Naar e Ishq part 22
তুরঙ্গনা
কাহসান কুঞ্জের অভিশপ্ত কক্ষের ভেতরে,জোছনার ম্লান আলোটুকু কেবল এক বীভৎস দৃশ্যপটের নীরব সাক্ষী হয়ে রইল। আরশিয়ার সমস্ত আর্তনাদ, তার শরীরের শেষবিন্দু দিয়ে করা প্রতিরোধ—সবই সেই চারজন নরপিশাচের অট্টহাসি আর আদিম লালসার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল।একটা সময় জাভিয়ান ঘরের কোণে মুখ লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও, তার মৌন সম্মতিই ছিল এই পৈশাচিকতার সবচেয়ে বড় অনুঘটক।
একে একে সেই তিনজন আরশিয়ার মানবিকতাকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলল। রাতের নিস্তব্ধ প্রহরে আরশিয়া মেহেরের আত্মা যেন তার দেহ ছেড়ে কোনো এক অজানা অন্ধকারে চিরতরে বিলীন হয়ে যেতে চাইল।
ভোরের আলো ফোটার আগেই সেই ছায়ামূর্তিগুলো ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। পেছনে ফেলে গেল এক বিধ্বস্ত, প্রাণহীন প্রায় অস্তিত্বকে।
কিন্তু এই চরম লাঞ্ছনা আর পাশবিক আঘাত আরশিয়ার মস্তিষ্কে যে পরিবর্তন আনল, তা ছিল আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। সে রাতেই আরশিয়া মেহের তলিয়ে গেল এক নিশ্ছিদ্র মানসিক অন্ধকারে, যেখান থেকে ফেরার পথ তার জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।
আরশিয়া মেহেরের এই আকস্মিক মানসিক বিকৃতি বা পাগলামি কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি একটি অত্যন্ত জটিল ও যৌক্তিক পর্যায়। সে যে অবস্থায় উপনীত হলো, তাকে বলা হয় সাইকোটিক ব্রেক। যার পেছনে কাজ করেছে তিনটি প্রধান মনস্তাত্ত্বিক ও জৈবিক কারণ।
আরশিয়া গত কয়েক মাস ধরে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। স্বামী হারানো, সামাজিক অপবাদ এবং গর্ভাবস্থার শারীরিক পরিবর্তন তার মস্তিষ্ককে আগে থেকেই নাজুক করে রেখেছিল। সেই রাতে যখন সে চরম শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনার শিকার হলো, তখন তার মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা…যা ভয় ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে—অত্যধিক সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে তার শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন হরমোনের তীব্র প্লাবন বয়ে যায়। এই হরমোনের আধিক্য মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস বা যুক্তি ও স্মৃতি নিয়ন্ত্রণকারী অংশকে সাময়িকভাবে অকেজো করে দেয়। একে বলা হয় নিউরাল শাটডাউন। এমনিতেও আরশিয়া খুব বেশি প্রখর মানসিক ক্ষমতাসম্পন্ন নারী ছিল না। পারস্য হতে আসা কেবল এক নমনীয় সুন্দরী নারীই ছিল সে। যার ব্যক্তিত্বের সেই অধিকতর নমনীয়তা সুহিনের মাঝেও স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে।
যখন কোনো মানুষের ওপর এমন ভয়াবহ অত্যাচার চলে যা সহ্য করা তার মস্তিষ্কের ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন মস্তিষ্ক নিজেকে বাঁচাতে এক অদ্ভুত প্রতিরক্ষা কবচ বেছে নেয়। যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় ডিসোসিয়েশন। আরশিয়ার মন নিজেকে তার শরীর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলে। সে নিজের চারপাশে এক কাল্পনিক দেয়াল তুলে দিয়েছিল, যাতে বাইরের কোনো স্পর্শ বা বেদনা তাকে আর নতুন করে আঘাত করতে না পারে। সে হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত জড়বস্তু, যার চোখ খোলা থাকলেও দেখার ক্ষমতা নেই, আর কান থাকলেও শোনার বোধ নেই।
মেহেরের এই অবস্থাটি পরবর্তীতে ক্যাটালিপটিক স্টুপর এর দিকে মোড় নেয়। হরমোনের চরম ভারসাম্যহীনতার কারণে সে বাস্তব জগতকে একটি হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করল। এর ফলেই সে নিজের সন্তান সুহিনকেও সহ্য করতে পারত না এবং অন্ধকার ঘরে একা থাকার প্রবণতা তৈরি হলো। এটি ছিল তার মস্তিষ্কের একটি বিফল সুরক্ষা কবচ, যা তাকে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক কাল্পনিক শান্তিতে ডুবিয়ে দিয়েছিল।
পরদিন সকাল হলো, কিন্তু আরশিয়া মেহেরের জগতে আর কোনোদিন সূর্য উঠল না। সে ঘরের কোণে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে রইল। তার চোখ দুটি খোলা থাকলেও তাতে প্রাণের কোনো স্পন্দন ছিল না। সে এখন এমন এক রাজ্যের বাসিন্দা, যেখানে কোনো জাভিয়ান নেই, কোনো লোকলজ্জা নেই, এমনকি কোনো মাতৃত্বের দায়ও নেই। সে নিজের ভেতরে নিজেই নিখোঁজ হয়ে গেল।
কাহসান কুঞ্জের সেই অভিশপ্ত রাতের বীভৎসতা ধামাচাপা দিতে জাভিয়ানদের খুব একটা বেগ পেতে হলো না। শাহমীর কাহসানের মৃত্যুর পর হতে সবকিছু অচিরেই বিধ্বস্ত রূপে ধারণ করেছিল। আর এই ঘটনার পর, জাভিয়ান সবার আগে বাড়ির থেকে অধিকাংশ গার্ড-মেডকে তাড়িয়ে দিল। তার মতে,বাড়িতে অপ্রয়োজনে এতো মানুষজনের কোনো প্রয়োজন নেই। এতে করে আর যাই হোক, এলাকার উচ্চবিত্ত এই কাহসান পরিবারের ভেতরকার নিত্যদিনের ঘটনাগুলো চারপাশের তথাকথিত মানুষের গল্পের আসরে প্রয়োজনীয় যোগান দিতে ব্যর্থ হলো। এতে করে লোকজন নিজেদের মতোই গল্প সাজাতো,মতামত দিতো,সর্বশেষ একবাক্যে নিজেদের আলোচনা শেষ করত—‘এসব বড়লোকদের ব্যাপার-স্যাপার, আমাদের এসব ঘেঁটে আর লাভ কি?’, অথচ পরদিন আবারও তাদের গল্পের আসরে ঠিক এই পরিবারটিকে নিয়েই সমাচার হতো।
অথচ ক্ষমতার দাপট আর অর্থের জোরে পৈশাচিকতাকে আড়াল করা সহজ, কিন্তু যে ক্ষত আরশিয়া মেহেরের মনে গেঁথে গিয়েছিল, তা মুছে ফেলার সাধ্য কারো ছিল না। দিন যায়, মাস ঘোরে; কিন্তু কাহসান কুঞ্জের চারদেয়াল এখন এক জীবন্ত মৃত্যুপুরী। বিশাল অট্টালিকার জাঁকজমক ফিকে হয়ে এসেছে, বাগানে ঘাস জমেছে, করিডোরগুলো ধুলোয় ধূসর। বাড়ির ভেতরে মানুষ থাকলেও বাড়িটা যেন এক পরিত্যক্ত ধ্বংসাবশেষে পরিণত হলো।
ছোট্ট সুহিন এই নিস্তব্ধতায় সবচেয়ে বেশি অসহায়। সে মাঝেমধ্যে মায়ের ঘরের বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু ভেতরে যাওয়ার সাহস পায় না। তার মা তখন এক অচেনা মানবী। অন্ধকার ঘরে একা পড়ে থাকা মায়ের খোঁজ নিতে কেউ আসে না; এই ভাবনাতেই যেন তার সবচেয়ে বড় কষ্ট। সুহিন নিজের পুরনো টেডি বিয়ারটা বুকে চেপে ধরে একা একা করিডোর দিয়ে হেঁটে বেড়ায়। তার চোখের সামনে তার সাজানো জগতটা ক্রমশই ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে,অথচ সে বোকার মতো কিছুই করতে পারছে না।
এদিকে আরশিয়া মেহেরের মাঝে এক আমূল পরিবর্তন এসেছে। সে এখন নিজের জগতের এক নিঃসঙ্গ সম্রাজ্ঞী। নিজের যত্ন নেওয়া বা বেঁচে থাকার কোনো দায়ভার তার নেই। রাত যখন গভীর হয়, যখন পুরো শহর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন আরশিয়া নিঃশব্দে ছাদে চলে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধীর পায়ে সে এলোমেলো শাড়িতে ছাদের ওপর হেঁটে বেড়ায়, যেন কোনো এক অশরীরী ছায়া নিজের হারানো অস্তিত্ব খুঁজে ফিরছে। কেউ তার দিকে নজর দেওয়ারও প্রয়োজনবোধ করছে না।
ভয়ানক সেই ঘটনার ঠিক দুদিন পরের কথা। এক নিশুতি পূর্ণিমার রাত। আকাশের চাঁদটা আজ যেন অস্বাভাবিকভাবে বড় আর রক্তিম। বাড়ির সামনে দু-একজন ঝিমোনো বডিগার্ড ছাড়া সবাই তখন গভীর ঘুমে মগ্ন। কিন্তু কেকের চোখে ঘুম নেই। অসহ্য যন্ত্রণায় তার মস্তিষ্ক যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। মাদকের বিষাক্ত প্রভাবে তার হাত-পা আর মেরুদণ্ড ধনুষ্টঙ্কারের ন্যায় বেঁকে আসছে। সে নিজের বারান্দার মেঝেতে বসে হাঁসফাঁস করছে, ফুসফুস দিয়ে বাতাস টানার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
বিকৃত হতে থাকা মস্তিষ্কেও কেকে এক অদ্ভুত হিসেব মেলানোর চেষ্টা করছে। সে বুঝতে পারছে, তার এই পতন কেবল নেশার জন্য নয়। কেউ একজন আড়ালে থেকে তাকে সুক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, তাকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে। এই সন্দেহ আর যন্ত্রণার মাঝেই হঠাৎ তার নজর পড়ল বাগানের দিকে।
ম্লান জ্যোৎস্নায় সে দেখল, লাল শাড়ি পরে নতুন বউয়ের মতো সেজেগুজে এক নারী বাগানের ঝোপঝাড় মাড়িয়ে সুইমিংপুলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই গভীর রাতে এমন সাজে কে হতে পারে? কেকের মাতাল মস্তিষ্ক তীব্র এক ঝাঁকুনি খেল। সে অস্ফুট স্বরে ধমকের সুরে ডাকল,
“হেই, কে ওখানে? এত রাতে ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন?”
নারীটি ফিরে তাকাল না। তার লাল শাড়ির আঁচল ঘাসের ওপর দিয়ে সর্পিল গতিতে এগিয়ে যেতে লাগল। কেকে ভাবল গিয়ে থামাবে, কিন্তু তার শরীর তখন অকেজো। পরক্ষণেই এক অজ্ঞাত আশঙ্কায় সে বিরক্ত নিয়েই, দাঁতে দাঁত চেপে টলমল পায়ে বারান্দা ছেড়ে রুমের দিকে এল। একবার ভাবল চুপচাপ ঘুমাবে, এসব ঝামেলা নিতে পারব না। এমনিতেও সবকিছু ঝাপসা দেখছে।
কিন্তু পরক্ষণেই তার মন আর এতে সায় দিল না। সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বাড়ির সদর দরজা খুলে সে উম্মাদের ন্যায় বাগানের পেছনের দিকে ছুটতে লাগল। যদিও চলার পথে তার হা-পা একপ্রকার টলছিল,কিন্তু তবুও কেকে নিজেকে সামলে নিল। কেকের বেরোনোর শব্দে দুজন পরিচারিকা আর গেটের গার্ডরাও কৌতূহলবশত পেছন পেছন ছুটে এল।
সুইমিংপুলের পাড়ে পৌঁছাতেই সবাই স্তম্ভিত হলো। স্থির শীতল পানির ওপর আধো অবস্থায় ভেসে আছে একটি লাল শাড়ি পরা নিথর নারী দেহ। পানিতে চকমক করছে গহনাগুলো। জোছনার আলোয় যখন মুখটা স্পষ্ট হলো, সবার মুখ দিয়ে একযোগে বিস্ময়ের কন্ঠস্বর বেরিয়ে এলো,
“মেহের ম্যাডাম!”
অন্যদিকে কেকে পাথরের মতো নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সবকিছু নিয়ে সে নিজেই দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে গেলো।এসব কি তার নেশার ঘোর নাকি বাস্তব? আর যদি তাই হয় তবে, মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগেই যাকে সে হেঁটে যেতে দেখল, সে এভাবে চিরনিদ্রায় তলিয়ে গেল কিভাবে?
| পুরো গল্প আবার নতুন করে এডিট করার পর, এই অতীতের ঘটনাগুলো আরেকটুখানি সাজিয়ে লিখব। তবে এখানে অনেক কিছুই ইচ্ছেকৃত স্কিপ করা৷ তাই হয়তো অতিরিক্ত নাটকীয় মনে হতে পারে। আরশিয়ার মৃত্যুর আরেকটি অংশ আগামী পর্বে পাবেন। বাকিগুলো পরবর্তীতে||
অতীতের সেই রক্ত হিম করা স্মৃতিচারণ শেষ হতেই গোডাউনের গুমোট পরিবেশে এক পৈশাচিক নীরবতা নেমে এল। কেকের বন্ধুদের চোখেমুখে তখন ঘৃণা আর বিস্ময়ের ছাপ। সিলিং থেকে ঝুলতে থাকা জাভিয়ান, আব্বাস মির্জা, আরিজ আর আরশাদের হৃদপিণ্ড তখন ভয়ে স্তব্ধ হওয়ার উপক্রম। কেকের শান্ত চোখের গভীরে যে হিংস্র দাবানল জ্বলছে, তা দেখে তারা স্পষ্টত বুঝতে পারল—আজকের রাতটি তাদের জীবনের শেষ রাত হতে চলেছে। আর যাই হোক, ছোটখাটো কারণে কেকে তাদের ধরে আনেনি।
আর এতোবছর ধরে যেন, জাভিয়ান এই আশংকাতেই ছিল। অনেক ছলাকলা করে, কৌশলে সে কেকের জীবনের সাথে বহু খেলা খেলেছে,তাকে পাগল বানিয়েছে,দেশ ছাড়িয়েছে; কারণ সে কিছুটা হলেও আন্দাজ করেছিল—মায়ের মৃত্যুর পর কেকে-কে বিপথে ঠেলতে গিয়ে সে যা রহস্যময় মানবে পরিণত হয়েছে তা ভবিষ্যতে একটা না একটা সময় তারই বিপদ টেনে আনবে।কিন্তু আজ যদি কেকে চিরতরে তার খেলাই শেষ করে দেয় তবে তার এতোবছরের সকল চালাকি-পরিশ্রম সবই ভেস্তে যাবে।
জাভিয়ান হুড়হুড়িয়ে আর্তনাদ করে উঠল,
“কাশিফ! বাবা, আমি ভুল করেছি। শয়তানের প্ররোচনায় পা দিয়েছিলাম। আমাকে ক্ষমা করে দাও বাবা, আমি তোমার চাচার মতো! আমি জানি আমি ঠিক করিনি, কিন্তু… বাবা, দয়া করো আমার উপর।”
কেকের মুখ হতে শোনা নিজেদের পৈশাচিক অতীতের গল্পটা শুনে, ভীতিগ্রস্তে আত্মহারা আরিজ আর আব্বাসও ভাঙা গলায় প্রাণভিক্ষা চাইল,
“কেকে, আমাদের ছেড়ে দাও। সব সম্পত্তি, সব টাকা তোমাকে দিয়ে দেব। আমাদের কিচ্ছু চাইনা, তুমি যা যা চাইবে সব তোমাকে দিয়ে দেবো। তবুও আমাদের ছেড়ে দাও।”
কেকে ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত তীর্যক হাসি ফুটিয়ে তুলল। সেই হাসিতে কোনো নেই কোনো নমনীতা।আছে কেবল নিকষ কালো অন্ধকার। সে কাঁধটা বাঁকা করে তাদের একনজর পরখ করে দেখল। প্রাণ ভিক্ষে চাওয়া কিছু নিঃস্ব কুকুর ছানার মতোই লাগছে তাদের। কেকে পুনরায় ক্ষীণ বিদ্রুপাত্মক হাসল। হাতের লাইটারটা বারংবার জ্বালিয়ে নিভিয়ে, আঙুলের ডগায় ঘুরিয়ে চেয়ার হতে উঠে দাঁড়াল। কালো লাইটার জ্যাকেটের পকেটে রেখে দিল।
লেটার জ্যাকেটের পকেটের দুহাত গুঁজে ধীরপায়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে সে তাদের কাছে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে ক্রোধ ফেটে পড়ছে। অথচ ভাবগম্ভীর্য সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কেকে শান্ত-শীতল গলায় সে বলে উঠল,
“ছেড়ে দেবো তাই তো?…ওকে ফাইন!”
মুহূর্তের জন্য জাভিয়ানদের চোখে আশার আলো ঝিলিক দিয়ে উঠল। কেকে সাদের দিকে হাত তুলে ইশারা করল। সাদ তার স্বভাবসুলভ বিস্তৃত হাসি হাসল—সে হাসিটি ছিল মৃত্যুর বার্তার ন্যায়ই ভয়ানক। যা জাভিয়ানদের বুঝতে দেরি হয়ে গেল।
জাভিয়ানরা ভাবল হয়তো শেকল খুলে দেওয়া হবে, কিন্তু সাদ গিয়ে কর্কশ শব্দে সিলিংয়ের সেই চেইন রোলিং লিভারটি পুরো শক্তিতে ঘুরিয়ে দিল। সাথে সাথে চেইনটি আলগা হয়ে গেল এবং চারজন নরপিশাচ একসাথে শূন্য থেকে সজোরে কংক্রিটের ফ্লোরে আছড়ে পড়ল। হাড়গোড় ভাঙার মচমচে শব্দ বেসমেন্টের প্রতিটি কোণে প্রতিধ্বনিত হলো।
এরপর শুরু হলো সেই নারকীয় অধ্যায়, যার বীভৎসতা বর্ণনাতীত। কেকের বন্ধুদের প্রত্যেকেই যেন আজ একেকজন ক্ষুধার্ত নরপিশাচ।
প্রথমে ধরা হলো আরিজকে। চ্যালা হয়ে নোংরা হাতে আকাশের চাঁদ ছোঁয়ার মতো দুঃস্বপ্নই আজ তার কাল হলো। শুরুতে আর বাকিদের মতোই তাকেও একত্রে হকিস্টিক, রড দিয়ে মেরে থেঁতলে ফেলা হলো। কেকে তখন নিরদ্বিধায় বসে বসে পায়ের উপর তা তুলে—সিগারেট টানছে। সাথে উপভোগ করছে, মর্মান্তিক আর্তনাদ বিশিষ্ট বিভৎস দৃশ্য।
আরিজ আধমরা হয়ে পড়ে আছে। সাদ বেটার হাত-পা পেছন হতে মুচড়ে ধরে আছে। জায়ান আরিজের পায়ের উপর হাটু চেপে, তার ধারালো বোয়িই নাইফ দিয়ে আরিজের ঊরুর মাংস ফালাফালা করে চিরে ফেলল। আরিজের গগনবিদারী চিৎকারে ফ্যাক্টরির সর্বকোণ যেন থরথর করে কাঁপছিল।
তালহা পাশ থেকে একটি ভারি হাতুড়ি নিয়ে আরিজের প্রতিটি আঙুল একটি একটি করে পাথরকুচির মতো থেঁতলে দিতে লাগল। হাড়ের গুঁড়ো আর ছিটকে আসা রক্তে ফ্যাক্টরির মেঝে দ্রুত কর্দমাক্ত হয়ে উঠল।
অন্যদিকে আরশাদের পরিণতি ছিল আরও পৈশাচিক। ফারিস অত্যন্ত নিপুণভাবে তার পেটে এক গভীর পোঁচ দিল। জীবন্ত মানুষের নাড়িভুঁড়ি যখন মেঝের রক্তে পিচ্ছিল হয়ে বেরিয়ে এল, আরশাদের চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। তার প্রতিটি আর্তনাদের সাথে শরীরের ভেতর থেকে কালচে রক্ত ফোয়ারার মতো ছিটকে বেরোচ্ছিল। কিছুক্ষণ আগের জ্যান্ত মানুষগুলো এখন নিথর, ছিন্নভিন্ন মাংসের স্তূপ।
রক্তের সেই উষ্ণ স্রোত যখন কেকের জুতো ছুঁয়ে গেল, তখন সে আব্বাস মির্জার দিকে এগিয়ে গেল। আব্বাস তখন নিজের সঙ্গীদের ছিন্নভিন্ন দেহের অবশিষ্টাংশ দেখে যন্ত্রণায় নয়, বরং চরম আতঙ্কে গোঙাচ্ছে। কেকের চোখ তখন আগ্নেয়গিরির ন্যায় উত্তপ্ত ; তার মস্তিষ্কের প্রতিটি স্নায়ু যেন উন্মাদ হয়ে উঠেছে। তার সমস্ত রাগ, ঘৃণা আর অতীতের দৃশ্যগুলো চোখের সামনে দাউ দাউ করে জ্বলছে। সে পাশে রাখা একটি স্বয়ংক্রিয় রাইফেল হাতে তুলে নিল।
”আব্বাস মির্জা! রাঘব বোয়াল। তোকে নিয়ে ঘেঁটে দেখতে গিয়ে জানলাম, তুই ইলিগ্যাল ওয়েতে অস্ত্র চোরাচালান সহ মানব পাচার করিস। উমমম…আশা করা যায়,তোর একাউন্টে হিউজ এ্যামউন্ট কেবল এসব সোর্স থেকেই আসে,রাইট?”
বিধস্ত আব্বাস স্তব্ধ হয়ে গেল। কেকে আসলে কি জানতে চাচ্ছে? এদিকে কোনো উত্তর না পেয়ে, কেকে ক্ষীণ তির্যক হাসল।
—“ভয় নেই, তোর টাকায় ভাগ বসাবো না আমি। এমনিতেই জানতে চাচ্ছিলাম।”
কেকের কথার ভাবভঙ্গিতে র’ক্তাক্ত মুখে আমতাআমতা করে আব্বাস মির্জা আওড়াল,
“তুমি কি ওইসব চাচ্ছো? যদি চাও তবে আমি…আমি তোমায় সব দিয়ে দিতে পারি। ইন্টারন্যাশনাল ডার্ক সাইটের অনেক জায়গাতেই আমার ভালো নাম আছে। তুমি সারাজীবন আয়েশ করে কাটিয়ে দিতে পারবে…যদি তুমি চাও তবে…”
কেকে পুনরায় হাসল, সিগারেট টেনে ধোঁয়া ছাড়ল। অতঃপর সিগারেটের অবশিষ্টাংশ নিবিষ্ট মনে একনাগাড়ে দেখতে দেখতে আওড়াল,
“উঁহু, বললামই তো, আমি শুধু জানতে চাচ্ছিলাম।”
এই বলতে না বলতেই, কেকে হুট করেই আব্বাসের চোখের মণি বরাবর জলন্ত সিগারেটের অংশটুকু ছুঁড়ে মারল। মূহুর্তেই নিজেকে সামলাতে না পেরে, আব্বাস মির্জা যন্ত্রণায় চিৎকার নিচে গড়িয়ে পড়ল। কেকে তৎক্ষনাৎ নিজের ভাবগম্ভীর্য নিরেট করে, আব্বাসের বুকের উপর পা তুলে দাঁড়াল। তার শুভ্র দামী পাঞ্জাবিটা তখন জঘন্য রকমের নোংরা ও রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে। ব্যাথার চোটে আব্বাস মির্জা শ্বাস নিতেও ভুলে গেল।
কেকে নিজের জ্যাকেটের পেছন হতে, পিঠের কাছে কোমড়ে গুঁজে রাখা পিস্তলটা একটানে বের করল। ম্যাগাজিন সে স্বযত্নে সে আগেই পূর্ণ করে রেখেছে। আর সকল পিস্তলের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন ও দামী হওয়ার সুবিধার্থে, এতে একসাথে ২০টির অধিক বুলেট বা রাউন্ড রাখা যায়।
পিস্তল দেখামাত্রই আব্বাস শ্বাস আঁটকে আওড়ায়,
“কেকে! মাফ করো… না, এটা করো না…তুমি…এটা…”
যথারীতি কেকে আর এক মূহুর্তেও সময় নষ্ট করল না। স্টাইড টেনে একের পর এক গুলি বিদ্ধ করতে লাগল,আব্বাস মির্জার সর্বস্বে। সে মাথা হোক বা চোখ মুখ, হোক কিংবা বুক আর তলপেট। এক মুহূর্তেই সে যেন উম্মাদ হয়ে উঠল।ঝাঁঝরা করে দিতে লাগল,একটি জ্যান্ত মানুষের অস্তিত্ব। তার চোখে-মুখে অব্দি শক্তের ছিটেফোঁটা লাগল অথচ সে দমে গেল না।
অবিরাম গুলির শব্দে ফ্যাক্টরির ভেতরটা নরককুণ্ডে পরিণত হলো। প্রথম কয়েকটা গুলি আব্বাসের পেট ফুটো করে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে মেঝেতে গেঁথে গেল। আব্বাসের শরীরটা সজোরে ড্রিল করা কাঠের মতো ছটফট করছিল। কেকে তবুও থামল না। সে পিস্তলটা একটু উপরে তুলে আব্বাসের বুকের পাজর লক্ষ্য করে অনবরত ব্রাস্টফায়ার শুরু করল। তপ্ত বুলেটের আঘাতে মাংসের টুকরো আর হাড়ের কুচি চারদিকে নক্ষত্রের মতো ছিটকে পড়তে লাগল। আব্বাসের পরনের সাদা পাঞ্জাবিটা মুহূর্তের মধ্যে শত শত ছিদ্রযুক্ত এক রক্তাত্ন ন্যাকড়ায় পরিণত হলো।
কেকে তখন সম্পূর্ণ হিতাহিতজ্ঞানশূন্য। চোয়াল শক্ত;নিয়ন্ত্রণহীন। সে ম্যাগাজিন শেষ হয়ে যাওয়ার পরও ট্রিগার চেপে ধরে রাখল। গুলির আঘাতে আব্বাসের মুখমণ্ডল তখন আর চেনা যাচ্ছে না।
চোয়ালের হাড় আর দাঁত গুঁড়ো হয়ে থকথকে মগজের সাথে মিশে এক বীভৎস মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়েছে। পুরো ঘরজুড়ে বারুদের কটু গন্ধ আর পোড়া মাংসের উৎকট গন্ধে শ্বাস নেওয়া দায় হয়ে উঠল।
”কেকে! থাম! ও শেষ! একদম শেষ!”
তালহা দৌড়ে এসে কেকের বন্দুক ধরা হাতটা ঝাপটে ধরল। কেকে তখনো দ্রুত শ্বাস ফেলছে, তার সারা মুখে আর উন্মুক্ত বুকে আব্বাসের তপ্ত রক্তের ছিঁটে লেগে আছে। তার দৃষ্টি তখনো সেই ছিন্নভিন্ন লাশের ওপর নিবদ্ধ। সে যেন আরও রক্ত চায়, আরও ধ্বংস চায়। তালহা তাকে সজোরে ঝাঁকুনি দিতেই কেকে দীর্ঘ এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
হাতের কব্জি দিয়ে, ঠোঁটের পাশে লেগে থাকা র’ক্তের ছিটে নির্বিকারে মুছে নিল। তপ্ত হাসিতে তির্যক হেসে,আওড়াতে লাগল,
“ফা*ক দিস বা*স্টার্ড!… ওর সামান্য নোংরা জগতটা আমাকে দিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল,ইডিয়ট!”
সে একটু থেমে ক্রোধের তোপে ভারী ভারী শ্বাস ফেলে আবারও হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
“হোয়্যার কে-কে এগজিস্টস, নো আদার ডেভিল হ্যাজ দ্য রাইট টু সারভাইভ।”
‘যেখানে কেকে-র অস্তিত্ব রয়েছে, সেখানে আর কোনো শয়তানের বেঁচে থাকার অধিকার নেই |
মেঝেতে তখন তিনটি লাশ পড়ে আছে—আরিজ, আরশাদ আর আব্বাস। তাদের শরীরের কোনো অঙ্গই অক্ষত নেই; প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আলাদা হয়ে এক নারকীয় কসাইখানার ছবি ফুটিয়ে তুলেছে। কেবল জাভিয়ান তখনো জ্যান্ত, তবে তার অবস্থা মরা মানুষের চেয়েও করুণ। সে নিজের চোখের সামনে নিজের ভাই আর বন্ধুদের এই বীভৎস দশা দেখে মানসিক ভারসাম্য হারানোর উপক্রম।
কেকে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল জাভিয়ানের দিকে। তার পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল আরও লোমহর্ষক। কেকে পাশ থেকে একটি ভারী লোহার রড তুলে নিল। কোনো কথা না বলে সে জাভিয়ানের দুই হাত আর পা লক্ষ্য করে এমনভাবে আঘাত করতে লাগল যে, হাড়গোড় ভেঙে একদম গুঁড়ো হয়ে গেল।
জাভিয়ানের গগনবিদারী চিৎকারে কেকে যেন আরও হিংস্র হয়ে উঠল। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা জায়ান আর ফারিস পাথরের মতো স্থির হয়ে সেই নৃশংসতা দেখছিল; সাদ ভয়ে চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলেছে। সে বেচারা একসাথে আজ এতোকিছু সহ্য করতে পারছে না।
—“কাশিফ, মাফ করে দাও। আমি তোমার চাচার মতো, অন্যায় করি আর যাই করি, তোমার পরিবার’কে ঐসময় আমিই টিকিয়ে রেখেছি। কাহসান ইন্ডাস্ট্রি হোক বা কুঞ্জ, আমি যদি সত্যিই বেঈমানী করতাম তবে এতোদিনে সবকিছুই নিজে আত্মসাৎ করতে পারতাম। কিন্তু আমি তা করিনি।হ্যা,আরশিয়ার সাথে যা হয়েছে…হয়তো আমি আটকাতে পারতাম কিন্তু…মাফ করে দাও বাবা, দয়া করে প্রাণটা ভিক্ষে দাও।”
কেকে তার কথায় হাত থেকে রডটা ফেলে দিল। ঘাড়টা কিঞ্চিৎ কাত করে, জাভিয়ানের নিরীহ রূপটাকে দেখল। অচিরেই তার ঠোঁটের ক্ষীণ এক হাসি ফুটে উঠল। চিবুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি ঘসে,নির্বিকার স্বরে আওড়াল,
“উমমম…কথা ঠিকই আছে, প্রাণ ভিক্ষেটা বোধহয় দেওয়ায় যাই। যতই হোক,চাচাজান বলে কথা। আপনার প্রতি শুধু আমি কেনো, আমার পরিবার-বাড়ি-বিজনেস সবকিছুই আজীবন কৃতজ্ঞ রইবে।”
কেকের কথায় জাভিয়ান যেন আবারও আকাশের চাঁদ খুঁজে পেল। তবে তার মনে সংশয়,আগেরবারের মতো ভালো কথা বলে,এবার কি করে বসে! জাভিয়ান আরো কিছু বলার আগেই, কেকে জায়ানকে ইশারা করল।
কিছুক্ষণ পর জায়ান একটি জ্বলন্ত কয়লার চুল্লি নিয়ে এল। সেখানে একটি রড আগে থেকেই গরম করা হচ্ছিল, যা এখন টকটকে লাল হয়ে আগুনের পিণ্ডের মতো দেখাচ্ছে। কেকে নিজের হাতে একটি কালো গ্লাভস পরে নিল। জাভিয়ান তখন রক্তে ভেজা মেঝেতে ছটফট করে প্রাণভিক্ষার আকুতি নিয়ে সকলের দিকে চেয়ে আছে। সে বুঝেও উঠতে পারল, এই মূহুর্তে তার সাথে কি হতে চলেছে।
এদিকে কেকে চুল্লি হতে উত্তপ্ত রডটাকে বের করে, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একবার দেখে নিল। পরক্ষণেই এক ঝটকায় জাভিয়ানের মুখটা বাম হাত দিয়ে চেপে ধরল এবং সেই তপ্ত লাল রডটা সরাসরি জাভিয়ানের মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিল। চারদিকে পোড়া মাংসের ধোঁয়া আর উৎকট গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। জাভিয়ানের গলার ভেতরটা তছনছ হয়ে গেল। বিকৃত এক গোঙানির স্বর বেরিয়ে আসতে লাগল। সাদ ভীত হয়ে চোখমুখ খিঁচে ফারিসের কাঁধে মুখ লুকিয়ে নিল। যদিও ফারিস সহ বাকি সকলেই তখন নিজেকে দৃঢ় রাখার চেষ্টায়।
অথচ কেকে’র কাছে সবটাই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। সে যেন দক্ষ হাতে নিজের কাজ করছে। জাভিয়ানের মুখের চারপাশের চামড়া-মাংস আর জিহবা গলে রডের সাথে লেপ্টে যেতে লাগল। মূলত তার বাকশক্তি চিরতরে ছিনিয়ে নিল কেকে।
কাজ শেষ করে কেকে পৈশাচিক হাসল। সে বিধ্বস্ত জাভিয়ানের চুলগুলো মুঠো করে ধরে মুখটা পেছনের দিকে হেঁচকা টানে হেলিয়ে দিল। জাভিয়ানের সেই বিকৃত, ঝলসানো চেহারার একদম কাছে মুখ ঝুঁকিয়ে,সে হিংস্র-শীতল কন্ঠে হিসহিসিয়ে আওড়াল,
”বিশ্বাসঘাতকের জন্য সেরা শাস্তি হলো মৃত্যু। কিন্তু চাচাজান হিসেবে তোকে এইটুকু ছাড় দেওয়া ফরজ ছিল। এই নে, দিলাম তোকে প্রাণভিক্ষা। মরার আগ পর্যন্ত এই চেহারা আর এই নরক যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাক! তোর এই বিকৃত আর্তনাদ যেন তোকে প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দেয়—আরশিয়া মেহেরের অভিশাপ ঠিক কতটা ভয়ংকর ছিল!”
পরদিন সকালবেলা। পুরো কাহসান কুঞ্জে তখন কেবল শুনশান নীরবতা বিরাজ করছে। সুহিন ঘুম থেকে উঠে নিচে নেমে কাউকে দেখতে না পেয়ে বেশ অবাক হলো। বাড়ির ভেতরে যে অস্থিরতা আর বিয়ের প্রস্তুতির চাপ ছিল, তার ছিটেফোঁটাও আজ নেই। কেকে, তার বন্ধুরা কিংবা জাভিয়ান আঙ্কেল—কারো কোনো চিহ্ন নেই। মেডদের জিজ্ঞেস করেও সে কোনো স্পষ্ট উত্তর পেল না। তারা শুধু জানাল, রাতের অন্ধকারে কয়েকটি গাড়ি নিয়ে সবাই বেরিয়ে গেছে। আর এখন অব্দি কেউ ফেরেনি।
সুহিন গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গতরাতে কেকে তাকে আশ্বস্ত করেছিল যে, তাকে আর কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না। আজ সকালে বিয়ের কোনো আয়োজন কিংবা মানুষের ভিড় না দেখে সে নিশ্চিত হলো—লোকটা তার কথা রেখেছে। এক অদ্ভুত স্বস্তিতে তার মন ভরে উঠল। ভার্সিটি ছুটি চলছে, বাইরে যাওয়ার কোনো তাগিদ নেই। সে ভাবল, নিমরাকে ফোন দিয়ে কিছুক্ষণ শান্তিতে কথা বলা যাবে। ওরা চলে যাওয়ার পর থেকেই যেন সবকিছু খারাপ যাচ্ছে। আর ওদেরও তেমন খোঁজখবর নেই।
এই ভাবনায় নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে তার নজর পড়ল কেকের বন্ধ ঘরটির দিকে। গত কয়েক দিনে তীব্র কৌতূহল থাকলেও এই ঘরে প্রবেশ করার সাহস তার হয়নি। কিন্তু আজ বাড়ি একদম জনশূন্য হওয়ায় তার অবদমিত ইচ্ছাটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সে ভাবল, একবার ভেতরে গিয়ে দেখে এলে ক্ষতি কী!
সে অত্যন্ত ধীরলয়ে ঘরের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল। ঘরে পা রাখামাত্রই তার চোখ পড়ল বিনব্যাগের ওপর কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে থাকা কেকের সাইবেরিয়ান হাস্কি টমি’র দিকে। এই প্রাণীটা দেখতে যতটা রাজকীয়, সুহিনের কাছে ততটাই ভীতিপ্রদ মনে হয়; ঠিক যেন তার মালিকের প্রতিচ্ছবি।
তবে টমি এখন অঘোরে ঘুমাচ্ছে দেখে সে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। যদিও ঘুমের মাঝেও তাকে ভীতিকর লাগছে। অন্যদিকে তার মাফিন একদমই ভিন্ন। সেও নিশ্চয় এখন তার ঘরে কোথাও ঘুমিয়ে আছে, তা না হলে এতক্ষণে এই মাফিন-টমি এক হলে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যেত।
সুহিন সন্তর্পণে দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে ঘরের চারদিকে নজর বুলাল। ধুলিকণাহীন, ছিমছাম পরিষ্কার ঘরটির ইন্টেরিয়র ডিজাইন ধূসর ও কালো রঙের আভিজাত্যের মাঝে সামান্য সাদা রঙের ছিটেফোঁটাও রয়েছে। তবে সুহিনের কাছে সম্পূর্ণ ঘরটা কেবল কোনো এক আজব ভুতের আস্তানা মনে হলো।
সে নিজের অবাধ্য গাঢ় বাদামী চুলগুলো আলতো করে বেঁধে নিয়ে, নাকের ডগায় নেমে আসা চশমাটা তর্জনী দিয়ে ঠেলে ঠিক করে নিল। টিপটিপে পায়ে টমিকে পাশ কাটিয়ে বিশাল কালো রঙের ক্লোজেটটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার মনে হলো, ঘরের ভেতরে দেখার মতো বিশেষ কিছু থাকলে তা হয়তো এই ক্লোজেটেই আছে।
কপাট খুলতেই তার নজরে এল কুচকুচে কালো পোশাকের সারি। কালো টি-শার্ট, লেদার জ্যাকেট আর প্যান্ট—সবই এক রঙের। সুহিন নিজের অজান্তেই একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বিড়বিড় করল,
“হাহ! কালা কাউয়া!…উঁহু, কেকে ওরফে চাপা-ভাঙা কাদের কাউয়া।”
বিরক্তির সাথে ঝুলে থাকা জ্যাকেটগুলো সরাতেই হঠাৎ অন্ধকারের বুক চিরে একটি শুভ্র সাদা শার্টের দেখা মিলল। সুহিন শার্টটি বের করে আনল। ওটার দিকে তাকাতেই গতরাতের কিছু স্মৃতি তার মানসপটে উজ্জ্বল হয়ে ভেসে উঠল। গতরাতে এনগেজমেন্টে কেকে এই শার্টটাই পরেছিল। কেকের সেই নিরেট গাম্ভীর্য সুহিনকে যেমন আতঙ্কিত করে, তেমনি ইদানীং এক অজানা অস্বস্তিভরা আকর্ষণেও আবিষ্ট করছে।
সুহিন চোখ বুজে শার্টটি নাকের কাছে ধরল। নিমিষেই সেই গভীর রাতের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের অনুভূতিগুলো তাকে গ্রাস করল। শার্টের তন্তু থেকে আসা পুরুষালি ঘ্রাণ আর ক্লোরাল পারফিউমের মিশ্র সুবাসে সে যেন ক্ষণিকের জন্য বিমোহিত হয়ে পড়ল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে সে বিড়বিড় করল,
“ধুর! কী সব আজেবাজে চিন্তা! আমি মোটেও ওমন মেয়ে নই।”
শার্টটি পুনরায় যথাস্থানে রেখে সে ড্রেসিং টেবিলের দিকে ফিরল। সেখানে কেকের ব্যক্তিগত ব্যবহারের কিছু জিনিসের মাঝে একটি কালো রঙের পারফিউমের শিশি তাকে আকৃষ্ট করল। সুহিন হাতে নিয়ে দেখল,তা টম ফোর্ড (Tom Ford F*cking Fabulous)-এর একটি কাস্টমাইজড ক্লোরাল ফ্র্যাগ্রান্স। নিচে অবশ্য ছোট করে খোদাই করে লেখা ‘KK’.
নীলচে চোখ জোড়া দিয়ে পারফিউমের শিশিটা ভালোভাবে পরখ করে সুহিন মনে মনে বলল,
“ওহ, তবে এটাই সেই জিনিস!”
এই বলেই সে নিজের হাতের কব্জিতে সামান্য পারফিউম মেখে সুঘ্রাণটা নাকের ডগায় টেনে নিয়ে মুগ্ধ ভঙ্গিতে আওড়াল,
“উমমম…আউটস্ট্যান্ডিং! তবে পারফিউমের নামটা লোকটার মতোই অভদ্র!”
এই বলে সুহিন কিঞ্চিৎ ব্যাঙ্গাত্নক হাসল। অচিরেই নিজের সাথেই অদ্ভুত এক আলাপে মত্ত হলো,
“যদি এটা আমি আজ চুরি করে নিয়ে চলে যাই,তবে উনি কি রাগ করবেন?”
তার এই প্রশ্নে, তৎক্ষনাৎ ভেতরের বিদ্রোহী সত্তাটা বলে উঠল,
“হুঁশ! চুরি কেনো করব। উনি জোর করে বিয়ে করেছে, ঠেসে ধরে চুমু খেয়েছে, কলারবোনে মেরে দেওয়া তার সো কল্ড মাস্টারপিস স্ট্যামের ব্যাথা এখনও কমেনি…এতোকিছুর পর,না বলে এই জিনিসটা নিয়ে যাবার কি আমার কোনো অধিকার নেই? অবশ্যই আছে!”
সুহিন বেশ জোরালো ভঙ্গিতে নিজেকে আশ্বস্ত করল। পরক্ষণেই নিজের ভাবনায় মিটমিট করে হাসল। ক্লোজটের দিকে আবারও এগিয়ে গেল। খুঁজে দেখতে হবে, আরো বিশেষ কিছু রয়েছে কিনা। জীবনের প্রথমবারের মতো এমন অদ্ভুত কাজ করছে সে, অথচ নূন্যতম দ্বিধাদ্বন্দ ছাড়াই।
সুহিন আবারও ক্লোজেটের প্রতিটি তাক অত্যন্ত সতর্কতার সাথে হাতড়াতে শুরু করল। প্রতিটি কোণ, প্রতিটি ভাঁজ সে খুঁটিয়ে দেখল—এমন কি বিশেষ কিছু নেই যা সেই পারফিউমটার মতোই তার কৌতূহল মেটাতে পারে? কিন্তু দীর্ঘক্ষণ খোঁজাখুঁজি করেও তেমন বিশেষ কিছুর দেখা না পেয়ে সে কিছুটা হতাশ হলো। নিজের ওপরই কিঞ্চিৎ বিরক্তি নিয়ে সে ড্রয়ারগুলো বন্ধ করতে চাইল।
ঠিক তখনই একদম নিচের ড্রয়ারটি খুলতেই একটি সাদা খামের কোণ তার নজরে এল। অত্যন্ত যত্নসহকারে কিছু পুরনো ফাইলের নিচে খামটি যেন আড়ালে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। প্রথমে সুহিন ভাবল এটি হয়তো কেকের প্রয়োজনীয় কোনো কাগজপত্র। তাই অযথা অন্যের গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন বোধ করল না সে। দ্রুত ক্লোজেটটি বন্ধ করে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
কিন্তু এক অদ্ভুত অদৃশ্য টান যেন তাকে বারবার ওই খামটির দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য করল। সাদা খামটার এককোণে টকটকে লাল রঙের একটি বিশেষ অদ্ভুত চিহ্ন দেওয়া। সুহিন নিজের অবাধ্য মনকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারল না। আজ দিনটাই যেন তার জন্য এক নিষিদ্ধ কৌতূহলের পসরা সাজিয়ে বসেছে। সে ভাবল, এতকিছু যখন ঘেঁটেছে, তখন শেষবার এই খামটা দেখতে ক্ষতি কী? কেকের প্রতি তার এই বিচিত্র আকর্ষণ আর কৌতূহল যেন সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। সুহিনও বেশ উপভোগ করছে।
Naar e Ishq part 21
সুহিন দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে খামটি হাতে তুলে নিল। ধীর হাতে ভাঁজ করা কাগজগুলো বের করে সে আনমনে পড়তে শুরু করল। কিন্তু পড়ার প্রথম কয়েক ছত্র পার হতেই তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। প্রতিটি লাইনে এমন সব তথ্যের সমাহার, যা তার কল্পনা কিংবা দুঃস্বপ্নকেও হার মানায়। সে যত এগোতে লাগল, তার চারপাশের পৃথিবীটা যেন ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। তার শরীর অবশ হয়ে আসছে, হৃদস্পন্দন যেন বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
কাগজের শেষ পাতাটির শেষ শব্দ পর্যন্ত পড়ে সুহিন পাথরের মতো নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বিস্ময় আর চরম আতঙ্কে তার হাতের আঙুলগুলো শিথিল হয়ে এল। কাগজগুলো হাত খসে অচিরেই ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ল। তার নীলচে চোখের সেই উজ্জ্বলতা মুহূর্তেই এক ঘন কালচে মেঘে ঢেকে গেল। সে ফিসফিস করে, প্রায় রুদ্ধকণ্ঠে অস্ফুটে আওড়াল,
”এসব মিথ্যে… এসব সত্য হতে পারে না! সবাই এভাবে আমার বিশ্বাস ভাঙতে পারে না।”
