প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫
নীতি জাহিদ
মামুন সাহেব ইমরানকে দেখে যতটা খুশি হয়েছেন তার চেয়ে বিষাদ ছেয়ে গিয়েছে বদন জুড়ে ছেলের এই অবস্থায়। মিনহাজের বেডরুমে সমবেত হয়েছে বাড়ির সদস্যরা। নুরজাহান বেগমকে দেখে ইমরান সালাম দিলো। প্রায় অনেক বছর পর ইমরানকে দেখে বাড়ির সবাই চমকে গিয়েছে। ইমরান মুচকি হেসে নুরজাহান বেগমকে বললেন,
– খালাম্মা খুশি হন নি?
নুরজাহান বেগম এগিয়ে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
– কতা আটকায় গেছে আমার বাপজান। এতটা বছর কইলাম আইসা ঘুইরা যাও। শুনলানা। আইজ তো মনে হইতাছে স্বপ্ন দেখতাছি।
হাসলো ইমরান। এখনো আঞ্চলিক ভাষা রয়ে গিয়েছে নুরজাহান বেগমের মুখে। ইমরানের খুব ভাল লাগে এই মানুষটার মুখে এভাবে আঞ্চলিক ভাষা শুনতে।পুনরায় হালকা হেসে বললো,
– তখন সময় হয়নি, এখন হলো তাই ছুটে এলাম আপনাদের কাছে।
– খুব ভালো করেছেন ইমরান ভাই। এবার কিছুদিন থেকেই যান।
মায়া নাস্তা হাতে নিয়ে ঢুকতে ঢুকতে ইমরানের উদ্দেশ্যে বললো। মাথা নেড়ে প্রশ্ন করলো ইমরান,
– কেমন আছো মায়া?
– আলহামদুলিল্লাহ ভালো।
সালমা এবং মনসুর দুজন একসাথে এলো। মনসুরের সাথে কোলাকুলি করে ইমরান টুকটাক কথা বলছে। এর মাঝে সালমা প্রশ্ন করলো,
– কিছুদিন কি থাকবেন ভাইয়া?
– আছি কিছুদিন।
– ইশান কেমন আছে?
– আলহামদুলিল্লাহ ভালো।
– একটা বিয়ে করে নিন এবার। নতুবা আশপাশের মানুষের জ্বালায় আবার দেশ ছাড়তে হবে।
কথাটা যাকে বলা হয়েছে সে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে। ক্রোধে মাথার তালু গরম হয়ে গিয়েছে। ইচ্ছে করছে কষে চ ড় মা/রতে। তৎক্ষনাৎ মনসুর স্ত্রীকে ধমকে বললো,
– সবসময় অহেতুক কথা বলবেনা।
ইমরান মনসুরের দিকে তাকিয়ে বললো,
– মনসুর…
মনসুর ইমরানের ইঙ্গিত বুঝে দমে গেলো। সালমাকে সবার সামনে ধমক দেয়াটা অপ্রয়োজনীয় আচরণ। ইমরান পছন্দ করেনি ব্যাপারটা মুখ দেখে সহজে বুঝা যাচ্ছে।
খাঁচা নিয়ে মোনা বাবার রুমে ঢুকলো। ইমরানের সামনে দাঁড়িয়ে কাকাতুয়ার খাঁচা এগিয়ে দিলো। হাত বাড়িয়ে খাঁচা নিলো ইমরান। ভেতরে লাল ঝুটি কাকাতুয়া ছটফট করছে। মোনা মিষ্টি গলায় বললো,
– ইমরান সাহেব আমার মিন্নি।
গাড়ির মধ্যে ব্যাপারটা মজার থাকলেও কেবল ঘটে যাওয়া ঘটনায় ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু। নুরজাহান বেগম নাতনীকে ধমকে বললেন,
– এ্যই ছেমরি ইমরান কি তোমার বন্ধু। নাম ধইরা ডাকো ক্যান? বেত্তমিজ। ছিঃ ছিঃ আদব কায়দা আর শিখাইতে পারলাম না।
মোনা তেড়ে দাদীর দিকে তাকিয়ে কটমট করে বললো,
– একশ বার ডাকবো। তাতে তোমার কি বুড়ি? আপনাকে এই নামে ডাকলে কোনো সমস্যা আছে ইমরান সাহেব?
ব্যাপারটাকে বাড়তে দিলোনা ইমরান। মোনাকে কাছে টেনে পাশে বসিয়ে বুঝিয়ে বললো,
– না মোনালিসা আমার সমস্যা নেই তবে আমি বেশ বড় তোমার চেয়ে। ডাকটা শুনতে অশোভনীয় লাগছে। যদিও খুবই সুন্দর ডাক। তবে এভাবে বাঙালী নারী তার প্রিয় মানুষদের স্মরণ করে।
– আপনি তো আমার প্রিয়। আমাকে কত আদর করে মোনালিসা ডাকলেন।
মিনহাজ মৃদু ধমক দিলো মেয়েকে,
– মোনা…
ইমরান চোখ বড় করে তাকালো মিনহাজের দিকে। ইশারা দিয়ে বুঝালো না ধমক দিতে। বাবার ধমক খেয়ে ছলছল চোখে তাকিয়ে বললো,
– আমি অসুস্থ, তুমিও অসুস্থ তবুও আমাকে বকা দিলে। এ্যই ইমরান সাহেব আর জীবনেও আমার বাসায় আসবেন না। আপনার জন্য আমি বকা খেয়েছি।
দৌঁড়ে চলে গেলো ইমরানের হাত থেকে খাঁচাটা কেড়ে নিয়ে। মায়া মাকে রেগে বললো,
– আম্মা সবকিছুতেই তুমি মুনিয়ার সাথে এমন করো। কি এমন অপরাধ করেছে? ইমরান ভাই কিছু মনে করবেন না। ছোট মানুষ।
রুম জুড়ে নিস্তব্ধতা। গলাটা বেশ রূঢ় শোনালো,
– আজ আসাটা উচিত হয়নি। স্বভাবতই নারী জাতি নাজুক। আপনারা বকে ধমকে এভাবে ম্যানেজ করতে গেলে হিতের বিপরীত হবে।
কি থেকে কি হয়ে গেলো? এর মাঝে ইমরানের ফোন আসাতে তড়িঘড়ি করে বের হলো। বাসা থেকে ফোন আসায় কেউ আটকায়নি। বাড়ির প্রতিটি মেম্বার আজ লজ্জা পেয়েছে। এতটুকু কারো বুঝতে অসুবিধা হলোনা যে ইমরান ভীষণ রাগ করেছে। এভাবে কথা বলা ওর অপছন্দের।
শেপার্ডের সাথে ছুটাছুটি করতে গিয়ে পড়ে পা ছিলে ফেলেছে ইমরান শরীফের নবাব পুত্র৷ এখন সে টেবিলের উপর অভিনব কায়দায় পা তুলে সোফায় শরীর এলিয়ে রেখেছে। কারণ ফুফি বলেছে পা যেন না নাড়ায়। এতে পা ব্যাথা বেড়ে যাবে। চুপ চাপ শান্ত ছেলেটা পা ছিলে যাওয়াতে যতটা ভয় না পেয়েছে ফুফি তার চেয়ে বেশি ভয় পেয়েছে। ফুফির তড়িঘড়ি অবস্থা দেখে ইশান মুচকি মুচকি হাসছে। পাঁচ বছর বয়সে বাবার সাথে ইতালী পাড়ি দেয় ইশান। প্রায় সাত বছর কেটে গিয়েছে। প্রথম তিন বছর দেশে আসা-যাওয়ার মধ্যে থেকেছে ইমরান। আইরিন ইতালি গেলে দেখে রাখতো ইশানকে। সেই সময়টাতে ইমরান দেশে আসতো। গত চারবছর আর আসা হয়না সেভাবে। দুশ্চিন্তা গেড়ে বসে মাথায়। এছাড়া ইশানের পড়াশোনা বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পরিস্থিতি, সময়, ঘটনা সবই সে বুঝে তবুও মাঝে মাঝে ভুল করে ফেলে। তবে ভুলের সমাধান ও তার জানা। বাবার কাছে সব সমাধান এক চুটকিতে মিলে যায়। অপেক্ষা করছে বাবার জন্য। ইমরান ইশানের রুমে ঢুকেই ছেলের এই হাল দেখে কাছে এসে জড়িয়ে ধরলো। বুকের সাথে চেপে ধরলো। এতটুকু পথ মনে হয়েছে প্রাণপাখি বোধ হয়ে উড়েই গেলো চিন্তায়। ছেলের কপালে চুমু দিয়ে বললো,
– প্রিন্স বেশি ব্যাথা করছে?
– নো পাপা, আমি ঠিক আছি।
– চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলেন তো পাপাকে।
– ফুফি চিন্তা করছিলো। দেখো কিভাবে আমাকে রোবট বানিয়ে বসিয়ে রেখেছে। পাপা জানো ফুফি ভয় পাচ্ছে ব্যাথা যদি আরো বেড়ে যায়। আমার তো চিন্তা হচ্ছে ফুফির জন্য, মনে হয় যেন ব্যাথা টা আমার না ফুফির।
কথাটুকু বলেই হেসে দিয়েছে ইশান। ছেলের এই হাসিটুকুর জন্যই নতুন করে জীবন সাজানো হয়নি। নিজের জীবন সাজালে ছেলের জীবন বিগড়ে যেতে কতক্ষন! এই ছেলে তার বড় তপস্যার। কোনোভাবেই ছেলের জীবন নষ্ট করবেনা।
সারাদিনের ক্লান্তিতে ঘুম ঝেঁকে ধরেছে। তিমির আচ্ছন্ন কামরায় বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। হুমড়ি তুমড়ি খেয়ে নয়ন ঢুকলো রুমে। ইমরান দরজা দিয়ে দেখতে পেয়েছে নয়নকে। রুমের লাইট জ্বালিয়ে নয়ন চেয়ার টেনে বসলো। কপালে ব্যান্ডেজ। এভাবে হন্তদন্ত হয়ে আসার কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছেনা ইমরান। প্রশ্নসূচক দৃষ্টি। নয়ন গাল ফুলিয়ে বলে,
– আজকে রাতটা থাকতে দিবি তোর বাসায়?
– হুম
– প্রশ্ন করবিনা?
– প্রয়োজন নেই।
– করবি কোন মুখে, দোষ তো তোর।
– আমার কিভাবে? রিসিভ না করলেই হতো।
– আমি কি জানতাম ওই মহিলা ছিলো। অপরিচিত নাম্বার ছিলো তো।
– ফ্রেশ হয়ে নেয়। খেয়ে নিবি।
নয়ন বাসায় পৌঁছে কিছুক্ষন বিশ্রাম নেয়ার জন্য শুয়েছিলো। অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন এলো। রিসিভ করতেই মেজাজ চ টে গেলো। ফোনটা ছিলো ইমরানের প্রাক্তন স্ত্রী কাকনের। পাশে ছিলো রিক্তা। নয়ন না বুঝেই রিক্তাকে বলে দিলো। রিক্তা ক্ষে পে বাসা থেকে বের করে দিলো। নয়নকে কেনো ফোন দেবে ওই দুশ্চরিত্রা ? ইমরানকে ফোন দিয়ে বিচার দিয়েছে৷ ইমরান সমাধান দিয়েছে বাড়ি থেকে বের করে দিতে। নয়ন ও তাই ইমরানের ঘাড়ে। উঠে গিয়ে ফ্রেশ হতে গেলো ইমরান। পরনে তোয়ালে পেঁচিয়ে ওয়াশরুম থেক্র বের হলো নয়নের চেঁচামেচিতে। ফোন দিয়ে তখন থেকে কেউ বিরক্ত করছে।
ফোন রিসিভ করতেই বুঝতে পারলো নতুন নাম্বার থেকে বিরক্ত করা হচ্ছে। ইমরান খাটে বসে ফোনটা স্পিকারে রাখলো। এদিকে নয়ন ছটফট করছে কাকনকে কথা শুনানোর উদ্দেশ্যে। ইমরানের ইশারাতে নিশ্চুপ নয়ন। ও পাশ মেয়েলী স্বর এলো,
– ইমরান, সব কিছুর লিমিট থাকে। দেশে এসেছো অথচ ছেলেকে দূরে সরিয়ে রেখেছো কেনো? আমি কথা বলতে চাই।
ইমরান নির্বাক। নয়নকে ইশারা দিতেই নয়ন বুঝে দরজা খুলে বের হলো। এদিকে কাকন প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। ইমরান কাকনের কয়েক বাক্যের বিপরীতে হুম, হ্যাঁ করছে। এর মাঝে নয়ন ইশানকে কোলে করে নিয়ে এলো। ছেলেটার পায়ে ব্যাথা। ইশান সামনে আসতেই ইমরান পাশে বসিয়ে বললো,
– ইশান, কথা বলো।
ইশান বাবার দিকে একবার তাকায়, আবার নয়ন আংকেলের দিকে তাকায়। গলার স্বর শুনে বুঝে গেলো কে? দেশে থাকা কালীন চার বছর আগেও এই মা কথা বলতে চেয়েছে কয়েকবার তখন বাবা দেয়নি। আজ কেনো দিচ্ছে? ও পাশে থেকে মা সম্পর্কিত নারী বললো,
– ইশান, বাবা কেমন আছো?
– আসসালামু আলাইকুম, জ্বি আলহামদুলিল্লাহ ভালো।
ছেলের ব্যবহার দেখে ইমরান তৃপ্তির হাসি দিলো। ছেলেটা যে ভদ্রতা শিখেছে এতেই ইমরান খুশি। পুনরায় ফোনালাপে মনোযোগ দিলো।
– ওয়ালাইকুমুস সালাম। আমাকে তুমি চিনতে পেরেছো?
– জ্বি।
– আমি তোমার মা।
– জানি।
– আসবে মায়ের কাছে?
– কেনো?
– বাবা তুমি তো এখন বড় হয়েছো। এখন তোমাকে তোমার বাবা আর আটকে রাখতে পারবেনা। তুমি মায়ের কাছে চলে আসো।
– পাপা তো আমাকে আটকে রাখেনি।
– তাহলে চলে আসো।
– কক্ষনো না। পাপাকে ছেড়ে কোথাও যাবোনা। আপনি আর কখনো আমাকে ফোন দিবেন না। কেনো আমার পাপাকে কষ্ট দিতে আমায় ফোন দিয়েছেন? আমি আপনাকে চাই না, আমি আপনাকে চিনিনা। আমার বাবা মা সব আমার পাপা।
ফোনের লাল অপশনটা চেপে ফোন কে*টে দিলো ইশান। বাবার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উলটে কেঁদে দিয়ে বললো,
– পাপা তুমি পঁচা। কেনো কথা বলেছো ওনার সাথে। আমি তোমার উপর খুব রাগ করেছি। আমার কষ্ট হচ্ছে পাপা।
ইমরান ছেলেকে বুকের সাথে চেপে ধরলেন। কিছু কষ্ট কাউকে বুঝানো যায়না। বাবাকে আকড়ে ধরে কেঁদেই যাচ্ছে ছোট্ট ইশান। ভেতরটা হয়তো মা মা করছে অথচ সেই মায়ের আদর যখন খুব প্রয়োজন ছিলো তখন তা থেকে বঞ্চিত ছিলো। এখন দরকার নেই। ইমরান ছেলের চোখের পানি মুছে দিয়ে কপালে চুমু খেলো। ছেলেকে কোলে বসিয়ে বললো,
– প্রিন্স, তুমি যেতে চাইলে যেতে পারো। পাপা কিছু বলবোনা।
ইশান গলা আকড়ে ধরে বললো,
– ইশানের শুধু পাপা,চাচ্চু, ফুফি, সোহান ভাইয়া আর সামান্তা আপু আছে। আর কাউকে লাগবেনা। তুমি প্রমিজ করো কখনো মিসেস কাকনের কাছে পাঠাবেনা, প্রমিজ?
– ছিঃ বাবা, মা হয় তোমার।
– প্রমিজ করো। আমি আবার কাঁদবো নাহলে…
নয়ন ধমক দিলো ইমরানকে।
– তোর কি প্রেম উতরায় পড়ছে? ছেলেটাও বুঝে কি ভালো আর কি খারাপ? তুই বুঝিস না। যত ইশানকে কাকন থেকে দূরে রাখবি তত ভালো। ইশান, পাপা তোমাকে দূরে পাঠাবেনা। সবসময় তুমি পাপার কাছেই থাকবে।
ইমরান ছেলের ছোট্ট হাত দুটোতে চুমু খেয়ে বললো,
– পাঠাবোনা পাপার জান। পাপা তোমাকে ছাড়া যে বাঁঁচবোনা বাচ্চা।
– আই লাভ ইউ পাপা।
– লাভ ইউ ঠু প্রিন্স।
ইশান নিজেই দু চোখের পানি মুছে বললো,
– পাপা জানো আজ কি হয়েছে? শেপার্ড আর আমি নিচে খেলা করছিলাম, রাবিয়া আন্টি এবং মতিয়া আন্টি বাগানে কাজ করছিলো। ফুফি বলেছিলো তুমি কুমড়োর শাক পছন্দ করো সেটা তুলে আনতে। ফুফি একটা খাবার বানাবে। মতিয়া আন্টি শাক তুলতে গিয়ে দেখে কালো জোঁকের মতন কিছু একটা। উনি একদম ভয় পায়নি। সেটা চুপি চুপি তুলে রাবিয়া আন্টির ওড়নাতে লাগিয়ে দিয়ে সেই কি চিৎকার। রাবিয়া তোরে জোঁকে ধরছে রে, তুই তো মইরা যাইবিরে। তোর তো বিয়া হইবো নারে। তোর জামাই আর তোরে বিয়া করতে আইবোনা রে…
ইশান হাসতে হাসতে থেমে গেলো। এদিকে নয়ন ও হাসিতে লুটপাট। ইমরানের চক্ষু ছানা বড়া। ছেলে কিভাবে এই ভাষা অবিকল নকল করে দেখালো? ছেলেকে প্রশ্ন করলো,
– তুমি ভয় পাওনি?
– আমি তো জিনিসটা দেখিনি। এরপর কি হয়েছে শুনো?
– কী?
– মতিয়া আন্টি সেই জোঁক সহ চিৎকার দিতে দিতে বাড়িতে ঢুকে গেলো। এদিকে ফুফি এদের চিৎকার দেখে বকা ঝকা শুরু করেছে। পরে নাকি জোয়াদ্দার চাচা এসে সেই জোঁক মে রেছে। সেই থেকে মতিয়া আন্টি তিনবার গোসল করেছে। এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছে। রাবিয়া আন্টিকে পানিশমেন্ট হিসেবে ফুফি কান ধরে দু ঘন্টা এক পায়ের উপর দাঁড় করিয়ে রেখেছে। এখন তার ও পায়ে ব্যাথা করছে। সব কাজ ফুফি শেষ করেছে। এর মাঝে আমি তো একটু পায়ে ব্যাথা পেলাম। সব নিয়ে আজ ফুফির খুবই খারাপ অবস্থা যাচ্ছে। তাই একটু মনটা খারাপ।
ইমরান মুখে বিরক্তিকর শব্দ করে বললো,
– এদের দুজনকে নিয়ে বড্ড বিপদে আছি। তোমার রুবিনা আন্টি কোথায়?
– আন্টি তো ছুটিতে। আন্টির বোনের মেয়ের বিয়ে না?
– হুম, ভুলে গিয়েছিলাম। ঠিক আছে তুমি যাও রুমে। পাপা তোমাকে খাইয়ে দিবো।
– আমি খেয়েছি পাপা। তুমি খেয়েছো?
– না বাবা, পাপা খেয়ে নিতে পারবো তুমি রেস্ট নাও। পায়ের ব্যাথা কমেছে?
– নেই তো ফুফি শুধু চিন্তা করে।
– আচ্ছা এই ছোটাছুটির মাঝেই কি তুমি পায়ে ব্যাথা পেয়েছো?
ইশান উপর নিচ মাথা নেড়ে বললো,
– হ্যাঁ ওদের চেঁচামেচিতে আমি আর শেপার্ড কনফিউজড ছিলাম কোনদিকে দৌঁড়াবো। পরে ইটের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়েছি শেফার্ড আমাকে সাহায্য করেছে নতুবা আরো বেশি ব্যাথা পেতাম। পাপা শেপার্ড ও ব্যাথা পেয়েছে মনে হয়।
ইমরান ট্রাউজার পরে ছেলেকে কোলে তুলে নিলো। ট্রাউজার পরার সময় নয়ন এক কান জ্বালা করা কথা বলে উঠলো,
– আমি ইমাজিন করতে পারছি একটা জিনিস দোস্ত?
ইমরান ভ্রু কুচকে বললো,
– কি?
– যদি মিস. তোফা তোকে তোয়ালে পরা দেখতো…উফ ফিট খেয়ে যেত। এরপর তো উনি হাসপাতালে থাকতো। তখন আমরা কিউসি ম্যানেজার হিসেবে কাকে নিতাম? অবশ্য গত মাসে একজন…
ইমরানের বজ্রধমকে লাফিয়ে উঠলো নয়ন। মুখটা পেঁচার মত করে বলে,
– ভাই, আমার মনে অনেক দুঃখ। আহারে আজকে রাতে আমিও তোয়ালে পরে আমার রিক্তার সাথে…
ইশানকে দেখে মেকি কান্না করে থামলো। পুনরায় বলে উঠলো,
– কিন্তু বউটা বাইর কইরা দিলো।
– থামলি কেনো বল অসভ্য। মুখ চালানো শুরু করলে সামনে কে আছে চোখে পড়েনা। বেয়াদপ।
ইশান হা করে দুজনের তামশা দেখছে। ইমরান ছেলেকে কোলে তুলে নিলো। নয়নকে জিজ্ঞেস করলো যাবে কিনা। তিনজন মিলে রওয়ানা দিলো শেপার্ডের বাড়ি। ইশান বাবার কোলে উঠতে লজ্জা পেয়ে বললো,
– পাপা আমি পারবো। কোলে নেয়া লাগবেনা।
ইমরান আরো শক্ত করে ছেলেকে চেপে ধরে বললো,
– আমার ছেলে আমার কাছে সবসময় ছোট্টোটি থেকে যাবে। এখনো এত বড় হওনি যে পাপার কোলে উঠতে লজ্জা পাবে?
নয়ন হেসে বলে,
– ইশানকে বিয়ে দিয়ে দিব এবার কি বলিস ইমরান?
ইশান লজ্জায় মুখ ঢেকে বলে,
– চাচ্চু পঁচা কথা বলবে না। ইশান বিয়ে করবেনা। পাপা তাহলে একা হয়ে যাবে।
হাঁটতে হাঁটতে শেপার্ডের বাড়ির সামনে এসে ইশানকে নামিয়ে দিলো ইমরান। দেখতে দেখতে ছেলেটা বারোতে পা দিয়েছে। এদেশ- সেদেশ করে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়েছে। অন্যদের মতো এখন ক্লাস সিক্সে থাকার কথা, এখন পিছিয়ে ভর্তি করাতে হবে। ছেলের পেটে কাতুকুতু দিয়ে বললো,
– তাই না? পাপার কথা এত ভাবে আমার প্রিন্স?
– ইয়েস। ভাবতে তো হবেই।
শেপার্ডের কাঠের বাড়ি খুব সুন্দর করে সাজানো। মনে হবে যেন কোনো মানুষের বাড়ি। ভেতরে দোলনা আছে ঘুমানোর জন্য বেড আছে। ক্ষুধা লাগলে ঘন্টা রেখেছে যা বাজালে খাবার দেয়া হয়। ইমরান শেপার্ড বলে ডাকতেই ছুটে এলো। হাঁটু গেড়ে বসে জড়িয়ে ধরলো ইমরানকে। জিজ্ঞেস করলো,
– কিরে কোথায় ব্যাথা পেয়েছিস দেখি।
সুরেলা ক্রন্দন শব্দ করে হাঁটু দেখালো। শেপার্ডের জানালার পাশেই ওর মেডিসিনের বক্স রাখা। ইমরান হাত বাড়িয়ে তা নিয়ে বসে ড্রেসিং করে দিলো। অনেকক্ষানী ঘা হয়েছে বাচ্চাটার। এই জার্মান শেপার্ড বাংলাদেশে থাকতেই কিনেছে। মাঝেই মাঝেই ইশতিয়াক সোহানের সাথে দেশে এসে ঘুরে যেত। ওয়েল ট্রেইন্ড এই শেপার্ড। ইশানের জন্যই রাখা হয়েছে। শেপার্ডকে ড্রেসিং শেষে পুনরায় ওর বাড়ি পাঠিয়ে নিজেদের কামরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। ইশানকে এবার নয়ন কোলে নিতে চাইলে ইশান লজ্জা পেয়ে বলে,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪
– তোমরা দুজন আমাকে লজ্জা দিতে চাইছো কেনো? আমার ভীষণ লজ্জা লাগছে।
ও ছুটে পা খুঁড়িয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেলো। ইমরান ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে বললো,
– ছেলে আমার বড় হচ্ছে নয়ন। লজ্জা পেতে শিখেছে।
