শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪০
সুরভী আক্তার
ময়না হেসেছে একটু । হেসেই বেরিয়ে গেছে ঘর থেকে ।
আসলো এই সবে , যেতে দেরি হলো না । আজ যাওয়ার আগে ময়না কাঁদে নি । মানিকের সাথে বিয়ে হওয়ার পর প্রথম বার যেবার এসেছিল , সেবার ও কাঁদে নি । পরবর্তী যতবার এসেছে , ফিরে যাওয়ার আগে চোখের কোনে পানি জমেছিল । আজ জমলো না । তবে মুখ ভার ছিল ।
চলে গেছে ওরা । বিকেল গড়াচ্ছে । সংগ্রাম আসবে বিকেলের শেষ ভাগে । এক জামাই এসে না খেয়ে চলে গেল , আরেক জামাই আবার আসবে । তার জন্য রান্না বসিয়েছেন অলকা । চুলায় জ্বাল ধরিয়েছেন সবে । শ্যামাও পাশে বসে । এর মধ্যেই দেউড়ির বাইরে থেকে মোখলেছের বড় ঝাইঝাই গলা ভেসে আসলো । খেকিয়ে ডাকছে সে । অলকা চমকালেন আকস্মিক । আব্বার কন্ঠ কানে আসতেই ধক্ করে উঠেছে শ্যামা । অলকা তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন…
” ঘরে যা, শ্যামা !
শ্যামা শুনলো না । অলকা পা থামিয়ে আবার বললেন…
” কি হইলো, ঘরে যাইতে কইলাম তো !
” অনেক দিন আব্বারে দেখি না আম্মা ! আমারেও তো দেখে না । দেখতে ইচ্ছা করতাছে আব্বারে ।
প্রতি উত্তরে অলকা কথা বাড়ালেন না । সংগ্রামের নিষেধ টুকুতে বেশি গুরুত্ব দিলেন না তিনি । মোখলেছের ডাকের মাত্রা বাড়তেই তড়িঘড়ি করে পা চালিয়ে খিড়কি খুলে দিলেন । সাথে সাথে ঘ্যাস ঘ্যাসে গলায় খেকিয়ে উঠলো মোখলেছ….
” দিন দুপুরে দোড় আটকায় বইয়া আছোস ক্যান ?
অলকা উত্তর না করে সরে দাঁড়ালেন । তাকে পাশ কাটিয়ে গলার গামছা ঝেড়ে কুঁচকানো মুখে বাড়িতে ঢুকলো মোখলেছ । চুলায় ধোঁয়া ওঠা দেখে তাকালো সামনে । শ্যামা দাঁড়িয়ে চুলার পাশে । অমনি কুঁচকানো মুখখানা আরো বেশি কুঁচকে গেল তার । কটমট করে উঠলেন তিনি । এই মেয়েটা আবার এসেছে ? চরম বিরক্ত হলেন মোখলেছ । ফুঁসে উঠলো ভেতর ভেতর । ময়নার এই অবস্থার জন্য শ্যামা কেই দায়ী করেন তিনি ! হয়তো নিজের কাঁধের বোঝা শ্যামার কাঁধে চাপিয়ে নিজেকে শান্তনা দেন । অলকার সাথে আজকাল ঝগড়া বাঁধে অনেক । সবকিছুতেই শ্যামা কে টানা অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে মোখলেছের ।
সামনে শ্যামা কে দেখে চোখ পাকিয়ে দাঁত পিষে অলকার দিকে তাকালেন মোখলেছ । শ্যামা শুধালো নরম কন্ঠে…
” ভালো আছো আব্বা ?
মোখলেছ গটগটিয়ে এগোলেন কলপাড়ের দিকে । অলকার উদ্দেশ্যে দাঁত পিষে বললেন ক্ষিপ্রবেগে….
” খাইতে দে আমারে , কাইল থাইকা বাড়ি আহি নাই । খোঁজ আছে কোনো ? অন্ন ধ্বংস করতাছোস একলা একলা মাইয়ারে লইয়া ? আমার চৌখের আগোর থাইকা দূরে যাইতে ক ঐ মাইয়ারে । গা জ্বালাইস না আমার !
মাথা নোয়ালো শ্যামা । অপমান বোধে নয় , কষ্টে ।
মোখলেছের গোসল সেরে বেরোনোর আগে শ্যামা ঘরে ঢুকেছে । নিজের ঘরে । টেবিলের উপরটা ফাঁকা । বই পত্র সব নিয়ে গেছে ময়না । শ্যামা কিছু ভেবে হাসার চেষ্টা করলো ।
মোখলেছকে খাবার বেড়ে দিয়ে সরে এসেছেন অলকা । ওখানে থাকলে অলকা কে শুনিয়ে শুনিয়ে বকবক করতেন তিনি । রাতে আবার আড়তে যাবেন তিনি ।
খেয়েই ঘুমিয়েছেন । সংগ্রাম এসেছে ঠিক সন্ধ্যা নামার আগে । শ্যামা ঘরে ছিল । অলকার রান্না শেষ । তিনি খিড়কি খুলে দিয়ে কলপাড়ে গেছেন ।
খাটের পাশে দাঁড়িয়ে জানালায় মাথা ঠেকিয়ে ঘাটের দিকে এক ধ্যানে চেয়ে আছে শ্যামা । ভাবছে কিছু । আফতাব আর ময়নার চেহারা চোখের সামনে ভাসছে বারবার । সেও আজ দ্বিতীয় বার আফতাব কে দেখলো । প্রথম বার দেখার পর চেহারা মনে ছিল না । হাজার চেষ্টা করেও আফতাবের চেহারা ধ্যানে আনতে পারে নি শ্যামা । তখন অপ্রত্যাশিত ভাবে আফতাবের জায়গায় সংগ্রাম কে কল্পনা করেছিল সে । কেনো জানা নেই ! সংগ্রাম কেও তো তখন একবারেই দেখেছিল । তাহলে ওর চেহারা তো ভুললো না । আর আফতাবের জায়গাতেই বা ওকে কল্পনা করার মানে কি ছিল তখন ? তখন তো শ্যামা সংগ্রাম কে ঠিক ঠাক চিনতো ও না । তবে ? ভাবতে ভাবতে শ্বাস দীর্ঘ হয়ে আসছে শ্যামার । ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা দেখা দিচ্ছে । সংগ্রাম তখন অপরিচিত থাকলেও এখন তো পরিচিত ! সুপরিচিত এখন !
সংগ্রাম নিঃশব্দে চুপিসারে ঘরে ঢুকলো । পা টিপে টিপে ঠিক শ্যামার পিছনে দাঁড়িয়ে আচানক বরাবরের ন্যায় আলগোছে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো শ্যামা কে । থুতনি উন্মুক্ত কাঁধে ঠেকিয়ে ডাকলো একই সাথে…
” সাহেবান !
চমকালো না শ্যামা । তেমন ভড়কানো প্রতিক্রিয়া ও দেখালো না । সে ধীরে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো । উত্তর করলো…
” হুম !
কপাল গুটালো সংগ্রাম ।
” ভয় পাও নি ?
” ভয় পাবো কেনো ?
” এভাবে আচমকা জড়িয়ে ধরলাম যে ?
” এভাবে আচমকা জড়াতে জড়াতে অভ্যাস হয়ে গেছেন আমার । আপনি ছাড়া আর কে এভাবে জড়াবে আমায় ?
” আমি তো এতক্ষন ছিলাম না ! বুঝলে কি করে ? যদি ভুত জড়িয়ে ধরতো ?
হাসলো শ্যামা ।
” আপনার গায়ের গন্ধ যেখানে আমার পরিচিত , সেখানে আপনার স্পর্শের অনুভূতি অনুভব করতে পারবো না ?
আর , ভুতের সাধ্যি আছে নাকি আমাকে ছোঁয়ার ? আপনি না ওর হাত কেটে দেবেন !
” দেবো তো ! তোমার দিকে তাকালেই চোখ উপড়ে ফেলবো , ছোঁয়া তো অনেক দূর । তোমাকে দেখা, ছোঁয়া , ভালোবাসা , জড়িয়ে ধরা, সবকিছুর অধিকার শুধু আমার ।
এখন চলো , তৈরি আছো তো । চলে যাই..?
” কেবলই তো আসলেন !
” তোমাকে নিতেই ! দেরি কিসের ?
” আমার যেতে ইচ্ছে করছে না !
” আর আমার তোমাকে এখানে রাখতে ইচ্ছে করছে না !
” আমার ইচ্ছের প্রাধান্য দিন আজ !
” তুমি আমারটার দাও !
” দিই তো সবসময় !
” আজ ও দাও ।
শ্যামা সংগ্রাম কে পুরোপুরি দেখলো নজর বুলিয়ে । এখান থেকে বেরোনোর আগে যেমন ছিলো এখনো তেমনই আছে । একই পোশাকে । শ্যামা শুধালো…
” বাড়িতে যান নি ?
” নাহ !
” কেনো ?
” তুমি নেই , গিয়ে কি করবো ?
” আমি যখন ছিলাম না, তখন কি করতেন ?
” তখন একলা ছিলাম বিন্দাস ছিলাম ! কোনো পিছুটান ছিল না । এখন তুমি হয়েছো , পিছুটান জন্মেছে । টান যেখানে, সেখানেই ছুটে আসলাম আবার । বউয়ের টান বড় টান বেগম । বিনি সুতোর শক্ত টানে ছুটে এসেছি আমি ।
” আম্মার প্রতি টান নেই ?
জড়িত কন্ঠে প্রশ্ন শ্যামার ? সংগ্রাম এবার ছাড়লো শ্যামা কে । শ্যামা ঘুরে মুখোমুখি দাঁড়াতেই উত্তর করলো…
” আছে তো ?
” তাহলে ? আম্মা হয়তো অপেক্ষায় ছিলেন আপনার ? কাল রাত থেকে বাড়িতে নেই আপনি ।
” এখন তো ফিরবো ! তোমাকে নিয়ে …
” আম্মাকে এড়িয়ে চলছেন আপনি ?
সংগ্রাম সোজাসুজি শ্যামার চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে । শ্যামাও চেয়ে কৌতুহলী দৃষ্টিতে । উত্তর না পেয়ে ফের শুধালো শ্যামা…
” উনি আপনার মা , ছোট জমিদার সাহেব !
” আর তুমি আমার বেগম !
” আমার গুরুত্ব বেশি নয় !
” উঁহু , তোমার গুরুত্বই বেশি আমার কাছে !
” উনি আপনার জন্মদাত্রী !
” জানি তো । আর এটাও জানি তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী । যেটা উনি মানেন না !
” আপনি তো বলেছিলেন তাতে আপনার কিচ্ছু যায় আসে না , তাহলে ? আমার জন্য নিজেদের মা ছেলের মধ্যকার সম্পর্কে অবনতি টানছেন ।
” টানছি না ! উনি টানতে বাধ্য করছেন !
” ছোট জমিদার সাহেব , আপনি অবুঝ নন ।
” জানি !
” আমার জন্য আম্মা কে আর উপেক্ষা করবেন না , কথা দিন ! আপনি আম্মার সাথে ঠিকঠাক ভাবে কথা বলবেন , সময় কাটাবেন , দেখবেন আম্মা খুশি হবেন এতে । আপনাকে নিয়ে ভয় দূর হবে আম্মার মন থেকে । এখন আপনি আম্মাকে উপেক্ষা করছেন , এটা তো আমার জন্যই । এতে করে আমার প্রতি আরো বেশি ক্ষোভ জন্মাচ্ছে আম্মার মনে । উনি ভাবছেন আমি আপনাকে ওনার থেকে দূরে সরাচ্ছি । আমাকে না মানার যথেষ্ট হেতু আছে আম্মার কাছে ! আমাকে মেনে নেওয়া সহজ এতো ?
” বেগম , এসব শুনতে পছন্দ করি না আমি তুমি ভালো করেই জানো । তোমাকে মেনে নেওয়া যদি সহজ না হয়ে কঠিন হয়, তাহলে কঠিনই ! সংগ্রাম জোয়ার্দার সহজ কাজ করে না । কঠিন টাকেই বেছে নেয় ।
” তাই বেছে নিয়েছেন আমায় ?
” এতো দিনেও এই প্রশ্ন ? বোঝো না আমায় ?
” বুঝি! কিন্তু আমাকে এভাবে বেছে নেওয়ার অর্থ বুঝি না । নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে শান্তনা দেই অনেক । তবুও প্রশ্ন জাগে , কি স্বার্থ আপনার, আমার মাঝে ?
সংগ্রাম খানিক হেসে বলল….
” তুমিই আমার সবচেয়ে বড় স্বার্থ । তোমাকে পাওয়াটাই স্বার্থ , স্বার্থক আমি ! শ্যামা সুন্দরী কে পেয়ে স্বার্থক এই সংগ্রাম জোয়ার্দার ।
” কিভাবে ?
বিবস প্রশ্ন । উত্তর তৎক্ষণাৎ….
” চোখ লেগেছে যে তোমার উপর । সংগ্রাম জোয়ার্দারের চোখ যেটাতে আটকায়, সেটা সে হাশিল করেই ছাড়ে । এক মাত্র নারী তুমি , জাদুকরিনী বললে ভুল হবে না । যে নিজের প্রতি আমাকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছো । আর আমি সক্ষম হয়েছি তোমাকে হাশিল করতে ।
শ্যামা চুপ । কথা বাড়ালো না । চুপচাপ পাশ কাটাতে গেলে সংগ্রাম ওর হাত টেনে ধরলো । আবার সামনাসামনি দাঁড় করালো । এই মেয়েটা বোঝে না কেনো ওকে ?
শ্যামা বিবস হয়ে যায় এই প্রসঙ্গে কথা উঠলে । তাই সে প্রসঙ্গ তোলে না । সংগ্রাম ও পছন্দ করে না এই প্রসঙ্গ ।
শ্যামার নত মাথা । সংগ্রাম চিবুক ধরে উঁচু করলো মুখখানি । কপালে একটা গাঢ় চুমু এঁকে দুগাল আগলে নিয়ে বললো…
” চলো ,
বাড়ি ফিরে আম্মার সাথে কথা বলবো । কথা দিলাম ।
সেই সকালের পর থেকেই খ্যাচ খ্যাচ করছে সুরবালা । মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না । আঁধার নেমেছে মুখে । অংকুরের দিকে তাকাচ্ছে না সে । অংকুর পুরোপুরি দৃষ্টিতে না তাকিয়েই বুঝেছে বালার ভাবগতিক । সন্ধ্যার পর নিজ ঘরে বসে বই পড়ছিল সে । শায়লার কাছ থেকে কতক্ষন বাদ এঘরে আসলো বালা । দরজা থেকে অংকুর কে দেখলো , চোখে সরু ফ্রেমের চশমা আজ । চশমা লাগিয়ে বই পড়ছে । এই বইটা মাঝে মাঝে অংকুর কে পড়তে দেখে সুরবালা ।
বালা ভালো করে লক্ষ্য করলো , খানিক হাসছে অংকুর । অধীর মনযোগ বইয়ের পাতায় । পাতা উল্টে আবার মনযোগ দিলো । বিঘ্ন হলো না একটুও ।
সুরবালা ফোঁস করে উঠে গটগটিয়ে ঘরে ঢুকলো । দরজায় খানিক শব্দ করে বাঁড়ি মেরে জানান দিলো নিজের উপস্থিতি । তবুও হেলদোল নেই অংকুরের । শক্ত মুখে ঘরে ঢুকে গোছানো পরিপাটি বিছানা আবার গোছালো সুরবালা । হাঁটছে দপদপ করে , তবুও তাকাচ্ছে না অংকুর । বালা ফুঁসলো চোখ সরু করে তাকিয়ে । বলতে লাগলো নিজের মাঝে জোরে জোরে….
” জবা ফুল কারোর খুব পছন্দ, তাই না ? ফুলের গন্ধ নাকে না লাগলে ঘুম ভাঙ্গে না তার ! গন্ধ শুকিয়ে ঘুম ভাঙ্গাতে হয় । হুটহাট একটা ছেলের ঘরে একটা মেয়ে ঢুকে পড়ে ! কোনো বাঁধা নেই ? জড়তা নেই কারোর মাঝে ! ফুলের ও না , আর ফুলের মালির ও না দেখছি । কতদিন ধরে চলছে এসব ?
অংকুর কপাল কুঁচকালো বইয়ের পাতায় নজর রেখেই । কিসব উল্টো পাল্টা বকছে এই মেয়েটা ?
অংকুর নিজ ইচ্ছায় শুনেও শুনলো না । বালা গজগজ করে উঠলো । এক ঝটকায় এগিয়ে ক্ষিপ্ত কন্ঠে কেঁপে কেঁপে বললো….
” এই যে , শুনছেন আমার কথা ? আমি কিছু বলছি…
” শুনছি !
” কোই ?
” কান দিয়ে শুনছি । কান কানের জায়গাতেই আছে….
” শুনুন , মন দিয়ে শুনুন আমার কথা ।
” মন তো দিয়েই দিয়েছি !
না তাকিয়ে একই ভঙ্গিতে উত্তর । জ্বলে উঠলো সুরবালা । বললো গলা টাটিয়ে..
” কতদিন ধরে চলছে এসব ?
” কিসব ?
” ঐ , জবা ফুলের সাথে প্রেম পিরিতি ?
বই থেকে নজর সরিয়ে সামনে দৃষ্টি পাত করলো অংকুর । তবুও তাকালো না বালার দিকে । বললো কপাল গুটিয়ে…
” কিসব বলছো ?
” যা বলছি তাই । একটা মেয়ের সাহস কি করে হয় একটা বিবাহিত ছেলের ঘরে ঢোকার ? কোনো বাঁধা নেই এতে ? কোন অধিকারে ও আমার ঘরে ঢুকেছে ? বলুন ? আগেও রোজ রোজ হুটহাট এভাবে আপনার ঘরে ঢুকতো ? ঘুম থেকে জাগাতো আপনাকে ? কেনো , হ্যাঁ ? একা একা ঘুম থেকে উঠতে পারেন না ? ঘুম থেকে জাগানোর জন্য আলাদা করে বান্ধবী কে রাখতে হবে ? কেনো ?
” একা একা ঘুম থেকে উঠতে আলসেমি লাগে , তাই বান্ধবী কে রাখতে হয় ! বুঝলে ?
ক্ষিপ্ত চাহনি আরো বেশি ক্ষিপ্ত হলো বালার । গর্জে উঠলো সে….
” আবার বেসরমের মতো স্বীকার করছেন ?
” মিথ্যে বলি না । সত্যি টাই বললাম তাই…
” চুপ করুন অসভ্য লোক । আমি থাকবো এই ঘরে । যে ঘরে অন্য মেয়ের পা পড়বে , সেই ঘরে থাকবো না আমি । আপনি থাকুন আপনার জবা ফুল বান্ধবী কে নিয়ে । রোজ রোজ ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতে আসবে তো সে …
” সুরবালা !!
” কথা বলবেন না আমার সাথে ! আমি চললাম মায়ের ঘরে । আজ থেকে সেখানেই থাকবো আমি !
বালা পা বাড়াতে গেলে আকস্মিক ওকে আটকাতে ওর আঁচল টেনে ধরলো অংকুর । স্পর্শ করা তো বারন ।
আঁচলে টান পেতেই ঝট করে পিছু ফিরলো বালা । অমনি চোখ সরালো অংকুর । অন্য হাতে চোখ থেকে চশমা খুলে উঠে দাঁড়ালো । আঁচলের কোণা হাতে পেঁচিয়ে সুরবালার দিকে এগোলো । সুরবালার শাড়ি পেঁচানো নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বলল ধীরে…..
” তোমার কি কোনো ভাবে হিংসে হচ্ছে ?
” হিংসে ? আমার ক্যান হিংসে হবে ?
” জবা শুধু…..
কথা শেষ করতে পারলো না অংকুর । শুরুই করতে পারলো না । তার আগে ঝাঁজিয়ে উঠলো সুরবালা….
” খবরদার ঐ মেয়ের নাম মুখে উচ্চারণ করবেন না ।
এবার এক পলকের জন্য বালার চোখে চোখ রাখলো অংকুর । এক পলকেই চোখ সরিয়ে নরম হাসলো । বললো পেঁচানো শাড়ির আঁচল নিজের হাত থেকে ছাড়াতে ছাড়াতে….
” আমার মুখে উচ্চারিত হওয়া একটা মেয়ের নাম ও সহ্য করতে পারছো না তুমি । অথচ আমি ? প্রতিনিয়ত তোমার হৃৎস্পন্দনে স্পন্দিত হওয়া অন্য কারোর নাম কে সহ্য করছি । আমার ঘরে একটা মেয়ে পা রেখেছে বলে সহ্য হচ্ছে না তোমার , অথচ তোমার পুরো মন জুড়ে অন্য কারোর দখলকারী , বিচরণ থাকা সত্ত্বেও তা সহ্য করে যাচ্ছি আমি ! বিষয়টা অদ্ভুত না….
ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো বালা । ক্ষিপ্ত ভঙ্গিমা শিথিল হয়ে আসলো নিমিষেই । অংকুর আঁচল ছেড়ে দিয়েছে । এক মুহুর্তের জন্য ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলো না বালা । চোখ নামালো সে । রুদ্ধ গলায় ঢোক গিলে চোখ তুললো আবার । কথা কাটিয়ে বললো কাঁপা গলায়…
” ঐ মেয়েটা যদি আর কোনো দিন এই ঘরে আসে , তাহলে সেদিনই এই ঘরে শেষ দিন হবে আমার । মনে থাকে যেনো…
হাসলো অংকুর । বুঝলো বালার প্রসঙ্গ পাল্টানোর কায়দা । সে আবার গিয়ে বসলো আগের জায়গায় । বই হাতে তুললো আবার । সেই ছেড়ে যাওয়া লাইনের পর নজর বুলিয়ে পড়তে শুরু করলো বই । বালা খানিক দাঁড়িয়ে থেকে ডাকলো…
” শুনুন !
” শুনছি !
” এভাবে নয় !
” কিভাবে ?
” বই রাখুন !
অংকুর শ্বাস ফেলে বইটা রাখলো । হেলে বসলো সামনের দিকে । ও তাকাচ্ছে না বালার দিকে । বালা সেই কাল থেকে লক্ষ্য করছে এটা । বালা এগিয়ে সামনে দাঁড়ালো । তবুও অংকুর চোখ না তুললে খানিক বিরক্তি নিয়ে বললো বালা…
” এভাবে চোখ ফিরিয়ে আছেন কেনো ? আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলুন । আমার দিকে তাকিয়ে কথা না বললে ভালো লাগে না আমার….
অংকুর চাইলো ঝট করে । বললো ও তড়িতে…
” কি চাও বলতো তুমি ? তোমাকে স্পর্শ করতে বারন করো আমায় , আবার হুটহাট আচমকা নিজে থেকেই আমাকে জড়িয়ে ধরো । তোমার দিকে তাকাতে অবধি বারন করো , এখন আবার না তাকলে ভালো লাগে না তোমার ? আসলে চাও টা কি ? কি ভালো লাগে তোমার ?
খানিক নিরেট তেজ অংকুরের গলায় । বালার সহ্য হলো না এটাও । সেও তেজ দেখালো…
” আমি যা চাই তাই । যেভাবে চাই সেভাবেই চলতে হবে আপনাকে !
” কেনো চলবো আমি ?
” কারন আপনি বিয়ে করেছেন আমাকে !
” তুমিও তিন কবুল পড়েছো , এটা ভুলে যেও না । স্ত্রী তুমি আমার…
” তো কি ? স্বামীর অধিকার চাই আপনার ?
অংকুর তৎক্ষণাৎ দাঁড়ালো । বলে উঠলো তৎক্ষণাৎ শক্ত রাগান্বিত কন্ঠে…
” সুরবালা ! কথা উল্টো পথে ঘোরাবে না । শুনতে ঘৃনিত লাগে এভাবে বললে…
বালার চোখ ছলছল । চোখে টই-টুম্বুর পানি দেখে ছলকে উঠলো অংকুর । ব্যাস্ত হয়ে বললো….
” আরে কাঁদছো কেনো ? কি এমন বললাম ?
” রাগ দেখালেন কেনো আমায় ? আমি বলেছি না আমি যেভাবে বলবো সেভাবেই চলতে হবে আপনাকে । আমি যখন যা বলবো তাই করতে হবে ।
” আচ্ছা , তাই করবো ! চুপ করো । পানি মোছো চোখের ।
” আপনি মুছিয়ে দিন ।
চোখ নামিয়ে আবদারের স্বর সুরবালার । অংকুর হতবাক হলো । স্থির হয়ে দাঁড়ালো ঠাঁয় ।
” কি হলো , মুছিয়ে দিন ।
নড়ে চড়ে উঠলো সে । কাঁপল দৃষ্টি । ঘন পলক পড়লো চোখে । ঢোক গিললো অংকুর । নরম এক পা এগিয়ে হাত বাড়িয়ে বৃদ্ধা আঙ্গুলের সাহায্যে সুরবালার চোখের কোনে সদ্য জমা চিকচিকে অশ্রু কণা টুকু মুছিয়ে দিলো আলগোছে । চোখ বুজলো মেয়েটা ।
বাড়িতে আসার পর আফতাব আর বেরোয় নি বাড়ি থেকে । সন্ধ্যা হতেই ময়না কে বসিয়েছে পড়ার টেবিলে । খাটের পাশে টেবিল । ও বসেছে খাটে পা ঝুলিয়ে । ময়না টেবিলের সামনে চেয়ারে । বসলো সবে । চুপচাপ দু’জনেই বসে । মাথা নত করে টেবিলের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আফতাব । মুখের ভঙ্গিমা স্থির, দুর্বোধ্য । ময়না গুটিয়ে বসে । সে এতক্ষন বাইরে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিল খালেদার সাথে রান্না বাড়ায় । আফতাব একবার বাইরে বেরিয়ে খালেদা কে উদ্দেশ্য করে বলছে…
” আম্মা , ওকে বলো গিয়ে পড়তে বসতে ! এভাবে কাজ দেখাচ্ছে কাকে ?
ব্যাস , খালেদা বুঝে ঘরে পাঠালেন ময়না কে । ময়না নিজে থেকেই টেবিলের সামনে বসেছে । আর বলতে হয় নি একবার ও । শুকনো অসহায় হয়ে বসে আছে । বাংলা বইটা টেনে সামনে নিয়েছে নিঃশব্দে । আফতাবের নিঃশব্দতা , আর প্রতিক্রিয়া হীন দেখে মাথা নামিয়ে আচমকা বলে বসলো ধরা গলায়….
” আমার জায়গায় আপা থাকলে আপনি খুব খুশি হইতেই , তাই না ?
বিজ্ঞদের মতো শোনালো কথা টা । যেন কতটা বুঝে বলেছে কথাটা । আফতাব তড়িতে চাইলো । কম্পিত হলো দৃষ্টি । ভাঁজ করে রাখা দুহাত আলগা হলো অমনি ।
এক পলকে চোখ সরিয়ে বললো গুরুত্বর ভঙ্গিতে…
” তোমার জায়গায় তোমার আপা থাকলে , তুমি এখানে থাকতে না । আর না আমি এখানে থাকতাম । দেশেই থাকতাম না হয়তো ।
” খুশি হইতেন কি না , এইটা জিগাইছি ?
” খুশি হওয়ার মতো কিছু নেই । যা হবার তা হয়েছে ।
” আপা টা খুব ভাগ্যবতী , জানেন ?
হাসলো আফতাব । খানিক শব্দে । ঘাড় নাড়ালো দুদিকে , হ্যাঁ বোধক সায় ময়নার কথায় । বললো দীর্ঘশ্বাসে..
” হয়তো !
” এখনো মনে করেন আপা রে ?
” নাহ…
” সত্যিই ?
” মিথ্যে বলি না ।
” এইতো কইলেন !
” মনে করলেও তোমার কি ?
” কিছু নাই !
” একটা কথা কি জানো ? আমরা দুজনেই এক দিক থেকে এক । আমিও তোমার জীবনে দ্বিতীয় কেউ, আর তুমিও আমার জীবনে । পার্থক্য এখানে, তুমি প্রথম জনকে পেয়েছিলে , সে তোমার থাকতে পারে নি । আর আমি প্রথম জনকে পাই নি , সে আমার হয়ই নি ।
তাই মনেই না হয় তাকে রাখলাম । কপালে নেই তো কি , মনে থাক !
” আমারে ছাইড়া দিবেন তাইলে ?
রুদ্ধ গলায় কোনো রকমে প্রশ্ন । চোখ নিচু , আড়াল সজল দৃষ্টি । আফতাবের উত্তর ভনিতা হীন….
” আমার ছাড়ার ইচ্ছে নেই । তুমি যদি ছাড় চাও , তাহলে ছাড়বো !
চকিতে চোখ তুললো ময়না । ভরাট অক্ষি যুগল থেকে মুহুর্তেই পানি গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে । অক্ষিপট ভিজে জবজবে । কাঁদো কাঁদো চেহারার ভঙ্গিমা । নাকের ডগা লালচে । পাতা ফুলে ফুলে উঠছে শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে ।
বললো দম আটকে কন্ঠ চিপে…
” মনে জায়গা দিতে না পারলে আমারে রাইখা কি করবেন ?
আফতাব সুক্ষ্ম নেত্রে তাকালো । বললো…
” বড়দের মতো কথা বলছো বেশ !
” ছোট নই আমি !
” বড় ও নও ।
আমার জীবনে তো জায়গা পেলে , কপালেও ঠাঁই আছে তোমার , মনেও চাই ?
” চাই ! আরো একজনের তো জীবনে জায়গা পাইছিলাম , কোই তারে তো পাই নাই । মনে জায়গা পাইলে হেয় ছাড়তো না আমারে…
” ওর সাথে আমার তুলনা ?
” না !
” আমি তোমার থেকে কমপক্ষে এগারো বছরের বড় !
” জামাই কোনো দিন বউয়ের থাইকা বয়সে ছোট হয় নাকি ?
” এভাবে কথা বলছো , লজ্জা করছে না ?
” না , লজ্জা শরম কম আমার !
হাসলো আফতাব ।
” তাহলে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলো, দেখি কত কম লজ্জা শরম !
তাকালো ময়না । কাঁদো কাঁদো চেহারায় বদল এসেছে । চোখে চোখ রেখেও একটুও সংকোচ জাগলো না আজ । বরং চোখ সরু করলো ময়না । আফতাব হেসে বলল…
” ছোট মানুষ তো , বয়স কম তাই লজ্জা ও কম । আর একটু বড় হও লজ্জা পাবে তখন ! এখন লজ্জা পাওয়ার বয়স নয় । পড়াশোনা করার বয়স ।
এখন পড়াশোনা করো , বই ওভাবে সামনে ধরে না রেখে পাতা উল্টাও !
ঠোঁট উল্টে আহত চোখে চাইলো ময়না । আফতাব বাংলা বই খানা হাতে তুললো । এখনো কড়কড়ে নতুন বইটা । গত দুই বছরে বই উল্টেছে কি না সন্দেহ । তবুও কিছু বললো না আফতাব । শুধালো গম্ভীর স্বরে…
” কি কি পারো ?
” পড়াশোনা বাদে সব !
ঝট করে উত্তর ময়নার । আফতাব চেয়ে বললো…
” পড়াশোনার মধ্যে কি কি পারো ?
” আমি ? পারি তো , সবি পারি । বাংলা,আরবি, বিজ্ঞান, আর ইংরেজি ও পারি !
” আর অংক ?
আদলে পরিবর্তন আসলো ময়নার । বললো খানিক থতমত খেয়ে…
” উমমমম , সেইটাও পারি ।
” কি কি !
” যোগ, বিয়োগ , গুন , ভাগ , সব ?
” এগুলো বাচ্চারাও পারে !
” আমিও তো বাচ্চা ! আপনিই তো কইলেন ?
” হুঁ । বাচ্চাই তো !
এই বাচ্চাটা যদি ভালোভাবে পড়াশোনা করে ভালো রেসাল্ট করতে পারে , তাহলে এই বাচ্চাটাকে একটা উপহার দেবো ! যদি উপহার পেতে চাও , তাহলে পড়াশোনা করো এই কদিন মন দিয়ে ।
চিকচিক করে উঠলো ময়না । গদগদ হয়ে শুধালো আফতাবের দিকে শরীর ঘুরিয়ে….
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩৯
” কি দিবেন ?
” সেটা পরে দেখতে পাবে !
” এখন কন , যেমন উপহার হইবো তেমন ভালো ফলাফলের চেষ্টা হইবো । কন আগে ….
” অর্থ বুঝে স্বার্থ । আমার স্বার্থ কম । খুব দামি কিছু আশা করো না । তবে কম দামি কিছু দেবো না এটা জেনে রাখো । অমূল্য কিছু পাবে..

Story ta anek sundor please next part dien