Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৩

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৩

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৩
নওরিন কবির তিশা

প্রায় সাড়ে আট ঘণ্টার দীর্ঘ সফরের সমাপ্তি ঘটিয়ে চিরপরিচিত সুখনীড়ের আঙিনায় এসে থেমেছিলো আর্যর গাড়িখানা। তৃষার উচ্চমাধ্যমিক অতিসন্নিকটে হওয়ায় ওরা সরাসরি ঢাকাতেই ফিরেছে। ​তবে ফেরার পর অবসাদ শরীরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিলো তৃষার,তাই আর বিন্দুমাত্র সময় ব্যয় না করে ঘুমন্ত টুইংকেলকে ওর কক্ষে শুইয়ে দিয়েই তৃষা গা এলিয়ে দিয়েছিল নরম শয্যায়। ঘুমের গভীর আবেশে কখন যে সময় তড়িৎবেগে বয়ে গেছে, তা টেরও পায়নি সে।
হঠাৎ তন্দ্রাচ্ছন্নতা টুটে যেতেই জানালার ফাঁক দিয়ে আসা রাতের হিমেল হাওয়ায় শিউরে উঠল তৃষা। বালিশের পাশে রাখা ঘড়িটার দিকে নজর পড়তেই ওর চক্ষু চড়ক গাছ! ঘড়ির কাটা রাত আটটা বেজে দশের ঘরে ।
​বাইরে তখন অমাবস্যার নিবিড় তিমির; মহানগরীর আকাশ থেকে চ্যুত হওয়া ধুলোবালি আর সোডিয়ামের আলো মিলেমিশে এক অদ্ভুত রহস্যময় পরিবেশের অবতারণা করেছে। দূরের কার্নিশে কোনো এক নিঃসঙ্গ পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ রাতের গাম্ভীর্যকে আরও গাঢ় করে তুলছে। তৃষা তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়ল। মনে মনে নিজেকেই ভর্ৎসনা করল সে,

-‘ হায় খোদা এ এমন ম’রার মত ঘুমিয়ে ছিলাম! ইস ওরা বোধহয় এখনো না খেয়ে বসে আছে। ছিঃ কি করলাম!
ও তৎক্ষণাৎ বিছানা থেকে নেমে পড়ল দ্রুত পদক্ষেপে ওয়াশরুমে গিয়ে মুখে একঝলক শীতল পানির ঝাপটা দিয়ে নিজেকে সতেজ করে নিল। ভেজা মুখটা তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে অস্থির চিত্তে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। মনের কোণে একরাশ অপরাধ বোধ বাসা বেঁধেছে ওর;ইস ওর কারণেই বোধ হয় সবাই ক্লান্তিতে না খেয়েই ঘুমিয়ে গেলো।
ও যখন এসকল চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে রান্নাঘরের চৌকাঠে পা রাখলো সঙ্গে সঙ্গে চক্ষুদ্বয় বিস্ময়ে স্থির হলো ওর।অন্দরের সেই স্নিগ্ধ আলোয় দেখা মিলল , এক অবিন্যস্ত কেশরাজের অধিকারী ঘর্মাক্ত পুরুষাবয়ব। তীক্ষ্ণ শৈল্পিক দেহে কিচেন অ্যাপ্রোনটা বেশ ভালই মানিয়েছে। তৃষা দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে অপলক চেয়ে রইল; ক্রাশ খেলো কিনা কে জানে?
আর্য তখনো চপারের সবজি কাটতে ব্যস্ত। হঠাৎ সবজি কাটার জন্য উৎপন্ন একটানা শব্দের সমাপ্তি ঘটতেই ধ্যান ভাঙলো তৃষার, ও তৎক্ষণাৎ খানিক নড়ে ওঠে মৃদু স্বরে শুধাল,

-‘ আপনি… আপনি রান্না করছেন?
আর্যর হাতের চপারটা একবার থেমে আবার সচল হলো। ও একবারও তৃষার দিকে না তাকিয়ে তেরছাভাবে প্যানের দিকে চেয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
​-‘ আপনার কি মনে হয় মিসেস আমি মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাশাপাশি না খেয়ে থাকার ট্রেনিংও নিয়েছি? আট ঘণ্টা ড্রাইভ করে আসার পর কারো না কারো তো ডিনারের চিন্তা করতে হবে।
​তৃষা অপরাধবোধে কুঁকড়ে গিয়ে দু-কদম এগিয়ে এসে আমতা-আমতা করে বলল,
-‘ আসলে আমি… খুব টায়ার্ড ছিলাম তো। আপনি কেন কষ্ট করতে গেলেন? দিন, আমি করছি।
​আর্য এবার চপারটা রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ওর কপালে জমে থাকা ঘামটা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে তৃষার চোখের দিকে তীক্ষ্ণভাবে তাকাল।

-‘ ডোন্ট নিড। রান্নাঘরটা অলরেডি একটা ল্যাবে পরিণত হয়েছে, নতুন কোনো এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে বিপদ বাড়াবেন না। তার চেয়ে বরং শান্ত হয়ে ওপাশে দাঁড়ান। বকবক না করলে কি আপনার মাইগ্রেন অ্যাটাক হয়?
​তৃষা গাল ফুলিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলল,
-‘ সব কিছুতেই কি ধমক দেওয়া জরুরি? আমি তো জাস্ট হেল্প করতে চেয়েছিলাম।
​-‘ আপনার হেল্প মানেই কাজ ডাবল হওয়া। ওপাশে গিয়ে গ্লাসগুলো টেবিলে রাখুন, ওটুকুই আপনার কোটা। এর বেশি নড়াচড়া করলে কিন্তু কিচেন থেকে বহিষ্কার করব আপনাকে।
​তৃষা রাগে গজগজ করতে করতে গ্লাসগুলো নিতে গেল। ঠিক তখনই টুইংকেল হাই তুলতে তুলতে চোখে হাত ঘষতে ঘষতে রান্নাঘরে ঢুকল। ও তৃষার কোমর জড়িয়ে ধরে আধো আধো কণ্ঠে বলল,
​-‘ বানি, ক্ষুধা লেগেছে তো!
তৃষা এক ঝলক আর্যর দিকেই ইশারা করতেই টুইংকেল অসহায় স্বরে বলল,,-‘ ও বানি নো। প্লিজ তুমি কিছু করো পাপা ওসব ঘাস পাতা কি রান্না করে !
তৃষা টুইংকেলের কথা শুনে হাসব না কাঁদব ভেবে পেল না। ও আর্যর দিকে আড়চোখে তাকাতেই আর্য টুইংকেলের দিকে ফিরে তাকালো।

-‘ সবজিকে ঘাসপাতা বলে এটা তোমাকে কে শিখিয়েছে মাম্মাম?
টুইংকেল বাচ্চমীসূলভ কণ্ঠে বলতে গেল,-‘ বানিই তো।
টুইংকেলের এই ছোট্ট স্বীকারোক্তির পিঠে তৃষার হৃৎপিণ্ডটা এক মুহূর্তের জন্য গলার কাছে এসে ঢিপঢিপ করছে। আর্যর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তখন অনুসন্ধিৎসু হয়ে তৃষার দিকে স্থির হতেই, তৃষা আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।
ও ঝটকা দিয়ে টুইংকেলকে নিজের দুই হাতের বেষ্টনীতে আগলে ওকে কিছু বুঝে ওঠার অবকাশ না দিয়ে আলতো হাতে ওর কোমল ঠোঁট সামান্য চেপে আর্যর দিকে তাকিয়ে এক গাল বোকা হাসিয়ে রেখা ছড়িয়ে তোতলামি করে বলল,
-‘ আ-আরে না না! টুইংকেল বোধহয় ঘুমের ঘোরে ভুলভাল বলছে। ও আসলে… ও আসলে বলতে চাইছে যে সবজি খেলে মানুষ অনেক শক্তিশালী হয়, তাই না সোনা? হাহাহা!
কথাটা শেষ করেই ও একরকম পাজাকোলা করে টুইংকেলকে কোলে তুলে নিল। আর্যর সরু চোখের কৌতূহলী চাউনিকে পাত্তা না দিয়ে ও পিছনের দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে বলল,

-‘ আপনি রান্না শেষ করুন মিস্টার! আমি ওকে নিয়ে হাত-মুখ ধুইয়ে ডাইনিং টেবিলে আসছি। একদম দেরি করবেন না কিন্তু, বাই!
রান্নাঘর থেকে একপ্রকার পালিয়ে ড্রয়িং রুমের সোফায় এসে ধপ করে বসল তৃষা। টুইংকেলের মুখ থেকে হাত সরিয়ে বুক ভরে দম নিতে নিতে ফিসফিস করে বলল,
-‘ ওরে আমার নাদান রে,পাপার সামনে ওসব কথা বলতে হয়? এখন যদি মিস্টার রোবট জেনে যেত যে আমি সব্জিকে ঘাসপাতা বলি, তাহলে ডাইনিং টেবিলটাই আজ কোর্টরুম হয়ে যেত!
টুইংকেল ফিক করে হেসে দিয়ে তৃষার গাল টেনে ধরল,-‘ স্যরি বানি আমি বুঝতে পারিনি।
তৃষা টুইংকেলের তুলতুলে চোয়ালে ছোট্ট চুমু একে বলল,-‘ইটস ওকে সুইটহার্ট।

হামিদা বেগমের কড়া শাসন আর বর্ষণমুখর সন্ধ্যার অশুভ সংকেতে মেহেসানা একপ্রকার বাধ্য হয়েই আজ আদ্রিয়ানদের বাসায় এসেছে। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি কাটাতে ও গেস্টরুম ভেবে যে কক্ষটিতে ঢুকেছিল, সেখানে এসি-র স্নিগ্ধ পরশ পেতেই কখন যে অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছে, তার হদিস নেই।
​হঠাৎ করেই কানের খুব কাছে কারো গলার আওয়াজ আর মৃদু খসখস শব্দে তন্দ্রা ভেঙে গেল মেহেসানার। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে ও দেখল, কক্ষের আবছা আলোয় সামনেই দাঁড়িয়ে আছে আদ্রিয়ান। ও তখন নিজের শার্টের বোতাম খুলতে ব্যস্ত ছিল। মেহেসানাকে ওভাবে বিছানায় আবির্ভূত হতে দেখে আদ্রিয়ান এক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেল, পরক্ষণেই বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে ওষ্ঠ কুঁচকে বলল,
​-‘ স্টুপিড গার্ল! আপনি কি এখন মানুষের বেডরুমও দখল করা শুরু করেছেন? আমার রুমে এভাবে চোরের মতো এসে আস্তানা গেড়েছেন কেন? গেট আউট অফ মাই বেড!
​মেহেসানা ঘুমের ঘোরে হতভম্ব হয়ে দ্রুত বিছানা থেকে নামল। এলোমেলো ওড়নাটা সামলে নিয়ে চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলল,

-‘ উইয়ার্ড! এটা আপনার রুম? আমি তো ভেবেছিলাম এটা গেস্টরুম। স্যরি, জানতাম না।
​বলেই ও দরজার দিকে এক কদম বাড়াল। কিন্তু হুট করে আদ্রিয়ানের বলা ‘স্টুপিড’ শব্দটা ওর মস্তিস্কে পুনরাবৃত্তি হতেই আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল ও। পিছন ফিরে কোমরে হাত দিয়ে রণচণ্ডী মূর্তিতে চেঁচিয়ে উঠল,
-‘ এই যে মিস্টার সেলফ-ডিক্লেয়ারড হ্যান্ডসাম! কী বললেন আমাকে? স্টুপিড? আপনি কোন সাহসে আমাকে স্টুপিড বললেন শুনি? আমি তো ভুল করে ঢুকেছি, কিন্তু আপনি যে অসভ্যের মতো আমার সামনে শার্ট খুলছিলেন, সেটার বেলা?
​আদ্রিয়ান তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,

-‘ নিজের রুমে শার্ট খুলব না তো কি আপনার পারমিশন নিয়ে লুঙ্গি ড্যান্স করব? লজিক নেই শুধু নয়েজ পলিউশন! এবার কি দয়া করে আপনার এই সাউন্ডবক্সটা নিয়ে বেরুবেন? আমার ঘুম পাচ্ছে।
​-‘ আপনার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে তবেই আমি যাব!
মেহেসানা আরও এক ধাপ এগিয়ে এলো,-‘ অসভ্য অভদ্র লোক কোথাকার! একটা মেয়ের ঘুমের সুযোগ নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে শরীর খুলছিলেন!
​আদ্রিয়ান এবার সত্যিই কপালে হাত দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও বুঝল, এই মেয়ের সাথে তর্কে জেতা মানে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে গান গাওয়া। ও শান্ত গলায় বলল,
-‘ ঠিক আছে বাবা, আমিই স্টুপিড, আমিই ল্যাম্পপোস্ট। এবার কি আপনি যাবেন নাকি সিকিউরিটি ডাকব?
​মেহেসানা নাক ফুলিয়ে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বলল, -‘ বেত্তমিজ!
​বলেই ও ধপধপ পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। করিডোরে দাঁড়িয়ে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে পাশের ঘরের দিকে হনহন করে হেঁটে গেল।

মেহেসানা গজগজ করতে করতে অপর প্রান্তের রুমের দরজাটা ঈষৎ খোলা দেখে ও কোনো চিন্তা না করেই ভেতরে ঢুকে পড়ল।রুমের ভেতর সাবরিনা আর মৃত্তিকা সোফায় বসে নিচু স্বরে কথা বলছিল। মেহেসানার এমন ঝড়ের বেগে প্রবেশ আর উস্কোখুস্কো চুল দেখে দুজনেই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মৃত্তিকা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে হেসে দিয়ে বলল,
-‘ কি ব্যাপার মেহু আপু?কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
মেহেসানা একটা লম্বা শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিয়ে পাশের খাটে বসে পড়ল। ওড়নাটা ঠিক করতে করতে খানিকটা আমতা-আমতা করে বলল,

-‘ আ-আরে কিছু না। আমি আসলে পাশের গেস্টরুমে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। জার্নির ধকলে শরীরটা একদম দিচ্ছিল না।
পাশ থেকে সাবরিনা বলল, -‘ কিতা ভাই? আমরা তোমাকে সারা বাড়ি খুঁজে আসলাম।
ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে হামিদা বেগমের কণ্ঠস্বর শোনা গেল। তিনি ঘরে ঢুকে মেহেসানাকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। সস্নেহে ওর মাথায় হাত রেখে তুমি করে সম্বোধন করে বললেন,
-‘ এই তো মেহু! তুমি এখানে? আমরা তোমাকে নিয়ে কত চিন্তায় ছিলাম মা। তুমি যে কখন গেস্টরুমে গিয়ে ঘুমালে টেরই তো পেলাম না। মুখটা শুকিয়ে একদম ছোট হয়ে গেছে। চল, নিচে খাবার দেওয়া হয়েছে, ডিনারটা সেরে নাও।
-‘ না আন্টি, আসলে আমার একদম ক্ষুধা নেই। শরীরটা খুব ম্যাজম্যাজ করছে, আমি বরং এখন একটু শুয়ে থাকি।
হামিদা বেগম ওর চিবুক ছুঁয়ে আদুরে গলায় বললেন,
-‘ ওসব শুনছি না! রাত অনেক হয়েছে, না খেয়ে ঘুমালে শরীর আরও খারাপ করবে। সাবরিনা, মৃত্তিকা তোমরাও চলো। সবাই মিলে একসাথে খাব।
হামিদা বেগমের মাতৃত্বসুলভ আবদারে ‌মেহেসানা আর অমত করতে পারল না। ধীরপায়ে ওদের সাথে ডাইনিং হলের দিকে পা বাড়াল।

মহানগরীর বক্ষ জুড়ে আজ তিমির রজনীর নিবিড় আলিঙ্গন। অন্তরীক্ষে নভোপতির অনুপস্থিতি যেন এক অসীম শূন্যতার হাহাকার ছড়িয়ে দিয়েছে চারধারে। কৃষ্ণা তিথির এই নিঝুম প্রহরে ধরিত্রী যেন কোনো এক মায়াবী নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। বেলকনির কার্নিশ ঘেঁষে বসা তৃষার দোলনাটি মৃদু সমীরণে দুলছে, আর সেই হিল্লোলে চড়চড়িয়ে ডানা মেলছে ওর অবাধ্য ভাবনারা। রাতের এই গাম্ভীর্যকে চিরে তৃষার আঙুল সচল হলো ইলেকট্রনিক পর্দার নীল আলোয়।
ও কিবোর্ডে আঙুল ছুঁইয়ে লিখে পাঠালো কাঙ্খিত অ্যাকাউন্টটিতে,,
-‘ কি ব্যাপার মিস্টার? আজও এত রাতে অনলাইনে।
মুহূর্তের মধ্যেই সিন হলো মেসেজটা রিপ্লাইও এলো তৎক্ষণাৎ,-‘ ইনসোনিয়া রোগ ধরা করেছে বোধহয়।

-‘ মানে?
-‘ ইদানিং রাতে ঘুম আসে না।
-‘ বলেন কি? এটা একদমই ভালো লক্ষণ নয়। তা ডাক্তার দেখাচ্ছেন?
এবার রিপ্লাই এলো খানিক বাদে,-‘ না।
তৃষা এবার প্রশ্ন ছুড়ল কিঞ্চিৎ কৌতুহলী হয়ে, -‘ কেন?
-‘ এ রোগের ঔষধ সব ডাক্তারের কাছে নেই।
-‘ তাহলে যার কাছে আছে তার কাছে যান।
-‘ সেই চেষ্টাই তো করছি ম্যাম।
-‘ তো?
-‘ কিন্তু তার তো দেখা নেই।
-‘ মানে?
-‘ মানে এ রোগের ঔষধ একমাত্র আমার পার্সোনাল ডাক্তারনীর কাছেই আছে।
এতক্ষণে তৃষা বুঝলো আর্য আসলে কিসের কথা বলছে। ফাজিল বেডার ফাজলামিকে নাদান তৃষা এতক্ষণ অসুস্থতা হিসেবেই ধরে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছিল।

‘ধুর! এই লোকের জন্য চিন্তা করাই বৃথা।’-কথাটা মনে মনে আওরে ফোনটা পাশে রাখলো তৃষা। পরক্ষণে হঠাৎ টুং শব্দ হতেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেটা হাতে তুলল ও। আর্যর মেসেজ,
-‘ তা ম্যাম? আপনার এত রাতে অনলাইনে থাকার রিজন?
তৃষা হেলদোলহীন ভাবে সরল মনে প্রত্যুত্তর পাঠালো, -‘সামনে এইচএসসি।
-‘ ওএমজি আপনি এইচএসসি ক্যান্ডিডেট?
-‘ জ্বী।
-‘ কোন কলেজের?
-‘ ঢাকা কলেজ।
-‘ কি বলেন? আপনি ঢাকার?
-‘ না আমি গ্রামের পড়াশুনার খাতিরে রাজধানীতে থাকি।
তৃষার উত্তরটা স্ক্রিনে ভেসে ওঠা মাত্রই আর্যর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ধূর্ত হাসি ফুটে উঠল। ও ভাবতেই পারেনি তৃষা এতটা সরলভাবে ওর জালে পা দেবে। ও দ্রুত টাইপ করল,
​-‘ ওয়াও! হোয়াট আ কো-ইনসিডেন্স! আমিও তো বর্তমানে ঢাকাতেই আছি। তাহলে কি বলেন ম্যাম? আমরা তো একবার মিট করতেই পারি।
​তৃষা মেসেজটা পড়েই নিজের কপালে একটা চড় মারল। বিড়বিড় করে নিজেকেই শোনাল,

-‘ ওরে তৃষা! তুই তো আস্ত একটা গাধী! একদম লোকেশন বলে দিলি? এখন যদি এই লোক দেখা করতে চায় আর আমি না যাই, তবে তো ভাববে আমি ভয় পাচ্ছি। আবার গেলে যদি ধরা খেয়ে যাই?
​ওর ভাবনার মাঝেই আর্যর পরবর্তী মেসেজ এল,
-‘ কী হলো ম্যাম? চুপ হয়ে গেলেন যে? ভয় পাচ্ছেন নাকি?
​আর্যর এই প্রচ্ছন্ন খোঁচায় তৃষার আত্মসম্মানে বড়সড় একটা ধাক্কা লাগল। ও দাঁত কিড়মিড় করে টাইপ করল,
-‘ ভয় পাওয়ার মেয়ে আমি নই মিস্টার! কিন্তু আমি হুটহাট অচেনা মানুষের সাথে দেখা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না।

​-‘ অচেনা? মাঝরাতে চেয়ে মানুষটার মেসেজের রিপ্লাই করতে পারেন সে এখন আপনার কাছে অচেনা? নাকি আপনি আসলে আমাকে রিয়েল লাইফে ফেস করার সাহস পাচ্ছেন না? চ্যালেঞ্জটা কি তবে হেরে গেলেন?
​চ্যালেঞ্জ শব্দটা দেখামাত্র তৃষার মাথার রক্ত চনমন করে উঠল। ও রাগের মাথায় কীবোর্ডে ঝড় তুলে লিখল,
-‘ কিসের চ্যালেঞ্জ? আমাকে কি আপনার খুব ভীতু মনে হয়? কোথায় আসতে হবে বলুন, আমি আসব!
​আর্যর বাঁকা হাসিটা এবার আরও চওড়া হলো। ও জানে তৃষাকে কীভাবে নাড়াতে হয়। ও শান্তভাবে লিখল,
-‘ দ্যাটস লাইক আ কুইন! কাল যখন আপনার টাইম হয়, তখন না হয় আমরা বনানীর ক্যাফে রিদম-এ মিট করলাম। একদম কর্নারের টেবিলটাতে আমি থাকব। হাতে নীল রঙের একটা রুমাল থাকবে, যাতে আমাকে চিনতে কষ্ট না হয়। ইউ জাস্ট কাম!
​তৃষা আর পিছপা হলো না। ও লিখে দিল,
-‘ আসব। ঠিক বেলা দুটো নাগাদ, সো বি রেডি মিস্টার সেলিং কিং।

​মেসেজটা পাঠিয়েই তৃষা ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। হাত-পা কাঁপছে ওর।তবে ও প্রখর রুপে অনুভব করছে আর্যর সাথে এই ভার্চুয়াল দ্বৈরথ এখন আর কেবল মজার ছলে নেই, এটি এখন ওর অস্তিত্বের এক সূক্ষ্ম পরীক্ষায় রূপ নিয়েছে। তৃষা এবার উপুড় হয়ে বালিশটা নিজের সঙ্গে বেশ জোরে চেপে ধরল।
এক নব ভাবনার উদয় হতেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেল ওর।​যে মানুষটা ঘরে থাকলে তৃষার সাথে দুটো সহজ কথা বলতে কুণ্ঠাবোধ করে, যে মানুষটা ওকে নিয়ে কোনোদিন নিজে থেকে কফিশপে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়নি, সেই মানুষটাই কি না একজন অচেনা মেয়ের সাথে দেখা করার জন্য বনানীর ক্যাফেতে টেবিল বুক করার স্বপ্ন দেখছে! ভাবতেই তৃষার পিত্তি জ্বলে উঠল।

​-‘ অ-সভ্য! এক নম্বর ল-ম্পট! ঘরে এতো সুন্দরী আর বুদ্ধিমতী একটা বউ থাকতে ও কোন সাহসে অন্য একটা মেয়ের সাথে ডেটে যাওয়ার প্ল্যান করে? তাও আবার নীল রুমাল হাতে নিয়ে? ইশ! কী রোমান্টিক সাজার চেষ্টা!
​তৃষা দাঁত দিয়ে নিজের নখের কোণ কামড়াতে লাগল একরাশ অভিমানে ও এবার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলো, কাল ও যাবেই। তবে তৃষা নেওয়াজ হয়ে নয়, বরং অন্য সাজে আর্যর মুখোমুখি দাঁড়াবে। ও​ এবার ফিসফিস করে বলল,
-‘ মিস্টার মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, কাল আপনার ওই নীল রুমাল দিয়ে আমি আপনারই চোখের পানি মুছিয়ে দেব। পরকীয়া করার শখ আমি কাল মিটিয়ে দিচ্ছি আপনার। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ!

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩২ (৩)

​ওদিকে নিজের ঘরে বসে আর্য ল্যাপটপ বন্ধ করল। ওর চোখের সেই নীলচে-ধূসর মণি তখন এক চরম তৃপ্তিতে চিকচিক করছে। ও আদতে এতটাই চেয়েছিল। ও খুব করে দেখতে চায় ওর বোকা মানবীর পদক্ষেপ কালকে কেমন হয়।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৪