প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪১
সাইদা মুন
দাঁত কেলিয়ে হাসছে মেহরীন আর তাহিয়া। ড্রাইভিং সিটে বসে তালহা কড়া চোখে তাকিয়ে আছে। ওদের হাসি দেখে গম্ভীর মুখেই বলল,
—ছাড় দিয়েছি মানে একেবারে ছেড়ে দেইনি। চারটার আগে যেন বাসায় চারটা পা থাকে। নয়তো পা গুলো ভেঙে গলায় ঝুলিয়ে দিবো।
হুমকির ওজন যেন ওদের কানে পৌঁছালই না। মাথা নেড়ে হালকা ‘টাটা’ ছুড়ে দিয়ে গেট পেরিয়ে কলেজে ঢুকে পড়ল দুজন। তালহা কয়েক সেকেন্ড সেদিকেই তাকিয়ে রইল, চোখে অদ্ভুত এক অস্থিরতা। তারপর তপ্ত এক নিঃশ্বাস ফেলে গাড়ি স্টার্ট দিল। মন সায় দিচ্ছিল না এদের একা ছাড়তে, কিন্তু দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে আর না করতে পারল না।
এদিকে মেহরীন আর তাহিয়া প্রায় ছুটেই ঢুকেছে কলেজে। বুক ভরা খুশি, তালহার কাছ থেকে অবশেষে পার্মিশন আদায় করে নিয়েছে। তাদের দৌড়ে আসতে দেখেই হাজির ফারিন, তনিমা আর রাফি। তাদের খুশি দেখেই বুঝে গেছে পার্মিশন পেয়ে গেছে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—আজকাল কুত্তাও কুত্তারে দৌড়ানি দেয়?
রাফির কথায় দুজনই থমকে দাঁড়ায়। পিটপিট করে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে, ঠিক কী বলল? কিন্তু বুঝতে দেরি হল না, ইন্ডিরেক্টলি ওদেরই কুকুর বলেছে রাফি। বুঝতেই দেয় ভোঁ দৌড়ানি। রাফি অবশ্য আগে থেকেই পিছিয়ে যাচ্ছিল, ওদের আসতে দেখেই সেও দৌড় দেয়। মুহূর্তেই শুরু হয়ে যায় বিশাল ছুটাছুটি। ফারিন আর তনিমা বাদ যাবে কেন, রাফি ফাঁকে ওদের চুলে টান মেরে দৌড় লাগায়, তাতেই আগুনে ঘি।
মাঠ পেরিয়ে, নিচতলার করিডোর, শহীদ মিনারের আশপাশ, সবখানেই দৌড়ের দাপট চলছে। করিডোর দিয়ে ছুটতে ছুটতেই আচমকা সবাই মুখোমুখি হয়ে যায় বাংলা স্যারের। স্যারকে দেখেই একেকটা নিজেদের জায়গায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, নিঃশ্বাস পর্যন্ত যেন আটকে ফেলেছে ভয়ে। ভীতু ভীতু চোখে একে অপরকে দেখছে আবার স্যারকে।
বাংলা স্যার কয়েক পলক সবার দিকে তাকিয়ে হঠাৎই নরম কণ্ঠে বললেন,
—এভাবে দৌড়াদৌড়ি করছো কেনো? কিছুক্ষন পর পরীক্ষা এখন যদি পড়ে টরে ব্যথা পাও কি হবে ভাবছ? যাও এক্সাম হলে পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে।
এইটুকু বলেই শান্তভাবে পাশ কাটিয়ে চলে যান তিনি। আর মেহরীনরা? সবাই বেকুবের মতো তাকিয়ে আছে। বাংলা স্যার মানে তো বজ্রকণ্ঠ, ঝাড়ি, ধমক, চোখ রাঙানি কিছুই তাদের উপর আক্রমণ করেনি? উনার এমন নরম সুর। ব্যাপারটা তাদের কারোরই হজম হল না।
—ব্যাপার কি রে স্যারের কি সৃত্মিশক্তি হারিয়েছে?
রাফির কথায় ফারিনও যোগ দেয়,
—আমিও তো তাই ভাবছি এতো নরম গলা ভূতে ভর করল নাকি?
তনিমা মাঝখান থেকে বলে ওঠে,
—আরে বয়স হয়েছে হয়তো ভুলে গেছে উনার আসল কন্ঠ।
তাহিয়া কথাগুলো থামিয়ে দেয়,
—যাই হোক, আমাদেরই তো ভালো। স্যারের ধমক আর খেতে হবে না।
সবাই কথা বললেও মেহরীন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। চোখ তার স্যারের চলে যাওয়ার পানে। কিছু একটা যেন মনে খচখচ করে। একটু ভেবে নিয়ে বলে,
—আমার না স্যারের মুখ দেখে লাগল স্যারের মনটা ভালোনা। কিছু একটা তো হয়েছে।
মেহরীনের কথায় বাকিরাও ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে। আসলে সবাই-ই বিষয়টা খেয়াল করেছে। তবে আপাতত এসব ভাবার সময় নেই, এক্সাম শুরু হয়ে যাবে। তাই ভাবনাগুলো পেছনে ফেলে সবাই এক্সাম হলের দিকে পা বাড়ায়।
দুপুর একটা বাজে। কলেজের সামনে পাঁচ বিচ্ছু দাঁড়িয়ে আছে। সবাই পাবলিক বাসে করে যাবে। সকলের চোখে মুখেই উত্তেজনা, যেন হঠাৎ একটা ছোটখাটো স্বাধীনতা অর্জন করেছে তারা। কিন্তু তাহিয়া পুরো উল্টে আছে। ছোটবেলা থেকে প্রাইভেট গাড়িতে চড়ে অভস্ত্য। বাসের ভিড়, মানুষের গা ঘেঁষাঘেঁষি করে চলাচল, এসব তার জন্য নতুন। কিছুটা টেনশনে আছে। আবার কিছুটা এক্সাইটেড ও।
বাস এসে থামতেই সবাই উঠে পড়ে। সামনে একপাশের দুইটা সিটে বসে পড়ে ফারিন আর তনিমা। তাদের পেছনের সিটে মেহরীন আর তাহিয়া। রাফি তাদের পেছনে বসেছিল, কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বয়স্ক মহিলার দিকে চোখ পড়তেই সে সঙ্গে সঙ্গে জায়গাটা ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। মহিলা বসেই কৃতজ্ঞ চোখে তাকায়। রাফি মুচকি হাসে। আশেপাশের সকলেই তার কাজ দেখে মমতার চোখে তাকিয়ে আছে। এবার তার দেখাদেখি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরও দু-একজন মহিলাকেও কয়েকজন নিজেদের সিট ছেড়ে দিয়ে বসতে দেয়। রাফি তখন মেহরীনদের সিটের পাশে দাঁড়ায়, এক হাতে হাতল ধরা, আরেক হাতে ব্যাগ।
কিছু কিছু সময় আমাদের খুব ছোট্ট একটি উদ্যোগই অন্যের জন্য বড় পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাফির মতো এমন নিঃশব্দ উদারতার কাজও অন্যদের মধ্যে মানবিকতার বীজ বপণ করতে পারে। বড় কিছু করার জন্য সবসময় বড় সুযোগের অপেক্ষা করতে হয় না। কখনো কখনো সামান্য সৌজন্য, একটু সহানুভূতিও সমাজকে ধীরে ধীরে ভালো দিকে নিয়ে যেতে যথেষ্ট।
আর কে কী করছে, কে কি করছে না সেটা নিয়ে সময় নষ্ট করার বদলে নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করা উচিত। নিজের জায়গা থেকেই করা প্রতিটি ইতিবাচক কাজ শুধু আপনাকে নয়, চারপাশের মানুষকেও অনুপ্রাণিত করে। একটি ছোট্ট উদাহরণও অন্যদের মধ্যে মানবিকতা এবং সহানুভূতির চেতনাকে উজ্জীবিত করতে পারে, যা সমাজকে আরও সমৃদ্ধ ও সুন্দর করে তোলে।
বাস ছাড়ে, আর কিছুদূর যেতেই ঢাকার চিরচেনা জ্যাম। চারপাশে হর্ন, ধোঁয়া, মানুষের গুঞ্জন। কেউ কলেজ শেষে বাড়ি ফিরছে, কেউ আবার কাজের ফাঁকে দুপুরের খাবার খেতে যাচ্ছে। বাসের ভেতরে গরম, মানুষের শরীরের গন্ধ আর রাস্তার ধুলো মিশে অস্বস্তিকর এক পরিবেশ তৈরি করেছে।
এই পরিবেশে যেন তাহিয়ার অস্থিরতা বাড়তে লাগল। সে বারবার জানালার দিকে তাকাচ্ছে, আবার বসার ভঙ্গি বদলাচ্ছে। গন্ধে তার বমি বমি ভাব আসছে। পাশের এক মহিলা তা দেখে বিরক্ত চোখে তাকালেও কিছু বলল না, বাসে এমন দৃশ্য নতুন না।
তাহিয়ার এই অবস্থা চোখ এড়ায় না রাফি আর মেহরীনের। দুজনেই অসহায় চোখে তাকায়। মেয়েটা তো অসুস্থ হয়ে পড়ছে৷ আগে জানলে বাসে উঠতো না। দুজনেই চোখাচোখি করে,
—কিরে কি করব তাহিয়ার যেই অবস্থা কখন জানি বমিই করে দেয়। চল নেমে যাই।
রাফি ভেবে নিয়ে বলল,
—এই জ্যামের মধ্যে নামবি? চল গল্প করি তাহলে হয়তো মাইন্ড ডাইভার্ট হবে। খারাপ লাগবেনা।
—হু তাই করি চল।
তাই তারা হালকা কথাবার্তা শুরু করে, যেন তাহিয়ার মনটা অন্যদিকে ঘুরে। তবে কি কথা বলবে তা কাজের সময় যেন ভেবেই পাচ্ছে না। একজন আরেকজনের মুখের দিকে চেয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এমনি হলে কথার যেন শেষই হয়না আর এখন কথাই পাচ্ছে না।
হঠাৎ রাফি বলে ওঠে,
—তা নাম কি?
মেহরীন উত্তর দিল,
—মেহরীন, তোর?
—আমার নাম রাফি, আর এই লডর-বডর তোর নাম কি?
হঠাৎ এমন প্রশ্নে তাহিয়া একটু চমকে যায়। চোখ বড় বড় হয়ে ওঠে, এ কেমন কথা। তার বন্ধুরা নাকি তার নামই জানে না? কিন্তু তাদের প্রশ্নাত্মক চোখে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকা দেখে মিনমিন করে বলল,
—তাহিয়া…
তারপর ফের সামনের দিকে তাকাতেই সিট থেকে তনিমা আর ফারিন উঁকি দিয়ে নিজেদের নাম বলে। আশপাশের কয়েকজন যাত্রী তখন কৌতূহলী হয়ে তাকাচ্ছে তাদের দিকে। একই কলেজ ড্রেস পড়া ছেলে-মেয়েদের কথায় কিছুটা অবাক।
এরপর রাফি আবার জিজ্ঞেস করে,
—কোন কলেজে পড়িস?
মেহরীন উত্তর দেয়,
—সামনের কলেজে।
তারপর একসঙ্গে সবাই একই কথা বলায় পেছনের এক ভদ্রলোক ভ্রু কুঁচকে কিছুটা আশ্চর্য হয়ে তাকান তার মুখের ভাব এমন যেন চেহারা দিয়েই প্রশ্ন করছে ‘তাহলে এত প্রশ্ন কেন?’।
তবে সেসবে রাফি থামে না আবারও জিজ্ঞেস করল,
—কোন সাবজেক্ট?
আবারও সবাই একই উত্তর দেয়। এবার তাহিয়া আর ধরে রাখতে পারল না নিজেকে, হেসে ওঠল বেচারি। তাদের দুষ্টুমিতে পাশের যাত্রীদের ঠোঁটের কোণেও মুচকি হাসি, কেউ কেউ আবার মনে মনে ভাবছে “পাগল হলো নাকি!”
তাদের এসব ফাইজলামি আর কথাবার্তা চলতেই থাকল। বাসের কেউ কেউ বিরক্ত হচ্ছে তো কেউ কেউ মজাই পাচ্ছে তাদের বাচ্চামোতে। এদিকে তাহিয়া এবার সবার দুষ্টুমি হাসি-ঠাট্টার মধ্যে আর নিজের দিকে খেয়াল দেয়নি তাই তেমন খারাপ ও লাগেনি। সেইসবের মধ্যেই জ্যাম ছাড়িয়ে বাস এসে থামে গন্তব্যে।
বাস থেকে নেমে সবাই এখন পার্কের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। কী কী কিনবে, সেটা নিয়েই চলছে আলোচনা। প্রথমে ঠিক হয়েছিল নিজেরাই রান্না করবে, কিন্তু একটু ভেবে দেখল, রান্নার কোনো আয়োজনই নেই। না আছে পাতিল, না আছে কোনো সরঞ্জাম। শেষমেশ সিদ্ধান্ত হলো, খাবার কিনে এনে এক জায়গায় বসেই খাওয়া হবে। যেই ভাবা, সেই কাজ। সকলের থেকে টাকা উঠিয়ে জমা করে।
তনিমা, মেহরীন আর ফারিন, এই তিনজন রাফি আর তাহিয়াকে নিজেদের ব্যাগ দিয়ে বসিয়ে রেখে সামনের দোকানে চলে যায় খাবার কিনতে।
এদিকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে বসে গল্পগুজব চলছে তাহিয়া আর রাফির মধ্যে। যদিও গল্প করা বললে ভুল হবে, কারণ এখানে গল্প বলছে শুধু রাফি, আর তাহিয়া মন দিয়ে শুনছে।
—কিইই সত্যি বলছিস?
—আরে হো, ছাগল তো ডিম পারে, সেই ডিম থেকেই বাচ্চা হয়।
রাফির কথায় ভীষণ অবাক হয়ে যায় তাহিয়া। একটু ভেবে নিয়ে সে বলে,
—তা তো আমি আজ অব্দি শুনলাম না।
—আরে এসব কেউ বলে নাকি। ছাগল ডিম পারে, এই কথা বললে ছাগলের ডিমে নজর লাগে। আর বাচ্চা হয়না।
রাফির আত্মবিশ্বাসী গলায় বলা কথায় তাহিয়া এবার পুরোপুরি বিশ্বাস করে নেয়। গালে বাম হাত রেখে ঠোঁট উল্টে বলে,
—এই প্রথম জানলাম, আগে কেউ বলেনি আমাকে।
রাফি ভাব নিয়ে উত্তর দেয়,
—আরে মে হু না, সব জানাই দিবো নে।
—কি জানানো হচ্ছে রে?
তাদের কথার মাঝেই তনিমার কণ্ঠ ভেসে আসে। দুজনেই পেছন ফিরে তাকায়। ফিরে এসেছে মেহরীনরা। তাহিয়াদের পাশে বসতে বসতেই তনিমা প্রশ্নটা ছুড়ে দেয়। তাহিয়া কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই রাফি ইশারায় তাকে থামিয়ে দেয়। কানে কানে ফিসফিস করে বলে,
—বলিস না, নজর লাগবে। বেশি মানুষ জানলে সমস্যা।
রাফির কথায় সহজ-সরল তাহিয়া আবারও বিশ্বাস করে চুপ করে যায়। এদিকে রাফির এই কাণ্ডে বাকিরা সবাই সন্দেহের চোখে তাকিয়ে আছে। কী এমন কথা হচ্ছিল যে, ওরা কাউকেই বলছে না। তাদের ছেড়ে গোপন কথা? এটা মানা যায়? খাবারের প্যাকেটগুলো পাশে রেখেই সবাই সাথে সাথে তাহিয়াকে ঘিরে ধরে,
—তাহিয়ার বাচ্চা, বল বলছি, কী বলছিল এই রাফি?
—হ্যাঁ হ্যাঁ, কী ইশারা করল তোকে?
—সত্যি করে বল।
একজনের পর একজন প্রশ্ন করতেই বেচারি তাহিয়া আর কথা চেপে রাখতে পারল না পেটে। সব খুলে বলতে লাগে,
—রাফি বলছিল ছাগল ডিম পারে। আর এইটা বেশি মানুষ জানলে ডিমে নজর লেগে আর বাচ্চা হয় না, তাই আমাকে চুপ থাকতে বলছিল।
তাহিয়ার কথা শুনেই মুহূর্তের মধ্যে সবাই থমথমে মুখ নিয়ে কয়েকসেকেন্ড তাকিয়ে থাকে তাদের দুইটার দিকে। রাফি বলদের মতো জোরপূর্বক হাসার ট্রাই করছে। আর তাহিয়া বেচারি ভীতু চোখে তাকিয়ে তাদের দৃষ্টি দেখে। পরক্ষণেই একসঙ্গে চিৎকার করে ওঠল তিনজন,
—কিইইইইইই…!
হঠাৎ এই চিৎকারে তাহিয়া আরও ভয় পেয়ে কেঁপে ওঠে। আর রাফি দাঁত বের করে আছে। মুহূর্তেই সবার কড়া নজর গিয়ে পড়ে তার দিকে। আবারও মেয়েটাকে বোকা বানিয়েছে এই পাজি। সুযোগ পেলেই তাহিয়াকে নিজের বানানো আজগুবি গল্প শোনায়, আর বোকা তাহিয়া সেগুলো নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করে। মেয়েটার ব্রেইন যেন খুব সহজেই ওয়াশ করা সম্ভব।
মেহরীন রেগে গিয়ে শাসিয়ে ওঠে,
—রাফির বাচ্চা, তুই আবারও আমার ভোলাভালা তাহিয়াটাকে বোকা বানিয়েছিস।
তার কথা শুনে রাফির দাঁত কেলানি আরও গাঢ় হয়। তাকে এমন হাসতে দেখে তাহিয়া চোখ-মুখ কুঁচকে তাকায়,
—কিই! তুই আবারও মিথ্যা বলেছিস? আমাকে বোকা বানিয়েছিস?
রাফির ঠোঁট আরও প্রসারিত হয়। তার এমন বেহায়া হাসি দেখে তাহিয়া রাগে ফুসে ওঠে। নাক ফুলিয়ে বলে,
—আর যদি তোর কোনো কাহিনি শুনেছি, বেয়াদব কথা বলবি না।
তাহিয়ার কথাই সবাই মিটিমিটি হেসে উঠে। তখনই পাশ থেকে একটা কুকুরের ঘেউ ঘেউ ভেসে আসে। সঙ্গে সঙ্গে রাফি সেই সুযোগে সবার দৃষ্টি সেদিকে টেনে নিয়ে বলে,
—দেখ দেখ ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চাটা, ঘেউ ঘেউ করছে…
রাফির কথাটা বলা শেষ হতে না হতেই উচ্চ হাসিতে ভরে ওঠে জায়গাটা। তবে একজন বাদে, আর সে হলো তাহিয়া। সবাই হাসছে, কিন্তু সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, এই কথায় হাসির কী আছে। তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে তার মাথা।
তাকে এমন ভাবুক দেখে ফারিন মাথায় গাট্টা মেরে বলে,
—ওরে লেটলতিফ, ছাগলের বাচ্চা কি ঘেউ ঘেউ করে, না ম্যা-ম্যা করে?
—ম্যা-ম্যা।
—তো রাফি বলেছে, ঘেউ ঘেউ করে।
—ও..
কথাটার মানে বুঝতেই পরক্ষণে তাহিয়াও হেসে ওঠে। এবার তার এই কাণ্ড দেখে সবাই আরও একদফা হেসে ফেলে।
এই হাসি-ঠাট্টার মাঝেই বিরিয়ানির প্যাকেট খুলে তাদের খাওয়া-দাওয়া শুরু হয়। কারো প্লেটে পড়েছে আলু, কারো ভাগে বড় মাংসের পিস, এই নিয়েই শুরু হয় ছোটখাটো অভিযোগ আর ঠাট্টা। কেউ মুখ ভরা খাবার নিয়েই কথা বলছে, কেউ আবার অন্যের প্লেট থেকে চুপিচুপি এক টুকরো তুলে নিচ্ছে। এভাবেই ভাগাভাগি করে চলছে তাদের খাওয়া।
গল্প করতে করতে, আড্ডা দিতে দিতেই খাচ্ছে সবাই। খাওয়ার টেবিল বলতে বাড়ি থেকে আনা একটা চাদর ঘাসের উপর বিছিয়েছে। তার উপরই বসেছে সবাই, কিন্তু তাতেই যেন আনন্দ আরও বেড়ে উঠেছে। রাফি মোবাইল এনেছে খাওয়ার মাঝে বসার মাঝে যখন যা পাচ্চে সে ছবি তুলে রাখছে। বলা তো যায় না একসময় এই মুহুর্ত গুলো আর ফিরে নাও আসতে পারে। পেট ভরতেই হঠাৎ উনো কার্ড বের করে।
—চল, খেলি!
—যে হারবে সে কিন্তু চা আনবে!
বেশ তাদের শর্তের খেলা শুরু। প্রথমে শান্তভাবেই খেলা চলছিল। কিন্তু খেলা মাঝপথে যেতেই তাহিয়ার চোখে পড়ে, রাফি নিজের একটা কার্ড লুকিয়ে, মাঝে রাখা কার্ডগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে রেখে দিচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে সে চেঁচিয়ে ওঠে।
—এই! তুই চিট করছিস!
ব্যস, এতেই শুরু হয়ে যায় তর্ক। একজন আরেকজনের দিকে আঙুল তোলে। কথার লড়াই থেকে মুহূর্তেই ঠেলাঠেলি, মুখে না পারতে শুরু হয় মারামারি। কে কাকে ধরবে, এই নিয়ে হঠাৎ করেই শুরু হয়ে যায় দৌড়াদৌড়ি।
হাসি, চিৎকার, ছুটোছুটি, পুরো পার্কটা যেন কিছুক্ষণের জন্য তাদের দখলে। আশেপাশের লোকজন তাদের দেখছে মনোযোগ দিয়ে। হয়তো তাদের মধ্যে নিজেদের ফেলে আসা মুহুর্তগুলোর এক ঝিলিক দেখছে। অনেকক্ষণ দৌড়ানোর পর সবাই ক্লান্ত হয়ে যে যার জায়গায় বসে পড়ে। কেউ হাঁপাচ্ছে, কেউ হাঁটুতে হাত রেখে বসে আছে। তবে সকলের মুখেই হাসি।
এই ফাঁকে রাফি বলে ওঠে,
—যা আমি মেনে নিয়েছি আমি হেরেক্সহি, তোরা বস। আমি চা আনতেছি।
উঠে চলে যায়, কিছুক্ষণ পর চা নিয়ে হাজির হতেই যে যার কাপে চুমুক দেয়। গরম চায়ের ধোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ক্লান্তিও যেন কিছুটা দূর হচ্ছে। পরিবেশটা হঠাৎ শান্ত হয়ে আসে। সবাই চুপচাপ উপভোগ করতে ব্যস্ত।
ঠিক তখনই রাফি হঠাৎ গলা ছাড়ে,
“পুরো পৃথিবী এক দিকে
আর আমি অন্য দিকে,
সবাই বলে করছ ভুল
আর তোরা বলিস ঠিক…
তোরা ছিলি
তোরা আছিস
জানি তোরাই থাকবি…
বন্ধুওওও… বুঝে আমাকে,
বন্ধু আছে… আর কি লাগে….”
শেষের লাইনগুলোতে কাউকে ডাকতে হয়নি। সবাই একসঙ্গে গলা মিলিয়ে গেয়ে ওঠে। গানের শেষের সঙ্গে সঙ্গে চারপাশটা যেন আরও নীরব হয়ে আসে।
এরমাঝেই মেহরীন এক হাত সামনে বাড়িয়ে দেয়,
—২০২৬ সাল চলে আসছে থাকব তো ওই বছরটাও আমরা সবাই একসাথে?
এক মুহূর্তও দেরি না করে বাকি চারটা হাত এসে মেহরীনের হাতের উপর পড়ে। কারো চোখে হাসি, কারো চোখে হালকা ভেজাভাব। সবাই একসঙ্গে চিল্লিয়ে ওঠে,
—জীবন শেষ হয়ে যাক তবুও আমাদের বন্ধুত্ব শেষ না হোক।
কথাটা শেষ হতেই সবাই হেসে ওঠে। কেউ হাত ছাড়ছে না। কয়েক সেকেন্ডের জন্য পাঁচজনই চুপ, যেন কেউই এই মুহূর্তটা নষ্ট করতে চাচ্ছে না। এই মুহূর্তটা হয়তো ছবি হয়ে থাকবে না, কিন্তু স্মৃতি হয়ে ঠিকই থেকে যাবে। কারণ কিছু মানুষ জীবনের সবসময় পাশে না থাকলেও, মনের ভেতর স্থায়ীভাবে জায়গা করে ঠিকই নেয়। আর বন্ধুত্বগুলোও ঠিক এমনই। প্রতিদিনের সঙ্গী একসময় ভীষণ পর হয়ে যায় দূরত্বের দিক দিয়ে। একেকজন একেক জায়গায় নিজেদের লাইফ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। তবে আপন হয়ে থেকে যাবে এই সুন্দর সময়গুলো।
হঠাৎ পাশ থেকে কারো তীব্র কান্নার শব্দ ভেসে আসতেই সবাই চমকে ওঠে। একে একে সব হাত সরে যায়।
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪০
—কে রে কাঁদছে?
মেহরীন প্রশ্ন করতেই রাফি বলে,
—দাঁড়া তোরা, আমি দেখে আসি।
সে একা যেতে চাইলে বাকিরাও উঠে দাঁড়ায়,
—দাঁড়া, আমরাও যাবো ওই সাইডটা নির্জন তোর একা যাওয়া উচিত হবে না।
সবাই কান্নার শব্দ অনুসরণ করে এগিয়ে যায়। কিছুদূর যেতেই তারা দেখতে পায়….
