Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩০

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩০

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩০
নীতি জাহিদ

আরে না জানি কি মন্ত্র করি জাদু করিল।।
ও সোনা,বন্ধে,…
ও সোনা বন্ধে আমারে দেওয়ানা বানাইলো
সোনা বন্ধে আমারে পাগল করিল
আবার সেই পুরনো গান। শাড়ি চেক করছে চেকিং রুমে। গ্রুপের প্রত্যেকে উপস্থিত আছে। নয়ন এবং ইমরানকে একসাথে ঢুকতে দেখে জোরে সুর ধরলো। নয়ন মুচকি হাসি দিলো। ইমরানের চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিজের কাজ করছে। ব্যাপারটা মনোরঞ্জনের জন্য মোটেও ছিলোনা। ইমরানকে টিজ করতেই গান ধরেছিলো। ইমরানের মুখাবয়ব দেখেই বুঝা যাচ্ছে বিরক্ত। গম্ভীর গলায় বললো,

– কাজ কতদূর।
রিমি আগ বাঁড়িয়ে বললো,
– স্যার আমরা সব কাউন্টের শাড়ি আলাদা করেছি। অনেকটা চিনে নিয়েছি। এখন শো রুমে উঠানো এবং মার্কেটিং পলিসি বাকি।
– আপনাদের পরিচিত ব্র্যান্ড প্রমোটর আছে?
তামান্না মাথা ঝেঁকে বললো,
– জ্বি স্যার। আমার কয়েকজন ফ্রেন্ড আছে।
-পরিচিত ফেস হলে বেশ ভালো।
– ওকে স্যার।
ইমরান নয়নকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। মোনাকে জানাতেই রিমি একটু জোরে বললো,

– চেয়ারম্যান স্যারকে আজ বেশ সুন্দর লাগছে। মানুষ দিন দিন বুড়ো হয়, উনি দেখি ড্যাশিং হচ্ছে।
মোনা খানিকটা হেসে উত্তর দিলো,
– শুধুই কি উনি ড্যাশিং। আমার বাবা মামাও তো ড্যাশিং।
তিহান বললো,
– তিনজনই স্মার্ট।
রিমি তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো,
– মোনা একটা কথা ছিলো। যদিও সবাই জানে তুমি জানো না আমার একটা হেল্প দরকার তোমার।
– কি হেল্প?
– আমার চেয়ারম্যান স্যারকে খুব ভালো লাগে। যতদূর জানি স্যার এর ডিভোর্স হয়েছে। তুমি তো ক্লোজ স্যারের। স্যার কি বিয়ে করার প্ল্যান আছে কোনো?
চৈতি ধমকে উঠলো,
– এসব কি ধরনের কথা রিমি?
– তোরা এমন করিস কেনো? আমি তো জানতেই পারি। আমার কৌতুহল থাকতে পারে না? অন্যায়ের কিছু তো দেখছিনা।
মোনার মুখভঙ্গি দেখে বুঝার উপায় নেই ঠিক কতখানি ভারাক্রান্ত মন। আগ্নেয়গিরির লাভার মত ফাটতেও পারে তবে নিজেকে শান্ত রেখে সবাইকে থামিয়ে বললো,

– না ঠিক আছে। অবশ্যই তুমি জানার জন্য প্রশ্ন করতেই পারো। তবে উনাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলে ভালো হতো না?
– ভয় করে তো।
– কারো পারসোনাল ম্যাটার নিয়ে কথা বলা ঠিক হবেনা। তুমি নিজের টা নিজে বলো।
রিমি উচ্ছ্বসিত হয়ে বললো,
– তাই করি তবে। তুমিও যখন বলছো।
মোনা সাবধান বাণীতে বললো,
– বুঝে শুনে বলবে। মামা বা বাবার মত নন উনি। এমন ভাবে বলবে যেন প্রশ্নের ও উত্তর পাও, অপমানিতও হতে না হয়।
– ঠিক আছে।
-আমার মনে কৌতুহল জাগলো, তোমার মনে হয় নি উনি দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন বা করেছেন? এত বছর কেউ একা থাকে? আর যদি করে থাকে তার স্ত্রী জানলে কি হবে?

– করলে তো আমরা জানতামই। তুমিও তো জানতে।
– আমি জানলে তোমাকে কেনো বলবো। এটা তো পারিবারিক ব্যাপার। অবশ্যই পারিবারিক ব্যাপার অফিসে শেয়ার করার মত নয়।
রিমি কিছুটা চমকে উঠলো। বাকিরাও মোনার গলার স্বর পরিবর্তনের আভাস পেলো।
রিমি বলে উঠলো,
– শুনো মোনা বিয়ে করলেও তো সমস্যা নেই। আমি জানতে পারবো অন্তত। আমি নাহয় বউয়ের কাছ থেকে ভাগিয়ে আনবো? চেকমেট।
মোনা হেসে বললো,

– ইমরানকে দেখেছো না কেমন ধাঁড় লাগানো বান্দা, বিয়ে করেছে কিনা সেই খবর একটু ভালো মতই নিও। দেখবে যাকে বিয়ে করেছে সে যদি টের পায় তার স্বামীকে নিয়ে এভাবে দাবা খেলার প্ল্যান আছে তবে সে তোমার মাথা নিয়ে ফুটবল খেলবে। গোলবারে ফুটবল গেলে সে চিৎকার দিয়ে বলবে না, গোওওওল। সে কাউন্ট করবে কয়টা লাথি হয়েছে। একটা করে গোল আর একটা করে লাথি। বুঝতে পারছো! বি কেয়ারফুল। ইমরানের আবার বউ ভাগ্য ডেঞ্জারাস যেটাই বিয়ে করুক না কেনো বউ গুলার রূপের আর গুনের সাথে সহজে কেউ পাঙ্গা নিয়ে পারেনা। তোমাকে একবার ধরতে পারলে খপ করে ধরবে। এরপর দেখবে মাথার চুল একটাও নেই। তোমার এই সুন্দর রিবন্ডিং করা চুল বেচে বাতাসা কিনে বাচ্চাদের খাওয়াবে। জোক্স আ পার্ট। ডোন্ট টেক ইট সিরিয়াসলি। হা হা হা।
রিমি অবাক হয়ে বললো,
– বাপরে আজকে একেবারে ইমরান! এমন ভাবে বলছো মনে হয় যেন তোমার।
– হুম, ওই যে বললাম সব নামে ডাকার অধিকার আছে আমার। একেক নামে ডেকে তোমাকে চমকে দিব। আর আমারই তো। সবাই আমার। তুমি ও তো আমার। মানে আমার কোম্পানির।
তামান্না বাঁধা দিয়ে বললো,
– বাদ দাও মোনা। ওর মাথা ঠিক নেই।
মোনা বেরিয়ে এলো। মনের মাঝে সকল প্রকার ক্রোধ উতরে উঠেছে। মনে মনে ভাবনা এসেছে সত্যি এবার ফুটবলই খেলবে।

তামান্নার কল করা প্রমোটরদের রিমির পছন্দ হয় নি। সে চাইছে সরাসরি কোনো মডেল বা হিরোইনকে দিয়ে এই কাজ করাতে। অনেক কষ্টে একজনের নাম্বার পেয়ে যোগাযোগ করেছে। হিরোইন জানিয়েছে কাজটা সে ভালোবেসেই করবে৷ পেমেন্ট নেবেনা।
রিমি সবাইকে জানালে কেউ আর আপত্তি করেনি। যেহেতু ইমরান এমন দায়িত্ব দিয়েছে তাই সবাই সাবধানে গুছিয়ে কাজ করতে ব্যস্ত। ইমরানের পারমিশন নিতে চাইলে ইমরান জানালো,
– ফাইনাল শ্যুট দেখতে চাই। সেদিন পছন্দ না হলে বাদ দিয়ে দিব। দুজন হাতে রাখুন। আর অবশ্যই শো স্টপার থাকবে।
– স্যার বাদ দিতেই হবে না। আমরা শিউর পছন্দ হবে।
– কনফিডেন্স ইজ গুড বাট ওভার কনফিডেন্স ইজ ইনজুরিয়াস ফর রেপুটেশন।
রিমি, তামান্না কিছুটা ঘাবড়ে গেলো। তবুও সাইন করে দিলো ফাইলে। করতে করতে বললো,
– লেটস সী। ডোন্ট বি আপসেট।
রিমি, তামান্না সজোরে মাথা নেড়ে জানালো,

– জ্বি স্যার।
মোনা অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছে। আজ মন বেশিই খারাপ। ওরা বের হতেই ইমরানকে বললো,
– বাবার সাথে কথা বলতে চাচ্ছি। আমার আর ভালো লাগছেনা।
ইমরান কাজ করতে করতে উত্তরে বললো,
– কথা বলার প্রয়োজন নেই এখন। আমি যেয়ে কথা বলিয়ে দিব। কাল সকালে ফ্লাইট।
চমকে উঠলো মোনা। টিকিট কাটলো অথচ একটি বার ও জানালো না। মনে আক্ষেপ জাগলো ইশ যদি সে যেতে পারতো। অবশ্য বিজনেস ট্রিপে তো তাকে নেয়ার নিয়ম নেই কি করে যাবে। তবুও একবার বলে দেখবে কি! সাহস করে বলেই ফেললো,
– আমাকে নেবেন ইমরান সাহেব।
মোনার আদুরে অনুরোধ ফেলতে ইচ্ছে হলোনা তবুও নিরুপায়। এখন যদি কোনো ভাবে ইমরানের গলার স্বরে নমনীয়তা টের পায় এতেই এই মেয়ে পেয়ে বসবে। যেতে বাহানা ধরবে। মাথা নেড়ে পূর্বের ন্যায় ভারী স্বরে বললো,
– এখন না। আমি একবার ঘুরে আসি।
মন খারাপ করে সায় দিলো মোনা। তবুও আনন্দ। উনি গিয়ে বাবার সাথে কথা বলাবে।

মোনা বাড়ির লোকজনের জন্য ডেজার্ট বানিয়েছে। সন্ধ্যায় নাস্তার আসর জমে উঠেছে। ইশতিয়াক আজ থানা থেকে দ্রুত ফিরেছে। পুলিশের জব অনেক আরাধ্য। ভাইয়া কষ্ট করে বড় করেছে। থানা,পরিবার ছাড়া আর কিছুই চায় না। সততার জন্য যে কত জায়গায় বদলি হতে হয়েছে। এবার ইমরান বাঁকা পথে টাকা খরচ করে ঢাকা শিফট করিয়েছে। হোম মিনিষ্টারের সাথে পারসোনাল মিটিং করিয়ে তবেই সম্ভব করেছে। সোজা পথে সবসময় চলা সম্ভব হয়না, পৃথিবী থেকে সততা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।
তুশির প্যান প্যান সইতে হচ্ছে। শপিংয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কথা দেয়াতেও রাখা সম্ভব হয়নি ব্যস্ততার জন্য। ইতুকে কোলে নিয়ে মোনা হাঁটছে। তুশির সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে ইশতিয়াক। এক পর্যায়ে তুশি রেগে গিয়ে চামচ ছুড়ে মে*রেছে । মোনার গায়ে এসে লাগলো। ছুটে এসে চামচ তুলে বললো,
– ভাবী একদম স্যরি , আমি খেয়াল করিনি। তুমি ব্যাথা পেয়েছ?
মোনা হেসে বললো,

– ব্যাথা তো পাইনি, তবে তুমি যা করছো। একটু পর তো ভাইয়া শহীদ হয়ে যাবে। কাল আমি তোমাকে নিয়ে শপিংয়ে যাব হ্যাপি?
তুশি মেয়েটা নাছোড়বান্দা। আসার পর থেকে আশে পাশে থাকে। মোনাকে স্নেহ সম্মান দুটোই করে। ইশানের টিউটর কিছুক্ষন হলো গিয়েছে। আগামীকাল ইশানের শেষ পরীক্ষা। ছেলেটা নাস্তা করেই চলে গিয়েছে পড়তে। খাবার টেবিলে এখন সোহান, ইশতিয়াক। তুশি বকছে। আইরিন তুশিকে তাল দিচ্ছে। মোনা সবাইকে থামিয়ে বললো,
– এবার একটু থামো। তুশি আপু তুমি যা করছো আমাদের ইতু ও তাই শিখছে। দেখো কেমন হাত নাড়াচ্ছে।
– ভাবী মেয়েটা বাপের কপি। বাপকে বাঁচাচ্ছে।
সোহান ছোট মামীকে থামিয়ে বলে,
– তোমার যা রাগ মামী আমি ভয়েও বিয়ে করবোনা। ছোট মামার চেহারাটা কেমন হলো আহারে।
তুশি মোনা থেকে হাত বাড়িতে নিতে চাইলো ইতুকে। ইতু বড়আম্মুর কোল থেকে যাচ্ছেনা। মোনা বললো,
– তুমি খেয়ে নাও। আমি আছি।
ইশতিয়াক এতক্ষনে মুখ খুলে বললো,

– ভাবী ভাইয়া কি কাল থাইল্যান্ড যাচ্ছে?
– জ্বি ভাইয়া আমাকে তাই জানালো।
– আমার একটু কাজ ছিলো ভাইয়ার সাথে তাই আগেই জেনে নিলাম। বানিজ্য মন্ত্রীর সাথে ভাইয়ার মিটিং আছে নেক্সট উইক। বলেছিলো মনে করিয়ে দিতে। আপনি কি যাবেন?
– না, বাবা তো চলেই আসবে কাজ শেষ হলে। যেয়ে কি করবো।
– তাও ঠিক। আসলে তো ইনশাআল্লাহ দেখা হবে।
হঠাৎ অদ্ভুত সম্বোধনে মোনার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। পেছনে তাকানোর সাহস হচ্ছেনা। পুনরায় ডাক এলো,
– মুনিয়া…
আইরিন এবং সোহান ভয় পেয়ে গেলো। এ যেন ভূত দেখার মতো চমক। গেটের কেয়ারটেকার ছুটে এলো। আইরিনের দিকে তাকিয়ে মায়া বললো,
– আপা তোমাদের কেয়ারটেকার এত বেয়াদপ। আমাকে ঢুকতেই দিচ্ছিলোনা। বার বার বলতেছে যে আপনার পরিচয় দেন। বললাম যে সম্পর্ক যখন হবে তখন দেখে নেবে। তোমাদের বাড়ির বড় ম্যাডাম হব।
মোনার কাছে চলে এলো কেয়ারটেকার জোয়াদ্দার। হাত জোড় করে বললো,
– বড় আম্মা বিশ্বাস করেন আমি ঢুকতে দি নাই। উনি আমারে মা/রতে আসছিলো।
মোনা হাত তুলে বললো,

– গেট খালি তুমি যাও।
জোয়াদ্দার চলে গেলো। আইরিন আর তুশি যেন রক্তশূণ্য। মোনা নিজেকে শক্ত রেখে ইতুকে কোলে নিয়েই বললো,
– বসো ফুফি। আমাদের সাথে নাস্তা করো। আমি বানিয়েছি আজকে নাস্তা।
– এইতো বসবো। আমি তো তোকে নিতে এলাম।
– আমাকে নিতে? কেনো? কি হয়েছে?
– এই বাড়িতে তোর কি কাজ?
– আমার বাড়িতে আমার কি কাজ মানে?
– কোনটা তোর বাড়ি?
– যেখানে দাঁড়িয়ে আছো ওটা?
– মুনিয়া তুই এখনো ছোট। তোর বাবা তোকে ভুল বুঝিয়ে বিয়ে দিলো দ্বিগুন বয়সের একজনের সাথে। এটা কোনো বিয়ে?

– ওসব বাদ দাও। তুমি শ্বশুর বাড়ি যাও নি?
– কিসের শ্বশুর বাড়ি। মানি নাকি ওটাকে শ্বশুর বাড়ি।কদিন ছিলাম। এরপর আগামীকাল চলে এসেছি ছোট ভাইয়ার সাথে। কালকেই এখানে আসতে চেয়েছিলাম। সালমা ডাইনিটা দিলোনা। আজ কাউকে না বলে চলে এসেছি।
মোনা হেসে বললো,
– আরেকটু ডেজার্ট নাও। মতিয়া…
মতিয়া ছুটে এসেছে।
– জ্বি বড় আম্মা।
– আমার ফোনটা চার্জে। নিয়ে আসো।
ইতুকে তুশির কোলে দিয়ে বললো,
– নাও আমার মা টাকে খাইয়ে দাও।
সোহান উঠে গিয়ে এই সুযোগে ইমরানকে জানিয়ে দিয়েছে। মতিয়া মোনার ফোন এনে দিতেই মোনা মনসুরকে ফোন দিয়ে বললো,
– চাচ্চু ফুফি আমার বাড়িতে। রাত হয়েছে। একা যেতে পারবেনা নিয়ে যেও।
মায়া চেঁচিয়ে উঠলো,

– একা কেনো যাবো তোকে নিয়ে যাবো।
– ফুফি ইশানের এক্সাম কাল। আস্তে কথা বলো। এখানে কেউ জোরে কথা বলেনা। ইমরান সাহেবের খুব অপছন্দের।
– ইমরান আংকেল বল।
– জেনে শুনে পাপ কামাবো নাকি।
মোনা চেয়ার টেনে বসলো খেতে। মায়াকে ইশারা দিলো বসার জন্য। রাবিয়াকে ডেকে বললো,
– আমাদের পুডিং দিও তো।
পুনরায় মায়া জোরেই বললো,
– তোকে আমি কি বলছি কানে যাচ্ছেনা।
– ভাস্তির বাড়ি এসেছো। ঠিক মতো আপ্যায়ন করতে দাও। এমন করছো কেনো?
মোনা একটা নারিকেল পুলি পিঠায় কামড় দিয়ে বললো,
– দাদী, দাদা ভাই কেমন আছেন? আমি যাবো যাবো বলে সময় পাচ্ছিনা। ক্যাম্পাস, অফিস করে ক্লান্ত আমি।
– কিসের অফিস?
– বাবার জায়গায় আমি বসছি কয়েকদিন।
– ওহ।
মোনার এমন শীতল আচরণ পুরো ঘরের লোকজনকে ভাবিয়ে তুলেছে। পাক্কা ঘরনী হয়ে উঠেছে। ইশতিয়াকের পাশে তুশি এসে দাঁড়ায়। মেয়েটার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আছে। ইশতিয়াক তুশিকে ধরে পাশে বসালো। চোখ দিয়ে আশ্বস্ত করলো।
মায়া মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,

– নাটক বন্ধ কর। আমার সাথে যাবি কি যাবিনা?
– আমার বাড়ির দরজা খোলা। চাচ্চুর জন্য অপেক্ষা করতে না চাইলে বেরিয়ে যাও। আমি স্বামী,সন্তান সংসার ছেড়ে তোমার সাথে কোথায় যাবো?
– কিসের স্বামী? কে সন্তান। ইমরান ভাই শুধু আমার। তার সন্তান ও আমার হবে।
– তওবা করো। আসতাগফিরুল্লাহ।
এসবের বাড়াবাড়ির মাঝে সালমা এবং মনসুর ছুটে ডুকেছে। সালমা বাইরে থেকে এসব শুনে বলে উঠলো,
– পুরান পাগল ভাত পায় না নতুন পাগলের আমদানী। শুনছি কাকন ও আইসা এসব কাহিনী করছে। নাটক করে ভাইয়ের মেয়ের সংসারে অশান্তি কইরোনা মায়া। চলো।
আচমকা সবার সামনে সালমার চুল টেনে ধরলো। মোনা ছাড়াতে গেলো। মোনাকে সজোরে থাপ্পড় দিয়ে ধাক্কা দিলো। মনসুর, সোহান এবং ইশতিয়াক ধরেও উঠতে পারলোনা। টেবিলের সাথে বাড়ি খেয়ে মোনার ঠোঁট কেটে গেছে। বাড়ির দরজায় ইমরান তখন। এসব দেখে এগিয়ে এসে মোনাকে ধরে উঠালো।হুংকার ছাড়লো। বাড়ি স্তব্ধ,
– এটা কি কোনো মেন্টাল অ্যাসাইলাম?
কাল থেকে মেজাজ খারাপ অফিসের কিছু ব্যাপারে।এর মাঝে গাড়িতে যখন শুনলো মায়া এসেছে দুশ্চিন্তা কাজ করছিলো। এখন যা দেখলো তাতে মেজাজ তুঙ্গে। মোনার দিকে রক্ত চক্ষুতে তাকালো।
গর্জে উঠলো মায়ার দিকে তাকিয়ে,

– তোমার এত সাহস হয় কি করে আমার বাড়ি এসে আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তুলো? অন্য কেউ হলে আমি এই হাত ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিতাম। মনসুর একে বাড়ি নিয়ে যাও। স্যরি সালমা, আমি তোমাদের আপ্যায়ন করতে পারছিনা। একদিন দুজন এসে ঘুরে যাবে। আমার চোখের সামনে থেকে সরাও এই উন্মাদকে।
মোনা শান্ত করে বললো,
– আপনি রেগে যাচ্ছেন কেনো। ফুফির ভুল হয়েছে আমরা দেখছি।
মোনা মায়ার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললো,
– ফুফি কেনো পাগলামি করছো? আমাকেও সংসার করতে দাও। তুমিও কর। যা করছো এগুলো কি ভালো পরিবারের মেয়েরা করে বলো। তুমি না আমার মা?
– মেয়ে হয়ে মায়ের এত বড় সর্বনাশ করলি। আমার ইমরানকে কেড়ে নিলি। কি রূপ দেখালি যে ইমরান আমার দিকে না তাকিয়ে তোর মাঝে মজেছে? কচি দেহে মজেছে?
গা শিঁউরে উঠলো মোনার। ইমরান চোখে মুখে ক্রোধ। সোহান মামার হাত ধরে রেখেছে। সত্যি তেড়ে এসে না মায়াকে মা*রে। ইশানকে ধমক দিলো,
– ইশান রুমে যাও।
ভয় পেয়ে ইশান রুমে চলে গেলো। ছেলেটা শোরগোল পেয়ে বেরিয়ে এসেছিলো। ইশতিয়াকের দিকে তাকিয়ে বললো,

– তোর ভাবীকে বল আমি কন্ট্রোল হারালে কিন্তু খুব খারাপ হবে। বের করতে বল এই পাগলকে।
ইশতিয়াকের এগিয়ে যেতেই মনসুর বললো,
– আমি দেখছি। মায়া চল। আর নাক কাটাস না।
পুনরায় পাগলামি শুরু করলে মনসুর কষিয়ে থাপ্পড় মারে। মায়া রাগে কেঁদে কেঁদে বলে,
– অভিশাপ দিলাম কোনোদিন সুখী হবিনা তুই।
সালমা চেঁচিয়ে মনসুরকে বলে,
– তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেনো? মেয়ের অশান্তি দেখতে? এই শকুনের দোয়ায় গরু ম/রবে না। অভিশাপ উলটা ওর দিকে আসবে।
জোর করে মায়াকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো মনসুর এবং সালমা। সালমা যাওয়ার আগে মোনার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
– সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। এই পাগলকে আগে সামলাই। আমি আসবো একদিন তোর ভরা সংসার দেখতে।
ইমরান সোফার উপর বসে আছে। মোনা উপরে চলে গেলো ছুটে। কপালে হাত রেখে চুপচাপ সোফায় বসে আছে। আইরিন ভাইয়ের মাথায় হাত রাখতেই মাথা উঠিয়ে বললো,

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২৯

– আমি ঠিক আছি আপা।
একের পর এক দুশ্চিন্তা। মায়ার অপমান যেন শরীরে বিঁধছে। কি নোংরা ভাষায় বলল প্রতিটি বাক্য। জোরে জোরে শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করে রুমের দিকে এগিয়ে গেলো। নিজের মনের এই অবস্থা হলে, মেয়েটার মনের অবস্থা হয়তো আরো জটিল হবে। অনেকটা নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েই বাড়ির সবার উপর এভাবে রাগ দেখালো। আজ কোনো কিছুতেই নিজেকে কেনো নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছেনা?

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩১