Home The Silent Manor The Silent Manor part 73

The Silent Manor part 73

The Silent Manor part 73
Dayna Imrose lucky

শালুক বুলবুল এর দিকে ঘুরে বললেন “আমি তোকে পাপ করতে বলেছিলাম, কিন্তু সে-ই পাপ পূর্ণ হয়নি। তবে মীর কেন দুনিয়া ছেড়ে গেল’ উনার কণ্ঠে আফসোস এর সুর।
‘আপনি হুকুম দিয়েছিলেন, কিন্তু ভাগ্যক্রমে তা পূর্ণ হয়নি।মীর দাদা বাবুর হয়ত আয়ু ছিল ওই পর্যন্তই।”
শালুক দু কদম পা ফেলে চুলার কাছে এগোলেন “মোহিনী কে মারিসনি! আমি শুনে খুশিই হয়েছিলাম। কিন্তু, ওঁরা যাবে কোথায়!”

“মালকিন” ভার কণ্ঠ বুলবুল এর। শালুক এর ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সাবধানতার সাথে চারদিকে তাকাল। “মায়া আপার বান্ধবী,মানে ঐ যে গৌরী! তাঁকেও কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।আহির দাদাবাবু আমার কাছে জিজ্ঞেস করেছিল।আমি গৌরীদের বাড়িতে গিয়েও খোঁজ নিয়েছি!সে বাড়িতেও যায়নি।আমার প্রশ্ন হচ্ছে, মেয়েটা না বলে কোথায় যাবে!”
শালুক ভ্রুযুগল ভাঁজ করে বুলবুল এর দিকে একবার, একবার রান্নাঘরের ছোট্ট জানালা দিয়ে দূরে তাকালেন। গভীর ভাবনার সমুদ্র দেশের অতলে তলিয়ে গেলেন। তাঁর চোখ দুটি অপলকে চেয়ে আছে।তা দেখে বুলবুল বলল “মালকিন,কি ভাবছেন!’
“ভাবছি ওঁরা কোথায় যাবে। কাউকে কিছু না বলে!”
“চিন্তার বিষয়”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

রাতের আঁধারে চাঁদনির উল্ককিতর আলোটা বেশ চকচক করছে।শীত পাড় হয়ে গরমের আগমন।আর এই সময়ে শীত ও গরম যেন মাঝামাঝি সময়ে বসবাস করে। কিছুটা গরমের উষ্ণতা কিছুটা শীতের কুয়াশা।
সন্ধ্যা থেকে বাতাস ছিল আজ।এখনো বাতাস বইছে। গাছের পাতাগুলো চিরিচিরি শব্দ করছে। ওঁরা যেন জানান দিচ্ছে,ওরা উপস্থিত।

আহির পথের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে।ক্ষেতের দিকে তাঁর দৃষ্টি। তাঁর পাশে একটা বড় গাছ।আহির চোখ বুলায় গাছটির দিকে।তাকাতে তাকাতে গাছের চূড়ায় তাকাল। দৃষ্টি তাঁর গাছের দিকে হলেও ভাবছে অন্যকিছু।
রাফিদ তাঁর থেকে কিছুটা দূরে বসে আছে একটা হেলে পড়া গাছের উপর।হাতে সিগারেট। সিগারেট সে-ই কখন থেকে টেনেই যাচ্ছে টেনেই যাচ্ছে। মিনিট কয়েক আগে দু’জন মিলে মীর এর কব’রের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রার্থনা করেছিল। তাঁদের বন্ধু-ভাই ভালো থাকুক।
আহির চোখ সরিয়ে রাফিদ এর দিকে একবার তাকাল। ভীষণ উদাসীনতার সাথে বসে আছে। তাৎক্ষণিক চোখ সরিয়ে গাছের পাতাগুলো দেখছে।মনে হচ্ছে, এখানে যেন কেউ লুকিয়ে আছে।আহির তাঁকেই খুঁজছে।
আশেপাশের প্রকৃতির সবটা জুড়ে হঠাৎ করে এক ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে যেন। তাঁরা ব্যতীত এমন নির্জনতার মাঝে অন্যকেউ থাকলে নির্ঘাত ভয় পেত।

বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন শালুক। মায়াকে নিয়ে এসেছেন। সারাদিন ঘরের মধ্যে বসে থাকে। ডাঃ বলেছে,মায়া যেন একনাগাড়ে বন্ধ করে বসেই না থাকে।মায়া আসতে চায়নি।শালুক জোড় করে এনেছেন।তবু এসেও মায়ার উন্নতি হল না। ছাদের সে-ই পাশে দাঁড়িয়ে আছে,যেখান থেকে কবরে শায়িত মীর কে দেখা যায়।শালুক কিছু বলছেন না। তাঁর চোখ পড়ে বাড়ির সামনের পথের দিকে। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আহির কে। দু’চোখ উনার রাফিদকেও খুঁজল।পেলেন তাঁকেও।

আহির নিষ্পলকে তাকিয়ে আছে দূরপানে। রাফিদ নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে বসে আছে। শালুক কখনো তাকান পথের দিকে, কখনো তাকান মায়ার দিকে।চোখ জোড়া স্তব্ধ হয়ে গেল। বুকের ভেতর ঠুকরে উঠল।মনে পড়ে মীর এর কথা। তার কথা মনে পড়তেই তাঁর অন্তরটা কাঁদে। জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যায়। তাঁরও কষ্ট হয়।খুব।তবে তিনি তা, ভাষায় অভিব্যক্তিকে প্রকাশ করতে পারেন না। চুপে চুপে ব্যথা গুলো শুধু ঘুরে বেড়ায় তাঁর চারপাশে।
শালুক মায়ার সন্নিকটে এসে দাঁড়াল। বিয়ের আগের দিন মায়া বলেছিল মীর কে কেউ তীর ছুড়েছে। স্বল্প রক্ত ঝড়েছে। শালুক আঁতকে উঠেছিল এমনটি শুনে। জিজ্ঞেস করেছিলেন কে সে!মায়া প্রত্যুত্তরে বলেছিল, হবে হয়ত কেউ।যে অন্য কাউকে ভেবে মীর কে তীর ছুড়েছে।সে নিশ্চিত ছিল। শালুক ও নিশ্চিত ছিলেন। কেননা,মীর এর এখানে কোন শত্রু থাকবে না,এটাই কি স্বাভাবিক নয়!

শালুক কিছু সময়ের জন্য নিজেকে গর্দুভ ধরে নিলেন।মীর এর শত্রু নেই তো কি হয়েছে, তাঁদের আছে।কেউ না কেউ ঠিক মীর এর ক্ষতি করতেই পারেন। শালুক তখন পদক্ষেপ নিলেন না কোন!হয়ত মীর এর মৃত্যু এভাবেই লেখা ছিল। শালুক চোখের জল মুছে নিজের ভাগ্যকে মেনে নিলেন।মেনে নিলেন, নিজের মেয়ে ও মীর এর ভাগ্যরেখা কে।হয়ত এটাই হওয়ার কথা ছিল।
শালুক মায়াকে স্পর্শ করলেন। জিজ্ঞেস করবেন মীর কে যে তীর ছুড়েছে তাঁকে তাঁরা দেখেছিল কিনা।সে কি সম্রাট নিষাদ এর কেউ ছিল!নাকি অন্যকেউ! হঠাৎ শালুক এর ভেতরে অতিতেত একটি অধ্যায় জাগ্রত হল।মায়া শালুক এর স্পর্শে ঘুরে তাকাল মায়ের দিকে। শালুক ধীরস্থির কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন “তোদের বিয়ের আগের দিন,জঙ্গলে গিয়েছিলি। সেখানে কেউ একজন মীর কে তীর ছুড়েছিল,সে কে ছিল! তাঁকে দেখেছিলিস!আপছা ভাবেও অন্তত দেখেছিলিস!””

মায়া দৃষ্টি নত করে ফেলল। এরপর মাথা নাড়াল সে দেখেনি। শালুক দৃষ্টি সরিয়ে ফেললেন।মায়া ফের শালুক কে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ইশারায় বোঝাল ‘হয়ত মীর কে ওদিন সম্রাট নিষাদ এর কেউই খু’ন করতে চেয়েছিল।সেদিন তাদের উদ্দেশ্য বেফলে গিয়েছে বলেই পড়ে বি’ষ দেয়ার পরিকল্পনা করে।’
শালুক মায়ার রেশ টেনে বললেন “হয়ত তোর ধারণায় সঠিক।”

২৪ ঘন্টা কেটে গেল।আহির ও রাফিদ যেন বেসামাল ঘূর্ণিপাকে জড়িয়ে পড়েছে। রাফিদ গতকাল শহরে যায়‌। এবং আহির ও। গৌরী ও মোহিনী’রা যেসব জায়গায় যেতে পারে বলে ধারণা করল সেসব জায়গায় গেল। কিন্তু তাঁদের কোন হদিস পেল না।
আহির বিষাক্ত মনে বসে আছে। রাফিদ পাশে বসে সিগারেট ফুঁকছিল। অর্ধেক টেনে বাকিটা এশট্রেতে রেখে দিয়েছে।আহির দু হাতে মুখের ভর দিয়ে কিছু ভাবছিল। মিনিট পাঁচেক পর তাঁর ভাবনা বিদায় নেয়।সে মুখ তুলে তাকায়।ভারী একটা দম ছেড়ে বলল “জানি না গৌরী কোথায়! তবে এতটুকু নিশ্চিত, আমি আমার ভালোবাসা হারিয়ে ফেলেছি। এতটুকু জীবনে কমতি ছিলনা কিছুর! কিন্তু আজ যেন মনে হচ্ছে,সব থেকেও কিছু একটা নেই। শূন্যতা আমায় ঘিরে ধরেছে।” থেমে আবার বলল “শূন্যতা ঘিরেই বাঁচতে চাই।তবু গৌরী কে দেয়া স্থানটি কখনো অন্য কারো হবে না। বিষাদময় জীবনে শূন্যতাই একমাত্র পরিচয়।”

আহির থেমে গেল। রাফিদ কিছুই বলছে না।আহির কোন ভুল বলছে না।সে ঠিকই বলেছে।ঠিক আহির এর মতই যেন, তাঁরও শূন্যতা ঘেরা জীবনে পা পড়েছে।
আহির নীরব কণ্ঠে বলল “চল! সিন্ধুতলি গ্রাম থেকে একবার ঘুরে আসি। শেষবার সেই ছদ্মবেশী অমর বাঁশিওয়ালা ওরফে সুফিয়ান হায়দার এর বাড়িটি দেখে আসি। ফিরে এসে চিরদিনের জন্য আলিমনগর ছেড়ে দেব।”
“হঠাৎ সেদিকে যাবি!” রাফিদ সবে শব্দ উচ্চারণ করল।
“ সুফিয়ান হায়দার – সেতো শতশত মানুষ এর মনে বেঁচে আছে। তাঁর খোঁজে এখনো কত মানুষ আসে! তাঁর সমাধিখানা দেখতে। ভাবতেই অবাক লাগে, মানুষটি দুনিয়ার বুকে নেই। শেষ একবার আমিও তাঁর সমাধিফলকটি দর্শন করতে চাই।”
“জীবন বড়ই বিচিত্রময়! বেঁচে থাকতে আমরা একজনকে মূল্য দেই না! কিন্তু সে মরে গেলে কত আক্ষেপ, আফসোস জমা করি।”

পড়ে থাকা হায়দার বাঁড়ি আজ নিস্তব্ধ।এতটাই নিস্তব্ধতায় ছেঁয়ে গেছে যেন,বাড়ির ভেতরে পা রাখতেই নিজের বুকের ধুকধুক শব্দ ভেসে আসাটা স্পষ্ট শোনা গেল। রাফিদ চারদিকে তাকিয়ে চাপা নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।যখন প্রথমবার এ বাড়িতে আসে, তখন মীর তাঁদের সাথে ছিল।আজ আর মানুষটি নেই। তাঁদের থেকে বহুদূরে চলে গেছে।
আহির বাড়িটির দিকে তাকাল। রাফিদ বলল “তোর হঠাৎ এখানে আসার উদ্দেশ্যটা ঠিক বুঝলাম না।”
“বললাম তো, শেষবারের মত দেখতে এসেছি।হয়ত এরপর আর সুযোগ হবে না।”
পর্যটক গাইড এলেন। তিনি লম্বা সুরে সালাম দিলেন।আহির জবাব দিল। তাঁদের দেখে গাইড চিনতে পেরেছেন।আহির মৃদু হেসে বলল “সুফিয়ান হায়দার ও তাঁর পরিবারের সবার কব’রটি জিয়ারত করব।” গাইড নিয়ে গেলেন কবরের দিকে।আহির ধীর পায়ে হেঁটে এগোলো।

কবরের স্থানটি পরিষ্কার করে রাখা হয়েছে।জঙ্গল- লতাপাতা শীঘ্রই সাফ করেছে।আহির এর দু’চোখে জল জমে।জলটুকু গড়িয়ে পড়ার আগেই মুছে ফেলল। এরপর জিয়ারত এর জন্য প্রস্তুত হয়।
বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে আহির ও রাফিদ সুফিয়ান হায়দার এর কব’রটি জিয়ারত করল।সবার জন্য দোয়া করল। তাঁদের ভুল, অন্যায় এর জন্য মাফ চাইল। অতঃপর হাঁটে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করার জন্য।ঘরের সামনে একজন বয়স্ক লোক বসা ছিলেন। তিনি অসহায় এর মত তাকায় আহির এর দিকে।যেন তিনি কিছু বলতে চান।আহির উনার অভিব্যক্তি কে তোয়াক্কা করল না।ঘরটির সামনে দাঁড়িয়ে ঘার পেছনে ঘুরিয়ে বাড়িটির চারপাশে তাকাল।এর আগে যখন তাঁরা এসেছিল তখন অনেক মানুষজন ছিল। অনেকে দেখতে এসেছিল সুফিয়ান হায়দার এর বাড়িটি। ছুঁতে চেয়েছিল তাঁর বাঁশিটি।হয়ে ওঠেনি বোধহয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল,আজ আর কেউ নেই তারা ব্যতীত।হয়ত সুফিয়ান হায়দার এর রেশ কেটে গেছে তাঁদের মধ্যে থেকে।
আহির ঘন দম ছেড়ে সামনে এগোয়। পর্যটক গাইড বললেন “বাইরে কি দেখলেন!আজ শুক্রবার!ভুলে গেছেন হয়ত। আজকের দিনে এখানে কেউ আসে না। কাউকে আজকের দিনে ঠুকতে দেয়া হয় না এখানে।”

“কেন!” রাফিদ জিজ্ঞেস করল।
“তেমন কোন কারণ নেই। প্রসাশন থেকেই এই নিয়ম।”
“তবে আমাদের যে ঠুকতে দিলেন!” আহির জিজ্ঞেস করল।
পর্যটক হেঁসে বললেন “আমি জানতে পেরেছি! সুফিয়ান হায়দার এর আত্মীয় আপনারা।তাই দায়িত্বের বাইরে এসেও আপনাদের ভেতরে ঠুকতে দিয়েছি।আসুন!” বলে সে আগে আগে হাঁটতে শুরু কররেন।আহির ভাবছে, তাঁর ধারণা ভুল প্রমাণিত হল। সুফিয়ান হায়দার ওরফে রাখাল বাঁশিওয়ালাকে মানুষ এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেছে কিভাবে!ভুলে যায়নি।হয়ত ভোলা অসম্ভব। তাঁর কৃতকর্ম তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে। একটা গ্রাম! শতশত গ্রাম বাসীদের বাঁচাতে নিজের হাতে নিজের প্রাণপ্রিয় ভালোবাসার মানুষটিকে হ’ত্যা করেছে। ক’জন পারে এমন!
আহির ও রাফিদ আসল সে-ই ঘরটিতে। যেখানে সুফিয়ান হায়দার কিছু পেইন্টিং করে রেখেছিল। গাইড পেইন্টিং গুলো থেকে সাদা কাপড় গুলো সরিয়ে দিলেন। সাদা ধুলো উড়ে গেল। রাফিদ একটা চেয়ারে বসে।আহির নির্বিকার ভঙ্গিতে শুরু থেকে সবকটি পেইন্টিং গুলোয় স্পর্শ করে। প্রতিটি অঙ্কন যেন জীবন্ত।মনে হচ্ছে যেন ডাকলেই সাড়া পাওয়া যাবে।

রাফিদ বলল “আচ্ছা, সুফিয়ান হায়দার কি করে আগাম বার্তা পেয়েছিল! মানে,সে কিভাবে জানতে পেরেছিল,যে তাঁর সাথে ভবিষ্যতে কি হবে!তুই তো গোয়েন্দা,তোর কি বলে ধারণা হয়?”
আহির জবাবের প্রথমে ঠোট বাঁকিয়ে এক রহস্যময় হাঁসি দিল নিঃশব্দে। এরপর পেইন্টিং গুলোর দিকে চেয়ে বলল “কোএন্চিডেন্স! অর্থাৎ সমাপতন বা কাকতালীয় মীল।সে হয়ত নিজের ভাবনা গুলোকে অঙ্কনের মাধ্যমে রুপ দিয়েছিল। কিন্তু তাকদির! তাকদির তাঁকে তাঁর সে-ই ভাবনা গুলোকেই বাস্তবে রুপ দিয়েছে। তাঁকে শূন্য করেছে, বিপাকে ফেলেছে,এতিম করেছে, সবশেষ তাঁকে গুলিবিদ্ধ হয়ে হয়ে মরতে হয়েছে! এখানে অন্যতম কোন কারণ নেই।” বক্তব্য শেষে আহির নির্বাক পায়ে হেঁটে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। দমকা হাওয়া বয়ে আসল। তাঁর শীতল মনটাকে আরো শীতল করে তুলল। জানালা থেকে ফিরে এসে পায়চারি করতে করতে বলল “তাঁর বোন বিন্তি সেদিন কি বলতে চেয়েছিল!তা যে আজও অজানা। সুফিয়ান হায়দার তাঁর জন্মদিনে কোন সত্য বলতে চেয়েছিল! কেউ কি জানে সে-ই অপ্রকাশিত কথা গুলো!”

গাইড বললেন “না!কে জানবেন,কেউ নেই। শুধু তাঁরাই জানতেন।”
রাফিদ পূর্বের স্বরেই বলল “তাঁর বাঁশিটি কে চুরি করেছে!এখনো কে আড়ালে লুকিয়ে বাঁশি বাজায়!”
আহির থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাকাল একটি অঙ্কনের দিকে।গাইড চাপা স্বরে বললেন “হয়ত সেই অচেনা বাঁশিওয়ালা‌। যাকে এখনো কেউ দেখেনি। যদি ভাগ্যে থাকে তবে আমরা দেখতেও পারি।তবে যাঁকে এখন পর্যন্ত কেউ দেখেনি, তাঁকে কি আমরা দেখতে পারব! সে-ই সৌভাগ্য কি হবে!”
আহির বলল “মানে, অচেনা বাঁশিওয়ালা কে!’
কিছুটা আশ্চর্য খানিকটা বিভ্রান্ত এর সাথে বলল।
গাইড বললেন “গত বারো বছর ধরেই এক অচেনা বাঁশিওয়ালার কথা শুনছি। তবে আজ পর্যন্ত কেউ তাঁকে দেখেনি।”
আহির বলল “জীবনে তো কাকতালীয় ভাবে কত কি হয়, আমরা যেন উনাকে দেখতে পারি।উনার দর্শন একবার চাই।”

সন্ধ্যা নামার পূর্বে আহির ও রাফিদ আলিমনগর এর উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়ে। অশ্বের পৃষ্ঠায় চেপে বসা তাঁরা। রাফিদ ও আহির পাশাপাশি। রাফিদ আহির কে লক্ষ্য করে বলল “তুই বারবার তখন শেষবার শেষবার কেন বলেছিলি!”
“চলে যাব আগামীকাল আলিমনগর থেকে।হয়ত এরপর আর তোদের সাথে দেখা হবে না। ভালো থাকবি সবসময়। মোহিনী যদি তোর ভাগ্যে থাকে হয়ত ঘুরেফিরে আবার আসবে ঠিক তোর সন্নিকটে‌।মায়ার দিকে খেয়াল রাখবি।মীর কে হারিয়ে মেয়েটি পা’গলপ্রায়।বলতে গেলে ও এখন পাগল।তোর মা বাবার মন মানসিকতা ভাল নেই।হয়ত আর ভালো হওয়ার নয়।এই মুহূর্তে তোর উচিত তাঁদের পাশে থাকা। মায়াকে আগলে রাখা। থমাস আঙ্কেল কে থাইল্যান্ডে পাঠিয়ে দিস। কাজেকর্মে থাকলে ছেলের শোক কয়েক মুহুর্তের জন্য হলেও ভুলে থাকবে। তৃষ্ণা, কাকিমা,দাদু তাঁদের যত্ন নিস।” আহির থেমে আড়ালে চোখ মুছে।ফের বলল “অনেকটা সময় তোদের সাথে কাটিয়েছি। কতশত স্মৃতি জমেছে। জমেছে শূন্যতা। বন্ধুকে হারালাম। নিজের প্রিয় মানুষটিকে পেয়েও হারিয়ে ফেললাম। আমার আর কোন চাওয়া পাওয়া নেই। শুধু চাই, প্রিয় মানুষ গুলো যেখানে থাকুক ভালো থাকুক।”

রাফিদ এর অন্তর টা বিষিয়ে উঠল।সব যেন হঠাৎ করে ফাঁকা ফাঁকা লাগতে শুরু করেছে।প্রিয় মানুষ হারানো আর কোনো বন্ধু চিরদিনের জন্য দূরে চলে যাওয়া—এই দুই অনুভূতি নিঃশব্দে মানুষকে ভেঙে দেয়। বাইরে থেকে জীবন স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে যেন কিছু একটা স্থায়ীভাবে ফাঁকা হয়ে যায়। যাকে হারানো হয়, তার উপস্থিতির অভ্যাসটা সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।হঠাৎ করে আর বন্ধু ডাক আসে না, আর কেউ খোঁজ নেয় না, আগের মতো হাসি ভাগ করে নেওয়া যায় না। স্মৃতিগুলো তখন আশ্রয়ও হয়, আবার যন্ত্রণার উৎসও।
বন্ধু দূরে চলে গেলে কষ্টটা একটু আলাদা। সে বেঁচে আছে জেনেও তাকে পাওয়া যায় না,এই বোধটা হৃদয়কে আরও ভারী করে তোলে। কথা জমে থাকে, বলা হয় না। অনেক কথা জমে থাকে।“যদি” আর “হয়তো” মনে এসব শব্দ আকাঙ্ক্ষা গুলো ঘুরপাক খায়। একসময় বোঝা যায়, কিছু মানুষ সময়ের সঙ্গেই থেকে যায়, আর কিছু মানুষ স্মৃতির ভেতর।
এই শূন্যতা ধীরে ধীরে মানুষকে সংযত করে, গভীর করে তোলে। কষ্টগুলো পুরোপুরি যায় না, শুধু মানুষ সেটা নিয়ে বাঁচতে শিখে যায়। হারানোর ব্যথা গুলোও যেন সয়ে যায়।

একদিকে আহির চলে যাবে। অন্যদিকে মীর হারিয়ে গেছে দুনিয়া থেকে।ক্ষনস্থায়ী জীবন থেকে সে বিদায় নিয়েছে। মোহিনী কোথাও গায়েব।বলে কেউ চলে গেলেও হৃদয় কে একটু শান্তি দেয়া যায়, অন্তত সে বলে চলে গেছে।বলে যাওয়ার থেকে না বলে হারিয়ে যাওয়াটা যে বড্ড কষ্টের। যন্ত্র’নার।

The Silent Manor part 72

একই ভাবে চলে গেছ গৌরী।পেয়ে,পূর্ণতা মিলিয়েও ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে মায়া। থমাস শন হারালেন সন্তান। আমজাদ চৌধুরী প্রিয় মেয়েকে চোখের সামনে পাগল হতে দেখছেন।তাঁর মেয়ে একটুআধটু করে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাঁর সইছে না যে আর।
সবশেষে সবাই এক শূন্যতার জালে ঘেরাও।যে জাল থেকে ছুটে আসা, অসম্ভব!
“আজ হাসানোর মানুষটা নেই, শুধু রয়ে গেছে তার রেখে যাওয়া সেই পুরনো হাসিমাখা স্মৃতিগুলো।”

The Silent Manor part 74