মেজর কারদার পর্ব ৩৯ (২)
ফিনারা ঝুমুর
বিয়ের মূল সময় একদম ঘনিয়ে এসেছে। বরযাত্রীর গাড়িগুলো কারদার বাড়ির সুবিশাল ফটকের সামনে এসে থামতেই চারিদিকে সাড়াশব্দ পড়ে যায়!
“বর এসেছে, বর এসেছে রে!”
চারপাশের কোলাহল আর দৌড়াদৌড়ির মাঝেই মেরুন রঙের জমকালো লেহেঙ্গাটা সামলে একপ্রকার ছুট্টে ঘরে আসে মিরা। দৌড়ানোর কারণে বেদম হাঁপাচ্ছে সে। তার এমনউসকোখুসকো অবস্থা দেখে মিথিলা একটু ভ্রু কুঁচকে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
“কী গো মেয়ে! এভাবে পাগলের মতো দৌড়াচ্ছ কেন?”
মিরা জোরে কয়েকবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। তারপর মিথিলার এমন শান্তভাব ও বেক্কেলামি দেখে চোখ দুটো পাকিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলে,
“আরে বর চলে এসেছে নিচে! আর তোমরা এখনো এখানে বসে আছ? নিচে চল, সোজা গিয়ে মেইন গেট আটকাব!”
“বলো কী! চলো চলো, তবে আর দেরি কেন!”
আজ বরপক্ষের থেকে মোটা অঙ্কের টাকা খসানোর ফন্দি এটে চটজলদি মিরার হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে ছুট লাগায় মিথিলা। ড্রয়িং রুমে তিথি আর মেঘকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কোনো কথা না শুনে ওদের দুজনকেও একপ্রকার জোর করে পাকড়াও করে সাথে নিয়ে চলে গেটের পানে।
বেশ বড়সড় আর জমকালো কারুকাজে সাজানো হয়েছে বিয়ের মূল গেটখানা। তবে মোটা লাল ফিতার শক্ত বাঁধা পেরিয়ে বর সামীর আর তার লোকজনের এখনো কারদার প্রাসাদে গৃহপ্রবেশ ঘটেনি!
“আরে বোনেরা, একটু দয়া করে ভেতরে যাইতে দেন না ভাই!”
“উহু! অত সোজা নয় ভাইয়া, আগে উপযুক্ত দাফায় টাকা দেন, তারপর গেট খোলা হবে!”
বরপক্ষ হতে আগত কয়েকজন চটপটে ছেলের অনুরোধের পৃষ্ঠে রাজকীয় আবদার হাঁকায় কনেপক্ষের নারীরা। এই কিপ্টে বর সামলানোর দলে সুনিপুণ নেতৃত্ব দিচ্ছে কারদার বাড়ির নতুন প্রজন্মের দুই নতুন পুত্রবধূ মেঘ ও তিথি! আর তাদের সাথে পুরো জোশে সঙ্গ দিচ্ছে মিথিলা, মিরা এবং নিশাত।
বরপক্ষের একটা ছেলে এবার ঝগড়ার প্রস্তুতি নিয়ে দেমাগ দেখিয়ে বলে ওঠে,
“হাজার টাকার বেশি এক টাকাও কিন্তু আপনারা আমাদের থেকে পাবেন না, বলে রাখলাম!”
ছেলেটার এমন একগুঁয়ে আর ভাব মারা কথা শুনে মিরা একহাতে লেহেঙ্গার দোপাট্টা সামলে কোমরে হাত রেখে বেশ রাগান্বিত কণ্ঠে হাঁকায়,
“আমরা মাত্র অর্ধলাখ টাকা তো চাইলাম! ফটাফট সেই পঞ্চাশ হাজার টাকা অনলাইনে বা ক্যাশে গুনে দিন, আর ঝটাঝট ঠাণ্ডা শরবত খেয়ে সুবোধ বালকের মতো ভেতরে গিয়ে বসুন!”
লম্বাটে চশমাপরা ছেলেটার চোখ দুটো মুহূর্তেই ছোট হয়ে আসে! চশমার মোটা কাঁচের আড়ালে থাকায় তার চোখের আসল অভিব্যক্তি বোঝা দুষ্কর বটে, তবে গলার মেজাজ স্পষ্ট। সে কড়া গলায় আবার বলে,
“বললাম তো, মাত্র এক হাজার টাকা পাবেন!”
মিরাও ত্যাড়ামি করে একদম একচুল না সরে হুংকার ছাড়ল,
“পঞ্চাশ হাজার মানে একদম পঞ্চাশ হাজার! এক টাকা কম হলেও ফিতা কাটা চলবে না!”
কথায় কথায় স্টেজের গেইটেই তুমুল তরজা আর ঝগড়া বেঁধে যায়! পাঁচ রমণীর তিক্ষ্ণ আর চটপটে যুক্তির তোড়ে বরপক্ষের দেমাগি ছেলেগুলোর অবস্থাও বেশ শোচনীয়। তবে বয়োজ্যেষ্ঠ যারা পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁরা পুরো দৃশ্য দেখে মিটমিটি হাসছেন মেয়েপক্ষের এমন খুনশুটি আর মিষ্টি দাবি তো বিয়ের আসরে নতুন কিছু নয়!
কিন্তু এই সব কিছুর মাঝে আসল বর সামীর অবস্থা সবচেয়ে করুণ। এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতেই ঝগড়ার তাসে ব্যস্ত বন্ধু নওয়াফকে কনুই দিয়ে জোরে এক গুতো মারে।
“কী হয়েছে রে? মাঝখান থেকে এভাবে গুতাচ্ছিস কেন?”
নওয়াফের এমন গলা চড়িয়ে চেঁচানোর শব্দে সামী চরম বিরক্ত হয়। রাগে ওর মস্তিষ্ক যেন রি-রি করে নাচছে! একদম দাঁতে দাঁত চেপে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলে
“ওরা যা চাইছে সোজা সেই টাকাটাই দিয়ে ঝামেলা মেটা না, ভাই! আমার ভেতরে এখন বউ চাই। তোর বন্ধু সামীর পকেটের টাকা গেলে যাক, তাতে তোর কী!”
নওয়াফ বেক্কলের মতো কিছুক্ষণ মাথা খারাপ হয়ে যাওয়া বন্ধুর পানে চেয়ে থাকে। শেষমেশ বিয়ের চক্করে বন্ধুর মাথা যখন একেবারেই গেছে, আর সে যখন নিজেই পকেটের টাকা খোয়ানোর ধান্দা করছে তখন নওয়াফেরই বা আর ঠ্যাকা কিসের! চটপট নিজের পকেট থেকে পঞ্চাশ হাজারের পুরো একখানা কড়কড়ে বান্ডিল বের করে সোজা মিরার বাড়িয়ে দেওয়া হাতে গুঁজে দেয়।
“হুম নাও, বেয়ানসাব! তবে মনে রাইখো, আজকের এই হিসাব কিন্তু একদিন শোধ উঠাবোই উঠাবো, একদম বলে রাখলাম!”
মিরা মিষ্টি করে জিভ বের করে একটা চটপটে ভেংচি কাটে। তারপর একদম পারফেক্ট শোধ তোলার মতো ঠাণ্ডা শরবতের থালা থেকে এক গ্লাস তুলে নিয়ে সোজা নওয়াফের ঠোঁটের সামনে ধরে মিহি গলায় বলে
“পরের কাজ পরে দেখা যাবে, বেয়াই সাহেব! আগে ঠাণ্ডা মাথায় শরবতটা পুরোটা গিলে মেজাজটা ঠাণ্ডা করুন দেখি!”
মিরার সেই অপার্থিব মিষ্টি হাসি আর সতেজ ভঙ্গির দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য যেন পুরোপুরি ফিদা হয়ে যায় নওয়াফ! আগ-পিছ আর কিছু না ভেবে একদম অন্ধের মতো গ্লাস তুলে এক চুমুক মারতেই মুহূর্তের মধ্যে নওয়াফের ফর্সা মুখখান একদম লাল-টকটকে টমেটো হয়ে ওঠে!আরে বাপরে… এ কী ভয়াবহ ঝাল! শরবতে যে মরিচের গুঁড়ো মেশানো!
চোখের মোটা চশমার আড়াল থেকেই জ্বলন্ত দৃষ্টিতে মিরার দিকে তাকাতেই মিরা নিজের লম্বা ঘন চুলগুলো বাতাসে উড়িয়ে হেলেদুলে গেইট থেকে সরে যায়। আর নিশাতের হাতে থাকা লাল গোলাপের ডালা থেকে চট করে কাঁচিটা হাতে নিয়ে বর সামীর সামনে ফিতা কেটে সগৌরবে কারদার বাড়িতে বরপক্ষের শুভ প্রবেশের ব্যবস্থা করে দেয়।ওদিকে বেচারা নওয়াফের ঝালের চোটে চরম বেগতিক অবস্থা! গলার ভেতর যেন আগুন জ্বলছে, তবুও বরপক্ষের ভাব ধরে বহু কষ্টে কান্না চেপে সহ্য করছে। এই যা!
কাজী সাহেবের শুভ উপস্থিতি ঘটেছে। কিছুক্ষণ পর কাজী সাহেব কনে কাবিননামায় সই করার জন্য কনেকে নিয়ে আসার ডাক পাঠালেন। হুকুম পেতেই নিশাত আর তিথি হাসিমুখে সোজা দোতলায় চলে যায় কিঞ্জাকে ধরে নিয়ে আসার জন্য।
ওদিকে কাজের ভিড়ে হুট করে মেঘের একদম কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে ওঠে মিরা,
“অ্যাই মেঘভাবি, বর সামী ভাইয়ার দামি জুতো জোড়া কই? ওটা তো আমাদের সরাতে হবে!”
কথাটা শুনে মেঘও সতর্ক চোখে চারপাশটা খুব ভালো করে পরখ করে নেয়। দেখতে পায়, সামীর সেই আভিজাত্যপূর্ণ কালো জুতো জোড়া পরম সুরক্ষায় বগলদাবা করে ধরে রেখে পাহারা দিচ্ছে ওই চশমাপরা নওয়াফ! মেঘও মিরার কানে কানে ফিসফিসিয়ে বিড়বিড় করে,
“ওই যে চাশমিসটার হাতে শক্ত করে ধরা! এখন আমরা জুতো জোড়া গায়েব করি কী করে, বলো তো?”
মিরা একহাতে নিজের দাঁত দিয়ে আঙুল কামড়ে ধরে ফন্দি আঁটার চেষ্টা করতে থাকে। আর মেঘ এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে প্রবল উত্তেজনায় ঝোঁকের মাথায় শক্ত করে খামচে ধরে মিরার সুকোমল বাহু! আচমকা তীব্র ব্যথায় মিরা ‘উফ!’ করে শব্দ করে উঠতেই মেঘ তড়িঘড়ি করে ওর বাহু ছেড়ে দেয়।
“কী হলো ভাবি? এভাবে আচমকা খামচে ধরলে কেন?”
“আরে, মাথা থেকে একটা মোক্ষম মতলব বেরিয়েছে!”
বাহুর ব্যথা এক নিমেষে ভুলে গিয়ে মিরা ফ্যালফ্যাল করে কৌতূহলী চোখে মেঘের পানে তাকায়। মেঘও সাথে সাথে অতি গোপনে ওর কানে কানে নিজের মাস্টারপ্ল্যানের ফন্দি বাতলে দেয়।
“অ্যাই যে, চশমা সাহেব! শুনছেন নাকি?”
নওয়াফ থেকে কিছুটা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে নিজের সবটুকু মিষ্টি কোকিলকণ্ঠ ঢেলে দিয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে ডাকে মিরা। মিরার সেই ডাক শুনেই নওয়াফের কপালে সেই আগের শরবতের ঝালের রাগের ভাঁজটা ফের ফুটে ওঠে! চোখ দুটো কড়া করে একটু চেঁচিয়েই বলে,
“আবার কী চাই, হ্যাঁ?”
মিরা ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসি ফুটিয়ে হালকা চোখ টিপে মিহি গলায় বলে,
“ওভাবে মেজাজ না দেখিয়ে আড়ালে ওই চিপায় একটু আসুন না, বলছি!”
নওয়াফ গভীর কপাল কুঞ্চিত রেখে সন্দিগ্ধ চোখে মিরার পেছন পেছন নির্জন গলিটার দিকে এগোতে থাকে। আর ঠিক এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল মেঘ ও মিথিলা! নওয়াফ ও মিরার অলক্ষ্যে সামীর সেই জুতো জোড়া চোখের পলকে হাত সাফাই করে উধাও করে দেয় তারা দুজন। তারপর পরম চতুরতায় জুতোজোড়া লুকিয়ে ফেলে স্টেজের পেছনে রাখা বিশাল ফুলের ডালির ঠিক নিচে!ওদিকে নিরিবিলি কোণে গিয়ে নওয়াফ বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলে,
“তা কিসের জন্য ডেকেছেন আমাকে এখানে, শুনি?”
নওয়াফের মুখের প্রশ্ন শেষ হওয়া মাত্রই মিরা আর এক সেকেন্ডও কালবিলম্ব না করে সোজা কাজে লেগে পড়ে! ওড়নার কোণে লুকিয়ে রাখা চুন আর কালির ঘন মিশ্রণটা এক নিমেষে নওয়াফের ফর্সা মুখে সজোরে মেখে দেয়! তারপর উল্লাসে হুল্লোড় করে হাততালি দিয়ে ওঠে,
“ও বেয়াই সা-য়া-য়া-য়া-ব! কেমন দিলাম বলুন তো, হা হা হা!”
বিজয়ীর মতো কথাটা বলেই চটজলদি এক ভোঁ-দৌড় দেয় মিরা! আর নওয়াফও নিজের মুখে হাত দিয়ে চুন-কালি আবিষ্কার করতেই রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে চিৎকার দিতে দিতে ওকে ধরার জন্য পিছু পিছু ছুট লাগায়!
কিঞ্জার সুসজ্জিত ঘর থেকে চরম উদ্বিগ্ন হয়ে বেরিয়ে আসে তিথি ও নিশাত। তাদের দু’জনের চোখে-মুখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ, ভয়ে হাত-পা পর্যন্ত থরোথরো করে কাঁপছে। সিঁড়ির মুখে আসতেই তাদের মুখোমুখি দেখা মেলে মেঘের সাথে। ওদের এমন অস্বাভাবিক আর ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থা দেখে নিমেষেই চিন্তিত হয়ে পড়ে মেঘ। কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে ব্যাকুল গলায় শুধায়,
“বড় ভাবি! তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? আর নিশাত আপু তোমাদের কী হয়েছে বলো তো?”
মেঘের প্রশ্নে তিথি যেন চমকে ওঠে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে অতি ভয়ে ভয়ে বিড়বিড় করে বলে দেয় আসল অঘটনটা। কথাটা কানে পৌঁছানো মাত্রই মেঘের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে যায়! এক অজানা আতঙ্কে ওর সুন্দর শ্যামলা মুখখানা ফ্যাকাসে রক্তশূন্য হয়ে পড়ে, হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসে। ব্যাতিব্যস্ত হয়ে আধো-আধো গলায় বলে ওঠে,
“কী বলছ এসব? সর্বনাশ! এখন কী হবে? বাইরের এতগুলো মানুষকে আমরা কী বলব?”
নিজের ক্ষীণ কণ্ঠের কথা যেন মেঘ নিজেই স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে না! তিথি আর নিশাতের আরও কোনো কথা শোর শোনার অপেক্ষা না করে সে একপ্রকার দৌড়ে চলে যায় শীর্ষর কাছে।
সেখানে নোমানের সাথে বসে বেশ শান্ত মনে আড্ডা দিচ্ছে শীর্ষ। মেঘ গিয়ে এক টানে শীর্ষর বাহু শক্ত করে ধরে। প্রচণ্ড হাঁপাতে হাঁপাতে অতি কষ্ট উচ্চারণে বলে,
“এই যে, শুনছেন?”
শীর্ষ কৌতূহল ও প্রশ্ন ভরা দৃষ্টি নিয়ে মেঘের পানে তাকায়। মেঘ শুকনো ঢোক গিলে আশেপাশের অলক্ষ্যে চাপা কিন্তু কাঁপাকাঁপা স্বরে বলে,
“কী কিঞ্জা আপু পালিয়েছে!”
মেঘের মুখে এত বড় অঘটনের খবর শুনেও শীর্ষ চরম শান্ত ও স্বাভাবিক গলায় জবাব দেয়,
“যাওয়ারই কথা ছিল।”
শীর্ষর এমন বিস্ময়কর নির্লিপ্ততা দেখে মেঘের চোখ জোড়া
ছানাবড়া হয়ে যায়! মুহূর্তেই মুখাবয়ব শক্ত করে ফেলে সে,
“কী বলছেন এসব আপনি, মেজর সাহেব? আপনার বোন বাড়ি থেকে পালিয়ে গেল আর আপনি এত শান্ত হয়ে বলছেন যাওয়ার কথা ছিল?”
পাশে বসে থাকা নোমান দৃশ্যটা দেখে মনে মনে বেশ মজা নিচ্ছে। শীর্ষ নোমানের দিকে বিন্দুমাত্র না তাকিয়ে হুট করে এক ঝটকায় মেঘকে টেনে নিয়ে বসিয়ে দেয় নিজের প্রশস্ত উরুর ওপর! পরম ভালোবাসায় ওর গালে এসে পড়া এলোমেলো চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে নিচু ও ভারী পুরুষালি স্বরে বলে,
“আগে শান্ত হও, ফ্লাওয়ার! কিঞ্জা খারাপ বা অচেনা কারও কাছে পালিয়ে যায়নি, যার কাছে ওর মন পড়ে ছিল, সে স্রেফ নিজের মানুষের কাছেই গেছে।”
মেঘ হা করে হাঁসফাঁস চোখে শীর্ষর শান্ত মুখশ্রীর দিকে চেয়ে থাকে! মাথার উপর দিয়ে যেন সব উড়ে যাচ্ছে ওর। বোন বিয়ের আসর থেকে উধাও হয়ে গেল, আর এরা সবাই মিলে কী আজব কাণ্ড ঘটিয়ে বসে আছে!
একটি সুসজ্জিত নিভৃত কামরার চেয়ারে শক্ত করে বসিয়ে রাখা হয়েছে আসন্ন এমপি প্রহরকে। তার সুঠাম দু-হাত পেছনে একত্র করে শক্ত বাঁধনে বাঁধা, এমনকী কোমরেও মোটা রশি দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে চেয়ারের সাথে। কিন্তু এত কিছুর পরও প্রহরের ধারালো দু-চোখে কোনো ভয় নেই সে চরম অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে আছে ঠিক তার সম্মুখে কনে সাজে দাঁড়িয়ে থাকা অনন্যা রমণীটির পানে!
তবে সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো সেই রূপসী কিঞ্জার ডান হাতে শোভা পাচ্ছে একখানা লোডেড চকচকে পিস্তল! সুকোমল আঙুলটি রাখা বন্দুকের ট্রিগারে, আর মায়াবী চোখ জোড়ায় ফুটে আছে এক আদিম আক্রোশ ও তীব্র জেদ! কাঁচা কাঁচা রক্তবর্ণের বধূর সাজে ওকে যেন সত্যিই স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোনো জেদী দেবীর মতো লাগছে।
প্রহরের সেই বাঁধার তোয়াক্কা না করে কিঞ্জা ধীর পায়ে এগিয়ে আসে। প্রহরের দুই উরুর দুই পাশে নিজের দুই পা দিয়ে সগর্বে গিয়ে বসে পড়ে তার কোলে! তারপর পিস্তলের শীতল নলের ধারালো অংশ দিয়ে প্রহরের চওড়া কপালে আলতো আঁচড়
কাটতে কাটতে অত্যন্ত শীতল ও ধারালো কণ্ঠে বলে,
মেজর কারদার পর্ব ৩৯
“শর্ত দুটো–
এক– কবুল বলে আমাকে সারাজীবনের জন্য নিজের করে নেওয়া,
দুই– আগামীকাল খবরের হেডলাইনে তোমার ধর্ষণের ছবি প্রকাশ পাওয়া। ইচ্ছে তোমার তবে, দ্বিতীয় শর্তে রাজী হওয়া মানে ইজ্জতের সাথে সাথে জীবনও হারানো — মাই হ্যাপিনেস!”
