Home ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৪৭+৪৮

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৪৭+৪৮

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৪৭+৪৮
তানিশা ভট্টাচার্য্য

চৌধুরী নিবাসের আধুনিক স্থাপত্যের কারুকার্য সকালের আলোয় যেন আরও বেশি রাজকীয় হয়ে ওঠে। প্রাতরাশের টেবিলে এক গম্ভীর প্রশান্তি নিয়ে বসে ছিল আর্ভিক। কফিতে চুমুক দিয়ে ও হঠাৎ তানভীর দিকে তাকিয়ে তলোয়ারের মতো ধারালো গলায় বলল
-“অনেক গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরেছিস, এবার একটু পড়াশোনায় মন দে। আজ সন্ধ্যাবেলা অফিস থেকে ফিরে তোকে পড়াবো, দ্বাদশ শ্রেণীর পড়াশোনা আজ থেকেই শুরু হবে। আমার রুমে চলে আসিস।”
তানভী কোনো প্রতিবাদ না করে নিঃশব্দে সম্মতি জানাল। আর্ভিকের হুকুম অমান্য করার সাধ্য তার নেই। কথামতো সন্ধ্যায় বই-খাতা বুকে আঁকড়ে তানভী আর্ভিকের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। আর্ভিক তখনও অফিস থেকে ফেরেনি, তবে ফোনে জানিয়ে দিয়েছে তানভী যেন ওর রুমে বসেই অপেক্ষা করে।

ধীর পায়ে তানভী রুমের ভেতরে ঢুকল। আধুনিক আর আভিজাত্যের এক নিখুঁত মেলবন্ধন এই রুমটি। বিশাল বড় রুম, যার একদিকের দেওয়াল জুড়ে কাঁচের স্লাইডিং ডোর। সাদা সিল্কের পাতলা পর্দাগুলো বসন্তের অবাধ্য হাওয়ায় মাঝেমধ্যেই ফুলে উঠছে, যেন কোনো অপার্থিব নৃত্য চলছে ঘরের কোণে। সিলিং থেকে ঝুলছে কারুকার্যময় ঝাড়লণ্ঠন, যা থেকে ঠিকরে পড়া আলো ঘরের দামি আসবাবপত্র গুলোকে এক মায়াবী রূপ দিয়েছে। মেঝের ওপর পুরু পারস্য গালিচা পা রাখা মাত্রই পায়ের পাতা ডুবিয়ে দেয় এক অদ্ভুত আরামদায়ক উষ্ণতায়।
তানভী এর আগে বহুবার এ রুমে এলেও আজ যেন একা থাকার সুযোগে সবটা নতুন করে দেখছিল। ঘরের এক কোণে ছাদ ছুঁইছুঁই বিশাল এক ওক কাঠের বুকশেলফ। আর্ভিকের যে বই পড়ার নেশা আছে, তা এই সংগ্রহের বহর দেখেই বোঝা যায়। কৌতূহলবশত তানভী উঠে গিয়ে শেলফের সামনে দাঁড়াল। ওর চোখ গেল ওপরের দিকে রাখা একটি নীল মলাটের বইয়ের ওপর।

বইটি সজোরে টানতেই ভারসাম্য হারিয়ে অন্য একটি বই নিচে পড়ে গেল। তানভী অপ্রস্তুত হয়ে সেটি তুলতে গিয়ে শেলফের ভেতরের দিকের একটি অদ্ভুত লিভারের মতো অংশে চাপ দিয়ে ফেলল। মুহূর্তের মধ্যে এক যান্ত্রিক ঘড়ঘড় শব্দে ঘরটি কেঁপে উঠল। তানভী বিস্ময়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে দেখল, বুকশেলফ সংলগ্ন আলমারির বিশাল অংশটি নিঃশব্দে একপাশে সরে যাচ্ছে।
সেই আলমারির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গোপন পথ। দেওয়ালের মাঝখান থেকে বেরিয়ে এল এক নিরেট দরজা, যা ধীরে ধীরে খুলে গিয়ে এক অন্ধকার কুঠুরির ইঙ্গিত দিল। তানভীর হৃৎপিণ্ড তখন ড্রাম বাজাতে শুরু করেছে। ও স্বপ্নেও ভাবেনি এই ঘরের অন্দরে এমন কোনো রহস্যময় সিক্রেট রুম থাকতে পারে। কৌতূহল আর ভয়ের দ্বন্দ্বে জিতে গেল কৌতূহলই। তানভী ধীর পায়ে সেই অন্ধকার ঘুলঘুলির ভেতরে পা বাড়াল। দেওয়াল হাতড়ে অনেক কষ্টে একটা সুইচ খুঁজে পেতেই জ্বলে উঠল নিওন আলো। আলোর বন্যায় চোখের পলক পড়তেই তানভী যা দেখল, তাতে ওর পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। এ ঘর তো কেবল ঘর নয়, এ যেন আর্ভিক রায়চৌধুরীর এক অন্য জগতের প্রবেশদ্বার, যা দীর্ঘকাল পৃথিবীর আড়ালে বন্দি ছিল।

এই ঘরের প্রতিটি ইঞ্চিতে মিশে আছে এক হিমশীতল গাম্ভীর্য আর ক্ষমতার আস্ফালন। ঘরের দেওয়ালগুলো কালচে ধূসর রঙের, যা নিওন আলোর বিচ্ছুরণে এক রহস্যময় আবহ তৈরি করেছে। মেহগনি কাঠের আসবাব আর চামড়ার গদি ঘেরা এই ঘরটি যেন কোনো এক ছায়া-সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ।
ঘরের মূল দেওয়ালে ঝোলানো একটি বিশাল ছবির দিকে তাকাতেই তানভীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সেই ছবিতে একজন পুরুষ বসে আছে এক রাজকীয় চেয়ারে। তার অবয়ব থেকে আভিজাত্য এবং কাঠিন্যের এক অপূর্ব মিশ্রণ ফুটে উঠেছিল। তার সুঠাম দেহের ওপর পরিহিত ছিল সাদা শার্ট তার উপর ছাই-কালো হাফ জ্যাকেট। তার শার্টের হাতা গোটানো ছিল। হাতে কালো লেদারের ঘড়ি। মুখটা এক অদ্ভুত কালো মাক্সে ঢাকা—কেবল তাঁর সেই তীক্ষ্ণ, ধাবমান বাজপাখির মতো চোখ দুটো বেরিয়ে আছে। ছবিটির বসার ভঙ্গি আর চোখের সেই অটল কাঠিন্যে দেখে মনে হচ্ছে সে এক অন্ধকার জগতের অধিপতি। পুরুষটির বসার ভঙ্গিমা দেখে তানভীর মনে হলো এটা তার আর্ভিক ভাইই সে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করল

-“এ কি সত্যিই আমার আর্ভিক ভাই? নাকি অন্য কেউ?”
দৃষ্টি সরাতেই ওর নজর গেল অন্য একটি সোনালি ফ্রেমের ছবির দিকে। ছবিতে এক বাঙালি দম্পতি; একজন মহিলার কোলে ছোট্ট এক শিশু, আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটির কোলে সাত-আট বছরের এক কিশোর। কিশোরটির চোখের চাহনি ঠিক আর্ভিকের মতো। তানভীর বুকটা হঠাৎ এক অজানা ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল। ছবিটির দিকে তাকিয়ে ও কেন জানি এক অদ্ভুত টান অনুভব করল, যেন ওই মানুষগুলো ওর ভীষণ পরিচিত, যেন কোনো জন্মান্তরের সম্পর্ক মিশে আছে ওই মানুষ গুলোর সাথে।
এরপর তানভীর চোখ গেল মাঝখানের বিশাল টেবিলটির উপর। সেখানে স্তরে স্তরে সাজানো বিভিন্ন ফাইল আর ইলেকট্রনিক গ্যাজেট। ঠিক মাঝখানে রাখা একটি ঝকঝকে রুপোলি নেমপ্লেট। তাতে খোদাই করা বড় বড় অক্ষরে লেখা— ‘এ.ভি. রয়’ (AV ROY)। নামটা দেখা মাত্রই তানভীর মাথাটা বোঁ বোঁ করে ঘুরে উঠল। সেই রাতের ফোন কলের কথা মনে পড়ে গেল ওর।

ঘরের অন্য প্রান্তে দেওয়ালে আটকানো কতগুলো কাঁচের কেবিনেট। তানভী ধীর পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল। কাঁচের ওপারে সাজানো রয়েছে অত্যাধুনিক সব মারণাস্ত্র। গ্লক পিস্তল, রিভলভার থেকে শুরু করে একে-৪৭—শোপিসের মতো সাজিয়ে রাখা হয়েছে মৃত্যুযন্ত্রগুলো। তানভীর দম যেন বন্ধ হয়ে আসছিল। একপাশে দেওয়ালে একটা বড় বোর্ডে অনেকগুলো মানুষের ছবি আর ম্যাপ পিন দিয়ে আটকানো। কোনো এক বিশাল ষড়যন্ত্র বা লক্ষ্যভেদের নিখুঁত ছক কষা হয়েছে সেখানে। তানভীর মাথায় নানান রকমের প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, সে ভাবছে
“এসব এখানে কি? আর্ভিক ভাইয়ের রুমের মধ্যে এসব কোথায় থেকে এল?? এগুলোর সাথে আর্ভিক ভাইয়ের কি সম্পর্ক। তবে কি আর্ভিক ভাই-ই সেই ভয়ংকর এভি রয়? যার নাম শুনলে অন্ধকার জগতের মানুষরা থমকে দাঁড়ায়?”
ঘরটি কেবল গোপন নয়, এটি একটি সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। মাফিয়াদের সেই নিষ্ঠুর আভিজাত্য আর রক্তের নেশায় মোড়ানো এই রহস্যময় জগত দেখে তানভী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর চেনা শান্ত আর্ভিক ভাই আর এই ভয়ংকর এভি রয় কি তবে একই মুদ্রার দুই পিঠ?

অন্ধকার প্রকোষ্ঠের সেই নিথর নিস্তব্ধতা যেন তানভীকে গ্রাস করছিল। ওর চোখের সামনে তখন হাজারো প্রশ্নের মিছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে এক জোড়া ভারী হাতের স্পর্শ অনুভব করল তানভী নিজের কাঁধে। শিরদাঁড়া বেয়ে এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল ওর। আড়ষ্ট হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, পিছনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং আর্ভিক। ওর চোখ দুটোয় কোনো ক্রোধ নেই, বরং সেখানে এক অতলান্ত বিষাদ জমে আছে।
আর্ভিক কোনো কথা না বলে তানভীকে আলতোভাবে একটি চামড়ার সোফায় বসিয়ে দিল। তারপর নিজে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসল তানভীর ঠিক সামনে। ওর কোমল দু-হাত দিয়ে তানভীর থরথর করে কাঁপতে থাকা হাত দুটো মুঠোয় পুরে নিল। আর্ভিকের কণ্ঠস্বর আজ অস্বাভাবিক শান্ত
-“সব দেখে ফেলেছিস ? ভেবেছিলাম এসব কথা তুই জানতে পারবি না, কিন্তু সত্য তো ঠিক নিজের পথ খুঁজে নেয়।”
তানভী কোনোমতে অস্ফুট স্বরে বলল

-“এসবের মানে কী আর্ভিক ভাই? এই ভয়ংকর অস্ত্র, ওই মাক্স পড়া পরা ছবি, আর এই ‘এভি রয়’ নামটা… কে সে? দেওয়ালে ওই হাসিমুখের মানুষগুলোই বা কারা?”
আর্ভিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে তানভীর চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। ধীর গলায় বলল
-“একটু ধৈর্য ধর তানভী। আজ তোর সব প্রশ্নের উত্তর দেব। ওই ছবিগুলো… ওগুলো কোনো অপরিচিত মানুষ নয়, ওটা তোর হারিয়ে যাওয়া পরিচয়।”
আর্ভিকের কথা শুনে তানভী চুপচাপ বসে থাকে নিস্তব্ধতা ভেঙে আর্ভিকের কণ্ঠস্বর এক বিষণ্ণ ইতিহাসের দুয়ার খুলে দিল। তানভী পাথরের মতো বসে রইল, আর আর্ভিক প্রতিটি শব্দের তুলিতে তার জীবনের ধূসর ক্যানভাসটা আঁকতে শুরু করল। আর্ভিক দেওয়ালে টাঙানো সেই নারী আর তেজস্বী পুরুষের ছবির দিকে আঙুল তুলে বলল

-“দেওয়ালে ওই যে মানুষ দুটোকে দেখছিস, ওরাই তোর জন্মদাতা পিতা-মাতা। আর ওনাদের কোলে যে ছোট্ট শিশুটি পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে, ওটা তুই তানভী। আর ওই ৮ বছরের বাচ্চা ছেলেটা আমি।”
তানভী বিস্ময়ে রুদ্ধশ্বাস হয়ে তাকিয়ে রইল। আর্ভিক বলে চলল
-“রুদ্র আঙ্কেল আর কাকিমণি তোর আসল বাবা-মা নন। তুই রুদ্র আঙ্কেলের একমাত্র বড় ভাই রনজয় ব্যানার্জী—অর্থাৎ আমার জেঠুমণি—আর মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী—অর্থাৎ আমার বড়মার একমাত্র সন্তান।”
তানভী আর্ভিকের দিকে অবিশ্বাস্য চাহনিতে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল
-“মিথ্যে কথা।”
-“না তানভী আজ আমি যা যা বলব সেগুলোর একটাও মিথ্যে নয়। তুই ধৈর্য্য ধরে একটু শোন।”
তানভী অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন করল
-“তবে আমার বাবা-মা কোথায় আর্ভিক ভাই? কেন বাবা আমায় তাদের কথা কোনোদিন বলেনি?”
আর্ভিক এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্মৃতির অতল গহ্বরে ডুব দিল।

-“আজ থেকে প্রায় অনেক বছর আগে আমরা সবাই তখন আমাদের গ্ৰামে থাকতাম। তোর ঠাকুমা আর আমার ঠাকুমা দুজনে খুব ভালো বান্ধবী ছিলেন ওনাদের একই গ্ৰামে বিয়ে হয়। আমার দাদু ছিলেন গ্রামের জমিদার বংশের। তোর দাদুরা জমিদার না হলেও জমিদারের থেকে কোনো অংশে কম ছিলেন না। তোদের বাড়ির নাম ছিল “রক্তিম তোরণ”।ওই দিন গ্ৰামে যে ধংস স্তূপটা দেখেছিলি ওটা তোদের বাড়ি ছিল।তোর বাবারা দুই ভাই রনজয় ব্যানার্জী আর রুদ্রপ্রতাপ ব্যানার্জী। রুদ্র আঙ্কেল আর আমার বাবা একই বয়সী হওয়ায় দুজনে খুব ভালো বন্ধু ছিল, তাছাড়া তোদের বাড়ির সঙ্গে আমাদের বাড়ির এক অন্যরকম সম্পর্ক ছিল। তোর বাবা রনজয় জেঠুমনি ছিলেন আমার বাবার বড় ভাইয়ের মতো। তখন কার দিনে গ্ৰামে অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া হতো সেই অনুযায়ী জেঠুমনিকে বড়মার সাথে বিয়ে দেওয়া হল।

একবছর বর্ষাকালে নদীর বাঁধ ভেঙে প্রবল বন্যা হলো। আমার দাদু সেখানে ত্রাণ দিতে গিয়ে এক অনাথ কিশোরীকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। মেয়েটি বন্যার জন্য পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যায়। কিশোরীটি কে আনার পর গ্রামের নানা গুজব রটতে থাকে সেসব রুখতে আমার দাদু নিজের একমাত্র ছেলের সাথেই তাঁর বিয়ে দেন—তিনিই আমার মা। বাবাও অল্পদিনের মধ্যেই মা কে মেনে নিল। দুবছরের মধ্যে আমার জন্ম হলো। পরিবারের প্রথম সন্তান, সকলের চোখের মনি হয়ে উঠি আমি। খুব আদরের সাথে আমি বড় হই। তবে আমি ছিলাম বড়মা আর জেঠুমনির প্রাণ, বিয়ে পর ওনাদের অনেক চেষ্টার পরেও কোন সন্তান হয়নি। আমি সব সময় তোদের বাড়িতে থাকতাম। আমার যখন দুবছর বয়স তখন ঋষি হল। সুখে-শান্তিতে কাটছিল আমাদের দিন গুলো।

কিন্তু একদিন দাদু আর ঠাকুমা কলকাতা থেকে গ্ৰামে ফিরছিলেন তখন তোর দাদুর ব্যবসায়িক শত্রুরা প্ল্যান করে এক ভয়ঙ্কর সড়ক দুর্ঘটনায় তোর দাদু-ঠাকুমাকে মেরে ফেলে। জেঠুমণি খোঁজ নিয়ে জানতে পারে তোর দাদুর ব্যাবসার কারণে ওদের রমরমে ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে এছাড়া ওরা আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়া। জেঠুমণি সেই প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে নিজেই আন্ডারওয়ার্ল্ডে যোগ দেন। শত্রুপক্ষকে খতম করলেও তাদের ছেলে ‘জ্যাকশন’ কোনোভাবে বেঁচে যায়।
জেঠুমণি তখন থেকেই আমাকে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে তোলেন। যুদ্ধবিদ্যা, অস্ত্র চালনা—সবই আমি শিখলাম তাঁর কাছে থেকে।”

আর্ভিক একটু থেমে জানলার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকাল। তারপর আবার বলতে শুরু করল
“আমার একটা বোন ছিল জানিস তো, কিন্তু তার জন্ম থেকে হার্টে ফুটো ছিল সে বেশিদিন রইল না আমাদের সাথে সবাইকে ছেড়ে পাড়ি দিল ফেরার দেশে। বাবা মা অনেক চেষ্টা করেছিল কিন্তু বাঁচাতে পারেনি তাকে। একমাত্র মেয়ে ছিল আমাদের পরিবারের মায়ের খুব আদরের মেয়ে আমার সাথে নাম মিলিয়ে রেখেছিল ওর নাম, আর্ভি। ওর চলে যাওয়াতে মা খুব ভেঙে পড়ে।

তার এক বছর পর জেঠুমণি ও বড়মার কোল আলো করে তুই এলি। মা তোর মধ্যে আমার বোনকে খুঁজে পেল, তোকে খুব ভালবাসত আমার মা। তোর বয়স যখন মাত্র দু-মাস, জেঠুমণি আর রুদ্র আঙ্কেল ব্যবসায়িক কাজে কলকাতা গিয়েছিলেন। ঠিক সেই রাতেই নরপিশাচ জ্যাকশন ওর বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে তোদের বাড়িতে হামলা করে। বাড়িতে তখন আমি তুই আর বড়মা ছিলাম। বড়মা তোকে আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিল, ‘বাবু, আগলে রাখিস সারা জীবন’।বড়মা আমাকে পেছনের দরজা দিয়ে পালাতে সাহায্য করে। পিছনের দরজা দিয়ে তোকে বুকে চেপে আমি যখন পালাচ্ছি জ্যাকশনের তিনজন লোক আমায় দেখতে পায়, তারা আমাকে ধরতে আসে জেঠুমনি আমাকে সবরকম পরিস্থিতিতে মোকাবিলা করতে শিখিয়েছিলেন। সেই কৌশল প্রয়োগ করে আমি বেঁচে যাই তোকে নিয়ে পালিয়ে যাই। আমি ভাবি লোকালয়ে গিয়ে লোকজন জড়ো করে নিয়ে আসবো, কিন্তু কিছুটা দূর যেতেই কানে একটা বিকট গুলির শব্দ শুনলাম। আমি বাড়িতে এসে তোকে আমার মায়ের হাতে দিয়ে সমস্ত ঘটনা বলি সবাইকে তাই শুনে বাবা লোকজন জড়ো করে সেখানে পৌঁছায়। ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গিয়েছিল আমারা গিয়ে দেখলাম বড়মার নিথর দেহটা মেঝেতে পড়ে আছে আর সারা মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছে।”
আর্ভিক ঘটনা বলতে বলতে আর্তনাদ করে উঠল, যেন সেই পুরনো ক্ষত আজ আবার তাজা হয়ে উঠেছে। তারপর নিজেকে সামলে আবার বলতে শুরু করে

-“খবর পেয়ে জেঠুমণি ফিরে এসে উন্মাদ হয়ে জ্যাকশনকে ধাওয়া করে দেশের বাইরে গেলেন, আর ফেরেননি। যাওয়ার আগে আমার হাত ধরে বলে গিয়েছিলেন—‘এভি, আমার ছোট্ট মেয়েটাকে তোর কাছে রেখে গেলাম, আগলে রাখিস’।”
তানভী অঝোরে কেঁদে চলেছে। আর্ভিক তানভীর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলল
-“এরপর কেটে যায় ৪ মাস রুদ্র আঙ্কেল সেদিনের পর থেকে আমাদের সাথে থাকতেন। তিনি তখন কলেজে ফাইনাল ইয়ারে পড়তেন। পড়াশোনার পাশাপাশি আমার দাদুর সাহায্যে তিনি আবার ব্যবসার হাল ধরলেন। তোকে মানুষ করার দায়িত্ব তিনি নিলেন। দোয়েল কাকিমণির সাথে আঙ্কেলের অনেক দিনের রিলেশন ছিল এমনকি বিয়েও ঠিক হয়েছিল, কিন্তু কাকিমনির বাড়ির লোক তোকে মানতে চায়নি। ওনারা আঙ্কেলের সাথে বিয়ে ভেঙে কাকিমণি বিয়ে অন্য জায়গায় ঠিক করে। বিয়ের আসর ছেড়ে কাকিমনি রুদ্র আঙ্কেলের কাছে পালিয়ে আসেন। আঙ্কেল কাকিমণিকে পরিবারের কাছে ফিরে যেতে বললেও তিনি ফেরেননি। এই জন্য কাকিমনির বাড়ির লোকের সাথে অনেক ঝামেলা হয়, ওনারা সব সম্পর্ক সেদিনই শেষ করে দেয়। কিন্তু কাকিমনি এতকিছুর পরেও তোকে নিজের মেয়ের চেয়েও বেশি ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছেন। এরপর আমরা সবকিছু ছেড়ে কলকাতায় চলে আসি। আমার দাদু-ঠাকুমা আসতে চায়নি। কিছু বছর পর দাদু মারা যায় বাবা ঠাকুমা কে অনেক বার কলকাতায় আনতে চেয়েছিল কিন্তু ঠাকুমা আসতে চায়নি।

আর আমি? আমিই সেই এভি রয়। জেঠুমণির দেওয়া এই নামে আমি আন্ডারওয়ার্ল্ডে সাম্রাজ্য গড়ি, কিন্তু কোনো খারাপ কাজ করি না। কেবল অন্যায়ের প্রতিবাদ করি। জ্যাকশনের সাথে আমার পুরনো অনেক হিসাব মেটানোর বাকি। আর গ্ৰামে সেদিন তোকে আমি মিথ্যে বলেছিলাম সেদিন রাতে আমি রক্তিম তোরণে গিয়েছিলাম।”
তানভী অঝোরে কাঁদছিল। ও বুঝতে পারল কেন গ্রামের সেই লোকটা তৃষাণকে ‘ভাগ্নে’ বললেও ওর দিকে ক্ষোভের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। বুঝতে পারল কেন ঠাকুমা বলেছিলেন ওকে ওর বাবার মতো দেখতে। আর্ভিকের প্রতিটি শব্দ যেন একেকটি ধারালো তলোয়ারের মতো তানভীর বুকের পাঁজর চিরে ফেলছিল। এতকাল যাকে ‘বাবা’ বলে ডেকে এসেছে, সে আসলে ওর জন্মদাতা নয়! যাকে ‘মা’ ভেবে এসেছে, সে আসলে এক অচেনা নারী! ওর সাজানো-গোছানো, আদরে মোড়ানো পৃথিবীটা এক নিমেষে তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তানভীর মনে হলো, ও যেন এক অতলান্ত শূন্যতায় তলিয়ে যাচ্ছে, যেখানে না আছে কোনো অবলম্বন, না আছে কোনো আশার আলো। ওর দু-চোখ ফেটে কান্না নেমে এল, কিন্তু বুক চিরে কোনো আর্তনাদ বেরোল না। ও কেবল পাথরের মতো নিথর হয়ে বসে রইল, আর আর্ভিকের মুখের দিকে চেয়ে রইল, যেন ও কোনো এক দুঃস্বপ্ন দেখছে।
হঠাৎ আর্ভিকের চোয়াল শক্ত হয়ে এল, চোখের মনিতে জ্বলে উঠল প্রতিশোধের শিখা। সে তানভীর হাত দুটো নিজের মুঠোর মধ্যে আরও দৃঢ়ভাবে চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল

-“জেঠুমণি আর বড়মার রক্ত বৃথা যেতে দেব না আমি। প্রতিটি গুলির হিসাব নেব, ওদের প্রত্যেককে আমি নিজ হাতে শাস্তি দেব। বড়মার সেই আর্তনাদ আজও আমার কানে বাজে তানভী, সেই শোধ আমি নেবই।”
এবার আর্ভিকের কণ্ঠস্বর নরম হয়ে এল, একরাশ আকুলতা নিয়ে সে তানভীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল
-“কিন্তু তার আগে তুই আমাকে একটা প্রমিস কর তানভী। আজ এই ঘরে যা শুনলি, যা দেখলি—তার এক বিন্দুও যেন এই চার দেয়ালের বাইরে না যায়। তুই যে সবকিছু জেনে গেছিস, সেটা বাড়ির কাউকে, এমনকি রুদ্র আঙ্কেলকেও বুঝতে দিবি না। এতদিন যেমন ছিলি, ঠিক তেমনই থাকবি। পারবি না?”
তানভী পাথরের মতো নিথর হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল আর্ভিকের দিকে। ওর বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠলেও, আর্ভিকের চোখের সেই সংকল্প দেখে ও ধীরে ধীরে সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল। এক বিষণ্ণ মৌনতায় ও আর্ভিকের হাতে হাত রেখে সম্মতির প্রমিস করল।

আর্ভিক তানভীর হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। এরপর ড্রয়ার থেকে একটি উজ্জ্বল সোনার চেইন বার করে বলল
-“জেঠুমণি যাওয়ার আগে এটা আমায় দিয়ে গিয়েছিলেন। তোর অন্নপ্রাশনের জন্য গড়িয়েছিলেন তাঁরা, কিন্তু সেই উৎসব তো আর হলো না। আজ এটা তোকে পরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে।”
আর্ভিক পরম যত্নে তানভীর গলায় সোনার চেইনটি পরিয়ে দিল। সেই উজ্জ্বল সোনার দ্যুতিতে তানভীর চোখের জল হীরের মতো চিকচিক করে উঠল। এক নিমিষেই যেন জীবনের সব কিছু বদলে গেল ওর।

সত্যিই তো, সময় সব ক্ষত মুছে দেয় না, বরং কিছু সত্যের ভার মানুষকে ভেতর থেকে নিথর করে দেয়। একটি সপ্তাহ কেটে গেছে, কিন্তু তানভীর মনের ওপর জমে থাকা সেই ঘন মেঘ এক বিন্দুও সরেনি। ওর সেই চঞ্চলতা, হাসিমুখ—সবই যেন এক রাতের ঝড়ে মিলিয়ে গেছে। সারাদিন ও বাড়ির এককোণে চুপচাপ বসে থাকে, যেন এক জীবন্ত প্রতিমা। আর্ভিকের তীক্ষ্ণ নজর এড়ায়নি তানভীর এই পরিবর্তন। ও বুঝতে পারছিল, তানভী ওর হারিয়ে যাওয়া পরিচয়ের বোঝা বইতে পারছে না। তাই আর্ভিক তানভীকে কিছুটা সময় একা থাকতে দিয়েছিল, কিন্তু তাতে কোনো লাভ হল না।
আজ সকালে আর্ভিক অফিসের জন্য রেডি হয়ে নিচে নেমে দেখল তানভী সোফায় বসে শূন্য চোখে জানলার দিকে তাকিয়ে আছে। আর্ভিক তানভীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল, গলার স্বরে কোনো কঠোরতা নেই, বরং এক অদ্ভুত মায়া নিয়ে বলল

-“কী করছিস এখানে এভাবে বসে?”
তানভী শুধু একবার নিষ্প্রাণ চোখে আর্ভিকের দিকে তাকাল, কোনো উত্তর দিল না। আর্ভিক হাল ছাড়ল না, বরং একটু জোর দিয়েই বলল
-“চটপট রেডি হয়ে নে, তোকে একটু বাইরে থেকে ঘুরিয়ে আনি।”
তানভী মৃদু স্বরে প্রতিবাদ জানাল
-“আর্ভিক ভাই, আমার কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। আপনি বরং একাই যান, আর তাছাড়া তো আপনি এখন অফিসে যাচ্ছেন।”
-“হুমম অফিসেই তো যাচ্ছিলাম, কিন্তু এখন আর যাওয়ার মুড নেই। চল ঘুরে আসি।”
-“না, ভালো লাগছে না।”
আর্ভিক এবার একটু হুকুমের সুরে বলল

-“আমি তোর থেকে পারমিশন নিইনি তানভী, তোকে রেডি হতে বলেছি। ১০ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে নিচে আয়।”
অগত্যা তানভী আর কথা বাড়াল না। কিছুক্ষণের মধ্যে একটা হালকা নীল কুর্তি আর ব্যাগি জিন্স পরে নিচে নামল, আর্ভিক তখন বাইক স্টার্ট দিয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করছিল।
বাইকের গতিতে ঝোড়ো হাওয়া তানভীর এলোচুল উড়িয়ে দিচ্ছে। তানভী ভাবছে, আর্ভিক ভাই ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে সেটা জিজ্ঞাসা করবে কি না। তারপর আবার ভাবল যে জিজ্ঞাসা করলে তো কিছুই বলে না। তানভীর ভাবনার মাঝে আর্ভিক বাইক থামাল, তানভী সামনে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল—আলিপুর চিড়িয়াখানা! তানভী ভ্রু কুঁচকে আর্ভিকের দিকে তাকিয়ে বলল

-“আর্ভিক ভাই, আমি কি বাচ্চা যে আমাকে হাতি-ঘোড়া দেখাতে এনেছেন?”
আর্ভিক এবার ঠোঁটের কোণে একটু বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল
-“তুই বাচ্চার থেকেও এককাঠি ওপর, তোকে দেখলে তো সত্যিকারের বাচ্চারাও লজ্জা পাবে। এখন কথা না বলে চুপচাপ চল।”
আর্ভিকের এমন কথায় তানভী গাল ফুলিয়ে হনহনিয়ে এগিয়ে গেল। আর্ভিক টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলো।

চিড়িয়াখানার বাঁধানো রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় আর্ভিক আর তানভীর মধ্যে শুরু হলো এক মিষ্টি যুদ্ধের মহড়া। তানভী তখনো অভিমানে মুখ ভার করে আছে দেখে আর্ভিক হঠাৎ একদল শোরগোল করা বাঁদরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল
-“ওই দেখ তানভী, তোর আত্মীয়রা তোকে দেখে কেমন নাচানাচি শুরু করেছে! বোধহয় তোকে ওদের দলে ফিরে পাওয়ার আনন্দে আত্মহারা।”
কথাটা বলেই আর্ভিক হেসে উঠলো। তানভী চোখ পাকিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল
-“আর্ভিক ভাই! আপনি কিন্তু বড্ড বেশি বলছেন। আমি কি ওই রকম কিম্ভূতকিমাকার দেখতে নাকি?”
আর্ভিক একদম গম্ভীর মুখ করে বলল
-“না না, তুই ওদের চেয়ে একটু বেশিই সুন্দর, কারণ তুই তো আমার স্পেশাল বাঁদর।”
এই বলে আর্ভিক তানভীর গালটা টেনে দৌড় লাগালো। তানভী এবার আর নিজের রাগ সামলাতে পারল না। ও আর্ভিককে ধরার জন্য আর্ভিকের পিছনে দৌড় দিল। দুজনে দৌড়াতে দৌড়াতে জিরাফের খাঁচার কাছে গেল। তানভী আর আর্ভিক দাঁড়িয়ে জিরাফ গুলো কে দেখতে লাগলো।
একটা জিরাফ তখন তার লম্বা গলা বাড়িয়ে পাতা খাচ্ছিল, আর্ভিক পেছন থেকে এসে তানভীর কানে ফিসফিস করে বলল

-“দেখলি? তোর উচ্চতা আর ওর গলার দৈর্ঘ্য—একদম মানানসই!”
তানভী এবার আর্ভিকের পিঠে একটা কিল বসিয়ে দিল। আর্ভিক নিজের পিঠ ডলতে ডলতে খিলখিল করে হেসে উঠল। আর্ভিক ভাবল, হয়তো তানভীর মনখারাপ কিছুটা সে দূর করতে পেরেছে।
অনেক্ষণ যাবত ঘোরার পর চিড়িয়াখানার এক কোণে ছায়াঘেরা বেঞ্চে বসে তখন জিরিয়ে নিচ্ছে তানভী। আর্ভিক দুটো কোন আইসক্রিম নিয়ে এল। একটা তানভীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে অন্যটা নিজে নিয়ে আয়েশ করে বসল। তানভী আইসক্রিম হাতে পেতেই ছোট বাচ্চাদের মতো উৎসবে মেতে উঠল। ওর খাওয়ার ধরনে এক অদ্ভুত সারল্য—ঠোঁটের কোণে আইসক্রিম লেগে যাচ্ছে, সেদিকে খেয়াল নেই।
আর্ভিক নিজের আইসক্রিমে কামড় না দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তানভীর সেই শৈশবমাখা মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে রইল। দুপুরের সোনা রোদ যখন তানভীর মুখে এসে পড়ল, আর্ভিকের মনে হলো এই মুহূর্তটা যেন এক জীবন্ত ছবি।
হঠাৎ খাওয়ার মাঝপথে তানভী থেমে গেল। আর্ভিককে ওভাবে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে ও একটু অপ্রস্তুত হয়ে প্রশ্ন করল

-“কিছু হয়েছে আর্ভিক ভাই?”
আর্ভিক একটু নড়ে চড়ে বসে আইসক্রিমে কামড় বসিয়ে বলল
-“না”
তানভী আবার খাওয়ায় মনোযোগী হল। খেতে খেতে তানভীর চোখ গেল পাখিদের খাঁচায়। কত রকমের পাখি, কি সুন্দর কিচিরমিচির করছে। হঠাৎ তানভীর মাথায় একটা প্রশ্ন এল, তাই সে আর্ভিক কে বলল
-“আর্ভিক ভাই একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?”
-“কি কথা?”
-“আচ্ছা আর্ভিক ভাই, আপনি আমায় সবসময় ‘ব্লু বার্ড’ কেন ডাকেন?”
আর্ভিক মুহূর্তকাল চুপ করে রইল। তারপর খুব আলতো করে নিজের আঙুল বাড়িয়ে তানভীর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা আইসক্রিমটুকু মুছে দিল। ওর সেই মৃদু স্পর্শে তানভী যেন এক লহমায় পাথর হয়ে গেল। আর্ভিক শান্ত গলায় বলতে শুরু করল

-“আমি যখন দেশের বাইরে একা থাকতাম, তখন একাকীত্বটা খুব অস্বস্তি লাগত। যে বাড়িতে থাকতাম, তার ঠিক সামনেই একটা বড় পুরানো গাছ ছিল। সেখানে একজোড়া ‘ব্লু বার্ড’ বাসা বেঁধেছিল। আমি দেখতাম, ওরা কীভাবে ওদের ছানাদের আগলে রাখে, কেমন কিচিরমিচির শব্দে সারাটা দিন মাতিয়ে রাখে। আমার সেই ধূসর দিনগুলোতে ওই পাখিদম্পতিই ছিল একমাত্র প্রাণের স্পন্দন। তখন থেকেই ‘ব্লু বার্ড’ আমার প্রিয় সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। তোকে যখন দেখি, তোর ওই চঞ্চলতা আমাকে সেই পাখিদের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাই তোকে ওই নামে ডাকি।”
আর্ভিকের এই গভীর অনুরাগের কথায় তানভী কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। এক অদ্ভুত ভালো লাগায় তানভীর বুকটা ভরে উঠল। আইসক্রিম খাওয়া শেষ করে ওরা আরও কিছুক্ষণ চারপাশটা ঘুরে দেখল। একসময় তানভী আর্ভিকের হাতটা হালকা করে টেনে বলল

-“আর্ভিক ভাই, আর ভালো লাগছে না এবার চলুন না ফিরে যাই।”
আর্ভিক মুখে চিরচেনা হাসি রেখে বলল
-“ঠিক আছে চল।”
চিড়িয়াখানার কোলাহল পিছনে ফেলে আর্ভিক তানভীকে নিয়ে পৌঁছাল এক বিলাসবহুল ফাইভ-স্টার হোটেলে। কাঁচের বিশাল দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই রাজকীয় আভিজাত্য ওদের অভ্যর্থনা জানাল। আর্ভিক তানভীর প্রিয় সব খাবার অর্ডার করলো। কিছুক্ষণ পর সব পদ একে একে টেবিলে সাজানো হলো।
তৃপ্তির আহার শেষে আর্ভিক বাইক স্টার্ট দিল। শহরতলীর ব্যস্ততা ছাড়িয়ে ওরা পৌঁছে গেল এক নির্জন প্রান্তরে। দু-পাশে ঘন সবুজ প্রকৃতি, মাঝখান দিয়ে সর্পিল কালো রাস্তা চলে গেছে দিগন্তের ওপারে। বসন্ত তখন বিদায়বেলায়; বিকেলের কনে দেখা আলোয় গাছের পাতারা এক অদ্ভুত সোনালি আভা মাখছে। ফুরফুরে উত্তুরে হাওয়া আর্ভিকের চুল গুলো উড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে। বাইক থামিয়ে দুজনে কিছুক্ষণ সেই নির্জন পথে পাশাপাশি হাঁটল। মাঝে মাঝে দু-একটা গাড়ি সাঁ হাঁ শব্দ করে বেরিয়ে যাচ্ছে, আর বাকি সময়টা কেবল ওদের পায়ের শব্দ আর বিকেলের মায়াবী নিস্তব্ধতা।
বাড়ি ফেরার সময় আর্ভিক বাইকের ওপর বসে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল

-“উফ, খুব ক্লান্ত লাগছে! তানভী, এবার তুই বাইকটা চালা তো।”
তানভী চোখ কপালে তুলে চিৎকার করে উঠল
-“কী! আমি বাইক চালাব? আর্ভিক ভাই, আপনি কি পাগল হলেন? আমি তো সাইকেলই ঠিকমতো ব্যালেন্স করতে পারি না, আর নাকি বাইক চালাব, তাও আবার এই বুলেট!”
আর্ভিক কৌতুকভরা চোখে তাকিয়ে বলল
-“আরে চালা না, একবার চেষ্টা তো কর কিছু হবে না আমি তো আছি।”
-“একদম না! আমি এত তাড়াতাড়ি মরতে চাই না। আমার জীবনে আরও অনেক কিছু করা বাকি আছে,”
তানভী গাল ফুলিয়ে কথাটা বলল। আর্ভিক এবার ভ্রু কুঁচকে একটু অন্যরকম ভঙ্গিতে তানভীর দিকে ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করল

-“কী করা বাকি শুনি? কারোর সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছিস নাকি?”
হঠাৎ এমন প্রশ্নে তানভীর মুখটা লাল হয়ে উঠল। ও মাথা নিচু করে লাজুক হেসে মনে মনে বলল,”হুমম আপনার সাথে”। তানভী কে নিরুত্তর দেখে আর্ভিক আবার জিজ্ঞেস করে, তানভী তখন একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে
-“আপনি বড্ড বেশি কথা বলেন।”
আর্ভিক হেসেই ফেলল। ও জোরাজুরি করে তানভীকে সিটে বসিয়ে দিল। নিজে পেছনে বসে তানভীর হাত দুটো বাইকের হ্যান্ডেলের ওপর রেখে স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনের গর্জনে তানভী প্রথমে ভয়ে কুঁকড়ে গেলেও আর্ভিকের বলিষ্ঠ হাতের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে সাহস ফিরে পেল। আর্ভিক ওকে ধাপে ধাপে গিয়ার আর ক্লাচের কারসাজি শেখাতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর যখন তানভী একা চালানোর চেষ্টা করছিল, হঠাৎ একটা বাঁকের কাছে ও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। বাইকটা স্ট্রিটলাইটের দিকে এগোতেই আর্ভিক চোখের পলকে হ্যান্ডেলটা নিজের আয়ত্তে নিয়ে বাইক সামলে নিল।

-“বললাম না আপনাকে! আমার দ্বারা হবে না। বাইক থামান আমি পিছনের সিটে যাব।”
তানভী হাঁপাতে হাঁপাতে বলল। আর্ভিক ওকে ধমক দিয়ে বলল
-“কথা কম বলবি, রাস্তার দিকে ফোকাস কর। সবে তো বাইক চালানো শেখাচ্ছি, এরপর তোকে ফোর-হুইলারও শেখাব।”
তানভী বিরক্ত হয়ে বলল
-“কেন? আপনি কি ড্রাইভিং স্কুল খুলেছেন নাকি?”
-“হ্যাঁ, খুলেছি। তবে সেটা স্পেশাল একজনের জন্যই। আর বেশি বকবক করলে তোকে এখানেই রাস্তায় ফেলে দিয়ে আমি একা বাড়ি চলে যাব।”
আর্ভিক মজা করে শাসাল। তানভী মনে মনে আর্ভিককে বকতে বকতে আবার বাইকের হ্যান্ডেল ধরল। সন্ধ্যের মায়া মাখা অন্ধকার নামছে, ওরা ধীরে ধীরে চৌধুরী নিবাসের বিশাল গেটের সামনে পৌঁছাল।

স্কুলে দ্বাদশ শ্রেণীর প্রথম দিন। করিডোর জুড়ে নতুন বইয়ের গন্ধ আর চেনা বন্ধুদের কলরব। ক্লাস শুরুর উত্তেজনা চারটে টানা পিরিয়ডের পর যখন একটু থিতিয়ে এল, তখন রিসেসের সময় মেঘাদ্রি, রিকি আর তানভী এসে বসল স্কুলের সেই পুরনো বাগানটার কোণে। ওদের আড্ডা দেওয়ার জায়গায়। খাওয়া শেষ হতেই রিকি হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে বলল,
-“বড্ড একঘেয়ে লাগছে রে! প্রথম দিনেই পড়াশোনার এমন চাপ? চল না কিছু একটা করি।”
মেঘাদ্রিও সায় দিয়ে বলল
-“আমারও একই দশা। কিন্তু করবিটা কী?”
তানভী তখন রহস্যময় এক হাসি হেসে নিজের স্কার্টের পকেট থেকে একটা রুমাল বের করল। মেঘাদ্রি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল

-“রুমাল দিয়ে কী হবে?”
রিকি নাক কুঁচকে বলে উঠল
-“এই বয়সে কি এখন রুমাল-চুরি বা কানামাছি খেলার কথা বলবি? আমাদের দেখে কি তোর বাচ্চা মনে হয়?”
তানভী একটু বিরক্ত হয়ে বলল
-“সব কিছু আগে থেকে ভেবে বসে থাকিস কেন? আগে নিয়মটা তো শোন।”
তানভী খেলাটা বুঝিয়ে দিল। একজনের চোখ রুমাল দিয়ে শক্ত করে বাঁধা থাকবে। বাকিদের মধ্যে একজন তার সামনে বসবে। যে চোখ বাঁধা ব্যক্তির সামনে বসবে, সে একে একে সবার দিকে আঙুল নির্দেশ করে ওই চোখ বাঁধা ব্যক্তিটিকে জিজ্ঞেস করবে— “একে কি মারব?” যার চোখ বাঁধা, সে যদি বলে “না”, তবে মুক্তি। কিন্তু সে যদি একবার বলে দেয় “হ্যাঁ”, তবে যার দিকে আঙুল তোলা ছিল, তাকেই সজোরে একবার মার খেতে হবে।
শুনতে বেশ মজাদার মনে হওয়ায় খেলা শুরু হলো। প্রথমে মেঘাদ্রির চোখ বাঁধা হলো। তানভী প্রথমে মেঘাদ্রির দিকে আঙুল দেখিয়ে মিটিমিটি হেসে জিজ্ঞেস করল

-“মারব?”
মেঘাদ্রি দেখতে পাচ্ছে না কার দিকে নির্দেশ করা হয়েছে, সে শান্তভাবে বলল
-“না।”
এরপর তানভী নিজের দিকে আঙুল নিয়ে গিয়ে বলল
-“একে মারব?”
মেঘাদ্রি আবার বলল
-“না।”
সবশেষে তানভী রিকির দিকে আঙুল তুলল। ঠিক সেই মুহূর্তে তানভী সন্তর্পণে মেঘাদ্রির পায়ে একটা লাথি মারল, সেটা রিকি দেখতে পেল না। মেঘাদ্রি ইশারায় বুঝে গেল এখন লক্ষ্যবস্তু রিকি। তানভী যেই জিজ্ঞেস করল
-“একে মারব?”
মেঘাদ্রি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল

-“হ্যাঁ, মার!”
অমনি তানভী রিকির বাম গালে সজোরে এক চড় বসিয়ে দিল। রিকি হতভম্ব হয়ে গাল ডলতে ডলতে চেয়ে রইল। পর পর তিনবার একই কাণ্ড হওয়ার পর রিকি খেপে গিয়ে বলল
-“এই! তোরা চিটিং করছিস! কেন বারবার শুধু আমাকেই মার খেতে হচ্ছে?”
তানভী নির্দোষ মুখে বলল
-“কোনো চিটিং নয়, মেঘাদ্রির তো চোখ বাঁধা, ও কী করে বুঝবে কার দিকে আঙুল দিচ্ছি? সব কপাল রে রিকি, সব কপাল!”
-“তাহলে এবার তোর চোখ বাঁধ।”
রিকির কথার মতো তাই হলো, তানভীর চোখ বাঁধা হলো। মেঘাদ্রিও একই কারসাজি শুরু করল। রিকি বেচারা বারবার মার খেয়ে শেষে বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল
-“ধুর! তোদের সাথে আর খেলবই না,”
বলে ও হনহনিয়ে ক্লাসরুমের দিকে হাঁটা দিল। পেছনে তানভী আর মেঘাদ্রি হাসতে হাসতে ঘাসের ওপর লুটোপুটি খাচ্ছে। এই বন্ধুত্বের খুনসুটি কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দু-জোড়া চোখ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওদের লক্ষ্য করছিল।

বসন্তের শেষবেলার দিনগুলো যেন বড় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। দ্বাদশ শ্রেণীর পড়ার চাপে তানভীর জীবনটা এখন স্কুল, কোচিং আর বইয়ের পাতায় বন্দি। পনেরোটা দিন কীভাবে কেটে গেল, ও টেরই পায়নি। আজ বিকেলে তানভী কোচিং থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরে সবে সোফাটায় গা এলিয়ে দিয়েছিল, ঠিক তখনই ঝড়ের বেগে বাইরে থেকে বসার ঘরে ঢুকল আর্ভিক। ওর চোখেমুখে এক অদ্ভুত ব্যস্ততা।
তানভীর দিকে তাকিয়ে সরাসরি আদেশের সুরে আর্ভিক বলল
-“চটপট রেডি হয়ে নে। হাতে একদম সময় নেই।”
তানভী একটু অলসতা মাখা স্বরে চোখ বুজেই বলল
-“আবার কোথায়? আজ কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না আর্ভিক ভাই, আপনি যান।”
আর্ভিকের গলা মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে উঠল

-“আমি তোর মতামত জানতে চাইনি তানভী, তোকে রেডি হতে বলেছি মানে তুই যাবি। দশ মিনিট সময় দিলাম।”
তানভী এবার একটু সোজা হয়ে বসে অবাক গলায় প্রশ্ন করল
-“সব সময় এভাবে জোর খাটান কেন? কোথায় যাব সেটা বলুন!”
-“সোহাগ আর প্রেমের রিসেপশনে যেতে হবে।”
আর্ভিক সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে বলল। তানভী যেন আকাশ থেকে পড়ল।
-“প্রেম দাদা আর সোহাগ দিদিভাইয়ের রিসেপশন! ওনাদের বিয়ে হয়ে গেল? কবে?”
-“পরশু,”
আর্ভিক উত্তর দিল। তানভী ক্ষোভের সুরে বলল

-“পরশু বিয়ে হয়ে গেল আপনি একা গেলেন বিয়েতে আর আমি জানতেই পারলাম না! আপনি একবারও বলেননি কেন? আর যখন বিয়ে তে একা গিয়ছেন তখন রিসেপশনেও আপনি একা যাবেন আমি যাব না।”
আর্ভিক উপরে ওঠা থামিয়ে দাঁড়িয়ে বলল
-“আজকেও তোকে নিয়ে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। নেহাতই প্রেম আর সোহাগ অত জোরাজুরি করল তাই নিয়ে যাচ্ছি।”
তানভী অভিমানে ঠোঁট উল্টে বলল
-“আপনি খুব খারাপ আর্ভিক ভাই, ভীষণ বাজে!”
আর্ভিক মুচকি হেসে বলল
-“জানি। এখন বকবক কমিয়ে ঝটপট যা।”

তানভী গটগট সিঁড়ি দিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াতে গেলে আর্ভিক পেছন থেকে ওর হাতটা টেনে ধরল। এক ডজন রিনরিনে কাশ্মীরি কাঁচের চুড়ি ওর হাতের মুঠোয় গুঁজে দিয়ে বলল
-“এটা পরে নিস। আর শোন বেশি মেকআপ করার দরকার নেই।”
রঙিন চুড়িগুলো দেখে তানভীর মেঘ করা মুখে এক চিলতে রোদ খেলে গেল। ও চঞ্চল পায়ে নিজের রুমে গিয়ে দেখল বিছানার ওপর একটা শপিং ব্যাগ রাখা। সেটা খুলতেই ওর চোখ ছানাবড়া—সাদা আর গোলাপির এক অপূর্ব মেলবন্ধনে কাজ করা একটা লেহেঙ্গা। চুড়িগুলোর সাথে এর রঙ কী অদ্ভুতভাবে মিলে যাচ্ছে! আর্ভিক ভাই যে আড়ালে ওর জন্য এত কিছু গুছিয়ে রেখেছে, সেটা ভেবেই তানভীর মনটা খুশিতে ভরে উঠল।
নিচে সোফায় বসে আর্ভিক তখন নিজের মনেই গজগজ করছে। মনে মনে ভাবছে, “বিয়ে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া মানেই একগাদা আপদ নিজের ঘাড়ে ডেকে আনা। কত শত লোক ওখানে হাঁ করে আমার সোনা বউটার দিকে তাকিয়ে থাকবে! উফ, শুধু এই প্রেমের জন্যই আজ ওকে নিয়ে যেতে হচ্ছে।”
প্রায় এক ঘণ্টা পর সিঁড়ির ওপর নূপুরের শব্দ শোনা গেল। তানভী খুব সাবধানে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে আর্ভিক কে উদ্দেশ্য করে বলল

-“আর্ভিক ভাই চলুন, হয়েছে গেছে আমার”
আর্ভিক সোফায় বসে ফোন দেখছিল, তানভীর কন্ঠস্বর শুনে মুখ তুলে তাকাতে তাকাতে বলল
-“এতক্ষণ সময়……”
আর্ভিক আর কিছু বলতে পারল না, ওর চোখের পলক থমকে গেল। সাদা-গোলাপি লেহেঙ্গায় তানভীকে যেন কোনো পৌরাণিক অপ্সরা মনে হচ্ছে। হাতে কাশ্মীরি চুড়ির রিনরিন শব্দ, খোলা চুলগুলো কাঁধের ওপর ছড়িয়ে আছে। খুব বেশি মেকআপ করা নেই যতটা না করলে নয় ততটাই করেছে।আর্ভিক একটা শুকনো ঢোক গিলে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ওর বুকের ভেতরটা যেন একটা অদ্ভুত ছন্দে ধুকপুক করে উঠল। তানভী নিচে এসে আর্ভিকের সামনে দাঁড়াল। আর্ভিক নিজেকে সামলে নিয়ে তানভীর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ডাক দিল
-“ঋ…ঋষি! জলদি আ…আয়, বের হতে হবে।”
ঋষি আসতেই তিনজনে মিলে গাড়ির দিকে এগোল। আজ আর্ভিক ড্রাইভ করছে। তানভী আর ঋষি দুজনে ব্যাকসিটে বসেছে। আর্ভিক ড্রাইভ করছে আর বারবার লুকিং গ্লাস দিয়ে আড়চোখে তানভীকে দেখছে। গাড়ির স্পিকারে তখন একটা রোমান্টিক গান বাজছিল। আর্ভিক হঠাৎ গানের সুরের সাথে তাল মিলিয়ে করে গেয়ে উঠল—

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৪৫+৪৬

“Tu agar samne ho,
kaise main khud ko rakh pao hosh mein….”
আর্ভিকের গলায় এমন আবেগ আর চোখের সেই তীক্ষ্ণ চাউনি লুকিং গ্লাসে ধরা পড়তেই তানভী চমকে উঠল। মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখাচোখি হলো। আর্ভিকের এমন নেশালো চাউনি সহ্য করতে না পেরে তানভী লজ্জায় মাথা নিচু করে নখ খুঁটতে লাগল। মনে মনে ভাবল, “ইশ, অসভ্য লোক একটা! এভাবে কেউ তাকায়?”
ঋষি পেছনে বসে এইসব দেখে মিটিমিটি হাসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িটা সোহাগ আর প্রেমের রিসেপশন ভিলার সামনে এসে থামল।

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৪৯