ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩০ (২)
নওরিন কবির তিশা
এদিকে তৃষাকে ধাওয়া করার তীব্র উন্মাদনায় ছুটতে ছুটতে কখন যে দিকভ্রান্ত হয়ে অন্দরের গোলকধাঁধায় পথ হারিয়েছে, তার হুঁশ নেই মেহেসানার। হাতে ধরা হলুদের বাটিটা সামলে ও যখন করিডোরের শেষ বাঁকটা সজোরে অতিক্রম করতে চাইল, ঠিক তখনই বাঁধলো বিপত্তি।
দীর্ঘকায় এক সুঠাম অবয়বের সাথে সজোরে সম্মুখ-সংঘাত ঘটলো ওর । মুহূর্তের অসাবধানতায় হাতের হলুদের বাটিটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিটকে গিয়ে পড়ল সম্মুখে দণ্ডায়মান পুরুষটির নীলরঙা পাঞ্জাবির ঠিক বক্ষস্থলে। হলুদের গাঢ় প্রলেপটি মুহূর্তেই নীল অম্বরে এক বিসদৃশ মানচিত্রের অবতারণা করল।
মেহেসানা ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল। মেজাজটা এমনিতে চড়া, তার ওপর এমন সংঘর্ষে ও এক মুহূর্ত না ভেবেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির দিকে চোখ রাঙিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
-‘ আরে! আপনি কি চোখে দেখতে পান না? মাঝরাস্তায় এভাবে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে থাকার মানে কী? আমার সব হলুদ তো নষ্ট হয়ে গেল!
আদ্রিয়ান স্তম্ভিত হয়ে নিজের সাধের পাঞ্জাবির দিকে তাকাল। পরপর সম্মুখের রমণীটির দিকে। কিঞ্চিৎ রাগ দেখানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টায় বলল,,
-‘ এক্সকিউজ মি? খাম্বা হয়ে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম নাকি আপনি বুলেট ট্রেন সেজে অন্দরমহলে ট্রায়াল দিচ্ছিলেন? নিজের অকাজের দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোটা কি আপনার নিয়মিত অভ্যাস, নাকি ? প্রথমত নিজে এসে ধাক্কা দিয়েছেন স্যরি তো বলিইনি নি আবার অসভ্যের মতো আমাকেই দোষারোপ করছেন?
মেহেসানা বাম ভ্রুটা সামান্য উঁচিয়ে বলল,,
-‘ কি বললেন? কি বলবো আমি?
-‘ স্যরি!
-‘ আইছে আমার খালু! স্যরি তাও নাকি আপনাকে বলতে হবে দুটো একসাথে যায়?
আদ্রিয়ান এবার সত্যিই বিরক্ত হল এই মেয়ের এমন ত্যাড়া জবাবে। ভ্রু কুঞ্চনপূর্বক ও বলল,,
-‘ মানে?
মেহেসানা ভাবলেশহীন কন্ঠে বলল,-‘ বুঝলে বুঝপাতা না বুঝলে তেজপাতা।
-‘ এর মানে কি?
-‘ আপনার মাথা।
বলেই আর এক মুহূর্ত সেখানে দন্ডায়মান রইলোনা মেহেসানা। আদ্রিয়ানকে আর কোন প্রশ্ন করার অবকাশ না দিয়েই গটগট পায়ে সেখান থেকে প্রস্থান করল ও। আদ্রিয়ান সূক্ষ্ম নেত্রে ওর প্রস্থান পথের দিকে চাইল পরক্ষণে নিজের নষ্ট হয়ে যাওয়া পাঞ্জাবিটা পরখ করে মনে মনে বিড়বিড় করলো,,
-‘ অসভ্য মেয়ে!
কলহাস্যের কলতানে মুখরিত হলুদিয়া প্রাঙ্গণ। মুরুব্বিদের অট্টহাসি আর পরিহাসের সুর প্রাঙ্গণজুড়ে এক উৎসবমুখর উন্মাদনা ছড়িয়ে দিচ্ছে। অহনাদের গায়ে হলুদ পর্বের সমাপ্তি ঘটেছে কিছুক্ষণ হলো। মুরুব্বিদের হাস্যোজ্জ্বল আশিস আর তরুণীদের মৃহু গুঞ্জনের আবহে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা খেলে যাচ্ছে চতুর্দিকে। প্রতিটি কোণ যেন তখন এক আসন্ন শুভক্ষণের প্রতীক্ষায় বিভোর।
অহনাকে এনে ড্রয়িং রুমের পার্শ্ববর্তী একটা কক্ষে বসানো হয়েছে। যদিও পাড়ার ভাবি আর আত্মীয়দের উপস্থিতিতে জনাকীর্ণ পরিবেশ সেথায়। তবুও এসির শীতল হাওয়ায় কিঞ্চিৎ স্বস্তি মিলছে। মেহেসানা তৃষা তিথি আর রাইসার সাথে বাম দিকটাই বসে ছিল। তৃষার কোলজুড়ে টুইংকেলের দখলদারিত্ব। হঠাৎ অহনার মিষ্টি মুখশ্রীতে চেয়ে তিথি বলল,
-‘ কি মিষ্টি লাগছে না মেয়েটাকে?
মেহেসানা পাশ থেকে জবাব, -‘ জ্বী আপু। তোমরা সবাই এত সুন্দরী! চোখ ধাধিয়ে যায় একদম।
তিথি ওর দিকে চেয়ে বলল,-‘ তোমার থেকে বেশি নই।
মেহেসানা খানিক লজ্জা পেয়ে বলল,-‘ কি যে বলোনা! কই তোমরা আর কই আমি।
-‘ আরে ছেমড়ি বহুত সুন্দরী তুই! ঢং করিস না তো!
তিথির এমন কথায় মুচকি হাসলো মেহেসানা। মোটামুটি সবার সাথেই সখ্যতা গড়ে উঠেছে ওর। কিছুক্ষণের মধ্যেই একে অন্যের পরিচিত হয়ে উঠেছে ওরা। ওদের কথার মাঝেই ফোড়ন কাটল টুইংকেল, তৃষার গলা জড়িয়ে মুখে ছোট্ট করে চুমু একে সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
-‘ নো, ইউ্য অল আর রং মাই বানি দ্য প্রিটেস্ট লেডি হেয়ার।
টুইংকেলের কথায় হেসে উঠল উপস্থিত সকলে। রাইসা ওর তুলতুলের চোয়াল দুটো খানিক টেনে বলল,,
-‘ ওলে লে লে আমার সোওনা। তোমার বানি সুন্দর বলেই তো তোমার পাপা তোমার বানিকে বেছে ছিল, না? এতে সন্দেহের কি আছে,আমরা সবাই জানি তোমার বানি এখানকার সব থেকে সুন্দরী।
রাইসার কথায় সকলে মুখ চেপে হাসলেও খানিক লজ্জা পেল তৃষা। এদিকে ছোট্ট টুইংকেলের মস্তিষ্ক বুঝলো না রাইসার কথার মর্মার্থ। ও শুধু এতোটুকুই বুঝলো যে রাইসা ওর বানির প্রশংসা করেছে। তাই ও-ও মাথা নাড়িয়ে বলল,
-‘ হ্যাঁ ঠিক বলেছ।
ওর কথায় আরো একবার হাসির হিল্লোল বয়ে গেল সেথায়। তৃষা খানিক লাজুক হেসে টুইংকেলের নিষ্পাপ মুখশ্রীতে চাইল। বাচ্চাটা যদি বুঝতো আসলে ওরা কি বলেছে! কিছুক্ষণ বাদে তামান্না এক বাটি সন্দেশ নিয়ে ওদের আড্ডায় যোগ দিল। মেহেসানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে নাটুকে স্বরে বলল,
-‘ যাইহোক তিথি আপু যেই যাই বলুক আমার জীবনটা বেদনার। মোর অন অ্যান অনলি বেস্ট ফ্রেন্ডেরও বিয়ে হয়ে গেল, আর আমি এখনো সিঙ্গেল অ্যান্ড রেডি টু মিঙ্গেল সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ঘুরছি। জীবনে কী করলাম?
তামান্না ওর পাশে বসে পিঠে একটা সান্ত্বনার চাপড় মেরে ফিক করে হেসে বলল,
-‘ আরে বইন, একদম কলিজায় হাত দিয়েছো! আমার অবস্থাও তো সেম। বাড়িতে বিয়ের কথা উঠলেই আম্মু এমনভাবে তাকায় যেন আমি কোনো মূল্যবান রত্নের কথা বলছি।
তৃষা ওদের এই বিলাপ শুনে মুখ টিপে হাসতে হাসতে বলল,
-‘ তোমরা দুজনে মিলে একটা সিঙ্গেলস অ্যাসোসিয়েশন খুলে ফেলো না! দেখবা মেম্বার কম পড়বে না।
তৃষার কথায় মেহেসানা ঈষৎ রাগ দেখিয়ে বলল,-‘ ফাইজলামি করিস? আমরা বলছি দুঃখের কথা।
-‘ আমি কই ফাইজলামি করলাম আমি তো সত্যিটাই বললাম।
ওদের হাসাহাসি যখন তুঙ্গে ঠিক সেই মুহূর্তে আড্ডার মাঝখানে হুট করে এসে উদয় হলো আদ্রিয়ান। ওর উপস্থিতিতে হাসাহাসির রোল মুহূর্তেই স্তিমিত হয়ে গেল। ঘরের প্রতিটি নারীমূর্তির ওপর একবার চোখ বুলিয়ে আদ্রিয়ানের দৃষ্টি স্থির হলো মেহেসানার ওপর।
মেহেসানাও দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। ও একমনে সন্দেশ চিবোতে চিবোতে বেশ তাচ্ছিল্যের সাথে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাল। আদ্রিয়ান কয়েক কদম এগিয়ে এসে তৃষার উদ্দেশ্যে গম্ভীর স্বরে বলল,
-‘ তৃষা ভাবি, আপনার গেস্ট লিস্টে কি আজকাল রোড-রোলারদেরও ইনভাইট করা হয়? অন্দরমহলে যেভাবে ট্রাফিক জ্যাম তৈরি হচ্ছে, তাতে সিগন্যাল ছাড়া হাঁটাচলা করা তো লাইফ রিস্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে!
আদ্রিয়ানের ত্যাড়া কথা শুনে মেহেসানা সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ও কোমরে হাত দিয়ে বেশ ঝাঁঝালো গলায় পাল্টা জবাব দিল,
-‘ শুনুন মিস্টার ল্যাম্পপোস্ট! আপনার মতো যারা মাঝরাস্তায় নেটওয়ার্ক খুঁজতে দাঁড়িয়ে থাকে, জ্যামটা আসলে তাদের কারণেই হয়। আর আপনার ওই নীল পাঞ্জাবির ম্যাপটা কিন্তু বেশ ইউনিক ছিল, উল্টে আমাকে থ্যাঙ্কস জানানো উচিত ছিল আপনার!
আদ্রিয়ান তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে তৃষার দিকে ফিরল,
-‘ ভাবি, আপনার এই বান্ধবীকে কি কোনো ডিবেট কম্পিটিশন থেকে হায়ার করেছেন? লজিক নেই, শুধু নয়েজ পলিউশন!
মেহেসানা তেড়ে যেতে চাইলে তৃষা মাঝখানে এসে দুজনকে থামিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
-‘ আরে আরে! আপনারা কি এখানেও কুস্তি শুরু করবেন? আদ্রিয়ান ভাইয়া, আপনি তো একটু থামুন।
পাশ থেকে টুইংকেল উঁকি দিয়ে বলল,
-‘ পাপা বলে ঝগড়া করলে ব্যাড বয় হতে হয়। তোমরা কি ব্যাড বয়-গার্ল?
টুইংকেলের নিষ্পাপ প্রশ্নে আদ্রিয়ান আর মেহেসানা একে অপরের দিকে অগ্নিদৃষ্টি হেনে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। তৃষা মিটিমিটি হাসতে হাসতে দুই মূর্তিকে শান্ত করার চেষ্টায় মগ্ন তক্ষুনি তিথি বলল,
-‘ আরে আরে কুল কুল। আর আদ্র ভাই তুমি কি শুরু করলা? মেহু তুমিও? কুউউল। ঝগড়া তো একটু পরে হবে। বাড়ির ছেলেরা ভারসেস মেয়েরা তখন দেখা যাবে কে কত ঝগড়া করে পারে।
ওরা অবাক দৃষ্টিতে তিথির দিকে তাকালো মেহেসানা কিঞ্চিত ভ্রু কুঁচকে শুধালো,,
-‘ মানে?
-‘ মানে আর কি? ও তোমাকে তো বলা হয়নি। আমাদের জমিদার বাড়িতে একটা রেওয়াজ আছে আমরা হলুদ সন্ধ্যা না করে বিকালে নাচ গানের আয়োজন করি। সেখানে বাড়ির ছেলেরা এক পক্ষ আর মেয়েরা অন্য পক্ষ হয়। একটা কম্পিটিশন বলতে পারো যেখানে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে হারাবে যে পক্ষ হারাতে পারবে সারা বছর সেই পক্ষের কথায় অপর পক্ষ কে চলতে হবে। বুঝতে পেরেছ? যদিও এটা বিয়ের মৌসুমে আসে তবে বলা যায় অন্য বিয়ের আগ পর্যন্ত এর পুরস্কার পায় বিজয়ী পক্ষ।
মেহেসানা আনমনে মাথা নাড়ল। আদ্রিয়ান ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
-‘ উনার গোবর ভরা মাথায় কিছু ঢোকেনি তিথি। এই যে মিস গোবর ঠাসা? এর মানে হচ্ছে ইন্ডিরেক্টলি ছেলেদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা বুঝেছেন? এমনিতেও ছেলেরা অনেক উদার মনের হয় মেয়েদের এমনিতেই জিতিয়ে দেবে। আর একটা বিয়ের পর অন্য বিয়ে কমপক্ষে ২ থেকে তিন বছর পর হয় তো সারা বছরের নাম করে, ওরা সারা জীবন আমাদের মাথা খায়। যেমন আপনি একটু আগে খাচ্ছিলেন। বুঝাছেন?
মেহেসানা রেগে তেড়ে যেতে গিয়েও কিছু বলল না আসলে ও প্রথমেই বুঝে ছিল না। তাই ও কথা ঘুরিয়ে বলল,
-‘ থাক আমি পাগলকে বেশি কিছু বলি না।
উদাসীন অপরাহ্ণের ম্লানিমায় তালুকদার মঞ্জিলের বিস্তৃত প্রাঙ্গণ আজ এক নব্য যৌবনের উৎসবে মাতোয়ারা। মাথার ওপর শামিয়ানার গাঢ় নীল আর হলদেটে কাপড়ের আড়ালে সূর্যের তপ্ত রশ্মিগুলো নতি স্বীকার করেছে, সমগ্র চত্বর জুড়ে স্নিগ্ধতা বিরাজমান। রমণী আর পুরুষালী উপস্থিতিতে মুখরিত হয়েছে স্থানটা।চতুর্দিকে তখন এক মিষ্টি লড়াইয়ের দামামা।
চমকপ্রদভাবে সেখানে উপস্থিত আর্যও। যদিও ওকে আনাটা এতটাও সহজসাধ্য ছিল না তবুও সকলের জোর জবরদস্তি তে একপ্রকার বাধ্য হয়ে ও এসেছে এখানে। পার্শ্ববর্তী পুষ্প সজ্জিত আসনে বসে আছে অহনা আর শাহারিয়ার। আর তার দুপাশের বিন্যস্ত আসনগুলোতে বসা সকলে। মাঝখানের সুবিস্তৃত স্থানটায় উৎসবের আয়োজন।
হঠাৎ সঞ্চালক হিসেবে সেখানে উপস্থিত হলো সৌভিক। দরাজ গলায় ঘোষণা করল,
-‘ লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান! লড়াইটা আজ সম্মানের। দেখা যাবে কারা হারে আর করা জিতে,নিয়মটা সিম্পল আমি বয়ামটা নিয়ে আসব, আর দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা চোখ বন্ধ করে একটা করে চিরকুট তুলবেন। সেখানে যা লেখা থাকবে, ঠিক সেটাই পারফর্ম করতে হবে। যদি কেউ রিফিউজ করেন বা ফেল করেন, তবে সারা বছরের জন্য অন্য পক্ষের গোলামি করার বন্ডে সই করতে হবে। সো গাইজ, আর ইউ রেডি?
সকলের সম্মতিক্রমে সৌভিক প্রথমেই এগিয়ে গেল মেয়েদের দলের দিকে। তৃষা এক পলক আর্যর দিকে তাকাল। আর্য সোফায় হেলান দিয়ে এক হাত পকেটে গুঁজে তৃষার দিকে তাকিয়ে আছে। তৃষা বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে বয়াম থেকে একটা গোলাপী চিরকুট তুলল।
সৌভিক চিরকুটটা নিয়ে উচ্ছ্বাসে বলল,,
-‘ ওয়াও! শুরুতেই রোম্যান্টিক কিছু! এখানে লেখা আছে নিজের জীবনসঙ্গীকে ইশারায় এখানে লেখা কথাটা বোঝাতে হবে। সো মিসেস আর্য এহসান ওরফে মাই সুইট ভাবি, দ্য ফ্লোর ইজ ইয়োরস!
তৃষার গাল দুটো মুহূর্তেই আরক্তিম হয়ে উঠল। এখানে যে শব্দটা লেখা আছে সেটা ও আর্যকে বলবে কিভাবে? লাজুকতা বেষ্টন করছে ওকে তীব্ররুপে। ও যখন ভাবনায় নিমগ্ন ঠিক তক্ষুনি তাতে ছেদ পড়ল ভেসে আসা সৌভিকের কণ্ঠস্বরে ,
-‘ কি হলো ভাবি আসুন।
তৃষা অপ্রকৃতস্থের ন্যায় চেয়ে বোকা কণ্ঠে বলল,-‘ হ-হ্যাঁ?
-‘ আরে স্টেজে আসবেন তো।
তৃষা কিছু বলতে যাওয়ার আগেই ছেলেদের দিক থেকে কেউ একজন বলল,
-‘ আরে ইয়ার বাদ দে, ভাবি মনে হয় খেলা শুরুর আগেই আমাদের জিতিয়ে খেলা শেষ করতে চায়। তাইনা ভাবি?
ছেলেপক্ষের টিটকিরিটা যেন অগ্নি হলকার ন্যায় ছড়িয়ে পড়লো আসরে। আদ্রিয়ান বাঁকা হেসে আলতো স্বরে বলল,
-‘ তৃষা ভাবি, ময়দান ছাড়ার আগে একবার ভেবে নিন। এই হারের দায় কিন্তু পুরো গার্লস গ্যাং-এর ওপর বর্তাবে। তার চেয়ে বরং আত্মসমর্পণ করে নিন, আমরা একটু না হয় দয়া-দাক্ষিণ্য দেখাব!
ওর কথায় ছেলেদের পক্ষ থেকে হাসির হররা বয়ে গেল ফের। তৃষার আত্মসম্মানে যেন মৃদু টোকা লাগল হয়তো,ও একবার তীক্ষ্ণ চোখে আদ্রিয়ানের দিকে তাকাল,পরক্ষণেই ওর দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো সোফায় আয়েশ করে বসা আর্যর ওপর। আর্য নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় বুকে হাত গুঁজে এদিকেই চেয়ে আছে। তৃষার জেদটা মুহূর্তেই চাড়া দিয়ে উঠল। ও শাড়ির আঁচলটা দৃঢ়ভাবে কাঁধে রেখে গটগট পায়ে সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
মেহেসানা পাশ থেকে চিৎকার করে উৎসাহ জুগিয়ে বলল,
-‘ কিল ইট তৃষা! দেখিয়ে দে এই ব্রিটিশ আমলের খাম্বাদের যে, আমরা কারো থেকে কম নই!
তৃষা মঞ্চের মতো সাজানো সেই ফাঁকা জায়গাটার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। ওর সামনেই আর্য বসে। চারদিকের হইহুল্লোড় যেন এক পলকে স্তিমিত হয়ে এল, সকলের কৌতূহলী দৃষ্টি তৃষার উপর নিবদ্ধ। সৌভিক আড়ালে গিয়ে ফিসফিস করে চিরকুটের লেখাটা আর্যকে দেখানোর চেষ্টা করলে আর্য হাত তুলে ওুকে থামিয়ে দিল। ও চায় তৃষা নিজেই যেন ওকে বুঝিয়ে দেয়।
তৃষা এক গভীর দীর্ঘশ্বাস নিল। চিরকুটে লেখা ছিল— “আই লাভ ইউ”। মূলত দেব আর পায়েলের ভারতীয় চলচ্চিত্রের নাম অবলম্বনে এটা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ও এই জিনিসটা সকলের সম্মুখে আর্যকে কিভাবে বুঝাবে? ও অস্থিরভাবে নিজের আঙুল মটকাতে লাগলো।
ওর কম্পিত অধর আর আনত নয়ন এক অবাধ্য ব্যাকুলতায় বারংবার আর্যর দৃষ্টি ছুঁয়ে যাচ্ছে। অতঃপর চারদিকের নিস্পন্দ নীরবতাকে সাক্ষী রেখে ও প্রথমে ডান হাতটি নিজের দিকে ইশারা করল তারপর দুই হাতের আঙুলদ্বয় দ্বারা হৃদপিণ্ডের অবয়ব তৈরি করে পরক্ষণেই তর্জনী তুলে আর্যর প্রশস্ত বক্ষস্থলে স্থির করল।
নিস্তব্ধ মজলিসে সকলের ভ্রুকুঞ্চিত বিস্ময় এখন তুঙ্গে, প্রত্যেকে সরু নেত্রে অবলোকনপূর্বক ওর ইশারার মানে বোঝার চেষ্টা করছে। ঠিক তখনই নীরবতা চিঁড়ে প্রতিধ্বনিত হলো আর্যর ভরাট কণ্ঠস্বর,
-‘ আই লাভ ইউ।
আর্য উত্তরে দু’নয়নে লজ্জার গাঢ় আস্তরণ পড়লো তৃষার। উপস্থিত সকলের বিস্ময়মাখা দৃষ্টির সম্মুখে তৃষা ধীরলয়ে ঘাড় নেড়ে আর্যর চোখের দিকে চাইল। ওর সেই সলজ্জ মৌনতাই যেন সহস্র শব্দের বাঙ্ময় রূপ নিল। মৃদু স্বরে ও শুধু উচ্চারণ করল,
-‘ হ্যাঁ।
সঙ্গে সঙ্গে নিস্তব্ধতা ভেঙে হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ল চারপাশ। সৌভিক এগিয়ে এসে বলল,,
-‘ ব্রাভো ভাইয়া-ভাবি! জাস্ট অসাম! তোমাদের কেমিস্ট্রি তো হেব্বি.
তৃষা সলজ্জ হেসে কাঙ্খিত আসনে গিয়ে বসলো। পুনরায় শুরু হলো খেলা।একে একে প্রত্যেক জোড়া কপতো-কপতির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই সংঘটিত হলো। চিরকুট তোলার পালা এবার আসলো মেহেসানার। ও আড়দৃষ্টিতে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে একখানা চিরকুট তুললো।
সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা‘নিজের সবচেয়ে অপছন্দনীয় মানুষটাকে গানে গানে কিছু বলো’ চিরকুটটা পড়েই এক কুটিল হাসি হাসল মেহেসানা ওর দৃষ্টি সরাসরি আদ্রিয়ানের দিকে নিবদ্ধ হলো। ভনিতা না করে ও গাইতে শুরু করল,,
🎶 পায়ে পা তুলে বাধিয়ে ঝগড়া…
দিনরাত করিস খিটমিট খিটমিট…
কখন যে মাথাটা গরম হয়ে যায়….
ভাঙবো মাথা তোর ঠিক ঠিক ঠিক ঠিক ঠিক…
রগবাজ চ্যাংড়া হো হো হো হো….
ঠকবাজ নোংরা হো হো হো ..🎶
গানের সুর সঙ্গে ওর বিদ্রুপাত্মক চাহনি আর ত্যাড়া ইশারা দেখে পুরো আসরে হাসির রোল পড়ে গেল। আদ্রিয়ান ঠিকই বুঝেচ্ছে ওকে বুঝিয়ে গান গাইছে মেহেসানা তবে ওকি দমবার পাত্র নাকি ও-ও নিজের আসন ছেড়ে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে ওর দিকে এগিয়ে যেতে যেতে গাইতে শুরু করল,,
🎶 চল তুইও তো পেত্নী হো হো হো…
হিংসুটে ভূতনি হো হো হো….🎶
মেহেসানা ওর দিকে তেড়ে গিয়ে গাইলো,,
🎶এই বাঁদর মুখো….
ত্যাদড় ছেলে দেখলে জ্বলে গা
হেট ইউ্য…..🎶
আদ্রিয়ানও ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে গাইলো,,
🎶আরে পেঁচি মুখী.
ধেরে খুঁকি.
যারে ফুটে যা..
হেট ইউ্য…..🎶
ওদের গানে শান্ত পরিবেশ মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। তৃষা,তামান্না, রাইসা কোনোমতে মেহেসানাকে ওদের পাশে এনে বসিয়েছে। সৌভিক হাসতে হাসতে আবার সকলের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো,নিজেকে সামলানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়ে বলল,,
-‘ স্যরি,স্যরি। বাট আদ্র ভাই তো রীতিমতো পাশের বাসার জরিনার মার মতো তেড়ে গেছিলো। আল্লাহ!
ও ফের হাসলো।অতঃপর বলল,,
-‘ সে যাই হোক। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলমান। দুই পক্ষেরই স্কোর সমান। তো এইবার জ্যাকপট রাউন্ড। নিয়ম হচ্ছে আমি এখন একটা ওয়ার্ড বলবো। আর সেইটা দিয়ে যেই পক্ষ প্রথমে গান গাইতে পারবে তারাই আজকের উইনার।
সৌভিকের একটি ঘোষণার মধ্য দিয়েই উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে চড়ল। সকলে উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। কখন ও শব্দটা বলবে। হঠাৎ সকলের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সৌভিক বলল,,
-‘ আর শব্দটা হচ্ছে দ’।
সঙ্গে সঙ্গে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তৃষা গেয়ে উঠল,,
🎶 দেখতে বর বর…
কিন্তু আস্ত বর্বর…
একটা জুটে গেছে কপালে…
দেখতে হ্যান্ডসাম…
কিন্তু ফেলুরাম…..
ফেসে গেছি আমি অকালে…..🎶
শেষ কলিটুকুর সমাপ্তি ঘটিয়ে তৃষা একবার আড়চোখে আর্যকে পরখ করলো। তবে ওর নির্লিপ্ত ভঙ্গিমার দরুন ওর মনোভাব বুঝতে ব্যর্থ হলো তৃষা। এদিকে মেয়ে পক্ষ হইহই করে উঠলো,
-‘ ইয়েহ উই আর উইন্যর!
তবে ওদের উচ্ছ্বাস দীর্ঘস্থায়ী রুপ নিতে পারলো না। ছেলে পক্ষ ওরা এই বিজয় নাকচ করে বলল,,
-‘ মানি না।আমরাতো শুনতেও পাইনি কি বলল। জ্ঞান কীভাবে গাইবো?
ওদের এমন যুক্তি হেসে উড়িয়ে দিয়ে মেয়েরা বলল,,
-‘ তোমরা কালা হলে আমারদের কি?
-‘ তোমরা বেশি বুঝো।
-‘ তোমরা কালা ।
তর্ক-বিতর্কের এমন পর্যায়ে আদ্রিয়ান পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল,,
-‘ ওকে ওকে, যেহেতু একটা মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হচ্ছেই তাহলে আরেকটা টচ হোক!
-‘ কি টচ!
-‘ না টচ না। আরেকটা গানে পারফরম্যান্স হোক। দেখি কারা জিতে! তো রেডি? যদি না হও তাহলে বুঝব..!না থাক।
মেয়েরা মানের ভয়ে রাজি হলো নিঃসংকোচে। আদ্রিয়ানের নির্দেশে সাউন্ড বক্সের কাছে গিয়ে গান ওন করলো সৌভিক। জোরে জোরে বাঁজছে গানটা,,
ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩০
🎶 সংসার সুখী হয় রমণীর গুণে….
আজকের মেয়েরা কি সেই কথা মনে..?🎶
ওরা এগিয়ে আসলো মেয়েদের দিকে। মেয়েরাও কম কিসে ওরাও ছেলেদের দিকে এগিয়ে গেলো গানের কলি ধরে,
🎶সংসারে সুখ আসে মোটা ইনকামে…
মেয়েরাতো তাই ছুটে অফিসের কামে…🎶
সূচনা ঘটলো আরেক হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের।
