এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২৬
আসিফা খান
কফি হাতে রুমে প্রবেশ করলো ইয়ানা। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলো রুমে কেও নেই।। ওয়াশরুম থেকে পানি পড়ার শব্দ আসছে।। ইয়ানা কফির কাপ টেবিলে রেখে,,,অগোছালো বিছানা গুছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ঘড় ঝাড়ু দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায় আর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিজেকে পরখ করতে থাকে। হালকা মিষ্টি গোলাপী রঙের থ্রি পিজ পরিহিত সে,,,চুল লম্বা বেনি করা তার,,,চোখ মুখ সাধারণ। কিন্তু সবার কাছেই তার এই সাধারণ রূপের প্রশংসা আছে। কিন্তু দাদী যে বললো তার এই সাধারণ রূপে রিফাত তাকে কাছে টানবে না! নিজেকে পরখ করার মুহূর্তে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো রিফাত। ভেজা শরীরে শুধুমাত্র ট্রাউজার পর া, উদাম দেহ উন্মুক্ত ইয়ানার চোখের সামনে। চুল থেকে টপ টপ করে পানি পড়ছে রিফাত এর।। ইয়ানা রিফাতের এরকম রূপ দেখে দুটো শুকনো ঢক গিলে মনে মনে নিজের স্বামীর উপর সেই ক্রাশ নামক বাঁশ খায়।।
রিফাত ইয়ানার এরকম তাকিয়ে থাকা দেখে হাত উঠিয়ে তুরি বাজাতেই ইয়ানার হুস ফিরল।। রিফাত ভ্রু নাচিয়ে বলল,,,”আমার কফি।”
ইয়ানা চট জলদি টি টেবিল থেকে কফির কাপ উঠিয়ে রিফাতের হাতে ধরার। শান্ত কণ্ঠে বলে,,,”আপনার চুল থেকে পানি ঝরছে।”
“তাহলে মুছিয়ে দাও।”
“আ আমি!”
“এখানে আর কেও আছে নাকি,,,আমার চোখে তো পড়ছে না!”
ইয়ানা বুঝতে পারে রিফাত তাকেই কথাটি বলেছে।। তাই দ্রুত পায়ে টাওয়াল এনে রিফাতের সামনে দাঁড়ায়। কিন্তু চুল মুছবে কি করে!তার থেকে রিফাত যে অনেক লম্বা।। অবাঞ্চিত ভাবেই ইয়ানার অন্তরের কোণে খারাপ লাগা কাজ করে ,,,তাদের যে উচ্চতাও সমকক্ষ নয়।।
ইয়ানার ভাবনা চিন্তাকে পরখ করে রিফাত বিছানায় গিয়ে বসে। ইয়ানা ও গুটি গুটি পায়ে হেঁটে রিফাতের সামনে দাঁড়িয়ে তার চুল মুছে দিতে থাকে। এদিকে রিফাত এক হাতে কফির কাপ ধরে অন্য হাত ইয়ানার কোমরে রাখলে ইয়ানা কেঁপে ওঠে।। মনের মধ্যে সীমাহীন আবেগ ভরে ওঠে। তার উপর লোকটা উদাম শরীরে বসে আছে,,,আর মিটিমিটি দৃষ্টি নিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।।ইয়ানার গলা শুকিয়ে আসছে। পেট মোচড় দিচ্ছে তার। কোনো রকম ভাবে রিফাত এর চুল মুছে সরে আসে।।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ইয়ানা রিফাত কে জিজ্ঞাসা করে,,,”আজ নার্সিংহোম যাবেন না?”
রিফাত টি শার্ট গায়ে জড়িয়ে উত্তর দিল,,,”যাবো দুপুরে।”
ইয়ানা আর কিছুই বলে না। চুপ করে বিছানায় বসে পা দুলাতে থাকে আর পরখ করতে থাকে আপাত মস্তক রিফাতকে। লোকটাকে এক কথায় সুদর্শন বলা যায়। লম্বা প্রশস্থ বাহু বিশিষ্ঠ দেহ, গভীর চোখে গোল ফ্রেম এর চশমা, চাপ দাড়ি,ফর্সা চেহারা। ইয়ানা যেনো বিনা কারণে রিফাত এর দিকে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকতে পারবে,,,তাতেও যেনো চোখের তৃষ্ণা মিটবে না তার। লোকটাকে দেখলেই মনটা কেমন জানি করে ওঠে,,,হুট করেই চোখ দুটো বেহায়া হয়ে যায়,,,মাথার ভেতর পচা পচা অনুভূতি তাকে অস্থির করে তোলে।। কর্মরত রিফাত ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে তাকায়,,,দেখে ইয়ানা উসখুস করছে,,,হয়তো কিছু বলতে চায় তাকে।। রিফাত গম্ভীর আওয়াজে বলে,,,,
“কিছু বলবে?”
ইয়ানা হকচকিয়ে যায়। সত্যিই তো সে অনেকক্ষণ ধরে রিফাতকে কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু সংকোচ বোধ করায় তাহ হয়ে উঠছিল না।। ইয়ানা এবার আমতা আমতা করে বলল,,,
“হ হ্যাঁ মানে,,,বলছিলাম কি”
“বলো,,,”
“আমায় থ্রি পিস এ কেমন লাগে?”
রিফাত ভ্রু কুঞ্চিত করে। মেয়েটার হঠাৎ এমন প্রশ্নে কিছুটা অবাক হয়। ঘাড় কাত করে বললো,,,
“যেমন লাগার কথা তেমনি।”
ইয়ানা মন ক্ষুণ্ণ হয়,,,কিছুটা বিষণ্ণ হয়ে বলে,,,”তারমানে ভালো লাগে না!”
“আমি এটা তো বলিনি।”
“ভালো লাগে,,,এটাও তো বলেননি।”
রিফাত চুপ হয়ে যায়। কিছু সময় পরে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে ইয়ানার চোখে চোখ রেখে,,,ভারী কন্ঠে সুধাল,,,,,
“যাকে ভালো লাগে তাকে সব অবস্থাতেই ভালো লাগে,,, তাতে সামনের মানুষের ব্যক্তিত্ব, পরিধানের কাপড় কোন কিছুই আমাদের চোখকে অতৃপ্তির মধ্যে ফেলতে পারে না।।”
রিফাত এর বলা বাক্য যেনো ইয়ানা কে ঝাকিয়ে তুললো। এক রাশ ভালোলাগা ছেয়ে গেলো মনের মাঝে। লোকটার কথার মাঝে এত মুগ্ধতা কেনো? কম ভাষী এই লোকটা যখন কথা বলে তখন যেনো তার মুখে কেও এক যুগ মায়াময় উদ্দামতা ছড়িয়ে দেয়।। ইয়ানা নতজানু হয়ে হাসলো। ভালোবাসার মানুষের সবকিছুই এত ভাল লাগে কেনো?
খানিক বাদে ইয়ানার ফোন বেজে উঠলো,,,’ আতু পাগলী ‘ লেখা নামটি দেখেই ঝট করে ফোন রিসিভ করে কানে দিয়ে বারান্দায় চলে গেল আর তাহ আড় চোখে দেখলো রিফাত।। বেশ কয়েক দিন পর আতিকার সাথে কথা হচ্ছে তার। একমাত্র প্রিয় বান্ধবীর আওয়াজ কানে আসতেই ইয়ানা হেসে ফেললো। কিন্তু সময় যত গড়ালো ইয়ানার মুখ ভঙ্গি পরিবর্তন হতে থাকলো।। একটা সময় গিয়ে কোনো রকম কথাই উচ্চারণ করলো না ইয়ানা। ইয়ানার কে চুপ হয়ে যেতে দেখে আতিকা ওই পাশ থেকে আদুরে শব্দে বললো,,,,
“ইনু,,,আমি সত্যিই সরি। বিশ্বাস কর সব কিছু এত তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে ভাবতেই পারিনি। বিয়ের রাতেই তাকে সব বলবো বলে ঠিক করেছিলাম কিন্তু সময়ই পাইনি। তোকে এতদিন কথাটি বলিনি বলে আমার পেট ফুলছিল,,,আর যেই এখন বলে ফেলেছি এখন কি হালকা লাগছে।”
ইয়ানা মুখ গোমড়া করে বললো, “আহিল ভাইয়ের সাথে বিয়ে হয়েছে তোর, যে কি না ওনার ভালো বন্ধু আর তার বউ তুই হয়েছিস,,,কিন্তু কথাটা আমি জানতে পারছি কবে?”
“মাফ চাই বইন,,,বললাম তো সময়ই পাইনি। মাঝে মধ্যেই আমাকে দেখতে ওনার আত্মীয় স্বজনরা হাজির হচ্ছিল,,,আজকেই একটু ফাঁকা পেয়ে তোকে ফোন করলাম।”
ইয়ানা তাও চুপ করে রইলো। সত্যি বলতে সে মনে মনে নাচছে।। আহিল ভাইকে সে বরাবরই পছন্দ করে আর তার বউ এখন তার প্রিয় বান্ধবী কথা শুনেই ইয়ানা অত্যন্ত আবেগী এবং খুশি।। আতিকা আবারও আদুরে সুরে বলল,,,
“কিছু তো বল ইনু,,,”
“আমি অন্নেক খুশি আতু,,,বিশ্বাস কর তুই এখন আমার কাছে থাকলে কষে একটা চুমু দিতাম।। আহিল ভাই প্রচণ্ড ভালো মানুষ আতিকা,,তোকে অনেক ভালো রাখবে।”
আতিকা লাজুক হাসলো,,,চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটির চেহারা,,মুহূর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে গেল আতিকা।। ইয়ানা আবার বললো,,,”কিন্তু এখনও কিন্তু তোদের মাফ করিনি,,,ক্ষমা পেতে হলে ট্রিট দিতে হবে,,,বুঝলেন মিসেস আতিকা আহিল শেখ।”
আতিকা ও সম্মতি দিলো। তত্পর কিছুক্ষন কথা বললো দুজনে। কথা বলার মাঝে মধ্যে খিলখিলিয়ে হেসে উঠছে মেয়েটা। দুই জনের বেশ অনেক্ষন জমিয়ে ফোনালাপ চালালো।। কথা বলা শেষ করেই পিছন ফিরতেই ধাক্কা লাগে রিফাত এর প্রশস্থ বুকের সাথে । ইয়ানা কপাল ঘোষে রিফাত এর দিকে তাকালো। লোকটা একদম তার মুখের সামনে দাড়িয়ে আছে। পকেটে দুই গুজে ঘাড় বাঁকিয়ে তার দিকেই চেহে আছে। চশমার আড়ালে ঢাকা তার দুই চোখ দিয়েই ইয়ানা কে কাপিয় তুলছে।। রিফাত ভরাট কথা প্রশ্ন করলো,,,
“কে ছিল?”
রিফাত এর প্রশ্নে ইয়ানা ভ্রু নাচিয়ে হালকা মনোভাবি ভঙ্গিতে বলল,,,”বি এফ”
উত্তর শুনে রিফাত চোখ ছোটো ছোটো করে ফেললো,,,মুহূর্ত অতিক্রম না হতেই সে ইয়ানা কে কোমর টেনে কোলে তুলে নিলো। ঘাবড়িয়ে গেল মেয়েটা। গলা শুকিয়ে গেল ক্ষণেই,,, অনুভব করলো রিফাত নিশ্বাসের শব্দ।। ব্যালকনির রেলিং এর সামনে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ইয়ানা কে ফেলে দেওয়ার ভান করে রিফাত। এক ভ্রু নাচিয়ে বলল,,,
“কি বললে,,,আবার বলো।”
ইয়ানা চোখে মুখে আতঙ্ক নিয়ে রিফাত এর গলা জড়িয়ে ধরলো, বুক ধড়পড় করছে তার। হঠাৎ করেই রিফাত এর এরকম পদক্ষেপ তার কাম্য নয়। তারপর ভয়! ইয়ানা কোনো রকম ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,,,”কিছু না,,,আমায় নামান প্লিজ।”
“আর ঘাড় ত্যাড়ামি করবে?”
“হ্যাঁ,,, মানে না না,,,করবো না,,,নামান প্লিজ। আমি পড়ে যাবো।”
“কার সাথে কথা বলেছিলে?”
এবার ইয়ানা একটু ঠোঁট বাঁকায়। গলা জড়িয়ে ধরে আরো একটু দৃঢ় হাতে। উদাস মনে এবং বিমর্ষতা কন্ঠে সুধায়,,,”আগে আপনি বলুন,,, আহিল ভাই আর আতিকার বিয়ের কথা আমায় বলেনি কেনো?”
“ইচ্ছে হয়নি তাই বলিনি।”
রিফাত এর উত্তর শুনে ইয়ানা নাক মুখ কুচকে ফেললো।
“আমার থেকে তো বেশি ঘাড় ত্যাড়া আপনি।”
ইয়ানার কথায় রিফাত মুখ ঘুরিয়ে ঠোঁট বাঁকায়। রেলিং এর ধার হতে সরে আসে কিন্তু ইয়ানা কে নামায় না বরং আরো শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে। অনিমেষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মেয়েটার দিকে। ইয়ানা শুকনো ঢোক গিলে,,,সে কি একটু বেশিই বলে ফেলেছে?,,,রিফাত এর এহেন চাহনি ইয়ানা কে তীব্র লজ্জার শিকার হতে বাধ্য করছে। দূরদূর বুকে এদিকে সেদিক দৃষ্টিপাত করলো নিজেকে স্থির রাখতে।। মানুষটা এখনও তাকে ছাড়েনি,,,তাই পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে হৃদ স্পন্দন। এরপর শোনা গেলো কারোর শীতল কণ্ঠ,,,
“আমার ত্যাড়ামি দেখেছো কোথায়? অপ্রকাশ্য আমি কে প্রকাশে এনোনা,,,ছারখার হয়ে যাবে তুমি।”
ইয়ানা নিস্তেজ হয়ে পড়েছে যেনো। ঘনো ঘোনো নিশ্বাসের তালে শরীর শিউরে উঠছে তার। রিফাত এর এহেন বাক্য বিনিময় ইয়ানা কে অন্তর দহনে পুড়িয়ে মারছে। কি শীতল শান্ত বুলি। দেহে খাপছাড়া ভাব কাজ করছে,,, হাতের মুঠোয় ধরে রাখা ফোনটি ধরাম করে নিচে পড়ল,শব্দ হলো কিছুটা, ইয়ানা চমকে উঠলো।। সহসা রিফাত হাসলো। একদম সূক্ষ্ম হাসি,,যেনো মরীচিকা যা গভীর ভাবে পরখ করলেই বোঝা যাবে হাসি, নাহলে মনে হবে ঠোঁটের কারসাজি।
রিফাত যেনো ইয়ানার এমনই প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় ছিল। নিঃশব্দে তাকে কোল থেকে নামিয়ে ফ্লোরে দাড় করালো, তত্পর পকেটে দুই হাত গুজে ধীর পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আর ইয়ানা আহাম্মক এর মত এখনো দাঁড়িয়ে আছে, চোখে মুখে তার বিস্মিত চাপ স্পষ্ট।
ইয়ানা গোসল করে সবে মাত্র বেরিয়েছে। শরীরে পানির অস্তিত্ব থাকায় পরনের কামিজটা আঁটসাঁট হয়ে আছে দেহের প্রতিটা ভাঁজে। চুলের পানিতে ভিজে গেছে পৃষ্ঠদেশ। গলা,কাধ এখনও পানিতে চুপচুপ করছে। গামছা দিয়ে সযত্নে মুছে চলেছে নিজের ভিজে চুল। আয়নায় নিজেকে দেখে চুলের আগা গোড়ার গামছা দিয়ে হাত চালাচ্ছে। ব্যাস্ত ইয়ানার খেয়াল নেই কোনো দিকেই,,,কেও যে তাকে দেখে থমকে গেছে তাহ সে জনেই না।
রুমে নিজের ফোন নিতে এসে এমন দৃশ্যের সাক্ষী হবে তাহ যদি জানত রিফাত! কিছু নিষিদ্ধ উদ্বেগ হাজির হচ্ছে মস্তিষ্কে। পিঠের শিরদাঁড়া বেয়ে বয়ে চলেছে শীতল শিহরণ। এই স্নিগ্ধ শুভ্র মায়াবিনী তাকে যেনো হাতছানি দিচ্ছে।। কেমন ঘোরের মাঝে চলে গেছে সে।। হঠাৎ কানে এলো মেয়েটার মিহি কন্ঠ,,,
“আপনি!”
এবার পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালো রিফাত। ইয়ানা বদনে ওড়না জড়াতে ব্যাস্ত। রিফাত গলা ঝেড়ে বললো,,,
“ফোন নিতে এসেছিলাম।”
ফোন নিয়েই চলে গেল রিফাত। ইয়ানা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। উফ লোকটা তাকে চোখের শব্দেই বিক্ষুব্ধ করার এক অশেষ ক্ষমতা রাখে।। ইয়ানা আর দেরি করলো না,,,ইসরাত বেগম হয়তো তার জন্য অপেক্ষা করছে। মাথায় ওড়না জড়াতে জড়াতে চলে গেল ইসরাত বেগম এর রুমে।
“তো তুমি তোমার সিদ্ধান্তের ওপর অটুট!”
“জ্বী। আপনাদের আমি নিজের মতামত জানিয়েছি।। তারিখ স্থির করার সিদ্ধান্ত আপনাদের উপর ছাড়লাম। গেস্ট,এরেঙ্গমেন্ট সমস্ত কিছু সেটেল করে আমায় জানাবেন।”
রিফাত কথাটি বলে দুটো শাস ছাড়ে। আফতাব মিয়া আর ইব্রাহিম সাহেব দুইজনেই বেশ অবাক হয়েছে রিফাত এর এহেন ফয়সালা তে।। আজ যেনো তারা অন্য এক রিফাত কে দেখছে। নিজের উপর চাপানো কোনো সিদ্ধান্ত মেনে না নেয়া এই ছেলে কি না মেনে নিয়েছে ইয়ানা কে! ভাবতেই বাঁধভাঙ্গা আনন্দ ছেয়ে যাচ্ছে আফতাব মিয়া আর ইব্রাহিম সাহেব এর কলিজায়।। ইব্রাহিম সাহেব রিফাত এর মাথায় হাত রেখে উৎফুল্ল হয়ে বললেন,,,
“আমি জানতাম আমার দাদুভাই এমনি কোনো সিদ্ধান্ত নেবে।। তোমরা আজীবন সুখী থাকো এই দুয়া করি।। ভালোথাকো দাদুভাই,,,”
ইব্রাহিম সাহেব এর গলা কেপে উঠলো। আর কিছুই বলতে পারলেন না তিনি। খুশির জোয়ারে আবেগপ্রবণ হয়ে গেছেন । রিফাত আলগোছে ধরে ফেললো দাদুর হাত। সে বুঝেছে দাদুর অবস্থা। আফতাব মিয়া ছেলের কাধে হাত রেখে মুচকি হেসে বললেন,,,
“তুমি আমার গর্ব রিফাত। জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপ তোমার জন্য সুখ বয়ে আনুক। সম্মানে, রহমতে ভরপুর থাকো আজীবন।”
রিফাত মাথা নিচু করেই “আমিন” উচ্চারিত করলো। এই যে তার নিঃস্বার্থ পরিবার,,,তাতে সুখী ছাড়া আর কিছুই চায়না তারা।।
দুপুরের খাবার খেতে ডাইনিং টেবিল জুড়ে বসেছে পুরো পরিবার। টেবিলে খাবার সাজিয়ে ইয়াসমিন বেগম আর মিসেস আসফিয়া ও চিয়ার টেনে বসেছেন। আলেয়া টেবিলের উপর মাথা রেখে আরাম করছে। মূলত সবাই অপেক্ষা করছে ইয়ানার। অপেক্ষার এক পর্যায়ে ইব্রাহিম সাহেব বলে উঠলেন,,,
“কি ব্যাপার বলতো। টেবিলে ইনু কে পেলে দাদুভাই কে পাওয়া যায়না আবার দাদুভাই কে পেলে ইনু কে পাওয়া যায় না।। এই তোমরা আবার ঝগড়া ঝাটি করোনি তো!”
রিফাত এর দিকে তাকিয়ে শেষের কথাটি বলে উঠলেন ইব্রাহিম সাহেব।। রিফাত কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না। সত্যি মেয়েটা গেলো কোথায়! রিফাত কিছুটা ভ্রু কুঁচকে সিড়ির দিকে তাকাতেই তার দৃষ্টি জোড়া আটকিয়ে যায় এক শুভ্র প্রণরেনীর দিকে। রিফাত দেখছে না কোনো পরি বা সর্গের অপ্সরী সে শুধুই দেখছে এক মায়াবিনী কে,,, দেখছে ধির পায়ে শাড়ির কুচি ঠিক করতে করতে নেমে আসা তার বউ কে। লাল শাড়ি সাদা পাড়,চোখে কাজল। রিফাত যেনো একটা হার্টবিট মিস করে। কি মনোহর দৃশ্য দেখছে সে। উত্তেজনায় অ্যাডামস অ্যাপেল কেপে উঠছে বার বার। কণ্ঠ নালী শুকিয়ে কাঠ। চোখের দৃষ্টি নাজেহাল। তার বুকের ভেতর সব কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ইয়ানার এই মন কাড়া রূপ রিফাত কে অবাক করছে। এই প্রথম ইয়ানা শাড়িতে দেখছে সে,,,দেখছে ওই রমণীর মাঝে নিজের সর্বনাশ।
হাতে কিছু এক ঠেকতে রিফাত এর ধ্যান ভাঙ্গে। পাশে তাকিয়ে দেখলো আলেয়া মিটি মিটি হাসছে আর তার দিকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিচ্ছে। রিফাত নিজের মুখায়োব গম্ভীর করলো কিন্তু পানির গ্লাস কোনো দিকেই না তাকিয়ে শেষ করে দিলো। তার সত্তিই পানির দরকার ছিল।। এদিকে ইয়ানা চুপ চাপ রিফাত এর পাশে বসলো। অত্যাধিক লজ্জার চোটে চোখ তুলতে পারছে না সে। ইয়ানার শরীর হতে নির্গত হচ্ছে মনমাতানো সুঘ্রাণ,,,যাহ রিফাত এর নাসিকা গ্রন্থিতে আঘাত করছে। রিফাত চোখ বন্ধ করে হাত মুঠো করে ফেললো। মেয়েটা তাকে কি আজ পাগল বানাবে?
“ইনুপি তোমাকে অন্নেক সুন্দর লাগছে।”
ইয়ানা চোখ তুলে তাকায় আলেয়ার দিকে মিষ্টি হেসে বলল,,,”থ্যাংকস আলু।”
আলেয়া জিভ ভাঙায়। ইসরাত বেগম এক লোকমা ভাত মেখে মুখে তুলে বলে,,,”এবার বউ বউ লাগছে মেয়েটাকে। এই আসফিয়া এবার থেকে ইয়ানা যেনো শাড়ি পড়ে,,,তবেই না বউ লাগবে,রিফাত এর পাশে মানাবে।”
আসফিয়া মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন। ইয়াসমিন বেগম ইয়ানার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। তার মেয়েটা কতই বড়ো হয়ে গেছে। একটা সময় যার চিন্তায় নির্ঘুম রাত পার করেছে এখন তাকে সুখী দেখে কলিজা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে ইয়াসমিন বেগম এর,,,মনে মনে দুয়া করে দিলো তার মেয়ে জামাই এর জন্য।। সবাই টুক টাক কথার মাধ্যমে খাওয়া শেষ করলো।। রিফাত আর বাকি সবাই যে যার রুমে চলে গেল।। ইয়ানা এঠো প্লেট গুলি সিঙ্ক এ রেখে ধোয়ার উদ্যোগী হতেই মিসেস আসফিয়া তাকে থামিয়ে দিলো। ইয়ানার হাতে এক বাটি দই দিয়ে বললো,,,
“রিফাত কে দে আর নিজেও খা,,,,ভালোবাসা বাড়বে।”
ইয়ানা চোখ বড় বড় করে তাকালো তার আন্টি মায়ের দিকে। লজ্জায় লাল হয়ে গেল তার গাল। এই মানুষটা তাকে কথায় কথায় লজ্জা দেয় কেনো তাহ বুঝে আসে না ইয়ানার!
ইয়ানা রুমে প্রবেশ করে দেখলো রিফাত আয়নার সামনে দাড়িয়ে দেহে শার্ট জড়াচ্ছে। ইয়ানা শাড়ি সামলে এগিয়ে গেলো সে দিকে। রিফাত আয়নায় ইয়ানা কে পরখ করে দেখলো এক বার। ইয়ানা দই এর বাটি রিফাত এর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,,,
“আপনার জন্য।”
রিফাত ভ্রু কুঁচকে এক বার বাটির দিকে তো এক বার ইয়ানার দিকে তাকালো। ঘুরে মেয়েটার সান্নিধ্যে অগ্রসর হতে হতে বললো,,,” উপযুক্ত বউ হতে চাও!”
ভরকে গেল ইয়ানা আমতা আমতা করে বলল,,,”ম মানে।”
“শার্ট এর বোতাম গুলি লাগিয়ে দাও। বউ এর দায়িত্ব পালন করো।”
ইয়ানা শুকনো ঢোক গিলল। রিফাত দই এর বাটি হাতে নিয়ে খেতে লাগলো আর অনিমেষ চেয়ে রইল ইয়ানার দিকে।। মেয়েটা কাপা হাতে তার শার্টের বোতাম গুলি সযত্নে লাগিয়ে দিচ্ছে। আবার মাঝের মধ্যে জিভ দিয়ে নিজের শুষ্ক ঠোট জোড়া ভেজাচ্ছে। রিফাতের মনের মধ্যে তৈরি হলো এক অদম্য ইচ্ছা,,,অভিলাষ হল সেই সূক্ষ্ম ঠোঁট জোড়া নিজের অধরের মাঝে নিয়ে সযত্নে তাহ মুড়িয়ে ফেলতে। কিন্তু নিজের এই ভয়ংকর ইচ্ছাকে ধামাচাপা দিয়ে এক চামচ দই উঠিয়ে ইয়ানার মুখের সামনে ধরে।। ইয়ানা নির্বাক ভাবেই তাহ খেয়ে নেয়।। সরে আসে রিফাত হতে।
কিছুক্ষণের মাঝেই রিফাত রেডি হয়ে যায় নার্সিংহোম যাবার জন্য।। রুম থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার আগেই রিফাত শুনতে পেল ইয়ানার কন্ঠ,,
এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২৫
“ফিরবেন কখন?”
“সন্ধ্যায়। আর কিছু?”
ইয়ানা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোঝায় কিন্তু তার মন ক্ষুন্ন হয়। যার জন্য এই শাড়ি পড়া সে যে কোন ধরনের প্রশংসা করলো না,,,এমনকি তার দিকে ভালোকরে তাকালো পর্যন্ত না।। কিন্তু ইয়ানা জানে না তার এই রূপের মাদকতায় কেও ঘায়েল।। ইয়ানা ঠোঁট বাঁকিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। মন খারাপে ভরপুর হলো তার চেহারা।। হঠাৎ করেই কারোর হাতের ছোঁয়া নিজের গালে পেতেই চমকিয়ে তাকায়,,,রিফাত গভীর চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকেই। মুহূর্তেই ঝুঁকে পড়ে মেয়েটার কানের কাছে,,, ফিসফিসিয়ে সুধায়
“কেও অজান্তেই তার রূপ দিয়ে আমায় আঘাত করার চেষ্টা করেছে । তাকে বলে বলে দিও আমি রিফাত আহত হয়েছি।”
