Home চিত্রাঙ্গনা চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৪

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৪

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৪
ইশরাত জাহান জেরিন

রুমে প্রবেশ করতেই চিত্রাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল ফারাজ এলাহী। চিত্রা নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “আপনি ফ্রেশ হবেন না? যতদূর জানি ফারাজ এলাহী মিনিটে মিনিটে কাপড় বদলায়। বাসায় আসলে সবার আগে ওয়াশরুমে গিয়ে সাওয়ার নেয়। নিবেন না?”
“একটা চুমু দেও। ভালো মানুষের মতো চলে যাচ্ছি, নইলে কিন্তু খারাপ মানুষের মতো উষ্ণ অন্ধকারে ঠেলে দেব তোমায়। এই শীতে উষ্ণতা চাই না তোমার?”

চিত্রা মুচকি হাসল। পা উঁচু করে ফারাজের গলার টাই ধরে তাকে কাছে টেনে আনে। ফারাজের চোখ দু’টো চিত্রার চোখে স্থির হয়ে যায়। অবাধ্য হাত আগুন সুন্দরীর বুক বেয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠে আসে। আলতো করে ছুঁয়ে দেয় ঠোঁট। একটা মৃদু কাঁপুনিতে চিত্রার শরীর কাঁপতেই সে ফারাজকে নিজের কাছে আরো গভীর ভাবে টেনে আনে। ফারাজ একেবারে চিত্রার কাছাকাছি। দু’জনে দুজনের উষ্ণ নিঃশ্বাস অনুভব করতে পারছে। হঠাৎ চিত্রা চোখ বন্ধ করে ফেলে। এই তো দু’টো অধর এক হওয়ার অপেক্ষায়। তবে চোখটা বন্ধ করতেই চিত্রা একটু ব্যতিক্রম অনুভব করল। চোখটা খুলতেই দেখল। ফারাজ শার্ট খুলতে খুলতে ওয়াশরুমের দিকে চলে যাচ্ছে। চিত্রা হাবার মতো তার দিকে তাকাতেই সে পেছন না ফিরে যেতে যেতে বলল, “কেমন লাগল ছোটলোক বউ? ভালোই তো লাগল, তাই না?”
চিত্রা ফারাজের দিকে তাকিয়ে আছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

তার ঘনঘন নিশ্বাস পড়ছে। ফারাজ পুরোটা শার্ট খুলে বাকেটে ফেলে দিয়ে সরু চোখে বলল,”ব্যাকুল হচ্ছো? আই লাভড ইট। মোর দ্যান ইউ ক্যান এভার ইম্যাজিন। যখন দেখি সামান্য আমার স্পর্শেই তুমি কাঁপতে শুরু করেছো, যখন আমার জন্য তোমার শ্বাস পর্যন্ত অস্থির হয়ে আসে, তখন সত্যিই ইট ড্রাইভ্‌স মি ইনসেইন।” ফারাজ থেমে পুনরায় বলল, “তুমি আমার জন্য কাতরাও,ফারাজ এলাহীর সামান্য স্পর্শের জন্য তোমার এই ব্যাকুলতা আমায় স্বস্তি দেয়। ” ফারাজ নিজের নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে বলল, “আমি দেখতে চাই, তুমি কতটা মরিয়া হতে পারো। আমার স্পর্শের জন্য কতটা বেপরোয়া হতে পারো। কতটা কাঁদতে পারো, কতটা আকুল হতে পারো…শুধু আমার সামান্য ছোঁয়া পাওয়ার জন্য।”

চিত্রা শাড়ি ঠিক করতে করতে আয়নার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। নিজের দিকে একবার তাকিয়ে ফের ফারাজ এলাহীর দিকে তাকিয়ে বলল, ” আমি তো কবেই আপনার কাছে আত্মসমর্পণ করেছি নিজেকে। আমি শুধুই আপনার। শুধু আপনারই ছোঁয়ায় দগ্ধ হওয়ার জন্য জন্মেছি।” বলেই সে বাঁকা হাসল। ফারাজের মুখেও সেই একই হাসি। সে কথা না বাড়িয়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। চিত্রা সেখানেই ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল।

রুম থেকে বের হতেই ফারাজ কিছুটা অবাক হলো চিত্রাকে দেখে। সে বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। ফর্সা পা দু’টো নাড়িয়ে নাড়িয়ে বইয়ের পাতা উল্টে যাচ্ছে। ফারাজের চোখ সব কিছু ভেদ করে চিত্রার মেরুন শাড়ির দিকে গেল। পাতলা শাড়ি ভেদ করে সরু কোমরটা দেখা যাচ্ছে। এবার তো এই আগুন সুন্দরী তার হৃদয়ে আগুন ধরিয়ে দেবে দেখছি। তবে সে আগুন হলে ফারাজও তো উত্তাল সমুদ্র। জলের জানা আছে কি করে আগুন নেভাতে হয়। সে চিত্রার পাশে এসে দাঁড়াতেও চিত্রা তাকে পাত্তা দিলো না। শেষে বিরক্ত হয়ে পা ধরে টেনে চিত্রাকে মুহূর্তেই নিজের কাছে আনল। চিত্রার পায়ের পাতায় চুমু খেলো। চিত্রা কেবল তাকিয়ে আছে তার দিকে। নেশা সেই চোখে, তার থেকেও বড় নেশা ফারাজের চোখে। ফারাজ চিত্রার দিকে তাকিয়ে হাস্কি গলায় বলল, ” পুরুষ ধ্বংস হয় কিসে জানো?”

“কিসে?”
❝পুরুষের ধ্বংস নেশায় নয়, নারীর কঠিন মায়ায় হয়।❞
“আর নারীর ধ্বংস?”
“তুমি বলো।”
❝পুরুষের চাহনিতে নারীর কঠিন মৃত্যু ঘটে, হৃদয় হয় ক্ষয়। তবুও নারী ভালোবেসে যায় তাকে, যে পাশে না থেকেও তার হৃদয়ে থাকে।❞
চিত্রা উঠে বসে ফারাজের ঘাড়ে চুমু বসিয়ে দেয়। শক্ত সেই চুমুতে লালচে দাগ বসে যায়। ফারাজ আয়নায় তাকায়। তার গেইম তার সঙ্গে খেলা? ইন্টারেস্টিং! সে চিত্রাকে ছুঁতে যায় ঠিক তখনই চিত্রা হুট করে উঠে দাঁড়িয়ে আয়নার সামনে দাড়িয়ে ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে কোমর বন্ধনী তুলে ফারাজের হাতে ধরিয়ে বলল, ” একটু পড়িয়ে দেবেন? আমি পড়তে পারছি না।”

“শাড়ি কেমন করে পড়লে?”
“ওটাও কি আমায় পড়াতে বললে হতো না?”
ফারাজ চিত্রার হাত থেকে বন্ধনী নিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসল নিচে। ঠান্ডা হাতের ছোঁয়ায় চিত্রার কোমরে বন্ধনী পড়াতেই সে কেঁপে উঠল। কেঁপে উঠল তখন যখন ফারাজ তার শীতল ঠোঁট চিত্রার কোমরে ছুঁইয়ে দিলো। মুহূর্তেই চিত্রা এক ধাপ সরে যেতেই ফারাজ তাকে বলল,” কি সমস্যা? ছুঁতে দিচ্ছো না কেন? ফারাজ জোরজবরদস্তিতে অভস্ত্য নয়। তবে কিভাবে কি আদায় করতে হয় তা ভালো জানে। আমি তোমায় জোর করব না বিবিজান, তুমি নিজেই নিজেকে আমার তরে সঁপতে বাধ্য হবে।”

“আজকে আপনি নয়, আমি আপনাকে স্পর্শ করব।” ফারাজ ব্যাকুল হতেই চিত্রা তাকে কাছে টেনে নিলো। একেবারে কাছে। “চোখ বন্ধ করুন।” ফারাজ চোখ বন্ধ করে ফেলে। এসব কাজে আবার দেরি করা চলে নাকি? ওইসব ছোটলোকি কারবার। ফারাজ চোখ বন্ধ করতেই অনুভব করল কি একটা নেই নেই। হঠাৎ চোখ মেলে দেখে চিত্রা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ফারাজের দিকে তাকিয়ে খিলখিলিয়ে বলল, “কেমন লাগে দারাজ এলাচী। প্রতিশোধ নিলাম বুঝলেন তো? কেমন লাগছে? আমার কিন্তু মজাই লাগছে।”
ফারাজ তেতে উঠে বলল, “আবুলের নাতনি কত বড় শয়তান! অভিশাপ দিলাম তোর একসঙ্গে দুইটা বাচ্চা হবে। দুইটারে খাওয়াতে খাওয়াতে, আর হাগুমুতু পরিষ্কার করতে করতে পাগল হয়ে কাঁদবি তুই। তখন আমি অভিশাপ স্বরূপ তোকে আরো দুইটা বাচ্চা ডোনেশন করে কাঁদাবো। আপনা টাইম আয়েগা। আসতাছি চান্দু, তুমি কই পালাতে পারো, কত দূর যেতে পারো আজকে আমিও দেখে ছাড়ব। গরম আদর তো তোমার কপালে সিলের মতো বসিয়ে দিয়েছে। পালানোর পথ নেই।”

ফারাজ চিত্রার পেছন পেছন দৌড়ে আসতে নিলে চিত্রা মুখ ভেংচি কেটে বলল, “গরম আদর পরে দিয়েন, আগে প্যান্ট তো পরেন।”
ফারাজ নিজের দিকে তাকালো। তোয়ালে তো পড়েছেই, বউ যেভাবে বলছে যেন সে তার মানচিত্র সবাইকে দেখিয়ে বেড়াচ্ছে। ছোটলোক বউ। রুমের সামনে দিয়ে হঠাৎ অভ্র যাচ্ছিলো। ফারাজকে এই অবস্থায় দেখে বলল, “ও মাই গড, সেই সেই।” চিত্রা দরজার কোণে লুকিয়ে থাকায় তাকে অভ্র দেখেনি৷ হঠাৎ অভ্রের এহেন কথায় সে লজ্জায় সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে রান্নাঘরের দিকে যেতেই অভ্র লজ্জায় পড়ে যায়৷ ফারাজ এলাহী অভ্রকে খোঁচা মেরে বলল, “সেই সেই করছো না? কুদ্দুসের বাপ, এখন তোমাকেই বড় আয়তনের বিশ্ব মানচিত্র দেখাব।”
” নাউজুবিল্লাহ ভাই, মাফ করে দেন। ওগো ঘরনী কোথায় তুই শালী, তোর সোয়ামীর সম্মান যে নিলামে উঠল বলে। কিস্তি তুলে হলেও বাঁচাআআআআআআ।”

এই বাড়ির কেউ তেমন একটা চিত্রার সঙ্গে কথা বলেনা। সন্ধ্যায় চিত্রা রান্না ঘরে প্রবেশ করতেই নদী তার পেছন পেছন ঢুকে বলল, “ফারাজ ভাইয়ের শরীর এখন কেমন আছে?”
“ভালোই।”
“কোনো সাহায্য লাগবে।” তারা দু’জন কথা বলতে না বলতেই মোহনা পেছন পেছন প্রবেশ করল। মোহনার চোখে এখন আলাদা একটা জুটি। রোশান বাড়িতে আছে। তার জন্যই চা গরম করতে এসেছে। চিত্রাকে দেখে বলল, “বুঝলে তো চিত্রা এখন আর কোনো ঝামেল চাই না। তবে পাপ থেকে মুক্তি চাই। এই বাড়িতে আর কিছু হোক তা চাই না।”

চিত্রা মোহনার দিকে তাকিয়ে বলল, “পাপী না মরলে পাপ শেষ হবে না। ওই যে বিড়ালদের কথা বলেছিলেন না, তাদের একটা দল আছে। দলটা ভাঙলে তারা মারা পড়বে।”
নদী মাঝ থেকে বলল, “সব শেষে স্বামীর ভালোবাসাই মূখ্য। যার কপালে স্বামীর ভালোবাসা নেই, তার কখনো সুখ হয়না।” নদীর চোখটা ঝাপসা হতেই মোহনা আর চিত্রার মনটা খারাপ হয়ে গেল। চিত্রা কিছু বলতে যাবে তার আগেই রান্নাঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় ফারাজ। কালো রঙের একটা শার্ট পড়া। সে শার্টের হাতা গুটিয়ে বলল, “ভাবীগনস একটু রান্নাঘরটা ফাঁকা করে দিতে পারবেন? আমার বউটা কি যেন রান্না করবে বলে এসেছে। স্বামী হিসেবে তাকে সাহায্য করা তো আমার উচিত।”

“তো আমরাও থাকি। মিলেমিশে কাজ করলে কাজ জলদি হবে।” বলল মোহনা। নদীও হাসল।
“ছ্যাহ, রোশান ভাই উপরে আছে গিয়ে তার কাজে সাহায্য করেন। আমাকে আমারটা করতে দেন তো মশারী ভাবি।”
চিত্রা ফারাজকে চোখ রাঙাতেই ফারাজ আরেকটু জোরে বলল, “প্লিজ আমাদের একটু একা ছাড়লে খুশি হবো।”
নদী বলল, “কি এমন রান্না করবে দু’জন মিলে খোদা জানে।”
“আমি আর আমার বউ মিলে বাচ্চা পয়দার রেসিপিটা করব।”

মোহনা আর নদী দু’জনেই লজ্জা পেয়ে জলদি রান্না ঘর থেকে বের হয়ে যায়। চিত্রা লজ্জায় নিচের দিকে তাকায়। কি একটা অবস্থা! ফারাজ এলাহী এগিয়ে আসে। “কাছে আসলে গরম মাইর পিঠে পড়বে।”
“গরম জিনিস আমার পছন্দ। ” সে চিত্রাকে টেনে নিজের কাছে এনে কোমর জড়িয়ে ধরে বলল, “এই যে আগুন সুন্দরী, তুমি না ঠিক পেস্তা বাদামের মতো। ওপর দিয়ে তেতো ভেতর দিয়ে মিষ্টি। তবে যেমনই হও না কেন, পেস্তা কিন্তু আমি না খেয়ে ছাড়ি না।”

“ছাড়ুন না কেউ চলে আসবে।”
“ছাড়াছাড়ির মায়রে কালা চুম্মা। ওইসব ছাড়াছাড়ির মতো ছোটলোকি কারবার আমি করি না। তার চেয়ে বরং মির্কি রোগীর মতো ভুজুংভাজুং না করে স্থির হয়ে দাঁড়াও দেখি।”
“কেন দাঁড়াবো? রান্না পুড়ে যাচ্ছে ছাড়ুন।”
“উফ বউ রান্না যাক চুলোয়। একটা চুমু দাও আগে।”
“চুমু চাই?”
“না আবুলের নাতনি তোর নানিরে চাই।”
” দারাজ এলাচীর বাচ্চা।”

“বাচ্চা আর হলো কই? বাচ্চার মা যদি এমন ব্যাঙের মতো লাফালাফি করে তাহলে বাচ্চার বাবা, তার ঠ্যাং ধরে তাকে ওপর থেকে টেনে আনবে কি করে?”
চিত্রা ওপর দিকে তাকিয়ে বলল,” বাচ্চাকে বুঝি ওপর থেকে টেনে আনতে হয়?”
“বিবিজান তুমি বেডরুমে না গেলে আমি বাচ্চা এনে দিব কোথা থেকে?”
“এই হয়েছে আপনার চালাকি বুঝি না ভাবছেন? আচ্ছা চোখ বন্ধ করেন একটা মিষ্টি চুমু দিব আজকে।”
“আমার কচু দেখিয়ে পালানোর ধান্দা তাই না? এবার ছাড়ছি না।”
“আরে সত্যি বলছি। আমাকে ছাড়ুন। কারন আপনি তো অনেক ধরেছেন। এবার আমার পালা। এবার প্রমিজ করছি।”
ফারাজ খুশিতে চিত্রাকে ছেড়ে চোখ বন্ধ করতেই গানের গলা শুনতে পেল,
~ তোমায় দেব মিষ্টি কিছু, তোমায় যদি পাই, তোমায় আমি ভালোবাসি, তোমায় আমি চাই।~
গানের গলা শুনতেই জলদি চোখ খুলে সামনে জমেলাকে দেখে ভয়ে ফারাজের গলা থেকে বেরিয়ে এলো, “উড়ি উড়ি বাবা।”

জমেলা চোখ মেরে ফারাজের কলার চেপে ধরে বলল,”এবার কালুর বাপ তুমি কোম্মে যাবা?”
ফারাজ কোনে দাঁড়িয়ে থাকা চিত্রাকে মিটমিট করে হাসতে দেখে বলল, “তবেরে? যা হাসার হেসে নাও। তারপর রুমে এলে ইন্টেক টিস্যু পেপার নিয়ে এসো। আজ যত হেসেছে তার দ্বিগুন যদি না কাঁদাই তবে আমিও ফারাজ এলাহী নয়।” পাশ থেকে জমেলা সেইসব কথা তোয়াক্কা না করে বলল, “এই হেন্ডু বেডা আই লাভিং ইউ।”

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৩

“ফাকিং বুড়ি,আজকে খাইছি। আগে বুড়ি তোমাকে শিক্ষা দেব তারপর তোমাকে যে পাঠিয়েছে ওটাকে।”
জমেলার খুশির অন্ত নেই। সে খুশি মনে বলল, “জলদি ইটিং মি হেন্ডু বেডা। আমি গোয়িং টু ইউর পেটে।”
ফারাজ জমেলার থেকে মেপে মেপে ধরে গিয়ে নিশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বলল, “খোদা রহম করো। এটা কেমন শাস্তি?”

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৫