Home Naar e Ishq Naar e Ishq part 28

Naar e Ishq part 28

Naar e Ishq part 28
তুরঙ্গনা

ট্রেন ছুটছে তীব্র গতিতে। নিমরা আর সুহিন একত্রে বসে আছে। ট্রেনে করে সর্বচ্চ ঘন্টা তিনেক এর মতো সময় লাগবে। রোম থেকে মিলানের দূরত্ব খুব একটা বেশি না হলেও সুহিনের মনের ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছে। ট্রেনের জানালার বাইরে ইতালির বিস্তৃত প্রান্তরগুলো দ্রুততর পেছনে সরে যাচ্ছে; ঠিক যেমন করে তার জীবন থেকে ফেলে আসা দিনগুলো হারিয়ে গেছে।
​দানিয়েল তার ক্যারিয়ার নিয়ে ইদানীং বড্ড বেশি সিরিয়াস। সে চায় না সুহিন এই মুহূর্তে দেশে ফিরে যাক। বরং ইতালির মাটিতেই যেন সে নিজের একটা শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলে, এটাই তার চাওয়া। দানিয়েল বেশ গম্ভীর গলায় তাকে বলেছিল,

“সুহিন, আবেগ দিয়ে জীবন চলে না। তোমাকে এখানে থাকতেই হবে। আমি চাই তুমি এই সুযোগটা হাতছাড়া না করো।”
​দানিয়েলের সেই জেদ আর জোরাজুরিতেই ইতালির বিভিন্ন নামকরা ভার্সিটিতে সুহিনের হয়ে সে নিজেই আবেদন করেছিল। অবশেষে যখন মিলানের বিশ্বখ্যাত ইউনিভার্সিটি অব মিলান সহ আরো দুটো ভার্সিটি থেকে ইন্টারভিউ আর ভাইবার জন্য মেইল এল, তখন দানিয়েলের আনন্দ দেখে কে! কিন্তু নিজের ব্যস্ততার কারণে সে শতচেষ্টা করেও যেতে পারছে না। তাই নিমরাকে ডেকে সে বেশ কড়া গলায় নির্দেশ দিয়ে বলল,
​”নিমরা, সুহিনকে নিয়ে তুই মিলান যাবি। দুই-তিন দিনের ব্যাপার। ওর যেন কোনো অসুবিধা না হয় সেটা দেখার দায়িত্ব পুরোটাই তোর। আমি ভার্সিটির চাপে এ-পাও নড়তে পারছি না। নয়তো আমিই যেতাম।”
​নিমরা এক কথায় রাজি। সে বেশ চনমনে স্বভাবের মেয়ে। সুহিনের কাঁধে হাত রেখে সে তখন তখনই বলল,
“আরে ভাই, তুমি একদম চিন্তা করো না। মিলান তো আর মঙ্গল গ্রহ না। আমি পারব,সমস্যা নেই।”
অতঃপর তার এই কথার ভরসাতেই দানিয়েল দুজনকে একাই মিলানের উদ্দেশ্য পাঠিয়ে দিল।

মিলান সেন্ট্রাল স্টেশনে নামার পর থেকেই এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা সুহিনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। মিলানের রাজকীয় আর ব্যস্ত রাস্তাগুলোতে পা রাখতেই তার মনে হলো, সে যেন এক অচেনা গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছে। তারা শহরের কেন্দ্রস্থলের কাছেই একটা অভিজাত বুটিক হোটেলে রুম বুক করল।
​রুমে ঢুকেই সুহিন বিছানায় গা এলিয়ে দিতে চাইল, কিন্তু নিমরা নাছোড়বান্দা। সে সুহিনের হাত ধরে টেনে তুলল।
“এই যে চশমিশ ম্যাডাম, ওঠো! মিলানে এসেছ আর ঘরে বসে থাকবে? চলো, একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। তোর মনটাও ভালো হবে।”
​সুহিন মৃদু প্রতিবাদ করে বলল,
“নিমরা, আমার ভালো লাগছে না। কাল ইন্টারভিউ, তার চেয়ে বরং একটু প্রস্তুতি নিই?”
​”প্রস্তুতি অনেক হয়েছে! তুই এমনিতেই পাস হয়ে যাবি। এখন একটু ফ্রেশ হওয়া দরকার। কোনো কথা নেই, চল এবার!”

​নিমরার একরকম জোরজবরদস্তিতেই সুহিন তৈরি হয়ে বাইরে বের হলো। ধূসর গাউনের সাথে চুলগুলো আলগা খোঁপা করে বেঁধে নিল। নীলচে চোখদুটো ঢাকা পড়ল সাদা ফ্রেমের চশমার আদলে।
দুজন ঘুরতে ঘুরতে মিলান-খ্যাত পিয়াজ্জা দেল দুয়োমোর সামনে গিয়ে পৌঁছাল। চারদিকে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। সাদা মার্বেলের তৈরি বিশাল ক্যাথেড্রালটার দিকে তাকিয়ে সুহিন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঝাঁকে ঝাঁকে পায়রা উড়ছে চত্বর জুড়ে, টুরিস্টদের কোলাহল, স্ট্রিট মিউজিশিয়ানদের সুর—সবই যেন এক ঐশ্বরিক আবহ তৈরি করেছে।
নিমরা পাশ থেকে বিস্ময়ের সাথে বলে উঠল,
“আরেব্বাস! বিদেশে কতো সুন্দর সুন্দর জিনিস, আর আমাদের দেশে শুধু খাম্বা?”
নিমরার কথা শুনে সুহিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আমাদের দেশে ক’দিন ঘুরতে বেরিয়েছিস তুই? ঠিকমতো খোঁজ নিয়ে দেখ, এমন অনেক কিছু পাবি, যা এদেশে নেই।”

নিমরা আর কথা বাড়াল। সে ঘুরেফিরে চারপাশটা দেখতে লাগল।কিন্তু সুহিনের কাছে কেন জানি এই জাঁকজমকও ধূসর লাগছিল। তার চশমার আড়ালে থাকা নীলাভ চোখ দুটো বারবার ভিড়ের মাঝে কাউকে খুঁজছিল, আবার ভয়ে সিঁটিয়েও যাচ্ছিল। নিমরা আইসক্রিম হাতে নিয়ে এসে বলল,
“কী রে,এখনো এখানে হা করে কী দেখছিস? আশেপাশে দেখ, শহরটা কত সুন্দর!”
​সুহিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অস্ফুট স্বরে বলল,
“সুন্দর ঠিকই, কিন্তু বড্ড বেশি অচেনা মনে হচ্ছে নিমরা। মনে হচ্ছে এই ভিড়ের মাঝে আমি খুব একা।”
সুহিন থেমে আবারও বলল,
“আম্মু-আব্বুর কথা মনে পড়ছে। আব্বু সবসময় বলতো,আমি আরেকটু বড় হলেই সে আমাকে আর আম্মুকে নিয়ে পুরো দুনিয়ার সব দিক-প্রান্তরে ঘুরতে বেরোবে। আমাদের পৃথিবী সব বিস্ময়কর জিনিসগুলো দেখাবে। কিন্তু আমি তখন ছোট ছিলাম বলে আমাদের আর ঘুরতে বেরোনো হয়নি। আম্মু বলতো,আরেকটু বড় না হলে নাকি পরবর্তীতে সেইসব স্মৃতি আমি ভুলে যাবো। আমিও তাদের কথা শুনেছিলাম, কিন্তু তারা তাদের কথা রাখেনি। আমি বড় হয়েছি, তাদের স্মৃতিও মনে রেখেছি,কিন্তু তারা আমার কাছে আর নেই।”
হুট করে তার এমন অভিব্যক্তিতে নিমরা থমকে গেল। শক্ত রমণীর মনটাও হুট করে নরম হয়ে পড়ল। সুহিন কাঁদছে না বরং তার নীল চোখদুটো নোনাজলে ভিজে উঠেছে;অথচ মুখে প্রশস্ত একখান মলিন হাসি।
নিমরা ভারী শ্বাস ফেলে তার দিকে ছুটে যায়। সুহিনের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
“আরে ধুর! ওনারা নেই তো কি হয়েছে, আমরা আছি না? এমন সিচুয়েশনেও কেউ এসব ভেবে মন খারাপ করে? চল,চল,আমরা ওই গ্যালারির দিকটা ঘুরে দেখি।”
​নিমরা প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে নিয়েছে। সে টানতে টানতে তাকে গ্যালারির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সুহিন তার কান্ডতে ক্ষীণ হাসল। অদ্ভুত একটা মেয়ে, দেখায় তার মতো রাগী মানুষ দুনিয়ায় আর দুটো নেই, অথচ মনের দিক থেকে সেও আর দশটা স্বাভাবিক মানুষের মতোই কোমল।

মিলানের আকাশজুড়ে গোধূলির রক্তিম আভা ছড়িয়েছে। ক্যাসেলো ফোরজেসকোর চারদিকে পর্যটকদের আনাগোনা, ইতালিয়ান কফির সুবাস আর নাম না জানা কোনো স্ট্রিট মিউজিশিয়ানের বেহালার সুর বাতাসে ভাসছে। সুহিন ভিড় থেকে কিছুটা তফাতে ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে অস্থির চোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল। নিমরা গিয়েছে কফি আনতে। ঠিক তখনই এক নাটকীয় মুহূর্তের সূত্রপাত।
​বিপরীত দিক থেকে লম্বা কদম ফেলে আসছিল এক দীর্ঘকায় যুবক। তার পরনে কুচকুচে কালো লেদার জ্যাকেট, নিচে আঁটসাঁট টি-শার্ট আর ডেনিম। চোখে তার দামি ব্র্যান্ডের কালো সানগ্লাস। সাজসজ্জা পরিমার্জিত হলেও ব্যক্তির ভাবগাম্ভীর্য কিছুটা অতিরঞ্জিত।
মাথার একগুচ্ছ চুল সুনিপুণভাবে জেল দিয়ে ওপরের দিকে চকাচক করে সাজানো—ঠিক যেন কোনো ইতালিয়ান ফ্যাশন ম্যাগাজিনের কভার থেকে উঠে আসা এক মানব। মুখের অর্ধেকাংশ ঢাকা তার কালো মাস্কে।
​অন্যমনস্ক নিমরা যখন দ্রুতপায়ে কফি নিয়ে ফিরছিল, ঠিক তখনই সেই ব্যক্তির সাথে তার সজোরে সংঘাত হলো। ধাক্কায় নিমরা টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়ার উপক্রম।
​নিমরা রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ইংরেজি-রোমান স্বরে চিৎকার করে উঠল,

“আর ইউ ব্লাইন্ড? দেখে চলতে পারেন না?”
​আগুন্তক তথা সাদ হাম্মাদি থমকে দাঁড়াল। সানগ্লাসের আড়াল থেকেই সে নিমরার তীক্ষ্ণ চিৎকার আর চেনা ভঙ্গিটা খুঁটিয়ে দেখল। আচমকা তার দুচোখ উৎফুল্ল আনন্দের ঝিলিকে চকচক করে উঠল। সে মাস্কের নিচ থেকেই একগাল হেসে বাংলায় চেঁচিয়ে উঠল,
“আরে! আরে! তুমি সেই মাধুমাক্ষী না? এ দেশে কী করছো?”
​অচেনা এক বিদেশি স্টাইলে সাজা যুবকের মুখে হুট করে এমন ঢঙের বাংলা শুনে নিমরা থতমত খেয়ে গেল। তার বিস্ময় তখন চরমে। সে এক মুহূর্ত বিরতি নিয়ে পরক্ষণেই চোখমুখ খিঁচে বলল,
“আপনি আবার কোন ক্ষেতের মুলা? বাংলাও বলতে পারেন দেখছি!”
​সাদ এক হাত দিয়ে তার কালো সানগ্লাসটা কপালে তুলল এবং অন্য হাতে মুখের মাস্কটা টেনে খুলে ফেলল। তার ঠোঁটের কোণে তখন সেই চিরচেনা বাঁদরামি মাখানো হাসি। সে কিছুটা ঝুঁকে এসে উৎসুক গলায় বলল,
“আরে আমায় তুমি সত্যিই চিনতে পারোনি? ওই যে আমাদের একদিন দেখা হয়েছিল, একটা পার্কে! আহা, সেই মধুর স্মৃতি কি এতো সহজে ভালো যায়য়য়? আমি ঠিক চিনতে পেরেছি তোমাকে, তুমিই আমার সেই মাধুমাক্ষী!”
​নিমরা এবার লোকটার হুলিয়া দেখে চিনতে পারল। এ তো সেই কনসার্টের স্টেজে বাদরের মতো লাফানো লোকটা! তার মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। সে ভ্রু কুঁচকে কর্কশ স্বরে বলল,

“ওরে আমার স্মৃতির মিনার! আপনি ঐই কনসার্টে বাদরের মতো স্টেজে লাফাতে থাকা লোকটা না? এবার আপনাকে আমি ঠিক চিনেছি।”
—“ওয়েট,তুমি ব্ল্যাকভেইনের কনসার্টে গিয়েছিলে? আমাকেও ফলো করেছো? হাউ সুইটটট! তোমার মতো নিরামিষের কাছে তো আমি এটা আশাই করিনি।”
সাদের এমন গদগদ ভাবভঙ্গি দেখে নিমরা ভ্রু উঁচিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“কি বলতে চাচ্ছেন আপনি?”
–—”না, না, তেমন কিছু না। আমি তো যাস্ট…”
—“হ্যা বলুন, বলুন, আপনি কি আমাকে ফলো করছেন? নাহলে যেখানেই যাই আপনার দেখা কেনো পাই? আমার কপাল তো এতোটাও খারাপ না!”
—“আরে মাধুমাক্ষী, শুধু শুধু রেগে যাচ্ছো কেনো আমি তো…”
—“একসেকেন্ড! এক সেকেন্ড! আবার মাধুমাক্ষী! চিনি না জানি না, কিসের মাধুমাক্ষী? এই মাধুমাক্ষী ডাকা বন্ধ করুন, নইলে এই কফিটাই আপনার চোখে-মুখে ঢেলে দেব!”
​নিমরা কফিটা তার দিকে ছুঁড়ে মারল বলে। রমণীর ফর্সা কপাল রাগে লাল হয়ে গিয়েছে। অথচ সাদ বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বরং বুক টান করে দাঁড়িয়ে বলল,

“আরে মটরফুল,না না সরি… বিউটিফুল বি! হুল ফোটাতে তো তুমি ওস্তাদ,তা তো আমি জানি।কিন্তু আমি তো এখানে নিজের কাজে এসেছি, তোমাকে ফলো করতে নয়। কিন্তু আমার চমৎকার ভাগ্যটা দেখো—সেই হুল ফোটানো সুন্দরীকেই আমার সামনে এনে হাজির করল। একেই বলে কুদরত-এ-খুদা!”
​সাদের এমন অসহ্য বাঁদরামি আর অনর্গল বকবকানিতে নিমরা রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠল। ইচ্ছে করল নিচ থেকে একটা পাথর কুড়িয়ে নিয়ে লোকটার মাথায় ছুঁড়ে মা রতে। সে আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ানো সমীচীন মনে করল না। হাতের কফিটা কোনোমতে সামলে নিয়ে সাদের দিকে একটা বিরক্তির চরম চাহনি ছুড়ে দিয়ে সে গটগট করে চলে যেতে উদ্যত হলো।
“আরে আরে এখনই কোথায় যাচ্ছো?”
—“আমার অহেতুক সময় নেই যে,কোনো বাদরের সাথে বকবক করব।”
—“তুমি কিন্তু আমায় ইনসাল্ট করছো মেয়ে!”
—“লজ্জা-সরম থাকলে দশহাত দূরে থাকুন তবে।”
সাদ থামল। একগাল হেসে দুহাত তুলে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে,ঠিক আছে, মনে হয় একটু বেশিই রেগে গেছো। কিন্তু তোমার রাগ আমার ভালো লাগে। হাউ সুইটটটটট!”

দুহাত এক করে অনবরত কয়েকটা চুমু ছুঁড়ে দিল নিমরার দিকে। নিমরা দাঁতে দাঁত পিষে চলে যেতে যেতে বলল,
“আরেকবার এমন অসভ্যতা করলে সোজা পুলিশে দেবো। ডান্ডার বাড়ি দুটো খেলে সব ঠান্ডা হয়ে যাবে।”
—“তুমি এমনিতেই যে হটটট, ঠান্ডা হবে কি করে? তবে তুমি আমায় সঙ্গ দিলে আমি সাতসমুদ্র পাড়ি দিয়ে হিমালয়ে বসে সন্ন্যাসী হতেও রাজি।”
নিমরা তার কথা শুনে আর একটাও প্রত্যুত্তর করল না। এতো বিরক্তিকর মানুষ হয়? আশ্চর্য! সে বিড়বিড় করে আওড়াল,,
“আজগুবি সব পাগল-ছাগল মানুষজন আমার কপালেই জোটে। বাদর লোক কোথাকার!”
ওদিকে তখনো পেছন হতে সাদের চিল চিৎকার আর হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছিল,
“টাটা মাধুমাক্ষী! আবার দেখা হবে কিন্তু!”
—“পাগল নাকি? এই জনমে তো না!”
​নিমরা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে দ্রুততর ভিড় সামলে সুহিনের কাছে পৌঁছাল। সুহিন তার এমন ভাবমূর্তি দেখে অবাক হয়ে বলল,

“কী হয়েছে? ওভাবে দৌড়ে আসছিস কেন?”
​নিমরা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আর বলিস না, একটা আস্ত পাগল আর বাঁদরের পাল্লায় পড়েছিলাম। এখানে এসেও শান্তি নেই!”
সে তখন আর বিস্তারিত কিছু না বলে সুহিনকে একরকম টেনে নিয়ে হোটেলের দিকে রওনা হলো, কিন্তু তার মনের কোণে তখন এক অদ্ভুত খচখচানি—এই লোকটা এখানে এল কীভাবে? আসলেই কাকতালীয় নাকি তাকে ফলো করছে?

রাত ক্রমশই গভীর হচ্ছে। জানালার ভারী পর্দাটা একপাশে সরিয়ে সুহিন বাইরের ব্যস্ত শহরের আলোকচ্ছটার দিকে তাকিয়ে আছে। মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে খানিকক্ষণ আগে বলা নিমরার কথাগুলো। রাস্তার নিয়ন আলোগুলো আজ তার চোখে বড় বেশি বিঁধছে। মনের ভেতর এক অস্থির কুয়াশা ক্রমাগত ঘনীভূত হচ্ছে।
হালকা অস্বস্তি নিয়ে সে বিছানায় আধশোয়া হয়ে থাকা নিমরার দিকে ফিরল। নিমরা তখনো গভীর বিরক্তিতে ফোন স্ক্রল করছিল, যেন ফোনের ওপরই বিকেলের সব রাগ উগরে দিচ্ছে। সুহিন দ্বিধা নিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“নিমরা, তুই কি নিশ্চিত ওটা সাদ ভাইয়াই ছিল?”
​নিমরা ফোন থেকে চোখ না সরিয়েই কপাল কুঁচকে উত্তর দিল,
“আরে হ্যাঁ! ওই বাদরকে আমি এত তাড়াতাড়ি ভুলি কী করে? ওটা ওই আপদটাই ছিল। মাস্ক খোলার পর তো আর কোনো সন্দেহ নেই।”
​সুহিন একটা ভারী শ্বাস ফেলল। তার দীর্ঘশ্বাসের শব্দে নিমরা ফোনটা পাশে রেখে সুহিনের দিকে তাকাল। সুহিনের ফ্যাকাশে আর মনমরা ভাবটা দেখে সে পরিস্থিতি আন্দাজ করতে দেরি করল না। কণ্ঠস্বর কিছুটা নরম করে নিমরা জিজ্ঞেস করল,

“তুই আবার এত কী ভাবছিস? হুট করে এমন দমে গেলি কেন?…আ… তুই কি কেকে-কে নিয়ে চিন্তা করছিস? ভাবছিস সে-ও এখানে আছে কি না?”
​সুহিন জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“থাকাটা কি খুব অস্বাভাবিক নিমরা? সাদ ভাইয়া এখানে মানে উনি-ও তো থাকতে পারে। ওনারা তো সব সময় একসাথেই থাকে।”
​নিমরা উঠে এসে সুহিনের পাশে বসল। সান্ত্বনার সুরে বলল,
“তো এতে এত চিন্তার কী আছে? বরং এটা তো ভালো যে এত সহজে কেকে-র হদিস পাওয়া যাবে। তার সাথে দেখা হওয়া মানেই তো তুই ডিভোর্স পেপার থেকে শুরু করে বাদবাকি সব ঝামেলা চটজলদি মিটিয়ে নিতে পারবি। অন্তত এবার এই টানাপোড়েনটা তো শেষ হবে।”
​সুহিন এবারও কেবল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চুপ করে রইল। মনের গহীনে সে জানত, দেখা হওয়াটা যতটা সহজ শোনাচ্ছে, বাস্তব ততটা সহজ নয়। তার নীরবতার মাঝেই নিমরা হুট করে বলে উঠল,
“আরে সবই তো বুঝলাম, কিন্তু দানিয়েল ভাইকে তো এখনো কিছু জানানো হয়নি। তাকে না জানিয়ে আগেই কি করব?”

​সুহিন কিছুক্ষণ নিরুত্তর হয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন নিজের ভেতরেই কোনো জটিল অঙ্ক মেলাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর সে ম্লান স্বরে বলল,
“না, এখনই থাক। আগে এই ইন্টারভিউ আর বাকি ঝামেলাগুলো একটু কেটে যাক। তারপর ধীরেসুস্থে সব গুছিয়ে তার সাথে এই নিয়ে আলোচনা করব। এখন বললে উনি অযথাই অস্থির হবে।”
​নিমরা তার যুক্তিতে সায় দিয়ে মাথা নাড়ল। সে সুহিনের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“ঠিক আছে, তোর কথাই থাক। এখন এসব দুশ্চিন্তা একদম ঝেড়ে ফেল। কাল তোর ভার্সিটির ভাইবা, সেটা নিয়ে প্রিপারেশন নে। নিজেকে শক্ত রাখ, এই সুযোগটা কিন্তু তোর জন্য খুব জরুরি। নাহলে দানিয়েল ভাই আবারও পাগলামি শুরু করে দেবে।”
​সুহিন কেবল আলগোছে মৃদু মাথা নাড়ল। অতঃপর রাতে খেয়ে-দেয়ে দুজনে স্থিরমনে ঘুমিয়ে পড়ল।

পরদিন সকাল বেলা। মিলানের আকাশটা আজ কিছুটা মেঘলা; যেন এক গুমোট রহস্য বুকে চেপে রেখেছে সমগ্র শহরটা। সুহিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিফলনটা দেখছিল। আজ তার জীবনের অন্যতম বড় একটা দিন; আসলেই বড় কিনা তা সে জানেনা। জীবন নিয়ে বিশেষ একটা অনুভূতি নেই তার, তবে নিমরা কিংবা দানিয়েলের এতো চেষ্টাও সে পুরোপুরি বৃথা হতে দিতে পারে না।
তবুও তার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছে। দানিয়েল নিজে তার সাথে আসতে না পারলেও, সেই সকাল থেকেই বারবার ফোন করে তাকে সাহস দিচ্ছিল। কিন্তু সুহিনের অবাধ্য মনটা বারবার গতরাতের নিমরার বলা সেই ঘটনার দিকে ছুটে যাচ্ছিল। সাদ যদি এখানে থাকে, তবে কি সে-ও…? না, ভাবা যাবে না। ঐ লোক তো শুধু তার স্বাভাবিক জীবনে গড়মিল বাঁধাতেই পেরেছে,এছাড়া কখনোই সুখকর কিছু দিতে পারেনি। সুহিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে নিজেকে সামলে নিল।
​সুহিনের পরণে সাদা-কালো রঙের ফর্মাল লং স্কার্ট সাথে সাদা রঙের টপস। তার রেশমি বাদামী চুলগুলো টেনে একটা উঁচু পনিটেইল আকারে খোঁপা করে নিয়েছে; অবাধ্য কিছু ছোট চুল বারবার কপালে এসে আছড়ে পড়ছে। চোখের সেই পরিচিত মোটা ফ্রেমের চশমাটা আজ যেন বারবারই তার অবাধ্য নাকের ডগায় নেমে আসছিল। চশমার আড়ালে থাকা তার নীল রঙের বড় বড় চোখ দুটোতে একরাশ আতঙ্ক আর সংকোচ খেলা করছে। কোনো প্রসাধন ছাড়াই তাকে আজ এক অদ্ভুত মায়াবী, অথচ খানিক বিষণ্ণ দেখাচ্ছে।

ভার্সিটির করিডোরটা বিশাল। চারদিকে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা স্টুডেন্টদের ভিড়। সবার পরনেই দামি স্যুট, কারো হাতে আইপ্যাড, কেউবা খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে তুখোড় ইতালিয়ান বা ইংরেজি ভাষায় কথা বলছে। তাদের সেই স্মার্টনেস আর আত্মবিশ্বাসের সামনে সুহিন নিজেকে খুব তুচ্ছ আর বেমানান ভাবছিল। তার মনে হচ্ছিল সে ভুল করে অন্য কোনো গ্রহে চলে এসেছে।
​করিডোরে পায়চারি করতে করতে সুহিন কয়েকবার বিড়বিড় করে নিজের নামটা আওড়ালো। বুকটা ধড়ফড় করছে। বারবার ফাইলটা বুকের সাথে চেপে ধরছে সে। নিমরা করিডোরের শেষ মাথায় বসে তাকে থাম্বস-আপ দিয়ে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু সুহিনের পায়ের তলার মাটি তখন কাঁপছে।
এরিমধ্যে হঠাৎ এক গম্ভীর নারী কণ্ঠে তার নামটা ঘোষিত হলো।সে যেন যান্ত্রিকভাবে এগিয়ে গেল। বিশাল দরজাটা ঠেলে ভাইবা রুমের ভেতরে পা রাখতেই,এক অদ্ভুত শীতল হাওয়া তাকে অভ্যর্থনা জানাল। রুমটা বেশ বড়; আধো-অন্ধকার যেন এক রহস্যের চাদরে মোড়া। সামনে বিশাল একটি অর্ধচন্দ্রাকৃতির টেবিল। সেখানে চারজন প্রফেসর বসে আছেন।

কিন্তু সবার মাঝখানে বসে থাকা সেই দীর্ঘকায় অবয়বটি সুহিনের সমস্ত চেতনা মুহূর্তেই অবশ করে দিল।
​লোকটি নিরেট অন্ধকারের মতো কালো রঙের একটি থ্রি-পিস স্যুট পরে বসে আছে। তার উপরে কালো রঙের একখান ওভার-কোট। সাদা শার্টের উপর কালো টাই-টাও প্রচন্ড নিখুঁতভাবে বাঁধা। লোকটির বসার ভঙ্গিতে খানিক রাজকীয় আভিজাত্য আর কর্তৃত্ব ফুটে উঠছে; যা বাকি প্রফেসর হতে তাকে কিছু ব্যতীক্রমী করে তুলেছে। তবে পরিমার্জিত এই রূপের মাঝে সবচেয়ে অগোছালো হলো তার চুলগুলো। কাঁধ অব্দি ছুঁয়ে থাকা ওল্ফ-কাটের চুলগুলো সহজাত গাম্ভীর্যের সাথেই অবিন্যস্ত রূপে দৃষ্টিতে ধরা দিচ্ছে। চোখে পড়া সুক্ষ্ম কালো ফ্রেমের চশমাটা অবিন্যস্ত চুলগুলোর আদলে কিছুটা ঢাকা পড়েছে।
টেবিলের ওপর রাখা তার দীর্ঘ আঙুলগুলো স্থির। তার মুখটা রুমের লাইটিং-এর কারণে কিছুটা ছায়ার ভেতরে থাকলেও, তার সেই দুর্ধর্ষ চোখের তীক্ষ্ণ-শীতল চাউনি সুহিনকে এক লহমায় বিদ্ধ করল।সেই বরফশীতল শিকারি দৃষ্টি যেন মানুষের চামড়া ভেদ করে সরাসরি অন্তরাত্মা খুঁটিয়ে পরখ করে নিতে পারে।
​সুহিন স্তম্ভিত! সংশয়ে নিজের দৃষ্টি একদম মাটির দিকে নামিয়ে নিল। সে বুঝতে পারছিল না সে এখন কী করবে। পায়ে পা লেগে হোঁচট খাওয়ার মতো অবস্থা। হাতের ফাইলটা কাঁপছে; হাত থেকে খসে পড়ার দশা। তার চশমার কাঁচটা সামান্য ঝাপসা হয়ে এলো ঘামের কারণে। মনের মধ্যে চাপা পড়েছে নতুন আশংকা—ওই কালো অবয়ব কি দেখতে পাচ্ছে তার চশমার আড়ালের কোণে জমে থাকা একবিন্দু অশ্রু? নাকি সে শুনতে পাচ্ছে সুহিনের বুকের পাগলাটে ছটফটানি।

​পুরো রুমে তখন পিনপতন নীরবতা। সুহিন প্রফেসরদের সামনে রাখা চেয়ারটার কাছে যাওয়ার সাহসটুকুও পাচ্ছিল না। সে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে পাথরের মূর্তির মতো একপ্রকার কাঁপতে শুরু করল। আদৌও ভুল কিছু দেখল কিনা,সেটাও বুঝে উঠতে পারছে না।

Naar e Ishq part 27

সংশয়ে কুঁকড়ে যাওয়া রমণীর আত্মবিশ্বাস তখন শূন্যের কোঠায়। ঠিক যখন সে ভাবল, এই বুঝি অজ্ঞান হয়ে গুটিয়ে পড়ে যাবে, ঠিক তখনই সেই থমথমে নীরবতা খানখান করে দিয়ে একটি ভারিক্কি, গম্ভীর ও অতি পরিচিত মেটালিক কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো।সেই কণ্ঠস্বর যেন এক লহমায় সুহিনের রক্তস্রোত হিম করে দিল। যা দেখে ব্যক্তিটি বেশ আয়েশ করে চেয়ারে সামান্য হেলান দিয়ে বসল; ক্রূর হাসির আভা মিশিয়ে, হুকুমের সুরে অত্যন্ত গুরুগম্ভীর হাস্কি-টোনে বলে উঠল,
​”হেই ইউ…চশমিশ! টেক ইউর সিট।”

Naar e Ishq part 29