচের টুকরোগুলো।

​এমন চরম মধুমিলনের মুহূর্তে এভাবে আকস্মিক ব্যাঘাত ঘটায় মুহূর্তেই রাগে-ক্ষোভে অশান্ত ও অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে শীর্ষর মস্তিষ্ক! সে ঝটপট একহাতে বিছানায় শুয়ে থাকা ভয়ার্ত মেঘের নগ্ন দেহখানি ধবধবে চাদরের সাহায্যে পুরো ঢেকে দেয়। তারপর শক্ত পায়ে বিছানা থেকে নেমে আসে নিচে। মেঝেতে পড়ে থাকা কাগজে মোড়ানো ঢিলগুলো এক এক করে হাতে তুলে নিয়ে খুলতে শুরু করে।
​একদম প্রথমে পাওয়া ঢিলটার ভেতর জড়িয়ে রাখা কাগজে কয়েক লাইনের একটা হাতে লেখা বার্তা দেখতে পায় শীর্ষ। চরম হুমকিস্বরূপ সেই অদ্ভুত লেখাটা দেখে নিজের একপাশের বাঁকা ভ্রু কুঁচকে ওঠে তার। কৌতূহল ও কড়া চোয়াল নিয়ে মনে মনে পড়তে শুরু করে সেই বিশ্রী লাইনগুলো,
​❝আমার ওই মায়াবতীর থেকে অনেক দূরে থাকবি, মেজর শীর্ষ! ওর শরীর আর অঙ্গে যদি তোর এক ফোঁটা ছোঁয়াও পড়ে, তবে এসিড দিয়ে পুড়িয়ে নষ্ট করে দেব তোর প্রতিটা অঙ্গের বাঁক! মায়াবতী শুধুই আমার, কেবলই আমার! আমি ব্যতীত ওকে ছুঁয়ে দেওয়ার বা পাওয়ার অধিকার আর পৃথিবীর দ্বিতীয় কারও নেই—তা সে তুই ওর নিজের আইনি বিবাহিত স্বামীই হোস না কেন!❞

​কাগজের নিচে কোনো নাম-ধামের ঠিকানা লেখা নেই। স্রেফ একটা ঢিল পড়ে দেখে নিয়েই শীর্ষ বুঝে যায়—বাকি কাগজ মোড়ানো ঢিলগুলোও নিশ্চয়ই কোনো অহেতুক ও কাপুরুষ আগন্তুকের কাজ!
​শীর্ষর ঠোঁটের কোণে ভেসে ওঠে একখানা চরম ভয়ংকর, শীতল আর রহস্যময় বিষাক্ত হাসি! সেই হাসিতে কোনো নমনীয়তা বা কোমলতার ছিটেফোঁটাও নেই। রয়েছে স্রেফ এক নির্দয় ও নিষ্ঠুর প্রতিহিংসা! নিজের শক্ত হাতের করতলে কাগজটিকে এক মুহূর্তে মুচড়ে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলে সে। ঘরের নিস্তব্ধতায় চাপা কিন্তু গর্জন করা কড়া স্বরে বিবিড় করে বলে,

মেজর কারদার পর্ব ৩৭

​❝এ নারী জন্ম-জন্মান্তর ধরে আমার নামে সিলমারা, বুঝলি? তাকে ছিনিয়ে নিবি তুই—তোর মতো এক ভীরু, আদলহীন অদৃশ্য ছায়া? ঠিক আছে তবে — আজ থেকেই শুরু হয়ে যাক তোর আর আমার এক মরণপণ সাপ-নেউলের খেলা!❞

মেজর কারদার পর্ব ৩৯