Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৪

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৪

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৪
আরোবা চৌধুরী আরু

অন্যদিকে ফ্রেশ হয়ে এসে, নাফিসা বিছানার একপাশে চুপচাপ বসে আছে। সায়মান ওর দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে আলমারির পাশের ছোট টেবিল থেকে একটা ট্রে তুলে আনল।
ট্রেতে ভাত, মুরগি আর একটু সবজি রাখা।নাফিসা অবাক হয়ে তাকাল।
— আপনি… এটা কখন আনলেন?
সায়মান স্বাভাবিক গলায় বলল,

— নিচে সবাই যখন খেতে বসেছে তখনই রাজিব দিয়ে পাঠিয়েছি।
তারপর বিছানায় বসে ট্রেটা নিজের সামনে রাখল।
— এসো।
নাফিসা একটু ইতস্তত করল।
— আমি তো গাড়িতে খেয়েছি।
সায়মান সংক্ষেপে উত্তর দিল,
— ঠিকমতো খাওনি।
তারপর প্লেটটা হাতে নিয়েই বিছানার পাশে বসে ভাত মেখে ছোট করে এক লোকমা এগিয়ে ধরল।
— খাও।
নাফিসা একটু ইতস্তত করল। নাফিসা আর কিছু বলল না। চুপচাপ মুখ খুলল। সায়মান ধীরে ধীরে তাকে খাওয়াতে লাগল। ভালোই লাগে তার সায়মানের হাতে খেতে। দু-এক লোকমা খাওয়ানোর পর তার হাত থেমে গেল। অজান্তেই তার দৃষ্টি নাফিসার পেটের দিকে গেল। খুব স্বাভাবিকভাবেই হাতটা সেখানে রেখে দিল।
কিছুক্ষণ নীরবতা রইল। তারপর নিচু গলায় বলল,

— আজ অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছো।
নাফিসা আস্তে বলল,
— সবাই করছিল।
— সবার সাথে তোমার তুলনা করতে গেলে হবে না। ইডিয়েট! এখন থেকে একটু সাবধানে থাকবে।
কথাটা বলার সময় তার হাতটা আলতো করে নাফিসার পেটের উপর বুলিয়ে গেল। নাফিসা মাথা নেড়ে বলল,
— থাকব।
সায়মান আবার ভাত মেখে লোকমা এগিয়ে দিল। নাফিসা খেতে খেতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।হঠাৎ সায়মান নিচু গলায় বলল, যেন খুব স্বাভাবিক কথাই বলছে,
— এই যে বেবি, বেশি জ্বালাবে না কিন্তু তোমার আম্মুকে।
নাফিসা একটু থমকে তার দিকে তাকাল। বুঝতে দেরি হলো না—কথাটা সে পেটের ভেতরের ছোট্ট মানুষটাকে বলছে। তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
সায়মান চোখ তুলে তাকাল।

— হাসছো কেন?
— কিছু না।
সে মাথা নেড়ে আবার খেতে লাগল।কিছুক্ষণ চুপচাপ কেটে গেল। সায়মান শেষ কয়েকটা লোকমা খাইয়ে প্লেটটা সরিয়ে রাখল।
তারপর আবার হাতটা নাফিসার পেটের উপর রেখে খুব শান্ত গলায় বলল,
— নিজের খেয়াল রাখবে। এখন আর তুমি একা না।
নাফিসা ধীরে সায়মানের হাতের উপর নিজের হাত রাখল।

খাওয়া শেষ হতে হতে রাত অনেকটা গড়িয়ে গেছে। ডাইনিং টেবিল গুছিয়ে সবাই ড্রয়িংরুমে গোল হয়ে বসে পড়ল। কেউ সোফায়, কেউ কার্পেটে পা ছড়িয়ে। রিদওয়ান বলল,
— এই রে, এমন জমজমাট আড্ডা অনেকদিন হলো হয়নি।
রায়হান রিদওয়ানের মাথায় একটা গাট্টা মেরে বলল,
— বেশি কথা বলিস, ছোট মানুষ। চুপচাপ মুখ বুজে বস।
রিদওয়ানের মুখটা বেজার হয়ে গেল। আস্তে আস্তে সবাই গল্প-আড্ডায় মত্ত হতে থাকল। জারিন হাসতে হাসতে গল্প করছে রুহি আর রিশার সাথে। কোণায় বসে সাইফান মুখ গোমড়া করে আছে।
— এই… — সে ধীরে ডাকল, — জারিন…
জারিন শুনেও না-শোনার ভান করল। রুহি বলল,
— তারপর কী হলো, বলো?
জারিন আরো উৎসাহ নিয়ে বলতে শুরু করল।সাইফান এবার একটু জোরে বলল,
— এই, চশমা…
জারিন একবারও তার দিকে তাকাল না। রিদওয়ান ফিসফিস করে বলল,

— ভাই, ভাবি কিন্তু আজকে তোকে পাত্তাই দিচ্ছে না।
সাইফান দাঁত চেপে বলল,
— আমি দেখতেছি।
আবার ডাকল,
— জারিন, ওঠো না একটু।
— কেন? — জারিন এবার তাকাল।
— মানে… এই যে… রাত তো অনেক হলো।
রাজিব হেসে বলল,
— কী সাইফান, এখন তো সকাল হতে আসলো! একবারে কালকে করিও বাসর। আজকে আমরা গল্প করেই কাটাই দিই।
সবাই হো হো করে হেসে উঠল। সাইফানের মুখটা বাংলার পাঁচের মতো হয়ে গেল। তারপর ক্ষুব্ধ হয়ে বলল,

— তোমরা সবাই আমার শত্রু! আমি সদ্য বিবাহিত মানুষ, আমারও অনুভূতি আছে! এতদিন ধরে মধু খাওয়ার জন্য বসে আছি, কোথায় আমাকে একটু হেল্প করবা মধু খাওয়ার জন্য, তা নাই—বালের গল্প বসিয়েছে!
আকাশ চুপচাপ বসে চা খাচ্ছিল। সাইফান হঠাৎ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— এই তুই! তোর কি বাসর নাই? এখানে বসে গল্প করছিস কেন?
একসাথে সবার চোখ ছোট হয়ে গেল। আকাশ চুপ করে আছে, কথার কোনো উত্তর দিল না।
সেটা দেখে সাইফান দাঁতে দাঁত চেপে রিশার দিকে তাকিয়ে বলল,
— এই ছেমড়ি, এই! শুটকি, বাসর করবি না নাকি রে? বিয়ে করার জন্য তো লাফাচ্ছিলিস, এখন বরকে পেয়ে একটু ঘরের মধ্যে নিয়ে গিয়ে একটু ইটিশ-পিটিশ করবে তা না! এখানে গল্প করছিস কেন? মাথায় বুদ্ধি বলে কিছু নাই, শুধু মাথাই গু আছে। বিয়ে করেছিস একটা নিরামিষের সাথে, আবার তুইও নিরামিষ! আমি আদৌ মামা ডাক শুনতে পারবো তো?
সাইফানের কথা শুনে রিশা নাক সিটকালো।

— মুখ সামলে কথা বলবে ! তুই-ই সবচেয়ে বড় অভদ্র, ভাইয়া!
জারিন সঙ্গে সঙ্গে সায় দিল,
— বিরাট অভদ্র লোক একটা! আমার কপালে লাস্টে এটাই জুটল শেষে !
তারপর সাইফানের দিকে তাকিয়ে ভ্রু উঁচু করে বলল,
— শোনো, আমরা দুই বান্ধবী আজকে একসাথে থাকব।অনেকদিন পর জমে গল্প করছি, কেউ ডিস্টার্ব করবে না।
কথাটা শোনার পর সাইফানের চেহারা এমন হলো যেন সত্যিই আকাশ থেকে পড়ে মাটিতে পড়েছে।
— কীইইই বললা? — সে বুক চেপে ধরল। — মানে আমি বাসর রেডি, রুম রেডি, মন রেডি… আর তোমরা বান্ধবী নাইট করবা?
সবাই হেসে লুটোপুটি। সাইফান মাথায় হাত দিয়ে ঘুরতে লাগল,

— হায় রে কপাল! বিয়ে করলাম বউ পাইছি, কিন্তু বউয়ের টাইম নাই! এই জীবন রেখে কী করব আমি?
হঠাৎ দৌড়ে গিয়ে আকাশের গলা জড়িয়ে ধরল।
— ভাইইই! তোর বউকে সামলা! আমার বউ তো তারছিরা! নিজের ভালো বোঝে না! দেখ, বাসর না হলে মা হবে কেমনে? আমি আদৌ বাবা ডাক শুনতে পারব তো? আমার বংশ রক্ষা হইব কবে? ভাই, কিছু একটা কর!
আকাশ বিব্রত হয়ে বলল,
— আগে ছাড়, গলা ভেঙে যাবে!
সাইফান কান্নার ভান করে বলল,
— আমি এভাবে শুকনা মুখে রাত কাটাব? এটা অন্যায়! আমি বিচার চাই!
রাজিব হেসে উঠে বলল,
— আরে সাইফান, একবারে কালকে করিও। আজকে আর বিয়ে কইরো না! একটু রেস্ট নাও, শরীর-স্বাস্থ্য ভালো থাকলে বংশও ভালো থাকবে!
আবার সবাই হো হো করে হেসে উঠল। সাইফান মাটিতে বসে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
— এই সংসারে আমার কেউ নাই! আমি একা! সদ্য বিবাহিত হয়েও নির্যাতিত স্বামী!
রায়হান বলে উঠলো,

— নাটক কম করো প্রিয় । বেশি বাড়াবাড়ি করলে সায়মান ভাইকে ডাক দিব সে এখন বউয়ের সাথে মধুর মিলন করতেছে। এই সময় ডাক দিলে রেগে যাবে আর তোর হাল খারাপ করব তা নাই আমাদের গল্প করতে দে।
সাইফান থমকে গেল।
— না না, আমি চুপ! তোমরা গল্প করো… কিন্তু একটু তাড়াতাড়ি শেষ করো প্লিজ! আমার ভবিষ্যৎ ঝুলে আছে!
ওরা আবার গল্প শুরু করলো, সাইফান বুঝল, এভাবে কিছু হবে না।হঠাৎ চুপচাপ উঠে দাঁড়িয়ে জারিনের পাশে গিয়ে বসল। ধীরে ধীরে তার হাতটা ধরল। জারিন চমকে তাকাল,
— কী করছো?
— উঠো।
— কোথায়?
— রুমে।
— এখন? সবাই বসে আছে! আর আমি বললাম না আজকে রিশার সাথে থাকবো।
— চুপ শালী জামাই রেখে বান্ধবীর কাছে যাবে লজ্জা করে না বেশি কথা বললে এখানে বাসর শুরু করে দিব । আমার বউ লাগবে।চুপচাপ চল না হলে আমি যা বলি তাই করি কিন্তু,,,
সায়ফান সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আস্তে আস্তে উঠে, জানিনা রে হাত ধরে দ্রুত তাকে নিয়ে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। রুমে ঢুকতেই জারিন হাত ছাড়িয়ে নিল।

— তোমার সমস্যা কী?
সাইফান জারিনের দিকে এগিয়ে এল।
— এতক্ষণ ইগনোর করছিলে কেন?
— আমি ইগনোর করেছি?
— হ্যাঁ! তোমার বিয়ে হয়েছে ক’টা? জামাই বাসরের জন্য মরে যাচ্ছে, আর তুমি বসে গল্প করছো!
জারিন চোখ ছোট করে তাকাল।
— তোমার মতো নির্লজ্জ মানুষ একটা দেখিনি। সবার সামনে কীভাবে এসব বলো?
সাইফান হেসে বলল,
— চশমা বেবি, রাগো কেন? আসো, আদর করি।
— দূরে থাকো।
সে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলো। সাইফান পেছন থেকে তার হাত ধরে টান দিল। জারিনের পিঠ গিয়ে ঠেকল সাইফানের বুকে।
এক মুহূর্ত চুপ। সাইফানের গলার স্বর নরম হয়ে গেল।

— এত সুন্দর লাগছে আজকে… জানো?
জারিন একটু নড়েচড়ে সরে যেতে চাইল।
— ছাড়ো।
— না।
সে ধীরে ধীরে তাকে নিজের দিকে ঘুরাল। দুজনের চোখে চোখ।
— এতক্ষণ সত্যি রাগ করছিলে?
জারিন ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
— হ্যাঁ।
— আমার উপর?
— হ্যাঁ।
— কেন?
— ভাইয়ার সাথে ওমন না করলেও পারতে।
সাইফান হালকা হেসে কপালে নাক ছুঁইয়ে দিল।
— ওমন না করলে তোমার ভাই আমাদের আসতে দিত তুমি আমার কাছে থাকতে বলতো।
বলেই সায়ফান একটু ঝুঁকে এল। জারিন চোখ বন্ধ করে ফেলল অজান্তে। জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে দুজনে সাইফান ধীরে ধীরে জারিনের ঠোঁটের কাছে এগুলো ঠিক সেই সময়,
ঠক ঠক ঠক! দরজায় জোরে ধাক্কা। সাইফান বিরক্তি হয়ে দাঁত চেপে বলল,

— কে রে আবার!
বাইরে থেকে রিদওয়ানের গলা,
— ভাই, সবাই লুডু খেলতেছি। একজন কম পড়তেছে, তাই তোকে ডাকতে আসলাম! তুই কখন চলে আসলি রুমে।
সাইফান বিরক্তিতে বলে উঠল,
— ধুর! আমি অলরেডি লুডু খেলতেছি! এখনই ছয় ফেলে পুরো বোর্ড উল্টে দিলাম! আমারে কি ঠিকমতো বাসরটাও করতে দিবা না নাকি? হে আল্লাহরে বিচার করো!
বাইরে হাসির রোল পড়ে গেল। আবার ধাক্কা।
— এই সময়ে ডিস্টার্ব করার মানে কী? — সাইফান চেঁচিয়ে বলল।
বাইরে থেকে রাজিব বলল,

— নাটক কম কর, পাঁচ মিনিটের জন্য আয়!
সাইফান দরজার দিকে এগোতে গেল। জারিন হাসি চেপে বলল,
— যাও না, লুডু খেলো।
সে ঘুরে তাকাল।
— তুমি খুব মজা পাচ্ছো, তাই না?
জারিন মাথা কাত করে বলল,
— একটু।
সাইফান দরজার কাছে গিয়ে থেমে গেল। হঠাৎ ফিরে এসে আবার জারিনের হাত ধরল।
— কেউ ডাকলে যাবো, কিন্তু আগে…
সে ঝট করে তার কপালে একটা চুমু দিল।

— এইটা আমার।
জারিন লজ্জায় মাথা নিচু করল।
বাইরে আবার ধাক্কা—
— ভাইইই! ঘুমাইয়া পড়ছো নাকি?
সাইফান বিরক্ত হয়ে দরজা খুলতে গেল।
— আসতেছি! মানুষরে শান্তিতে থাকতে দে!
জারিন পেছনে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসল। সায়ফান দরজা খুলে সবার দিকে তাকালো সবাই মিস করে হাসতে ওর দিকে থাকে,

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৩

— তোমরা জেনে শুনে আমার সাথে ষড়যন্ত্র করছ তাইনা। আমার নাম সাইফান রাশিদ ভুলে যেও না। তোমাদের সবার পিছনে লাগলে কেউ ছাড় পাবে না। আর একবার দরজা নক করবে না বলে সকলের মুখের উপর ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিল।
চার বছর ওগো বুঝে নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করে জারিন এর দিকে তাকালো মুচকি একটা হাসি দিয়ে,
— কি চশমা আপা আমার থেকে রক্ষা পাবেন এবার কিভাবে। উফফ খেয়ে ফেলবো একদম।
বলেই সাইফান জারিনের দিকে এগোতে থাকলো….

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৫